এখন সময়:রাত ৩:২৭- আজ: রবিবার-২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ৩:২৭- আজ: রবিবার
২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

আদিগন্ত ইন্দ্রজাল

আনিস রহমান

 

দিনেরাতে টানা তিনদিন ভ্রমণ শেষে এক বিকেলে চেন্নাই স্টেশনে এসে নামলাম।

ঠিক বিকেল না তখন, শেষ বিকেল। সূর্য অস্থিরপাটে লুকোবে বলে! সে কী ব্যস্ততা ওর!

অনেক ভিড় স্টেশনে! মানুষের গায়ে মানুষ! মাথায় মাথায় মানুষ! ওদের ঠেলে-উজিয়ে শেষে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। সঙ্গে সুকল্যাণ ছিল বলে রক্ষে! হাওড়া থেকেই আমরা সহযাত্রী। শুধু কী সুকল্যাণ! ওর আরও দুভাই আর বাবাও ছিল আমাদের সহযাত্রী। সহযাত্রী থেকে কখন যেন আমরা এক পরিবার হয়ে গেলাম তিনদিনের যাত্রাপথে। সে এক অবাক ব্যাপার বটে!

সুকল্যাণ সঙ্গে থেকে আমাদের মালপত্তর সব অটোতে তুলে দিল। অটোঅলাকে বলে দিল আমাদের হোটেলের নাম।

দূরে কোথাও যাবার কথা উঠলে আমি সবসময় কেন জানি না, কোনো বিস্ময়ের সঙ্গে দেখা হবে বলে অপেক্ষা করি। সুকল্যাণও এক বিস্ময় আমাদের দীর্ঘ ভ্রমণ পথে। অপরিচয় থেকে পরিচয়।শেষে ঘনিষ্ঠতা। এবং একসময় যেন হরিহর আত্মা হয়ে উঠেছে সুকল্যাণওর পরিবার! উত্তর ভারতের অর্জুন ভার্মার পরিবারের কথা বলছি তেমনি এক সম্পর্ক দাঁড়িয়েছে এ কদিনে ট্রেনের এক টুকরো কামরায়।

আর কতো! পুরো পথই শুয়ে বসে কাটাল অর্জুন।

ওর নাদুস-নুদুস হলুদ রঙা শরীর নিয়ে এবার উঠে বসল অর্জুন ভার্মা! শেষ স্টপেজ। ট্রেন খানিক জিরিয়ে শেষে ডিপোর্টে যাবে। তারপরও উঠে বসল অর্জুন আমাদের বিদায় জানাতে। বিশেষ করে দিঘলকে আশীর্বাদ না করলে কী হয়! তার নাতি এখন দিঘল। ভার্মা হলো দিঘলের দাদু। দাদু-নাতির সম্পর্ক ওদের। এখন বললেই কী আর বিদায় হয়! দাদা বলল, “বেটা মেরা সাথ ঘার চালিয়ে। আচ্ছা ঘার হ্যায়! উদারছে ইতনা বড় মাঠ হ্যায়! ক্রিকেট খেলোগে! জবরদস্ত প্লেয়ার হ্যায় উদারসে! বিরিয়ানি খাউঙ্গে! পাঠ্ঠাকো রেজালা! কাবাব ভি হ্যায়! হাম দেখিয়ে তুম আইসক্রিম বহুদ পিয়ার কারতা হ্যায়। হামকো ঘার মে জাদা আইসক্রিম হ্যায়! হেভ্ভি টেস্টি!”

নাতির সঙ্গে খুনসুটি আর নানা খাবারের প্রলোভন! কিন্তু তাতেও পটেনি দিঘল! শুধু মিটিমিটি হাসি আর ডাগর চোখ দুটো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে শেষে চোখ ওর স্থির হয়ে থাকে ট্রেনের মেঝেতে। এ দেখে ভার্মা বাবুর বড্ড অভিমান হয়“তুম বেটা মেরে পেয়ার কারতা নেহি হ্যায়।” এমনি যখন আমাদের সম্পর্ক তখন ভার্মা তার ছেলেকে বলল, “যাও বেটা ওদের অটোতে উঠিয়ে দিয়ে আসো।”

তার আগে একদিন ট্রেনের দুলুনি খেতে খেতে অর্জুন ভার্মা আমাকে আর বলাকাকে বলল, আমার এ তিন ছেলে আমাকে এত খেয়াল করে, সবসময় চোখে চোখে রাখে! এত আদিক্ষেতা ভালো লাগে না। বিশেষ করে সুকল্যাণ তো বাবা বলতে অন্ধ। তারপর আমাকে আর বলাকাকে কাছে ডেকে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, এ কথা বলাটা কোনোভাবেই ঠিক হচ্ছে না। একদম অন্যায়। এ পৃথিবীতে কেউ জানে না! তবু বলছি, মানুষের ভেতর কত বিচিত্র মানুষ হয় তা চিনে রাখার জন্যে। সুকল্যাণকে পেয়েছিলাম ডেভিড হিসেবে!

মানে!

ছেলেটি জন্মের সময়েই ওর মা মারা যায়। মায়ের ছায়া নেই, মায়া নেই। মায়ের দুধ নেই। কী কষ্টকর জীবন ওর। চোখে সওয়া যায় না। তখন আমার মেজ ছেলের বয়েস এক বছর। তখনও মায়ের বুকের দুধ খেয়ে ওর দিন কেটে যায়। এক সন্ধ্যায় এসে বললাম সুদেষ্ণাকে, ডেভিডের কষ্টের কথা! সুদেষ্ণা বলল, রজত দুধ খেয়ে অনেক দুধ থেকে যায়। ওকে নিয়ে এসো, খাইয়ে দেব না হয়!

