প্রাগৈতিহাসিক স্নান
সালিম সাবরিন
মেঘের জঠর থেকে ঝরে পড়ে প্রাগৈতিহাসিক স্নান
তোমার দেহপল্লব বেয়ে নামে বর্ষার নিবিড় অভিজ্ঞান।
তুমি যেন হিরণ্যকশিপুর সভার সেই অপ্সরা
দেবরাজ ইন্দ্রের বিপ্রতীপ অধরা!
সিক্ত অঙ্গে মেখেছো সিন্ধুর পলি,
মহেঞ্জোদারোর ধূলিকণা।
তুমি সেই কবেকার প্রাচীন বিদিশার অন্ধকার
নিশীথ হাওয়ায় ভেসে আসা বনলতার মতো-
আজও তোমার দুচোখ অমীমাংসিত-প্রতীক্ষারত
অগণিত -অবিরত -সুদূরের ইশারা!
তোমার প্রতিটি অঙ্গ যেন কোনো বিলুপ্ত সুমেরীয় লিপি
বৃষ্টির বারিধারায় ধুয়ে – আলোকিত চন্দ্রের মতো
তোমার শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে আছে হিমালয়ের হিমেল নীরবতা,
আর নিঃশ্বাসের কম্পনে বেজে ওঠে বেটোফেন গাঁথা
যেনো উর্বশীর পায়ে বেজে ওঠা আদিম মহাজাগতিক সুর
তোমার অস্তিত্বে মিশে আছে শ্রাবণমেঘ ও অরণ্যের সুদূর।
তুমি এঞ্জেলোর ক্যানভাসে আঁকা ধ্রুপদি মিথ
চিবুকের জলবিন্দুর প্রতিধ্বনি ক্রেতাযুগের মৌনসঙ্গীত।
বৃষ্টি তোমার চারপাশে বুনে চলে প্রত্নতাত্ত্বিক মায়াবী বৃত্ত
নারী, তুমি আদ্যাশক্তি – প্রকৃতির ভাঙাগড়া তুমিই আদি এবং অন্ত!
কালের নশ্বরতাকে ধূলিসাৎ করে বৃষ্টির অরণ্যে আজও
তুমিই চিরবিস্ময়, তুমিই চিরায়ত কাব্যগ্রন্থ!
===================================
যত বোল তত আম হয় না কখনও
মুজিব রাহমান
যত বোল তত আম হয় না কখনও।
দুঃখ করো না, মরো না মনস্তাপে
পথে পথে পথ নানা বাঁক নেয়
পথের নেই তো শেষ
শ্বাসরুদ্ধ নদীর দেশে
দোয়েলের শিস কোকিলের কুহু
এখনও অনিঃশেষ।
এখনও এখানে লড়াইয়ের দিন
জীবনের বাঁকে বাঁকে
ভালোবাসা তবু নীরবে এখানে
সোনালি ছবিটা আঁকে।
যত বোল তত আম হয় না কখনও।
===================================
অভিন্ন ঈশ্বর
সিকানদার কবীর
পৃথিবীর সব শিশুর চেহারা একই রকম- মায়ায় ভরা
যেন সহস্র ফুলের শোভায় এ ধরণী আত্মহারা
তাদের হাসিও অভিন্ন – পাষাণের মনকাড়ে
কান্নারও একই ধারা- শ্রাবণে অশ্রু ঝরে।
শিশুদের অবয়ব যেন পবিত্র মক্কার কাবা-
যেন রাসুলের আলোকোজ্জ্বল মদিনার রওজা-
যেন শরতের আকাশ কিংবা জোছনাময় পূর্ণিমা,
তাদের হাসির কাছে সীমার পরাস্ত হয়-
বাঘের থাবা থমকে যায় – ব্যাধের ধণুক ব্যর্থ হয়
অর্জুনের তির হয় লক্ষ্যভ্রষ্ট;
সেই শিশুর বুকে কেউ তাক করো না স্টেনের গুলি
সমগ্র ইসরায়েল পিষ্ট করো পায়ের নিচে
স্বৈরশক্তি মিশাও মাটির ধুলায়
কিন্তু কোন শিশুর শরীরে দিও না আঙুলের টোকা।
বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত সিরিয় সেই শিশুটির মতো কিংবা আগস্টের কালোরাতে গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া বুক নিয়ে শিশু রাসেলের মতো কিংবা জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শিশু শহিদ আহাদের মতো কেউ যেন বলতে না পারে,
” ঈশ্বরকে আমি বলে দিবো সব….”
হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান পৃথিবীর তাবৎ শিশুকুল
একই হাতে গড়া, এক বাগানের ফুল।
জেনে রেখো সবে,শিশুদের ঈশ্বর এক ও অভিন্ন তবে।
===================================
কেউ কি আদৌ ছিলো ?
জাহাঙ্গীর আজাদ
লন্ঠনের তেরছা আলোয় মুখখানি আবছায়া
পথের শেষে দাঁড়িয়ে ছিলো তোমার মতো কেউ
সন্ধ্যা শেষের ট্রেনের শব্দ মিলিয়ে যাবার পরে
ল্যাম্পপোস্টের শিথিল তারটি দোলায় স্মৃতির ঢেউ
এ পথ বেয়ে হেঁটে গেছে রাংতা মোড়া আধফালি শৈশব
কৈশোরটিও লেপটে আছে ঝুলকালিতে মাকড়সাদের জালে
পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তোমার আমার মধ্যিখানে তবু
মজে আসা নদীর মতো আর কখনও ঢেউ জাগে নি পালে
পথের শেষে দাঁড়িয়েছিলো তবু তোমার মতো
তুমি তো নও, কেউ কি আদৌ ছিলো ?
হোঁচট খাওয়া নড়বড়ে নখ, তবুও খোঁড়ে মাটি
স্মৃতির মতো দড়ির আগুন কেউ কি নেড়ে দিলো?
