শাহেদ কায়েস
একজন কবিকে নিয়ে ব্রিটিশ সরকার এতটা অস্বস্তিতে পড়েছিল কেন? তাঁর লেখা বাজেয়াপ্ত করতে হয়েছে, পত্রিকার জামানত কেড়ে নিতে হয়েছে, ছাপাখানায় নজরদারি বসাতে হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়েছে। একজন তরুণ কবির হাতে অস্ত্র ছিল না, তাঁর অধীনে কোনো সেনাবাহিনী ছিল না, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সাংগঠনিক শক্তিও তাঁর হাতে ছিল না। ছিল কলম, কণ্ঠ এবং এমন এক অদম্য স্বাধীনতাবোধ, যার সামনে ঔপনিবেশিক শাসকের ক্ষমতাও নিরাপদ বোধ করেনি।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যিক জীবন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাঁর কবিতা ও রাজনৈতিক চেতনা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সাহিত্য তাঁর কাছে কেবল সৃষ্টির ক্ষেত্র ছিল না; ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যমও ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা ছিল মানুষের চেতনা। তিনি বুঝেছিলেন, ঔপনিবেশিক শাসন শুধুমাত্র সৈন্য, পুলিশ, কারাগার ও আইনের সাহায্যে টিকে থাকে না; মানুষের ভয়, আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং নিজের শক্তি সম্পর্কে সংশয়ও তাকে দীর্ঘায়িত করে। নজরুলের কবিতা সেই ভয় ও আত্মসমর্পণের জায়গাতেই আঘাত করেছিল।
সৈনিক থেকে বিদ্রোহী কবি
নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার পেছনে তাঁর সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৭ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। করাচির সেনানিবাসে কাটানো সময় তাঁকে সাম্রাজ্যের সামরিক কাঠামোর ভেতর থেকে পৃথিবীকে দেখার সুযোগ দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী পৃথিবী তখন দ্রুত বদলাচ্ছে। রুশ বিপ্লব নতুন এক রাজনৈতিক কল্পনার জন্ম দিয়েছে, ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছে, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ শাসনের নির্মম চেহারা উন্মোচিত করেছে।
সেনাবাহিনী থেকে ফিরে কলকাতার সাহিত্য জগতে প্রবেশের পর নজরুল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও কাছ থেকে দেখতে শুরু করেন। সেই সময়ের ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাঁর সাহিত্যেও গভীরভাবে জায়গা করে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর কবিতায় এমন এক শক্তিশালী কণ্ঠ তৈরি হয়, যার কেন্দ্রে ছিল মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। ১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সেই উচ্চারণকে বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে দেয়। কবিতার ‘আমি’ কোনো ব্যক্তিগত আত্মম্ভরিতার ‘আমি’ নয়, সে সমস্ত শৃঙ্খল ভাঙতে উদ্যত মানুষের সম্মিলিত সত্তা। পুরাণ, ধর্ম, ইতিহাস, প্রেম, ধ্বংস, সৃষ্টি, ঝড়, আগুন—সবকিছুকে নিজের মধ্যে ধারণ করে সেই সত্তা ঘোষণা করে তার অপ্রতিরোধ্য অস্তিত্ব।
‘বল বীর—
বল উন্নত মম শির!’
এই উচ্চারণ ঔপনিবেশিক প্রজার মাথা নিচু করে থাকার সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল। সাম্রাজ্য তার অধীন মানুষকে প্রথমে প্রজা হিসেবে দেখতে চায়, নজরুল তাকে নিজের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ডাকলেন। এই জায়গাতেই ‘বিদ্রোহী’র রাজনৈতিক শক্তি। স্বাধীনতা সেখানে কোনো প্রশাসনিক বন্দোবস্তের অপেক্ষায় থাকা ভবিষ্যৎ ঘটনা না, মানুষের নিজের মর্যাদা আবিষ্কারের মধ্যেই তার সূচনা।
‘ধূমকেতু’: কাগজের পাতায় আগুন
১৯২২ সালের ১২ আগস্ট নজরুলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’। নামটির মধ্যেই ছিল তাঁর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক মেজাজ। ধূমকেতু আকাশে আসে অশুভ স্থিরতা ভাঙার বার্তা নিয়ে। নজরুলের পত্রিকাটিও ঔপনিবেশিক ভারতের স্থবির রাজনৈতিক পরিবেশে তেমনই এক তীব্র আবির্ভাব। ‘ধূমকেতু’কে নিছক সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে ভাবলে তার চরিত্র ধরা যায় না। পত্রিকাটি ছিল সাহিত্য, রাজনীতি এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার মিলিত ক্ষেত্র। রবীন্দ্রনাথ পত্রিকাটির জন্য আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন—
‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু।’
