এখন সময়:রাত ২:৩৯- আজ: রবিবার-২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ২:৩৯- আজ: রবিবার
২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

বাতাসের ছুরি

সাদিয়া সুলতানা

১.

তিন দিনের টানা বৃষ্টির পর রোদ উঠেছে। এই রোদ বড়ো কাঙ্ক্ষিত ছিল। নিজের গুরুত্ব বোঝাতে রোদও আহলাদীপনা করে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ডুবসাঁতার কাটে। বৃষ্টিধোয়া গাছের পাতায় সোনারোদ পিছলে পড়ে পাতার বাহার দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমড়া, করমচা, কদম, পেয়ারা, আম, জামসহ নানা জাতের গাছের শোভায় হায়দার আলীর বাড়িটাকে কোনো এক জমিদারের বাগানবাড়ির মতো দেখায়। বিশেষ করে উঠানের করমচা গাছের রূপ এই ভরা বর্ষায় দেখার মতো হয়েছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে করমচার লাল থোকা আর সাদা ফুলের রূপ দেখে আত্মভোলা মানুষও থমকে দাঁড়াবে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে আদরও করে দেবে একবার। যদিও এই বাড়ির কারও কাছেই করমচার আদর-কদর কোনোটাই নেই। অথচ জাহানারার মা ডালে ফোঁড়ন দেওয়ার পর পাঁচ-ছয়টা করমচা দিয়ে ডালে বলক তুললে সেই ডাল দিয়ে অনায়াসে দুই থালা ভাত খেয়ে ফেলা যেত। এই বাড়িতে সেই ডাল রান্না করলে কেউ দাঁতে ভাত কাটবে না।

তাই বলে কি আর জাহানারার খাওয়া বন্ধ থাকবে? এক জামবাটি করমচা ছেঁচে ঘানিভাঙা সরিষার তেল আর কাঁচা মরিচ দিয়ে ভর্তা বানাতে গিয়ে লবণ চেখে চেখেই ভর্তা অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে এসেছে জাহানারা। নিজের কাণ্ড দেখে ওর নিজেরই হাসি পায়। ছেলের বউকে হাসতে দেখে উঠানে দাঁড়ানো নিলুফারও হাসে। পোয়াতী বউটা শখ করে টক ফল খায়। দেখে বুকের ভেতরে সুখ উথলে ওঠে। এই সময়টাই বেশ, যা দেখো হাসো আবার অল্প কিছুতেই কাঁদো।

জাহানারাকে হাসিখুশি দেখে নিলুফার আবদার করে, ‘ও বৌমা, চুলে তেল দিবি না আইজ? উকুন কুটকুট কইরা মাথা খাইতাছে। ভত্তা খাওন শ্যাষ হইলে তেল আর উকুন মারা চিরুনিটা নিয়া কাছে আয়তো দেহি। আর অবেলায় অত টক খাইস না। ভাত খাইতে

পারবি না।’

‘তোমার মাথা উকুনে খায় না গো আম্মা। পাকা চুলের গোড়াত কুটকুট করে। আইতাছি খাড়াও। পাকা চুল বাইছা দিমুনে।’

‘খবরদার ছেমড়ি, আমার চুল পাকার কথা কইবি না! তোর থন ম্যালা চুল কালা আমার।’

শাশুড়ির কথা শুনে জাহানারা হাসিতে ভেঙে পড়ে।

‘হ আম্মা। তুমি তো কচি লাউয়ের ডোগা! মন চায় কচকচ কইরা খাই।’

‘তোর মতো তো কচি শইল আমার! হায়…হায়…ছেড়ি মুরুব্বি মানে না, যা মন চায় কইয়া ফালায়!’

নিলুফারের কপট ভর্ৎসনা শুনে জাহানারার হাসি বাড়তে থাকে। হাসির দমকে হাতের তেলের শিশি ছলকে পরনের শাড়িতে খানিকটা তেল পড়ে যায়। তাই দেখে দুজনে আরও হাসে। যেন এই বাড়িতে একমাত্র হাসিরই সুখরাজ্য।

 

