এখন সময়:রাত ২:৩৯- আজ: রবিবার-২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ২:৩৯- আজ: রবিবার
২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

কেন এই সঙ্গতা

রেজাউল করিম খোকন

 

বশিরুদ্দিন মাতবর কিছুক্ষণ আগে উপজেলা সদর হাসপাতালে মারা গেছেন।

৭৫ বছরের একজন বয়স্ক মানুষ মারা গেছেন। এই বয়সে একজন মানুষের মৃত্যু স্বাভাবিক হলেও চণ্ডিপুর গ্রামজুড়ে বশিরুদ্দির মৃত্যু নিয়ে নানা কানাঘুষা, ফিসফাস, গুঞ্জন চলছে। কারও মৃত্যু বেদনাদায়ক, দুঃখ-কষ্ট, বিষাদের ঘটনা হলেও তার মৃত্যু নিয়ে কেউ কেউ প্রকাশ্যে আবার কেউ আড়ালে হাসাহাসি, ঠাট্টা, রঙ্গরস, কৌতুকও করছে।

সকালের দিকে তার শরীরটা হঠাৎ ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। বাড়ির লোকজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই তার অবস্থা শোচনীয় হতে দেখে দ্রুত ভ্যান গাড়িতে করে উপজেলা সদরের হাসপাতালে নিয়ে আসে। ভাগ্যিস, সাতসকালে হাসপাতালের কয়েকজন ডাক্তার ছিলেন। সাধারণত দিনের বেলাতেই প্রায় সময় রোগীরা তাদের দেখা পায়না নিয়মিতভাবে। কিন্তু ঐ সময়টাতে আজ কিভাবে যেন কয়েকজন ডাক্তার ছিলেন। তারা থাকলেও কোনো লাভ হয়নি। হাসপাতালে আনার পর সবাই মিলে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বৃদ্ধ বশিরুদ্দিকে মৃত ঘোষণা করে। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে, বলে জানায় তারা।

তার মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে একধরনের আলাদা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

চারদিকে ফিসফাস, গুঞ্জন চলছে। বাজারে, চায়ের দোকানের আড্ডায় বশিরুদ্দির মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা, গবেষণা শুরু হয়েছে।

‘আহারে মানুষটা তো সুস্থই ছিল, ঠিকঠাক মতো চলাফেরা, কাজকর্ম করতো। তেমন অসুখ-বিসুখও তো ছিল না তার। এত বয়স হইলেও তারে কোনো সময় বড় ধরনের অসুখে পড়তে দেখি নাই। হঠাৎ কি জানি কি হইল—।’ আক্ষেপ করতে করতে একজন বলেন।

লোকটা বশিরুদ্দির সমবয়সীই হবে। এক সঙ্গে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়তেন তারা।

তার কথা শুনে চা খেতে খেতে পাশের একজন ফোঁড়ন কেটে বলে ওঠেন, এই বয়সে মানুষটা এত্ত বড় লোড লইতে পারে নাই! বেশি কারেন্টের শট খাইলে যেমন হয় আর কী, তারও তেমন হইছিল! সামলাইতে পারে নাই। বোঝো না, ফোর ফোরটি কারেন্টের শট!

এই লোকটারও বয়স হয়েছে। তবে বশিরুদ্দির সমবয়সী নয়। আরও কিছু কম হবে। তবে রসিক মানুষ হিসেবে তার বিশেষ পরিচিতি আছে গ্রামজুড়ে। তার রসিকতাপূর্ণ কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে সেখানে বসা লোকজন হো হো করে হেসে ওঠে।

ঠিকই কইছেন, ফোর ফোরটি কারেন্টের শট— আবারও হো হো করে হাসতে থাকে সবাই।

তখন একজন কিছুটা রেগে উঁচু গলায় ধমকের সুরে বলে ওঠেন, ‘এই মিয়ারা থামো! এইসব কী শুরু করছ তোমরা? একটা মানুষ মারা গেছেন। তিনি মুরব্বি গোছের একজন মানুষ ছিলেন। তার মৃত্যু নিয়ে হাসিঠাট্টা, তামাশা করতেছ। ছি ছি! তোমাগো দিলে কি সামান্য মায়া-দয়া নাই? তোমরা একদিন মরবা না!’

