এখন সময়:সন্ধ্যা ৬:৩০- আজ: বুধবার-২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:সন্ধ্যা ৬:৩০- আজ: বুধবার
২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

বাঙালির বর্ষবরণ—কবিতায়-গানে

সুমন বনিক

দিনপঞ্জিকায় প্রতিটি মাসের পাতা জুড়ে ৩০/৩১ টি সংখ্যা থাকে| সংখ্যাগুলো একএকটি তারিখ বা দিনের নির্দেশনা দিয়ে থাকে| আমরা সেই তারিখমতো আমাদের কর্মপরিকল্পনা সাজাই বা রুটিনমাফিক দিনযাপনে তারিখটি অতিবাহিত করি| কিন্তু ,আমাদের জাতীয় জীবনে ক্যালেন্ডারের কিছু কিছু দিন বা তারিখ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে আসে| অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল সেই দিন বা তারিখগুলো আমরা উদযাপন করি, যেমন— ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ,  ১৬ই ডিসে¤^র, ১লা ˆবশাখ, ৩০শে ˆচত্র, ইত্যাদি| উল্লিখিত দিনগুলো আমাদের জাতিসত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, দিনগুলোতে ¯^াধীনচেতা বীর বাঙালির পরিচয় বহন করে আবার আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য- সংস্কৃতি ফুটে উঠে| পহেলা ˆবশাখ উৎসবমুখর বাঙালির ঐতিহ্যে সমুজ্জ্বল| বৈশাখের উৎসব সর্বজনীন—এটা বাঙালির উৎসব| উৎসব প্রিয় বাঙালির পহেলা ˆবশাখ একটি লোকায়ত উৎসব| নানান রকমের উৎসব আমাদের জাতীয় জীবনে জড়িয়ে আছে যেমন- পৌষ পার্বন, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি| তেমনি বাংলা নববর্ষ আমাদের আর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের দাবীদার| বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর আর্থ সামাজিক কাঠামোর সাথে বাংলা দিনপঞ্জীর সম্পর্ক গভীর| এখনো এ দেশের কৃষকরা বাংলা তারিখের হিসেবেই বীজ বোনে, ফসল কাটে| বাংলা সনের প্রবর্তন কবে হয়েছিল, কে তার প্রবর্তক তা নিয়ে নানান বিতর্ক রয়েছে| তবে বাংলা সন সৃষ্টির পেছনে দুইজন মুসলমান শাসকের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত| এদের একজন সুলতান হোসেন শাহ ও অন্যজন মোগল সম্রাট আকবর| তবে অধিকাংশের মতামত হলো মোগল সম্রাট আকবরই বাংলা সনের প্রধান প্রবর্তক|

 

