এখন সময়:রাত ২:৪০- আজ: রবিবার-২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ২:৪০- আজ: রবিবার
২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

গগন হরকরা ও রবীন্দ্রনাথ

আনোয়ার মল্লিক

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূর্ববঙ্গের শিলাইদহে এসেছিলেন জমিদার হিসেবে। শুধু শিলাইদহ নয়, নওগাঁ জেলার পতিসর এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ঠাকুর পরিবারের আরও দুটি জমিদারি ছিল। ১৮৮৯ সালের নভেম্বর মাসে তিনি জমিদারি দেখাশোনা করতে প্রথমবারের মতো তৎকালীন পূর্ববঙ্গে আসেন। বিভিন্ন আসা-যাওয়ার মাধ্যমে ১৯০১ সালে স্ত্রী বিয়োগ পর্যন্ত তিনি এই অঞ্চলে অবস্থান করেন।

জমিদারের মূল কাজ কৃষকের নিকট থেকে খাজনা আদায় করা। এবং এই খাজনা আদায় খুব সুখকর কোনো কাজ ছিল না। জমিদার কর্তৃক খাজনা আদায়ের কথা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কৃষকের করুণ মুখচ্ছবি। কিন্তু একজন কৃষক সন্তান, যাঁর নিজেরও জীবিকা ছিল কৃষির সঙ্গেই যুক্ত, তিনি জমিদার রবীন্দ্রনাথের অপার ভালোবাসা এবং স্নেহ লাভ করেছিলেন।

শিলাইদহে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউল সম্রাট লালনের সাক্ষাৎ হয়েছিল কি না, এ ব্যাপারে দুই ধরনের বিতর্কের কথা আমরা জানি। তবে দেখা না হওয়ার পাল্লাই ভারী। কিন্তু গগন চন্দ্র দাস ওরফে গগন হরকরার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের সুযোগ নেই। গগন হরকরার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আকস্মিকভাবে পরিচয় ঘটে যায়।

গগন হরকরা কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের আরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। আনুমানিক ১৮৪০ মতান্তরে ১৮৪৫ সালে শিলাইদহ ইউনিয়নের গোবরখালী গ্রামে তাঁর জন্ম। কৃষি কাজের পাশাপাশি তিনি শিলাইদহ পোস্ট অফিসের চিঠি বিলির কাজ করতেন। পোস্ট অফিসের চিঠি বিলির কাজ যাঁরা করতেন, তাঁদেরকে সেই সময় ডাক হরকরা নামে ডাকা হতো। সেই নিয়মে গগন চন্দ্র দাস হয়ে যান গগন হরকরা।

গগন হরকরা ছিলেন বাউল ধর্মমতের অনুসারী সাধক। উদাসী মনে নিজের আনন্দে তিনি পথে পথে গান করে বেড়াতেন। একদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বোটের ছাদে বসে পদ্মার শোভা উপভোগ করছিলেন। এমন সময় গগন হরকরা পোস্ট অফিসের চিঠির থলে পিঠে নিয়ে গান করতে করতে ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। গগনের গান শুনে কবিগুরু মুগ্ধ হয়ে যান। তাঁকে তিনি লোক মারফত কাছে ডেকে পাঠান।

গগন হরকরা লালন সাঁইজির একজন ভক্ত ছিলেন। সময় পেলেই তিনি গুরু লালনের সান্নিধ্যে যেতেন। লালনও শিষ্য গগনকে স্নেহ করতেন। গুরুর সংস্পর্শে থেকে তাঁর অনেক গানও শিখেছিলেন এবং পথে-প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে গুরুর গান গেয়ে বেড়াতেন। অবশ্য গগন হরকরা নিজেও ছিলেন একজন গীতিকবি এবং সুকণ্ঠী গায়ক। সাঁইজির গানের সঙ্গে নিজের লেখা গানও তিনি গাইতেন। তাঁর লেখা একটা বিখ্যাত গানের কথা আমরা সবাই জানি:

“আমি কোথায় পাবো তারে / আমার মনের মানুষ যে রে / হারায়ে সেই মানুষ / তার উদ্দেশ্যে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।”

শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে গগনের কণ্ঠে এই গান শুনে কবিগুরু মুগ্ধ হয়ে যান। এরপর থেকে প্রায়ই গগন হরকরাকে রবীন্দ্রনাথ গান শোনানোর জন্য ডেকে পাঠাতেন। লালনের গানের সঙ্গে নিজের লেখা গানও কবিগুরুকে শোনাতেন তিনি। কবিগুরু পরম আগ্রহ নিয়ে গগনের কাছে বাউল গান সম্পর্কে জানতে চাইতেন এবং বাউল তত্ত্ব নিয়ে দুজন গভীর আলোচনায় মেতে উঠতেন। অনেক দিন তিনি পদ্মার উপরে বোটের ছাদে বসে গগনের গান নিজের কণ্ঠে গাইতেন।

 

রবীন্দ্র-মানসে এর ফল হয় সুদূরপ্রসারী। বাউল গানে নিরাকার ঈশ্বর তথা মনের মানুষের অনুসন্ধান করা হয়। রবীন্দ্রনাথ এই মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতাকে মানবধর্ম বলে অভিহিত করেন এবং তাঁর কাজের মাধ্যমে এই দর্শনকে তিনি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন। তিনি তাঁর বিভিন্ন রচনায় এবং দেশ-বিদেশে প্রদত্ত ভাষণে উদার বাউল দর্শন এবং লালন সাঁইজি ও গগন হরকরার মাহাত্ম্য তুলে ধরেন। ১৯২০ সালের ২১ এপ্রিল ফ্রান্সের গিমে মিউজিয়ামে ‘অহ ওহফরধহ ঋড়ষশ জবষরমরড়হ’ শীর্ষক বক্তৃতায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গগন হরকরার গানের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন, ”

The first Baul song, which I chanced to hear with any attention, profoundly stirred my mind… The name of the poet who wrote this song was Gagan. He was almost illiterate; and the ideas he received from his Baul teacher found no distraction from the self-consciousness of the modern age. He was a village postman, earning about ten shillings a month, and he died before he had completed his teens.

প্রখ্যাত লোকসাহিত্য গবেষক মুহম্মদ মুনসুর উদ্দিন সম্পাদিত ‘হারামণি’ (১৯৩৬) গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সেই ভূমিকায় গগন হরকরার গান সম্পর্কে তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেন।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ গানের সুরের অনুকরণে রচিত হয়। মুহম্মদ মুনসুর উদ্দিনের ‘হারামণি’ গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ বিষয়টা উল্লেখ করেছেন এভাবে: “শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে সর্বদাই আমার দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হতো। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগ-রাগিণীর সঙ্গে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে।”

উল্লিখিত গানটি ছাড়াও গগন হরকরার আরেকটি গানের সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন,

“ও মন অসার মায়ায় ভুলে রবে কতকাল এমনি ভাবে

এসব ভোজবাজিকায় মন রে, ভোজবাজিকায় কেউ কারো না

দেখতে দেখতে কোথায় যাবে।

সুখের আশে দেশ-বিদেশে ভ্রমিতেছো নিশি-দিবে

তবুও হলো না সুখ মন রে, হলো না সুখ সদাই অসুখ

সুখের যে পথ চিনবি কবে?

যাদের এখন দিয়ে প্রাণ-ধন, করছ যতন আপন ভেবে

যেদিন পাবে অক্কা, সবই ফক্কা, সঙ্গে তার কেউ যাবে না।

আপন যে জন, লও তার স্মরণ, ভব-বন্ধন এড়াইবে

ভেবে বলছে গগন, এবার বুঝি আমার সাধের মানব জনম এমনি যাবে।।”

বাউল গগন হরকরার উপর্যুক্ত গানের সুরের আদলে রবীন্দ্রনাথ নিম্নবর্ণিত গানটি রচনা করেন:

“যে আমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়বো না মা!

আমি তোমার চরণ-

মা গো, আমি তোমার চরণ করবো স্মরণ, আর কারো ধার ধারব না মা।”

গগন হরকরার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। গ্রামের মক্তবে সামান্য কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন। যেহেতু তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে চিঠি বিলি করতেন, তাতে বোঝা যায় তিনি বাংলা, ইংরেজি পড়তে পারতেন। তবে তাঁর গানের ভাষা, শব্দচয়ন দেখলে সহজেই অনুধাবন করা যায় তিনি ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত বাউল কবি। আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, একসময় তাঁর একটি আম-কাঁঠালের বাগান ছিল। সেই বাগানের আম-কাঁঠাল রবীন্দ্রনাথ খুব পছন্দ করতেন বলে শোনা যায়।

