এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

হুমায়ুন আজাদ ও তাঁর কবিমানস

আনোয়ার মল্লিক

হুমায়ুন আজাদ (জন্ম-২৮ এপ্রিল, ১৯৪৭ খ্রি., মৃত্যু-১২ আগস্ট, ২০০৪)-এর অনেক পরিচয় আছে। একাধারে তিনি শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, গবেষক, ঔপন্যাসিক ও ভাষাবিদ। শিশু-কিশোর সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ আছে। তবে এতোসব পরিচয় পেছনে ফেলে তিনি তাঁর কবি পরিচয়টাকেই প্রধান মনে করতেন। তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন সেই সময় থেকেই তিনি কবিতার প্রতি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। কালের বিচারে তিনি ষাটের দশকের কবি। বাংলা কবিতা তিরিশি কাব্য আন্দোলনের পর চল্লিশ পেরিয়ে পঞ্চাশের দশকে এসে প্রকৃত আধুনিক হয়ে ওঠে যার কেন্দ্র ছিলো ঢাকা। এ দশকেই আবির্ভূত হন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরি প্রমুখ আমাদের প্রধান আধুনিকেরা। ষাটের দশকে আরেক ঝাঁক মেধাবী কবির দেখা মেলে যেমন আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা প্রমুখ। ষাটের দশকের কবি হলেও এদের মধ্যে একমাত্র আবদুল মান্নান সৈয়দ ছাড়া এই দশকে আর কারো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। সৈয়দের প্রথম বই ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। বাকি সবার কবিতা গ্রন্থবদ্ধ হয়ে আত্মপ্রকাশ করে সত্তরের দশকে। ষাটের কবিগণের একটা সৌভাগ্য হলো, আধুনিক বাংলা কবিতার একেবারে তৈরি করা জমিনে এসে তাঁরা কবিতা লিখতে শুরু করেন। এছাড়া বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, স্বাধিকারের চেতনা, সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে তাঁরা ধারণ করেছেন। ফলে তাঁদের কবিতা যেমন বিষয়-বৈভবে এবং প্রকরণগতভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তেমনি কবিতায় উঠে এসেছে মানুষের মুক্তি এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও গৌরব। তৎকালীন এরূপ প্রেক্ষাপটে হুমায়ুন আজাদের আবির্ভাব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন। ছাত্র অবস্থায়ই কবিতাসহ সাহিত্যের নানা বিষয়ে তাঁর লেখালেখির সূচনা হয়। ১৯৬৮ খ্রি. থেকে ১৯৭২ খ্রি. পর্যন্ত লেখা কবিতা নিয়ে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অলৌকিক স্টিমার’।

 

মোটা দাগে স্বদেশ, প্রকৃতি, প্রেম এবং সমকালীন বোধ তাঁর কবিতার প্রধান অন্বিষ্ট। এছাড়া তাঁর কবিতায় সন্তান বাৎসল্য, স্মৃতিকাতরতার প্রকাশ দেখা যায়। কবিতায় তিনি প্রবলভাবে সৌন্দর্যপিয়াসী। আজাদের কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি যা বলতে চান, তা প্রবলভাবে বলেন, তীব্রভাবে বলেন। এ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব স্বীকারোক্তি: “অন্যদের সাথে আমার কবিতার পার্থক্য এর তীব্রতা, এর সৌন্দর্যতা, এর কবিত্ব। তাদের সাথে আমার ভিন্নতা বিষয়ে, ভাষায়, সৌন্দর্যের তীব্রতায়, শিল্পকলাবোধে।” অবশ্য শুধু কবিতার ক্ষেত্রেই নয়, তাঁর অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যেও এই তীব্রতা লক্ষ করা যায়। এবং এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এই তীব্রতা তাঁর কবিতাকে অনেক ক্ষেত্রে লঘু করেছে এবং কবিতার রহস্যময়তার অন্তরায় হয়েছে।

 

