নাজমুল হুদা
কখনো জ্যোৎস্নালোকিত খোলা আকাশের নিচে একলা শুয়ে অসীম নীলের নক্ষত্রপুঞ্জ দেখেছেন? কী মনে হয়? অসংখ্য তারার মাঝে অতল গহ্বরে ঝাপ দিয়ে কোথাও গভীরে পড়ে যাচ্ছেন? কিংবা অন্তহীন প্রসারিত পথ হেঁটে হেঁটে নিরুদ্দিষ্ট কোনো গন্তব্যে পৌঁছে যাবার চেষ্টা করছেন? কিংবা গ্রামীণ মেঠো পথ একাকী অতিক্রমকালে গা ছমছম করে ওঠে কি আপনার কখনো কোনো অজানা ভাবনায়? অনুভূত হয় কি যে কেউ হয়তো নিঃশব্দে আপনাকে অনুসরণ করছে? এই যে মনের অজান্তে বা অবচেতন মনে পথপরিক্রমার যে চলচ্চিত্র বা কাহিনি অবচেতনভাবে রচনা করে চলেছেন, তার উৎস কারো কাছে কোনো গল্পের কল্পিত রূপ, অথবা আপনার ˆশশবে কোনো গল্পেরই ধারাবাহিকতা| জীবনের যে পর্যায়েই যেভাবে আমরা চলি না কেনো মিথের একটি জগত সকল অবস্থায় আমাদের ভেতরে বুনে-রাখা গল্পের কাঠামো দিয়ে পরিচালনা করে থাকে| সচেতনভাবে আমরা তা বুঝি না| মনে হয় এ আমাদের নিছক মনের ভুল বা আকাশ কুসুম কল্পনা|
মিথ বা কাল্পনিক কাহিনি আসলে কী? মিথ হলো রূপক| মিথের আভিধানিক অর্থ ‘দেবদেবীগণের কাহিনি’| শুনেই বোঝা যাচ্ছে, এ হলো প্রাচীন বা আদিম ব্যাপার| মিথ আদিম মানুষের জীবনযাপনের বিজ্ঞান| আদিম মানুষ মিথ অর্থাৎ দেবদেবতার কাহিনি বা অতিন্দ্রীয় শক্তির কাহিনি রচনা করেছিলো চারপাশে ঘটে যাওয়া আপাত ব্যাখ্যাহীন বিষয়/ঘটনাকে ব্যাখ্যা করবার জন্য| সেজন্য মিথকে আদিম মানুষের দর্শনও বলে থাকেন কেউ কেউ| দেবদেবীর কাহিনির সাথে কেন মিথের সামঞ্জস্য? যেহেতু মানুষ মনে করতো দেবদেবীগণ বিশেষ বা সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী, যা তারা কল্পনা করতো এবং ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করতো, তাদের কর্মপদ্ধতিই প্রকৃতি ও মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে|
মিথ মানুষের মধ্যে তার অজান্তেই জন্ম নেয়; অবচেতনভাবে প্রভাবিত করে| মানুষের ভেতরে পরম আনন্দের বোধ ও অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়| এটি মূলত কাহিনি; আরো বিশদভাবে বললে কল্পকাহিনি— আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, অগ্রসর মানুষ মনে করে মিথ আদিম মানুষের বিজ্ঞান যা তারা ব্যবহার করতো আপাত অলৌকিক ঘটনা ব্যাখ্যা করবার জন্য| আধুনিক সময়ে অনেকেই মিথকে পশ্চাদপদ সমাজের বর্বরদের কাহিনি হিসেবে দেখে| মিথতাত্ত্বিক জোসেফ ক্যাম্পবেল মিথকে দেখেন জীবনযাপনের সুশৃঙ্খলতার উপাদান হিসেবে, আনন্দের উপাচার হিসেবে, জীবনকে প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তি হিসেবে| এই যে মানুষ ধর্মভেদে সৃষ্টিকর্তার একত্বে বা বহুত্বে বিশ্বাস করে— এর পেছনে রয়েছে ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাস| তবে ক্যাম্পবল মনে করেন এ স্রষ্টার একত্ব ও