===================================
বৃষ্টি
বিপুল বড়ুয়া
রুপোর নুড়ি
ইলশে গুড়ি
নিঝুম করা
বৃষ্টি ঝরা
দেখছে খুকু চুপ
ব্যাঙের ছাতা
সজনে পাতা
শিউলি ফোঁটা
ঝরছে ফোটা
টুপ টুপ টুপ
খুকুর দিঠি নড়ছে
বৃষ্টি অঝোর ঝরছে।
===================================
মনভাগ
রেজাউল করিম
সবকিছু ওলট-পালট, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে
তারা এপার ছেড়ে ওপারে,ওপার ছেড়ে এপারে
পেছনে যতসব দুঃসহ স্মৃতি…রক্তদাগ।
যা ঘটে গেলো ভাবলে গা শিউরে ওঠে…
সাতচল্লিশে কি শুধু দেশভাগ হলো?
না, হলো যুগপৎ মনভাগও।
অথচ তারা তো ছিলো হাজার বছর ধরে এক অভিন্ন
নৃতত্ত্ব ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতির উত্তরাধিকার।
একদিন যা ছিলো মানব কল্যাণের অথচ
হয়ে গেলো সাম্প্রদায়িক বিভেদ বিভাজন
উপনিবেশিকতার মস্ত খড়গহস্ত।
সেই থেকে আজও তার হৃদয়জুড়ে রক্তপাতের শোণিতধারা
কখনো কি থেমে আছে?
চলছে রক্তক্ষরণ…যারা সমব্যথী তারা বুঝে
এই যন্ত্রণার ক্ষত কতো গভীর।
সাতচল্লিশে যেন ভুলে ভুলে মহাভুল, মহাভাগ মনভাগ
যা ঘটে গেলো ভাবলে গা শিউরে ওঠে আজও।
===================================
ফাহমিনা নূর এর তিনটি কবিতা
মন
চোখ জ্বালা করে ঈশ্বর, মনের
ওজন মাপতে পারি না।
অতিশয় ক্লান্তি কোথা থেকে যেন
উড়ে এসে বসত গেড়েছে আঙ্গিনায় ;
ভেজা কাপড়ের মতো তালগোল পাকিয়েছে মন,
আকৃতি বোঝা যায় না,
কেবল ওজনে ভারী হয়ে চেপে বসে আছে পাঁচফুটী বারান্দায়।
হাওয়ার মতো কিছু স্মৃতি উড়ে গেল কিছু আগে,
কার ডাকে যেন সাড়া দিতে গিয়ে
আমি হারিয়েছি তার গতি-সীমানা।
আমার কিচ্ছু মনে থাকে না,
একটা যে মন ছিল সেটাও না।
বন্ধ্যা মায়ের ছেলের সোয়েটার
ঈশ্বরকে ছূঁতে গিয়ে মৃত্যুকে ছূঁয়েছে যে বালক তার আর অন্য মৃত্যু নেই।
সমুদ্রতটে সে শুয়ে আছে প্রাণহীন, সাগরের তরঙ্গ-ধ্বনি আছড়ে পড়ছে শূন্যে
এই মৃত্যুগন্ধা বাতাস পাক খেয়ে তুলছে যে তীব্র হাহাকার
সেখানে বোপিত হচ্ছে নতুন বীজ, তুমুল তড়িৎ-গতিময় জীবনের আধার।
এইসব নিত্য ও অনিত্য চক্র থেকে দূরে
উলের সোয়েটার বুনে যাচ্ছে এক সন্তানহীনা মা,
বহুকাল এ দৃশ্য ধরে রেখেছে এক পুরাতন বাড়ির নিস্তব্ধ বারান্দা,
একটা ছায়াঘেরা নিবিড় নিঃসঙ্গ বারান্দা।
সাগরের তরঙ্গ ধ্বনি কেনোদিন সেখানে পৌঁছাবে না।
সমাহত
নদী সাঁতরে প্রাণে বাঁচা প্রাণ আমি।
পঙ্গু হরিণের মতো ডিঙিয়েছি সাতশো ক্রোশ পথ।
জলকাদায় মাখামাখি মাঠ, সে আমার দুরূহ প্রান্তর
হতাশ হওয়া ধাতে নেই ব’লে
একটা সোনালি রূমাল ঝুলিয়ে রাখি শূন্য আঙিনায়।
আমার একমাত্র সম্পদ একটি কাঠগোলাপের চারা;
কুঠার হাতে কোন ঈর্ষাকাতর ফিঙে তাড়া করছে তাকে!
তার ঘ্রাণ ও পুষ্পরেণু মাটির সাথে কথা বলে
সময় তবু কেন নির্লিপ্ত ঘাতকের মতো খুনি হতে চায়!
===================================
ভালোবাসার পঙক্তিমালা
হোসাইন আনোয়ার
যে সড়ক ডুবে যায় বর্ষার প্লাবনে
সেখানেই পাল তুলি ভালবাসার পাল
যে আগুন জ্বলে শুধু পাঁজরের ভেতরে
সেখানেই জল ঢালি নয়নের জল,
কষ্টকে ঢেকে রেখে অন্তরে অন্তরে
উজানে দাঁড়টানি কাল থেকে মহাকাল ।
===================================
দার্শনিক
মুস্তফা হাবীব
স্বজন সারথিরা জানে
জানে আলো বাতাস, পাহাড় সমুদ্র, গ্রহ নক্ষত্র
আরো জানে রাতজাগা শীতার্ত বৃক্ষ বিহঙ্গ ;
দু’হাজার দশ খৃস্টাব্দের চার জানুয়ারির মধ্য রাতে
পৃথিবীর মায়াজাল ছিন্ন করেছে পরম গুরুজন
অদৃশ্য খেয়ায় চড়ে পাড়ি দিয়েছে নিরলোকে।
সে ছিল আমার সরল সুন্দর জীবন গড়ার কারিগর,
ভালোবাসতো ধর্মপ্রাণ অগ্রসর স্বপ্নীল মানুষকে
দূষণমুক্ত সমাজ চেয়ে পথসভায় প্রদীপ জ্বালাতো।
সে দিব্যলোকে উন্মোচন করতো
অসুন্দর তাড়াবার সূত্র, আগামী লক্ষ্য সামনে রেখে
শুনাতো শুদ্ধ স্নানের শাশ্বত বাণী।
তার অমলিন উৎসাহে ভেঙেছি পথের পাঁচিল
পেয়েছি কল্পলোকের চাবি, শিল্পময় জগৎ সংসার,
কবিতার গহিন অরণ্যে হারাবার দুর্দান্ত সাহস
অতিক্রম করতে পেরেছি চারপাশের সমূহ অন্ধকার।
কে সেই দার্শনিক – স্বপ্নদ্রষ্টা ?