আমি বললাম, শুধু খাইয়ে দেবে, রাখবে না! সুদেষ্ণা খানিক সময় আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা দুটো ছেলে পেয়েছি ভগবানের কৃপায়। ডেভিড আমার আরেকটা ছেলে। তিনটে ছেলে আমাদের অসুবিধা কোথায়? আজ অবধি কেউ জানে না। তোমরা দেখতো ওদের চেহারায় কী মিল! তিনটি ছেলেই বাবা বলতে পাগল।” অর্জুন ভার্মার চোখেমুখে পরম তৃপ্তি ভালোবাসা আর আনন্দ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।

বাবার শরীর যে ভালো নেইতা ওর অজানা নয়। চিকিৎসার জন্যে যে আমরা এসেছি তাও জানে সে। কিন্তু দিঘল কিছুই জানে না। ওর ধারণা আমরা বেড়াতে এসেছি। বাবা-মা আর দিদিকে পাশে পেয়েই ওর আনন্দ। প্রায় তিনদিনের ট্রেন জার্নিতে ওর আনন্দের কমতি ছিল না। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ওকে বললাম“বাবা, খুব টায়ার্ড লাগছে তোমার! ঘুম পাচ্ছে?” ও মাথা নেড়ে না করল শুধু বলল, “কেন যেন মন ভালো লাগছে না বাবা।” আমি আর বলাকা অবাক হয়ে তাকালাম“কেন ভালো লাগছে না বাবা!”

জানি না। শুধু বাড়ির কথা মনে পড়ছে। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে আমি আর বলাকা চোখাচোখি করি! কথা বলিকী হলো ওর!

ট্রেনে কতো আনন্দ করলে, হইচই করলে তাহলে এখন আবার কী হলো! ভার্মা দাদুর কথা মনে পড়ছে বুঝি!

জানি না!

ওরা আমাদের নির্ধারিত রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। রুম বয় ভেতরে! সবকিছু চেক করছে। দিঘলের মন তেমনি বিষণ্ন। ও আনমনে দূরের রাস্তায় তাকিয়ে বলল, মা কালকে আমরা কোথায় যাব?

কেন?

তোমরা যাও। আমার যেতে ভালো লাগছে না।

একটু যেন চমকে উঠলাম আমি! নিশ্চয়ই ওর মন জানান দিচ্ছে আমি আর বেশি দিন নেই। ওর মনে তাই ভালো না লাগাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার! তা না হলে এমন কেন হবে! একেই বুঝি বলে টেলিপ্যাথি!

বলাকার চোখেমুখেও কেমন এক বিষণ্নতা! বলাকা ওর হ্যান্ডি ব্যাগটা বিছানায় রাখতে রাখতে বলল, “জানি না ছেলে-মেয়ে দুটোর কপালে কী আছে! এতো খারাপ কপাল নিয়ে ওরা জন্মেছে! ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে! আমি তো…”বলেই আঁচলে মুখ চেপে বসে পড়ে বলাকা।

নিসর্গ আর দিঘল পাথর হয়ে বসে থাকে বিছানায়ওদের চোখ মেঝেতে কী যেন খুঁজছে! মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকায় মায়ের দিকে। কখনও এক ঝলক আমাকেও দেখে নেয়। ওদের চোখেও জল জমেছে। যেকোনো মুহূর্তে ঝরতে পারে। আমি খুব বিপন্ন বোধ করি। এই বিদেশ বিভুঁয়ে এসেও কেবল আতঙ্কে ভুগছে ও। এমন পরিবেশে কতক্ষণ? তাই পরিবেশকে একটু হালকা করার চালে বললাম, আমার কিন্তু দারুণ লাগছে। এক ঘরে সবাই। হুটোপুটি করবে তোমরা, আমরা দেখব।

বলাকা বলল, এক ঘরে সবাই বন্দি! আমি একটু হোঁচট খেলাম। বন্দি হবে কেন? নিজেদের মতো সময় কাটাব আমরা। এমন সময় ডোর বেল বাজল। রুম বয় সম্ভবতআইয়ে-আন্দারমে আইয়ে! ছেলেটি ভেতরে ঢুকে ডান হাত বুকে ঠেকিয়ে একটু নুয়ে ছেলেটি ইংরেজিতে বলল, “রাতের খাবার কি অর্ডার করবেন?”

আমি সঙ্গে সঙ্গে অন্য তিনটি মুখ মুখের সঙ্গে ছটি চোখ, চোখ এবং মুখ মিলিয়ে এক মানবিক অবয়ব খুঁজলাম। বোধহীন কাষ্ঠ নির্মিত অবয়ব ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পেলাম না। এ কাঠের প্রতিমা অসহ্য! আমি সেখানে প্রাণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলাম আচ্ছা সবাই মিলে একটু বাইরে গিয়ে খেলে কেমন হয়!

আমি রুম বয়ের দিকে তাকালাম। ও বলল, “হাঁটা পথেই অনেক হোটেল পাবে! তবে আটটার মধ্যে বেরুলে ভালো।”

আমি বললাম, “ধন্যবাদ। আমরা বাইরেই খেয়ে নেবো। থ্যাঙ্কু বলো বাবাকে!”

ওপার থেকে কোনো সাড়া পেলাম না। শুধু বলাকা বলল, যা হয় এখানেই বলো! বাইরে খরচ বেশি। অনেক টাকার ব্যাপার!

