বাবুল সিদ্দিক
সত্যজিৎ রায় তার ‘ কাঞ্চনজঙ্ঘা ‘ সিনেমার একটি দৃশ্যের জন্য একটি বিশেষ নামের পাখি খুঁজছিলেন। এক বৃদ্ধ এসে সত্যজিৎ রায়কে বললেল, “ আপনি আসলে কোন পাখি খুঁজছেন ? “
সত্যজিৎ রায় বললেন,“ পাখির নাম ‘ হিমালয়ান বার্ড “
বৃদ্ধ বললেল, “ এই নামে কোন পাখি নাই। “
সত্যজিৎ রায় বললেন, “ আছে “
বৃদ্ধ বললেল, “ আমি বলছি নেই এবং অবশ্যই নেই।”
সত্যজিৎ রায় বৃদ্ধের দিকে তাকালেন। মুখে সাদা দাড়ি, কন্ঠস্বর ভাঙা, শরীরে কোন শ্রী নেই। দেখলে মনে হয় পাগল। সত্যজিৎ রায় বিরক্ত হয়ে সহকারীকে বললেন, “ এই বুড়োকে সরিয়ে দাও।”
সহকারী বুডো লোকটিকে শুধু সরিয়েই দিল না, গাড়িতে তুলে দিল। তারপর সত্যজিতের কাছে এসে বললো, “বুড়োকে সড়িয়ে দিয়েছি।”
এর কিছুক্ষণ পর সহকারী পরিচালক হন্তদন্ত হয়ে সত্যজিৎ রায়ের রূমে ঢুকে বললেন, “ ভারতবর্ষের খ্যাতিমান পক্ষী বিশারদ সালিম আলী আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন, তিনি কোথায় ? “
সত্যজিৎ রায় বললেল, “দেখতে কেমন ? “
— “ বুড়ো, মুখে দাড়ি, কন্ঠস্বর ভাঙা।”
সত্যজিৎ রায় লজ্জায় মাথা নিচু করে বললেন,
“ তাকে তো আমি পাগল মনে করে তাড়িয়ে দিয়েছি, কি লজ্জার ব্যাপার।”
ছোট বেলায় পিতা মাতা হারিয়ে মামার আশ্রয়ে লালিত পালিত হতে থাকেন সালিম আলী । মামা আমিরুদ্দিন ছিলেন নামকরা শিকারী। ছোট বেলায়ই মামার কাছ থেকে একটি এয়ারগান উপহার পান। সেটি দিয়ে নানা ধরনের পাখি শিকার করে বেড়াতেন। তো, একদিন একটি চড়ুই শিকার করে হাতে নিয়ে দেখলেন, তার গলায় হলদে দাগ, যা অন্য চড়ুইদের মাঝে দেখেন নি। দৌড়ে মামার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাস করলেন, এ পাখিটা নাম কি ? মামা নিজেও চিনতে পারেন নি। তাকে পাঠিয়ে দেন ‘ বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির’ সেক্রেটারি ওয়েল্টার স্যামুয়েল মিলাডের কাছে। মিলাড পাখিটির আসল পরিচয় বলে দেন। মিলাড সালিম আলীকে তার সংগ্রহে থাকা বিভিন্ন ধরনের পাখির স্টাফ করা দেহ দেখান। সোসাইটির ভেতরে দেয়াল জুড়ে মাউন্ট করা জীবজন্তু, শোকেসে সাজানো প্রজাপতি ও পাখিদের ডিম, দেয়ালে টানানো চিতাবাঘ, বাঘের মাথার খুলি দেখান। প্রথমবার এসব দেখে সালিমের ছোট্ট মনে একরাশ বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়, তৈরী হয় কৌতুক। সেই কৌতূহলই সালিম আলীর বদলে দিয়েছিল।
সালিম আলী নাম সুপরিচিত হলেও সেলিম আলী তার আসল নাম। জন্ম ১২ নভেম্বর, ১৮৯৬ সাল। একজন সাধারণ পাখি পর্যবেক্ষক থেকে তিনি বিশ্বের প্রবাদপ্রতিম পক্ষীবিশারদ হয়েছিলেন। সালিম আলী হায়দ্রাবাদ, ত্রিবাঙ্কুর, কোচিন, ইন্দর, ভূপাল, হিমাচল প্রদেশ, গাড়োয়াল এমন কি পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তিব্বত, ভূটান, অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে তিনি পাখিদের ওপর অসামান্য বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার কাজ চালিয়ে ছিলেন। লিখেছেন বহু প্রবন্ধ, নিবন্ধ। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত হলো তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্যা বুক অব ইন্ডিয়ান বার্ডস’। বইটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই প্রায় ৪৫ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল।
তবে সালিম আলীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো ১০ বছর ধরে তার লেখা ১০ খন্ডের অত্যাশ্চর্য বই, নাম ‘হ্যান্ডবুক অব দা বার্ডস অব ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান’। তিনি প্রথম যিনি ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ অরনিথোলজিস্ট ইউনিয়ন কর্তৃক ইংরেজ না হয়েও স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন।
ভারত সরকার তাকে ১৯৫৮ সালে পদ্মভূষণ এবং ১৯৭৬ সালে পদ্মবিভূষণ পদকে সন্মানিত করে। ১৯৭৬ সালে পরিবেশ বিষয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ‘পল গেটি অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সালিম আলীর আত্মজীবনী ‘দ্যা ফল এ স্প্যারো’ বাংলায় যার অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ‘চড়াই উৎরাই’ নামে, অনুবাদক সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। সেই জীবনীতে তিনি লিখেছিলেন “অস্তিত্বপ্রবঞ্চক সভ্যতার দ্রুতবেগের এই যান্ত্রিক যুগে কোলাহলময় ডামাডোল থেকে আমার মুক্তির রাস্তা হলো পাখি দেখা।’
সেই মুক্তির রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই কবেই যেন তিনি হয়ে গেলেন ভারতের ‘বার্ড ম্যান’। ২০ জুন ১৯৮৭ একানব্বই বৎসর বয়সে ভারতবর্ষের এই ‘বার্ড ম্যান’ সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে চিরতরে উড়ে গেলেন অচিনপুরের দিকে।
বাবুল সিদ্দিক, প্রাবন্ধিক




