বাঙলায়ন : শফিউল আজম মাহফুজ
এলা হুইলার উইলকক্স (১৮৫০-১৯১৯) নিছক একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন এক সময়ের প্রতিনিধি, যে সময় আমেরিকান সাহিত্যে ব্যক্তিগত অনুভূতি আর জনজীবনের দর্শন একসূত্রে গাঁথা হচ্ছিল। উহসকনসিনের জেলহনসটাউনের প্রত্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম নেওয়া এই কবি মাত্র আট বছর বয়সে কলম ধরেছিলেন। কৈশের পেরোানোর আগেই হয়ে উঠেছিলেন নিজ জনপদের গর্ব। উইলকক্সের কবিতার মূল সুর হলো আশাবাদ। যে যুগে সাহিত্যে বিষাদ আর নৈরাশ্যের চর্চাই ছিল বেশি, সেই যুগে দাঁড়িয়ে তিনি সচেতনভাবেই বেছে নিয়েছেন ইতিবাচকতার পথ। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা Solitude এবং My Grave বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন শফিউল আজম মাহফুজ)। কেবল কবিতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। উপন্যাস, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা— সাহিত্যের বিচিত্র শাখায় ছিল তাঁর সাবলীল বিচরণ। ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত Poem of Possion তাঁকে এনে দেয় ব্যাপক খ্যাতি ও বিতর্ক দুটোই। সে যুগের রক্ষণশীল রুচির বিপরীতে দাঁড়িয়ে যে সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজকের চোখে তাঁকে করে তোলে এক অগ্রগামী কণ্ঠস্বর। সহজ ভাষা, সরল ছন্দ, অথচ গভীর জীবনবোধ এই বৈশিষ্ট্যগুলো উইলকক্সের কবিতাকে করেছে চিরকালীন, যা তাঁকে আজও অনুবাদযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
নির্জনতা
হাসো, আর পুরো পৃথিবী উঠবে হেসে
কাঁদো, সাান্ত¦না দিবে না কেউ এসে।
ধার করা সুখ খোঁজে এই ক্লান্ত জগৎ,
নিজের দুঃখেই তার ভরা আছে ঢের।
গাও পাহাড়ও উত্তর দেবে সুরে সুরে,
দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে যাবে নিভৃত হাওয়ায়।
আনন্দধ্বনি লুফে নেয় সবাই মিলে,
কষ্টের সুর কেউ ধরে না নিজের গলায়।
উল্লাসে থাকো, মানুষ খুঁজবে তোমায়,
শোকে ডুবলে, মুখ ফিরিয়ে সব চলে যায়।
তোমার সুখের কানায় কানায় ভাগ বসাতে চায়
তোমার দুঃখের ভারী বোঝাটি কেউ ছুঁতে না চায়।
সুখে থাকো যদি, বন্ধুর দল ভিড় জমাবে দ্বারে;
দুঃখী হলেই মিলিয়ে যাবে একে একে অন্ধকারে।
অমৃত সুধা পান করতে কাঙালের অভাব নাই,
গরল পাত্রে একা চুমুক দিতে হবে তোমাকেই ভাই।
উৎসবে মাতো, দেখবে ভরেছে তোমার পুরো মহল,
উপবাসে কাটাও, পাশ কেটে যাবে চেনা মানুষের দল।
সাফল্য ছড়াও, বাঁচতে শেখাবে এই জগতের রাত,
মরার বেলায় একাকী তুমি— সবাই অতীত।
প্রমোদ মহলে উপচে পড়ে চাটুকারের ভিড়,
সেখানে রয়েছে আসন পাতা আভিজাত্যের নীড়।
কিন্তু শেষে, এক এক করে সবাইকে যেতে হয়—
ব্যথার গলির সরু পথ বেয়ে, একা নিঃসহায়।
আমার সমাধি
যখন আমি মৃত, আর দিতেই হয় মাটি,
দেখো গোরস্থান যেন না হয় মোর শেষ শোবার পাটি।
নিভৃত কোন গর্তে আমায় দিয়োনা বিসর্জন,
যেথায় পৌঁছায় না ব্যস্ত জগতের প্রাণ স্পন্দন।
যেথায় কদাচ কেউ আসে নত শিরে সজল নয়নে
শেষ বিদায়ের বিষাদমাখা ঋণের অন্বেষণে।
কোনো এক দূর পথের পথিকের তরে,
বরং ঠাঁই দিয়ো, যেখায় জীবন নিত্য খেলা করে।
যেথায় অবিরাম কোলাহল আর ব্যস্ততা সারাবেলা,
আমায় ঘিরেই আবর্তিত হয় ব্যস্ত জীবনের মেলা।
গাড়ির চাকার ঘর্ষণ আর চঞ্চল চরণের ধাওয়া,
প্রেম, বানিজ্য, আনন্দ নিত্য করে আসা-যাওয়া।
মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাক ধরিত্রীর কলস্বর,
মরে গিয়েও যাতে হই জীবনের সহোদর।
বজায় থাকুক চঞ্চল বিশ্বের সাথে নাড়ীর সে টান,
গভীর নিস্তব্ধতা বরং বাড়িয়ে দিবে জীবনের ব্যবধান।