রাখো খরচ! সবাই মিলে একসঙ্গে আনন্দ করে খাব আনন্দে থাকলে মনও ভালো থাকবে। আমার শরীরও ভালো হয়ে যাবে তখন!

এবার ছেলে-মেয়ে দুটোর চোখেমুখে কী যেন টলমল করে উঠলসে কী আনন্দ!

বেরিয়ে পড়লাম আর দেরি না করে!

রুমে ফিরতেই রিসিপশন থেকে জানাল, পরদিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট। রাত একটায়! মালার হাসপাতালে!

হঠাৎ ব্রেক করলে যেমনি ঝাঁকুনি লাগে তেমনি ঝাঁকুনি খেলাম! রাত একটা! বলাকা বলল, অতো রাতে তোমাকে একা যেতে দেবো না!

অগত্যা ঠিক করলাম সবাই মিলে একসঙ্গে যাব! এটাও আনন্দ! কী বলিস!

ওদের খুব কষ্ট হবে! এত রাতে তো জেগে থাকে না ওরা! বলাকার নিষ্প্রভ কণ্ঠ।

আমি তাকালাম বলাকার দিকে! না, কোনো কিছু কাজ করছে না মাথায় কাল আসুক, তখন ভেবে দেখব!

আলো আঁধারি চারদিকে তখনও। ঘুম ভেঙে গেল ভজনের সুরে। কী এক অপার্থিব সুর বাতাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়ছে। কাছেপিঠে কোনো মন্দিরে বাজছে এ ভজন।

উঠোনে গাছজুড়ে পাখির কিচির-মিচির। ঝুমুরের মতো বাজছে। পাশেই দুটো বড় গাছ। গাছের পাতার ভিড়ে পাখিরা ঢুকছে ফের বেরিয়ে পড়ছে ফুড়ুৎ করে। জানালার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে বেশ খানিকটা সময় চোখ বুজে থাকলাম।

কী আশ্চর্য! বন্ধ দুচোখে অন্ধকার নেই। নতুন সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত!

আগের দিন সকাল। ট্রেনে সারারাত জেগে থেকে সবে চোখ লেগেছে আমার। তখনই অর্জুন শর্মা ডেকে ওঠে, দেখো দেখোকেয়া আচ্ছা সুরুজ হ্যায়! ওঠ বেটা, জলদি জলদি ওঠ।

জানালা গলে বাইরে তাকালাম। তীব্র লাল একটি রেখাদিগন্ত জুড়ে। পায়ে পায়ে সে রেখা কুসুম হয়ে আকাশের ক্যানভাসে ফুটে আছে। আলোর বানভাসী আকাশ জুড়ে। কী তীব্র আলো। যেন জাগ্রত কোনো দেবতা। চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আমি বিস্ময় মেখে নতুন সূর্যকে দেখলাম। রহস্যের আঁধারে ডুবে সূর্যকে অনুভব করলাম হৃদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে।

বলাকা এসে আমার চুলে উকুন খোঁজার ছলে মাথায় হাত বোলালো। অনেকটা সময় ধরে। তারই ফাঁকে বলল, ভালো একটা রেস্টুরেন্ট খুঁজে দেখ না। আমাদের তিনবেলার খাবার যাতে ওখানেই সেরে নিতে পারি! কেন? তুমি না কাল বললে, হোটেলেই যা হয় একটা সেরে নিলেই হবে। বাইরে খরচ বেশি!

পরে ভেবে দেখলাম কখন কোথায় থাকি; ঠিক নেই। রুমে এসে দেখলো, রুম বন্ধ। তখন!

অতো ভেবে কী হবে!

রুমসার্ভিসের লোক এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ে কে? আসুন!

হ্যাংলা মতো একটি ছেলে ঘরে ঢুকলো। শরীরে তেল-চর্বি আর মাংশের ঘাটতি চোখে পড়ার মতো! তবে শরীরের চেয়ে ওর মাথার ওজন বোধ হয় বেশি হবে! ঘাড় অবধি চুল! কোকড়ানো চুলের ঝাঁপি মাথা জুড়ে। চোখাচোখি হতেই বলল, শুনলাম বাংলাদেশ থেকে এসেছেন!

ঠিকই শুনেছেন!

আমি নিখিলেশ। এ হোটেলে রুমে খাবার সার্ভ করি।

তা আপনি দেখি ভালো বাংলা বলেন, বাঙালি নাকি!

বাঙালি, উড়িষ্যায় বাড়ি। তবে আমরাও পূর্ব বাংলার মানুষ! আমার বাপ-দাদারা দেশ ভাগের পর প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে এল। সেখান থেকে উড়িষ্যায়। এখন উড়িষ্যার ভাষাতেই কথা বলি। ঘরে বাবা মা থাকতে বাংলা চলতো। এখন আমি কেবল একা বাঙালি। বাংলায় কথা বলি সুযোগ পেলেই!

দুপুরে খাবার তালিকায় মাছ সবজি ডাল টক আরও কী কী পদের নাম যেন বলল নিখিলেশ!

চিকেন হবে না!

চিকেন রাতে দেবো দাদা!

বাচ্চাদের জন্য সব বেলাতেই চিকেন দেবেন।

সেই থেকে তিন বেলা খাবার নিয়ে আসে নিখিলেশ। হোটেলের কাছেপিঠেই ওর ঘর। সেখানেই দিনরাত রান্নাবান্না চলে। স্টাফ আছে তিনজন। সব দেখভাল করে অপর্ণা। নিখিলেশ বাজার আর খাবার পৌঁছে দেয়ার কাজটুকু করে।

দুপুরে খাবার দিতে এসে নিখিলেশ বলল, শুধু শুধু বসে থাকবেন কেন? বিকেল বিকেল বিচে যান। খুব সুন্দর পরিবেশ! একবার ঘুরে আসুন ভালো লাগবে!

