সৈয়দ মনজুর কবির
ওপাশ থেকে লাইন কেটে যায়। সাদি আরো লজ্জা পেয়ে লজ্জিত চোখে মিশুর দিকে তাকায়।
মিশুর মনে কিছু একটা জোট পাকাচ্ছে ওপাশের মেয়েটির বলা কথায়। মেয়েটি কি তাকে চেনে? ও সাদিকে বললো, কি ব্যাপার! তোমাদের গ্যারেজটি দেখি আধুনিকতায় ঘেরা। তো ইন্টারকমে তোমার আপু কি যেনো বললো?
আহা, মিশু ভাই, আমার আপুর কথা আর বলবেন না। একটা পাগল কিসিমের মানুষ। আমি ছোটবেলা থেকেই দেখছি কেমন একা একাই থাকে। আবার নিজেকে ভাবে একজন ডিটেকটিভ। মাঝে মধ্যে বলে ফেলে কাকে যেনো সে ফলো করে আসছে। ডিটেকটিভ না ছাই। আট বছর ধরে একজনের পিছনে লেগে আছে। সে কি করে, কোথায় যায়, কি খায় না খায়। মা তো সারাক্ষণ বলেই চলছেন, কি রে মা, কি কাজে এতো মনোনিবেশ? আপু কিছুই বলে না। বরং যেদিন মা ওগুলো বলে সেদিন খাওয়া দাওয়াই বন্ধ করে দেয়। বাবা বেঁচে থাকতেও জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুই কি কাউকে খুঁজছিস? কিছু বলতো তো নাই-ই, আরো চুপচাপ হয়ে যেতো। আমার আবার ওর ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই।দেখেন না বুয়েটেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে বলে জিদ ধরে নিজেকে প্রিপেয়ার্ড করলো। কিন্তু প্রথমবার চান্সই পেলো না। পরের বার চান্স পেলো প্রথম সারির চয়েজ- কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ। কিন্তু পড়বে ঠিক করলো পেছনের সারির ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংএ। একদম পাগল! ও নাকি সারা জীবন এই গ্যারেজ নিয়েই থাকবে। বিয়ে টিয়ের কথা বললে আরো রেগে যায়। বলে, জীবনেও বিয়ে করবে না। বাদ দেন তো ওর কথা। আচ্ছা, মিশু ভাই, হাকিম চাচাকে খবর দিই, গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে। উনি তো মহা খুশি হয়ে যাবেন। তো ওনাকে কতো টাকার বিল করবো?
মিশু নিবিষ্ট ভাবে কি যেনো ভাবছিলো। ও তো এই পার্ক নির্ধারণ করেছে ওর মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক গোপন বিষয়ের জন্য। নিজে নিজেই প্রতিজ্ঞা করেছিলো, পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে একজনের খোঁজ নিবে। কি লাভ হবে সে নিজেও জানে না। তবুও মনের ইচ্ছা। মিশুর মন উত্তাল হয়ে উঠে। মনে পড়ে যায় পুরো সিনেমায় চলমান দৃশ্যের মতো, তখন সে ক্লাস সিক্স এ পড়ে। মিশনারি স্কুল। কো-এডুকেশন – ছেলে মেয়ে এক সাথে। সেই ক্লাস ওয়ান থেকে স্কুলে অন্যান্য ছাত্র- ছাত্রীদের মাঝে ও বেশ জনপ্রিয় আর সেও তো সবার সাথে ভীষণ মিশুক। একদিন হঠাৎ স্কুলের গেটে মিশুর কাছে মনে হলো সে এক অন্যরকম সুন্দর মেয়েকে দেখলো। ওর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। খোঁজ খবর নিয়ে জানে নতুন ভর্তি হয়েছে ক্লাস ফোরে। ভালো মিশতে পারার গুণের জন্য মেয়েটির সাথে পরিচিত