এখন সময়:রাত ৩:৩৭- আজ: রবিবার-২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৩:৩৭- আজ: রবিবার
২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

আইজাক সিঙ্গার : তাঁর শোশা তাঁর অনন্যতা

মহীবুল আজিজ

আইজাক সিঙ্গার তাঁর একমাত্র সন্তান তাঁর ছেলে এবং স্ত্রীকে রেখে পোল্যান্ডের ওয়ারশ ছেড়ে আমেরিকা চলে যান ১৯৩৫ সালে। ছেলের তখন পাঁচ বছর বয়স। পিতা-পুত্রের পুনরায় দেখা হয় এর কুড়ি বছর পরে ন্যুইয়র্কে। সিঙ্গারের গল্পগ্রন্থ আ ফ্রেন্ড অব কাফকা গল্পগ্রন্থের ‘পুত্র’ গল্পটির কথা মনে পড়ে যেখানে তিনি পিতা-পুত্রের এই বিষয়টিকে তুলে আনেন গল্পে। সিঙ্গারের ছেলে ১৯৭৮ সালে তাঁর পিতার সঙ্গে স্টকহোমে যান পিতার নোবেল পুরস্কার গ্রহণ-অনুষ্ঠানে। কিন্তু পিতার প্রতি তীব্র ক্ষোভ আর মনোবেদনায় পুত্র ইজরায়েল আর কখনোই প্রত্যাখ্যাত পিতৃনামকে নিজের নামের অংশ করেন নি। তিনি ইজরায়েল জামির। আমাদের মনে পড়তে পারে অস্কার ওয়াইল্ডের কথা। ওয়াইল্ডের জীবনে সমকামিতার অভিযোগ, বিচার, কারাবরণ, জনসাধারণ্যে তাঁর অসম্মান ইত্যাদি ঘটনায় বীতশ্রদ্ধ তাঁর স্ত্রী কন্সট্যান্স তাঁদের দুই পুত্র সিরিল এবং বিভিয়্যানের নাম থেকে পিতার পদবি ঝেড়ে ফেলে সেখানে জুড়ে দেন তাঁর নিজের বংশের এক পূর্বপুরুষের ‘হল্যান্ড’ পদবি। সিঙ্গার কেন আমেরিকা চলে যান সে-বিষয়ে পরে তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনাতে লিখেওছিলেন অকপটে। ঈডিশ, তাঁর মাতৃভাষায় লিখতে শুরু করার কিছুকাল পরেই তাঁর মনে দৃঢ় একটা বিশ্বাস জন্মেছিল, তিনি সাহিত্যে নোবেল পাবেন। আর সেজন্যেই সমস্ত পিছুটান ফেলে পাড়ি জমান আমেরিকায়। সেখানে গিয়ে আবার বিয়ে করেন। নতুন স্ত্রীকে জানিয়ে দেন, তাঁর আর কোনো সন্তানের প্রয়োজন নেই কারণ পোল্যান্ডে রেখে আসা স্ত্রীর সূত্রে ইতোমধ্যে তাঁর সন্তানলাভের ঘটনা ঘটে গেছে। তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাহিত্যসাধনা।

আইজাক সিঙ্গার ঈডিশ ভাষার লেখক। এ-ভাষাকে তিনি বিশ্বসাহিত্যের ভিটামিন বলে অভিহিত করেন তাঁর নোবেল ব্ক্তৃতায়। বস্তুত পৃথিবীজুড়ে ঈডিশ ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্ম নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যে-ভৌগোলিক সীমানায় এ-ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ এবং এ-ভাষার সাহিত্যের বিবর্তন সেই সীমাটাই এখন ঐতিহাসিকভাবে বিলুপ্ত। উল্টো করে বললে, ভূগোলটি রয়েছে ঠিকই কিন্তু সেখানকার মানুষজন আজ আর নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিটলারি নরমেধযজ্ঞ ও আগ্রাসনের পরিণাম ঈডিশবাসী মানুষদের অপমৃত্যু ও দেশত্যাগ। বর্তমানে এই জনগোষ্ঠী মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ইউরোপের নানা জায়গায় ছড়ানো ছিটানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিশক্তির হাতে নিহত হয় প্রায় ষাট লক্ষ লোক, যাদের শতকরা ৮০ ভাগ ছিল ঈডিশভাষী। সে-অর্থে আইজাক সিঙ্গারের ভাষায় রচিত সাহিত্যের ভাষীগত জগতটি যথেষ্ট সংকুচিত। এরকম প্রায় অপরিচিত একটি ভাষায় সাহিত্য রচনা করেও কেবল সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি, অভূতপূর্ব মানবিকতা, ইতিহাস-উপকথার অপরূপ ব্যবহার, মানবচরিত্র বিশ্লেষণের অসাধারণ ক্ষমতা প্রভৃতি বিশেষত্বে মণ্ডিত তাঁর গল্প-উপন্যাস এখন বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ। শোশা তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ ও মানব-পরিস্থিতির এক অমর শিল্পরূপ উদ্ভাসিত।