বৈশাখের আগমনে বেজে উঠে নতুনের জয়গান| দুঃখ, জরা, ব্যর্থতা ও মলিনতাকে ভুলে সবাই জেগে ওঠে নব আনন্দে, নব উদ্যমে| ফসলি সন হিসেবে মোঘল আমলে যে বর্ষগণনার সূচনা হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ সমগ্র বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক স্মারক উৎসবে পরিণত হয়েছে| পহেলা ˆবশাখের মাঝে বাঙালি খুঁজে পায় নিজ¯^ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও চেতনার ¯^রূপ| পহেলা ˆবশাখ শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়| এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আত্মবিকাশ ও বেড়ে ওঠার প্রেরণা| বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মুক্তিসাধনায় পহেলা ˆবশাখ এক অবিনাশী শক্তি|বাংলা নববর্ষ বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উৎসব আনন্দে মেতে ওঠার দিন| আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় গণমানুষের উৎসব| নববর্ষ সেজন্যই আমাদের আর্থসামাজিক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় বাঙালির ঐতিহ্যের অহংকার| পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেকেও খ্রিস্টিয় সালের দিনক্ষণ মেনে চলতে হয়| তবুও বাঙালির ঐতিহ্যের শিকড়ে প্রোথিত বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব অপরিসীম—মহিমায় উজ্জ্বল| সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাংলা নববর্ষই দেশের সর্বজনীন বড় উৎসব| নববর্ষের উৎসব আসে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে| এমন সর্বজনীন উৎসব আর একটিও নেই| নানা মাত্রায় এটি সারাদেশে পালিত হয়| যা কিছু পুরোনো, যা কিছু জীর্ণ— তা পেছনে রেখে নতুনকে আমরা বরণ করি| আমরা নতুন করে শুরু করি| প্রকৃতিও নবরূপে সাজে| সবকিছু যেন আরও সবুজ হয়ে ওঠে| গাছে গাছে নতুন পাতা, ফুলের সমারোহ আর পাখির কণ্ঠে গান যেন উৎসবে ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়| দোকানে দোকানে হালখাতা অনুষ্ঠান হয়, গ্রামের পথে-প্রান্তরে মেলা বসে| বর্ষবরণ বা পহেলা ˆবশাখ আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনের সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহক হলেও, জীবন আর জীবিকার তাগিদে গ্রামের মানুষ একসময়ে উঠে আসে শহরে, সঙ্গে নিয়ে আসে সংস্কৃতির নানান অনুষঙ্গ| পহেলা ˆবশাখের সাংস্কৃতিক আয়োজন এভাবেই গ্রামীণ মানুষের হাতধরে শহরে চলে আসে| ˆবশাখী মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি উৎসবমুখর বাঙালির ঐতিহ্যের স্মারক|

 

০২]

উৎসবমুখর বাঙালির প্রতিটি পার্বন নিয়ে রচিত হয়েছে অজস্র কবিতা গান| বাংলা কবিতা ও গানে বারবার উঠে এসেছে ষড়ঋতুর রূপ ˆবচিত্র্য| বাংলা সাহিত্যে এমন কোনো কবি নেই, যিনি ˆবশাখ নিয়ে কবিতা লেখেননি কিংবা যাদের কবিতায় ˆবশাখের রূপ উঠে আসেনি|  বাংলা কবিতায় নববর্ষ যেভাবে, যত বহুমাত্রিকতায় এসেছে- তা অন্য কোনো জাতির নববর্ষে আসেনি| পহেলা ˆবশাখের ভোরে আলো ফোটার আগেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানটি আজ বাঙালির ঐতিহ্যের রূপ পরিগ্রহ করেছে| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “এসো হে ˆবশাখ ” গানটি যেন বাঙালির মননে জানান দিয়ে যায় — আজ পহেলা ˆবশাখ| ˆবশাখকে আবাহন করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের এই গানটি যেন বাঙালির হৃদয় থেকে উৎসারিত| রবীন্দ্রনাথের সেই আবেগতাড়িত বিবেকজাগানিয়া গানটি এখানে উৎকলন করছি:

 

“এসো হে ˆবশাখ, এসো, এসো

তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥

 

যাক পুরাতন স্মৃতি,যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,

অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥

 

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা

 

রসের আবেশরাশি

শুষ্ক করি দাও আসি,

আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ|

মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥”

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান “এসো হে ˆবশাখ” পুরনো বছরের জীর্ণতা, গ্লানি ও দুঃখ মুছে ফেলে নতুনের আহ্বানের এক ˆশল্পিক ও দার্শনিক আবাহন| এই গানে ˆবশাখকে রুদ্র ও প্রলয়ঙ্করী রূপে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা আগুনের স্নানে ধরণীকে পবিত্র করে নতুন আশা ও শক্তির সঞ্চার করবে| এটি শুধু নববর্ষের গান নয়, জীবনের ক্লান্তি দূর করে নতুনভাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা| কবি ˆবশাখকে বলছেন, “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা”| অর্থাৎ, গত বছরের হতাশা, রোগ, শোক ও জরাজীর্ণতা যেন নির্বাসিত হয় — জীবনের অধ্যয়  থেকে|”অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা” —বৈশাখের প্রচণ্ড খরতাপ বা কালবৈশাখীর ঝড় যেন পৃথিবী থেকে সমস্ত আবর্জনা ও অশুভ শক্তি দূর করে ধরণীকে পবিত্র করে তোলে|”আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ”—পুরনো, মৃতপ্রায় বা ‘মুমূর্ষু’ অস্তিত্বকে ভেঙে চুরমার করে নতুন কিছু গড়ার জন্য ধ্বংসের (প্রলয়) প্রয়োজন, যা ˆবশাখ নিয়ে আসে| রবীন্দ্রনাথ ˆবশাখকে ‘তাপস’ বা কঠোর সাধক হিসেবে কল্পনা করেছেন | তার এই রূপ যেমন রুদ্র (ভয়ংকর), তেমনই মোহন (আকর্ষণীয়)| রবীন্দ্রনাথের গানটি এখন বাঙালির নববর্ষ উদ&যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আমাদের নতুন বছরকে ¯^াগত জানাতে প্রস্তুত করে| এই গানটি ভাঙনের মধ্য দিয়ে গড়ার, ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টির এবং পুরনোকে পেছনে ফেলে নতুনের সাথে নতুনভাবে পথচলার গান|