হতে বেশি সময় লাগলো না মিশুর। ছোট খাটো বিভিন্ন উপহারও দেয়া শুরু হলো। মেয়েটিও টিফিন আওয়ারে ওর মায়ের হাতে বানানো কেক আর বিভিন্ন স্ন্যাকস্ ওর সাথে শেয়ার করতো। এভাবে রোজার ছুটির আগের দিন মেয়েটিকে দিলো আর্চির সবচেয়ে দামি গ্রিটিংস কার্ডটি। কয়েকটি সবুজ পাতাসহ পাঁচটি রক্ত লাল গোলাপের একটা ছবি। মনে হয় জীবন্ত ফুল সাদা কার্ডটার ওপর রেখে দিয়েছে কেউ। কার্ডটার পিছনে সবার নীচে খুবই ছোট্ট করে লেখা – প্রিন্টেড ইন জার্মানি। এছাড়া ওটাতে আর একটি অক্ষরও লেখা ছিল না। মিশু ওই কার্ডটার ওপরে আর্টিস্টিক করে লিখলো নিলু – মেয়েটির নাম। আর এটাই হোলো কাল। ঈদের ছুটির শেষে প্রথম দিনটিতেই মেয়েটির বাবা এসে শুধু অভিযোগ করেই গেলেন না, সাথে সাথে মেয়ের টিসিটাও নিয়ে গেলেন। হেডস্যার মিশুর বাবাকে ডেকে পাঠালেন। তারপর বললেন, আপনার ছেলেকে কন্ট্রোল করতে হবে। ওর অপরাধ ও একটা মেয়েকে লাভ কার্ড পাঠিয়েছে। এটা শুনে মিশু নিজেও ভীষণ অবাক হয়েছিল। কারণ ওয়ো জানতো না আসলে ওটা ছিল একটা লাভ কার্ড। যদিও মেয়েটার প্রতি তার ভালো লাগাটাই ভালোবাসা কিনা ও তখনও বুঝতোই না। একটা কার্ড ক্যাপশনবিহীন হলেও শুধু প্রচলিত সংস্কৃতির রেয়াজ অনুযায়ীও যে বিভিন্ন ভাষা কিংবা মনের ইচ্ছা করতে পারে সেটা মিশু জেনেছিলো পরে। আসলে জার্মানিতে লাল পাঁচ গোলাপ মানে হলো গভীর ভালোবাসার প্রতীক। আর মেয়েটির বাবা বহুদিন ছিলেন ওই জার্মানিতেই। উনিই যে ওর কার্ডের শানে-নজুল বের করেছেন তাতে সন্দেহ নেই। যা ই হোক, সেদিনের চরম লজ্জা আর অপমানিত মিশু আর কোনো দিন ওই স্কুলে ফিরে যায় নি। ভর্তি হয় বাংলা মিডিয়ামের এক বালক বিদ্যালয়ে। নিজেকে গুটিয়ে ফেলে একদম একাকিত্বে। পরে কোনো দিন ওই মেয়েটির আর কোনো খোঁজই নেয় নি। যদিও শুনে ছিলো আজকের আসা এই পার্কটির আশে পাশেই ওদের পৈত্রিক বাসা। মনে ছিলো সংশয়, ওর কারণে মেয়েটা না জানি কত অপমানিত হয়েছে। তবে এই ঘটনা মিশুর জীবনে অনেক গভীরে চলে গেছে। ও কখনই ভুলতে পারে নাই আর পারবেও না। ওর ইচ্ছা ছিল পড়ালেখার গণ্ডি পেড়িয়ে মেয়েটির সামনে একবার আসবে। ক্ষমা চেয়ে নিবে। তবে এও বলবে, সেদিনের না জেনে দেয়া কার্ডটা বড় হয়ে বুঝতে পারে ওটা ওর প্রকৃত ভালোবাসার প্রতিরূপই ছিলো। যে ভালোবাসা ও কারো সাথে শেয়ারও করতে পারবে না। মিশুর বুকের ভেতর ভীষণ তোলপাড় হয়ে যায়। আচ্ছা, এই ইন্টারকমের ওপারের মেয়েটা কে? কত মানুষের কত কত কাকতালীয় ব্যাপার ঘটে। ওর জীবনে কি এমন কিছু ঘটতে পারে না। ওর হৃদপিণ্ডের হার্টবিট মনে হচ্ছে গ্যারেজের সবাই শুনতে পারছে। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা শুরু হয়েছে। এমন অবস্থায় ওর ভাবনায় ছেদ পড়ে সাদির হাতের ঝাঁকুনিতে।
কি ব্যাপার মিশু ভাই? আপনি কোথায় ডুব দিলেন? একি আপনি ঘামছেন কেনো?