নিখিলেশ ভুল কিছু বলেনি!

বাউণ্ডুলে বাতাস! বাতাস অমন বেয়ারা না হয়েই বা কী করবে! চেন্নাইয়ের একদিকে আরব সাগর, একদিকে বঙ্গোপসাগর! আরও বেশ কিছু পথ সামনে এগোলেই ভারত মহাসাগর!

বিচ জুড়ে আনন্দ-বিনোদনের কত আয়োজন। ঘোড়া আর গাধারাও আছে।

দিঘল কিসে চড়বে? গাড়িতে?বাবা আমি ঘোড়ায় চড়বো। ঘোড়ায় চড়বো বাবা! ঘোড়া!

ঘোড়ায় চড়বে! আমার বুকের ভেতরের সবটুকু জল যেন শুকিয়ে আমচুর হয়ে গেল। আসলে ঘোড়ায় চড়াতে আমার মন একেবারে সায় দিচ্ছিল না। যদিও ছোটবেলা থেকেই ও ঘোড়ায় চড়ে অভ্যস্ত। সে ঘোড়া কখনও হতো ওর দাদা। কখনও আমি। ঘরে হামা দিয়ে ওকে পিঠে নিয়ে ঘোরাতাম। সে অভ্যাস দেখি এখনও আছে। মাথা থেকে ঘোড়া নামেনি!

আমাকে সহিস বলল, “কোনো চিন্তা কোরো না। দুশ্চিন্তা তো না-ই। বাবুর সঙ্গে আমিও উঠব।” সহিস কোলে করে ওকে নিয়ে তুলল ঘোড়ারূপী পাহাড়ে। আমি আকাশ দেখার মতো দিঘলকে দেখছিলাম। দিঘলের মন যেন এবার খানিকটা চুপসে গেল। সহিসের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই! শিকার ছুটে যেতে পারে আশংকা থাকে। আর কথা না বাড়িয়ে দিঘলকে পিঠে নিয়ে টগবগ টগবগ করে ঘোড়া চলল।

আরবীয় ঘোড়া। কী উঁচু আর তেলচকচকে শরীর। যদি ছুটে পালায় তাহলে কী যে হবে! হঠাৎ তাকিয়ে দেখি আকাশে শাদাটে মেঘগুলো মুহূর্তে কেমন দলা পাকাল! তারপর সফেদ-চুল দাড়িঅলা একটা মানুষে রূপ নিল। সুফি সুফি চেহারা। চুলগুলো উড়ছে ওর দুরন্ত বাতাসে। যেন পঙ্ক্ষিরাজে চড়ে ভাসছে সুফি লোকটি। সে আমাকে উদ্দেশ্য করে শুধু বলল, মাত্র সাড়ে তিন বছরের শিশুওর মন ভাঙিস না। যেন কোনো দৈববাণী! মন থেকে সবটুকু ‘না’ উড়ে উড়ে দূরে সরে গেল। হয়তো ক্ষুদে ক্ষুদে মেঘ হয়ে ওরা আকাশে ভেসে গেল মনের আনন্দে!।

আমি যখন বারবার পিছিয়ে যাচ্ছি সহিস বলল, তুমি অটো বা বাইক নিয়ে আমাদের পিছে পিছে থাক।

ততক্ষণে বলাকা আর মেঘেলা পায়ে পায়ে অনেক দূর চলে গেছে। ওদের একদিকে ধুধু বালিয়াড়ি, অন্যদিকে বিশাল জলরাশি। আর কিছুটা দূরে গেলে ওরা বিন্দুর মতো ছোট হয়ে আসবে! কিন্তু ওরা বিন্দু হবার আগেই আমরা জলজ্যান্ত ঘোড়া সমেত ওদের সামনে এসে দাঁড়ালাম! ওরা তো অবাক! শুধু কী অবাক! ওদের চক্ষু চড়কগাছ! দিঘলকে ঘোড়ার পিঠে দেখে আঁৎকে ওঠে বলাকাও ঘোড়ার ওপর কেন? কে চড়াল ওকে! কেমন করে চড়লি বাবা! এক নিঃশ্বাসে অনেক প্রশ্ন। যেন কান্নারা উথলে উঠছে ওর কণ্ঠ ছাপিয়ে।

সহিস বাংলা কতটা বুঝলো কে জানে! কিন্তু মায়ের চোখেমুখে উৎকণ্ঠার যে ভাষা তা বুঝতে অসুবিধা হলো না ওর! ও নিজে হাতে দিঘলকে ঘোড়ার ওপর থেকে নামিয়ে এনে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখল অনেকক্ষণ। শেষে দিঘলের চিবুক নেড়ে বলল, “এবার খুশি তো। একেবারে মায়ের কাছে নিয়ে এসেছি!” দিঘল লজ্জা পায়।