‘অলৌকিক স্টিমার’ কাব্যে আজাদের বিচিত্র বিষয়ে কবিতা রয়েছে।

এই গ্রন্থের প্রথম এবং দ্বিতীয় কবিতা যথাক্রমে ‘আমার সন্তান’ এবং ‘আমার কন্যার জন্যে প্রার্থনা’। গ্রন্থের একেবারে শেষের দিকে আরেকটি কবিতা আছে ‘খোকনের সানগ্লাস’। কবিতাগুলো হুমায়ুন আজাদ যখন লিখেছেন তখনও তিনি বিয়ে করেননি। এখানে সন্তানের রূপকে তিনি সমকালীন সমাজ বাস্তবতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

যেমন আমার সন্তান কবিতায় তিনি বলেন, “আমার সন্তান যাবে অধঃপাতে,চন্দ্রালোক নীল বন/ তাকে কভু মোহিত করবে না।/কেবল হোঁচট খাবে/রাস্তায়/ সিঁড়িতে/ড্রয়িংরুমে/সমভূমি মনে হবে বন্ধুর পাহাড়/উল্টে পা হড়কে পড়ে যাবে/নিচে/আরো নিচে/ময়লায়/ড্রেনে/” (আমার সন্তান, অলৌকিক স্টিমার)।

 

উদ্ধৃত স্তবক একটা বৈরী সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘আমার কন্যার জন্যে প্রার্থনা’ কবিতাও একটা বিরূপ বাস্তবতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরছে। উদাহরণ: “আমার কন্যার ঘর ভেঙ্গে যাবে প্রাত্যহিক সামান্য বাতাসে।/তবুও সে কাঁদবে না, কেননা সে কাঁদতে শেখেনি,/হে আমার বন্ধ্যা কন্যা,অন্য কোনো হাত/তোমাকে কি তুলে নেবে মধ্যরাতে ভাসমান উৎসব স্রোত থেকে?” (আমার কন্যার জন্যে প্রার্থনা)।

 

তবে ‘খোকনের সানগ্লাস’ কবিতার প্রেক্ষাপট আরো বিস্তৃত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রতীকী ব্যঞ্জনায় এই কবিতায় উপস্থাপিত হয়েছে। খোকন এখানে বাংলাদেশের স্পর্ধিত, মুক্তিকামী যৌবনের প্রতীক। সানগ্লাসের রঙিন কাচের ভেতর দিয়ে সবকিছু সুন্দর দেখায়। সানগ্লাস এখানে মুক্ত স্বদেশের অনিন্দ্য সুন্দর রূপের প্রতিচ্ছবি। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য লক্ষ খোকন নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলো। ‘খোকনের সানগ্লাস’ কবিতায় অসাধারণভাবে এ দেশের সাহসী যৌবনের প্রতীক হিসেবে খোকনকে তুলে ধরা হয়েছে।

 

“খোকন তো বেড়ে উঠতো বিদ্রোহী বৃক্ষের মতোই।

ওর বাহু বৃক্ষরাজের বলিষ্ঠ শাখার মতো নভোমুখি,নানান তরুবর মৌলিল,

আকাশে লাগতো তার ডাল। কখনো খোকনকে মনে হতো

মেঘলোকে যুবরাজ আলবাট্রস,সমুদ্রের গারো নীল আকাশের স্বাদ পান করে

অজর অমর হতে পারতো খোকন, আমার খোকন।” (খোকনের সানগ্লাস)।

কবিতাগুলো শৈল্পিক মানেও উত্তীর্ণ, বিশেষ করে ‘আমার কন্যার জন্যে প্রার্থনা’ এবং ‘খোকনের সানগ্লাস’।

 