সাদির ঝাঁকুনি খেয়ে মিশু বাস্তবে ফিরে আসে। বলে, ও, ও কিছু না। এমনিতেই, এখনি ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা, তুমি কি যেনো বলছিলে?
ওই যে, ওই গাড়ির বিলটা কত ধরবো?
তোমাদের গাড়ির পার্টস টার্স খুলে সার্ভিসিং করে আবার লাগাতে যা নেও তাই নিবা।
কি বলেন? আপনি যে পার্টসটা ঠিক করে দিলেন, তার সম্মানী দিতে হবে না?
না, দিতে হবে না। আমি এটা করে যে আনন্দ পেয়েছি, তার দাম অনেক অনেক বেশি। আচ্ছা, একটা কাজ করোতো, গাড়ির মালিকে এখন আসতে বলতে পারো? আমার ওনাকে একটা কথা বলার ছিলো।
আপনাকে চুপচাপ ভাবতে দেখে আমি তখনই তো হাকিম চাচাকে ফোন করেছিলাম। উনি আমার আপন চাচা। উনি আর চাচি রিকশা করে কোথায় যেনো যাচ্ছিলেন, এই কাছাকাছিই আছেন। আমার কথা শুনে তিনি তো মহা খুশি। এক্ষুনি চলে আসবেন। ওই যে বলতে না বলতেই উনি এসে গেছেন। হাত তুলে দেখালো সাদি।
দুজন মধ্যবয়সী পুরুষ আর মহিলা ওদের কাছে চলে আসে। প্রথমে পুরুষ লোকটাই কথা বলে, কি হলো বলোতো, গতকালই আমাদের ড্রাইভার বললো যে গাড়ির ইঞ্জিনের বড় রকমের প্রবলেম হয়েছে। কমছে কম বিশ হাজার টাকার ধাক্কা। আর সময় লাগবে দুই দিন। তোমরা কি এমন করলে যে একদিনও লাগলো না।
প্রথমেই বিনয়ের সাথে সালাম দিয়ে সাদি হাসি হাসি মুখে বললো, চাচা, কাল রাত দশটা অবধি সময় গেছে প্রবলেম ধরতেই। পরে ধরা পরে যে পার্টসটায় সমস্যা, সেটাতো ঠিক করার অযোগ্য। সকালে পার্কের ওপাশের পার্টসের দোকানে ফোন করে জেনেছি ওটা ওখানে আছে, আর দাম সতেরো হাজার টাকা। আমি পার্কের ভিতর দিয়ে যেতেই এই যাদুকর মিশু ভাইকে দেখতে পাই। উনি তো ওনার জাদুর ছোঁয়ায় ঠিক করার অযোগ্য জিনিসটাও ঠিক করে দিলো। বলে গর্বের সাথে হাত দিয়ে মিশুর হাতের বাহুতে স্পর্শ করে দেখিয়ে দেয়।
হাকিম চাচা মিশুর দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়, ধন্যবাদ, ইয়োং ম্যান। শুনেতো ভীষণ ভালো লাগছে, যে বর্তমানে ভালো এবং দক্ষ মানুষ তাহলে আছে।
মিশু হাকিম সাহেবের বাড়িয়ে দেয়া হাত মেলালো, আমি কাজটা করে খুব আনন্দ পেয়েছি। তবে আপনার সাথেও দেখা করতে চেয়েছি। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার ছিল।
কি কথা ইয়োং ম্যান?