 

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানেও ˆবশাখের রুদ্ররূপ উঠে এসেছে| কবির বিখ্যাত “প্রলয়োল্লাস” কবিতাটি  নজরুল সঙ্গীত বা দেশাত্মবোধক গান হিসেবেও পরিচিত| এই কবিতাটি ধ্বংস ও নতুন সৃষ্টির আনন্দে কালবৈশাখীর ঝড়ের মাধ্যমে পুরনো জরাজীর্ণতাকে ভেঙে ফেলার আহ্বান জানায় |কালবৈশাখীর কাল্পনিক রূপ ধরে প্রলয়ঙ্করী শক্তির আগমনে পুরনো, অন্যায্য ও জরাজীর্ণ সমাজ ভেঙে পড়ে এবং নতুন যুগের সূচনা হয়| কবি এই ধ্বংসযজ্ঞকে ভয় না পেয়ে উল্লাসের সাথে ¯^াগত জানাতে বলেছেন|মূলত ,নজরুল এই কবিতাটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন, যেখানে ‘প্রলয়’ বলতে ¯^াধীনতা সংগ্রাম ও বিপ্লবের মাধ্যমে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক বোঝানো হয়েছে| কবিতা/গানটির অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরছি:

 

“তোরা সব জয়ধ্বনি কর

তোরা সব জয়ধ্বনি কর

ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল&-বোশেখীর ঝড়|

তোরা সব জয়ধ্বনি কর

তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!

 

আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল

সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!

মৃত্যু-গহন অন্ধ-কূপে

মহাকালের চণ্ড-রূপে

ধূম্র ধূপে

বজ্র শিখার মশাল জেলে আস&ছে ভয়ঙ্কর—

ওরে ঐ হাস&ছে ভয়ঙ্কর!

তোরা সব জয়ধ্বনি কর

তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!”

 

কবিতাটি মূলত তরুণ সমাজকে অন্যায় ও ভয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এবং নতুন সমাজ গড়ার প্রেরণা দেয়|   জীবনানন্দ দাশ  বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি, যিনি রূপসী বাংলার কবি বা প্রকৃতির কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত| তাঁর কবিতায় বাংলার চিরায়ত নিসর্গ, নদী, ধানক্ষেত, কাশফুল এবং বিষণ্ন সৌন্দর্যের এক অনন্য চিত্রকল্প ফুটে ওঠে, যা পাঠককে মুগ্ধ করে| তিনি প্রকৃতির ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ তুলে ধরেছেন কবিতার পঙক্তিতে| বাঙালির ˆবশাখ মাসটি জীবনানন্দের কবিতায় উঠে এসেছে এক অনন্য নান্দনিকতায়| জীবনানন্দ দাশের ˆবশাখ বা নববর্ষ নিয়ে লেখা অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো বর্ষ আবাহন| এই কবিতায় তিনি পুরাতন বছরের জীর্ণতা মুছে ফেলে নতুন ˆবশাখকে ¯^াগত জানিয়েছেন, যেখানে প্রকৃতির ¯^চ্ছ রূপ এবং নতুনের বার্তা সুস্পষ্ট| এছাড়া, তিনি ˆবশাখের ধ্বংসের পাশাপাশি সৃষ্টির উল্লাসকেও তার কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন| জীবনানন্দ দাশের বর্ষ আবাহন কবিতাটি এখানে উৎকলন করছি:

 

“ওই যে পূর্ব তোরণ-আগে

দীপ্ত নীলে, শুভ্র রাগে

প্রভাত রবি উঠল জেগে

দিব্য পরশ পেয়ে,

নাই গগনে মেঘের ছায়া

যেন ¯^চ্ছ ¯^র্গকায়া

ভুবন ভরা মুক্ত মায়া

মুগ্ধ-হৃদয় চেয়ে|

অতীত নিশি গেছে চলে

চিরবিদায় বার্তা ব’লে,

কোন& আঁধারের গভীর তলে

রেখে স্মৃতিলেখা,

এসো এসো ওগো নবীন,

চলে গেছে| জীবণ মলিন—

আজকে তুমি মৃত্যুবিহীন

মুক্ত সীমারেখা|”

 

জীবনানন্দ দাশের আরেকটি কবিতায় ˆবশাখী রাতের পরিবেশ ও বাতাসের স্পর্শ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে| তাঁর কবিতায় ˆবশাখ মানেই প্রচণ্ড দাবদাহের পরে কালবৈশাখীর রূপ, সোনালি রোদের ঢেউ এবং প্রকৃতির নতুন সাজ|বৈশাখকে তিনি দেখেছেন শুভ্রতার প্রতীক, মেঘের ভেলা আর সাদা কড়ির মিলন| জীবনানন্দ দাশের ‘ঘুমিয়ে পড়ব আমি’ কবিতায় সেই ¯^রটি আমরা শুনতে পাই এভাবে:

 

‘ঘুমিয়ে পড়ব আমি একদিন

তোমাদের নক্ষত্রের রাতে

শিয়রে ˆবশাখ মেঘ সাদা

যেন কড়ি শঙ্খের পাহাড়|’

 

জীবনানন্দ দাশের ˆবশাখের কবিতাগুলোতে সাধারণত প্রকৃতির রূপ বদলের সাথে সাথে মানুষের জীবনের নতুনের প্রতি আশা-আকাঙ&ক্ষার প্রতিফলন ঘটে|

 

ষাটের দশকের কবিতায়, বাংলাদেশের কবিতায় একটি স্পষ্ট পালাবদলের কাজ চলেছিল, যার ভিত্তি রচনায় শামসুর রাহমানের অবদান ছিল সর্বাধিক| শামসুর রাহমান বাংলা সাহিত্যে কবিতার রাজ্যে  আধুনিকতার প্রতীক, যিনি নববর্ষের আনন্দ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন| তাঁর রচিত নববর্ষ বা ˆবশাখ নিয়ে লেখা কবিতাগুলোতে পুরনো বছরের হতাশা ভুলে নতুন আশা, তেজ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন ঘটে| শামসুর রাহমানের “এলো নববর্ষ, শুভ নববর্ষ” কবিতা— উৎসবের সুর নিয়ে আসে|শামসুর রাহমানের কবিতায় নববর্ষের চেতনা জীর্ণ-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুন আশা ও ¯^প্নের উদয় ঘটে| তাঁর অনেক কবিতার মতোই নববর্ষের লেখাতেও অন্যায় ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ফুটে ওঠে| তবে, শামসুর রাহমানের নির্দিষ্ট কোনো একটি “নববর্ষের কবিতা”র চেয়ে তার সামগ্রিক কাব্যধারায় নববর্ষ ও ˆবশাখ নতুন উদ্দীপনার বার্তা বহন করে| তাঁর কবিতায় ˆবশাখের রূপ ফুটে উঠে এভাবে:

 

‘রাত্রি ফুরালে জ্বলে ওঠে দিন

বাঘের থাবায় মরছে হরিণ

কাল বোশেখের তাণ্ডবে কাঁপে পড়ো পড়ো চাল

শূন্য ভাঁড়ারে বাড়ন্ত চাল ইচ্ছে তার ইচ্ছে|’

