অধ্যাপিকা
ধরা যাক, কলেজ থেকে ফিরে তুমি স্নান করে চুল শুকোবার ছলে
বসে আছ দিগন্তে
বা চেয়ে আছ অনতি দূরে— দেখছ
মাঘের প্রথম দিনে ঘুড়িদের দুরন্ত উড়াল
পিপাসার্ত বাতাস শুষে নিয়েছে চুল থেকে জল
আর এখন সেই চুল উড়ছে আষাঢ়ের ঢেউ খেলানো মেঘের মতো
ঢেকে দিচ্ছে গাল, কপাল আর চোখ
আর পুকুরের জলে তোমার ছায়া বারবার শিউরে উঠছে।
ঘরে তোমার মন টেকে না। টেবিলে খাতার স্তূপ প্রতিটি ইঞ্চিতে ছড়িয়ে থাকা নৈমিত্তিকতা
পৈশাচিক প্রেতাত্মার মতো তোমাকে ঘিরে নৃত্য করতে চায়—
আর তখন দূরে ছিটকে যেতে থাকে সেল্ফ থেকে বই
কণ্ঠ থেকে গান শরীরের মর্ম থেকে মাটির নির্যাস।
তুমি শোনো অনতিদূরে সমবেত কলস্বর
যা তুমি অতিক্রম করে এসেছিলে, তোমাকে ডাকছে।
তুমি দেখতে পাও আকাশে বাতাসে পথে প্রান্তরে পাখি ও প্রজাপতির মতো
কবিতা উড়ছে কিন্তু তা অতিক্রান্ত দিনে পাঁচালি
তোমাকে স্পর্শ করে যায় তারুণ্য দিনের সে কী মর্মান্তিক উৎসব!
তুমি দূর এক মফস্বলে শব্দহীন বেদনার মতো একা একা
টলমল করো।
অনুভূতির ঝোড়ো ঝাপটা
অন্যের কষ্ট বুকে নিয়ে তুমি ঘুমাতে যাও।
অন্যের স্বপ্নভাঙার যন্ত্রণায় তুমি ছটফট করো।
আলো নিভিয়ে দিয়েছ। না নিভালেও এখানে
কৃষ্ণপক্ষ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। অবচেতন থেকে
শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে উঠে আসতে চায়
কতিপয় কবিতার পঙ্ক্তি। অনুভূতির ঝোড়ো
ঝাপটায় তুমি তাদের সরিয়ে দাও। দূর থেকে
ভেসে আসে সুর, করুণ ও বিদারক। তুমি
ঘরের সব ফুঁটো বন্ধ করে দাও, তবু তাকে
দমাতে পারো না। কান চেপে ধরো। না—
তবু তা তোমাকে বিস্রস্ত করে দেয়। তুমি
বুঝতে পারো আত্মাকে বিদ্ধ করা ছাড়া
তোমার আর কোনো গতি নেই, গন্তব্য নেই।
ফিরে এসো মায়াবী নতুন
অনেক জ্বর গেল, ঝড় গেল।
বাদামি পাতার মতো ঝুরঝুর করে ঝরলো কিছু মানুষও।
তাহলে এবার তুমি কোথাও থেকে ঘুরে এসো।
কক্সবাজার যাও—সমুদ্রস্নান করো, মূলত মন্থন করো তাকে।
তুমি তো একা নও, সিন্দাবাদের মতো তোমারও আছে
কত লোক-লস্কর। অন্তত কাউকে নাও— রাতের ট্রেনে
যার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোতে কোনো কুণ্ঠা হবে না।
জিন্সের প্যান্ট আর শাদা শার্ট? এই বসন্তে
ট্রেন যদি মাতলামি করে, করুক না!
ও যদি নিয়ে যায় কোনো নতুন পথ খুঁড়ে
ক্ষতি কী?
সমুদ্রে অনেকেই যায়।
তুমি যাবে সমুদ্রের কাছে।
তুমি যাবে আদিগন্ত তৃষ্ণার কাছে।
গাঢ় কালো সানগ্লাস খুলে তুমি জলে নেমে যেয়ো।
সাঁতার জানো না বলে উদভ্রান্ত হয়ো না।
দূর থেকে ধেয়ে আসা প্রতিটি তরঙ্গশীর্ষে
ভেঙে যেয়ো, গলে যেয়ো, মিশে যেয়ো!
সমুদ্র মন্থন শেষে ফিরে এসো
তুমি এক মায়াবী নতুন!
কুয়াশার মতো নিস্তব্ধতা
নিস্তব্ধতা তৈরি করে নিতে হয়।
যা তড়িঘড়ি আসে, তা তড়িঘড়ি চলে যাক।
তুমি দুয়ার খুলে বলো, ‘আবার দেখা হবে।’
তুমি তো জানো, কারো সঙ্গেই
দ্বিতীয়বার দেখা হয় না।
গাছে গাছে বৃষ্টিধোয়া নতুন পাতা।
এখনো লেকের জল ঘোলা হয়ে ওঠেনি।
আরেকটু গভীরে গেলে স্পষ্ট হবে
মাছেদের চলাচল।
এই ভরদুপুরে ঝিঁঝি ডেকে উঠলে
কান পেতে দিও।
কতো কতো অভিমান চারপাশে!
একদিন বোঁটা শুকিয়ে যাবে—
খসে পড়বে
বাতাস তাকে নিয়ে যাবে অন্য কোনো সীমান্তের পরপারে।
একটু স্থিত হও। স্থির হও।
চিত্তচাঞ্চল্যকে ঘুমিয়ে পড়ত দাও।
অন্তরে ও বন্দরে আরেকটু নির্জনতা নামুক।
তোমার চোখের পাতায় খুব ক্লান্তি জমে আছ।
দেখবে, সেখানে পুঞ্জিভূত হচ্ছে কুয়াশার মতো নিস্তব্ধতা।