রবীন্দ্রনাথের সেই আহ্বান যেন নজরুলের সম্পাদনায় বাস্তব রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়ে গেল। পত্রিকার পাতায় তিনি আপসের পথ বেছে নেননি। ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আনুগত্য রেখে ধীরে ধীরে কিছু রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চিন্তা তাঁর কাছে পর্যাপ্ত মনে হয়নি। তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলেছেন এমন সময়ে, যখন ভারতীয় রাজনীতির প্রধান ধারাতেও পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি সর্বসম্মত অবস্থানে পৌঁছেনি। নজরুল লিখেছিলেন, ভারতের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীনে থাকবে না। তাঁর স্বাধীনতার ধারণা ছিল সরাসরি, আপসহীন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে সামান্য সংস্কার, প্রশাসনিক অংশীদারিত্ব, সীমিত অধিকার পাওয়ার মধ্যে তিনি মুক্তি খুঁজে পাননি। তিনি চেয়েছিলেন পরাধীনতার সম্পূর্ণ অবসান। এই রাজনৈতিক স্পষ্টতাই ‘ধূমকেতু’কে দ্রুত ঔপনিবেশিক সরকারের নজরে নিয়ে আসে।
‘আনন্দময়ীর আগমনে’: দেবীর মুখে বিপ্লব
১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ধূমকেতু’র পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। বাংলা সাহিত্যে ঔপনিবেশিক বিরোধী কবিতার ইতিহাসে এর অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপূজার পরিচিত সাংস্কৃতিক আবহকে নজরুল এখানে রাজনৈতিক বিদ্রোহের রূপ দিয়েছেন। তাঁর আনন্দময়ী কেবল পূজামণ্ডপের প্রতিমা হয়ে থাকেন না, তিনি অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন। কবিতায় ধর্মীয় পুরাণের পরিচিত চরিত্র ও প্রতীককে সমকালীন রাজনীতির মধ্যে টেনে আনেন নজরুল। ভারতবর্ষের পরাধীনতা, ব্রিটিশ শাসনের দমন-পীড়ন এবং দেশীয় মানুষের প্রতি অবমাননা নজরুলকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। তাই দেবীর আগমন তাঁর কবিতায় হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক অত্যাচার ভেঙে মুক্তির পথ তৈরির প্রবল আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
‘আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।’
এই সম্বোধনের মধ্যে পূজার প্রচলিত ভক্তিভঙ্গি ভেঙে যায়। কবি দেবীকে অলৌকিক প্রশান্তির প্রতীক হিসেবে ডাকছেন না, তিনি তাঁকে মাটির মূর্তি ছেড়ে জীবন্ত প্রতিরোধে আবির্ভূত হতে আহ্বান করছেন। ধর্মীয় আবেগকে ক্ষমতার অনুগত রাখার বদলে অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর এমন সাহসী কাব্যকৌশল ব্রিটিশ প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা ছিল না। কবিতাটি প্রকাশের পর ‘ধূমকেতু’র কার্যালয়ে পুলিশি অভিযান চলে। সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। নজরুলের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-এ ধারায় রাজদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর কুমিল্লা থেকে তিনি গ্রেপ্তার হন। কবিতা তখন সরাসরি রাষ্ট্রের মামলার নথিতে প্রবেশ করল।
আদালতের কাঠগড়ায় কবি
নজরুলের রাজদ্রোহের মামলা বাংলা সাহিত্য ও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্পর্কের এক অসাধারণ অধ্যায়। একজন কবির লেখা কবিতাকে রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক মনে করছে। আদালত বসেছে, বিচারক আছেন, আইন আছে, অভিযোগ আছে, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন কবি। এই মুহূর্তে নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রচলিত পথ নিলেন না। ক্ষমা চাননি, নিজের লেখার রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করেননি, ভুল বোঝাবুঝির আশ্রয়ও নেননি। ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি আদালতে তিনি যে বক্তব্য দেন, পরে সেটিই ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে বাংলা সাহিত্যের এক ঐতিহাসিক গদ্যরচনা হয়ে ওঠে। আদালতে তিনি বলেছিলেন— “আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী! তাই আমি রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত। একধারে রাজার মুকুট; আরধারে ধূমকেতুর শিখা। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আরজন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড। রাজার পক্ষে রাজার নিযুক্ত রাজবেতনভোগী, রাজকর্মচারী। আমার পক্ষে- সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্তকাল ধরে সত্য ু জাগ্রত ভগবানৃ।” (রাজবন্দীর জবানবন্দী)