জাহানারার স্বামী ফিরোজ মালয়েশিয়ায় থাকে। বিয়ের পাঁচ মাসের মধ্যেই জাহানারার শ্বশুর হায়দার আলী ফিরোজকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। জাহানারার শাশুড়ি নিলুফার ওকে চুপিচুপি বলেছিল, এটা হায়দার আলীর কূটচাল। ওদের স্বামী-স্ত্রীর নৈকট্য হায়দার আলীকে যাতে অসহায় করে না ফেলে সেজন্যই সে এই ব্যবস্থা করেছে। তবে হায়দার আলীর বিধি নিষেধের তর্জনী জাহানারাকে দিন দিন অতিষ্ট করে তুললেও স্বামী ভিনদেশে থাকায় ও খুব বেশি কাবু হয়নি। বরং দিনভর গৃহস্থালি কাজে ছোটাছুটির পর রাতে ঘুম চোখে স্বামীর রুটিনমাফিক চাহিদা মেটাতে পাঁচ মাসেই জাহানারার হাঁপ ধরে গিয়েছিল। শরীরের সঙ্গে মনের আকর্ষণের বিযুক্তি দুজনের সম্পর্কের মধ্যে কোনো ইতিবাচক কিছুর ইঙ্গিত তৈরি করেনি বলে ফিরোজের চলে যাওয়াতেও জাহানারার হাসির খলবলানি বন্ধ হয়নি।

আরেকটা কথা অবশ্য নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, জাহানারার হাসির ঐশ্বর্যের আরেকটি কারণ হলো ওর শাশুড়ি নিলুফার। প্রিয় সখীর মতো ছায়াসঙ্গী হয়ে যিনি জাহানারার দৈনন্দিন সময়টুকু তরঙ্গময় করে রাখেন। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দুপুরের তেজ মরার পরের সময়টুকু বরাবরের মতো বউ-শাশুড়ি দুজনে উপভোগ্য করে তুলছে। গল্পে, কথায় একে অন্যের কাছে নিজের ভালোবাসার তোরঙ্গ উপুড় করে দিচ্ছে।

 

২.

চোঙা মাইকে নিজের নাম শুনে হায়দার আলী উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। নামটার প্রতিধ্বনিতে কেমন গমগম করে উঠেছে চারপাশ। উপস্থাপক ছেলেটা ভরাট কণ্ঠে অকৃপণভাবে বিশেষণ ব্যবহার করছে। এসব শুনতে শুনতে হায়দার আলীর বুকের ছাতি প্রশস্ত হয়ে যাচ্ছে। হয়তো সামনে অপেক্ষমাণ আমজনতাকেও সেই অনুভব স্পর্শ করে তাই বিশিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী মোহাম্মদ হায়দার আলীর নাম ঘোষণার সাথে সাথে করতালিতে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে।

হায়দার আলী মঞ্চে উঠে বেশিক্ষণ বক্তৃতা দিতে পারেন না। উপস্থিত জনতা ধরে নেয় আবেগে তার কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। যদিও মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর একটা সারসংক্ষেপ তিনি মুখস্থ করে রেখেছেন। কিন্তু আজকাল ছেলেছোকরারা খুব বেশি প্রশ্ন করে। প্রশ্ন কানে তোলার প্রধান সমস্যা হলো, এক প্রশ্নের উত্তর থেকে অন্য প্রশ্নের উৎপত্তি হয়। হায়দার আলী তখন নিজের অপ্রস্তুত ভাব লুকাতে পারেন না। আজ অবশ্য তার প্রস্তুতি ভালো। হাতে রাখা বাদামি ফাইলটা খুলে তিনি তবু একবার চোখ বুলিয়ে লেমিনেটেড সনদটি দেখে নেন।

যুদ্ধদিনের বিশেষ বিশেষ বর্ণনা দিতে গিয়ে আজ তার গলাটা কেমন শুকিয়ে আসছে। বারবার শব্দবিচ্যুতি ঘটছে। মুক্তিযুদ্ধের বদলে গণ্ডগোল শব্দটাও জিহ্বার ডগায় এসে গণ্ডগোল পাকাচ্ছে। ফজরের ওয়াক্তেই কেন যেন বুঝতে পারছিলেন, দিনটা ভালো যাবে না। সকালটাও ভালো করে শুরু হয়নি। সাতসকালে জাহানারার চোখদুটো কেমন রক্তজবার মতো দেখাচ্ছিল। তবে এ আর নতুন কী! হায়দার আলীর কোনো মিটিঙের খবর পেলেই জাহানারার চোখজোড়ায় রক্ত এসে জমা হয়। ওর রক্তচক্ষু ছাপিয়ে আজ ইতিহাস নির্মাণ করা তার জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বয়সও হয়েছে, আজকাল অনেক কিছুই মনে থাকছে না। এই তো আরেকটু হলেই বিশাল একটা ভুল হয়ে যেত। গ্রাম বদলের মতো ব্রিজের নামটাও মুলিপাড়া থেকে কুলিপাড়া হয়ে যাচ্ছিল।