কবিতা কেন লেখেন এই প্রশ্নের উত্তরে হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘আমি আমার পক্ষীকুলকে ভালোবাসি, আমি আমার নদীগুলোকে ভালোবাসি। তাই কবিতা লিখি।’ এই কথার প্রমাণ মেলে তাঁর অনেক কবিতায়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রূপময়তায় তিনি প্রবলভাবে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। এদেশের বৃক্ষ, নদী, পাখি, জ্যোৎস্নার সৌন্দর্যের কথা তিনি বিভিন্নভাবে উচ্চারণ করেছেন। উদাহরণ:

 

“ আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো/ছোট্ট ঘাসফুলের জন্যে/একটু টলোমলো শিশির বিন্দুর জন্যে/আমি হয়তো মারা যাবো চৈত্রের বাতাসে/উড়ে যাওয়া একটি পাপড়ির জন্যে/একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে।” (আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে, কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু)।

 

আমরা লক্ষ্য করি, আজাদের প্রথম কাব্য ‘অলৌকিক স্টিমার’-এর বেশ কিছু কবিতায় পরাবাস্তব আবহ আছে, বিশেষ করে সৌন্দর্য বন্দনামূলক কবিতাগুলোতে। যেমন ‘জ্যোৎস্নার অত্যাচারে’ কবিতায় দেখি জ্যোৎস্নার আলোয় ড্রেন, ডাস্টবিন সব পদ্মের মত ফুটে উঠেছে, সাইরেন হয়ে গেছে সানাইয়ের সুর। ‘বিবস্ত্র চাঁদ’ কবিতায় চাঁদকে দেখেছেন তিনি নারী রূপে। বিভিন্ন জন সেই নারীর ভিন্ন ভিন্ন উপকরণ যেমন ব্রা, পেটিকোট, শাড়ি, খোঁপার কাঁটা, এমনকি ব্যবহৃত চটিজোড়া খুলে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কবি নিয়েছেন পুরো চাঁদকেই।

 

“আর পাছপকেটে পুরে আমি শয্যাকক্ষে

নিয়ে এলাম ওই চতুর্দশী বিবস্ত্র চাঁদকে।”

 

‘বিবস্ত্র চাঁদ’ কবিতায় কল্পনা আর সৌন্দর্যপ্রিয়তার অভিনব এক প্রকাশ ঘটেছে। আরেকটি অপূর্ব কবিতা ‘বেহালা’। কবি বলছেন, শোকেসে বন্দি একটা বেহালা কোনো তন্ত্রী, ছড় ছাড়াই হাজার বছর ধরে একাকী বেজে চলেছে। অথচ তার কোনো অস্তিত্ব নেই। মূলত কবির হৃদয়তন্ত্রীতে বাজে এই মায়াবী সুর। এই অনন্ত পৃথিবীতে সুর আর সৌন্দর্যের একটা সহাবস্থান। ‘বেহালা’ কবিতায় সেই ইঙ্গিতই কবি দিতে চেয়েছেন। ‘স্টেজ’ কবিতায় এক গভীর জীবন-সূত্র ধরা পড়েছে। আপাত হাসিকোলাহলে বয়ে চলা জীবনের গভীরে রয়েছে বিষাদের এক মায়াজাল। মানুষ নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যের মুখে হাসি ফোটায়। ‘স্টেজ’ কবিতার সঙ্গে আবুল হাসানের বিখ্যাত ‘ঝিনুক নীরবে সহো’ কবিতার একটা সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

 

“নাচো,নাচো,হে নর্তকী, এই বক্ষে, এই স্টেজে নাচো চিরদিন,/তোমার সৌন্দর্য সব দর্শকের,স্টেজের ভাগ্যে থাক বিষ,/তবুও সে অভিযোগ তুলবে না, একবিন্দু, তৃণসম ক্ষীণ,/স্টেজের কাম্য শুধু পদাঘাত- হাহাকার, বিষ অহর্ণিশ।” (স্টেজ, অলৌকিক স্টিমার)।

 

