আনোয়ার রশীদ সাগর
ভ্যাঁভুঁ প্যাঁপুঁ শব্দ হচ্ছে। গোয়ালন্দ ঘাটে ফেরি ভিড়েছে। পদ্মার বুক চিরে আসা জলের গন্ধ, পোড়া ডিজেলের ধোঁয়া আর ভাজা বাদামের গন্ধ মিলেমিশে একটা ক্লান্ত বিকেল তৈরি করেছে। ডেকে উঠছে বৃহত্তর কুষ্টিয়া এলাকার বাস। একটা, দুটো, তিনটে। লোহার পাটাতনে চাকার ঘড়ঘড়, হেল্পারের চিৎকার, যাত্রীর কোলাহল। ফেরিতে উঠে দুটো বাস পাশাপাশি দাঁড়ায়। দুটি জানালা একজায়গায় এক হয়ে যায়। যেন দুটো সময়, দুটো জীবন, দুটো না-পাওয়া হঠাৎ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল।
এক জানালায় কিশোরী। বয়স সতেরো কি আঠারো। চোখে কাজল, গায়ে হালকা নীল জামা, চুলগুলো খোলা। বাতাসে উড়ছে পদ্মার জলের মতো, ঢেউ তুলে তুলে। অন্য জানালায় মধ্যবয়সী একজন মানুষ। চোখে চশমা, কপালে ভাঁজ, দাড়িতে পাক ধরেছে, পরনে কালো পাঞ্জাবি। যেন শোকের রঙ গায়ে মেখে বসে আছে। চার চোখ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সময় থমকে দাঁড়ায়। ফেরির ইঞ্জিনের শব্দও যেন দূরে সরে যায়, কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যায়।
একসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
সবুজে ঢাকা ক্যাম্পাস। দিঘির জলে শাপলা ফোটে সাদা আর লাল, যেন জলের বুকে লজ্জা আর অভিমান পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে। অতিথি পাখিরা ডানা জাপটায়, শীতের অতিথি হয়ে আসে, আবার উড়ে যায়। বনজঙ্গলে কৃষ্ণচূড়া আগুন জ্বালে বৈশাখে। বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল সাঈদ এবং নাজমা। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ঘনিষ্ঠতা হলো ওদের। যেন দুটো নদী আলাদা উৎস থেকে বয়ে এসে এক মোহনায় মিশে যায়। দিঘির পাড়ে বসে সাঈদের কোলে মাথা রেখে নাজমা গল্প শুনত। সাঈদের আঙুল চলত নাজমার চুলে, যেমন করে মাঝি দাঁড় টানে নরম জলে। শীতের বিকেলে গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে হাঁটত বোটানিক্যাল গার্ডেনে। কুয়াশা নামত ধবল দুধের মতো। পাখির ডাকে, পাতার মর্মরে, ওদের প্রেম কথা কইত। নাজমা বলত, “তোমার বুকে কান পাতলে আমি সমুদ্রের গর্জন শুনি।” সাঈদ হাসত, “আর তোমার নিঃশ্বাসে আমি বকুলের ঘ্রাণ পাই।”
সাঈদ ভালো কবিতা আবৃত্তি করত। ভরাট কণ্ঠ, যেন মেঘের গর্জন। টিএসসির মঞ্চে যখন সে ‘বিদ্রোহী’ আবৃত্তি করত, “বল বীর, বল উন্নত মম শির”, তখন পুরো মিলনায়তন স্তব্ধ হয়ে যেত। দেয়ালের পলেস্তারাও শুনত সে কবিতা। নাজমা প্রথম সারিতে বসে তাকিয়ে থাকত অপলক। মনে হতো, এই কণ্ঠস্বরটা শুধু তার জন্যই বাজে, তার বুকের ভেতর দোলা দেয়। আবৃত্তি শেষে হাততালির ভেতর সাঈদ চোখ খুঁজত। নাজমার চোখ। পেয়ে গেলে, চোখে চোখ পড়লে হাসত, যেন যুদ্ধ জিতে ফিরল। যেন সমস্ত জ্যোৎস্নালো এসে বুকের গহীনে ফিসফিস করে কিছু বলছে।
লাইব্রেরিতে ঘটত অন্য ঘটনা।