বহুত্বের বিশ্বাস, ধর্মাচারের ভিন্নতা ও উৎসবের প্রকৃতি এসবের পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক মিথ| এ মিথ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে অনাদি কাল থেকে| এই যে ঈশ্বর, ধর্ম কিংবা দেবদেবীর কাহিনি— সবই মিথের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন ক্যাম্পবেল | এক ধর্মের মানুষের কাছেও অন্য সকল অলৌকিক ধর্মীয় কাহিনিকে মিথ বলে মনে হয় মূলত ঐ সকল কাহিনির আপাতবাস্তবতা বা যুক্তিগ্রাহ্য বৈশিষ্টের অনুপস্থিতির কারণে| অথচ ধার্মিক ব্যক্তিমাত্রেই তা হৃদয়ে ধারণ করে কোনো প্রকার সন্দেহ ছাড়াই|
মিথের উৎস হচ্ছে পরিবার, সমাজ, ভৌগোলিক অধিক্ষেত্র, সংস্কৃতি, জীবনধারা, সঙ্গীসাথী ও শিক্ষাদীক্ষা| একই পরিবেশ ও শিক্ষায় ব্যক্তির মিথিয় ধারণা ভিন্ন ও ˆবচিত্র্যময় হতে পারে| এও নির্ভর করে প্রতিবেশ, ধর্মাচারণ ও বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে| ব্যক্তি মানুষ ও সমাজের গভীরে যে মিথের জন্ম, মানুষ তার জীবদ্দশায় বা যৌবনের চরম বিদ্রোহাত্মক চেতনার সময় উত্তরণের ক্ষমতা রাখে না| মনের অজান্তেই নানা বিষয়ে ও ঘটনায় পরিচালিত হয় নানা রকম মিথ দ্বারা যা হয়তো সে সচেতনভাবে বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে পারে না| মানুষের মন যদিও নতুন কোনো মিথভঙ্গ জ্ঞান লাভ করে, তার হৃদয়ের গভীরে দাগ কেটে অবস্থান নেয় পুরোনো মিথ যা সে ˆশশবে হৃদয়ে ধারণ করে জীবনযাপন করে আসছে| হৃদয়ের সর্বোচ্চ ও গভীরতম পর্যায় হলো আত্মা যা আবেগের অনুভূতি জড়ো করে তৃপ্তি বা অতৃপ্তির ধারণা নির্মাণ করে| এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে অনুভূতির মিথ| জীবনে এর প্রভাব সুগভীর এবং অন¯^ীকার্য|
বিখ্যাত মিথতাত্ত্বিক জেমস ফ্রেজার মনে করেন, ‘মানুষ ˆনর্ব্যক্তিক জাদুবিদ্যার ভিত্তিহীন নিয়মনীতি অবল¤^ন করে জীবনযাত্রা শুরু করেছিলো| যখন তারা উপলব্ধি করলো যে এসব নিয়মনীতি কাজ করে না, তখন তারা ব্যক্তিগত দেবতা, যা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে অবল¤^ন করে, ফলে জন্ম হয় ধর্মভিত্তিক মিথের| ইতিমধ্যে যে সকল ম্যাজিকধর্মী ধর্মকৃত্য লোকজন পালন করে এসেছে অত্যাবশ্যকভাবে, তা তারা মিথধর্মিতার কারণে পুনরাবৃত্তি হিসেবে লালন করতে থাকে|’ তবে তিনি এও মনে করতেন যে বিজ্ঞান মিথকে এক সময় অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছিলো| অর্থাৎ যুক্তির কাছে হেরে যায় মিথ|
