আরফান হাবিব
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য চর্চার ধারাটি নানা কারণে নিয়মিত ও শক্তিশালী আগেও ছিল না, এখনও নয়| দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভাষাগত সমস্যা, প্রান্তিকতা, সর্বোপরি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এর মূল কারণ| নিয়মিত প্রকাশনা চালু না থাকার কারণে অব্যাহতভাবে সাহিত্যচর্চা করেন এমন সাহিত্যিক তিন পার্বত্য জেলায় খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না| বছর শেষে বিঝু বা সাংগ্রাই উৎসবকেন্দ্রিক সংকলন আপাতত এ অঞ্চলের সাহিত্যকে চলমান রেখেছে| সমসাময়িক কিছু কবি-সাহিত্যিক নিজ উদ্যোগে গ্রন্থ প্রকাশ করছে যা কিছুটা হলেও স¦স্তির| তিন পার্বত্য জেলায় উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট থাকলেও তাদের প্রকাশনা বিভাগের কার্যক্রম খুবই সীমিত| সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সমতলের সাহিত্য-সমালোচকদের মনোযোগ পেলে সামগ্রিকভাবেএ জনপদের সাহিত্যচর্চা আরো গতিশীলতা ও প্রাণময়তা লাভ করতে পারে|
বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিসমূহের জাতীয় অধিকার এখনও পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি| জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি আদিবাসীদের ভাষা-সংস্কৃতি| এই কারণে আদিবাসীদের সাহিত্য-সংস্কৃতি এখনও পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত জাতির সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে তুলনীয় নয়| আদিবাসীদের জীবনের কথা, ইতিহাস, গল্প, গান ইত্যাদি এখনও সাধারণ লোকের মুখে মুখে বেশি প্রচলিত| আদিবাসীদের সাহিত্য এখনও অনেকটাই লোকসাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ| নিজ¯^ ইতিহাস, সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদি থাকলেও তাদের নিজ¯^ ভাষায় সেগুলো ব্যাপকভাবে রচিত হওয়ার সুযোগ নেই; আর যাও হয়েছে, তার বহুল প্রচার ও ব্যাপক বিপণন হয়নি| পৃথিবীতে মানব জাতির ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশ একদিনে হয়নি| এটা স্মরণাতীত কালের বিকাশের ফল|
এ সীমাবদ্ধ প্রেক্ষাপটে— চাকমা রাজপরিবারের ইতিহাস, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং আধুনিক শিক্ষাবিস্তারের ধারায় রানী বিনীতা রায়ের( ১৯০২-১৯৯০) নাম এক গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়| তিনি জন্মসূত্রে ছিলেন এক প্রজ্ঞাময় ও নবজাগরণ-প্রভাবিত পরিবারের সদস্য| ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ কেশব চন্দ্র সেন-এর পুত্র ব্যারিস্টার সরল সেনের প্রথমা কন্যা হিসেবে তিনি কলকাতার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন| উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের সূচনায় যে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে প্রগতিবাদ, নারীশিক্ষা, সামাজিক সংস্কার ও মানবতাবাদী চিন্তার গ্রোত প্রবাহিত হচ্ছিল, সেই ধারার প্রত্যক্ষ প্রভাব তাঁর মানসগঠনে প্রতিফলিত হয়েছিল| ফলে তাঁর ব্যক্তিত্বে একদিকে যেমন ছিল রাজকীয় আভিজাত্য, অন্যদিকে তেমনি ছিল উদার ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি| তাঁর কাকাতো বোন ছিলেন ষাটের দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া অভিনেত্রী সাধনা মুখার্জি-যা থেকে বোঝা যায় শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক সংযোগ কতটা গভীর ছিল|