‘এত ছি ছি কইরেন না তাজুল কাকা! যিনি মারা গেছেন, তিনি কী করছিলেন? সেইডা কন না ক্যায়া। এমনে এমনে তো একটা সুস্থ মানুষ এক রাতের মধ্যেই অসুস্থ হইয়া পটল তোলে নাই।’ যুবক বয়সী রমজান তির্যক সুরে জবাব দেয়। ‘তার মরার কারণ তো সবাই জানে, তিনি এই বয়সে আইয়া কি কামডা করছিলেন?’

চণ্ডিপুর গ্রামজুড়ে বিভিন্ন আড্ডায় এমন মন্তব্য, তর্ক, বিতর্ক চলতে থাকে।

সকাল গড়িয়ে বেলা বাড়তে থাকে। দুপুর হয়ে গেলেও উপজেলা হাসপাতাল থেকে সকালে মারা যাওয়া বশিরুদ্দি মাতবরের মৃতদেহটা বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি। তার মৃত্যু নিয়ে গ্রামজুড়ে নানা বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, তার মৃত্যুটা স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে কোনো অসুখ না থাকলেও তো বয়স্ক একজন মানুষ হঠাৎ করে মারা যেতে পারে। আবার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে আরেক দল মানুষ। তাদের চোখে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ বশিরুদ্দির মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়, সন্দেহজনক ব্যাপার রয়েছে এর মধ্যে।

মাতবর বাড়ির লোকজন তাদের পরিবারের একজন বয়োবৃদ্ধ সদস্যের মৃত্যুটাকে রহস্যজনক দাবি করে বশিরুদ্দির মৃত দেহের ময়নাতদন্ত এবং পুলিশি তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একসময় এ বাড়ির বেশ দাপট ছিল গ্রামজুড়ে। এখানকার বিচার-সালিশ, মেল-দরবার এ বাড়ির লোকজন ছাড়া করার কথা ভাবা যেত না। দিনে দিনে আগের সেই কৌলিন্য হারালেও এলাকার রাজনীতিতে এখনও মাতবর বাড়ির কিছুটা হলেও দাপট, প্রভাব অবশিষ্ট রয়েছে। সেই সুবাদে এলাকার প্রশাসনও বশিরুদ্দির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে। নানা তৎপরতা শুরু হয়েছে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

বশিরুদ্দি গতকাল বিয়ে করেছিলেন।

স্ত্রী মেহেরুন্নেসার মৃত্যুর পর গত কয়েকটি বছর দারুণ নিঃসঙ্গতায় কাটছিল তার জীবন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন সেই কবে। তারাই এখন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই নারী। একজনের স্বামী মারা গেছে হার্ট অ্যাটাক করে। দুই মেয়েই শ্বশুরবাড়িতে ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তারা মাঝে মধ্যে এসে বাবাকে দেখে যেত। বুড়ো মানুষটিকে দেখাশোনার জন্য রুশনি ও তার স্বামী হাতেম ছিল। তারা অনেক দিন ধরে মাতবর বাড়িতে আছে। বলা যায়, ছোটবেলা থেকেই এ বাড়ির ফাই-ফরমাশ খেটে বড় হয়েছে। বিয়ের বয়স হলে বাড়ির মুরব্বিরা সবাই মিলে রুশনি আর হাতেমের বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। তারা এ বাড়ি ছেড়ে আর কোথাও যায়নি। নিজের বাড়িঘর মনে করে থেকে গেছে।