তাঁর সেই বিখ্যাত উচ্চারণ—
‘একধারে রাজার মুকুট; আর ধারে ধূমকেতুর শিখা।’
কয়েকটি শব্দের মধ্যে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও কবির সম্পর্ককে এমন নাটকীয় দৃশ্যে দাঁড় করানো বাংলা সাহিত্যে বিরল। একদিকে সাম্রাজ্যের আইন, বিচারব্যবস্থা, কারাগার, পুলিশ ও রাজশক্তি; অন্যদিকে একা কবি এবং তাঁর কলম। দৃশ্যত ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ অসম। তবু নজরুল নিজের অবস্থানকে দুর্বল অভিযুক্তের জায়গায় রাখলেন না। আদালতের কাঠগড়াকেই তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের বিচারের মঞ্চে রূপান্তর করলেন।
‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’: অভিযুক্ত যখন বিচারক
‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ শুধু আদালতে দেওয়া একটি বক্তব্যের সাহিত্যরূপ নয়। ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে একজন লেখকের আত্মমর্যাদার দলিল হিসেবেও এর গুরুত্ব বিপুল। নজরুল সেখানে নিজের লেখার দায় গ্রহণ করেছেন পূর্ণ সাহসে।
তিনি ঘোষণা করেন—
“আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত।”
এই উচ্চারণের মধ্যে কবির দায়িত্ব সম্পর্কে তাঁর গভীর উপলব্ধি রয়েছে। রাষ্ট্র যাকে রাজদ্রোহ বলছে, কবি তাকে সত্য উচ্চারণের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করছেন। ফলে বিচারের চরিত্র বদলে যায়। আইনের চোখে নজরুল অভিযুক্ত, কিন্তু তাঁর নিজের উপলব্ধিতে বিচারাধীন হয়ে পড়ে অত্যাচারী রাজশক্তি। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিজের আইনকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। নজরুল সেই দাবির সামনেই আপত্তি তুললেন। আইন থাকলেই তার প্রয়োগ ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না, রাষ্ট্রের হাতে আদালত থাকলেই কবির বিবেককে অপরাধী করা যায় না। তাঁর বক্তব্যে এই সংঘাত অত্যন্ত তীব্র।
তিনি বিচারকের ব্যক্তিগত অবস্থানের চেয়েও বড় কাঠামোর দিকে তাকিয়েছিলেন। ঔপনিবেশিক আদালতে ভারতীয় বিচারক থাকলেও সেই আদালত শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যের আইন প্রয়োগ করছে। ব্যক্তি ভারতীয় হতে পারেন, ক্ষমতার কাঠামো ব্রিটিশ রাজের। নজরুল তাই ব্যক্তিগত বিরোধের সীমা ছাড়িয়ে শাসনব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়ান। শেষ পর্যন্ত তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কারাগার: শাস্তির ঘর থেকে প্রতিরোধের মঞ্চ
ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ধারণা ছিল, কারাগার মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করবে। নজরুলের ক্ষেত্রে ঘটল উল্টো। জেলের দেয়াল তাঁর রাজনৈতিক কণ্ঠকে আরও তীব্র করে তুলল। কারাগারে রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে তিনি অনশন শুরু করেন। তাঁর অনশন দীর্ঘ হতে থাকে। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। বাইরে উদ্বেগ বাড়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কের এই মুহূর্ত বাংলা সাহিত্য ইতিহাসে গভীর মানবিকতার স্মারক হয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত বিরজাসুন্দরী দেবীর অনুরোধে দীর্ঘ অনশনের পর তিনি খাদ্য গ্রহণ করেন।
কারাজীবন নজরুলের কবিতাকে থামাতে পারেনি। সেখানেও সৃষ্টি হয়েছে গান ও কবিতা। তাঁর ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ পরাধীন মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার অন্যতম প্রবল সংগীত হয়ে উঠেছে—
‘কারার ঐ লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল কর রে লোপাট।’
কারাগার এখানে শুধু ইট, লোহা ও প্রাচীরের স্থাপনা না, সমস্ত পরাধীনতার প্রতীক। লৌহকপাট ভাঙার ডাক তাই ব্যক্তিগত মুক্তির আবেদন ছাড়িয়ে রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় পৌঁছে যায়।
নিষিদ্ধ বই, ভীত সাম্রাজ্য
নজরুলের সঙ্গে ঔপনিবেশিক সরকারের সংঘাত একটি কবিতা কিংবা একটি মামলায় থেমে থাকেনি। তাঁর একাধিক গ্রন্থ ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। ‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয় শিখা’, ‘চন্দ্রবিন্দু’সহ বিভিন্ন রচনা ও গ্রন্থ সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং নজরদারির মুখে পড়ে। ‘বিষের বাঁশী’ নামের মধ্যেই নজরুলের কাব্যিক বিদ্রোহের প্রকৃতি ধরা পড়ে। বাঁশি সাধারণত সুরের প্রতীক, নজরুল সেই বাঁশিতে বিষ ঢেলে দিলেন অত্যাচারীর জন্য। তাঁর কাছে সৌন্দর্য ও বিদ্রোহ পরস্পরের শত্রু ছিল না। কবিতার সৌন্দর্যকে তিনি এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যার ভেতরে শোষকের জন্য অস্বস্তি এবং নিপীড়িতের জন্য সাহস জমা থাকে।