আপনার ড্রাইভার সাহেবকে বদলিয়ে ফেলুন। পার্টসটায় ইন্টেনশনাল মেনিপুলেশনের সাইন দেখেছি। আই অ্যাম শিওর, এটা ড্রাইভার সাহেবেরই কাজ।
শুধু হাকিম সাহেবই নয় সাদিও মিশুর এমন ভাষার ব্যবহারে অবাক হয়ে শুনছিলো। এদিকে হাকিম চাচার স্ত্রী উনি একটু উস্ খুস্ করছিল মিশুকে দেখে। পরে ওর কথাবার্তা শুনে চেঁচিয়ে ওঠে, এই তুমি মিশু না? মিশুই তো! নাসরীনের ছেলে। মিশুই তো!
মিশু ওনার কথায় বিশাল ধাক্কা খায়। মুখ দিয়ে কথাই বের হচ্ছে না। কেবল অবাক চোখে মহিলাটার দিকে চেয়ে থাকে। দশ সেকেন্ডের নীরবতা। সবাই চুপচাপ। হাকিম সাহেব চোখ কচলিয়ে আছেন আর সাদির চোখ বিস্ফোরিত হবার জোগাড়।
নীরবতা ভাঙেন হাকিম সাহেব নিজেই, কি বলছো? ও কি আমাদের বিশাল শিল্পপতি আসাদ আর নাসরীন ভাবির ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটা, যে শুনেছি মাস্টার্সও শেষ করে ফেলেছে। অবাক কাণ্ড! কয়েক বছর আগে ওদের বাসাতেই তো দেখেছি। দু’দিন আগেও কি নিয়ে যেনো ওর কথা উঠলো আমি তো ওকে চিনতেই পারলাম না।
হাকিম চাচার কথা টেনে নিয়ে চাচি বললেন, কতবার ওদের বাসায় গেলাম। ওকে দেখার ভাগ্য হয়েছে মাত্র তিন-চার বার। ও তো কারও সামনেও তেমন আসে না। মিশুর দিকে তাকিয়ে বললেন, তা তুমি এখানে? কি হয়েছে? কি, ব্যাপারটা কি?
ওনার কথায় মিশু পড়লো আরো বিপদে। ওর মনে হচ্ছে মুখ দিয়ে শব্দ আর বের হবে না। ঠিক এই সময় গ্যারেজের ইন্টারকমটা আবার বেজে ওঠে। মিশুর মনে হলো কেও অদৃশ্য থেকে ওকে এই বেহাল অবস্থা থেকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে। সবাই একসাথে বাজতে থাকা ইন্টারকমের দিকে তাকায়। সাদি তখন দৌড়ে গিয়ে রিসিভার কানে নেয়। তারপর বেশ কয়েকবার জোরে বললো, হাঁ, মা। এক্ষুনি আসছি সবাইকে নিয়ে। এক্ষুনি আসছি।
রিসিভার জায়গা মতো রেখে সাদি সবার সামনে ফিরে আসে। বলে, চাচা চাচি আপনাদের মা ডাকছেন। দুপুরের খাবার টেবিলে দেওয়া হয়েছে। মিশু ভাই, আপনাকেও যেতে বলেছেন।
বলে, মিশুর হাত ধরে একপ্রকার জোর করেই গ্যারেজের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া কংক্রিটের চিকন পথটার দিকে নিয়ে চললো। পিছন পিছন চাচা চাচিও ওদের অনুসরণ করতে থাকে।
প্রথমে এই গ্যারেজে ঢুকেই মিশু বুঝতে পেরেছিল পাশের কংক্রিটের পথটা নিশ্চয়ই পিছনে কোনো বাড়ির গেটের সামনে থামবে। তাই হলো, চিকন রাস্তার মাথায় সুন্দর আরেকটা লোহার গেট। গেট দিয়ে ঢুকেই মিশুর মাথা গোলমাল হয়ে গেলো। ভিতরে নানা রঙের ফুলের বাগান ঘেরা অপূর্ব সুন্দর উপরে এন্টিক রঙের টালি দেয়া একতলা দালান। চারদিকে উঁচু প্রাচীর ঘেরা। সামনে যে একটা গ্যারেজ আছে তা বাড়ির চারদিকের উঁচু প্রাচীরের ভেতরে ঢুকলে বোঝার কোনো উপায় নেই। বাড়ির সামনের অংশ পাতার ডিজাইনে গড়া মোটা গ্রিল দিয়ে ঘেরা এপাশ থেকে ওপাশ টানা বারান্দা। দু’স্টেপের প্রশস্ত সিঁড়ির মাঝ বরাবর গ্রিলের দরজা। ওদের সাথে মিশু বারান্দায় প্রবেশ করে। সামনেই ওপাশের দেয়ালের মাঝামাঝি আরেকটা দরজার ভারী পর্দা সরিয়ে একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা বেরিয়ে আসেন। চেহারায় স্পষ্ট উদ্বেগের ছায়া। হাকিম সাহেব আর ওনার স্ত্রীকে সালাম দিয়েই জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার ভাইজান, ভাবি? এসব কি হচ্ছে? মেয়েটা দশ মিনিট আগেই ইন্টারকমে কার সাথে যেনো রাগারাগি করলো। তার কিছুক্ষণ পর ওই মনিটর রাখা রুম থেকে পাগলের মতো বেড়িয়ে আমাকে টেবিলে খাবার বাড়তে বললো। জানায় আপনারা এসেছেন। সাথে আরেকটা বেশি প্লেট সাজাতে বলে। ওকে কেমন অস্থির আর মনে হচ্ছিল ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। বললো, মা এক্ষুনি ইন্টারকমে সাদিকে বলো বাসার ভিতরে আসতে। এক্ষুনি। নতুন আরেক জন এসেছেন। ওনাকেসহ ডাকো। প্লিজ, মা প্লিজ।
আমি তো ভয় পেয়ে যাই। ফোনে সাদিকে বলি নতুন কে যেনো এসেছে, তাকেসহ আপনাদেরকে যেনো দুপুরের খাবার খেতে ভেতরে নিয়ে আসে। আমার বলা শেষ হতেই দৌড়ে নিজের রুমে চলে যায়। সাড়ে তিন বছর আগে ওর বাবা মারা যাওয়ার ঠিক আগে ওকে একা রুমে ডেকেছিলেন আবার একটু পরেই কেনো যেনো পাগলের মতো দৌড়ে ওর রুমে চলে যায়। আবার সেই আগের মতোই দৌড়ে আবার বাবার রুমে ঢোকে। বেশ কিছু সময় পরে ওনার রুম থেকে বেরিয়ে আজকের মতোই আচরণ করেছিলো। ওর রুমে গিয়ে সারটা দিন দরজা বন্ধই করে রেখেছিল। রাতে ওর বাবা চলে গেলেন, তখন শুধু একবার বের হয়েছিল বাবাকে শেষ দেখতে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল অনেক। সেই ক্লাস ফোর থেকে মেয়ে আমার চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর ও তো আরো চুপচাপ হয়ে গেলো। অনেকদিন পর আজকেও আমি ওকে সেদিনের মতোই দেখলাম। কি হলো, কি হচ্ছে, আমি তো তার কিছুই বুঝতে পারছি না।
মায়ের চোখ দিয়ে নীরবে অশ্রু ঝরছে দেখে সাদি গিয়ে মায়ের হাত ধরে। মা, আমিও আজকে অবাক হয়েছি আপুর ব্যবহারে। ও আমার সাথে এই প্রথম ইন্টারকমে কথা বলেছে খুবই স্বাভাবিকভাবে, যেমনটা আমাদের মাঝে হওয়া উচিত। আজ সকাল থেকেই আমার সবকিছু কেমন যেনো অদ্ভুত লাগছে। আর এমন হওয়ার পিছনে প্রধান মানুষটাই হচ্ছে এই মিশু ভাই। সাদি আঙুল তুলে মিশুর দিকে।
সাদির মা এবার ভালো মতো খেয়াল করেন মিশুর দিকে। বলে, কে তুমি বাবা?