বশিরুদ্দিকে রান্নাবান্না করে খাওয়ানো, তার ঘরদোর গুছিয়ে রাখা, কাপড়চোপড় ধোয়া থেকে শুরু করে বাজার-ঘাট সব কাজই রুশনি আর হাতেম মিলে করে আসছে। একজন বয়স্ক মানুষ হিসেবে বশিরুদ্দির এসব ব্যাপারে কোনো সমস্যা কিংবা অভাব অভিযোগ ছিল না। তবে এই বৃদ্ধ বয়সে একজন সঙ্গীর অভাব তাকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছিল। সাধারণত যুবক বয়সে মানুষের সঙ্গীর কোনো অভাব থাকে না। সময় কাটানোর জন্য কথা বলার জন্য চারপাশে কতজনকেই তো পাওয়া যায়। তখন নিঃসঙ্গতা তেমনভাবে গ্রাস করে না একজন মানুষকে। কিন্তু বয়স্ক একজন মানুষের জন্য স্ত্রীর সঙ্গ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। জীবনের সুখ-দুঃখ, ভালোলাগা, খারাপলাগার অনুভূতিগুলো মন খুলে বলার জন্য স্ত্রীর চেয়ে ভালো নির্ভরযোগ্য আর কেউ হতে পারে না। বাড়িতে ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনিরা থাকলে হয়তো স্ত্রী হারানোর অভাবটা এত তীব্র হয়ে উঠত না তার জন্য। বশিরুদ্দির কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় এই ৭৫ বছর বয়সে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ হিসেবে তাকে একাকী জীবনযাপন করতে হচ্ছিল।

কয়েক বছর আগে স্ত্রী বিয়োগের পর গ্রামের কয়েকজন তাকে বিয়ের পরামর্শ দিয়েছিল। বিধবা গরিব পরিবারের মাঝবয়সী কোনো নারীকে বিয়ে করে ঘরে তোলার পরামর্শ তখন পাত্তা দেননি বশিরুদ্দি।

‘আরে ধুর, এই বুড়া বয়সে আরেকটা বিয়া করলে লোকজন কী কইব? আমার তো দিন শেষ। আর কয়দিন বাঁচমু? বাকি জীবনডা এইভাবে একলা একলা কাটাইয়া দিমু আর কী! আমার এই বয়সে আরেকটা বেডি মানুষরে জীবনে জড়াইয়া ঝামেলা করতে মন চায় না।’ বশিরুদ্দি সবাইকে একই কথা বলে ফেরত দিয়েছেন অনেকবার।

কিন্তু ইদানীং হঠাৎ করে একাকী জীবনের নিঃসঙ্গতা তাকে পেয়ে বসেছিল গভীরভাবে। রাতে ঘুম আসতে চাইত না। এক ধরনের অস্থিরতা, অস্বস্তিতে দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইত তার। সারা রাত ছটফট করে কাটত তার। একজন সঙ্গী পাশে থাকলে এই বয়সের মনের অনেক কথা অকপটে খুলে বলে হালকা হওয়া যেত। শরীরটা খারাপ লাগলে তার আন্তরিক সান্নিধ্য ও সেবা পেলে মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। অসুস্থ ভাবটা কেটে যায় অদ্ভুত যাদুবলে।

মনের সাথে অনেক যুদ্ধ করে বশিরুদ্দি শেষ পর্যন্ত এই বয়সে আবার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পাত্রীও পেয়ে গিয়েছিলেন। এই গ্রামেরই মেয়ে বকুল আক্তার। বয়স বত্রিশ-তেত্রিশ হবে। আগে দু’বার বিয়ে হয়েছিল। প্রথম স্বামী দুবাই ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করতো। দেখতে সুন্দরী বলে দুবাইওয়ালা স্বামী পেতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। যৌতুক দেওয়া লাগেনি অপেক্ষাকৃত গরিব ঘরের মেয়েটির বাবা-মাকে। বিয়ের পর পরই বকুলের স্বামী দুবাই ফিরে যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। ক্ষতিপূরণ হিসেবে দুবাইয়ের কোম্পানি থেকে ম্যালা টাকা পেয়েছিল বকুলের মৃত স্বামীর পরিবার।

বিয়ের অল্পদিনের মাথায় স্বামীর মৃত্যু বকুলকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। দুঃখশোকে সে পাথর হয়ে গিয়েছিল। তার কত স্বপ্ন ছিল। সুখের সংসার হবে। কয়েকটি বাচ্চা-কাচ্চার মা হবে। তাদের লালনপালন করতে করতে কেটে যাবে জীবনটা। কিন্তু অকালে, অসময়ে বিধবা হয়ে বকুলকে বাপের বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছিল।