দোতলার কোণার টেবিলে বসে মিনার শুধু বই পড়ত। নাজমাদের দুই ইয়ার উপরে, সমাজবিজ্ঞানে পড়ত। ডাগর চোখ, উঁচু লম্বা সুন্দর যুবক, চওড়া বুক,মাথায় কুকড়া চুল। চুপচাপ, গম্ভীর, যেন একটা জমাটবাঁধা দুপুর। নাজমা বই নিতে গেলে মিনার মুখ তুলে তাকাত। তাকালেই নাজমার বুকে কাঁপন ধরত। যেন দিঘির জলে ঢিল পড়তো, বৃত্ত বৃত্ত ঢেউ উঠতো নিত্য বুকের ভেতর। কোনোদিন কোনো কথা হয়নি না ওদের। একটা শব্দও না। তবুও অনুভূতি চালচলনে উপলব্ধি করা যেত।
মিনার বইয়ের পাতা ওল্টাত, কিন্তু চোখ থাকত নাজমার ছায়ার দিকে। নাজমা রেফারেন্স খুঁজত, কিন্তু মন পড়ে থাকত মিনারের টেবিলের কোণায়। নিঃশব্দ এক নদী বয়ে যেত দুজনার মাঝখানে। স্রোত ধারা যেন কাছে টানতো,কানে কানে বলে যেতো নীল আকাশে এতো আলো!
সাঈদ টের পেত। অভিমান করত। বলত, “তুমি আমার আবৃত্তি শোনো না, মিনারের নীরবতা শোনো। আমার চিৎকারের চেয়ে ওর নীরবতা তোমার কাছে দামি?” নাজমা হাসত, মাথা নিচু করত। জবাব দিত না। কারণ জবাব ছিল না। প্রেম তো অঙ্ক না, যে মিলিয়ে দেবে।
সময় গড়াতে থাকে ।
অনার্স শেষ হলো সাঈদ নাজমার। বিদায়ের দিন নাজমা সাঈদের হাতে একটা রুমাল গুঁজে দিয়েছিল। বলেছিল, “কাঁদলে এটা দিয়ে চোখ মুছো,আকাশ দেখো।” সাঈদ বলেছিল, “তুমি চলে গেলে আমার চোখে আর জল থাকবে না। মরুভূমি হয়ে যাব।”
নাজমা বাড়ি ফিরল কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়ায়।
আর ফেরা হল না ক্যাম্পাসে। বাবা মা, আত্মীয়স্বজন মিলে সেই মিনারের সাথেই বিয়ে দিয়ে দেয় নাজমার। মিনার তখন বিসিএস দিয়ে প্রশাসনে ঢোকেছে। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, বনেদি পরিবার, সরকারি গাড়ি, লাল বারান্দার ফ্ল্যাট। নাজমার মতামত কেউ শোনে না।অথবা নাজমা মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না।
তাছাড়া মেয়ের মতামত শোনার রেওয়াজ এই সমাজে এখনও আসেনি। শুধু একবার চিঠি লিখেছিল সাঈদকে। নীল কাগজে, কাঁপা হাতে।
“সাঈদ,
আমাকে ক্ষমা করো। আমি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে পারলাম না। বাবা বলল, ‘মিনার ছেলে ভালো, ভবিষ্যৎ আছে। তোর পাগল কবিকে বিয়ে করে কী খাবি?’ মা কাঁদল, ‘সমাজে মুখ দেখাব কী করে?’ আমি হেরে গেলাম সাঈদ । তুমি আমাকে ঘেন্না করো। তবুও জেনে রেখো, জাহাঙ্গীরনগরের দিঘির পাড়ে আমার একটা কবর রইল। সেখানে আমি রোজ মরি।
ইতি,
তোমার নাজমা।”
চিঠি পেয়ে সাঈদ নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। হলে পড়ে থাকত দিনের পর দিন। মেঝেতে, সিঁড়ির উপর। একদিন হৈমন্তীর মতোই সিঁড়ির উপর কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল সাঈদ। ভোরে বন্ধু রাশেদ এসে দেখে, সাঈদের চোখের গড়ানো জল শুকিয়ে দাগ হয়ে আছে গালে। যেন লবণের দাগ। যেন কান্নার ফসিল। সেই শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ দেখে অপুর মতোই রাশেদের বুকে হুহু করে কান্না চলে এসেছিল। চিৎকার করে বলেছিল, “ওঠ হারামজাদা, মরে যাবি নাকি?”
