আবদুল্লাহ আল-আমিন
প্রাক-ঐতিহাসিক যুগেও নারীর স্বাধীনসত্তা ছিল না। তারা ছিল আক্ষরিক অর্থেই সাবঅল্টার্ন অর্থাৎ নিম্নবর্গের মানুষ। ক্ষমতা কাঠামোর এমন এক প্রান্তিক পর্যায়ে তারা অবস্থান করতেন, যেখান থেকে স্বাধীনভাবে কথা বলা কিংবা মুক্তচিন্তা চর্চার কোনো সুযোগ ছিল না। ধর্ম দর্শন শিক্ষা ভাষা–সবই চলে যায় পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে। সর্বগ্রাসী পুরুষতন্ত্রের দীর্ঘ ছায়ার নিচে শতাব্দীর পর শতাব্দী বসবাস করতে করতে তারা হারিয়ে ফেলে স্বাধীন কর্তাসত্তা। পরিণত হয় পুরুষের জ্ঞানের ‘বস্তু’তে। পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের আয়নায় নিজেদের দেখতে শুরু করে। রামায়ণের সীতাও ছিলেন লিঙ্গীয় সাবঅল্টার্ন। তিনিও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য ও সহিংসতার মর্মান্তিক শিকারে পরিণত হন। তাঁকেও কথা বলতে হয়েছে রামচন্দ্রের তৈরি করা ধারণার কাঠামোতে অবস্থান করে। রাজধর্ম পালন ও প্রজারঞ্জনের নামে তাঁর জ্ঞান, আত্মপরিচয় ও মর্যাদার ওপর যখন ভয়ংকর আক্রমণ চালনা করা হয়, তখনও তিনি নীরব ছিলেন। অথচ এই সর্বংসহা নারী মানবসমাজকে একটি নতুন সভ্যতার আলো দেখাতে চেয়েছিলেন এবং সেটা তিনি পারতেন। কিন্তু নিষ্ঠুর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাঁকে বুঝতে পরেনি, গ্রহণ করতে পারেনি তাঁর দান। বিপরীতে অপবাদ দিয়ে তার দান প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। পণ্ডিতরা বলেছেন, সীতা আসলে ‘কৃষিবিদ্যা’ যা ‘জনক’ রাজা অযোধ্যাবাসীকে দান করেছিলেন। মানুষ যেদিন মৃগয়া ছেড়ে জীবনধারণের উপায় হিসেবে কৃষিকাজ রপ্ত করে কৃষিজাত দ্রব্য উৎপাদন করতে শেখে, সেদিন থেকে কৃষি সভ্যতার জন্ম হয়। এর পর থেকে বদলে যায় মানব সভ্যতার গতিমুখ। মানুষের জীবনধারায় আসে শোভা ও সমৃদ্ধি, তিরধনুক নির্ভর জীবন ছেড়ে মানুষ স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন শুরু করে। রামায়ণ কাহিনির সীতা-ও বদলে দিয়েছিলেন রামচন্দ্রের জীবন। জনকদুহিতা সীতা যেদিন দশরথপুত্র রামচন্দ্রের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন সেদিন ভারতবর্ষে এক নতুন সভ্যতা রচনার পথ প্রশস্ত হয়েছিল। অযোধ্যাবাসী আদিম সমাজ পরিত্যাগ করে কৃষি সভ্যতায় প্রবেশ করে। বাল্মীকির রামায়ণে বর্ণনা করা হয়েছে, ক্ষত্রিয় রাজাগণের মধ্যে এক ব্যতিক্রমী রাজর্ষি ছিলেন ‘জনক’। তিনি লাঙল দিয়ে প্রত্যহ ভূমি কর্ষণ করতেন। নিজ হাতে ফসল ফলাতেন। একদিন লাঙলের অগ্রভাগের ক্ষত থেকে উদ্ধার করেন একটি অপরূপ পদ্ম। লাঙলের অগ্রভাগ হতে কুড়িয়ে পাওয়া সেই পদ্মটির নাম রাখা হয় ‘সীতা’। তার মাধ্যমে সূচিত হয় এক নতুন সভ্যতার। সীতা ছিলেন অপরূপ রূপবতী। ‘তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, হরিণনয়না, ক্ষীণকটি সীতা। পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় তাহার মুখের শোভা ও লাবণ্য। চম্পককলির মতো তাঁহার আঙুল, হস্তীর শুঁড়ের ন্যায় উরুদ্বয়, স্বাভাবিক অলক্তরাগে রঞ্জিত তাঁহার পদযুগল। সেই অত্যাশ্চর্য সৌন্দর্য বীরভোগ্যা।’ (শাঁওলী মিত্র, সীতার উত্তরণ, দেশ, শারদীয় ১৪১১) তাঁর চরিত্রে একাকার হয়ে ছিল সারল্য, নির্বুদ্ধিতা ও তেজস্বিতা। মনেপ্রাণে ছিলেন সম্পূর্ণরূপে স্বামী সমর্পিতা। তারপরও স্বামী রামচন্দ্র তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন। কেন তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন? কি তাঁর অপরাধ? তাঁর অপরাধ, তিনি অপহৃতা হয়েছিলেন। যে স্ত্রী পরগৃহবাসিনী হয়, তাকে কোনো সৎকুলজাত তেজস্বী পুরুষ ভালোবাসার পাত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না! তেজস্বী পুরুষ রামচন্দ্র-ও অপহৃতা সীতাকে গ্রহণ করেতে পারেননি। নিষ্ঠুরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। রাম যখন বললেন, ‘আমার অ-কীর্তির ভয়েই আমি সীতাকে পরিত্যাগ’ করলাম, তখন লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন বিস্মিত হয়েছিলেন, কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করতে পারেননি প্রবল পরাক্রান্ত রামের অমোঘ আদেশের বিরুদ্ধে। যে রামকে দর্শন করে, যে রামের নাম শুনে সীতা অষ্টপ্রহর পুলকিত হতেন, সেই রামচন্দ্র তাঁকে প্রবলরূপে বঞ্চিত করছিলেন, অথচ সীতা কিছুই বলতে পারেননি। কেবল বলে উঠেছিলেন, ‘মাগো, ঠাঁই দাও কোলে। আর যে পারি না মাগো!’ রামায়ণ কাহিনির সীতার মতো সর্বযুগেই নারীরা নিগৃহীত উপেক্ষিত অপরিগৃহীত। অথচ এই নিগ্রহ-নিপীড়ন ও অবদমনের বিরুদ্ধে তারা কোনো প্রতিবাদ করেনি, বরং নীরব থেকেছে, নীরব থাকতে হয়েছে। পুরাণ-কন্যা সীতাও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে নীরব ছিল, নীরব তাঁকে থাকতে হয়েছে। রামায়ণের সীতা কি কেবলই কাল্পনিক? কেবলই মহাকাব্যের কিংবদন্তি? না, কেবলই কিংবদন্তি নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘রামায়ণ-মহাভারতকে কেবল মহাকাব্য বলিলে চলিবে না, তাহা ইতিহাসও বটে, ঘটনাবলীর ইতিহাস নহে, কারণ সেরূপ ইতিহাস সময়বিশেষকে অবলম্বন করিয়া থাকে। রামায়ণ-মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস।’ রামায়ণেও রয়েছে স্বামী-সমাজ-সংসার কর্তৃক পরিত্যক্তা এক নারীর করুণ ইতিহাস।
২.