ঘোড়া নিয়ে চলে যায় সহিস। বাইক নিয়ে বাইকঅলা। বলাকা জলের কাছে গিয়ে দু পা ঢেউয়ের কাছে সপে দেয়। দিঘল আর মেঘেলা জল ছুড়ছে একে-ওকে। কখনও আঁজলা ভরে জল আকাশের দিকে ছুড়ছে। ওদিকে সূর্য তখন পাটে যাবার আগে রঙ ছড়াতে বসেছে। পুরো আকাশ শিল্পীর ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে তখন। সেখানে নীল আর হালকা গোলাপিকোথাও ফিকে লাল থেকে বাসন্তী রঙের মিশেল। রঙধরা আকাশের নীল ফুঁড়ে দেখি হঠাৎ একটা পাখি উড়াল দিল। পাখা ঝাপটে, পাখা ঝাপটে শুধু ওপরেই উঠছে পাখিটা। শাদা পালকে ঢাকা পাখির সারা শরীর। দুহাত নেড়ে সাঁতার কাটার মতোই দুটো ডানা নেড়ে নেড়ে পথ ভাঙছে সে পাখি।

কখনও শিল্পী তার ক্যানভাসে আত্মার বিমুক্তির দৃশ্য দেখাতে পাখিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে। কোনো শিল্পী ক্যানভাসে নীলের ঘনঘটা করেও বিষাদের চিহ্ন আঁকে। কেউ আবার নীলের আকাশছোঁয়া রেখা টেনে আত্মার চলে যাওয়ার পথ এঁকে দেয়। আমার আত্মাটাও বুঝি এমনি করে পাখি হয়ে উড়ে যাবে! নাকি নীলিমায় মিশে থাকবে কষ্টের আলপনা হয়ে। জানি না! বুঝি না! ভাবতে চাই না কিছু! বুক ধড়ফড় করে ওঠে কেন যেন!

এ মুহূর্তে বলাকা ওরা বিন্দু হয়ে গেছে। কখন যেন ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যায় ওরা ভয় হচ্ছে। কিন্তু ওদের কোনো ভয়-ডর নেই। ওরা শুধু এগিয়েই যাচ্ছে। একবারও ফিরে তাকাচ্ছে না পেছন দিকে! আমাকে বোধ হয় পরিত্যাক্ত ভাবছে ওরা। খুব কি অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে আমাকে!

যাবার আগে মেঘেলার চোখেমুখে হাসি ছিল। বলাকাও ছিল স্বাচ্ছন্দ্য! সবটুকু বিষণ্নতা কাটিয়ে মাঝে মাঝে বুঝি সজিব হতে চায় ওরা। ওরা সত্যি সত্যি এখন দূরে সরে যাচ্ছে! আমি কেমন যেন কিংকর্তব্যবমূঢ়! মনে মনে বললাম, মন চাইলে তোমরা আরও ঘোরো আরও দূরে চলে যাও।

আমি সৈকতের আরও ঢালে গিয়ে বসি। ওরা তখন অনেক দূরে। শেষ বিকেলের লালচে আভায় মিশে গিয়ে ওরা তখন ফুজিফিল্মের অংশ। শুধু ছবির ফ্রেম থেকে নিজেকে একটু একটু করে সরিয়ে নিচ্ছি। মন বলছে মায়া কাটাও। সময় ঘনিয়ে আসছে!

ওদিকে রাত একটায় ডাক্তার মুরালির সঙ্গে অ্যাপয়ন্টমেন্ট। মালার হাসপাতাল। আমাদের হোটেল থেকে ম্যালা দূরে। ট্যাক্সিতে যেতে হবে! তার আগে একটু বিশ্রাম না নিলে হচ্ছে না। মন ছুটে যায় বিছানায়। ওদের পাই কোথায়! ওরা তখন অনেক দূরে! কখনও কখনও বলাকাকে কি একটু স্বার্থপর মনে হচ্ছে!

গভীর রাত তখন। হাসপাতাল ঘুমিয়ে আছে। ডাক্তারের দেখা নেই। কাউকে যে জিজ্ঞেস করব তেমন কাউকে দেখছিও না। হঠাৎ একজন সিস্টারের দেখা পেলাম।

ও বলল, আসুন।

পরে একটি রুম দেখিয়ে বলল, “এখানেই বসেন, অপেক্ষা করুন। স্যার সম্ভবত রাউন্ডে।”

অতো রাতে রোগীদের যাতে সমস্যা না হয় তাই ঘরে কোনো আলো নেই। টেবিলে একটা ল্যাম্প জ্বলছে শুধু! নিষ্প্রভ আলো! বিষণ্নতা ছড়ানো যেন! ধ্যানী-মৌনী এক সাধক মন নিয়ে মগ্নতায় ডুবে আছে ল্যাম্প। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফিরে এলাম বারান্দায় যেখানটায় বসেছিল বলাকা। ততক্ষণে ফিকে অন্ধকারে কুণ্ডলি পাকানো একটি স্থাপত্য গড়ে উঠেছে সেখানে। কাছে গিয়ে দেখি এক চাদরে জড়িয়ে বসাশোয়া এবং আধা-শোয়া হয়ে আছে ওরা তিনজন। দিঘল মেঝেতে শুয়ে পড়েছে। নিচে মায়ের ভ্যানিটি। আমি কাছে গিয়ে জবথবু দাঁড়িয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। বলাকা টের পেয়ে মাথার চাদর নামিয়ে বলল, “আট তলায় বেশ বাতাস তাই চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছি!” কতকুতে চোখে ঘোমটার আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে মেঘেলা। দিঘল ঘুমে কাদাকাদা।

ডাক্তার ওদের বারান্দার মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখে বললেন, “বিকেলে আমি অন্য জায়গায় বসি সেখানে এলে আশা করি অসুবিধে হবে না। সরিবাচ্চারা ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে।” বলেই তার একটি ভিজিটিং কার্ড হাতে দিয়ে বললেন, “যেকোনো অটোকে বললেই নিয়ে যাবে।”