মিশুর গলা আগের মতো আবার যায় আটকে। কোনো শব্দই যেনো বের হতে চাচ্ছে না। ভেতরে মনে হলো শুকিয়ে কাঠ। ওনার উত্তরে মিশু শুধু বললো, আ-আ-মি একটু পানি খাবো।
এবার হাকিম চাচা বলে উঠেন, এ ছেলেও তো দেখছি কম যায় না। সাদি যা তো তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে আয়।
থাক এখানে পানি আনতে হবে না, বললেন সাদির মা। আমারই বরং সবাই ডাইনিং রুমে যাই। চলো বাবা, ভেতরে চলো।
ভারী পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে মিশু একটা স্নিগ্ধ আলো ছড়ানো লম্বা করিডরে এসে দাঁড়ায়। দেয়ালে সুন্দর লতাপাতা, ফুল আঁকা। করিডরের দুপাশে দুটো করে দরজা। আর একেবারে মাথায় আরেকটি দরজা। মনে হচ্ছে খুবই আধুনিক সিস্টেমেটিক ডিজাইন ফলো করেই বাড়িটি বানিয়েছেন। ডান দিকে প্রথম দরজা পেরিয়ে দ্বিতীয় দরজা দিয়ে ভেতরে মিশুই সবার শেষে ঢোকে। এটাই ডাইনিং রুম। টেবিলে প্লেট সাজানো। ভাত, তরকারি বিভিন্ন ছোট বড় বাটিতে রাখা। সাদির মা কথা বললেন, বাবা, তুমি ওই চেয়ারে বসো। তোমাকে পানি দিচ্ছি।
মিশু বাধ্যগতভাবেই চুপচাপ সামনের একটা চেয়ারে গিয়ে বসতেই ক্যাঁচ করে ছোট্ট একটা শব্দ শোনে। ডাইনিং রুমের ওপাশের একটা দরজা খুলে যায়। সাদির মা গ্লাসে পানি ঢালতে গিয়েও থমকে যায়। দ্রুত দরজার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকায়। ওনার দৃষ্টি অনুসরণ করে ওই রুমের সবাই। ভারী পর্দা সরিয়ে যে ডাইনিং রুমে ঢোকে তাকে দেখে মিশুর হার্টবিট প্রায় বন্ধ হবার জোগাড়। একি! সময়ের পরিবর্তনের সাথে মিশুর কল্পনায় ছোট্ট মেয়েটির রূপেরও পরিবর্তন হয়েছে। ইদানীং ও যে রূপে মেয়েটিকে এঁকেছে এযে বাস্তবে এখন ওর সামনেই। পরি দেখতে কেমন হয় মিশু জানে না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সামনেই হেঁটে হেঁটে ওর সামনে আসছে সে তো মানুষ হতে পারে না। আধুনিক মেকআপের কতখানি কম ব্যবহারে একটা মেয়ে অপ্সরা হতে পারে তা এই মেয়েটিকে না দেখে বুঝতে পারবে না। ওই রুমের সবাই হতবাক ওকে দেখে। সাদির মা তো মেয়েকে ওর রুম থেকে এভাবে বেরোতে দেখে শব্দ করেই কেঁদে উঠেন, মা! তুই বের হয়েছিস! আল্লাহ রে, আমার মেয়েটাকে নীল শাড়িতে কত্তো সুন্দর লাগতেছে!