মুঘল আমলেও নারীরা নানাভাবে নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়েছে। শাহজাদা সেলিমের (পরবর্তীকালের সম্রাট জাহাঙ্গীর) সঙ্গে প্রেম ও প্রণয়ে জড়ানোর দায়ে শার্ফ-উন-নিসা ওরফে আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করা হয় সম্রাট আকবরের নির্দেশে। আনারকলির জীবনকাহিনি নিয়ে লোকশ্রুতি, নাটক, সিনেমা তৈরি হলেও মুঘল ইতিহাসের কোথাও তার ঠাঁই হয়নি। আসমুদ্র হিমাচলের অধিপতি সম্রাট আকবরের এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে সেদিন কোনো প্রতিবাদ হয়নি। উনিশ শতকের জ্ঞানদীপ্তি ও আলোকায়নের যুগেও বাঙালি নারীরা চরম প্রবঞ্চনার শিকার হয়েছে। গ্রামের সাধারণ পরিবারের মেয়েরা কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করলেও শিক্ষিত ভদ্রবাড়ির মেয়েরা ছিল হাজারো বিধিনিষেধের শৃঙ্খলে বন্দি। তাদের হাসিকান্না, আনন্দ-আহ্লাদ, উচ্ছ্বাস, পোশাক-আশাকের ওপর আরোপ করা হয়েছিল কঠোর বিধিনিষেধ। বড়বাড়ির মেয়েরা কিভাবে চলবে, কি ধরনের পোশাক পরবে, কার সঙ্গে মিশবে– এসব বিষয়ের ওপর ভিক্টোরিয় নৈতিক মূল্যবোধ এবং উচ্চবর্গীয় মোরাল কোডগুলি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সভ্যতার দোহায় দিয়ে। “উনিশ শতকে যে আলোকপ্রাপ্ত নাগরিক সভ্যতা গড়ে উঠলো সেখানে ‘গার্হস্থ্য পরিবার’ হয়ে উঠল এক বিশেষ ধরনের ‘ক্ষমতা’ এবং সামাজিক প্রতিপত্তির ‘ক্ষেত্র’। পারিবারিক ক্ষমতাকেন্দ্রটিকে স্যানিটাইজড রাখার জন্য মেয়েদের নিজস্ব বাচনভঙ্গি, আমোদ-আহ্লাদ, পোশাক-আশাক, এমনকি হাঁটাচলার পদ্ধতির উপরেও নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারি প্রয়োগ শুরু হল।—- গ্রামের মেয়েরা পুকুরে-নদীতে যেতে পারত, সেরকম বাধা ছিল না, কিন্তু কলকাতার ভদ্রবাড়ির মেয়েরা প্রকাশ্য দিবালোকে গঙ্গাস্নানে যেতেন না। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের পালকিসুদ্ধ গঙ্গায় স্নান করিয়ে আনার কথা তো সবার জানা।’’ (অর্ণব সাহা, উনিশ শতক বাঙালি মেয়ের যৌনতা। কলকাতা, জানুয়ারি ২০১৭ বইমেলা। পৃষ্ঠা: ২১-২২)
উনিশ শতকে পারিবারিক সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় মেয়েদের ভূমিকা ছিল খুবই নগণ্য। অধিকাংশ নারী বেঁচে থাকতেন পুরুষের অনুকম্পায়। লেখাপড়ায় ছিলেন নিদারুণভাবে পিছিয়ে। অভিজাত পরিবারের মেয়ে, মহিলা-জমিদার ও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানহীন বিধবারা কিছুটা লেখাপড়া জানলেও সাধারণ পরিবারের মেয়েরা মোটেই লেখাপড়া জানতেন না। মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে সমাজের কর্তা ব্যক্তিরা কোনো দায় বা অন্তর্গত তাগিদ অনুভব করতেন না। নবজাগৃতির পথিকৃত রামমোহন রায় নারীর প্রতি বাঙালি পিতৃতন্ত্রের মনোভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘একই সঙ্গে রান্না করতে পারে, শয্যাসঙ্গিনী হতে পারে এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে ঘরের রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে এরূপ জন্তু ব্যতীত নারীদের আর কিছইু বিবেচনা করা হয় না।’ (রামমোহন রায় প্রণীত গ্রন্থাবলি, রাজনারায়ণ বসু সম্পাদিত) কেবল বাঙালি সমাজে নয়, সারা দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও তখন নারীদের নিম্নমানের প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হত। মনে করা হত, ‘প্রকৃতিই নিম্নশ্রেণির জীব হিসেবে নারীদের সৃষ্টি করেছেন পুরুষের ওপর নির্ভরশীল করে। অতএব নারীদের মনে রাখতে হবে যে, শাসন করা নয়, স্বামীর বশ্যতা স্বীকারই তাঁদের জন্য নিয়তি-নির্ধারিত।’ (রাশিয়ার সরকারি প্রতিবেদন ১৮৪৫) বঙ্গদেশেও তখন নারীদের সামাজিক অবস্থান ছিল অমনই অথবা তার চেয়েও করুণ। বাংলার নারীরা গৃহকর্ম, রন্ধন, সন্তান লালন এবং সূচিকর্ম করবে, পড়াশোনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করবে— এটাই ছিল বাঙালি পিতৃতন্ত্রের অলিখিত বিধান। নারীর দুরবস্থা নিয়ে বঙ্গদেশে প্রথম চিন্তা করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। কেবল সতীদাহ প্রথার বর্বরতা সম্পর্কে নয়, নারীদের দুর্দশা সম্পর্কেও তিনি গভীর সচেতন ছিলেন। রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এই সমাজ স্বার্থপর ও ভণ্ড। সেই কারণেই এই সমাজ নারীদের ‘প্রকৃতিপ্রদত্ত প্রশংসনীয় উৎকৃষ্ট গুণাবলিকে অস্বীকার করেছে।’ ১৮১২ সালে রামমোহন যখন সতীদাহবিরোধী সামাজিক আন্দোলন শুরু করেন, তখন খ্রিস্টান মিশনারি, ব্রাহ্ম সমাজ ও প্রগতিশীল হিন্দুরা তাঁর পাশে দাঁড়ালেও হিন্দু রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিরা তীব্রভাবে বিরুদ্ধাচরণ করে। বেন্টিঙ্ক কর্তৃক প্রণীত সতীদাহবিরোধী আইন (১৮২৯)-কে চ্যালেঞ্জ করে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করা হয়। আপিলের বয়ানে বলা হয়, সতীদাহ হিন্দু নারীর স্বেচ্ছায় আত্মত্যাগের এক মহিমান্বিত ঐতিহ্য, যা তাদের সতীত্ব, সাহস এবং পতিভক্তির চূড়ান্ত প্রতীক। রাজা রাধাকান্ত দেব, ভবাণীচরণ বন্দোপাধ্যায়, নীলমণি দে, গোকুলনাথ মল্লিকের মতো রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী হিন্দু নেতারা সতীদাহ প্রথাবিরোধী আইনকে নিজেদের সাংস্কৃতিক বিষয়ে ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করেন। নিজেদের পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য তারা সতীদাহ প্রথাকে সমর্থন করেন। রামমোহন, দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুরের মতো পুরোধা ব্যক্তিত্বরা সতীদাহ তথা সহমরণ প্রথা বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, কিন্তু কলকাতার অভিজাত পরিবারের কোনো নারী এই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন বলে শোনা যায়নি। কারণ উনিশ শতকের বাঙালি মেয়েরা ছিল ঔপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মতো আক্ষরিক অর্থেই নিচুতলার মানুষ। সাহস, স্বকীয়তা, আত্মত্যাগ বলতে যা বোঝায় তার ছিটেফোঁটাও তারা ধারণ করত না। সাহিত্য তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক ঈধহ ঃযব ঝঁনধষঃবৎহ ংঢ়বধশ? (প্রথম প্রকাশ, ১৯৮৫) শীর্ষক বিখ্যাত প্রবন্ধে বলেছেন, নিম্নবর্গ তথা নারী, আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের কণ্ঠস্বর উপস্থাপিত হয় না, তাদের সম্পর্কে জানতে হয় উচ্চবর্গের বয়ান থেকে। অর্থাৎ যে হিন্দুনারীকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে বা স্বেচ্ছায় সহমরণের চিতায় উঠছে, সেখানে নারীর নিজের কণ্ঠস্বর কোথায়? লর্ড বেন্টিঙ্ক বা ব্রিটিশ সরকার নারীকে শিকার হিসেবে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে নিজেরা পরিত্রাতা হিসেবে হাজির হয়েছেন। আর ভারতবর্ষের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি অংশ সেই নারীকে দেবী বা ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে মহিমান্বিত করে তার ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে চেয়েছে। এই দুই প্রবল শক্তির বিতর্কে নারীর কোনো বক্তব্য বা ইচ্ছাকে গ্রাহ্য করা হয়নি। সে কি স্বেচ্ছায় সহমরণের চিতায় উঠতে চেয়েছিল? না কি তাকে বাধ্য করা হয়েছিল? সে কি ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে এই পথ বেছে নিয়েছিল, নাকি সামাজিক চাপে? সে কি ব্রিটিশদের মাধ্যমে উদ্ধার পেতে চেয়েছিল? এই প্রশ্নগুলো বারবার ঘুরেফিরে আসে, কারণ কোনো পক্ষই নারীর স্বাধীন সত্তার মূল্য দিতে চায় না। নারী কোনো কালেই কথা বলার পরিসর পায়নি। সব কালেই নারী অন্যের হাতে তৈরি একটি প্রতীক, একটি পুতুল, একটি ধারণা, যার কোনো নিজস্ব ইচ্ছা বা বক্তব্য নেই (ঝঢ়রাধশ, ১৯৮৮)। দেরিদোর দর্শন অনুযায়ী, নারী একটি ‘মুছে ফেলা চিহ্ন’ যার ওপর পুরুষতন্ত্র তাদের নিজস্ব বয়ান চাপিয়ে দিয়েছে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। এটিই হল জ্ঞানতান্ত্রিক সন্ত্রাসের চূড়ান্ত রূপ, যার মাধ্যমে সাবঅল্টার্ন নারীকে কেবল নীরব করে রাখা হয়নি বরং বিভিন্ন ন্যারেটিভসের মাধ্যমে তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। নারীর নীরবতাকে পুরুষতন্ত্র তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। তার অস্তিত্বই যেন অপরের অর্থাৎ শক্তিমানদের ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রামায়ণের উত্তরখণ্ড অবলম্বনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যে ‘সীতার বনবাস’ রচনা করেন সেখানে রামচন্দ্র প্রজাদের ‘অসন্তোষপ্রদর্শন ও কলঙ্কীর্ত্তনের’ ভয়ে অন্তঃসত্ত্বা সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে তথাকথিত ‘রাজধর্ম’ পালন করেন। রামচন্দ্রের নির্দেশ মোতাবেক লক্ষ্মণ তাঁকে ভাগীরথী নদীর তীরে রেখে আসেন। সেখানেই তিনি লব ও কুশের জন্ম দেন। চরম দুঃখ কষ্টে লব-কুশকে লালন-পালন করেন। পরিশেষে জীবন বিসর্জন দেন ধরিত্রীর গর্ভে। এতো লাঞ্ছনার পরও সীতা কোনো প্রতিবাদ করেনি বা করতে পারেননি।
৩
বৈদিক যুগে অবশ্য নারীর সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান কিছুটা ভাল ছিল। তাদের শাস্ত্রপাঠের অধিকার ছিল। যজ্ঞে অংশগ্রহণ ও উপনয়নের অধিকারও ছিল। আদর্শ কুলকন্যারা বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে, গার্হস্থ্য ধর্ম পালন করেছে, কিন্তু অনেক নারীই উচ্চতর বিদ্যার্জনের জন্য আজীবন পিতৃগৃহে চিরকুমারী হয়ে অবস্থান করেছেন, এ নিয়ে কোনো কথা হয়নি। পুরুষ কবিদের মতোই নারী কবিরাও (ঋষিকা) শ্লোক রচনা করেছেন যা আজও বেদের পাতায় জ্বলজ্বল করছে। বৈদিক যুগে লোপামুদ্রা, শাশ্বতী, ইন্দ্রাণী প্রমুখ ছিলেন পুরুষের মতোই কবি ও মন্ত্রদ্রষ্টা। উপনিষদে গার্গী ও মৈত্রেয়ীর মতো কিছু বিদুষী নারীর সাক্ষাত পাওয়া যায়। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে সমাজে পুরুষের আধিপত্য বাড়তে থাকে। কমতে থাকে নারীর কথা বলার পরিসর ও অধিকার। গার্হস্থ্যধর্মই নারীর মূল আচরণীয় বলে ঘোষণা করা হয়। পুরুষতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে নারীবিদ্বেষী বিধিবিধান। শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে বিধবা, ঋতুমতী নারী কিংবা স্বাধীনচেতা নারীদের অপবিত্র বা পাপের প্রতীক বলে চিহ্নিত করা হয়। বলা হয়, নারী কখনোই স্বাধীন হবার যোগ্য নয়। বংশরক্ষা, সম্পত্তির ওপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে, সামাজিক ক্ষমতা কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করতে পুরুষের স্বার্থে শাস্ত্র-ধর্মকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয়। সচেতনভাবে উপেক্ষিত হয় নারীর কণ্ঠস্বর। এ বিষয়ে নারীরা কোনো প্রতিবাদ করেনি বা করতেও পারেনি। শতাব্দীর পর শতাব্দী তাদের নীরব থাকতে হয়েছে। বেছে নিতে হয় শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকার ‘ব্রত’। রেনেসাঁসের যুগে রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্ত্রীরাও লেখাপড়া জানতেন না, জানার আগ্রহও পোষণ করেননি। বরং জাত ও ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার দোহাই পেড়ে ‘অনাচারী’ স্বামীর কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তবে কিছু নারী-জমিদার লেখাপড়া জানতেন হিসাব রাখার উদ্দেশ্যে। অভিজাত পরিবারের বিধবারা লেখাপড়া শিখতেন শাস্ত্রপাঠের জন্যে। বাঙালি অভিজাতরাও মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। রবীন্দ্রনাথ নারীদের আধুনিকায়নের প্রতি অবদান রাখলেও, শিক্ষিত নারীদের চাকরি করার বিষয়টি পছন্দ করতেন না। তাঁর উপন্যাসের নায়িকারা কেউই চাকরিজীবী নন। ব্যক্তি জীবনেও তাঁর প্রচুর অসঙ্গতি ছিল। গল্প-উপন্যাসে তিনি যা লিখেছেন ব্যক্তি জীবনে তা পালন করেননি বা করতে পারেননি। বাংলার মেয়েদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন এডওয়ার্ড ড্রিংকওয়াটার বেথুন নামক অক্সফোর্ড পড়ুয়া এক ইংরেজ। ১৮৪৯ সালে তিনি যখন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন তখন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মেয়ে সৌদামিনীকে স্কুলে পাঠাবেন কি পাঠাবেন না, এ নিয়ে কিছুটা ইতস্তত হয়েছিলেন। আর রক্ষণশীল হিন্দুরা নিজেদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে বিরুদ্ধ মনোভাবাপন্ন ছিলেন। মেয়েরা স্কুলে লেখাপড়া শিখলে তাদের কমনীয়তা রমণীয়তা বিনষ্ট হয়– এই ধরনের ভ্রান্ত ধারণা অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। তারা মনে করতেন, মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে গার্হস্থ্য কর্মে উদাসীন হয়ে বিলাসিতায় ব্যস্ত থাকবে। ধর্মকর্ম ছেড়ে দিয়ে বিবি সেজে গড়ের মাঠে হাওয়া খেয়ে বেড়াবে। কবি ঈশ্বর গুপ্ত নারীশিক্ষার প্রতি কতটা বিরূপ ছিলেন, সেটা তাঁর লেখা একটি কবিতা পাঠ করলেই বোঝা যায়। তিনি লেখেন:
‘আগে মেয়েগুলো ছিলো ভালো, ব্রত-ধর্ম কর্তো সবে।/ একা ‘বেথুন’ এসে শেষ করেছে, আর কি তাদের তেমন পাবে পাবে।/যত ছুঁড়ীগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে।/ তখন “এ বি” শিখে, বিবি সেজে, বিলাতী বোল কবেই কবে।/ সব কাঁটা চামচে ধোরবে শেষে, পিঁড়ি পেতে আর কি খাবে।’ উনিশ শতকের বাঙালি রক্ষণশীল সমাজ নারীকে বহুকাল স্কুল-কলেজে পড়তে দেয়নি। নারীদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, লেখাপড়া শিখলে তাদের বিধবা হতে হয়। মেয়েদের হাতে একখণ্ড কাগজ দেখলেও বয়স্ক মহিলারা রাগান্বিত হতেন। তারা বিশ্বাস করতেন, মেয়েরা কালির আঁচড় দিলে নাকি সংসারে দুর্ভাগ্য নেমে আসে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নারীশিক্ষার প্রতি কিছু চিন্তাশীল মানুষের মনোভাব বদলাতে থাকে। নারীদের শিক্ষায় আগ্রহী করে তুলতে এগিয়ে আসেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী, রাধাকান্ত দেব, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ উদার ও রক্ষণশীল হিন্দু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। অতপর সরকারি অর্থায়নে একে একে বঙ্গদেশের বিভিন্ন জেলায় বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হতে থাকে। তাঁরা উপলব্ধি করেন, ‘শিক্ষিত পুরুষের সহিত অশিক্ষিত স্ত্রীর (নারীর) বিবাহ হইলে, সবদিকে সুখজনক হয় না।’ (স্ত্রীশিক্ষা, জ্ঞানাঙ্কুর, আশ্বিন ১২৮২) শিক্ষা ছাড়া নারী তার ‘স্বামীর ছায়াতুল্য সহচরী’ হয়ে উঠতে পারে না। নারী শিক্ষার প্রসারের ফলে কৈলাসবাসিনী দেবী, তাহেরন নেসা, কৃষ্ণভামিনী, কামিনীসুন্দরী প্রমুখ কবি ও গদ্য লেখিকার আবির্ভাব ঘটে। তাহেরন নেসা ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান গদ্য লেখিকা, যার একটি গদ্য রচনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
৪
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কেবল ব্রাহ্ম ও খ্রিস্টান পরিবারগুলো শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। বাড়িতে শিক্ষক রেখে মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। এর পর রক্ষণশীল হিন্দু নারীরাও লেখাপড়া শিখতে এগিয়ে আসেন। রাসসুন্দরী দেবীর মতো গ্রামীণ পরিবারের মেয়েরাও লেখাপড়ায় আগ্রহ বোধ করেন। কৈলাসবাসিনী দেবী গোপনীয়তা অবলম্বন করে লেখাপড়া চালাতে থাকেন। রক্ষণশীল পরিবারের কাদম্বিনী গাঙ্গুলি বিলেত থেকে ডাক্তারি পাস করে আসেন। শিক্ষার প্রতি বাঙালি মুসলমান সমাজের মনোভাব বদলাতে আরও কয়েক দশক সময় পার হয়। মুসলমান পরিবারে নারী শিক্ষার বিষয়টি ছিল ভীষণভাবে উপেক্ষিত। কারণ মুসলমান সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে বেশ পরে। তারপরও এগিয়ে আসেন তাহেরন নেসা নামক এক নারী-লেখিকা। তিনি বলেন, কেবল পুরুষরাই সমাজকে উন্নত করতে পারে না। সমাজে নারীদেরও একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে, কিন্তু নিজেদের অজ্ঞতা ও অনগ্রসরতার জন্যে তাঁরা এ ভূমিকা পালন করতে পারে না। এর কয়েক দশক পরে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আরও বলিষ্ঠভাবে বলেন, ‘জাগো মাতা, ভগিনী, কন্যা-উঠ, শয্যা করিয়া আইস, অগ্রসর হও। ঐ শুন, “মোয়াজ্জিন” আজান দিতেছে।’ তিনি বলেন, শিক্ষার অভাবে বাঙালি নারী পিছিয়ে আছে। শিক্ষার আলো দিয়ে তাদের জাগাতে হবে। মুয়াজ্জিনের আজান শুনে ধর্মপ্রাণ মুসলমান কখনও ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। নতুন দিনের প্রত্যাশায় তারা জেগে ওঠে। বাঙালি নারীকেও জেগে উঠতে হবে নতুনের স্বপ্নে। ‘গৃহ-কারাগার স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে পড়িয়া অঘোরে’ না-ঘুমিয়ে সমস্বরে বলতে হবে ‘আমরা মানুষ’। আর সত্যিকারের মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষা। শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘প্রকৃত সুশিক্ষা চাই যাহাতে মস্তিষ্ক ও মন উন্নত হয়। আমরা উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত না হইলে সমাজও উন্নত হইবে না।— শিক্ষার অভাবে আমরা স্বাধীনতা লাভের অনুপযুক্ত হইয়াছি।’ শিক্ষার অভাবে বাঙালি নারী অনেক অত্যাচার-অবহেলা সহ্য করেছে। তবে প্রেক্ষাপট বদলেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মেয়েরাও লেখাপড়া শিখছে। কুপমণ্ডুকতা, কঠোর পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পীড়ন, জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশনের মধ্যেও বাংলাদেশের মেয়েদের অগ্রগতি আমাদের আশাবাদী করে তোলে। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের মেয়েরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আসলে কি তাই? সত্যি কি তারা এগিয়েছে? তাদের কী চাহিদা, কী আকাঙ্ক্ষা, কী স্বপ্ন-কল্পনা, তা কি তারা ভালোভাবে জানে? তাহলে, কেন নিজেদের জীবনের গল্পগুলো নিজেরা বলতে পারে না? ে তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য কেন তারা ‘চেতনার ধারক’ বুদ্ধিজীবী, তথাকথিত প্রগতিশীল এনজিও কিংবা প্রতাপশালী ধর্মনেতা প্রভৃতির মতো আধিপত্যবাদী শক্তির দ্বারস্থ হয়! কেন নিজেরা কথা বলার পথের বাধাগুলো দূর করতে পারে না? প্রতিদিন ছড়ানো হচ্ছে নারীবিদ্বেষী হাজারো বয়ান, অথচ প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী কিংবা রাজনীতিকদের হস্তক্ষেপ ছাড়া তারা কিছুই করতে পারছে না। সময় এসেছে বিদ্রোহ করার এবং সব ধরনের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জ্ঞান ও সত্য উৎপাদনের। এজন্য মেয়েদের আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে কথা বলতে হবে, নীরব থাকলে চলবে না। কারণ প্রতিটি নীরবতার পিছনে লুকিয়ে আছে বেদনা রক্তক্ষরণ, লাঞ্ছণা বঞ্চনা, অসম ক্ষমতা এবং না-বলা কথার দীর্ঘ ইতিহাস। গায়ত্রী স্পিভাক তাঁর `Speak Can Subaltern Speak?’–প্রবন্ধে সাবঅল্টার্ন তথা নারী তথা বিশ্বের নিপীড়তরা যেন নীরবতা ভেঙে কথা বলতে পারে, তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, তাদের হয়ে কথা বলাই যথেষ্ট নয়, তারা কী বলতে চায় তা শোনাও একটি বিরাট নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। সাবঅল্টার্ন তথা নারীরা কথা বলতে পারে না, কারণ তাদের কথা শোনার জন্য সমাজের সচ্ছল, শিক্ষিত ও প্রভাবশালীরা প্রস্তুত নয়। গার্গী, মৈত্রেয়ী কিংবা সীতাকে চিরায়ত পুরুষতন্ত্র কতটুকু বুঝতে পেরেছিল জানি না, তবে এ কালের পুরুষতন্ত্র যে-নারীকে খুব বুঝতে পারেনি, অবস্থাদৃষ্টে তা মনে হয় না। নারীর চিন্তাজগতকে সম্মান করার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, বিনয় ও সংবেদনশীলতা প্রয়োজন, তা আজও আমরা অর্জন করতে পারিনি। রাতের নিস্তব্ধতাকে ভাঙার জন্য যেমন ভোরের আলোর প্রয়োজন, তেমনই নারীর নীরবতা ভাঙার জন্য প্রয়োজন সহনশীল ও সংবেদনশীল পৃথিবী। প্রয়োজন এমন এক সমাজ, যে-সমাজ নারীর অন্তর্দাহ, রক্তক্ষরণ ও বেদনাকে মর্যাদা দিতে শিখবে। সেই নতুন সমাজ ও পৃথিবী নির্মাণের দায়িত্ব কার? গায়ত্রী স্পিভাকের সাবঅল্টার্ন তত্ত্ব অনুযায়ী, এ দায়িত্ব আমাদের সকলের, বিশেষ করে শিক্ষিত ও সুবিধাভোগী শ্রেণির যারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবেই হয়তো একদিন, কোনো এক ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত হবে গার্গী মৈত্রেয়ী সীতার মতো অগণিত নারীর হা-হুতাশ, চাপা-দীর্ঘশ্বাস, না-বলা করুণ কাহিনি কিংবা হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো।
আবদুল্লাহ আল-আমিন: অধ্যাপক, লেখক ও প্রাবন্ধিক