দেখতে সুন্দরী বলে আবার তার জন্য সম্বন্ধ আসতে শুরু করেছিল। বিধবা হলেও বাচ্চাকাচ্চা না হওয়ায় ছয় মাসের মধ্যেই তার আবার বিয়ে হয়ে যায়। বকুলের দ্বিতীয় সংসারেও বেশ সচ্ছলতা ছিল। স্বামীর মুদির দোকানের ব্যবসা। বাজারে দোকান হওয়ায় বিক্রি-বাট্টা ছিল ভালো। বিয়ের পর সংসার জীবন ভালোভাবে কাটলেও দু’বছরেও সন্তানের মা হতে পারেনি বকুল। এ নিয়ে তার স্বামীর মনেও দুঃখবোধ, হতাশা ছিল। কারণ, মানুষটা এর আগেও একটা বিয়ে করেছিল। তিন বছর ঘরসংসার করলেও বাচ্চাকাচ্চা না হওয়ায় প্রথম স্ত্রীর গালিগালাজ অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করতে হচ্ছিল। একসময় রাগ করে সেই বউকে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল সে।

বকুলও বুঝতে পেরেছিল বিয়ের পর দু’বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তার গর্ভে সন্তান না আসার কারণ। সমস্যা ছিল তার স্বামীর। ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ব্যাপারটি জানলেও সেটা বাড়ির কাউকে না বলে নিজের মধ্যে চেপে রেখেছিল মানুষটা। এক রাতে সন্তানের বাবা না হতে পারার নিজের অক্ষমতার কথা বকুলকে জানিয়েছিল।

জীবনে সে আর সন্তানের মা হতে পারবে না— এই দুঃখবোধ মনের মধ্যে চেপে মাটি কামড়ে পড়েছিল বকুল। এভাবে বাকি জীবনটা কীভাবে কাটবে, ভেবে কেবলই বুক চিরে গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসত তার। এক্ষেত্রে তার তো কিছু করার নেই। স্বামীর বন্ধ্যত্বের কারণেই সে সন্তানের মা হতে না পারলেও আশপাশের পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়স্বজনদের নানা খোঁটা শুনতে হতো তাকে। ‘বানজা বেডি’র বদনাম তার ওপর পড়েছিল। এটা যে তার স্বামীর অক্ষমতার কারণে ঘটছে তা কোনোদিন কাউকে বলতে পারেনি বকুল। সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়েছিল স্বামীর সম্মান রক্ষার জন্য।

মানসিক যন্ত্রণার আগুনে পুড়ে মরছিল বকুলের দ্বিতীয় স্বামী। এভাবেই শরীরে বাসা বেঁধেছিল মারণব্যাধি ক্যান্সার। মাত্র কয়েক মাস রোগে ভোগার পর তাকে পরপারে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। এবারও স্বামীর মৃত্যু বকুলকে দিশেহারা করে। কারণ, প্রথম স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার সংসার শুরুর সময় তার মনে যে স্বপ্নগুলো ছিল তার কিছুই পূরণ হয়নি। সন্তানের মা হতে পারেনি স্বামীর শারীরিক কিছু ত্রুটির কারণে। তারপরও কোনোভাবে স্বামীকে নিয়ে বাকি জীবনটা কাটানোর আশা-স্বপ্ন ছিল মনে। ক্যান্সারে স্বামীর মৃত্যু তার সব কিছু ধূলিসাৎ করে দেয়।