পরদিন প্যাথলজি ল্যাবে যাব বলে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। তখনও বেশ অন্ধকার। রাস্তায় অটো নেই। কোনো গাড়ি নেই। মাঝে মাঝে দু-একজন মানুষের চলাচল শুধু। এর মধ্যেই দেখি আরেক বিস্ময় অপেক্ষা করছে। তামিল মেয়েরা ঝাঁপি ভরে ফুল নিয়ে বসে আছে। পুজোর আয়োজন! বাহারে সব ফুল। কী অপূর্ব গন্ধ। তার সঙ্গে অল্প দূরে দূরে মন্দির। মন্দিরে ভজন বাজছে“জয়গানিশ জয়গানিশ দেবা। মাতা জাকি পাবর্তী পিতা মহাদেবা!”

সুরের সঙ্গে ফুল পুজারিদের কী এক অপূর্ব বৌদ্ধিক সমন্বয়! সুরেও ঈশ্বর! ফুলেও ঈশ্বর! সবই ঈশ্বরের নৈবেদ্য! ঐশ্বরিক সুষমায় পবিত্র এবং স্নিগ্ধ এক জ্যোতি যেন মেয়েদের শরীর ফুটে বেরুচ্ছে! যোগসাধনায় তৈরি ওদের শরীর। চূড়ো খোঁপা বাঁধা। খোঁপায় জড়ানো বেলফুলের মালা। কপালে চন্দনের তিলক আঁকা। ব্লাউজ নেই গায়ে। দুহাতের বাহু সৌষ্ঠব অপূর্ব সুষমা ছড়াচ্ছে। ওঁদের কেউ কোড়া শাড়ি গায়ে। কেউ বাসন্তি রঙের। সব মিলিয়ে অপার্থিব এক পবিত্র অবয়ব আঁকা রয়েছে চারদিকে। মাঝে মাঝে ভজনের সুরের ধমক এসে বুকে আছড়ে পড়ছে। আছড়ে পড়ছে না যেন আমার বুকের ভেতরটা খামচে ধরছে বারবার। কী মেলোডিয়াস সুর। কী মায়াবী কণ্ঠ! যেন আমার বুকের ভেতরটা টলিয়ে দিচ্ছে বারবার!

একটু একটু করে জমাট বরফ ভেঙে জলধারা বইছে আমার চোখ ছাপিয়ে। এতোদিনের সবটুকু জমাট কষ্ট, সবটুকু চেপে থাকা কষ্ট-যন্ত্রণা টলে পড়ছে। আমি বাঁধা দিই না। কান্না থামানোর চেষ্টা করি না। সুরে মগ্ন হয়ে থাকি। কখনও ফুলদেবীদের মুখের দিকে তাকাই ফিরে ফিরে। এ তো শুধু সৌন্দর্য নয়! যেন স্বর্গীয় সৌন্দর্য! কী পবিত্র মুখচ্ছবি! চোখ জুড়িয়ে আসে। সুখ পেয়ে আমার কষ্টরা সব যেন পাখা মেলে উড়াল দিল কোথায়! এক ধরনের স্নিগ্ধতা আর প্রশান্তি নিয়ে অটোতে চেপে বসলাম। দুচোখে তখনও জলের ধারা!

আমার কোনো স্পেসিমেন্ট যাচ্ছে ব্যাঙ্গালোরে, কোনোটা মুম্বাই, কোনোটা দিল্লি, বাদবাকি চেন্নাইয়েই রয়ে গেল। সময় রিসিপশন থেকে বলল, অনেকগুলো প্রদেশে যাচ্ছে আপনার স্পেসিমেন্ট। একটু সময় লাগবে সবগুলো রিপোর্ট পেতে। পেলেই ডাক্তারবাবুকে মেইল করে দেয়া হবে। তিনি যোগাযোগ করবেন আপনার সঙ্গে।

প্রায় আট দিন হয়ে গেল কিন্তু ডাক্তারের কাছ থেকে কোনো ফোন এল না।

বলাকা বলল, নাকি একবার ডাক্তারের কাছে যাবে!

আসলে আমার ভেতরে কুঁকড়ে আছে এক অজানা আশংকা। রিপোর্টের ভেতরে কোন সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকবে কিনা কে জানে! ওর মতো রয়েসয়ে আসুক! কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করি না! আমি শুধু বললাম, অপেক্ষা করো। ডাক্তার বিরক্ত হতে পারে!

এ ফাঁকে চললো আমাদের মন ভালো করা থেরাপি। আমরা কখনও চেন্নাই মিউজিয়ামে যাচ্ছি। কখনও যাচ্ছি স্নেক মিউজিয়াম। কখনও শহর ঘুরে ঘুরে নায়ক-নায়িকাদের বাড়ি দেখার প্রোগ্রামে। একজন সহযাত্রী জিজ্ঞেস করল শুধুই নায়ক-নায়িকা! কমেডি অভিনেতা কিংবা ভিলেন কারও কোনো বাড়ি তো দেখলাম না! চলো চলো! ঠিকই দেখবে! গাব্বার সিং এর বাড়ি এটা! নিশ্চয় মনে আছে গাব্বার সিংয়ের কথা!