সিঙ্গারের জন্ম পোল্যান্ডে এক গোঁড়া ইহুদি পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন র্যাবাই— একটি ধর্মীয় পারিবারিক আদালত পরিচালনা করতেন। ধর্মীয় অনুশাসনের কঠিন প্রহরায় শৈশব-কৈশোর কাটে সিঙ্গারের। তবে পিতার পারিবারিক আদালতের নানা কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করার সুযোগে শৈশব থেকেই বাইরের জীবন ও সমাজের বিভিন্ন মানুষ ও ঘটনা সম্পর্কে অর্জিত হয় প্রভূত অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন উপন্যাস ছাড়াও শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিনির্ভর আত্মকথা ইন মাই ফাদারস্ কোর্ট-এ তাঁর শৈশবে দেখা পোল্যান্ড এবং ইহুদি জনজীবনের প্রাণময় বিবরণ দেখি। ক্র্যাকফ নামের যে-গ্রামে তাঁর জন্ম সেটি একদিকে সমকালীন পোল্যান্ডের ইহুদি জীবনধারার আকর-ভূগোল, অন্যদিকে তা পেয়েছে সিঙ্গারের নিজস্ব উপনিবেশের স্বীকৃতি। কিন্তু শুধু পোল্যান্ড নয় তাঁর সীমানা আরও বহুদূর বিস্তৃত। ১৯৯১ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আমেরিকার অধিবাসী সিঙ্গার ভুলতে পারেন নি তাঁর জন্মভূমিকে। পোল্যান্ডের অভিবাসী ইহুদি, যুদ্ধে সংকটগ্রস্ত মানুষ, যুদ্ধোত্তর দেশত্যাগী ইহুদি ছাড়াও পুরনো জীবন ছেড়ে নতুন দেশ-সংস্কৃতিতে অভিপ্রয়াণকৃত মানুষের বিচিত্র ছবিতে ভরা তাঁর সাহিত্যভুবন। এতো অল্পসংখ্যক মানুষের ভাষার সীমানা পূর্ব ইউরোপ থেকে আমেরিকা, স্টকহোম হয়ে ইংরেজি ভাষার সূত্রে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে এটা বিশ্বাস করাটা ছিল কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু সিঙ্গার হয়তোবা ছিলেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা অথবা নিজের সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষমতায় প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। নিজেকে নয় কেবল ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর সাহিত্যের জনজীবনটাকেও পৃথিবীময়।

সিঙ্গারের পিতা র্যাবাই হলেও তাঁর মনমানসিকতা জীবনরসে ভরপুর। ইন মাই ফাদারস্ কোর্ট ছাড়াও আমেরিকার স্মৃতিকথা লাভ অ্যান্ড এক্সাইল-এ পিতার সেই চরিত্রটি জীবন্ত। পেন্টাটয়েক, গেমারা এবং আরও নানা ধমীয় বিষয়ের টীকাভাষ্য রচয়িতা হিসেবে খ্যাতি কুড়ান তিনি। সিঙ্গারের বড়ো ভাই ইজরায়েল জশুয়া সিঙ্গারের কথাও বলা যায়। বিখ্যাত উপন্যাস দ্য ব্রাদার্স আশখেনাজি-র রচয়িতা জশুয়া বাশেভিসের নিকটে এক ভ্রাতাই নন, ছিলেন বন্ধু ও দার্শনিকও। বলতে গেলে অগ্রজের সূত্রেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসার পাঠ। জশুয়া এবং বাশেভিস দু’জনেই নিজস্ব ঐতিহ্য, রক্ষণশীলতা প্রভৃতি প্রাচীনতামুখী মানুষ এবং একই সঙ্গে আধুনিকতা, নাস্তিকতা, অবিশ্বাস অনাস্থাবাদী মানুষের জীবনকে এঁকেছেন। কখনো মনে হয় আইজাক তাঁর বাবার মতোন গোঁড়া ধার্মিক, কখনো মনে হয় জশুয়া’র মতোন উদার মুক্তমনা। আসলে তাঁদের পারিবারিক জীবনের এই মিশ্র সংস্কৃতি ও ভাবধারা সমগ্র ইহুদি জাতিরই আন্তর বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। সেখানে মানুষ যেমন বিনা প্রশ্নে সবকিছুকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে মেনে নেয়, এমনকি আউশভিচ-ডাচাওয়ের অগ্নিকুণ্ডকেও, আবার হিটলারের স্রষ্টা ঈশ্বরকে ছুঁড়ে দেয় তীব্র প্রশ্ন। সমালোচকদের দৃষ্টিতে আইজাক সিঙ্গার এমন একজন রহস্যময় মানুষ যিনি পুরোপুরি ধার্মিক নন, আবার নন পুরনোকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগকারী রূপান্তরিত মানুষও। দ্য ম্যাজিশিয়ান অব লুবলিন-এ জাদুকর ইয়াশা মাজুর-এর অস্তিত্ব ও পরিপার্শ্ব লৌকিকতা-অলৌকিকতার স্পর্শমোড়ানো। আবার, এনিমি: আ লাভ স্টোরি-তে নায়ক চরিত্রটি তিন রমণীর গোলকধাঁধার মধ্যে এমন ঘুরপাক খায় যেটিকে অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হয়। এটা কী প্রকৃতই বাস্তব নাকি সিঙ্গারের কল্পনা তেমন একটা ধাঁধা পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলিতে উপন্যাসের নায়ক একটি খড়ের গাদার কুঠুরির মধ্যে আত্মগোপন করে কাটিয়ে দেয় কয়েকটা বছর। পরে, যুদ্ধশেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে বহু ঝড়ঝঞ্ঝা উজিয়ে সে আশ্রিত আমেরিকায়। তার পোলিশ স্ত্রী গ্যাসচেম্বারে নিহত বলে জানা যায়। কৃতজ্ঞতার বশে খড়ের গাদায় আশ্রয় দেওয়া খ্রিস্টান বড়োলোকের কন্যাকে সে গ্রহণ করে বধূরূপে। আবার, অন্য এক রমণির সঙ্গে সে জড়িয়ে যায় পরকীয়ায়। এই তিনের চক্রে তার জীবনটা এক মারাত্মক ট্র্যাজেডি’র নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ ও সমাজের তৈরি এক কৌতুক ও ব্যঙ্গের কাহিনি শোনান সিঙ্গার যেটি মানুষেরই নিষ্ঠুরতারও অভিব্যক্তি। সেটা হতে পারে প্রেম, হতে পারে গ্যাসচেম্বার, হতে পারে সামন্তশোষণ কিংবা সামাজিক উচ্চ ও নিম্নবর্গের পারস্পরিকতার অযুত কাহিনি। ‘প্যারিস রিভ্যু’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিঙ্গার বলেন, মানুষের যন্ত্রণার শেষ দেখতে পান না তিনি। যখনই মনে হয় যে একটা যন্ত্রণার শেষ তখনই সেই মানুষ আবিষ্কার করবে নতুন যন্ত্রণাকে এবং এভাবেই তা চলতে থাকে এক অনিঃশেষ চক্রের মতোন।