হুমায়ুন আজাদের বিচিত্র বিষয়ে ভাবনা এবং আগ্রহ ছিলো। তিনি শুধু কবি ছিলেন না। সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়ও তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। ভাষাবিদ হিসেবে তাঁর কাজ বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সাহিত্য সমালোচক এবং গবেষক হিসেবেও তিনি নন্দিত। তাঁর রচিত ‘নারী’ গ্রন্থের জন্য তিনি যেমন অভিনন্দিত হয়েছেন, তেমনি সরকারি নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে বইটি। ঔপন্যাসিক হিসেবেও তিনি খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। ১৯৯২ সালে ‘প্রবচন গুচ্ছ’ নামে হুমায়ুন আজাদের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। সংকলনটি তৎকালীন সময়ে একইসাথে তুমুল আলোচিত এবং সমালোচিত হয়। এই বহুমাত্রিকতা তাঁর প্রবল মনীষার প্রমাণ, সন্দেহ নেই। কিন্তু এর ফলে তাঁর কবিতার ক্ষতি হয়েছে। কবিতা যে নিরবচ্ছিন্ন মনঃসংযোগ দাবি করে, সেই দাবি তিনি মেটাতে পারেননি। কবিতায় তিনি প্রচুর উপমার ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ব্যবহৃত উপমার আতিশয্য কবিতার সৌন্দর্যকে অনেক ক্ষেত্রে ম্লান করে দিয়েছে। তাঁর কবিতায় মেধা এবং মননের ছাপ আছে, সৌন্দর্য এবং কল্পনার বিস্তার আছে, কিন্তু সবগুলো এক সূত্রে বেঁধে কম ক্ষেত্রেই সফল শিল্প সৃষ্টি হয়েছে। তবে একটা কথা অবশ্যই স্বীকার্য যে, কবিতায় তিনি একটা স্বকীয়তা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।

 

আজাদের মোট কাব্যগ্রন্থ সাতটি। কোনো একক বিষয় দ্বারা যদি গ্রন্থগুলোকে শনাক্ত করতে হয়, তা হলো প্রেম। তিনি নানাভাবে, নানা ভঙ্গিমায় এবং বিচিত্র অনুভবে প্রেমকে কবিতায় ধারণ করেছেন।

‘তুমি যদি আসো’ কবিতায় প্রেমিকাকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, “তুমি যদি আসো তবে এ-শহর ধন্য হবে।জ্বালবে/ মোমবাতি/ সব গাছে মসজিদে এভেন্যুতে গোলাপ পাপড়িতে।”

 

আবার ‘তরুণী সন্ত’ কবিতায় প্রেমিকার প্রতি ঝরে পড়েছে প্রবল অভিমান।

“তুমি তো তাকাও সব দিকে;তুমি শুধু আমার মুখের দিকে,/মানুষের দুরূহতম দুঃখের দিকে,এক শতাব্দীতে/একবারো-ভুলেও-তাকালে না।”

 

প্রেমিকার কাছে কবি বেশিকিছু চান না। তাঁর চাওয়া খুবই অল্প। প্রিয় নারী শুধু তাঁর দিকে একবার তাকালেই তিনি ধন্য। ভালোবাসা কত তীব্র হলে এরকম বলা যায়—

 

“একবার তাকাও যদি পুনরায় দৃষ্টি ফিরে পাবো।/বড়োবেশি ছাইপাশ দেখে দেখে দুই চোখে ছানি পড়ে গেছে-/যদি চোখ ফিরে পাই তবে শুধু একবার তাকাবো/তোমার মুখের দিকে,তারপর অন্ধ হয়ে যাবো।” (একবার তাকাও যদি, আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে)।

 

হুমায়ুন আজাদ তিরিশি আধুনিকতার উত্তরাধিকার বহন করেছেন মেধায়, মননে এবং সৃষ্টিতে। তিরিশের কবিগণ শুধু কবিতার বিষয়, আঙ্গিক, প্রকরণে পরিবর্তন এনেছেন তাই নয়, তাঁরা রেনেসাঁ পরবর্তী ইউরোপের আলোকিত জীবন দর্শনকে প্রবলভাবে ধারণ করেছিলেন। সুতরাং কবিতার বাইরে গিয়ে তিরিশের কাব্য আন্দোলন জীবন-বোধকেও পাল্টে দিয়েছিলো। আজাদ পরিপূর্ণভাবে সেই বোধকে ধারণ করেছিলেন।