মানুষকে মিথ অনুসরণ করতে হবে কেন? মিথ অনুসরণ না করেও আপনি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবেন— কোনো সমস্যাই হবে না| তবে মিথের নানা উপাদান, আচার ও বিশ্বাস জীবনকে আপনার অজান্তে ভরিয়ে তুলবে পরম আনন্দে| আপনার নিজের মনকে অবসরের শান্তিময় সময়টুকু দিয়ে কল্পনার ও সুখের ঘটনা দিয়ে জীবনে সত্যিকার পরিবর্তন না এনেও, সুখে, বলা ভালো পরম সুখে, ভরিয়ে তুলতে পারবে| মনের ভেতর অনাবিল শান্তি থাকলে চারপাশে আপনি আবিষ্কার করবেন অনাবিল সুখের ফল্গুধারা| প্রকৃতিতে আবিষ্কার করবেন অলৌকিক ও ঐশীবৈশিষ্ট সম্পন্ন ঘটনাবলি|
প্রাচ্যের মিথলজি বা মিথের কাহিনি মূলত অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য কাহিনিতে ঠাসা| শনি-মঙ্গল বারের মিথ, ঝাড়ু-জুতার মিথ, সকাল-সন্ধ্যা-রাত্রি, নান রঙ ও প্রকৃতি, আকাশ, মেঘ, পশু— ইত্যকার নানরূপ চিত্র, প্রতীক বা লক্ষণ নির্মাণ করে শূভ অশূভের ধারণা; নানা ধরণের মিথের জন্ম দেয়| ভবিষ্যত নির্ধারণ করে দেয় প্রকৃত ফলাফলে আগেই|
মিথের কাহিনির রয়েছে নানা রকম ক্ষমতা, আকার-প্রকার, বয়স, চেহারা অনুযায়ী আলাদা ˆবশিষ্ট্যসম্পন্ন চরিত্রও| প্রাচ্যের মিথ আবার প্রতীচ্যের মিথ থেকে আলাদা| যেটা গ্রীক মিথলজির দেবতা জিউস, নর্স বা রোমান বা প্রাচ্যের অন্য কোনো পুরুষ দেবতা বা দেবী চরিত্র, তার মধ্যে নানা প্রকার অভ্যন্তরীন সামঞ্জস্য বা মিল রয়েছে| ফরাসি দার্শনিক ক্লদ লেভি-স্ত্রদ এই মিলসমূহ খুঁজে বের করে সমিল ˆবশিষ্ট্যের অধিকারী মিথীয় চরিত্র দেখতে পান| সেগুলির প্রভাবিত করার ক্ষমতার মিলও লক্ষ্য করেন| আর এ মিল বা তুলনামূলক ব্যাখ্যা করার প্রক্রিয়ার নাম দেন তিনি কাঠামোবাদি মিথ চর্চা|
মিথকে ইতিহাস বলা যায় না| ইতিহাসের মতো মিথের ঘটার সময়, কাল, পাত্র নির্ধারিতভাবে উল্লেখ করা যায় না| বিজ্ঞান দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায় না| ফলে মিথ এ সকল কোনো প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি বাতিল বা অবল¤^ন না করেই নিজের মতো ব্যাখ্যা ˆতরি করে| জন্ম হয় লেজেন্ড বা অবিশ্বাস্য ক্ষমতার চরিত্রের, ঘটনার বা চর্চার যা ঐতিহাসিকভাবে সত্য বলে গণ্য হয় না, প্রয়োজনও পড়ে না| মিথ ব্যাখ্যায় প্রতীক, রূপক ও চিহ্ন ব্যবহারও লক্ষণীয়| মিথ হলো এমন এক ধরণের প্রতীক যা নির্দেশ করে আধ্যাত্মিক শক্তি যা মানুষের জীবনে ক্রিয়াশীল| দেশে দেশে নানা ধর্মের মানুষ দেবতা গড়ে প্রতীক হিসেবে— নিজেকে দেখতে চায় দেবতার শক্তিরূপে| মানুষ তার ক্ষমতা ও ধারণা দিয়ে নিজের ক্ষমতার প্রতীক রচনা করে দেবতা বা দেবী মূর্তির মধ্য দিয়ে| এই প্রতীক বা শক্তি মানুসের সাথে কথা বলে| কৃষি সংস্কৃতির স্থানে ‘মা’ কাজ করে চমৎকার একটি শক্তি বা শক্তির প্রতীক হিসেবে| কমনীয় বা কোমল রূপের যে কোনো প্রাকৃতিক উপাদান যাতে মায়ের মতো আদরণীয় ঐশ্বর্যের ছোঁয়া রয়েছে, তাকে মানুষ তুলনা করে ‘মা’ প্রতীকের মাধ্যমে| নদী, দেশ, গাছ বা নানা উপকারী প্রাণী, বা চাঁদ অথবা যানবাহন পরিণত হয় মানুষের কাছে মাতৃ-প্রতীকে, মা-এর মিথে|