কার নির্দেশে পেয়েছি আমি নির্মল পথের সন্ধান !
কার ভালোবাসায় ভুলে গেছি অতীতের দহনজ্বালা
সে অন্য কেউ নয়, অনিবন্ধিত স্কুলের একজন শিক্ষক
আমার পরম শ্রদ্ধেয় বাবা আবদুল লতিফ ।
===================================
অন্তবর্তীকালীন প্রেমিকা
আ ই না ল হ ক
শুনো; তোমারে একখান কতা কই বর্ণমালা
আমার মতো একজন ফালতু মানুষরে লইয়া চিন্তা কইরা
অযথা সময় নষ্ট করার কি দরকার, কও?
সামনে তোমার রঙিন ভবিষ্যতের অপার হাতছানি;
উজ্জ্বল ক্যারিয়ার, বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালেন্স,
উত্তম জীবন সঙ্গী, যশ-খ্যাতি আরো কত কি!
আমারে এক্কেবারে ভুইলা যাও বর্ণমালা, ভুইলা যাও
যখন ছিলাম তখন ছিলাম,
সেই নিয়া ভাইবা ভাইবা কি পাইবা কও?
না পাইবা আমারে, না পাইবা সংসার
আক্রারার বাজারে শুধু সস্তা ভালোবাসায় কি হয়?
না, ভুল আমি বলতাছি না। ভালো আমারে লাগতেই পারে
ভালোবাসার স্বাধীনতাও আছে
তাই বইলা সমাজের কতা চিন্তা করবা না?
আচ্ছা, বাদ দিলাম সমাজ; অন্তত নিজের কতা?
এ এইটা কিন্তু একদম ঠিক না বর্ণমালা;
হৃদয় তো আর বাজার থাইকা কিইনা আনা বাতাসা না,
যে শেষ হইবো। আরেক জনরে দিয়া দাও, হ দিয়া দাও
যে তোমার রেস্টুরেন্টের সঙ্গী হইবো,
লং ড্রাইভে লইয়া যাইবো, বৃষ্টিবিলাসে সঙ্গ দিবো;
আ-আমার মতো হ্যান্ড টু মাউথরে হৃদয়ে পোষে
নিত্য নতুন কষ্টের সৌজন্য সাক্ষাতে কি লাভ, বর্ণ?
তোমার চোখের মহত্ত্বের কতা আগেও বলেছি বহুবার
সেখানে লোকানো মায়া মুইছা ফেলো,
এই অবাঞ্ছিত মানুষটারে আর কত পোষে রাখবা মনা?
এখনো যে নীরব কষ্টে বুক পোড়াও, টের পাই
আমার নামে রোজ বিরহে অধর ভেজাও, তাও জানি
ভুলে যাও বর্ণমালা, ভুইলা যাও!
অন্তত রিয়ালিটি বুঝো।
মানুষের হৃদয়ের অতল দীঘিতে
রোজ রোজ কত্ত বেদনার সমাধি খুঁড়তে হয়, তার ইয়ত্তা আছে?
সেখানে আমারে লইয়া পইড়া আছো চিন্তায়,বোকা কোথাকার।
যাযাবরের আবার থাকা না থাকা!
আশ্রয়হীন মানুষের ঘরের চিন্তা থাকে বুঝি? পাগলি
য্যামনে রাখে ত্যামনে থাকি
এই থাকা থাকি ব্যাপারে আমার কোনো অভিযোগ নাই।
===================================
বাবারা এমনি
রওশন মতিন
পিঠে পেট ঠেকেছে তবু আনন্দ -বেসাতির কমতি নেই,
রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে
একটা মানুষ জীবন যুদ্ধে লড়ে যায় অহর্নিশি,
প্রসন্নতার আলপথে খোঁজে কষ্টের সুখ
চোখের দীপ্র জ্যোতিতে প্রিয় সন্তানের মুখ,
কষ্টের টানপোড়েনে ও বাবা যেন সাঁকো বাধা সেতু-
জীবন -নদীর দুই তীর আপত্য স্নেহে বেঁধে রাখে।
নদীর জল কোথাও খরোস্রোতা, কোথাও ধীর-লয়,
রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে
পরিশ্রমী বাবারা এমনি বহমান নদী।
===================================
রক্তে লেখা প্রতিবাদ
আলী আকবর বাবুল
গুলির শব্দে ভোর হয়েছিলো গোপালগঞ্জ,
সূর্য উঠেনি, উঠেছে ছিন্নভিন্ন লাশের স্তূপ
নদীর জলে ভেসেছে শিশুর কান্না,
মায়ের বুক ছেঁড়া আহাজারি নেমে এসেছে গাছের পাতায়।
পিচঢালা রাস্তায় রক্তের কালি
এই কি ছিলো প্রজাতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি?
কার ইশারায় চলে গুলি, কারা বাঁধে এই মৃত্যু পরীক্ষা?
তাদের চোখে আমরা ছিলাম কী
ভোটের বাক্স না, কেবল লক্ষ্যবস্তু?