আইজাক সিঙ্গারের উপন্যাসগুলো পড়লে মনে হয় কোথাও কোনো খোড়লের মধ্যে থাকা বিচ্ছিন্নতাই হয়তোবা আদি বোধ। এমন বোধের দেখি জাতিগত শেকড়ও। শোশা’র নায়ক এ্যারন গ্রাইডিঙ্গার বলে, নয়শো বছর ধরে পোল্যান্ডে বসবাস করেও ইহুদিরা পোলিশ হতে পারে নি, তারা ইহুদিই। এই যাত্রার শুরু সেই বাইবেলের জেনেসিস-এ। ইহুদি জনগোষ্ঠির মূল বারোটি গোত্রের মধ্যে দশটাই দেশান্তরী। সুদূর মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে পৃথিবীর নানা দেশে ঘটেছে তাদের মাইগ্রেশন বা অভিপ্রয়াণ। ভারতের কোচিন কিংবা ইউক্রেন-লাতভিয়ার ইহুদিও তাই স্বপ্ন দেখে পবিত্র ভূমির— বাইবেল কথিত মোজেসের হোমল্যান্ডের। জন্ম থেকেই সে জানে যে সে যেখানকার বাসিন্দা সেখানকার মানুষ আসলে অস্বীকার করে তাকে, চায় না তাকে, তাই সেখানে তার পক্ষে জীবনের প্রতি ভালোবাসা জিঁইয়ে রাখা দুরূহই বটে। জন্ম থেকেই শুরু তার অস্তিত্বের লড়াই। যেদেশে জন্ম যে-মাটিতে বেড়ে ওঠা সেখানেই সে ‘অপর’। একটা ট্রমাক্রান্ত ভ্রূণের বেড়ে ওঠা ও ক্রমে বিচ্ছিন্ন হতে থাকা তার সেই অস্তিত্বের লড়াইয়ের কেন্দ্রীয় সুর। শোশা উপন্যাসের একটি চরিত্র তাই খুব নির্বিকারভাবে উচ্চারণ করে এক নির্মম সত্য: “হিটলার ও তার সৈন্যরা এসে যখন ইহুদিদের হত্যা করবে তখন পোলিশরা এই ভেবে খুশি হবে যে যাক হিটলার ওদের হয়ে কাজটা করে দিল।” কী মর্মন্তুদ উপলব্ধি। একই স্বদেশি মানুষ কেবল ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে দূরের হয়ে যায়, আবার দূরের বিদেশি নিকট হয় সে-ও একই ধর্মীয় কারণেই। এই বাস্তবতা আজও মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয় নি।

একটি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের সমগ্র জীবন পরিচালিত, সেই বিশ্বাসের মূল ‘পবিত্র ভূমি’ এবং সেই ভূমিতে তাদের নিয়ে যেতে পারেন একমাত্র ‘ত্রাণকর্তা’। পোল্যান্ডে বসবাসরত প্রতিটি ইহুদির তাই দৃঢ় বিশ্বাস, একদিন মহান ত্রাণকর্তার আবির্ভাব ঘটবে এবং তারা সবাই উপনীত হবে পবিত্র ভূমি ইজরায়েলে। ফলে হিটলার ও তার দ্বারা সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞকেও অনেকে গভীর বিশ্বাসে মনে করে ত্রাণকর্তা বা ‘মেসায়া’-আগমনের পূর্বলক্ষণ। যারা যুগ-যুগ ধরে পোল্যান্ডবাসী অথচ যারা জন্ম থেকে বিচ্ছিন্নতার বোধে আক্রান্ত, যাদের চোখে জীবনের মূল লক্ষ্য হলো পবিত্র ভূমির স্বপ্ন, শোশা তাদেরই কাহিনি। কিন্তু এ-কাহিনি বড়ো করুণ বেদনাঘন। শোশা-য় দেখি নায়ক এ্যারনের পিতা এবং অন্যান্য প্রথাবাদী মানুষেরা এক কঠিন বৃত্তে আবদ্ধ। তাদের প্রতিটি মুহূর্ত ঈশ্বরভাবনায় চিহ্নিত। পোশাকে-আশাকে তারা সাধারণ পোলিশদের চাইতে ভিন্ন। দীর্ঘ জুলফি, শ্মশ্রুমণ্ডিত, লম্বা জোব্বাধারী, টুপি পরিহিত তাদের গলায় ঝোলে তাওরাত-গ্রন্থ। সুতিবস্ত্র ছাড়া উল-নাইলন ইত্যাদি যে-কোনো কাপড় তাদের জন্য নিষিদ্ধ। তাদের দরজায় সাঁটা থাকে ‘মেজুজা’— চামড়ায় গাঁথা তাওরাতের বাণী। তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শুরু হয় ইয়েশিবা অর্থাৎ ধর্মীয় পাঠশালায়। তাওরাতের নির্দেশনার বাইরে অন্য কিছুই করণীয় নেই তাদের পক্ষে। এদের মধ্যে যারা হাসিদ, এক বিশেষ ধরনের গোঁড়া ইহুদি, তাদের জীবন আরও কঠিন। ঈডিশবাসী এই জনগোষ্ঠি নিজেদেরকে কঠিন জীবনবৃত্তে রেখে কারও কোনো ক্ষতিসাধন ব্যতিরেকে কাটিয়ে দিয়েছে যুগের পর যুগ। অথচ এরাই সর্বাধিক বলী হয়েছে পশুশক্তির নিকটে। প্রাণ হারিয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদী কিংবা ধর্মবিদ্বেষীদের হাতে। পূর্ব-ইউরোপের ইহুদি-ম্যাসাকার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইহুদিনিধন গ্রন্থিবদ্ধ একই সুতোয়। হিটলারের পূর্বসূরী বোগদান খেমিয়েলনিকি যে সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরীহ জনগোষ্ঠির ওপর। আইজাক সিঙ্গার তাঁর শোশা-য় যে-জনগোষ্ঠীর জীবনকাহিনি শোনান আজ তারা ইতিহাস — তাদের আর কোথাও পাওয়া যাবে না। একদিন তারা এক প্রবল জীবনের তরঙ্গ পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিল। এখন তাদের সেই জীবন সিঙ্গার ও অন্যান্য লেখকের সাহিত্যপৃথিবীতে অন্তর্র্বতী।