পরপর দুই বার স্বামী হারিয়ে বিধবা হয়ে বাড়ি ফিরে আসার পর বকুলের ওপর তার পরিবারই বিরক্ত হয়ে ওঠে। সোয়ামি খাওয়া ‘ডাইনি’, ‘রাক্ষসী’, ‘অপয়া’, ‘সর্বনাশী’ ইত্যাদি গালিগালাজ শুনতে হয়েছে বেশ অনেকদিন। সেই থেকে বকুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বাপের বাড়িতে না খেয়ে থাকলেও আর কোনোদিন কোনো পুরুষ মানুষের সাথে বিয়েশাদির বন্ধনে জড়াবে না। দরকার হলে কাজকর্ম করে, গতর খাটিয়ে নিজে উপার্জন করে অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করবে। এভাবেই দিন কাটছিল তার।

দেখতে সুন্দরী ও ভরা যৌবনের কারণে বিয়েতে আগ্রহী না হলেও বকুলকে বিভিন্ন বয়সী পুরুষের অশালীন প্রস্তাব দেওয়া বন্ধ ছিল না। তাকে বিয়ে করতে মন চাইলেও ‘স্বামীখেকো নারী’ হিসেবে পরিচিত বকুলকে জীবনসঙ্গী করার ব্যাপারে একধরনের অনীহা ও ভয় ছিল সবার মধ্যে। গোপনে তার সঙ্গে অবৈধ প্রণয়ের খায়েশ ছিল বহু পুরুষের। তবে বকুল কাউকে প্রশ্রয় দেয়নি। এরকম কোনো ইচ্ছে তার মনে ছিল না কখনো।

 

গ্রামের খানদানি মাতবর বাড়ির বিপত্মীক বশিরুদ্দি ৭৫ বছর বয়সে আবার বিয়ে করতে ইচ্ছুক হয়েছেন। একাকী জীবনের নিঃসঙ্গতা কাটাতে তার একজন সঙ্গী প্রয়োজন। স্ত্রী বিয়োগের পর গত কয়েক বছর কাটলেও ইদানীং তাকে নিঃসঙ্গতা কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে। গ্রামের মজনু ঘটককে ডেকে বশিরুদ্দি তার আবার বিয়ের ইচ্ছের কথা খুলে বলেছেন। এই বয়সে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে তেমন কোনো পাত্রী যদি পাওয়া যায় তাহলে খুব ভালো হতো।

মজনু ঘটক গ্রামের বিবাহযোগ্য সব মেয়ের খবরাখবর রাখে। কোন পাত্রের চাহিদা পছন্দ কেমন আবার পাত্রীপক্ষের বর হিসেবে কেমন ছেলে পছন্দ—সব তথ্য মাথায় নিয়ে চষে বেড়ায় আশপাশের কয়েক গ্রাম। যার সঙ্গে যাকে মানায় তাকে সেখানে বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মজনু ঘটকের বিশেষ সুনাম রয়েছে।

বকুলের মতো সদ্য বত্রিশ অতিক্রম করা একজন বিধবা যুবতীর সঙ্গে ৭৫ বছর বয়সী বশিরুদ্দি মাতবরের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসার সময় মজনু নিজেও সংশয়ে ছিল বকুল কিংবা তার পরিবারের মানুষজন অপমান, লাঞ্ছিত করে বাড়ি থেকে বিদায় করে দেয় কিনা ভেবে। কিন্তু অবাক ব্যাপার, এত বেশি বয়স্ক একজন মানুষের সঙ্গে বত্রিশ-তেত্রিশ বছর বয়সী বকুলের বিয়ের প্রস্তাব খোদ পাত্রীসহ সবাই সাদরে গ্রহণ করে রাজি হয়ে যায়। বকুল তার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বয়স্ক বৃদ্ধ মানুষটির জীবনসঙ্গী হতে রাজি হয়। কোনো আপত্তি করে না।

এরকম একটি অসম বয়সী জুটির বিয়ের ঘটনাটা গ্রামে খুব বেশি জানাজানি না হলেও যারাই শুনেছে তাদের ভ্রু কুঁচকে উঠেছে। এই বুড়ো বয়সে আবার বিয়ের খায়েশ জাগল কেন বশিরুদ্দির? এই বয়সে এটা তার ভীমরতি ছাড়া আর কিছুই না, কেউ কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতেও ছাড়েনি।