চাকমা রাজা নলিনাক্ষ রায়-এর সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পর বিনীতা সেন নাম পরিবর্তন করে বিনীতা রায় নাম গ্রহণ করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজপরিবারে প্রবেশ করেন| এটি কেবল একটি পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল সমতল বাংলার নবজাগরণ-ধারার সঙ্গে পাহাড়ি জনপদের ঐতিহ্যের এক ঐতিহাসিক মিলন| তিনি দ্রুতই রাজপরিবারের দায়িত্বশীল ও প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন| তিনি ছিলেন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়-এর জননী এবং বর্তমান চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়-এর দাদি| ফলে রাজবংশের ধারাবাহিকতায় তাঁর ভূমিকা ছিল কেবল মাতৃস্থানীয় নয়, নীতিনির্ধারণী ও সংস্কৃতিগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ|
রানী বিনীতা রায়ের সর্বাধিক স্মরণীয় অবদান নিঃসন্দেহে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে| তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম সাহিত্যপত্রিকা ‘ˆগরিকা’| সে সময় পাহাড়ি অঞ্চলে ছাপাখানা, যোগাযোগব্যবস্থা ও সাহিত্যচর্চার অবকাঠামো ছিল সীমিত| তবুও তিনি সাহসী উদ্যোগ নিয়ে একটি সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন| এই পত্রিকার নামকরণ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-যা এই উদ্যোগকে সমগ্র বাংলা সাহিত্যজগতের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়| “গৈরিকা” নামটির মধ্যেই ছিল মাটি, রঙ, প্রকৃতি ও ¯^াতন্ত্র্যের ইঙ্গিত-যেন পাহাড়ি জনপদের নিজ¯^ সত্তার প্রতীক|
পত্রিকাটির নান্দনিকতাও ছিল উল্লেখযোগ্য| এর প্রচ্ছদ অঙ্কন করেন চাকমা শিল্পী চুনিলাল দেওয়ান, যিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন-এর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন| ফলে “গৈরিকা” কেবল একটি সাহিত্যপত্রিকা ছিল না; এটি ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির সমšি^ত প্রকাশভূমি| এই পত্রিকার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় লেখক, কবি ও প্রাবন্ধিকদের জন্য এক নতুন মঞ্চ সৃষ্টি হয়| পাহাড়ের সমাজজীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোককাহিনি এবং সমকালীন ভাবনা এতে স্থান পায়| এতে করে পাহাড়ি জনপদের সাহিত্যচর্চা একটি সুসংগঠিত রূপ লাভ করে এবং মূলধারার বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি হয়|
শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী| রাঙামাটিতে প্রতিষ্ঠিত “রাণী দয়াময়ী স্কুল” গড়ে ওঠার পেছনে তাঁর উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ| বিদ্যালয়টির নামকরণ তাঁর নামানুসারেই করা হয়, যা তাঁর অবদানের ¯^ীকৃতি¯^রূপ| সে সময় পার্বত্য অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা ছিল অত্যন্ত তীব্র, বিশেষত নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে| রানী বিনীতা রায় শিক্ষাকে কেবল জ্ঞানার্জনের উপায় হিসেবে দেখেননি; তিনি একে সমাজগঠন ও প্রগতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন| তাঁর প্রচেষ্টায় বহু শিক্ষার্থী শিক্ষার সুযোগ লাভ করে, যা পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে|
সব মিলিয়ে রানী বিনীতা রায় ছিলেন এক সেতুবন্ধনকারী ব্যক্তিত্ব-কলকাতার নবজাগরণ-চিন্তার সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যকে যুক্ত করেছেন তিনি| রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাঁকে কেবল একজন রানী নয়, বরং এক দূরদর্শী সমাজনির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে| পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে তাঁর নাম তাই কেবল রাজপরিবারের বংশতালিকায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং সাংস্কৃতিক জাগরণ ও শিক্ষাবিস্তারের এক অনন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে চিরস্মরণীয়|