এক একটি শরীর ছিঁড়ে ফেলছে জাতির বিবেক,
এই ইতিহাস কেউ লিখবে তো, না ধুয়ে ফেলবে জলপাই জুতা দিয়ে?
আমি কবি নই আজ
আমি গোপালগঞ্জের শেষ আর্তনাদ।
===================================
শূন্যতার ক্যানভাসে
সাজ্জাদুর রহমান
যদি জানতে চাও কেমন আছি
খদ্দেরহীন ব্যবসা মজমায়। শূন্যতার ক্যানভাসে ।
তবে বলবো—
ঠেকা নিঃশ্বাস নিরাপদে রাখার যুদ্ধ
আত্মার গহিনে বন্দি থাকে
কালের ধুলোয় প্রেম
মরিচা ধরে পড়ে থাকে বুকে নিয়ে অসুখ
মুখোশ প’রে শোকেসে বসে আছে
মৃত গন্ধের বিজ্ঞাপন
সত্যের প্রদীপে প্রতিধ্বনি তোলে
মিথ্যের মানচিত্র ।
তোমার ঠোঁটের নিচে
আমার ঘামের পরাগায়ন তুমি দেখতে পাওনা
বহুবার মরে গিয়ে আমি উভচর
তোমার দেহসুরের গহিন কলতানে ।
===================================
নতুন ধানের লাশ
অমিত মামুন
কৃষকের কান্নায় ভেলা ভাসিয়ে সাধের বৈশাখ আসে,
ঘরে পড়ে থাকে পুরনো ধানের খুন
হাওরে ভাসে নতুন ধানের লাশ
চাতকের শুধু প্রহর শেষের প্রতীক্ষা।
কালবৈশাখীর ভয়ঙ্কর তাণ্ডব শেষ হলে,
কৃষকের বার্ষিক খোরাকের হিসাব মেলে না।
তবু শহুরে সভ্যতায় নববর্ষের আনন্দ জাগে-
পান্তা-ইলিশে ভরে উঠে মাটির রঙিন সব থালা ।
কৃষক তখনো নিমজ্জিত বৈশাখের অপ্রত্যাশিত জলে,
নষ্ট হওয়া ফসলের কবরের পাশে শুধু আর্তনাদ গিলে।
===================================
পলি
জিল্লুর রহমান শুভ্র
ছিপছিপে অন্ধকার প্রয়াত হলে চাঁদ নামে
সাজুগুজু হয়ে এই সমুদ্রকান্তায়, এই উপবনে
আশ্চর্যজনকভাবে কাস্তেচরা পাখি তখন
ভিড় করে আমাদের হৃদয় নিয়ে;
উদ্ভিন্নযৌবনা বাঁশকাটা গ্রাম অথবা লালপেড়ে শাড়িপরা
গোধূলি আসে ফিরে ফিরে
শুধু আসো না তুমি সশরীরে।
পলি, ভেসে যাওনি তুমি বেনোজলে
ঘুমঘুম চোখে তাকাওনি অস্তাচলে
নিখাদ যন্ত্রণার মতো রয়েছ বিমূর্ত চিত্রপটে।
শিল্পবোদ্ধার মতো করি অন্বেষণ
হাওয়াঘরের এক নিতান্তই ভুত
শোঁ শোঁ করে রশি টানে ফেলে আসা বোধের ভেতর।
কে লিখল আমাদের বিচ্ছিন্নতার অছিয়তনামা?
হৃদয়ের নিঝুম উপকূলে কে আনল বিধ্বস্ত জাহাজ?
ছড়ানো-ছিটানো হাড়গোড়?
আবিসিনিয়া থেকে মালাক্কা, মালাক্কা থেকে পুণ্ড্র,
স্বরচিত সড়কের মতো বিন্যাসিত ছিল আমাদের প্রেম; হঠাৎ
সে সড়ক কেন হলো বিবর্ণ অনুভূতির গর্জন?
তবে কী ঈশাণ কোণে জমেছিল শত্রু শত্রু মেঘ?
বৃষ্টিতে ছিল কী অ্যাসিড?
রামধেনুর চারণভূমি ও পাখিদের অভয়ারণ্য হয়ে
উঠেছিল সুতীব্র দীর্ঘশ্বাসের রঁদেভু, আর
আমাদের দিন-রাত্রি বেহুলার ঘর।
অথচ ভাবো একবার
কত সুন্দর ছিল আমাদের প্রেমের শুরুটা!
তোমার ভাইয়ের বিয়ে, সেই মথুরাপুর,
বাঁক খাওয়া নদীর ধারে; যেখানে মেঘ-বিজলি-বাদল
নতজানু হয় বৃক্ষদের কাছে।
আমরা বরযাত্রী, বাহন গরুগাড়ি।
গাড়িয়াল সাঁতারু হয়তো প্রেমিক ছিল না,
তবুও তার মনের আয়নায় ধরা পড়েছিলাম আমি;
ইঙ্গিতে তুলে নিল তার গাড়িতে।
গাড়িতে আমিই একমাত্র ব্যাটা পুরুষ
বসেছিলাম তোমার গা ঘেঁষে
কারো ওজর-আপত্তি তেমন ছিল না।
ইচ্ছে করেই শরীরটা ঢলে দিয়েছিলে আমার দিকে
কতবার স্পর্শে স্পর্শে জেগে উঠেছে আমার লোম!
ফেরার পথে, তখন সন্ধেরাত, ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত
গোবরচাঁপা হাটে বসেছিল গ্রামীণ মেলা
কিনে দিয়েছিলাম বেলোয়ারি চুড়ি, আরও সওদাসুলুপ।
তোমার মনে পড়ে?
হঠাৎ প্রেমের অদৃষ্টপুরুষ হয়ে আসেন তোমার দুলাভাই
বর-কনে অজ্ঞাতকারণে পরিত্যাগ করেছিল পালকি
সেই পালকিতেই জোর করে তুলে দেন আমাদের
তারপর বাকিটা কী আর বলব!