‘ভাঙার গান’-এ এই মনোভাব আরও প্রত্যক্ষ—
‘কারার ঐ লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল কর রে লোপাট
রক্ত-জমাট
শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী।’
‘শিকল-পূজা’ কথাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পরাধীনতা শুধু শাসকের চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা হয়ে থাকে না, দীর্ঘদিনের দাসত্ব মানুষের মধ্যে শিকলের প্রতিও আনুগত্য তৈরি করতে পারে। নজরুলের বিদ্রোহ তাই বিদেশি শাসকের পাশাপাশি মানুষের ভেতরের দাসত্বের বিরুদ্ধেও।
রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়েও বিস্তৃত মুক্তির ভাবনা
নজরুলের ঔপনিবেশিক বিরোধিতা বুঝতে গেলে তাঁর স্বাধীনতার ধারণার ব্যাপ্তি ধরতে হবে। ব্রিটিশ শাসকের বিদায় তাঁর আকাঙ্ক্ষার শেষ সীমানা ছিল না। বিদেশি শাসকের জায়গায় দেশীয় শোষক বসলে সাধারণ মানুষের জীবনে মুক্তি আসবে না—এই উপলব্ধি তাঁর কবিতা ও গদ্যে বারবার ফিরে এসেছে। ‘সাম্যবাদী’, ‘কুলি-মজুর’, ‘দারিদ্র্য’, ‘নারী’, ‘মানুষ’সহ বহু কবিতায় তিনি শ্রেণি, ধর্ম, লিঙ্গ ও সামাজিক মর্যাদার বিভাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ মানুষের পূর্ণ মর্যাদা।
‘গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’
ঔপনিবেশিকতা বিদেশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আধিপত্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক শোষণের ব্যবস্থাও। কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুরের শ্রম থেকে সম্পদ তৈরি হচ্ছে, অথচ তারাই বঞ্চিত। নজরুল তাই রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সামাজিক সাম্যের সঙ্গে যুক্ত করেন। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় রেলগাড়ি থেকে একজন কুলিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য তাঁকে আহত করে। সাম্রাজ্য রেলপথ নির্মাণ করেছে, আধুনিকতার গর্ব ছড়িয়েছে; সেই আধুনিকতার ভার বহনকারী শ্রমিকের মানবিক মর্যাদা কোথায়? নজরুল সাম্রাজ্যের চকচকে অবকাঠামোর আড়ালে শ্রমিকের শরীর দেখতে পেয়েছিলেন। এই জায়গায় তাঁর সাহিত্যিক প্রতিরোধ আরও গভীর। তিনি শুধু ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদের কবি হয়ে থেমে যাননি, স্বাধীন দেশের সম্ভাব্য শোষকের দিকেও তাঁর চোখ ছিল।
সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অন্যতম রাজনৈতিক কৌশল ছিল ভারতবর্ষের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যকার বিভাজনকে ব্যবহার করা। হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের উত্তেজনা যত বেড়েছে, সম্মিলিত ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনের শক্তিও তত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নজরুল এই বিভাজনের বিরুদ্ধে তাঁর সাহিত্যকে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় কোরআন ও পুরাণ, আল্লাহ ও কালী, কারবালা ও কুরুক্ষেত্র পাশাপাশি এসেছে। এই মিলন কোনো অলংকারসর্বস্ব কাব্যকৌশল ছিল না। বিভক্ত ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় ক্ষতবিক্ষত সমাজের সামনে তিনি এমন এক সাংস্কৃতিক চেতনার রূপ দিচ্ছিলেন, যেখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হবে তার ধর্মীয় সম্প্রদায় দিয়ে নয়, তার মানবিক মর্যাদা ও ব্যক্তিসত্তা দিয়ে। হিন্দু, মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে যে কৃত্রিম দূরত্ব তৈরি করা হয়েছিল, সাহিত্য ও সংগীতের মধ্য দিয়ে তিনি সেই ব্যবধান অতিক্রম করতে চেয়েছেন। তাঁর কাছে ধর্ম মানুষের বিশ্বাস ও আত্মিক অনুভবের অংশ, কিন্তু সেই পরিচয় মানুষকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করার দেয়াল হয়ে উঠতে পারে না। তাই তাঁর সৃষ্টিতে বারবার এমন এক সমাজের আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা, সাম্য এবং পারস্পরিক সহাবস্থান প্রধান হয়ে ওঠে।
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!’
‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর এই উচ্চারণ ভারতীয় রাজনীতির সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত। যে মুহূর্তে মানুষ ডুবছে, তার ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাওয়া মানবিক বিপর্যয়ের চিহ্ন। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত মুক্তির জন্য এই বিভাজন অতিক্রম করা নজরুলের কাছে জরুরি ছিল।
কবিতার ছন্দেও বিদ্রোহ
নজরুলের প্রতিরোধ শুধু তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সরাসরি ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বিদ্রোহ ছড়িয়ে আছে তাঁর কবিতার ছন্দ, শব্দের বিন্যাস, চিত্রকল্প, ধ্বনি এবং বাক্যের চলনের মধ্যেও। তিনি কী বলেছেন, তার পাশাপাশি কীভাবে বলেছেন, সেদিকেও তাকালে তাঁর সাহিত্যিক প্রতিরোধের আরেকটি গভীর স্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর বহু কবিতা পড়ার সময় মনে হয়, শব্দ স্থির হয়ে পৃষ্ঠায় পড়ে নেই; তারা যেন চলমান। কখনো সৈন্যদলের মতো মার্চ করছে, কখনো অশ্বারোহীর বেগে ছুটছে, কখনো যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে, আবার কখনো ঝড়ের প্রবলতায় একের পর এক বাক্য ভেঙে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। এই গতিময়তা পাঠককে কেবল কবিতার অর্থের কাছে নিয়ে যায় না, তাকে কবিতার ভেতরের উত্তেজনা, ক্রোধ, দ্রোহ এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও টেনে নেয়।
‘বিদ্রোহী’, ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘কামাল পাশা’, ‘আনন্দময়ীর আগমনে’সহ তাঁর বহু কবিতায় এই তীব্র গতির উপস্থিতি পাওয়া যায়। দীর্ঘ পংক্তি, আকস্মিক উচ্চারণ, পুনরাবৃত্তি, বিস্ময়সূচক ভঙ্গি, পরপর শক্তিশালী ক্রিয়াপদ এবং দ্রুত বদলে যাওয়া চিত্রকল্প তাঁর কবিতাকে অনেক সময় বক্তৃতা, সংগীত ও যুদ্ধের আহ্বানের সম্মিলিত রূপ দিয়েছে। পাঠক সেখানে নিছক কোনো দৃশ্যের বর্ণনা পান না, শব্দের ধাক্কা অনুভব করেন। কবিতার ছন্দ যেন শরীরের ওপরও কাজ করে। পাঠের সঙ্গে শ্বাসের গতি বাড়ে, উচ্চারণে চাপ তৈরি হয়, পংক্তির পর পংক্তি পাঠককে সামনে ঠেলে নিয়ে যায়। ফলে বিদ্রোহ তাঁর কবিতায় শুধু একটি বিষয় হয়ে থাকে না, কবিতার নিজস্ব গতির মধ্যেই বিদ্রোহী শক্তি সঞ্চারিত হয়।
শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নজরুল প্রচলিত সাহিত্যিক শুদ্ধতার বেড়া মানেননি। বাংলা, সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি উৎসের শব্দ তাঁর কবিতায় পাশাপাশি এসে এক নতুন ধ্বনিসম্পদ তৈরি করেছে। একই কবিতায় পৌরাণিক চরিত্র, ইসলামী ইতিহাস, যুদ্ধের পরিভাষা, লোকজ অভিব্যক্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের শব্দ স্বচ্ছন্দে মিলেছে। শব্দের উৎস নিয়ে তিনি সংকোচে ভোগেননি। তাঁর প্রয়োজন ছিল এমন উচ্চারণ, যা তাঁর অনুভবের তীব্রতা বহন করতে পারে। ফলে বাংলা কবিতার শব্দভান্ডার তাঁর হাতে আরও বিস্তৃত ও বহুস্বরিক হয়ে উঠেছে। এই মিশ্রণ একই সঙ্গে বাংলার বহুধর্মী ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজের জীবনকেও কবিতার মধ্যে প্রবেশের জায়গা দিয়েছে। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং শহুরে শিক্ষিত সমাজ দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যিক পরিশীলনের একটি বিশেষ ধারণাকে গুরুত্ব দিয়েছিল। কোন শব্দ কবিতার উপযুক্ত, কোন অভিজ্ঞতা উচ্চাঙ্গ সাহিত্যে স্থান পাবে, কার জীবন কবিতার বিষয় হতে পারে, এসব নিয়েও অদৃশ্য কিছু সীমারেখা তৈরি হয়েছিল। নজরুল সেই সীমারেখার প্রতি খুব কমই আনুগত্য দেখিয়েছেন। তাঁর কবিতায় রাজপথ এসেছে, কারাগার এসেছে, ব্যারাক এসেছে, যুদ্ধক্ষেত্র এসেছে, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এসেছে। সৈনিকের হাঁক, শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের দুঃখ, ক্ষুধার্ত মানুষের ক্রোধ, মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, যুদ্ধের দামামা, বাঁশির সুর, প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাস সবকিছুকেই তিনি কবিতার উপাদান করে তুলেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্যজগৎ কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির অভিজ্ঞতার মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের উপস্থিতি। কুলি, মজুর, কৃষক, সৈনিক, ক্ষুধার্ত মানুষ তাঁর কাছে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করার চরিত্র ছিল না। তাঁদের শ্রম, বঞ্চনা, ক্রোধ ও আত্মমর্যাদা তাঁর কবিতার শক্তির সঙ্গে মিশে গেছে। ‘কুলি-মজুর’, ‘সাম্যবাদী’, ‘দারিদ্র্য’সহ বিভিন্ন রচনায় সমাজের নিচের সারিতে ঠেলে রাখা মানুষ কবিতার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। যাদের জীবন দীর্ঘদিন সাহিত্যিক সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণার বাইরে রাখা হয়েছিল, নজরুল তাদের অভিজ্ঞতাকেই কবিতার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে সাহিত্য কার কথা বলবে এবং কার জীবনকে ধারণ করবে, সেই পরিসরও অনেকখানি বদলে যায়।