এমনি করে নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে আমরা ফিরে এলাম মিউজিয়ামে।

ডাইনোসর, সাপ আর নায়ক-নায়িকাদের বাড়িঘর দেখে সময় কাটালেও সন্ধ্যায় যেন মনের গভীরে পলি পড়ে যায়। যে নাও ঘাটে ভেড়ে, ভাটায় সে নাও জল হারিয়ে যেন কাদায় হুবুডুবু খাচ্ছে। ফের জোয়ার এলে তবে এ বন্দিদশা কাটবে।

জোয়ার আসবে কখন? ছঘণ্টা পর আসার কথা! আসবে তো! জোয়ারের জন্যে অপেক্ষা করে বসে আছি কাদায় পা ঠেকিয়ে। আসলে এক গুচ্ছ রিপোর্টের জন্যে আমার অপেক্ষা! আমার রক্ত রিপোর্ট! সে রিপোর্টে জোয়ারও আসতে পারে। আবার ভাটার টানে তলিয়ে যেতেও পারি!

এই যে সমুদ্র, জোয়ারের ঢেউ, এক তাল কাদা। কাদায় আটকে থাকা সাম্পান কিংবা নৌকো। নৌকোর গায়ে মাছের আঁশটে গন্ধ! গন্ধ শুঁকে পেত্নির আঁকুপাকু ভাব সবই মনে মনে। আমার হৃদয় গহীনে! কিছুতেই বুঝতে দেই না ওদের কিংবা বুঝতে পারে না ওরা। আমি মিশে যাই ওদের খুনসুটি কিংবা আলাপচারিতার ভিড়ে।

রাতে ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পড়লে বলাকা কাছে আসে। আমার হাত ধরে বসে থাকে কিছুক্ষণ। আমি তাকাই। ওর চোখে চোখ রাখি। বুঝতে চেষ্টা করি ওর চোখের ভাষা। বড্ড অপরাধী চোখে ওকে দেখি কতক্ষণ! ও এবার হেসে ফেলেআমাকে বুঝি তোমার মানুষ মনে হয় না!

কেন! এ কথা কেন?

তোমার এ শরীরে তোমার কাছে কিছু চাইবো তুমি ভাবলে কী করে!

চাওয়াটা তো দোষের কিছু নয়। চাইতেই তো পার! নতুন পরিবেশ!

তা বলে তোমার এ শরীরে! জানো তো, পাথরে কখনও ফুল ফোটে না!

আমি আলতো হেসে ওর কপালে চুমু এঁকে দিই। ও অনেকটা সময় চোখ বন্ধ করে রাখে। শেষে আমার নাক টেনে বলে, ডাক্তারের কাছে যেতে ইচ্ছে করে না বুঝি!

গেলে কুমির কামড়ে দেয় যদি!

আশাবাদী হও! আশাবাদী হতে তো আর পয়সা লাগে না!

আমার বাড়ির কথা মনে পড়ছে। ভীষণ মনে পড়ছে। দুদিন থেকে কেন মনে পড়ছে! হয়তো আর দেখা হবে না, ফেরা হবে না বলেই কী!

ধেড়ে আমগাছটার কথা খুব মনে পড়ছে। ঝাঁপানো গাছ। কালচে সবুজ পাতা। লম্বা লম্বা। পাটনাইয়া ছাগলের কানের মতো ঝুলে থাকে। গাছের এ-ডালে ও-ডালে অনেকগুলো পাখির বাসা। কাকের বাসাও আছে বেশকটা। অদ্ভুত! কাকেরা কখনও পাখির বাসায় হামলা করেনি। পাখির ডিম ঠুকরে দেয়নি। কিংবা পাখির ছা-কে ঠোঁটে তুলে উড়াল দিতেও কখনও দেখা যায়নি। সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ কাকেদের। মুগ্ধ চোখে দেখতাম!

এবার মুগ্ধতা ছড়িয়ে এল বিস্ময়! এক বিকেলে ইশকুল থেকে ফিরে দেখি অমন ধেড়ে গাছ ঝাঁপানো ডালপালা নিয়ে পড়ে আছে মাটিতে। পাতাগুলো ততক্ষণে নেতিয়ে পড়েছে। পাখির বাসাগুলো ঝুলে আছে ডালে। না হয় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ডিমগুলো ভেঙে কুসুম ছড়িয়ে পড়েছে পাতায়-ডালে-মাটিতে। ডিমের গন্ধ শুঁকে বেড়াল আর কুকুরগুলো নাক টানছে। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে বারবার। বাচ্চাদের খোঁজে পাখি আর কাকেরা গাছের ডালে পাতার ফাঁকে ফাঁকে লুটিয়ে পড়ছে, হামলে পড়ছে বারবার। ওদের ডাকে কী আঁকুতি। কী বিষণ্নতা। কাকের কর্কশ ডাক ছাপিয়ে কান্নারা উথলে উঠছে যেন। গাছের নিচে চাপা পড়ে আছে অনেকগুলো লেবু আর মানকচু গাছ। এ দেখে আমি আঁতকে উঠি! “গাছ কাটলো কে?”

তোর বাবা!

কেন?

তক্তা বানাবে। চৌকাঠ বানাবে। দেশে ঘর করবে।

তাই বলে গাছ কাটতে হবে! অমন সুন্দর গাছটা!

নিমগাছটাও কেটে ফেলেছে! মায়ের কণ্ঠে আহত সুর!

বেলগাছের ওপরে দেখি নিমগাছের লাশ পড়ে আছে!

নিমগাছও কাটতে হলো!