যা হবার তাই হয়েছিল।
হেতুবিদ্যা যখন হেলে পড়ে হেত্বাভাসে, তখন
জলের ফোঁটার মতো গড়িয়ে গড়িয়ে আসে
বিলুপ্তপ্রায় নগরীর মতো ধূসর সেসব স্মৃতি।
আজ আয়ূর করিডরে যেন ধুঁকছে লাল ঝুঁটি মোরগের লড়াই।
বৃষ্টি ভেজা শিয়াল লেজা ঘাস, স্নিগ্ধ বিকেলে ফোটা গোলাপ, রামধনু
কিংবা ট্রেনের হুইসেল, কিছুই ভাল্লাগে না আর; এমনকি নিজেকেও।
পলি, এ দুঃসময়ে একবার যদি পাশে দাঁড়াতে!
জানি, দাঁড়াবে না, কেউ দাঁড়ায় না
যে হাত একবার ফসকে যায় তা সহসা ফিরে আসে না।
===================================
ফিরে চাই
রুমি চৌধুরী
ফিরে চাই প্রেম, ফিরে চাই দ্রোহ, ফিরে চাই সে হৃদয়
আজো ফিরে চাই ক্রমাগত স্রোতে ভেসে যাওয়া সে সময়।
জীবনের ঘাটে পোড় খাওয়া এক অচেনা পথিক এসে
যৌবনবতী নদীর মতোন মোহনাকে ভালোবাসে।
পাণ্ডুর দেহ, বিপরীত চাওয়া সভ্যতা বিকশমান
ঘোর কুয়াশায় ভিজে যায় সব আলোর ফোয়ারা, গান।
আজ ফিরে চাই সেইসব দিন, সেই রাত্রির ছায়া
ধূপে চন্দনে স্বপ্নে বোনা এক আকাশের মায়া।
===================================
নারী
তাহমিনা আলম
নারী- আত্মজা, মাতা, পত্নী, ভগ্নি
বিচিত্র ভূমিকায় সে সর্বজয়ী।
আপসহীন সংগ্রামী,
যুগে যুগে গেঁথেছে মাল্যখানি প্রীতির।
জয়ে – পরাজয়ে বীরোচিত সাহসী,
সংগ্রামে-আন্দোলনে, দৈন্য – দুর্বিপাকে অপরাজেয় জয়শ্রী।
দিয়েছে সাহস, প্রেরণা,নির্ভরতা, বিশ্বস্ততা।
গড়েছে প্রেম, কামনা- বাসনার দুর্লঙ্ঘ্য সৌধ।
নিষেধের উঁচু প্রাচীরে, নিয়মের ভুয়া ঝাণ্ডা উঁচিয়ে তাঁকে করেছ অস্পৃশ্য!
বিধিনিষেধের নিষ্ঠুর ঘায়ে,অনুশাসনের ক্ষুরধার পথে
তাকে বারবার করো পরাস্ত।
ধর্ষকের ঘৃণার কদর্যতায়, নিষ্ঠুর লালসায় সে বারেবারে নিষ্পেষিত।
মহাকালের উত্তাল স্রোতে ভেসে যায় তাঁর রচিত কীর্তি
নষ্ট সময়ের নাগপাশে মুছে যায় অবিনাশী স্মৃতি।
তবুও তো তাঁরা ভুলে যায় গ্লানি, ক্লিন্নতা, ব্যথা।
পুরোনো ক্ষত সারিয়ে নেয় নতুনের আবাহনে, তোমাদের মিথ্যা অনুরাগে।
যুগে যুগে তাঁরাই তো প্রেমিকা তাঁরাই বিরহিনী
প্রেম- কাম, ভরসা- বিশ্বাসের এক উদ্দাম স্রোতস্বিনী।
তাঁকে শুশ্রূষা দাও, জড়াও মানবিক বাহুডোরে।
প্রেম দাও,আশীর্বচনে ধন্য করো,
পুষ্ট করো ভালোবাসায়।
তাঁর বাহুবন্ধনে বেজে উঠুক জয়ধ্বনি,
অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি পাক উজ্জয়নী
সীতা, কৃষ্ণা, আছিয়া,রামিসা, ইরাদের জীবনের দামে রচিত হোক স্বর্গভূমি।।
হে মহান
তুমি নেই বলে, সবুজ উপত্যকায় বৃষ্টি নামে না বহুকাল।
নদী আর তরঙ্গায়িত হয় না জল কল্লোলে।
মাছেরা সাতার কাটে রক্তে,পাখিরা গান গায় বর্বর কোলাহলে।
রাত্রির বুক পকেটে জোনাকির আলো আর নেই।
নিকষ কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে বদ্বীপ।
বারুদের উৎকট গন্ধ মিশেছে শিউলির সুবাসিত শরীরে।
জননীর পবিত্র দেহ কারা যেন খুবলে খায় হিংস্র শ্বাপদের মতো,
কেউ বোঝে না বৃক্ষের সবুজ বিক্ষোভ,
মহাসমুদ্রের মূক,বোবা কান্নাকে তারা করে বিদ্রূপ।
বর্বরের দানব মুঠোয় ধরা পড়ে দিগন্তের বিস্তৃত ইতিহাস।
মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে স্খলিত হয় শ্বাশত সুন্দর।।
পাঁচ শব্দের কবিতা
গাজী আবু হানিফ
১. চির সুখের গান:স্বর্গসোপান, শুধু সুখ আনন্দ গান
২. স্বর্গের প্রকৃতি:হীরের জল মাটি, অনন্যা পরিপাটি