নজরুলের সাহিত্যিক বিদ্রোহের শক্তি এখানেই আরও গভীর। তিনি সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লিখেছেন, একই সঙ্গে সাহিত্যজগতের শ্রেণিগত ও সাংস্কৃতিক দরজাগুলোতেও আঘাত করেছেন। তাঁর কবিতা যেন ঘোষণা করেছে, সাহিত্য শুধু শিক্ষিত অভিজাতের পরিশীলিত অনুভূতির সম্পত্তি হয়ে থাকতে পারে না। শ্রমিকের ক্লান্ত শরীর, কৃষকের ক্ষুধা, সৈনিকের উত্তেজনা, বন্দীর ক্রোধ, ধর্মীয় মানুষের প্রার্থনা, প্রেমিকের আকুলতা এবং নিপীড়িত মানুষের মুক্তির বাসনা সমান শক্তিতে কবিতার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এই বিস্তৃত মানবজগতকে ধারণ করেই নজরুল বাংলা কবিতার পরিসরকে আরও উন্মুক্ত করেছিলেন। তাই তাঁর সাহিত্যিক প্রতিরোধকে শুধু ব্রিটিশবিরোধী কয়েকটি কবিতা, রাজনৈতিক নিবন্ধ কিংবা রাজদ্রোহের মামলার মধ্যে আবদ্ধ করে পড়লে তাঁর সৃষ্টিশীল বিদ্রোহের বড় একটি অংশ আড়ালে থেকে যায়। ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই যেমন রাজনৈতিক, তেমনি সাহিত্যিক রুচি, শব্দের শ্রেণিবিভাগ এবং কবিতার প্রচলিত ভদ্রতার বিরুদ্ধেও ছিল তাঁর অবস্থান। তিনি সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি কবিতার ভেতরের কর্তৃত্বকেও অস্বস্তিতে ফেলেছিলেন। বাংলা কবিতার দরজা আরও প্রশস্ত করে সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন, শ্রম, বিশ্বাস, ক্ষুধা, প্রেম, ক্রোধ ও বিদ্রোহকে প্রবলভাবে প্রবেশ করিয়েছিলেন। এই কারণেই নজরুলের কবিতায় প্রতিরোধ কেবল বক্তব্য হিসেবে ধরা পড়ে না; প্রতিরোধ সেখানে শব্দের শরীর, ছন্দের গতি এবং উচ্চারণের শক্তি হয়ে বেঁচে থাকে।
নজরুলের স্বাধীনতার স্বপ্ন
নজরুল যে স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক স্বাধীনতার সরল সমীকরণ করা কঠিন। তাঁর কাছে স্বাধীনতা শুধু বিদেশি শাসকের বিদায় কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার হাতবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি এমন এক মুক্ত মানুষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার মাথার ওপর ঔপনিবেশিক প্রভু থাকবে না, আবার সমাজের ভেতরেও মানুষ ধর্ম, শ্রেণি, লিঙ্গ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক মর্যাদার কারণে অপমানিত হবে না। সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, শ্রমের মর্যাদা, নারীর অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মানুষের আত্মমর্যাদা তাঁর মুক্তিচিন্তার ভেতরে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের বহু আগেই তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতায় তাই এমন এক সমাজের আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে, যেখানে মানুষের পরিচয়ের কেন্দ্রে থাকবে তার মনুষ্যত্ব। এই কারণেই নজরুলের ঔপনিবেশিক বিরোধিতাকে শুধু ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক সাহিত্যের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্বে আটকে রাখা যায় না। তাঁর লেখার গভীরে ছিল আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মশক্তি জাগিয়ে তোলার তাগিদ। সাম্রাজ্য চলে যেতে পারে, কিন্তু সাম্রাজ্যিক মানসিকতা থেকে যেতে পারে। বিদেশি শাসক বিদায় নিতে পারে, অথচ ক্ষমতার সামনে মাথা নত করার অভ্যাস সমাজে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে। শাসকের চেহারা বদলালেও প্রভু ও অধীনস্থের সম্পর্ক নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পরও যদি মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ থাকে, শ্রমিক তার শ্রমের মর্যাদা না পায়, নারী নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষ আক্রান্ত হয়, দরিদ্র ও দুর্বল মানুষ ক্ষমতাবানের হাতে নিপীড়িত হয়, তাহলে