আমরা আরও অবলোকন করি, শামসুর রাহমান ˆবশাখকে কবিতায় তুলে এনেছেন এভাবেই:

 

“আকাশের তুলট কাগজে কী সহজে

ˆবশাখ স্পষ্ট লেখে প্রথম অক্ষর,

যেন আদি কবির খাগের কলমের

ডগা থেকে ঝরে আদি শ্লোক নতুনের

খবর রটিয়ে চরাচরে| ——-”

 

আল মাহমুদের কবিতায় নববর্ষ বা ˆবশাখ জরাজীর্ণতাকে ভেঙে নতুন প্রাণের উল্লাস বয়ে আনে| আল মাহমুদের কবিতায় ˆবশাখী ঝড় শুধু ধ্বংস নয়, বরং নতুন সৃষ্টির মহাগুঞ্জন জাগায়| প্রসঙ্গত, আল মাহমুদের কালবোশেখী কবিতাটি এখানে উৎকলন করছি:

 

কোথায় যাব কোথায় বাড়ি কোথায় হবে শেষ

ঝড়ের বাতাস টানছে আমায় টানছে নিরুদ্দেশ

উড়িয়ে নিল বসন, শাড়ি আঁচল উড়ে যায়

হাত বাড়ালেই ধরতে পারি দক্ষিণা হাওয়ায়

আঁচলখানি ধরি যদি ধরতে তো চায় মন

ঝড়ের বাতাস পাতা উড়ায়, ঝড়ের আয়োজন

পা বাড়িয়ে পথে নামি পথের কী শেষ আছে

গাছের ডালে বসছে পাখি শব্দ গাছে গাছে

 

কালবোশেখী ঝিলিক মারে কালো মেঘের সাজ

শরম নাই লো ও যুবতী নাই বুঝি তোর লাজ

ঘোমটাখানি দিলাম তুলে সিঁথির ’পরে টান

ঝড়ের সাথে খড়ের কুটো আনছে ডেকে বান

ওড়ার মাঝে জোড়ার পাখি খুঁজছে সাথী তার

কোথায় সাথী কালো রাতি নামল কী আঁধার!”

 

তাঁর কবিতায় ‘কালবোশেখী’র সাথে গ্রামীণ জীবনের একাত্মতা এবং উৎসবের আমেজও ফুটে ওঠে|

 

গ্রামীণ জীবনে পহেলা ˆবশাখ শুধুমাত্র উৎসবের আনন্দ নিয়ে আসে না, বরং জীবনের প্রাপ্তি /অর্জনের খেরোখাতা খুলে দেয়| মহাজনের সম্পদ নির্মাণে খাজাঞ্চিবাবুর শ্রম-ঘামের মূল্যায়ন আছে কি! অমন ব্যতিক্রম সমীকরণ নিয়ে  কবি নির্মলেন্দু গুণের ˆবশাখের কবিতা —’খাজাঞ্চীবাবুর নববর্ষ’|

এখানে কবিতাটি উৎকলন করছি :

 

 

“দেখতে দেখতে আরো একটি ˆচত্র প্রায় শেষ হলো, আজ সংক্রান্তি, কাল থেকে ˆবশাখের শুরু|

খেরোখাতার হিসাবের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভাবছেন খাজাঞ্চিবাবু-এরই মধ্যে নাকের ডগায় ঝোলা

সুতো বাঁধা চশমার লেন্স বদলাতে হলো বার তিনেক|

তবু তার হিসাব মিলছে না-শুধু দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে বারবার|

এদিকে উদ্বিগ্ন মহাজন সতর্ক’ ভ্রুকুটি হেরে আছেন তাকিয়ে,

যেন একজোড়া আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র,

কখন আঘাত হানবে কে জানে?