সাদি তো প্রায় চেঁচিয়ে উঠে, আপু, তুই! এতটুকুই মুখে বলে। কিন্তু অবাক চোখ দুটো তখনো কথা বলে যাচ্ছিল। হাকিম চাচা, চাচি বললেন, মা শা আল্লাহ। কি অপরূপ আমাদের মেয়ে!
এতো উৎফুল্লতা মেয়েটিকে যেনো স্পর্শই করলো না। ও নিবিষ্ট মনে ধীরে ধীরে মিশুর ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায়।
মিশু পলকহীন চোখ শুধুই দেখছে সামনে দাঁড়ানো মেয়েটিকে। আজকের বিশেষ অভিযানে তার লুকানো ইচ্ছেটা সত্যিই কি কাকতালীয়ভাবে পূরণ হতে যাচ্ছে। তাহলে সত্যিই কি সে তার সেই ছোট বেলার মেয়েটি? মিশুর বুকের ভেতর এক অজানা কম্পন বয়ে যায়। দুমড়ে মুচড়ে হঠাৎ কান্নাও পাচ্ছে। মনে হচ্ছে মেয়েটিকে স্পর্শ করলে এই কম্পন, এই কান্না ভাব থেমে যাবে।
মিশুর মনে যখন এমন উতাল পাথাল অবস্থা তখন মেয়েটি কাঁপাকাঁপা গলায় কথা বলে, মিশু ভাই, আমি কি আপনাকে একটু ছুয়ে দেখতে পারি। গত আট বছর ধরে দূর থেকেই আপনাকে দেখছি। আপনাকে দেখবার সময় আমার বুকের ভিতরের সেই অনুভব বোঝাতেও পারবো না। বারবার মনে হতো এক দৌড়ে আপনাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু এক অপরাধ বোধ আর লজ্জা আমাকে সেটা করতে দেয় নি। আমার কারণে আপনাকে স্কুলে অপমানিত হতে হয়েছিল। হাঁ, আমার কারণেই। আপনার সাথে বন্ধুত্ব শুরু থেকে গিফট পাওয়া সবই শুধু বাবাই জানতেন। কারণ, ছোট্টটি থেকেই তিনিই ছিলেন আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি, সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। অতি তুচ্ছ ঘটনাও দৌড়ে গিয়ে বাবাকে বলতাম। আর বাবাও কতই না আগ্রহে সেসব শুনতেন। আবার কত মজা করেই সেগুলো সমাধান করতেন। শুধু সেদিন আপনার দেয়া গোলাপ কার্ডটা দেখে কেনো জানি উনি চুপটি হয়ে গেলেন। কার্ডটা একটু দেখে আমাকে দিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু ছুটির শেষে প্রথম দিনই আমাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করে দেন। আমাকে বলেছিলেন, মা তুই কি ওই মিশু ছেলেটার সাথে আর কথা না বললে মনে কষ্ট পাবি? আমি বাবাকে বলেছিলাম, না বাবা। কেনো কষ্ট পাবো?
