এখন সময়:রাত ৩:৩৩- আজ: রবিবার-২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৩:৩৩- আজ: রবিবার
২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

গলিত ঘড়ির নীচে মণিপদ্ম দত্তের পোয়েটিক ফিকশন

সাম্য রাইয়ান

 

পরাবাস্তব বা সুররিয়ালিস্টিক ঘরানার ছবি আঁকার যে খেলা সালভাদর দালির ক্যানভাসে আমরা গলিত ঘড়ির অবয়বে দেখেছিলাম, সেই অবয়বই কবিতায় আনবার প্রয়াস পেয়েছেন মণিপদ্ম দত্ত। তাঁর কবিতায় প্রবেশপদ্ধতি অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ। বইটির উৎসর্গপত্রে কবি তাঁর প্রথম ও প্রধান পাঠক কন্যা রোশনাইকে গভীর ভালোবাসায় জড়িয়েছেন, “রোশনাই-কে, যে তার বাবার লেখার প্রথম পাঠক”। কিন্তু এই কোমল সূচনার পরই আমাদের দাঁড়াতে হয় অসাড়, ঠাণ্ডা ও বিপন্ন পৃথিবীর সামনে।

 

প্রথম কবিতা ‘স্বপ্নকাব্য’ আমাদের ভেতরে এক কসমিক ঘূর্ণি তৈরি করে। যা ধাবিত হয় অবচেতনের ভেতর দিয়ে:

“ধায় শক্তি ধায় শক্তি ধায় শক্তি ধায়

মর্ত্য এবং আকাশগঙ্গায়

শক্তিরে ঐ উৎস কোথায় তোর

উৎস আমার স্বপ্নের ভিতর”

 

স্বপ্ন আসলে মানুষের ভেতরের সেই আদিম ও প্রলয়ংকরী রূপ, যা সহজে বাইরে আনা যায় না। যখন তা বাইরে আসে, তখন মর্ত্য এবং আকাশগঙ্গা একই আগুনে পুড়তে থাকে। কিন্তু কবির লক্ষ্য এই ধ্বংসের গভীর দিয়ে মুক্তির ইশারা খোঁজা। তাই তিনি অকপটে লেখেন:

“সর্বভুকের সংসার শোয় বাষ্পীভূত শব

তোমার জন্য শান্তি আমার আসন্ন বিপ্লব”

 

অন্তর্লোকের সমস্ত অপ্রাপ্তি আর হাহাকারের সম্মিলিত কোলাহলই এ বিপ্লবের স্বরূপ। ধ্বংসকারী তার পাথুরে সম্মোহনী শক্তি দিয়ে আমাদের বসিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু অবচেতনের নদীকে চিরকাল বেঁধে রাখতে পারে না।

 

বইয়ের দ্বিতীয় কবিতা ‘হত্যাকাণ্ড’ আধুনিক নাগরিক জীবনের শীতল ও অবশ রূপকে আমাদের সামনে হাজির করে। ভর দুপুরে সাজানো এক নারীদেহের সামনে কবির এই যে দাঁড়িয়ে থাকা, তা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের চূড়ান্ত সাড়াহীনতা আর বিচ্ছিন্নতাকে বড় বেশি নগ্ন করে দেখায়:

“দেখে এলাম এমন নারীদেহ

ভর দুপুরে, থাকে না সন্দেহ

সজ্জিত বুক, গুরু জঘন গা

কিন্তু স্পর্শ করলে কাঁপছে না।”

 

সবকিছু সচল, সবকিছু সুন্দর, অথচ আসল জায়গায় কোনো স্পন্দন নেই! এই যে সাড়াহীনতার অন্ধকার, তা আমাদের বর্তমান সমাজ ও সভ্যতার এক চরম অসুখ। শরীরকে আমরা জাগাতে চাই, মনকে ধেয়ে নিয়ে যাই প্রবল জ্বর ও আবেগ নিয়ে, কিন্তু বিনিময়ে পাই হিমশীতল শূন্যতা:

“আমি আমায় তীব্র পিষে নিজে

ছড়িয়ে দিলাম লক্ষ লক্ষ বীজে

নামল জ্বর ক্লান্ত হল দেহ

তবুও সে বীজ উপ্ত হল না।”

 

এই যে বীজ উপ্ত না হওয়ার বন্ধ্যাত্ব, তা একদিকে যেমন একজোড়া মানব-মানবীর ব্যর্থ দৈহিক সংযোগের কথা বলে, অপরদিকে বর্তমান করপোরেট ও যান্ত্রিক সভ্যতার এক চূড়ান্ত বিপণন প্রক্রিয়ার দিকেও নির্দেশ করে। ‘দোজখের ওম’ কবিতায় এই হাহাকার আরও তীব্র, আরও তীক্ষ্ম এবং নগ্নভাবে দৃশ্যমান হয়:

“আমরা তাহলে শপিং মলের মতোই

করেছি কেবল শারীরিক বেচাকেনা

এক আর একে দুই হয়ে ছিঁড়ে গেলো

তীব্র মেহনে। বাকিটুকু প্রতারণা।”

 

আমাদের প্রাত্যহিক প্রেম, আবেগ, ক্ষোভ আর বাসনাগুলো যেভাবে আজ শপিংমলের কাচের শোকেসে পণ্য হয়ে উঠেছে, মণিপদ্ম খুব চমৎকারভাবে সেই ক্ষতটিকে ছুঁয়ে দিয়েছেন। এখানে আর কোনো বিশুদ্ধতা অবশিষ্ট নেই। জরায়ু থেকে ছিটকে পড়ছে বীজহীন সিলিকন, ক্রোমোজোমগুলো আজ বিক্রির জন্য ব্র্যান্ডেড প্যাকেটে বন্দি হচ্ছে চৈত্রদিনের সেলে:

“আসলে আমরা নিজেরই ছদ্মবেশে

জমিয়ে ফেলছি এতো মৃত সিলিকন

জরায়ু ছিটকে বীজহীন বীজ বোনা

কীই বা করবে গাভীন বৃষ্টি জল।”

 

এই যে সিলিকন আর এ-আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্ত, তা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতির জগৎকে কীভাবে গ্রাস করছে, তার এক অনবদ্য হাহাকার ফুটে উঠেছে ‘প্রস্তর যুগ’ কবিতায়:

“খুব শীগ্গিরই শুকিয়ে যাবে সমস্ত কাগজের ফুল আঁকা চ্যাটবট পরিবার।

আমাদের জমাট প্রস্তরীভূত নৈঃশব্দ্য

পাথরের শস্যক্ষেত্র জুড়ে

নতুন বীজ বুনে

সোনালী ধান বানাবে বারম্বার।”

 

কাগজের ফুল দিয়ে সাজানো আমাদের যে চ্যাটবট পরিবার, তা আসলে মানুষের এক চরম একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতারই বিকল্প প্রতিচ্ছবি। মানুষ যখন রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভুলে যায়, তখনই সে যন্ত্রের কড়া নাড়ে। কিন্তু কবি বিশ্বাস করেন, এই কৃত্রিমতার দেয়াল ভেঙে শেষ পর্যন্ত আদিম সত্যই ফিরে আসবে। মঙ্গল গ্রহের স্পেসশিপ যখন শূন্য আকাশের কোণে এসে উঁকি দেবে, তখনো মানুষ গুহার দেয়ালে বাইসন আঁকবে আর পাথরের বর্শা নিয়ে তার অস্তিত্বের লড়াইয়ে শামিল হবে। কৃত্রিম মেধার সাধ্য নেই মানুষের এই বেঁচে থাকার আদিম ও তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে রুখে দেয়।

 

আবার ‘পেসমেকার’ কবিতায় দেখি এক অন্য মণিপদ্মকে, যেখানে সময় মাপা আর জীবন যাপনের এক কঠোর ও যান্ত্রিক সমঝোতা ফুটে উঠছে:

“বুকের ভিতর পেসমেকার

মণিবন্ধে ঘড়ি

যখন তখন সময় মেপে

বাঁচার দস্তুরি”

 

পেসমেকারের কৃত্রিম ধুকপুকুনি আর হাতের ঘড়ির কাঁটার মাঝখানে আমাদের জীবন আজ এক অদ্ভুত নিয়মে বাঁধা পড়ে গেছে। কিন্তু করোটি ভরে থাকা জোছনা যখন নিশির মতো ডাক পাঠায়, তখন সেই কৃত্রিম নিয়মের দেয়ালগুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায়। কবি চান সেই কৃত্রিম জীবনের মাঝেও স্বপ্নের ভেতর তাঁর একদা প্রেমিকাকে ছুঁয়ে থাকতে। এই প্রেম সে-ই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, যা সমস্ত যান্ত্রিক বিধিনিষেধ আর সময়ের বেড়াজালকে অস্বীকার করে বেঁচে থাকে।

 