প্রতিটি মহৎ উপন্যাসই এক অর্থে আত্মজৈবনিক। শোশা-ও কমবেশি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, যদিও প্রত্যক্ষ আত্মজীবনী এটি নয়। লাভ এ্যান্ড এক্সাইল নামক আত্মজীবনীতে সিঙ্গার শোশা নাম্নী মেয়েটির বাস্তবতাকে স্বীকার করেন। পোল্যান্ডের ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা ক্রোখমালনা স্ট্রিটে মেয়েটি ছিল তাঁদের প্রতিবেশি। ক্রোখমালনা বাস্তবিক পোলিশ ইহুদিদের নগরজীবনের প্রাণকেন্দ্র ছিল। এলাকাটি উপন্যাসে এর বিচিত্র মানুষ, ঘটনা আর চরিত্র-চিত্র নিয়ে বাক্সময়। ক্রোখমালনার পারিবারিক সামাজিক জীবন, উৎসব, সংস্কার-বিশ্বাস এইসব আজ ইতিহাসের উপাদান। এর সঙ্গে মিশেছে সেই ইতিহাসে নিহিত এক অপেক্ষার কাহিনি। কেউ অপেক্ষা করে ত্রাণকর্তার, কেউ হিটলারের। তাদের বিশ্বাস যুদ্ধ, ধ্বংস, মৃত্যু এইসব পেরিয়ে তবেই আসবেন ত্রাতা। জার্মানিতে তখন ইহুদি-বিদ্বেষ চরমে। ক্ষমতায় হিটলার এবং ইহুদিদের চিহ্নিত করা হয়েছে হলুদ রংয়ের ডেভিড-তারকা দিয়ে। আশেপাশে গর্জনরত ‘হের হিটলার’-এর দল। শোশা-য় প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’র পরিধিতে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছরের কাহিনি বিধৃত। এই সময়পর্বের মধ্যে সুদীর্ঘকালের ধারায় প্রবহমান পূর্ব-ইউরোপের এক প্রাচীন সংস্কৃতি এর আধার জাতিত্বসহ উপড়ে চলে যায়। যেন মিলিয়ে যায় সহসা হাওয়ায় স্পন্দিত জীবনের এক বিবর্তমান বৃক্ষ। শোশা’র নায়ক এ্যারন যার মধ্যে দু’টি ধারার সংমিশ্রণ, সে এই ধ্বংস ও বিবর্তনের সাক্ষী। গোঁড়া ইহুদির সন্তান হলেও এ্যারন বেছে নেয় মধ্যবর্তী পথ। ধর্মীয় পাঠশালা, ধর্মগ্রন্থ, রীতিনীতির বৃত্ত ছেড়ে সে পা বাড়ায় আধুনিক জীবনের বিস্তৃত অঙ্গনে। ব্যক্তিগত জীবনে সিঙ্গারও খানিকটা এ্যারনের মতোই। এ্যারনের মতো তার জীবনেও এসেছিল একাধিক নারী। শোশা নামের মেয়েটি সমস্ত চলমানতা, উত্থান-পতন, তরঙ্গ এ সবের মধ্যে এক বৃদ্ধি-অসম্ভব প্রাণ। তার কোনো বিকাশ নেই, গতি নেই— চারপাশের গতি ও চলমানতার মধ্যে সে যেন এক স্থির সত্তা। শোশা’র সত্তার এমন চিত্রণের একটা প্রতীকী ব্যঞ্জনা রয়েছে। যে-ইহুদি জাতি এর বিচিত্র প্রাচীন প্রথায় আটকে থাকতে চায়, সমস্ত দরজা-জানলা রুদ্ধ রেখে কেবল স্বর্গ-নরকের হিসাব করে তার তো কোনো বৃদ্ধি-বিকাশ থাকবার কথা নয়। শোশাও যেন তাই। তার শৈশব-কৈশোর ছিল, এ্যারন তাকে বিয়েও করেছে। শোশা একসময় মারা পড়েছে হিটলারের গেস্টাপো’র হাতে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথে। বাস্তবিক বাড়ে নি শোশা, একই রয়ে গেছে পূর্বাপর। এ্যারনের পাক্তন প্রেমিকা ডোরা স্টোলনিজ বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী বিপ্লববাদী নারী। কিন্তু ডোরা’র প্রেমিক এ্যারন ঘোরতর সমাজতন্ত্রবিরোধী। সিঙ্গার নিজেও ছিলেন সমাজতন্ত্রবিরোধী। কোনোরূপ তন্ত্র দিয়ে মানুষকে সীমাবদ্ধ করবার পক্ষে তিনি নন। উপন্যাসে একদিকে দেখবো সমাজতন্ত্রের প্রতি ডোরা’র মোহ, অন্যদিকে স্ট্যালিনের নির্যাতন-নিপীড়নের প্রসঙ্গ। শেষপর্যন্ত ডোরাকে এক পথভ্রান্ত পথিক মনে হয় যে আটকে গেছে ভুল আদর্শের গড্ডলে। এরপর বেটি ড্রাইম্যান। এই মার্কিন নারী ইহুদি হলেও কৌতূহলী দর্শক হয়ে ঢোকে ক্রোখমালনা স্ট্রিটে। তার চোখ দিয়ে লেখক দেখাচ্ছেন কীভাবে একটি প্রাচীন সভ্যতা ক্রমশ বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যায়। বেটি পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ধারক কিন্তু তার উৎসাহ প্রাচীন ইহুদিবাদী নাটকে। তার প্রবল ইচ্ছে নিজের নাট্যপ্রতিভা দিয়ে বিশ্বকে চমৎকৃত করা। কিন্তু তার সমস্ত আগ্রহ উদ্দীপনা মার খায় বিবিধ প্রতিকূলতার কাছে। ফলে বেটির মধ্যে জন্ম নেয় এক ধরনের অবিশ্বাস। তার ধারণা সমস্ত পৃথিবী তার সঙ্গে প্রতারণায় লিপ্ত উদ্দেশ্যমূলকভাবে। সকলেই তার শত্রু এবং সকলেই চায় তার উন্নতি না হোক। বেটির মধ্যে লেখক এমন এক আধুনিক সত্তার অনুসন্ধান চালান যে পাশ্চাত্য জীবনের যান্ত্রিকতা ভোগবাদিতায় ক্লান্ত বিপর্যস্ত। সে চায় এসবকে সরিয়ে দিয়ে একটা বিকল্প সুখি পথের সন্ধান। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা তার অনুকূলে নয়। কেবল বেটি নয় কারো বিকাশ কারো বিবর্তনই যেন আর সম্ভব নয় কোনোভাবে। সমস্ত কিছুকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য দলবল নিয়ে অগ্রবর্তী হিটলার। এ্যারনের চোখের সামনে দিয়ে সমস্ত প্রাচীনতা রূপ রস গন্ধ বর্ণ নিয়ে গুড়িয়ে যেতে থাকে ক্রোখমালনা। এটি কাকতাল নয়, যুদ্ধপরবর্তী বর্তমান পোল্যান্ডে ক্রোখমালনা কেন ইহুদিদের স্মৃতিবিজড়িত প্রায় সবকিছুই গেছে হারিয়ে। বিস্মৃতির এক ভারী পাথরের নিচে চাপা পড়ে যায় সমাজ সভ্যতা ইত্যাকার যাবতীয় গৌরবের স্মারক। জাতিবিদ্বেষ হতে পারে এমনই ভয়ানক। কেবল গনগনে অগ্নিকুণ্ডের স্মৃতি নিয়ে জেগে থাকে আউশভিচের কারাসীমানা আর মানবদাহচুল্লি।