রানী বিনীতা রায় কেবল একজন রাজমাতা বা সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদকই নন, তিনি নিজেও ছিলেন সংবেদনশীল ও মননশীল এক কবি-যার উজ্জ্বল প্রমাণ তাঁর রচিত “কবি নজরুল স্মরণে” কবিতাটি| এই কবিতায় তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর জন্মদিনকে উপলক্ষ করে যে আবেগ, শ্রদ্ধা ও অন্তর্গত স্পন্দনের প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা তাঁর কাব্যসত্তার গভীরতা ও সচেতন সাহিত্যবোধকে স্পষ্ট করে| “হে বিপ্লবী আজি শুভ জন্মদিনে তোমারে বারে বারে স্মরি”-এই উচ্চারণে যেমন রয়েছে আন্তরিকতা, তেমনি রয়েছে ইতিহাস-সচেতন এক কবিমনের দৃঢ়তা| তিনি নজরুলকে কেবল বিদ্রোহের কবি হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁর রক্তরাঙা চেতনা, শৃঙ্খলমুক্তির আহ্বান এবং অন্তঃপুরের অবগুণ্ঠিত নারীর মুক্তির আলোকে তিনি নতুন যুগের দিশারী হিসেবে চিত্রিত করেছেন| বিশেষত নারীমুক্তির প্রসঙ্গে তাঁর পঙ&ক্তি-“অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত অন্তপুরের নারী / তোমার বহ্নিশিখার আলোয় চলে অগ্রসারি”-প্রমাণ করে যে বিনীতা রায়ের কবিসত্তা ছিল প্রগতিশীল ও মানবমুক্তির পক্ষে দৃঢ় অবস্থানসম্পন্ন|
একই সঙ্গে তিনি নজরুলের কাব্যের করুণ ও মানবিক দিকও গভীরভাবে অনুধাবন করেছেন-‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’-এর উল্লেখ তাঁর সাহিত্যপাঠের সূক্ষ¥তা প্রকাশ করে| বিদ্রোহ ও বেদনার এই ˆদ্বত সুর তিনি অত্যন্ত আবেগময় অথচ সংযত ভাষায় প্রকাশ করেছেন| তাঁর কবিতায় অলংকারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে অনুভবের আন্তরিকতা ও ভাবের ¯^চ্ছতা| ফলে বোঝা যায়, তিনি কেবল একজন পৃষ্ঠপোষক নন; বরং বাংলা সাহিত্যধারার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত এক সৃজনশীল কবি, যিনি যুগসচেতনতা, মানবিকতা ও নারীমুক্তির চেতনা নিজের কাব্যে ধারণ করেছিলেন| এই কবিতার আলোকে বিনীতা রায়কে আমরা একজন সহৃদয়, প্রগতিমনা ও শিল্পসচেতন কবি হিসেবে মূল্যায়ন করতে পারি-যাঁর কণ্ঠে শ্রদ্ধা যেমন আছে, তেমনি আছে নবজাগরণের দীপ্ত বিশ্বাস|
রাজপরিবারের সদস্যা হয়েও তিনি কেবল প্রথাগত রাজকীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সাহিত্যিক চেতনায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন| তার কাব্যচর্চা প্রমাণ করে যে তিনি সময়-সচেতন, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় উজ্জ্বল এবং গভীর সাহিত্যবোধসম্পন্ন এক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব| বিশেষত একজন আদিবাসী নারী হিসেবে তাঁর এই মূল্যায়ন আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সে সময় পাহাড়ি সমাজে নারীদের সাহিত্যচর্চা বা প্রকাশ্য বুদ্ধিবৃত্তিক অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত| সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নজরুলের বিপ্লবী চেতনা, নারীমুক্তির আহ্বান এবং মানবিক বেদনার দিকগুলোকে তিনি যে স্পষ্ট ও সাহসী কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন, তা তাঁর প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষ্য বহন করে| একজন আদিবাসী নারী হয়েও তিনি সমাজ-সংস্কারের আলোকে সামনে এগিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছিলেন| তাঁর এই সাহিত্যচর্চা পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীসমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে|
রানী বিনীতা রায়কে কেবল রাজপরিবারের সদস্যা বা সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নয়, বরং প্রথম আদিবাসী নারী কবি হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত-যিনি মূলধারার বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পার্বত্য জনপদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে যুক্ত করেছিলেন| তাঁর কবিতায় যেমন বিদ্রোহের অনুরণন আছে, তেমনি আছে মানবতার মধুর সুর| এই ˆদ্বত ¯^র তাঁকে বাংলা সাহিত্যভুবনে এক ¯^তন্ত্র ও সম্মানিত অবস্থানে অধিষ্ঠিত করে|
আরফান হাবিব, প্রাবন্ধিক ও গবেষক