বইয়ের ‘পঞ্চতন্ত্র’ নামের টানাগদ্যকবিতাটি হয়ে উঠেছে সমাজ-রাজনীতির সূক্ষ্ম ও তীব্র চাবুক। জঙ্গলরাজ আর শশকের সেই প্রাচীন উপাখ্যানকে কবি যেভাবে চিরকালীন গণতান্ত্রিক বোঝাপড়া আর আজকের শোষণের রাজনীতির সাথে মিলিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়:

“সর্ব সম্মত চুক্তিটা ছিল, রাজ হামলার বদলে প্রতিদিন একটি দেশভক্ত পশু রাজখাদ্য হবে। ব্যাস। এর বেশি নয়। চির আধুনিক শান্তিপূর্ণ ব্যাবস্থা।”

 

দেশপ্রেমের এই অদ্ভুত নব্য সংজ্ঞা আর আধুনিক শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থার পেছনে যে কর্পোরেট বুদ্ধিজীবীদের (সম্প্রতি এরা ‘গণবুদ্ধিজীবী’ নাম ধারণ করেছে) ভূমিকা থাকে, তা অত্যন্ত পরিহাসের সাথে ফুটে উঠেছে এখানে। কিন্তু শাসক চিরকালই এক আত্মমুগ্ধ নির্বোধ, যাকে এক তুচ্ছ অকিঞ্চিতকর প্রাণী তার কুয়োর জলজ আয়না দিয়ে হারিয়ে দিতে পারে। কবি সেই রূপক শশককেই খুঁজে চলেছেন আধুনিক এই অমানবিক ও সুবিধাবাদী সমাজে:

“ঐ রকম শশক আমি খুঁজিয়া চলেছি

শুধু প্রাজ্ঞজনে জানে, ঠিক পথেই আছি!”

‘দালির ঘড়ি ও অন্যান্য কবিতা’ আমাদের সময়ের পরাবাস্তব অবয়ব। মণিপদ্ম দত্ত প্রথাগত কাব্যিক অলঙ্কার বা অতি-মেদযুক্ত আবেগের পথে না হেঁটে অত্যন্ত নির্মম ও ঋজু ভাষায় আধুনিক ট্র্যাজিক আখ্যান রচনা করেছেন। যার অন্তর্গত শব্দশৈলীতে লুকিয়ে আছে চাপা দ্রোহ আর ভাঙনের গান। পরাবাস্তবতার কুয়াশায় ঢাকা এই দালির ঘড়ি শেষপর্যন্ত আমাদের বুকের পেসমেকার আর সময়ের ঘড়িটিকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা নিজের নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হই।

দালির ঘড়ি ও অন্যান্য কবিতা, এবং অধ্যায়, কলকাতা ৭০০০০১২; মুদ্রিত মূল্যঃ ২০০ টাকা

 

 

সাম্য রাইয়ান : কবি ও প্রাবন্ধিক

সম্পাদক, শিল্প সাহিত্যের কাগজ- বিন্দু, কুড়িগ্রাম

বাংলাদেশের জন্ম ও বঙ্গবন্ধু: কিছু অনুমান, কিছু প্রশ্ন কিছু অনস্বীকার্য সত্য

আবু মকসুদ   বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশ চাওয়া’ বা ‘স্বাধীনতা চাওয়া’ নিয়ে কখনোই কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। কিন্তু ইতিহাসকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টার

মাহরাং বালুচ বেলুচিস্থানের শেখ মুজিব!

ফজলুল বারী   বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেত্রী ডা: মাহরাং বালুচ আজ বঙ্গবন্ধুর মতোই পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিনী। মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন

গল্পটি রুনা আখতারকে নিয়ে

রুনা আখতার আমাদের কারখানায় অপারেটর থেকে সুপারভাইজার পদে পদোন্নতি পেয়েছে। পদোন্নতি একটি নিয়মিত বিষয়— অনেকেরই হয়। কিন্তু রুনার গল্পটি আলাদা।   এই পদোন্নতি তাকে এতটাই

আন্দরকিল্লা : আলোকিত জীবনের রূপরেখা

ধীমান বড়ুয়া কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীদের আন্তরিকতায় আপনার নিয়মিত প্রকাশনাগুলো আমার হাতে পৌঁছে যায়, আর আমি প্রতিবারই নিজেকে একজন কৃতজ্ঞ ও মুগ্ধ পাঠক হিসেবে আবিষ্কার করি।

বিশ বছর পর বাংলায় ফিরছেন তসলিমা

রোখসানা ইয়াসমিন মণি সাহিত্যের ইতিহাসে বহু লেখকই সময়ের স্রোতে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু কিছু মানুষ জন্মান কেবল লেখার জন্য। তসলিমা নাসরিন সেই ধারারই এক সাহসী