 

কবিতা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য-

“চূড়ান্ত অর্থহীনতাকে অর্থজ্যোতির্ময় করার জন্যেই দরকার কবিতা, এবং কবিতাই দরকার। ঝিনুক তার ব্যাধিকে রূপান্তরিত করে মুক্তোয়, কবিতাও মহাজাগতিক নিরর্থকতাকে জ্যোতির্ময় মুক্তোয় রূপান্তরিত করার রসায়ন।” (ভূমিকা, শ্রেষ্ঠ কবিতা)।

 

আজাদ ছিলেন প্রবলভাবে দেশপ্রেমিক। ‘ব্লাড ব্যাংক’ এবং ‘আমার ছাত্র ও তার প্রেমিকার জন্যে এলেজি’ শীর্ষক দুটি অনবদ্য কবিতায় এদেশের মানুষের জীবনযাপন, সংগ্রামী চেতনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য আত্মত্যাগকে চিত্রিত করেছেন। স্বদেশের বন্ধ্যাত্ব এবং দুর্দশায় তিনি ব্যথিত, বিষণ্ন। তিনি বলেন—

 

“আমার কুঁড়েঘরে নেমেছে শীতকাল

তুষার জমে আছে ঘরের মেঝে জুড়ে বরফ পড়ে আছে

গভীর ঘন হয়ে পাশের নদী ভরে

বরফ ঠেলে আর তুষার ভেঙে আজ দু-ঠোঁটে রোদ নিয়ে

আমার কুঁড়েঘরে এ-ঘন শীতে কেউ আসুক”

(আমার কুঁড়েঘর, কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু)।

 

‘পেরোনোর কিছু নেই’ কাব্যে ‘বাংলাদেশের কথা’ শীর্ষক কবিতাতেও দেশের জন্য তাঁর প্রবল হতাশা ঝরে পড়েছে। তবে একই কবিতায় দেশকে নিয়ে আশাবাদের কথাও ধ্বনিত হয়েছে। যেমন- “তার ধানখেত এখনো সবুজ,নারীরা এখনো রমণীয়,গাভীরা এখনো দুগ্ধবতী,” (বাংলাদেশের কথা, পেরোনোর কিছু নেই)।

 

হুমায়ুন আজাদ জীবনকে ভালোবাসতেন। জীবনের রূপ, রস, গন্ধকে তিনি পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছেন। তবে সেই জীবনকে তিনি শিল্পের জন্য, কবিতার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন-“জীবন অশেষ মূল্যবান আমার কাছে, তার চেয়েও মূল্যবান কবিতা; যা কিছুর জন্যে জন্ম এবং জীবনকে আমি স্বীকার করি, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবিতা আমার কাছে, এবং আমি যে কবিতা সৃষ্টিতে কিছু সময় ব্যয় করেছি, তা আমার জন্য পরম সুখকর।” (ভূমিকা, শ্রেষ্ঠ কবিতা)।

 

হুমায়ুন আজাদের জন্ম বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার রাড়িখাল গ্রামে। মুন্সীগঞ্জ জেলার পূর্ববর্তী নাম ছিল বিক্রমপুর। রাড়িখালের নিসর্গের মধ্যে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পদ্মা নদী। কবিতায় তাঁর শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বিক্রমপুর, রাড়িখাল, আড়িয়ল বিলের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য এবং পদ্মা নদীতে চলাচল করা স্টিমারের কথা এসেছে। স্টিমারের শব্দ শৈশবে তাঁর মধ্যে আনন্দের শিহরণ জাগাতো এবং এই শব্দে রাতে তাঁর ঘুম ভেঙে যেতো। এক অলৌকিক আবহ নিয়ে পদ্মা নদীর স্টিমার তাঁর মানসপটে উদ্ভাসিত হতো।