আইজাক সিঙ্গার হয়তো ভবিষ্যতদ্রষ্টাই ছিলেন। জাতিবিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা আর ঘৃণার বাস্তবতা ছেড়ে বিপুল বৈচিত্র্যের দেশ আমেরিকায় পাড়ি জমান তিনি কেবল লেখালেখি দিয়েই বিশ্ব জয় করবার জন্য। তবে মার্কিন মুলুকে থেকেও তিনি ইংরেজিতে লেখার কথা ভাবেন নি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, যে-বর্ণিল জীবন তিনি পোল্যান্ড থেকে বয়ে নিয়ে আনেন, সারাজীবন লিখে গেলেও সেই ভাণ্ডার ফুরোবার নয়। তাঁর ঈডিশ লেখা প্রকাশিত হতে থাকে একের পর এক ‘জুয়িশ ডেইলি’ পত্রিকায়। পওের সেসব রচনা অনূদিত হতে থাকে অন্যান্য ভাষায়, বিশেষত ইংরেজিতে। প্রায় সারাদিন তিনি রেস্তোরাঁয় কাটাতেন, লেখালেখির রসদ সংগ্রহ করতেন সেখান থেকেও। নানা চরিত্রের মানুষদের পর্যবেক্ষণ করতেন সারাক্ষণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গ্যাসচেম্বার আউশভিচ ডাচাও থেকে শেষ মুহূর্তে রক্ষা পাওয়া বহু মানুষের কাহিনি তিনি সঞ্চয় করেন এভাবেই। সেগুলোর আশ্রয়ে রচনা করেন বহু গল্প-উপন্যাস। সাহিত্য তাঁর কাছে নিছক কালক্ষেপণের ব্যাপার ছিল না, ছিল জীবনকে পলে-পলে বুননের কাজ। সিঙ্গারের ছেলের লেখা ‘জার্নি টু মাই ফাদার’ পড়লেও বোঝা যায় পিতার এইসব গুণাবলি বিস্ময়ের উদ্রেক করে তাঁর মনে। পাশাপাশি সিঙ্গারের আত্মকথাগুলি মিলিয়ে পড়লে দেখবো নিজের সাহিত্যজগতের চরিত্রগুলিকে গড়ন দিতে খুব একটা কল্পনাপ্রবণ হতে হয় নি তাঁকে। এমনকি ‘গিম্পেল দ্য ফুল’ গল্পের সেই ছোকরা গিম্পেলকেও নয়, যে ময়দার ময়ান তৈরি করতে করতে ভাবতো পানির বদলে নিজের প্রস্রাব ব্যবহার করে সেই রুটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে বরং সেটা কাজের হয়। এইসব বিকৃত-চিত্তপ্রক্ষেপযুক্ত মানুষজনও বহু দেখেছিলেন সিঙ্গার। সেই দেখাটাকে লেখার জগতে কাজে লাগিয়েছিলেন ষোলো আনা। সিঙ্গারের নিকটে লেখালেখির মধ্যে তত্ত্বের প্রয়োগের চাইতেও অভিজ্ঞতার রসায়নের গুরুত্ব অধিক। ১৯৬৮ সালের হেমন্তে লেখালেখিতে মনোবিশ্লেষণকে সামাল দেওয়ার প্রসঙ্গে ‘প্যারিস রিভ্যু’র হ্যারল্ড ফ্লেন্ডারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিঙ্গার বলছেন, লেখক যদি মনোচিকিৎসকের চেম্বারে বসে সে-কাজটা করেন সেটা তাঁর ব্যাপার। আর সেটাকে যদি প্রয়োগ করতে চান লেখালেখির মধ্যে তাহলে সেটা এক ভয়ানক ব্যাপার। সিঙ্গার অলডুস হাক্সলি’র মনোবিশ্লেষণধর্মী ‘পয়েন্ট কাউন্টার পয়েন্ট’কে পছন্দ করেন নি। সিঙ্গারের মতে, হাক্সলি ফ্রয়েডিয় মনোবিশ্লেষণের আশ্রয়ে উপন্যাসটা লিখেছিলেন এবং সেখানে তাঁর প্রাপ্তি হলো ব্যর্থতা।