দূর আকাশে উদ্দেশ্যহীনভাবে কয়েকটা শকুন উড়ছে। দুপুরের লাজলজ্জাহীন আলোতে ঝলসে যাচ্ছে চারপাশ। হায়দার আলী এদিক সেদিকে তাকিয়ে কী যেন খোঁজেন। সামনের পরিচিত, অর্ধপরিচিত, অচেনা মুখগুলোর উৎসুক দৃষ্টির সামনে সহসা নিজেকে অসহায় মনে হয়। হায়দার আলী টের পান ঝিরিঝিরি বাতাসে স্মৃতির অণু ভাসছে না, শুধু ভাসছে ছলচাতুরি ভরা শব্দগুচ্ছ।

নিজেকে সামলে নিয়ে হায়দার আলী বলতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এইবার সব কথার ফুল তার বুকপকেটে ঢুকে যায়। মাঝে হায়দার আলীর কণ্ঠ কাঁপে, আবেগের তরঙ্গ ওঠানামা করে। বহু বছর হলো বহু কায়দা করে এমন সব ওঠানামা তিনি রপ্ত করেছেন।

মানুষের মাথার চুল আর বয়সী বটের ছায়া—এই দুই না কি ইতিহাসের সাক্ষী থাকে। নদীর গতিপথেও না কি ছড়িয়ে থাকে ইতিহাসের রঙ। হায়দার আলী এইসব মানেন না। তিনি জানেন কুহকের ছন্দে কী করে ইতিহাস রচনা করতে হয়। দুপুরের তপ্ত বাতাস হায়দার আলীর শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। তিনি আরও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। একসময় স্তোত্রপাঠ শেষ হয়। গলায় ফুলের মালা আর হাতে সম্মাননা স্মারক নিয়ে হায়দার আলী মঞ্চ থেকে নেমে এক মিছিল প্রতারিত মানুষকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলেন। তার সঙ্গে চলে কয়েকজন অন্ধ অনুগামী।

সরষে খেত ঘেঁষে হায়দার আলী হাঁটেন। পাকুরিয়া ময়দান থেকে তার বাড়ি দুই কিলো হাঁটা রাস্তা। দুটো ছেলে ছাতা ধরে তার পাশাপাশি হাঁটছে। এদের সঙ্গে হায়দার আলীর সাবধানী কথোপকথন চলে। আজকাল এত সতর্কতা ভালো লাগে না তার। বয়স বাহাত্তর ছুঁয়েছে। স্থানবদলে খানিক নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। কিন্তু গ্রামের প্রভাব প্রতিপত্তি রেখে শহরে যেতেও মন টানে না। ছেলেটাকে বিদেশ পাঠিয়ে খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেও, নিজের বউ আর ছেলে বউয়ের বেয়াড়াপনা আজকাল সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাড়িতে পা দিলেই দেখা যায় পর্দাপুশিদার বালাই নেই, মাথার কাপড় নেই। একেক জন বাজারি মেয়েমানুষের মতো হাসিতে ঢলে ঢলে পড়ছে।

হায়দার আলী খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। খেতের ভেতরে রাখাল বালকের পেতে রাখা ফাঁদ থেকে করুণ আর্তনাদ ভেসে আসছে। রোজ ভোরে খেতে নামে ঘুঘুর দল। ফাঁদে অসর্তক পা ফেলার সাথে সাথে জালবন্দি হয়ে যায় দুএকটি পাখি। হায়দার আলী দূরে তাকান। দুষ্ট রাখাল বালকের ফন্দি আঁচ করতে পেরে পরিযায়ী পাখির দল সরলরেখায় উড়ে বেড়াচ্ছে। ঐ যে দূরে রুপালি-ধূসর ডানার রূপাচিল। দুর্দান্ত ওড়ে। খেতের কোল ঘেঁষে বারকয়েক খেলনা বিমানের মতো শোঁ শোঁ করে চলে যায় তবু হলদে জমিনের লোভে পড়ে না। ফাঁদে পা দেয় না। বেঁচে যায়।

কী শান্তি! কী শান্তি! হায়দার আলীর মন বিস্তীর্ণ প্রশান্তিতে ভেসে যায়।

৩.