 

খাজাঞ্চিবাবু ভাবেন আজ এই সংক্রান্তির পুণ্য-রজনীতে

মহাজন গদিতে যদি তার মৃত্যু হয়, তাও ভালো| বিবাহযোগ্যা দুই মেয়ে সুজল-সুফলা আর নাবালক দুই পুত্র যদু-মধুকে নিয়ে বিধবা হবেন স্ত্রী অন্নপূর্ণা| আমার কী? আমি দিব্যি ˆবতরণী পাড়ি দিয়ে চ’লে যাবো

ঈশ্বরের নিজের মোকামে, তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সহায় সম্পদের

হিসাব মিলাবো অন্য এক খেরোখাতায়|

আর ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন হয় চিত্রগুপ্তের কাজটাই যাবো পেয়ে,

এক দু’বছর তো নয়, দীর্ঘ দু’শ পঁয়ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতা|”——-( সংক্ষিপ্ত)

নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় নববর্ষ কেবল উৎসবের রং নয়, বরং গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন| তাঁর ‘খাজাঞ্চিবাবুর নববর্ষ ‘কবিতায় ˆবশাখী উৎসবের আড়ালে মহাজনের হিসাব-নিকেশ ও সাধারণ মানুষের হতাশা আর আক্ষেপের চিত্র ফুটে উঠেছে | নতুন বছরের নতুন আশার চেয়েও খাজাঞ্চিবাবুর ঘানিটানা জীবনের দীর্ঘশ্বাসমাখা  কাহিনি এখানে বিধৃত হয়েছে| ‘খাজাঞ্চিবাবুর নববর্ষ’ কবিতায় ˆবশাখের হালখাতা ও ˆচত্রসংক্রান্তির জরাজীর্ণ হিসাবের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের বাস্তব দৃশ্য তুলে ধরেছেন|  ˆবশাখ যেমন উৎসব, তেমনি জীবনের  খতিয়ান মেলানোর সময়ও বটে!

বাঙালির গানে-কবিতায় বাংলার নববর্ষ বা পহেলা ˆবশাখ বহুবর্ণিল, কবিদের কাব্য সুষমায় ˆবশাখের রূপ  ফুটে উঠেছে নানান মাত্রায়| আবহমান বাংলার ষড়ঋতুর রূপ ˆবচিত্র্যে মুগ্ধ বাঙালি কবি| তাই,  তাঁদের কাব্যের উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্পে ষড়ঋতুর রূপ-লাবণ্য ফুটে উঠে— সেইসূত্রে ˆবশাখের রূপ ˆবচিত্র্যও চিত্রিত হয় কবিতায় -গানে| বাঙালি সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অনুষঙ্গ বাংলা বর্ষবরণ উৎসব| বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ভাসিত বর্ষবরণ উৎসবে বাঙালি খুঁজে পায় তার শিকড়ের সন্ধান| তাই, বাঙালির বর্ষবরণ— গানে ও কবিতায় মুখরিত|

 

সুমন বনিক, কবি, সম্পাদক-অগ্নিশিখা

 

বাঙালির বর্ষবরণ—কবিতায়-গানে

সুমন বনিক দিনপঞ্জিকায় প্রতিটি মাসের পাতা জুড়ে ৩০/৩১ টি সংখ্যা থাকে| সংখ্যাগুলো একএকটি তারিখ বা দিনের নির্দেশনা দিয়ে থাকে| আমরা সেই তারিখমতো আমাদের কর্মপরিকল্পনা সাজাই

আন্দরকিল্লা সাহিত্য পত্রিকাকে সম্মাননা দিলেন লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ

গত ১১ এপ্রিল ২০২৬ লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ-এর ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সাহিত্য সম্মেলনে আন্দরকিল্লা সাহিত্য পত্রিকাকে সম্মাননা প্রদান করেন| আন্দরকিল্লা সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল আবসার এই সম্মাননা

লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদের ২৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : গত ১১ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদের ২৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সাহিত্য সম্মেলন ২০২৬ উপজেলা  পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়| সাহিত্য সংসদের

সুখ কিনতে কত লাগবে

সাফিয়া নুর মোকাররমা “সুখ কিনতে কত লাগবে?”—প্রশ্নটি শুনতে সরল, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে মানুষের গভীরতম আর্তি| আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা প্রায়ই ভাবি, সুখ যেন