 

২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় আজাদের শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘পেরোনোর কিছু নেই’। একই বছরে তিনি আততায়ী কর্তৃক আক্রমণের শিকার হন এবং জার্মানিতে অবস্থানকালীন মৃত্যুবরণ করেন। এই গ্রন্থে তিনি তাঁর শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত নিসর্গের কাছে ফিরে গিয়েছেন। বিক্রমপুর তাঁর স্মৃতিপটে চিরভাস্বর এক জনপদ। এর অভ্যন্তরে আড়িয়ল বিল এবং পাশ দিয়ে বয়ে চলা প্রমত্ত পদ্মা তাঁকে স্মৃতিকাতর করে। তাঁর বাড়ি থেকে শৈশবে আড়িয়ল বিলে যেতে মাঝে একটা সাঁকো পড়তো। সেই সাঁকোকে নিয়েও তাঁর গভীর স্মৃতি আছে। ‘সাঁকো’ নামে একটা অনবদ্য কবিতাও লিখেছেন তিনি। সাঁকোতে উঠলে তা কাঁপতে থাকতো। তিনি অনুভব করেন আজও সেই নড়বড়ে সাঁকোটা যেন তাঁর বুকের ভেতর কেঁপে চলেছে। পদ্মার তোড়ে প্রতিবছর কবির প্রিয় বিক্রমপুর ভেঙে যেত। তাঁর বসবাসের বাড়িও একদা পদ্মার ভাঙনে পানিতে মিশে যায়। তারপরও পদ্মার প্রতি তাঁর কোনো খেদ নেই, অভিমান নেই। ‘বিক্রমপুর’ নামের অপূর্ব এক কবিতায় তিনি বিক্রমপুরের প্রশস্তিগাঁথা রচনা করেছেন। বিক্রমপুরের উদ্দেশে তিনি বলেন-

 

“তোমার উর্বর মাটি বুকে মেখে তিব্বতের দিকে হেঁটে

গেছেন শ্রীজ্ঞান,তোমার মনন বিখ্যাত মগজে ধারণ করে বিশ্বের দিকে এগিয়ে গেছেন জগদীশ।”

এবং

“তোমাকে আমার খুব মনে পড়ে,প্রিয়তম,আমার বিক্রমপুর-

মনে পড়লেই চোখের সামনে দুলে ওঠে কুমড়োর

হলদে ফুল,নিরাক ধানের ক্ষেত,আড়িয়ল বিলের উত্তর পাড়ে

আশ্বিনের আকাশ প্রদীপ,আর একটি কিশোর-

তার দুই চোখে শিশির,কুয়াশা, আশ্বিনের চাঁদ,ঘাসফুল,

নদী, মেঘ, বৃষ্টি, আর অমরতা।”

(বিক্রমপুর, পেরোনোর কিছু নেই)।

 

যারা একই সাথে কবি এবং কবিতার সমালোচক, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের কবি পরিচয় আড়ালে চলে যায়। এটা বুদ্ধদেব বসুর ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছে, আবদুল মান্নান সৈয়দের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। হুমায়ুন আজাদের ক্ষেত্রেও এটা ঘটেছে। কবি হিসেবে তিনি উপেক্ষার শিকার হয়েছেন। আজাদ তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, “যা পুরোপুরি বুঝে উঠবো না, বুকে ওষ্ঠে হৃদপিণ্ডে রক্তে মেধায় সম্পূর্ণ পাবো না; যা, আমি অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার পরও, রহস্য রয়ে যাবে রক্তের কাছে, তার নাম কবিতা।” কিন্তু আজাদের কবিতার বেলায় এটা প্রযোজ্য হয় না। তাঁর অধিকাংশ কবিতা পড়ার পরে কোনো রহস্য থাকে না।