৩. মায়াবিনী হুর:হুর পরি মায়াবিনী, অনন্ত বিনোদিনী
৪. চিরন্তন যৌবন:চির যৌবনকাল, শান্ত সৌম্য ত্রিকাল
৫. অলৌকিক প্রাসাদ:
বইবে সুগন্ধি নহর, অলৌকিক প্রাসাদ-ঘর
বর্ষার রূপ:
৬.বর্ষা হাসে, টইটম্বুর মন ভাসে
৭.কদমফুলে ফুলে,মনখানি দোলে
৮.নৌকাবাইচের গান,আনন্দে মন অফুরান
৯.পালের নৌকায়,বধূ নাইওর যায়
১০.শাপলাফুলের হাসি,ফোটে রাশি রাশি
১১.অনুরাগের হাসি : প্রেম আছে বলে,পৃথিবী হাসে।
১২.চেতনার স্পন্দন : প্রাণই দিচ্ছে চেতনা,শিহরণ জাগরণ।
১৩. একাকিত্ব: তুমিহীন শহরে, বসন্তও ভীষণ একাকী।
১৪.স্মৃতির বৃষ্টি :স্মৃতির পাতায়, আজও বৃষ্টি পড়ে।
১৫.প্রত্যাশা: অন্ধকার কেটে, আলো আসবেই আবার।
১৬. নবান্ন:নবান্নের বাসে, কৃষক মন হাসে
১৭. বৈশাখী মেলা:মেলার বাঁশি বাজে,রঙিলা সাজে
১৮. গ্রামীণ সকাল:পাখির কলতানে,সবাই জাগে গানে
১৯. আল্পনা:মায়ের মনের কল্পনা,উঠোনের আল্পনা
২০. বাউল গান:একতারার সুরে,মন হারায় দূরে
===================================
মেঘ থেকে মৃত্তিকা
সোমা মুৎসুদ্দী
মেঘ থেকে মৃত্তিকায়
ছড়িয়ে দেই কিছু নান্দনিক বীজ।
এই বর্ষায় পাতারা সজীব হয়ে
কণ্ঠে তোলে সবুজ এক কবিতা।
আমার ভেতরেই জেগে ওঠে অন্য আমি
কফিতে চুমুক দিতে দিতে গল্প করে
কোনও এক আগামী ূদিনের মানব শিশুর
যে শিশু পরম মমতায় দোল খাবে
সাহিত্য ও সংস্কৃতির দোলনায়
বার্তা দেবে এক নবজাগরণের।
===================================
বৃষ্টি
মো. দিদারুল আলম
রিমঝিম রিমঝিম নামলো যে বৃষ্টি
বর্ষার এ এক অসাধারণ সৃষ্টি।
কালো মেঘে ঢাকা যায় নীলাভ আকাশটা
জুড়িয়ে যায় যে আজ সকলের হৃদয়টা।
ব্যাঙগুলো ডাকে থইথই বৃষ্টির জলে
হাসে ওই কদম ফুল গাছেদের বৃষ্টি ভেজা তলে।
কাগজের নৌকা ভাসায় যে ছোট্র খোকা
বৃষ্টিতে ভিজে হয়ে যায় সে বোকা।
মাঠ-ঘাট নদী-নালা বৃষ্টির পানিতে একাকার
সবুজে সেজে প্রকৃতি হয়েছে নিরাকার ।
চাষি ভাই মুখে হাসি মাঠে চলে যায়
ব্যাঙের ছাতারা সব উঁকি দেয় গাঁয়।
টিনের চালেতে বাজে বৃষ্টির অবিরাম শব্দ
শীতল আবহে বাড়ির সবাই আড্ডায় মুগ্ধ।
বর্ষার এই দিনে ঘরে থাকা বড় দায়
হৃদয় শুধু বৃষ্টিতে ভিজে উড়ে যেতে চায়।
===================================
কালো মেঘের ফাঁদ
শবনম ফেরদৌসী
আকাশে নেই আজ বাঁকা চাঁদ
গগনে কালো মেঘের ফাঁদ,
ঝরছে অজর ধারায় বৃষ্টি
স্রোতে ভেঙেছে বাঁধ।
কেউ কেউ বর্ষাকে উপভোগ করে
ভাবে বর্ষাই বসন্ত,
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মূগ্ধ হয়ে
ভেসে বেড়ায় দিগন্ত।
বর্ষার জলে ভাসে নিন্মাঞ্চল
ঘর করে ছলছল,
এতটুকু খাবার নেই ঘরে
চারদিকে নোংরা জল।
===================================
বর্ষার রাতে
সুজন দাশ
ঝরে রিমঝিম বাদলের ধারা
জ্বলে মিটিমিটি আকাশের তারা
বিজলিও চমকায়,
জনমানবের নেই পথ চলা
হেঁকে যায় মেঘ ছেড়ে তার গলা
বুঝি ওরা ধমকায়?
ভিজে নেয়ে ওঠে কদমের ফুল
উল্লাসে ব্যাঙ ডাকেও ব্যাকুল!
হাসে চাঁদ জ্যোৎস্নায়,
পুকুর ডোবায় জল আর জল
থেমে থেমে মেঘ করে নেয় বল
আলো হাসে রৌশনাই।
বিরহে কাতর হয়ে ওঠে মন
স্বপনেতে আঁকি মিলনের ক্ষণ
কোথায় যে তাকে পাই?
কল্পনা রঙে যাই যেন ভেসে
তাকাই সুদুরে অজানার দেশে!
নাই পাশে কেহ নাই।
আবেগের বশে মন ভেসে যায়
পাশে অপ্সরা নাচে আর গায়!
চলে যাই যেন ঘোরে,
মনে হয় তারে চিনতাম আগে
ভেসে গেছি কত প্রেমে আর রাগে!
