ড. মাসুদুল হক
২৫ আগস্ট ২০২৬ সন্ধ্যা একটু একটু করে রাতের দিকে গড়াচ্ছিল। কচি অন্ধকার পাকতে পাকতে যখন চেরাগি পাহাড় মোড়ে পৌঁছালাম, তখন চট্টগ্রামের ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতরেই যেন অন্য এক সময়ের দরজা খুলে গেল। ‘আন্দরকিল্লা’ পত্রিকা অফিসে মুহম্মদ নুরুল আবসার ভাইকে ঘিরে গোল হয়ে বসে আছেন কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, চিন্তক ও সমাজমনস্ক মানুষজন। দৃশ্যটি আমার কাছে বেকনের মৌমাছির মতো—প্রত্যেকে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও চিন্তার পরাগ নিয়ে এসেছেন, আর সম্মিলিত আলাপে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের অদৃশ্য মধু। কোনো পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান নেই, নেই মঞ্চের আনুষ্ঠানিকতা; অথচ কথার ভেতর দিয়ে সময়, সমাজ, সাহিত্য ও মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে তীব্র অনুসন্ধান চলছিল, তা কোনো আনুষ্ঠানিক সভার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আড্ডাটি দ্রুতই সৌজন্যবিনিময়ের সীমা অতিক্রম করে প্রবেশ করল গভীরতর এক বৌদ্ধিক পরিসরে। সেখানে সাহিত্য কেবল সাহিত্য থাকল না; সাহিত্য হয়ে উঠল সমাজকে দেখার একটি জানালা, আবার সমাজও হয়ে উঠল সাহিত্যের দায় ও নৈতিকতার আয়না।
আমাদের আড্ডা ও কথায় এই সময়ের এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক সংকট ও সম্ভাবনার দ্বৈত রেখা তৈরি হয়। আমরা যা-ই লিখি না কেন, সবকিছুর সঙ্গেই দায়বদ্ধতা থাকা অত্যাবশ্যক। এই দায়বদ্ধতা
কোনো দলীয় আনুগত্য কিংবা তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার কাছে আত্মসমর্পণ নয়; বরং মানুষের জীবন, সময়ের সত্য এবং সমাজের অন্তর্গত ক্ষতগুলোর প্রতি লেখকের নৈতিক দায়। লেখক যখন নিজের সময়কে অস্বীকার করেন, তখন তাঁর ভাষা যতই অলংকারময় হোক, তার ভেতর থেকে প্রাণের উষ্ণতা সরে যায়। আর যখন তিনি সময়ের দহনকে নিজের অনুভবের ভেতর ধারণ করেন, তখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অতিক্রম করে তা হয়ে উঠতে পারে সামষ্টিক ইতিহাসের দলিল।
সময় আমাদের শরীরে ও সমাজে যে পোড়া দাগ রেখে যায়, তার দিকে তাকানোর দুটি উপায় আছে। একদিকে সেটিকে নিছক ধ্বংসের স্মারক হিসেবে দেখা যায়; অন্যদিকে দেখা যায়, সেই দগ্ধতার ভেতরেই নতুন কিছুর জন্মের সম্ভাবনা আছে। প্রসববেদনা যেমন কেবল যন্ত্রণার নাম নয়, তেমনি ইতিহাসের যন্ত্রণাও কখনো কখনো নতুন সামাজিক চেতনার জন্মদ্বার। এই জায়গাতেই একটি বৃহত্তর নন্দনতাত্ত্বিক প্রশ্ন এসে যুক্ত হয়—সাহিত্য কি শুধু সৌন্দর্যের অন্বেষণ, নাকি সৌন্দর্যের গভীরে অসুন্দর, বেদনা, ক্ষয়, অন্যায় ও সম্ভাবনাকেও ধারণ করার নাম?
সমকালীন আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আড্ডায় যে উদ্বেগ উচ্চারিত হয়েছে, তার কেন্দ্রে ছিল এক ধরনের অসহায় বোধ। যা চলছে, তা মেনে নেওয়া কঠিন—এই বাক্যটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ হলেও এর সামাজিক অভিঘাত গভীর। কারণ একটি সমাজ যখন দীর্ঘদিন ধরে এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, যার সঙ্গে তার নৈতিক বোধের সংঘাত তৈরি হয়, তখন মানুষের ভেতরে এক ধরনের বিমূর্ত ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হয়। সেই ঘূর্ণাবর্তের কোনো দৃশ্যমান আকার নেই; কিন্তু তার অভিঘাত আছে মানুষের মননে, সম্পর্কের ভেতর, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের কল্পনায়।
এই কারণেই প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার হালহকিকত নিয়ে আলোচনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার ফল, চাকরির প্রস্তুতি কিংবা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে তা মানুষ তৈরি করে না; তৈরি করে কেবল দক্ষ প্রতিযোগী। অথচ একটি সমাজের প্রয়োজন এমন মানুষ, যে প্রশ্ন করতে পারে, অন্যায়ের সঙ্গে অস্বস্তি অনুভব করতে পারে, সৌন্দর্য ও অসৌন্দর্যের পার্থক্য বুঝতে পারে এবং নিজের সময়কে সমালোচনামূলক চোখে দেখতে পারে। সাহিত্যচর্চার সংকট এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকট তাই বিচ্ছিন্ন কোনো দুটি বিষয় নয়। উভয়ের গভীরে রয়েছে চিন্তার স্বাধীনতা, কল্পনার পরিসর এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রশ্ন।