আইজাক সিঙ্গার, শোলেম আলাইকেম, আইজাক ব্যাবেল যে-কালবৃত্তের কাহিনি রচনা করে রেখে গেছেন তারা গেঁথে রয়েছে কেবল সময়ের গহিন ভেতরে, সেখানকার স্থানাঙ্কিত সমাজ আজ ইতিহাস। শোশা’য় ক্রোখমালনা স্ট্রিটের যে-বর্ণময় চিত্র পাই তা যে বাস্তবে নেই সেটা ভাবতেও অবাক লাগে। ক্রোখমালনা, রাওয়া রুস্কা, স্যাক্সোনি গার্ডেন, আয়রন স্ট্রিটের প্রাণচাঞ্চল্য, ইয়েনাশের হাট, দোকানপাট, বাদ-বিসংবাদ, দরকষাকষি, ইয়োম কিপুর, হানুকাহ্, তিশা বভের উপবাস এসবই আজ নৃতত্ত্বের বিষয়। বেটি ডোরা শোশা এ্যারন মরিস ফাইটেলজোন যে জীবনের ছবিটা রেখে যায় সেটিকে বুঝতে হলে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব এসবের প্রয়োজন। সিঙ্গারের রচনা সার্ত্র, কাম্যু কিংবা কাফকা’র মতো নয়। নিঃসঙ্গতা বা আত্মময়তা তাঁর লেখায় কম। ফ্লবেয়ার এবং দস্তয়েভস্কি দু’জনই প্রিয় লেখক সিঙ্গারের কিন্তু তিনি এর সঙ্গে সামাজিকতার এমন একটি মাত্রা যোগ করেন যে তা সমকালীন সমাজ ও জীবন ছাড়িয়ে আরও অনেকটা দূর পৌঁছায়। কখনো মনে হয় সিঙ্গার তার চাইতেও আরও অতীতের কাহিনি শোনাচ্ছেন কিন্তু সেখানে ইতিহাস থাকলেও তা ইতিহাসের মতো নয়, সেখানে মানুষ আর তাকে ঘিরে অযুত গল্পের বিচ্ছুরণ। দ্য স্লেভ, দ্য ম্যানর, এইসব উপন্যাসে দেখি যেন থামিয়ে দেওয়া হয়েছে সময় নামক প্রবাহকে। থামিয়ে দিয়ে তিনি দেখাতে চান, বলতে চান, দেখো আমাদের পূর্বপুরুষেরা ঠিক এরকমটি ছিল। আমরা বাহিত হয়েছি তাদের পথ ধরে, তারাও রয়ে গেছেন আমাদেরই মধ্যে। দ্য স্লেভ উপন্যাসে যে-মেয়েটি তার সামন্ত প্রভুর মনোরঞ্জন করে, বহুযুগ পরে বুঝি সেই মেয়েটাই শোশা’য় এসে দাঁড়ায় ক্রোখমালনার ঝুলবারান্দায়। তাকিয়ে দেখে হিটলারের সৈন্যরা মার্চপাস্ট করতে করতে চলে যাচ্ছে। জার্মাানির হিটলার দ্য স্লেভ-এও ছিল, পোল্যান্ডে, অন্য ধরনে। শোশা’য় যে-জীবনের তৎপরতা দেখি আমরা পাঠকেরা কিংবা দেখে এ্যারন তা যেন চলমান জীবনের শেষ টুকরোটি যে-জীবনের মঞ্চ আর কখনোই উন্মুক্ত হবে না কোথাও। উন্মুক্ত হলেও সেখানে দর্শক থাকবে হয়তো কিন্তু যারা পাত্রপাত্রী তাদের নিয়তি নির্ধারিত হয়ে গেছে। ফলে এ্যারন, শোশা, মইশে, জেলিগ, তাইবেলে এরা সব পারম্পর্যবিহীন একেকটি দ্বীপের মতোন। একমাত্র স্মৃতি নামক এক ক্ষমতাধর শক্তি দিয়ে তাদের তুলে আনেন সিঙ্গার। রক্ষা করেন তাদের বিস্মরণের হাত থেকে। তাই, বাস্তবে ক্রোখমালনা আর না থাকলেও এর যে সাহিত্যিক প্রতিরূপটি রয়ে গেছে সেটা অনেক বেশি জীবন্ত। পোল্যান্ডের যেসব ইহুদি-গ্রাম আজ ‘শ্টেট্ল্’ হয়ে আছে সোলেম আলাইকেম এবং অন্যদের রচনায়, সেরকম।