নিঃশ্বাসও বয় জোরে।
===================================
চাষার স্বদেশ
সোহেল মাহমুদ
চাষার স্বদেশ হল- ফসলের জমি,
মোহনীয় মসনদ- দূর পরাহত।
রোদে পোড়া চামড়ায়- শস্যের মমি,
লালন পালন করে- জন্মের ক্ষত।
প্রতিবেশী খড়কুটো- গোয়ালের গাই,
শরীরের ঘামে কেনা স্বীয় সম্ভ্রম।
আকাশের পানে কোন অভিযোগ নাই,
মানুষ নিজেই তার মৃত্যুর জম।
বুকের উনুনে রাঁধা মুখের আহার,
সাদাভাতে এক ফোঁটা ঘামের লবণ।
ইটের শহর আজও- মৃত চেতনার
মাংসের আসবাবে অঙ্কিত বন।
যাপনের অবহেলা- জন্মের দোষ,
কোথায় পালাবে তুমি- শূদ্র মানুষ?
===================================
আমাদের শহর, আমাদের প্রিয় নগর
স্বপন কুমার বড়ুয়া
এই আমাদের নগর এখানেই বসবাস
এখানেই নিত্য নিই শ্বাস-প্রশ্বাস।
শহর ঘিরে নাগরিক আঁকে স্বপ্নবিলাস
এই শহরে দুঃখ-বেদনা আনন্দ -উল্লাস।
এ নগরের বাড়ছে বহর
তরতরিয়ে বাড়ছে ঘর,
অলিগলি সড়ক রাস্তা কোথাও নেই ঠাঁই
চারদিকে ইটের সাজ যখন যেদিকে তাকাই।
পুকুর দিঘি নদী-নালা -খাল সবই হচ্ছে দেদার ভরাট
শিশু-কিশোর -তরুণ -তরুণী পায় না খুঁজে খেলার মাঠ।
ঝোপঝাড় আর বন পাহাড়
কোথাও নেই একটুকু ছাড়
সুযোগ পেলেই করছে উজাড়।
বস্তি থেকে নদীর তীর
সবখানেতে লোকের ভিড়,
গ্রাম ছেড়ে দলে দলে আসছে শহর
ছোট- বড় সব বয়সের নারী -নর
দিনে দিনে শূন্য হয় গাঁও গেরামের ঘর
লোকের ভিড়ে যায় না চেনা আপন পর।
ইচ্ছেমতো চলছে সবাই
নিয়ম মানার নেই বালাই
মানে না শাসন, শোনে না কারো কথা
হাতের মুঠোয় রাখতে চায় সবার প্রিয় স্বাধীনতা।
দানব সেজেছে শহরের যত রাস্তা সড়ক
রোজ ঝরে প্রাণ , যেন লেগেছে মড়ক।
সড়ক এখন নয় নিরাপদ
অলুক্ষণেই ঘটে কত বিপদ।
নগর দিচ্ছে খেসারত পথের ধারে বাগান গড়ার সখে
প্রাকৃতিক কাজে ফুটপাতগুলো ইচ্ছা মত করছে ব্যবহার লোকে।
হাঁটতে চলতে সবখানে যেন আজ মরণ ফাঁদ
জেঁকে বসেছে ভয়-ভীতি দিন কিংবা রাত।
যে যার মত চালায় লোকে লড়ি গাড়ি ঠেলাগাড়ি
রাস্তা নয় যেন মেলা বসেছে দোকান সারি সারি,
মেলায় মিলে সবই গরুর দুধ,সব্জি -মাছতরকারি।
নেই পাত্র আবর্জনার যত্রতত্র ফেলছে লোকে বর্জ্য
দুর্গন্ধ আর পচন দুষণে জনজীবন আজ অসহ্য।
দিনে দিনে মুছে যাচ্ছে সড়কের সব নাম ফলক
অতিথিরা পারে না চিনে নিতে শহরের রাস্তা সড়ক।
ক্লান্ত পথিক কিংবা যুগল যায়
ছায়া ঘেরা শান্ত শীতল ডিসি হিল
সন্ধ্যে পেরোতেই বন্ধ থাকে প্রহরায়
প্রহরী এসে ফটকে লাগায় তালা সিল।
দখল এখন আরেক অজগর
নেই বুকে তার ভয় ডর
দিনে দিনে গিলছে নগরবাসীর প্রিয় কলিজা “সি আর বি”
দোকান রেঁস্তোরায় হারিয়ে যাচ্ছে তার নিসর্গ রূপ সবই।
সড়ক দ্বীপ দেয়াল স্থাপত্যে লোকে দিচ্ছে সেঁটে পোস্টার রূপ জৌলুস শহরের দিনে দিনে হচ্ছে সবই ছারখার।
সকাল বিকাল ভিড় জমছে শহরের যত রেস্তোঁরায়
ভিড় জমছে কোচিং কেন্দ্রে চলছে খরা গান বাজনায়।
বর্ষা এলে বানের জলে হাবুডুবু খায় উঁচু-নীচু এই শহর
চিনে না পানি সখের বাগান, দোকান অফিস বাড়ি ঘর।
বছর বছর শুনি শুধু আশ্বাস বাণীর ধ্বণি
কবে হবে বান অবসান সেই প্রহর গুনি।
বছর ঘুরে আসলে ঝড়- বাদল নামে পাহাড় ধসের খড়্গ প্রাণ হারায় ,ভাসায় ঘর সব হারিয়ে কাঁদে ভাগ্যহত নিঃসঙ্গ ।
নয় আশ্বাস, নয় সে ‘শ্লোগান “- চট্টগ্রাম হবে বাণিজ্য রাজধানী “,
নগরবাসী এবার দেখতে চায় মাঠের কাজ নয় মুখের বাণী।
মধ্যবয়সী, বুড়োরা শহরের কপালে দেয় দু’ হাত
গৌরব ধন্য চট্টগ্রামের একে একে সব হচ্ছে বেহাত।ৃ
শহর আবার ফিরে পেতে চায় প্রাচ্যের রাণীর গর্বিত রূপ জাগো পিতা জাগো নগরবাসী থেকো না বসে আর নিশ্চুপ।
জ্ঞানী গুণী শিল্পী বীরের পুণ্যভূমি সবার প্রিয় চট্টগ্রাম
সব কালিমা ঘুচিয়ে রক্ষা হোক এই নগরের সুনাম।
===================================
ছাই
সারমিন চৌধুরী
পাতিলের পোড়া বুকের মতই
অহর্নিশ জ্বলতে থাকে মন স্মৃতির উনুনে;
সিঁধ কেটে যেখানে লুট হয়েছিলো জরির প্রেম
তেড়ে আসা ঢেউয়ে জেগেছিলো আস্থার চরাচর
আবেগের মহিরুহ মেলেছিলো শাখাপ্রশাখা!