বাবা খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু আমি সেদিন প্রথম বাবাকে মিথ্যে কথা বলেছিলাম। কেনো জানি না, আমি সত্যিই ভীষণ, ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। তারপর থেকে বাবার সামনে আমি আর দাঁড়াতে পারি নি। ওই কার্ডটা কেনো জানি আমাকে একদম একা করে দিলো। আমার মনে ছিলো মিশু নামের কৌতূহল। ক্লাস টেনে উঠে আমি হঠাৎ জানতে পারি আপনার দেয়া কার্ডটা গভীর ভালোবাসার এক প্রতিচ্ছবি। তখন থেকে আপনাকে খুঁজে বের করতে চাই এবং খুঁজেও পেলাম। আর সেই থেকে আড়ালে আপনাকে যখন যতটুকু দেখতাম মনের মাঝে এক অজানা ঝড় বইতো। বাসায় এসে চুপিচুপি আপনার দেয়া কার্ডটা স্পর্শ করতাম। এটাই আমার জগৎ হয়ে গেলো। আমার চুপচাপ হওয়ার পিছনের কারণটা বাবা ছাড়া কেউ জানত না। মিশু ভাই, এই যে দেখেন বলে আঁচলের আঁড়াল থেকে পাঁচটা রক্ত গোলাপের ছবির সেই কার্ডটা বের করে মিশুর সামনে টেবিলের ওপর রাখে।
মেয়েটির কথা শুনতে শুনতে মিশু এতক্ষণ এক ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল কিন্তু টেবিলে রাখা কার্ডটা দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। ও পাগলের মতো দু’হাত বাড়িয়ে দ্রুত তুলে নেয়। চোখকেও বিশ্বাস করাতে পারছে না এটা সেই তার না বুঝে গভীর ভালোবাসা প্রদানের স্মৃতি। শক্ত করে ধরে রাখে দু’হাতে কিছুক্ষণ। তারপর একটা জিনিস দেখে লাফিয়ে ওঠে। বলে, আমিতো শুধু “নিলু” নামটাই লিখেছিলাম। এই যে, এইখানে “আর মিশু”, এই শব্দ দুটো আমি লিখি নাই। বিশ্বাস করো, নিলু, আমি এভাবে লিখি নি। চোখে জল আর সেই সাথে এক নিষ্কলুষ দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকায় মিশু।
মেয়েটিও কাঁদছে। অশ্রুজল গড়িয়ে থুতনির কাছাকাছি চলে এসেছে। এক্ষুনি পড়বে নীচে ফোঁটায় ফোঁটায়। কান্না জড়ানো গলায় তাড়াতাড়ি বলে, না, না, মিশু ভাই, ওটা আপনার লেখা না। ওটা আমার বাবা লিখেছেন, উনি চলে যাবার দিন। উনি আমাকে একা ডেকেছিলেন শেষবারের মতো। ভীষণ অসুস্থ, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিলো। তারপরও বললেন, মা, নিলু, সেই কার্ডটা নিয়ে আয় তো মা। আমি জানি, তুই খুব যত্নে আগলে রেখেছিস ওটা। মা, আমিই দায়ী তোর একটা অতি সাধারণ ভালোলাগাকে গভীর ভালোবাসায় পরিণত করার। তুই আমাকে ভীষণ ভালোবাসিস তাই আমি জানি, আমি যেটা অপছন্দ করেছিলাম সেটা তুই জীবনেও আমার সামনে আনবি না। তখন তুই তো এতো ছোট ছিলি, বাবা হিসেবে আমার কর্তব্য ছিল অমনটি করার। তাই বলে বুঝিনি, আমি তোকে আমার কাছ থেকে এতো দূরে সরিয়ে দেবো। তুই, যা তো মা। নিয়ে আয় কার্ডটা। বাবার কথায় আমার তখন বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছিলো। সেটা ঠেঁকিয়ে এক দৌড়ে আমার রুম থেকে কার্ডটা নয়ে যাই। বাবা ওনার রিডিং টেবিল থেকে কলমটা দিতে বলেন। তারপর নিজ হাতে বাকি দু’টো শব্দ লেখেন। হাসি হাসি মুখে বলেন, এখন থেকে আর মিশুকে লুকিয়ে ফলো করার দরকার নেই। সোজা ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াবি। আর আমার পক্ষ থেকে এই রিটার্ন গিফটা দিবি। কি, মা, দিবি তো?
সৈয়দ মনজুর কবির : গল্পকার, ঢাকা