আইজাক সিঙ্গার যে-ভাষায় লিখে নোবেল পেয়েছেন সে-ভাষা ঈডিশভাষী লোকসংখ্যা খুব কম কিন্তু সিঙ্গারের সাহিত্য তাঁর ভাষার সীমানা ডিঙ্গিয়ে সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আমেরিকায় এসে একটা সময় তিনি মহাসংকটে পড়েন, পোল্যান্ড থেকে বয়ে নিয়ে আসা ঈডিশ ভাষা এবং মার্কিন দেশের ভাষার মধ্যকার দ্বন্দ্বে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। এমন অনেক শব্দ অভিব্যক্তির মধ্যে তিনি ঘুরপাক খেতে থাকেন যেগুলো তাঁর কাছে অচেনা, পোল্যান্ডে সেসব ছিল না। আর ঈডিশ যেহেতু খুব কম লোকের ভাষা তিনি ভাবেন, কার জন্য লিখবেন, কেনইবা লিখবেন। বহু বছর তাঁর কেটে যায় না-লিখতে পারার যন্ত্রণায়। আরও এক মৌলিক পার্থক্য ছিল ঈডিশ ভাষায় রচিত উপন্যাস আর পাশ্চাত্যের উপন্যাসের জীবন ও আদর্শ ইত্যাদি বিষয়ে। ঈডিশ উপন্যাসে, ইহুদি লেখকদের উপন্যাসে নায়ক ঠিক পাশ্চাত্যের উপন্যাসের নায়কের মতো নয়, পাশ্চাত্যের উপন্যাসের নায়কেরা হলো অতিমানবিক। অন্যদিকে ইহুদি উপন্যাসের নায়কেরা, ঈডিশ ভাষায় রচিত উপন্যাসের নায়কেরা তাদের মতো ‘অতি’ নয় বরং ‘ছোট’ লোক যারা দরিদ্র কিন্তু তাদের রয়েছে স্বঅস্তিত্বের অহংকার। তারা সর্বদা সংগ্রামী, লড়ুয়ে। সিঙ্গার তাঁর উপন্যাসের নায়কদের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, তারা ছোট লোক কারণ তারা বিপক্ষতার শিকার। সে এ্যান্টি-সেমিটিজমের শিকার, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির শিকার এবং আরও অনেক প্রতিকূলতার শিকার। গিম্পেলের উদাহরণ টেনে সিঙ্গার বলেন, সে বোকা হতে পারে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে ক্ষুদ্র নয় বরং জীবনের পৃষ্ঠদেশে দাঁড়ানো এক গর্বিত নায়ক।

ভাষার চারিত্র প্রসঙ্গে বলা যায় ঈডিশ এমন একটি ভাষা যেটির ভাব-অভিব্যক্তি ্ইরেজির মতো নয় বরং এটির সঙ্গে বাংলা ভাষার অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। বাংলার মতো সমষ্টিগত সামাজিক অভিব্যক্তি রয়েছে ঈডিশেও। যেমন শোশা উপন্যাসে এক জায়গায় একজন আরেকজনকে বলছে, রাস্তায় গাড়িঘোড়া না থাকলেও সে ১১-নম্বর গাড়ি করে এসেছে। এর মানে হলো, সে হেঁটে এসেছে। বাংলা ভাষাতেও একই লোকপ্রচলিত অভিব্যক্তিটি বর্তমান। শব্দের ক্ষেত্রেও দেখবো, এমন অনেক শাব্দিক প্রকাশ ঈডিশে পাওয়া যাবে যেগুলোর সাদৃশ্য বাংলা ভাষায় সুলভ। যেমন বাংলায় আমরা বলি, মাছ-টাছ, মুড়ি-টুড়ি, কলাটলা ইত্যাদি। ঈডিশ ভাষাতেও তদ্রূপ দেখবো ফিশ-স্মিশ, টেলিভিশন-স্মেলিভিশন ইত্যিাদি। ঈডিশভাষী ইহুদিরা দীর্ঘদিন ধরে যুগ-যুগ ধরে একান্নবর্তী পরিবারের কাঠামোতে বসবাস করেছ্ে ফলে তাদের কথ্যভাষা নানামুখী ব্যবহৃতিতে নানামুখী পরীক্ষাপর্বে উত্তীর্ণ হয়ে টিঁকে রয়েছে ভাষাভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য নিয়ে। বাংলাভাষিতার সঙ্গেও দীর্ঘকালের একান্নবর্তিতার সংযোগ লক্ষ করবার মতো। উৎসের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে শতকরা আশি ভাগ জার্মান শব্দ এবং শতকরা বিশ ভাগ হিব্রু শব্দের ভাণ্ডারে গড়া ঈডিশ ভাষার মধ্যে নিহিত আছে বিচিত্রতার সম্পদ। স্লাভিক ভাষার ঋণও ঈডিশে পাওয়া যাবে। আবার প্রাচীন জার্মান, লাতিন ভাষার সাদৃশ্যও দুর্লক্ষ্য নয় ঈডিশে। ইংরেজিতে যেটি ‘হ্যান্ড’ বা হাত সেটি ঈডিশে ‘হ্যান্ট’। ইংরেজির ‘ব্রেড’ বা রুটি ঈডিশে ‘ব্রোয়ট’, ইংরেজি ‘ক্যাপ্টেন’ ঈডিশে ‘ক্যাপিট্যান’। ভাষাবিজ্ঞানীরা মজা করে বলেন, আপনি যদি ভুল ইংরেজি বলেন দেখবেন সেটা হয়ে যাচ্ছে শুদ্ধ ঈডিশ। বাংলা ভাষাও তেমনি যুগপরম্পরায় বিবিধ বৈচিত্র্যের উত্তরাধিকারে অর্জন করেছে সমৃদ্ধি। আমরা বাংলায় বলি, যে নিজের কাছে ভালো না, সে অন্যের কাছেও ভালো না। এটিকে উল্টো করেও বলা যাবে: নিজে ভালো তো জগত ভালো। ঈডিশে প্রবাদটা পাওয়া যাচ্ছে এভাবে: ঠবৎ বং ঃড়রম হরংযঃ ভধৎ ুববপয, বৎ ঃড়রম হরংযঃ ভধৎ ুবহবস (ভের এস টোয়াগ নিশ্ট্ ফার যিখ, এর টোয়াগ নিশ্ট্ ফার ইয়েনেম)।