খাট বানাবে! নিমকাঠের খাটে শুলে নাকি শরীর ভালো থাকে। বাত-ব্যথা কিছু থাকে না। তাই তোর বাবার ইচ্ছে নিম কাঠের খাট বানাবে। পুরোনো ঢাকায় বাগানবাড়ির মতো সুন্দর বাড়ি আমাদের। এ বাড়ির এ কী হাল! বাবা কী পাগল হয়ে গেল!

গাছগুলোর জন্যে, পাখি এবং পাখির বাসার জন্যে, বাগানবাড়ির জন্যে মন কেঁদে ওঠে। কাকের কণ্ঠের আকুলতায় আমার বুক কেঁপে ওঠে। কষ্টগুলো জমাট করে বুকে পুষে রেখেছি আজও। তার চেয়ে বেশি কষ্ট বাবা গাছ কেটেছে দেদারছে। কিন্তু কোনো আসবাব হয়ে ওরা ঘরে ফিরে আসেনি! সেসব কষ্টরা আজ কেন যেন বেশ নাড়াচাড়া দিচ্ছে। তবে কী ওরা বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে বুক চিরে!

সকালে সবাই মিলে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে হাজির!

ডাক্তার অবাক! আমি তো ফোন করিনি! এখনও একটা রিপোর্ট আসেনি। খুব গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট। আরও কদিন লাগতে পারে!

পরে ডাক্তার হিসেব করে বলল, আরও চারদিন! তার আগে যদি আনা যায় চেষ্টা করবো। মুম্বাই থেকে আসবে রিপোর্টটি।

হঠাৎ বলাকা মুখ ফসকে বলে উঠলো আমাদের হাতে অতোদিন থাকার মতো টাকা নেই!

টাকা নেই! তারপর কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন। ও নিয়ে ভাববেন না! দুদিন বাদে আমাদের হোটেলে ফোন এল। ডাক্তার মুরালি! কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার চেম্বারে চলে আসুন! ওর কণ্ঠে উৎকণ্ঠা, ব্যাকুলতা নাকি টেনশন! ঠিক বুঝতে পারিনি! আমার গলার সবটুকু জল কে যেন শুষে নিচ্ছিল তখন!

আমাদের ট্যাক্সি ক্যাব ছুটছে ছুটছে। হাইওয়ে, ফ্লাইওভার, হাইওয়ে। মিটারের কাটা ঘুরছে। আমাদের মুখে কথা নেই। নিসর্গ আর দিঘল ঘুমে ঢুলছে। মানবিক জীবনে আমার এখন চোখ নেই। গাড়ির দুরন্ত গতির দিকে আমার মন নেই। আমি মনপ্রাণ ঢেলে আকাশ দেখছি। আকাশে শাদা মেঘ। ফাঁকে ফাঁকে নীলিমার ঢেউ।

আমার আত্মাটা পাখি হবে নাকি নীলিমা হয়ে মিশে যাবে আকাশেকে জানে! তবু ভাবছি! মগ্ন হয়ে ভাবছি। তখনই বলাকা আমার হাত চেপে ধরে বলল, জানো কাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি!

ভালো!

জিজ্ঞেস করলে না কি দেখেছি!

ইচ্ছে করছে না। তোমার মন চাইলে বলো!

বলাকা নীরব হয়ে যায়। কই বললে না!

দেখলাম ডাক্তার তোমার হাতে একটা ফুলের তোড়া দিয়ে বলল, ভারী মিষ্টি গন্ধ! ফুলের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে এবার বাড়ি চলে যান।

বাড়ি তো যেতেই হবে! টাকা ফুরিয়ে এসেছে না!

আমার কথার ভঙ্গি দেখে ফিক করে হেসে ওঠে বলাকা!

কী নির্মল হাসি! হাসি এমন সুন্দর আর পবিত্র হয় নাকি! এর আগে কখনো তো দেখিনি!

 

আনিস রহমান : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক, ঢাকা

বাংলাদেশের জন্ম ও বঙ্গবন্ধু: কিছু অনুমান, কিছু প্রশ্ন কিছু অনস্বীকার্য সত্য

আবু মকসুদ   বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বাংলাদেশ চাওয়া’ বা ‘স্বাধীনতা চাওয়া’ নিয়ে কখনোই কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। কিন্তু ইতিহাসকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টার

মাহরাং বালুচ বেলুচিস্থানের শেখ মুজিব!

ফজলুল বারী   বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেত্রী ডা: মাহরাং বালুচ আজ বঙ্গবন্ধুর মতোই পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিনী। মিথ্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন

গল্পটি রুনা আখতারকে নিয়ে

রুনা আখতার আমাদের কারখানায় অপারেটর থেকে সুপারভাইজার পদে পদোন্নতি পেয়েছে। পদোন্নতি একটি নিয়মিত বিষয়— অনেকেরই হয়। কিন্তু রুনার গল্পটি আলাদা।   এই পদোন্নতি তাকে এতটাই

আন্দরকিল্লা : আলোকিত জীবনের রূপরেখা

ধীমান বড়ুয়া কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীদের আন্তরিকতায় আপনার নিয়মিত প্রকাশনাগুলো আমার হাতে পৌঁছে যায়, আর আমি প্রতিবারই নিজেকে একজন কৃতজ্ঞ ও মুগ্ধ পাঠক হিসেবে আবিষ্কার করি।

বিশ বছর পর বাংলায় ফিরছেন তসলিমা

রোখসানা ইয়াসমিন মণি সাহিত্যের ইতিহাসে বহু লেখকই সময়ের স্রোতে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু কিছু মানুষ জন্মান কেবল লেখার জন্য। তসলিমা নাসরিন সেই ধারারই এক সাহসী