পুলকিত হাসিতে ঝরেছিলো চারদিকে জ্যোৎস্না
নোনাজলের ঐশ্বর্য ছিলো অবলম্বন হয়েই
আজ সেটা অবসন্নতায় ভরা খাঁখাঁ বিরানভূমি।
যেখানে অন্ধকার হিমের মতো জট পাকাচ্ছে
শিরা-উপশিরা হয়ে আসছে ক্রমশ নিস্তেজ,
ম্লান হয়ে যাচ্ছে জীবনের আলো নৈঃশব্দ্যে
ব্যথার দ্যোতনায় চমকাচ্ছে শেষ অভিপ্রায়।
অথচ হারানোর ভয়ে হয়নি কেউ শোকসন্তপ্ত
রুদ্ধ আহাজারি শুনেও কর্ণপাত করেনি কেউ
স্বার্থের ইঁদুর হয়ে কেটেছে শুধু সম্পর্কের বন্ধন।
ছলোনার বড়শিতে ঘায়েল হওয়া নিথর হৃদয়
চাবিহীন তালার মতো আজই অদরকারী।
শ্মশানের কাঠের ন্যায় পোড়ে যাচ্ছি নিভৃতে-
অন্তিমতায় চোখমুখে দেখছি শুধু দগ্ধ ছাই।
===================================
ইকবাল বাবুলের গুচ্ছ ছড়া
বাংলা ম্যাডাম তামান্নাকে
আমার ভীষণ ভাল্লাগে সেই
বাংলা ম্যাডাম তামান্নাকে
বিন্দু বিন্দু শিশির হয়ে
যখন তিনি ঘামান নাকে।
ইচ্ছে করে দিই বাড়িয়ে
সুগন্ধিময় টিস্যুখানি
সত্যি তাকে ভাবতে গিয়ে
কল্পনাতে কী সুখ আনি !
এ’সুখ মানে আর কিছু নয়
গোপন প্রণয় কবির ও তার
প্রেমিক ছাড়া কেউ বোঝে না
অর্থটা এই গভীরতার।
সত্যি আমার টান আছে
যতোই বলুক দুষ্টু আমায়
করুক আমার নিন্দে সে
এ দেশ ছেড়ে যাক চলে সেই
ইংল্যান্ড বা চীন দেশে।
সত্যি তবু ভুলতে আমায়
পারবে না সে তেমনটি
পড়বে মনে একলা যখন
বসবে খেতে লেমন টি।
পড়তে গিয়ে চোখের জলে
ভিজবে নিউজ পেপারটা
আমি ছাড়া জানবে না কেউ
এই যে গোপন ব্যাপারটা।
থাকবো আমি কল্পনাতে
তার আনাচে কানাচে
কারণ হলো তার প্রতি যে
সত্যি আমার টান আছে।
পাশের বাসার বৌদি আমার
পাশের বাসার বৌদি আমার
সুন্দরী সেই রমা সেন
এখন দেখি আগের চেয়ে
দেখতে আমায় কম আসেন।
প্রায় সময়ে এসেই তিনি
হাঁটতেন সেই বারান্দায়
ব্যাপারটুকুন বুঝতে পেরে
টাইট দিয়েছেন হারান দা’য়।
===================================
জোয়াইক্কা
উৎপলকান্তি বড়ুয়া
চেরাই বেরাই লেরাই পেরাই
তারা দুউয়া ভাই,
হক্কল বঅইত্যা কাঁন্ড কাঁমর
কঁনঅ ফারাগ নাই।
চেদের বেদের লেচের ফেচের
হিতারা দুই বেডা,
ভাদাইম্যা বঅর নানা ডইল্যা
কঁতার গালে পেঁডা।
ঘুচুর ঘচুর লুচুর লুচুর
অত্থরে দুই পঅল,
ঠিগ দুইজ্জা উইদ্যা বিলৎ
রইদৎ চড়ায় ছঅল!
লেডাই পেডাই ভেঁডাই চেঁডাই
এই দুনুউয়া মিলি,
হাঁরাদিন-নান্ বকসির হাডর
চাবায় পানর খিলি।
ফেডের ফেডের ভেডের ভেডের
জোয়াইক্কা ভাই তারা,
থেনতেয়ালি দুউরাই ধরি
পিছঅদি দেয় দারা!
===================================
মৃন্ময়ী মৃম-এর গুচ্ছ অণুকাব্য
১.
নির্জন প্রহর
একাকী ভায়োলিন বাজে
স্মৃতির শহরে
পথিকের পথ চলা থমকে যায়
ক্ষণিকের বেসুরে
ধূপের মত মন পোড়ে।
২.
স্বপ্ন উড়ছে
অধরা রয়ে যায় কখনো জীবনে
স্বপ্ন মরে না
মনের সাথে তা বুনছে।
৩.
কিছুই হারায় না
স্মৃতিতে জমা থাকে পাণ্ডুলিপি
ধুলো ঝেড়ে মন
তাকায় যখন তখন
তোলে স্বরলিপি।
৪.
শোকের বিলাপ থামে না
কালের স্রোতে বহে নিরন্তর
গভীর হতে হতে হয় শব্দহীন
পোড়ে শুধু অন্তর।
৫.
ভালোবাসা ধ্রুপদী
গভীর মগ্নতা-ই তার সরগম
নয়তো জন্মে না অনুরাগ
বাজে না বেহাগ অনুপম।