নজরুলের কল্পিত মুক্তির পথ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কারাগারের লৌহকপাট একদিন খুলে যেতে পারে, অথচ মানুষের মনের ভেতরে ভয় ও আনুগত্যের অদৃশ্য শিকল রয়ে যেতে পারে। ঔপনিবেশিক শাসন মানুষের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি তার আত্মবিশ্বাসেও আঘাত করে। দীর্ঘদিনের অধীনতা মানুষকে নিজের শক্তি সম্পর্কে সংশয়ী করে তোলে, প্রতিবাদের বদলে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত করে, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকাকে নিরাপদ জীবনের কৌশলে পরিণত করে। নজরুলের সাহিত্য এই মানসিক অধীনতার বিরুদ্ধেও প্রবল আঘাত। তাঁর কবিতার ‘আমি’ তাই নিছক ব্যক্তিগত অহংকারের উচ্চারণ হয়ে থাকে না। সেই ‘আমি’র মধ্যে আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়া মানুষের দুর্দমনীয় শক্তি জেগে ওঠে। যে মানুষ এতদিন মাথা নিচু করে ছিল, নজরুল তাকে নিজের উচ্চতা আবিষ্কার করতে আহ্বান করেছেন। তাঁর বিদ্রোহের একটি গভীর তাৎপর্য এখানেই। ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ তাই শুধু দৃশ্যমান কারাগারের দরজা ভাঙার আহ্বান হিসেবে পড়লে তার ব্যাপ্তি সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। লৌহকপাটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় ভয়, নিষ্ক্রিয়তা, আত্মসমর্পণ ও পরাধীন মানসিকতার নানা প্রাচীর। একইভাবে ‘বল বীর— / বল উন্নত মম শির!’ উচ্চারণের মধ্যে ব্যক্তিগত দম্ভের চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে অবনত মানুষকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর আহ্বান।
ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র যে মানুষকে প্রজা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, নজরুল সেই মানুষকেই নিজের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন স্বাধীন সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন। এখানেই তাঁর সাহিত্যিক প্রতিরোধ রাজনৈতিক প্রতিবাদের সীমা ছাড়িয়ে মানুষের ভেতরের স্বাধীনতাকেও স্পর্শ করে। নজরুলের বিদ্রোহকে তাই শুধু ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে পড়লেও ভুল হবে। তাঁর কবিতায় ঝড় আছে, প্রলয় আছে, ভাঙনের উন্মত্ত গতি আছে। কিন্তু সেই ধ্বংসের লক্ষ্য মানুষের ওপর চেপে বসা অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের কাঠামো। পুরোনো জগতের অন্যায় ভেঙে মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথ তৈরি করাই তাঁর বিদ্রোহের অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষা। ‘বিদ্রোহী’র শেষ দিকে কবি নিজের শান্ত হওয়ার সময়কে যুক্ত করেছেন এমন এক দিনের সঙ্গে, যখন উৎপীড়িতের ক্রন্দন আর আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হবে না, অত্যাচারীর খড়্গ নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হবে না। এই উচ্চারণ তাঁর সমগ্র বিদ্রোহী সত্তাকে বুঝতে সাহায্য করে। তিনি বিদ্রোহের জন্য বিদ্রোহ চাননি; মানুষের ওপর অত্যাচারের অবসান না হওয়া পর্যন্ত বিদ্রোহকে প্রয়োজনীয় শক্তি হিসেবে ধারণ করেছেন। এই জায়গা থেকেই তাঁর সাম্যের আকাঙ্ক্ষা, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সংহতি, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং নারীমুক্তির চিন্তা একই প্রবাহে এসে মেশে। কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, নিপীড়িত নারী, ধর্মীয় বিভাজনে আক্রান্ত মানুষ—তাঁদের প্রত্যেকের মুক্তিকে তিনি বৃহত্তর স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর কাছে একজন মানুষের ওপর আরেকজন মানুষের আধিপত্যও স্বাধীনতার পরিপন্থী। ফলে ব্রিটিশ শাসনের অবসান তাঁর স্বপ্নের একটি রাজনৈতিক পর্যায় হতে পারে, কিন্তু মানুষের পূর্ণ মুক্তির শেষ সীমা সেখানে এসে থেমে যায় না।