গগন হরকরা একটি বাউল গানের দল গঠন করেছিলেন। এই দলের নাম ‘সখি সংবাদ’। এই দল নিয়ে তিনি গান গেয়ে বেড়াতেন। গগনের গানের সুর, ছন্দ, কথা মানুষের মনকে আলোকিত করে তোলে। অসংখ্য বাউল সুরের গান রচনা করেছিলেন তিনি, কিন্তু আজ সেসবের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

লালন সাঁইজিরও একটি দল ছিল এবং তিনি সবসময় দলবল নিয়ে চলতেন। এছাড়া কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের আরেকটি দল ছিল ‘সখের বাউল দল’ নামে। এই দলের সদস্য ছিলেন অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, মীর মোশাররফ হোসেন, জলধর সেন প্রমুখ।

গগন হরকরা যেসব গান রচনা করেছিলেন, মাত্র দুটি বাদে সেগুলোর আর সন্ধান পাওয়া যায় না। সংরক্ষণের অভাবে তাঁর বাকি গানগুলো হারিয়ে গেছে। তবে এমনও হতে পারে, অযত্নে-অবহেলায় তা কোথাও পড়ে আছে। চর্যাপদ উদ্ধার হয়েছিল রচনার কয়েক শ বছর পরে নেপালের রাজদরবার থেকে এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন উদ্ধার হয়েছিল বাঁকুড়া জেলার কাকিলা গ্রামের গোয়ালঘর থেকে। হয়তো গগনের গানও এরকম একদিন উদ্ধার হবে।

গগন হরকরার গান হারিয়ে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর গানের দার্শনিক তত্ত্ব উপলব্ধি করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন: “এমন বাউল গান শুনেছি, ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে যার তুলনা মেলে না।” (ভূমিকা, হারামণি, মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন)

গগন হরকরা সেই বিরল প্রতিভাবানদের একজন, যাঁর সৃষ্টির স্বীকৃতি দিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্ববরেণ্য মানুষ। অন্যদিকে গ্রামের সহজ-সরল সাধারণ মানুষও তাঁর গানের ভাবে এবং ঐশ্বর্যে একাত্ম হয়ে যেতে পারতেন।

তথ্যসূত্র:

১। ওয়াকিল আহমদ, বাংলাপিডিয়া।

২। ভূমিকা, হারামণি, মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন।

৩। গগন হরকরা: আমি কোথায় পাবো তারে – সোহেল আমিন বাবু, কিংবদন্তী পাবলিকেশন, বাংলাবাজার, ঢাকা।

 

আনোয়ার মল্লিক : অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল,

রাজশাহী বিভাগ, রাজশাহী

বাংলাদেশের জন্ম ও বঙ্গবন্ধু: কিছু অনুমান, কিছু প্রশ্ন কিছু অনস্বীকার্য সত্য

আবু মকসুদ   বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশ চাওয়া’ বা ‘স্বাধীনতা চাওয়া’ নিয়ে কখনোই কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। কিন্তু ইতিহাসকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টার

মাহরাং বালুচ বেলুচিস্থানের শেখ মুজিব!

ফজলুল বারী   বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেত্রী ডা: মাহরাং বালুচ আজ বঙ্গবন্ধুর মতোই পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিনী। মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন

গল্পটি রুনা আখতারকে নিয়ে

রুনা আখতার আমাদের কারখানায় অপারেটর থেকে সুপারভাইজার পদে পদোন্নতি পেয়েছে। পদোন্নতি একটি নিয়মিত বিষয়— অনেকেরই হয়। কিন্তু রুনার গল্পটি আলাদা।   এই পদোন্নতি তাকে এতটাই

আন্দরকিল্লা : আলোকিত জীবনের রূপরেখা

ধীমান বড়ুয়া কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীদের আন্তরিকতায় আপনার নিয়মিত প্রকাশনাগুলো আমার হাতে পৌঁছে যায়, আর আমি প্রতিবারই নিজেকে একজন কৃতজ্ঞ ও মুগ্ধ পাঠক হিসেবে আবিষ্কার করি।

বিশ বছর পর বাংলায় ফিরছেন তসলিমা

রোখসানা ইয়াসমিন মণি সাহিত্যের ইতিহাসে বহু লেখকই সময়ের স্রোতে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু কিছু মানুষ জন্মান কেবল লেখার জন্য। তসলিমা নাসরিন সেই ধারারই এক সাহসী