কথা-পরিবার
তোমার কথা বলা শেষ হলে
তোমার কথাগুলোর সঙ্গেই কথা বলতে থাকি আমি।
কথাগুলো তোমার সহোদর বোনের মতো,
সখীদের মতো, দাদিমার মতো
তুমি না থাকলেও
ওরা আমাকে ঠিকঠাক যত্ন করে,
আদর করে, উপহাস করে।
দাদিমা-কথারা বলে
‘কী গো জামাই,
আমার নাতিন তোমার খোঁজখবর রাখে তো?
একটু রাগি বটে, তবু পেয়েছ সরেস।’
সখী-কথারা বলে
‘বলেন তো জামাইবাবু,
এমন কী জাদু করেছেন আমাদের মধ্যমণিরে?’
তোমার সহোদরা কথা-বোনেরা
আমার বাহুর ভেতর ঘুমিয়ে পড়ে।
কথার শাশুড়ি এসে বলে
‘তোরা ছেলেটাকে এবার একটু ছাড়,
ঢের হয়েছে, নাওয়া-খাওয়া করতে দে।’
আর তুমি-কথারা দরোজার ওপাশ থেকে
মুচকি হাসো চোখের কটাক্ষে;
কিছু না বলেও বলতে থাকো বলার অধিক।
তুমি থাকলে কথারা উপেক্ষিত থাকে।
ওরা গা ঘেঁষে বসতে চায়, পারে না।
একটি কথার মানে খুলে যাওয়ার আগেই
আরেকটি কথা এসে দাঁড়ায় দরজায়।
কথারা যতই হোক তোমার আপন,
তুমি থাকলে কথাদের দিকে থাকে না মন।
আবার কথারা না থাকলে
তুমি এক নির্জন দ্বীপকন্যা।
কথারা এখন আমার কাছে আছে
তুমি নিশ্চিন্তে স্নান সারো,
কবরী বাঁধো,
কপট হেঁসেলঘরে যাও
মায়ের আহ্লাদি মেয়ে হয়ে।
আমি বেশ আছি
তোমার কথাদের প্রযত্নে।
পাগলা কবিতা
অনেকদিন তুমি ঘোরের মধ্যে ছিলে, অনেকদিন।
অনেকদিন তুমি কবিতার মধ্যে ছিলে, অনেকদিন।
কবিতা মানে তো ঈশান কোণে মেঘ জমা,
কবিতা মানে ঝড়ের পূর্বাভাস।
ঝড় যে হবেই তার মানে নেই—
তবে হতেও পারে।
ঝড় হলো পাগলা হাওয়া,
আর পাগলা কথারাই কবিতা।
তুমি কবিতার মধ্যে আছ মানে
ইচ্ছে হলে তুমি
নিজের গোপন আচ্ছাদন খুলে
উড়িয়ে দেবে বাতাসে;
ঝুমবৃষ্টি সাইকেল চেপে
তোমার মাথায় করবে পাড়া।
মায়েরা ছেলেদের বলবে
দেখ, চৌধুরীবাড়ির মেয়ে!
এমন মেয়েকে কোলে নেওয়ার শখ
কতদিনের।
তাদের ছেলেদেরও ইচ্ছে হয়,
কিন্তু তারা ঝুমবৃষ্টিতে ভিজতে জানে না।
সবাই তো কবিতা লিখতেও জানে না,
অনেকে কবিতা শুনতেও জানে না।
কিন্তু তুমি নিজেই কবিতার মতো
উদ্দাম, অনিয়ন্ত্রিত।
প্রতিটি শব্দের উচ্চারণে
যে ঝংকার ওঠে,
সশব্দে নামে বজ্রপাত।
তোমার বিভঙ্গ
কবিতা হয়ে ওঠে
কবির সর্বনাশ।
কবিতা, যৌথ অক্ষমতা
আজ তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখা হয়নি।
কবিতা লেখা হয়নি মানে
তোমাকে আদর করা হয়নি।
আমি কবিতা দিয়েই তোমাকে ছুঁই,
কবিতা দিয়েই করি আদর,
কবিতা দিয়েই ধরে রাখি
তোমার অভিমান।
তুমি কথা না বললে
কবিতাগুলো আমার সঙ্গে কথা বলে।
ওরা হাসে, কাঁদে,
উরুর ওপর শুয়ে পড়ে।
তুমি তো সব সময় আসতে পারো না,
মুখটা বুকের কাছে টেনে নিতে পারো না।
তখন কবিতারাই আমাকে জড়িয়ে থাকে।
তুমি এত দূরে থাকো
মাঝখানে রাজ্যের নির্দয় পুলিশ,
ইমিগ্রেশন, সীমান্তের সিলমোহর।
কবিতা ছাড়া আর কে পারে
এসব অতিক্রম করতে?