ফুলেরা যখন পরিণতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে তখন তাদের যেমন মলিন ও বিধ্বস্ত দেখায় জাহানারাকেও তেমন দেখাচ্ছে। হায়দার আলীর তবু দয়া হয় না। বরং জাহানারার মলিন জবুথবু মুখটা দেখে তার মনে আগুনের ফুলকি জ্বলে ওঠে। এবার হায়দার আলী এমনভাবে জাহানারাকে মারে যেন জাহানারার কোনো শরীর নেই। চ্যালা কাঠটির ঘূর্ণনে জাহানারার শরীরে দাগ বসে যায় তবু যেন ব্যথা লাগে না। জাহানারার স্তব্ধতা দেখে মনে হয় ওর জাগতিক বোধসমূহ হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। তবু ধরা দিচ্ছে না জাহানারা। একটিবারের জন্যও সৃষ্টিকর্তাকে বা হায়দার আলীকে বলছে না, ‘আমাকে ছাড়েন! রহম করেন!’

হায়দার আলী আর জাহানারার চোখের দৃষ্টিতে আগুন ঘুরপাক খায়। সেই সাথে দুটি মানুষের বিপরীতমুখী অন্তর্জগত আর বহির্জগতের ইতিহাস মুদ্রিত হতে থাকে বাতাসের সমুদ্রে। ঐ সমুদ্রের ঢেউ আচমকা আছড়ে পড়ে জাহানারার মুখে, চোখে, চিবুকে। জাহানারা এবার ফুঁসে ওঠে, ‘ওই হারামি!’

জাহানারার স্পর্ধা দেখে হায়দার আলীর ইচ্ছে হয় আরেকটা চ্যালা কাঠ ভাঙে বেটির শরীরে! ‘বেপদ্দা, বেলেহাজ! আকাইম্মা মাগী!’ গালি দিয়ে সে দুই হাত সক্রিয় করে, তখনই নিলুফার ছুটে এসে তার পা জড়িয়ে ধরে, ‘বৌমারে ছাইড়া দ্যান। আমরা থাকুম না। এই ভিটা ছাইড়া বৌমারে নিয়া চইলা যামু। নরম শরীর, মায়্যাডা বাঁচবো না। এমনেই ছাওয়ালডা দুনিয়ায় আইসাও মইরা গেল। সেই শোকে মায়্যাডার মাথার ঠিক নাই।’

হায়দার আলী গর্জে ওঠে, ‘যা মাগী….তুই যা। তোর বৌমারে আমি এহানেই পুইতা রাখমু। কত বড় সাহস তার! পাড়ার পোলাগো লগে গুজুর গুজুর করে! আমারে ইতিহাস শিখায়! সাম্বাদিক শিখায়!

হঠাৎ জাহানারার কী যেন হয়। হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ায়। যেন খুব জরুরি কিছু একটা মনে পড়েছে। এক ছুটে ও রান্নাঘরে ঢুকে যায়। তারপর বঁটি হাতে বের হয়ে এসে রক্তচোখে গর্জে ওঠে, ‘মা কোনোখানে যাইবো না, আমিও যামু না। তুই যাবি রাজাকার, বেজন্মার বাচ্চা। তোর চক্ষু দুইটা তুইল্লা ফালামু আজ। হারামি। রাজাকার!’

জাহানারা জগতের সব নোংরা শব্দের বিশুদ্ধ ব্যবহার করতে থাকে। সেই শব্দযজ্ঞে বিপন্ন হায়দার আলী পালানোর পথ পায় না। বাতাসের ঘূর্ণিতে শব্দগুচ্ছ পাক খেতে থাকে। হায়দার আলীকে সেই ঘূর্ণি থেকে বের হওয়ার পথও করে দেয় না। অদূরে দাঁড়ানো নিলুফার থরথর করে কাঁপে। ভয়ে। আশংকায়। জাহানারার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে হায়দার আলী।  দুই পা ধরতে খানিক ইতস্ততঃ করে আবার হাত বাড়ায়। জাহানারার হাতে ধরা বঁটিতে রোদের আলো পিছলে যায়।

‘রাজাকারের বাচ্চা! মুক্তিযোদ্ধা হইছস! ভেক ধরস। আইজ তোর ভেক ছুটামু। হারামি রাজাকার!’

শরীরের সব ঘৃণা নিংড়ে জাহানারা গালি দেয়। গালির পুনরাবৃত্তিতে শব্দটার অন্তর্গত ঘৃণা যেন ওর মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরিতে বিরতিহীন আঘাত করতে থাকে। এই জাহানারা সবার অচেনা। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আসন্ন প্রেক্ষাপটের ভয়াবহতা যেন হায়দার আলীর কাছে দৃশ্যমান হয়ে যায়। ভূপৃষ্ঠের অতল থেকে আজ টেনে হিঁচড়ে ইতিহাস বের করে আনবে জাহানারা। তারপর বাতাসের ছুরিতে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিবে হায়দার নিজ হাতে তৈরি ইতিহাস।

‘হারামি রাজাকার, গেরামথন পলাইয়া গেছিলি। মুক্তিগো দাবড়ানি খাইয়া ঠ্যাং ভাঙছোস! এহন ন্যাতা হইছোস, রাজাকারের রাজাকার!’