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলেও দেশভাগের রক্তপাত, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, উদ্বাস্তু মানুষের দুর্দশা এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় বৈষম্য স্বাধীনতার অর্থকে আরও জটিল করে তোলে। নজরুল তখন দীর্ঘ অসুস্থতায় সৃষ্টিশীল জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। তবু তাঁর আগের লেখাগুলোর দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, পতাকা ও শাসকের পরিবর্তনের চেয়ে অনেক বিস্তৃত ছিল তাঁর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। মানুষ যদি নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অন্য মানুষকে ঘৃণা করে, সম্পদের মালিক শ্রমিককে পদদলিত করে, পুরুষ নারীকে অধীন করে রাখে, রাষ্ট্র নাগরিকের স্বাধীন কণ্ঠকে ভয় পায়, তখন ঔপনিবেশিক শাসক চলে গেলেও আধিপত্যের পুরোনো প্রবণতা নতুন পোশাকে ফিরে আসে। এই জায়গাতেই নজরুল আজও সমকালীন। তাঁর সাহিত্য আমাদের সামনে স্বাধীনতার এমন এক বিস্তৃত ধারণা হাজির করে, যেখানে রাষ্ট্রের স্বাধীনতার পাশাপাশি মানুষের স্বাধীনতাও সমান গুরুত্ব পায়। যে স্বাধীনতায় মানুষ ভয়হীনভাবে কথা বলতে পারে, নিজের বিশ্বাস ও পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারে, শ্রমের মর্যাদা পায়, নারী নিজের জীবনের ওপর কর্তৃত্ব রাখে, দুর্বল মানুষ ক্ষমতাবানের হাতে অপমানিত হয় না এবং ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভেদের অস্ত্র হয়ে ওঠে না। এমন সমাজের আকাঙ্ক্ষাই নজরুলের বিদ্রোহকে তার ঐতিহাসিক সময় অতিক্রম করে বর্তমানের কাছে নিয়ে আসে।
তাই নজরুলকে পড়া মানে শুধু ঔপনিবেশিক ভারতের এক বিদ্রোহী কবিকে স্মরণ করা না, মানুষের ভেতরে ও বাইরে তৈরি হওয়া আধিপত্যের নানা রূপকে শনাক্ত করাও। তাঁর সাহিত্য প্রশ্ন তোলে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পর মানুষ কতখানি স্বাধীন হলো, রাষ্ট্রের পতাকা বদলানোর সঙ্গে মানুষের জীবনের অপমান কতখানি দূর হলো, শাসকের পরিচয় পাল্টানোর পরও ক্ষমতার পুরোনো চরিত্র কতখানি রয়ে গেল। নজরুলের বিদ্রোহের চূড়ান্ত গন্তব্য কোনো সিংহাসনের পতনেই শেষ হয় না। তার শেষ গন্তব্য এমন এক মানবসমাজ, যেখানে উৎপীড়িত মানুষের কান্না থামবে, অত্যাচারীর অস্ত্র নিষ্ক্রিয় হবে এবং মানুষ মাথা উঁচু করে নিজের পূর্ণ মর্যাদায় বাঁচতে পারবে। সেই মুক্তি যতদিন অসম্পূর্ণ, ততদিন নজরুলের বিদ্রোহও তার প্রয়োজন হারায় না।
কবির বিরুদ্ধে সাম্রাজ্য, সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কবিতা
‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশের পর পুলিশ কবিকে খুঁজেছে। ‘ধূমকেতু’ বাজেয়াপ্ত হয়েছে। রাজদ্রোহের মামলা হয়েছে। আদালত তাঁকে কারাদণ্ড দিয়েছে। কারাগারে তাঁর শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে। তাঁর বই নিষিদ্ধ হয়েছে। তবু সাম্রাজ্যবাদী শক্তি একটি কাজ করতে পারেনি—তাঁর উচ্চারণকে কারাগারের ভেতর আটকে রাখতে পারেনি। বরং বিচারের কাঠগড়া থেকে জন্ম নিয়েছে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। কারাগারের অভিজ্ঞতা থেকে আরও শক্তিশালী হয়েছে শিকল ভাঙার গান। সরকারি নিষেধাজ্ঞা তাঁর কবিতাকে পাঠকের কাছ থেকে মুছে দিতে পারেনি। যে রাষ্ট্র তাঁর বই বাজেয়াপ্ত করেছিল, সেই রাষ্ট্র আজ আর নেই; বইগুলো রয়ে গেছে। এখানেই সাহিত্যিক প্রতিরোধের এক আশ্চর্য পরিণতি।
ক্ষমতার আয়ু এবং কবিতার আয়ু এক মাপে চলে না। ঔপনিবেশিক সরকারের হাতে পুলিশ ছিল, সেনাবাহিনী ছিল, আদালত ছিল, কারাগার ছিল, সেন্সরশিপ ছিল। নজরুলের হাতে ছিল শব্দ। তৎকালীন শক্তির বিচারে তুলনাটি হাস্যকর রকম অসম। প্রায় এক শতাব্দী পরে এসে দৃশ্যটি পাল্টে গেছে। ব্রিটিশ রাজ ভারতবর্ষের অতীতের অধ্যায়; নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ এখনো উচ্চারিত হয়, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ এখনো মানুষকে আলোড়িত করে, ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ এখনো ক্ষমতার সামনে একজন লেখকের সাহসী অবস্থানের স্মারক হয়ে আছে।নজরুল তাই শুধু ব্রিটিশবিরোধী কবি নন। তিনি সেই কবি, যিনি পরাধীন মানুষের কল্পনার ভেতর স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিলেন। তাঁর কবিতা মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা দিয়েছিল, তাঁর গদ্য আদালতের কাঠগড়াকে প্রতিবাদের মঞ্চে পরিণত করেছিল, তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা সংবাদপত্রের পাতাকে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্র বানিয়েছিল।
‘একধারে রাজার মুকুট; আর ধারে ধূমকেতুর শিখা’—নজরুলের নিজের তৈরি এই দৃশ্যের মধ্যেই তাঁর সাহিত্যিক জীবনের এক বড় অংশ ধরা আছে। রাজার মুকুটের পেছনে ছিল একটি সাম্রাজ্য। ধূমকেতুর শিখার পেছনে ছিলেন একজন কবি। শেষ পর্যন্ত মুকুটটি হারিয়ে গেছে। শিখাটি এখনো জ্বলছে।
শাহেদ কায়েস: কবি, প্রাবন্ধিক ও অধিকারকর্মী, নারায়নগঞ্জ