প্রাণী পোষ মানানোর পর থেকে মানুষের মধ্যে আদিম যুগে দেখা যায় মিথের পরিবর্তন ও রূপান্তর| বন্যপ্রাণীর যে চারিত্র ও মিথ মানুষের মনে এতদিন ছিলো পোষ মানানোর মধ্য দিয়ে তার রূপান্তর ঘটে| বণ্যতা লোপ পেলে মানুষের মনের মিথও বদলায়, পরিণত হয় বন্ধুত্বের বা আপনজনের অবয়বের মিথে|
মিথ ও ইতিহাসের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন| ইতিহাস নির্দিষ্ট সময়ের ফ্রেমে বাঁধা কিন্তু মিথ পুনরাবৃত্তিমূলক| এটি প্রতিটি উৎসব ও সংস্কৃতিকে দেখা যায়, দেখা যায় ধর্মাচরণে, সাহিত্যে, সিনেমায় ও গানে| যেমন—বাংলার সংষ্কৃতিতে বেদের মেয়ে জোছনা, বেহুলা-লাখিন্দর, মনসা বা ডালিম কুমার বা পঙ্খিরাজ ঘোড়া— এসবের কোনো ঐতিহাসিক বাস্তবতা নেই| তবু এ সকল রঙিন কল্পনার কাহিনি আমাদের ˆশশবে আমাদের মনের গহীনে ডানা বিস্তার করে আমাদের বিভোর করে রাখতো, জন্ম দিতো সুখানুভূতির, বা ভয়ের ও কষ্টের| আমাদের কল্পনার ও বিশ্বাসের, সাহিত্যের বা সংস্কৃতির অংশ হয়ে এ সকল মিথ আমাদের ভাবিত করে, প্রভাবিত করে, আন্দোলিত করে এবং আমাদের মানসলোককে প্রশিক্ষিত করে ভাবনার জগৎকে প্রসারিত করতে| আমাদের পরম গোপনে আনন্দিত করে বা দুঃখবোধে জর্জরিত করে এবং আমাদের মধ্যে লালনপালন করে মানবীয় গুণাবলির| সমুদ্রের গর্জন, বা জোছনারাতের প্রকৃতি বা অন্ধকারের চেতনা, বা ঘুমের ভেতরের ¯^প্ন আমাদের মধ্যে ভিন্নভিন্ন ভাষার সৃষ্টি করে, গভীর অনুভূতি প্রদান করে এবং আমাদের চিন্তা ও চেতনায় বসতি গড়ে আমাদের ভাবনার শক্তিকে প্রতিনিয়ত রাখে জাগরুক| মিথের শক্তি এমনই প্রচণ্ড রকম|
বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে মিথের বাস্তবতা ব্যাখ্যাযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য না হলেও মিথ জুড়ে আছে আমাদের জীবনে| সবকিছু পঞ্চ ইন্দ্রীয় দিয়ে ব্যাখ্যা করে বা সময়ের অনুদার চামচে মেপে মেপে জীবন যাপন করতে হবে এমনই ব্যাকরণ জীবন মানে না| যৌবনের অমিত তেজ শেষে বার্ধক্য নেমে এলে, জীবন চায় নির্জনতা—— গভীরভাবে ভাববার জন্য, ˆশশবের স্মৃতি জাবর কেটে সময়েঅসময়ে জীবনে ফেলে আসা সময়ের অবোধ্য আনন্দ উপভোগ করার জন্য| ক্লান্ত আত্মার কাছে এ সময়ে ভালো লাগে গ্রামের নির্জনতা, প্রকৃতি, সবুজঘেরা বনানী, কল্পনা ˆতরি করবার মতো পরিবেশ, বা ˆশশবের কৈশোরের চেনা জায়গা আর মানুষ| জীবনের ক্ষতি করে না মিথ | বরং চিন্তা-¯^প্ন-ভাবনার দিগন্ত করে প্রসারিত, ˆতরি করে ভাবাবেগ, সৃষ্টি করে নতুন ¯^প্ন| হাঁট করে খুলে দেয় মনের বন্ধ জানালা| উন্মেচিত হয় নতুন নতুন বোধের ও ভাবনার দরোজা| মানসলোকে ধরা দেয় নতুন নতুন দিগন্ত| মিথ জীবনকে ভরিয়ে তোলে অনাবিল সুখের অনুভূতিতে যার প্রয়োজন জীবনকে অনুভব করতে অন¯^ীকার্য|
নাজমুল হুদা, আলোকচিত্রী, কবি ও প্রাবন্ধিক