আড্ডায় জেন-জি প্রজন্মের সাহিত্যচর্চা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তরুণদের সাহিত্যবিমুখতা নিয়ে অভিযোগ করা সহজ; কিন্তু সমাজতাত্ত্বিকভাবে প্রশ্নটি আরও জটিল। যে প্রজন্ম এমন এক ডিজিটাল বাস্তবতায় বড় হচ্ছে, যেখানে তথ্যের প্রবাহ বিপুল অথচ মনোযোগের স্থায়িত্ব ক্রমশ সংকুচিত, সেখানে সাহিত্য পড়ার অভ্যাস বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। তাই নতুন প্রজন্মকে শুধু দোষারোপ না করে আমাদের ভাবতে হবে, সাহিত্যের সঙ্গে তাদের নতুন সম্পর্ক কীভাবে তৈরি করা যায়। তাদের ভাষা, প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও মানসিকতার ভেতরে প্রবেশ না করে তাদের কাছে পুরোনো পাঠাভ্যাসের নৈতিকতা দাবি করলে দূরত্বই বাড়বে। সাহিত্যকে আবার জীবনের প্রয়োজনীয় কথোপকথনে ফিরিয়ে আনতে হবে।
এই আড্ডার সৌন্দর্য এখানেই যে, কেউ কোনো চূড়ান্ত বিধান নিয়ে বসেননি। কথার পর কথা, স্মৃতির পর স্মৃতি, অভিজ্ঞতার সঙ্গে অভিজ্ঞতার সংঘর্ষ ও সমঝোতায় একটি সম্মিলিত চিন্তার আবহ তৈরি হচ্ছিল। মুহম্মদ নুরুল আবসার ভাইয়ের সঞ্চালনায় কবি ও প্রাবন্ধিক প্রফেসর মহীবুল আজিজ, প্রফেসর হোসাইন কবির, প্রফেসর মুজিব রাহমান, প্রাবন্ধিক তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী, চিন্তক প্রদীপ খাস্তগীর, কবি স্বপন মাহমুদ, কবি রিজোয়ান মাহমুদ, কবি ইউসুফ মুহম্মদ, কবি বেলাল উদ্দীন, কবি আ ন ম ইলিয়াছ, গবেষক জামশেদ উদ্দিন, কবি শবনম ফেরদৌসি, দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, সংগঠক চন্দন কুমারসহ উপস্থিত সবাই মিলে কথোপকথনটিকে এক বহুস্বরিক পরিসরে নিয়ে গেছেন। এখানে কারও কণ্ঠ একক সত্যের দাবিদার ছিল না; বরং নানা কণ্ঠের সহাবস্থানই সত্যকে আরও জটিল, আরও মানবিক করে তুলেছে।
শেষ পর্যায়ে যখন কবিরা স্বরচিত কবিতা পাঠ করলেন, তখন মনে হলো এতক্ষণ যে তর্ক, উদ্বেগ, বেদনা ও প্রত্যাশা গদ্যের ভেতর ঘুরছিল, তা এবার ছন্দ ও চিত্রকল্পের শরীর পেল। এটাই সম্ভবত সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা—যে অনুভূতিকে সমাজবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে, রাজনীতি যার কারণ অনুসন্ধান করতে পারে, ইতিহাস যার পটভূমি নির্মাণ করতে পারে, কবিতা কখনো কখনো তাকে এমন একটি দৃশ্যমান ও অনুভবযোগ্য রূপ দেয়, যা মানুষের অন্তরে দীর্ঘকাল থেকে যায়।
আমাদের কথায় যে ‘বিদ্যুৎ ফুলকি’র কথা এসেছে, সেটি তাই কেবল অন্ধকারে এক মুহূর্তের আলো নয়। বরং তা আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের এক প্রতীক। বর্তমান যতই তমসাচ্ছন্ন হোক, তার ভেতরে যদি আমরা আলোর ক্ষুদ্রতম উৎসটুকুও শনাক্ত করতে পারি, তাকে ধারণ করতে পারি, ভাষা দিতে পারি, তাহলেই ভবিষ্যতের পথরেখা আঁকার কাজ শুরু হয়। অন্ধকারকে অস্বীকার করে আলো পাওয়া যায় না; বরং অন্ধকারের প্রকৃতি বুঝেই আলোর সম্ভাবনা আবিষ্কার করতে হয়।
চেরাগি পাহাড়ের গত রাত তাই আমার কাছে নিছক একটি সাহিত্য আড্ডার স্মৃতি নয়; তা আমাদের সময়ের সঙ্গে কয়েকজন মানুষের এক অন্তরঙ্গ মুখোমুখি বসা। বাইরে তখন শহর তার নিজস্ব কোলাহলে ব্যস্ত, আর ভেতরে কয়েকজন মানুষ শব্দ দিয়ে নিজেদের সময়কে স্পর্শ করার চেষ্টা করছিলেন। সেই স্পর্শে ছিল ক্ষোভ, বিষণ্নতা, প্রশ্ন, স্মৃতি, দায় এবং আশার সূক্ষ্মতম রেখা।
হয়তো এভাবেই সাহিত্য তার সামাজিক ভূমিকা পুনরুদ্ধার করে—বড় কোনো ঘোষণার মধ্য দিয়ে নয়, বরং একটি ঘরে গোল হয়ে বসা কয়েকজন মানুষের কথোপকথনে। সময়ের পোড়া দাগকে কেবল ক্ষত হিসেবে না দেখে সেখানে নতুন জন্মের রেখা খুঁজে নেওয়ার মধ্য দিয়েই সাহিত্যের প্রয়োগমুখী সার্থকতা পাওয়া যায়। আর সেই খোঁজের মধ্যেই থাকে লেখকের দায়, পাঠকের সম্ভাবনা এবং একটি সমাজের পুনর্জাগরণের নন্দনতত্ত্ব।
ড. মাসুদুল হক : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, দিনাজপুর