সাদামাটা আয়োজনে কাজী ডেকে বিয়েটা পড়ানো হয়েছিল। বশিরুদ্দির বাড়িতেই পোলাও-কোরমা, খাসির রেজালা আর ফিরনি রান্নার আয়োজন সামলেছিল রুশনি ও তার স্বামী হাতেম। পনেরো-বিশজন মানুষের জন্য রান্নাবান্নার আয়োজন এমন কোনো ব্যাপার নয় তাদের জন্য। সবাই মিলে পেটপুরে খেয়ে নতুন দম্পতির সুখ সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া করেছিল।

সন্ধ্যের পর বিয়ে পড়ানো শেষ হলে বকুল আর বশিরুদ্দি একটা ব্যাটারিচালিত রিকশা করে চলে এসেছিল মাতবর বাড়ি। নববধূর সাজে লাল শাড়িতে বকুলকে দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল। আগে দু’বার এভাবে নতুন বউ সেজে লাল শাড়ি পরে শ্বশুরবাড়িতে গেছে সে। তৃতীয়বার আবার নতুন করে লাল শাড়ি পরে মাতবর বাড়ির নতুন বউ হয়ে পা রাখার সময় অজানা আশঙ্কায় তার বুকটা কেঁপে উঠেছিল। এবার তার কপালে কী আছে কে জানে!

দ্বিগুণেরও বেশি বয়সী স্বামীকে নিয়ে তার মনে কোনো অস্বস্তি, দ্বিধা, ভয়, সংকোচ ছিল না। এখন পুরুষ মানুষ নিয়ে তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। তার বয়স ৩৫ হোক আর ৭৫ হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। এর আগে দু’জন পুরুষের সঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা তার মনোজগতে এক ধরনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

 

দুপুর নাগাদ স্থানীয় থানার তদন্তকারী কর্মকর্তার নির্দেশে বশিরুদ্দির মৃতদেহটা ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। বিয়ের দিন রাতে বৃদ্ধ মানুষটির আকস্মিক মৃত্যু রহস্যজনক। তার তেমন অসুখ বিসুখ ছিল না, আত্মীয়-স্বজন সবাই পুলিশকে জানিয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের সময়। একজন সুস্থ সক্ষম মানুষ হঠাৎ এক রাতের অসুস্থতায় মারা যেতে পারে না, পুলিশও ধারণা করছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে বশিরুদ্দির নবপরিণীতা স্ত্রী বকুল আক্তারের নামটি খুব সহজেই চলে আসে। কারণ, গতরাতটি ছিল তাদের বাসর রাত। একসঙ্গে তারা দুজন শুয়েছিল একই বিছানায়। বকুল সারাটি রাত তার নতুন স্বামী বশিরুদ্দির সঙ্গেই ছিল একই ঘরে। সেখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি ছিল না। তেমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে মানুষটির অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর জন্য কেউ কেউ আকার ইঙ্গিতে, কথাবাতায় বুড়ো মানুষটির যুবতী স্ত্রী বকুলকে দায়ী করছিল। সবকিছুর ভিত্তিতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এ ছাড়া তাদের হাতে বিকল্প কোনো কিছু ছিল না।

পুলিশ আসার আগে বশিরুদ্দির ঘরে ঝিম মেরে বসেছিল বকুল। কেমন বিমূঢ়, নির্বাক পাথর হয়ে গেছে সে। গতকাল থেকে তার মনে এক ধরনের অজানা আশঙ্কা কেবলই দোলা দিচ্ছিল। দোয়া দরুদ পড়ে নিজের বুকে বারবার ফুঁ দিয়ে সেই আশঙ্কা দূর করার চেষ্টা করছিল সে।

 