এ দেশের নিসর্গ আজাদের কাছে মোহনীয় রূপে ধরা দিয়েছে। কিন্তু মানুষের হঠকারিতা এবং নিষ্ঠুরতা তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছে। মানুষের উগ্রতা এবং পশ্চাদপদতা তাঁর মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ কাব্যের নাম কবিতার এই শব্দগুচ্ছ খুব আলোড়ন সৃষ্টি করে। তৎকালীন বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে খুব সঙ্গতিপূর্ণ ছিলো কাব্যের এই নাম। ঐ কবিতায় কবি বলেন,

“আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকার এ যাবে।

কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার রাত

নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ

শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে।

রবীন্দ্রনাথের সব জোসনা আর রবি শংকরের

সমস্ত আলাপ হৃদয় স্পন্দন গাঁথা ঠোঁটের আঙ্গুর

ঘাইহরিণীর মাংসের চিৎকার মাঠের রাখাল

কাশবন একদিন নষ্টদের অধিকারে যাবে।”

(সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে)।

 

 

 

 

শেষ কাব্যে এসে তাঁর হতাশা আরও তীব্র হয়েছে। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে তিনি নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিয়েছেন—

“মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভালো লাগে;অতিশয় দূরে বেঁচে আছি,

পথের কুকুর দেখে মুগ্ধ হই,দেখি দূরে আজো ওড়ে মুখর মৌমাছি।”

(মানুষের সঙ্গ ছাড়া, পেরোনোর কিছু নেই)।

 

আরেকটি কবিতায় তিনি বলেন, “আজ পেরোনোর কিছু নেই,বসে আছি -স্তব্ধ, শুনি শূন্য বাতাসের

শব্দ, দেখি অন্ধকার নেমে আসে মাঠে জলে শস্যে শক্তিতে।” (পেরোনোর কিছু নেই)।

 

ষাটের দশকের কবিগণ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রত্যক্ষ করেছেন। যে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার পতনে স্বভাবতই তাঁরা হতাশ। এই হতাশার অনুরণন দেখি হুমায়ুন আজাদের কবিতায়।

 

আনোয়ার মল্লিক : অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল,

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ

নাজিমুদ্দীন শ্যামল এর গুচ্ছ কবিতা

আব্বা   আমার আব্বা খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন। তিনি খুব সাধারণ কথাবার্তা বলতেন তিনি ভাষার কথা বলতেন, তিনি স্বাধীনতার কথা বলতেন। তিনি বলতেন ‘অ’ মানে

জাকির তালুকদার-এর ‘মাতৃহন্তা’: মিথ, ইতিহাস ও নারী জাগরণের এক অনন্য আখ্যান

শারমিন সুলতানা সাহিত্যের প্রতিটি শাখাই পাঠককে বিমোহিত করে লেখকের সৃষ্টিশীলতার গভীরতায়। একজন বড় লেখক তাঁর সৃষ্টিকর্মে যত বেশি অভিনবত্ব, ভাবনার বৈচিত্র্য ও ভাষার সৌন্দর্য আনতে

শিল্প পরিক্রমায় শিল্পের সাম্পান

শিশির মল্লিক   শিল্পদর্শন, শিল্পপাঠ কিংবা শিল্প আলোচনা/সমালোচনা— দর্শক, পাঠক, আলোচক বা সমালোচকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বা উপলব্ধিকে রিপ্রেজেন্ট করে। ফলতঃ কোন সুনির্দিষ্ট ফ্রেমে শিল্প বা

ধাঁধা: প্রজ্ঞা ও ধীশক্তির লোক-ঐতিহ্য

অমল বড়ুয়া   লোকসাহিত্যের একটি অন্যতম বিষয় হল ধাঁধা। প্রাচীনকাল থেকেই ধাঁধা সাধারণ জনমানুষের শিক্ষার একটি অন্যতম উপায়। আদিম সমাজে মানুষ যখন প্রকৃতির বিভিন্ন রহস্য