হঠাৎ থেমে যায় জাহানারা। যেন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেছে। চারপাশ সুনসান হয়ে পড়ে। আঁচলের খুট থেকে চাবির গোছা বের করে জাহানারা ভেতর ঘরে পা বাড়ায়। নিলুফার চমকে পিছু ডাকে, ‘জানারা, জানারা!’ নিষ্প্রাণ কণ্ঠস্বর দ্রুত বাতাসে হারিয়ে যায়। হায়দার আলীর দিশাহারা লাগে। কী হলো! কী হবে! জাহানারার এই রূপ হায়দার আলী কিংবা নিলুফার কেউ কখনও দেখেনি।

রান্নাঘর আর কলঘরের বৃত্ত ডিঙিয়ে নিলুফার কখনও দুই পা সামনে দেয়নি। গ্রীবা উঁচু করে কথা বলেনি স্বামীর সাথে। এত বছরের সংসার জীবনে নিলুফারের সমান্তরাল আচরণের বিপরীত প্রতিমূর্তি আজ হায়দার আলীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

হায়দার আলীর পা সরে না। ঘরের ভেতরের রহস্যময়তা ভাঙার কোনো তোড়জোড় দেখা যায় না তার মধ্যে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহানারা বের হয়ে আসে। এলোকেশে জাহানারাকে ঝড়ের মতো দেখায়। ওর হাতের সবুজ রঙের ফাইলটা দেখে হায়দার আলী শেষবারের মতো গর্জে ওঠার চেষ্টা করে। পারে না। ফাইলটা নিয়ে জাহানারা চুলার পাড়ে গিয়ে বসে। ওর চোখে মুখে কোমল অহংকার একটা ফুটে ওঠে। বোধ বিলুপ্ত হায়দার আলী মুহুূর্তেই বুঝে যায় কী ঘটছে যাচ্ছে। তার ইচ্ছে হয় ছুটে যায়। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবে হায়দার আলীর দুই পা চোরাবালিতে গেঁথে যায়। কুলকিনারাহীন বিহ্বলতায় সে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। শেষ চেষ্টা হিসেবে একবার হয়তো পা বাড়াতে চায়। কিন্তু ততক্ষণে বাতাসের ঘূর্ণিতে ধানে একাকার হওয়া সুবাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে হায়দার আলীর লেমিনেটেড সনদের পোড়া গন্ধ জুড়ে যায়।

 

সাদিয়া সুলতানা : কথাসাহিত্যিক, দিনাজপুর

বাংলাদেশের জন্ম ও বঙ্গবন্ধু: কিছু অনুমান, কিছু প্রশ্ন কিছু অনস্বীকার্য সত্য

আবু মকসুদ   বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশ চাওয়া’ বা ‘স্বাধীনতা চাওয়া’ নিয়ে কখনোই কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। কিন্তু ইতিহাসকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টার

মাহরাং বালুচ বেলুচিস্থানের শেখ মুজিব!

ফজলুল বারী   বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেত্রী ডা: মাহরাং বালুচ আজ বঙ্গবন্ধুর মতোই পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিনী। মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন

গল্পটি রুনা আখতারকে নিয়ে

রুনা আখতার আমাদের কারখানায় অপারেটর থেকে সুপারভাইজার পদে পদোন্নতি পেয়েছে। পদোন্নতি একটি নিয়মিত বিষয়— অনেকেরই হয়। কিন্তু রুনার গল্পটি আলাদা।   এই পদোন্নতি তাকে এতটাই

আন্দরকিল্লা : আলোকিত জীবনের রূপরেখা

ধীমান বড়ুয়া কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীদের আন্তরিকতায় আপনার নিয়মিত প্রকাশনাগুলো আমার হাতে পৌঁছে যায়, আর আমি প্রতিবারই নিজেকে একজন কৃতজ্ঞ ও মুগ্ধ পাঠক হিসেবে আবিষ্কার করি।

বিশ বছর পর বাংলায় ফিরছেন তসলিমা

রোখসানা ইয়াসমিন মণি সাহিত্যের ইতিহাসে বহু লেখকই সময়ের স্রোতে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু কিছু মানুষ জন্মান কেবল লেখার জন্য। তসলিমা নাসরিন সেই ধারারই এক সাহসী