ঈডিশ এবং বিশ্বসাহিত্যে আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের অবদান বিপুল। ‘স্যাটান ইন গোরে’, ‘দ্য ফ্যামিলি মস্কাট’, ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান অব লুবলিন’, ‘দ্য স্লেভ’, ‘দ্য ম্যানর’, ‘দ্য এস্টেট’, ‘এনিমিজ: আ লাভ স্টোরি’, ‘শোশা’, ‘দ্য পেনিট্যান্ট’, ‘মেশুগা’ প্রভৃতি উপন্যাস ছাড়াও তাঁর ছোটগল্প এবং আত্মজীবনীর সংগ্রহ তাঁর অসাধারণ সাহিত্য-শক্তির স্বাক্ষর। শোশা’র প্রকাশের বছরেই (১৯৭৮) সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান সিঙ্গার। যদিও তাঁর সাহিত্যের অনন্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল আরও আগেই। শোশা গত শতকের ত্রিশের দশকের ওয়ারশ’র ইহুদি জনগোষ্ঠির কাহিনি যারা প্রতিমুহূর্তের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে একদিকে বিলীন হয়ে গেছে এবং অন্যদিকে কোনোরকমে খড়কুটোর আশ্রয়ে টিঁকে থেকেছে। হিটলার জার্মানিতে এবং সে একটি জনগোষ্ঠিকে নির্মূল করবার প্রতিজ্ঞায় প্রাণপণ। ঐদিকে রাশিয়ায় স্ট্যালিনের প্রবল একনায়কতন্ত্র জন্ম দেয় ভয়ংকর সন্ত্রাসের। আবার, স্থানীয় পোলিশরাও বৈরিতায় নয় ঊন, এমন পরিস্থিতিতে একমাত্র খোলা পথ ছিল আত্মহত্যা। উপন্যাসের নায়িকা শোশা এমন এক নারী যার ব্যতিক্রমী নির্মাণ সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেই বিরল। শোশা উপন্যাসটিকে সমালোচকগণ মনে করেন ঈডিশ ভাষা ও সাহিত্যের মিউজিয়মে সংরক্ষিত থাকা এমন একটা জীবন যেটিকে পুনরায় সৃষ্টি করা সম্ভব যদি সেই স্থান ও কালকে আবার পুনরাবর্তনে ফিরিয়ে আনা যায়।

 

মহীবুল আজিজ : কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম

বাংলাদেশের জন্ম ও বঙ্গবন্ধু: কিছু অনুমান, কিছু প্রশ্ন কিছু অনস্বীকার্য সত্য

আবু মকসুদ   বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশ চাওয়া’ বা ‘স্বাধীনতা চাওয়া’ নিয়ে কখনোই কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। কিন্তু ইতিহাসকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টার

মাহরাং বালুচ বেলুচিস্থানের শেখ মুজিব!

ফজলুল বারী   বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেত্রী ডা: মাহরাং বালুচ আজ বঙ্গবন্ধুর মতোই পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিনী। মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন

গল্পটি রুনা আখতারকে নিয়ে

রুনা আখতার আমাদের কারখানায় অপারেটর থেকে সুপারভাইজার পদে পদোন্নতি পেয়েছে। পদোন্নতি একটি নিয়মিত বিষয়— অনেকেরই হয়। কিন্তু রুনার গল্পটি আলাদা।   এই পদোন্নতি তাকে এতটাই

আন্দরকিল্লা : আলোকিত জীবনের রূপরেখা

ধীমান বড়ুয়া কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীদের আন্তরিকতায় আপনার নিয়মিত প্রকাশনাগুলো আমার হাতে পৌঁছে যায়, আর আমি প্রতিবারই নিজেকে একজন কৃতজ্ঞ ও মুগ্ধ পাঠক হিসেবে আবিষ্কার করি।

বিশ বছর পর বাংলায় ফিরছেন তসলিমা

রোখসানা ইয়াসমিন মণি সাহিত্যের ইতিহাসে বহু লেখকই সময়ের স্রোতে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু কিছু মানুষ জন্মান কেবল লেখার জন্য। তসলিমা নাসরিন সেই ধারারই এক সাহসী