তৃতীয় স্বামী হিসেবে ৭৫ বছর বয়সী বশিরুদ্দিকে পেয়েছিল বকুল। এ নিয়ে তার বাড়ির লোকজনদের নানা কথাবার্তা শুনতে হয়েছিল। সমবয়সী ভাবি এবং পাড়া প্রতিবেশী অন্য নারীরাও টিপ্পনি কাটছিল। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলছিল, ‘দেহিস, বুড়া হইলেও অনেক পুরুষ মানুষের ঐ কামে বেশ ভালা ক্ষেমতা থাহে কিন্তু! বকুল, এইবার তোর পেডে বাচ্চা না আইয়া পড়ে, তোর মা হওনের খায়েশ এই বুড়া মিডাইতে পারে। এইডা অসম্ভব কিছু না। তুই কিন্তু তারে ঐ কামে বাধা দিবি না। যা করতে চায় করতে দিবি। তোর পেডে ঐ বুড়ার বাচ্চা আইলে তোরই তো লাভ হইব। তার সহায় সম্পত্তির ওয়ারিশ হইবো সেই বাচ্চা। সাথে সাথে বউ হিসাবে তুইও হইবি সম্পত্তির বড় একটা অংশের মালিক।’

থানা থেকে আসা পুলিশ বকুলের হাতে হাতকড়া পরায়। বিয়ের অলঙ্কারগুলো খোলা হয়নি এখনো। হাতভর্তি কাচের এবং ইমিটেশন গোল্ডের গোল্ডের চুড়ির সাথে হাতকড়া লাগানো হয়। বিয়ের লাল শাড়িটা এখনও তার গায়ে জড়ানো। মাথায় ঘোমটা টেনে মুখটা আড়াল করতে চেষ্টা করে বকুল।

থানা থেকে আসা একজন নারী পুলিশ কনস্টেবল তাকে এক হাতে ধরে টেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরোয়। বকুলের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই এই মুহূর্তে। সে শুধু ভাবছে, একজন মেয়ে মানুষের জীবনে কতটা দুর্ভোগ, অপমান, লাঞ্ছনা, দুর্ভাগ্য থাকতে পারে।

চারদিকে উৎসুক নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতীর ভিড় জমেছে। সবাই কৌতূহলী হয়ে তৃতীয়বারের মতো বিধবা হওয়া স্বামী হত্যার সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার হওয়া বকুলকে অবাক চোখে দেখছে। কেউ কিছু বলছে না উপস্থিত পুলিশের ভয়ে। কেউ কিছু বললে যদি পুলিশ তাকে হাতকড়া পরায়, তেমন আশঙ্কা তাদের মনে।

 

রেজাউল করিম খোকন : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার, ঢাকা

বাংলাদেশের জন্ম ও বঙ্গবন্ধু: কিছু অনুমান, কিছু প্রশ্ন কিছু অনস্বীকার্য সত্য

আবু মকসুদ   বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশ চাওয়া’ বা ‘স্বাধীনতা চাওয়া’ নিয়ে কখনোই কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। কিন্তু ইতিহাসকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টার

মাহরাং বালুচ বেলুচিস্থানের শেখ মুজিব!

ফজলুল বারী   বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেত্রী ডা: মাহরাং বালুচ আজ বঙ্গবন্ধুর মতোই পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিনী। মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন

গল্পটি রুনা আখতারকে নিয়ে

রুনা আখতার আমাদের কারখানায় অপারেটর থেকে সুপারভাইজার পদে পদোন্নতি পেয়েছে। পদোন্নতি একটি নিয়মিত বিষয়— অনেকেরই হয়। কিন্তু রুনার গল্পটি আলাদা।   এই পদোন্নতি তাকে এতটাই

আন্দরকিল্লা : আলোকিত জীবনের রূপরেখা

ধীমান বড়ুয়া কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীদের আন্তরিকতায় আপনার নিয়মিত প্রকাশনাগুলো আমার হাতে পৌঁছে যায়, আর আমি প্রতিবারই নিজেকে একজন কৃতজ্ঞ ও মুগ্ধ পাঠক হিসেবে আবিষ্কার করি।

বিশ বছর পর বাংলায় ফিরছেন তসলিমা

রোখসানা ইয়াসমিন মণি সাহিত্যের ইতিহাসে বহু লেখকই সময়ের স্রোতে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু কিছু মানুষ জন্মান কেবল লেখার জন্য। তসলিমা নাসরিন সেই ধারারই এক সাহসী