কখনো যদি দয়াপরবশ হয় রাজার পুলিশ,
তখনও থাকে সাতপাঁকের বেড়া,
লোকাচারের দেওয়াল।
কবিতা ছাড়া কে আছে জগতে
এত বন্ধনহীন, এত সর্বত্রগামী?
তাই আমার হয়ে কবিতাগুলো
তোমাকে আদর করে।
জিভ থেকে জিভে ছড়িয়ে পড়ে
আমাদের জলজ প্রবাহ।
থেমে নেই আমাদের দূরগামী জাহাজ।
সমুদ্র সন্তরণ শেষে
আজ বুঝতে পারি
কবিতাগুলো জন্ম নেয়
আমাদের যৌথ অক্ষমতা থেকে;
আমাদের বিদেহী মিলনের
অদৃশ্য সমাপ্তির জন্য।
রুমাল
রুমালে তুলেছিলে ফুল, রেখেছিলে বুকের গভীরে;
অনেক দিনের কথা কতকাল আগে গেছ ফিরে।
থোকা থোকা অন্ধকার, একটি গাছ নির্জন একা,
সেই স্মৃতি এঁকেছিল প্রথম তোমার সঙ্গে দেখা।
চামচিকে উড়েছিল, উপস্থিতি পেয়েছিল টের;
তার ডানার ঝাপটা রয়ে গেছে সুচিকর্মের ফের।
যত না এঁকেছিলে, তার চেয়ে অনুক্ত ছিল ঢের;
ইঙ্গিতের ভাষা হলেও কেউ পেয়েছিল টের।
কলেজ হয়েছিল বন্ধ, গিয়েছিলে গ্রীষ্মের ছুটিতে;
কত ভয়, কত সংকটে রুমাল তুলে দিলে মুঠিতে।
একটি রঙিন ফুল, মৌমাছির ডানার গুঞ্জরণ
সেইখানে থেমেছিল মুহূর্তে পৃথিবীর ক্ষণ।
অনেক দিনের কথা, কোথায় রেখেছ সেই রুমাল?
বিস্মৃত হয়েছ সব আমার মনে হয় গতকাল।
মহাজাগতিক
তুমি যে নক্ষত্রজাত,
তার ছায়া পৃথিবীতে পড়েছিল কাল;
দু-একটি টেলিস্কোপ
আগেই বানিয়েছিলেন গ্যালিলিও, হাবল।
সমুদ্রের জরায়ুতে এসেছিলে ভেসে
যে-সব আলোর কণিকা,
মহাকাশ গবেষণা শেষে
আবিষ্কৃত হলো সেই সুদূর নীহারিকা।
শত সহস্র কোটি বছরের যাত্রায়
কতবার নক্ষত্রের ধূলিঝড়,
কত ছায়াপথ, কত মিল্কিওয়ে পেরিয়ে
এখানে বেঁধেছিল ঘর।
সময়ের দিনক্ষণ, মাতৃগর্ভ
আজ আর নেই আমাদের মনে;
তবু স্বাতী-নক্ষত্রের অস্থিরতা
রয়ে গেছে কশেরুকার গোপনে।
কয়েক কোটি আলোকবর্ষ পেরিয়ে
শূন্যের ক্ষণিক স্টেশনে
তত্ত্বের বেড়াজালে এসে
থিতু হয়েছিল আমাদের মন।
যদিও জানতাম নারী ও পুরুষ;
তবু গ্যাস, জল, বায়ুর অম্লজান নিয়ে
সবুজ পল্লবের ভেতর
হেসে উঠেছিল ফুলগুলি।
জন্মের রহস্য নিয়ে
আজও অমীমাংসিত তর্কের বিবাদ;
কবিতা ও বিজ্ঞান অনুমেয় থেকে যাবে,
থেকে যাবে ধর্ম, দর্শন, মতবাদ।
ছবির বয়স নিয়ে আর থাকব না
অমীমাংসার বেড়াজালে;
তুমি আর আমি শুধু কাছাকাছি থেকে
চুম্বন এঁকে দেব গালে।