দাড়ি বাড়ল, চোখ বসে গেল, কণ্ঠস্বর ভেঙে গেল সাঈদের। যেন পুরনো গ্রামোফোন রেকর্ড। ক্লাস করে না, আবৃত্তি করে না, মঞ্চে ওঠে না। বন্ধুরা ধরে ধরে হলে ফেরাত, ভাত মেখে খাওয়াত,বিছানায় শুইয়ে দিত।
একদিন নাট্যবিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মুস্তাফা কামাল এসে সাঈদের মাথার কাছে বসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আরে ব্যাটা, একটা মেয়ের জন্য জীবন শেষ করে দিবি? ওঠ। চল, নাটক করতে হবে। মঞ্চ তোকে ডাকছে। তোর গলা শুনতে চায় হাজার মানুষ।”
সাঈদ ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। চোখে শূন্যতা দেখে। “স্যার, নাজমা নাই। কবিতা নাই। আমিও নাই।”
স্যার হাসলেন। সে হাসিতে বাবার মতো মমতা। বললেন, “শোন, শিক্ষাবিদ রুশোকে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিল, ‘আপনি পাঁচ সন্তান এতিমখানায় রেখে এসেছেন কেন?’ রুশো জবাব দিয়েছিলেন, ‘পৃথিবীর সব মানব সন্তানই আমার।’ বুঝলি? প্রেম একজনের জন্য না, সাঈদ। প্রেম সবার জন্য। মঞ্চের জন্য। মানুষের জন্য। তোর কণ্ঠটা আল্লাহ দিয়েছেন লক্ষ মানুষের কান্না হাসি হয়ে ফুটতে। একটা নাজমার জন্য সেটা নষ্ট করবি? তবে তুই স্বার্থপর হবি?।”
এভাবে দিনের পর দিন উদাহরণ দিয়ে, সাহস দিয়ে, ধমক দিয়ে স্যার সাঈদকে টেনে তুললেন। সাঈদ আবার মঞ্চে ফেরে। প্রথমে কাঁপা গলায়, যেন প্রথম কথা বলা শিশু। তারপর বজ্রকণ্ঠে। নাটক লিখে ‘জল জ্যোৎস্না’, নির্দেশনা দেয়, অভিনয় করে। ‘রক্তকরবী’, ‘কবর’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। একের পর এক আলোড়ন তুলতে থাকে।
জাতীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক মানের অভিনেতা এবং নাট্যকার হয়ে যায় সাঈদ। ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান দেশে দেশে মঞ্চ কাঁপায়। লোকে বলত, “সাঈদের কণ্ঠে কান্না আছে, আগুন আছে।” কিন্তু চোখের কোণে একটা জল জ্যোৎস্না রয়েই গেল। নাজমার জন্য। রাত গভীর হলে সে জ্যোৎস্না চিকচিক করত,জ্বলে উঠত।
ওদিকে নাজমা সংসার করতে থাকল যুগ্মসচিব মিনারের সাথে। ঢাকায় ফ্ল্যাট, গাড়ি, সন্তান, সম্মান, সবই হলো। মিনার স্বামী হিসেবে দায়িত্বশীল, ভদ্রলোক। বাজার করে, বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যায়, সময়মতো অফিস করে। কিন্তু সেই নিঃশব্দ চাহনির মানুষটা সংসারে এসে আরও নিঃশব্দ হয়ে যায় । যেন কথা বলা ভুলে গেছে। নাজমা বুঝল, প্রেম আর সংসার এক জিনিস না।
প্রেমে জ্বর আসে, সংসারে থার্মোমিটার। মিনার বই পড়ে, ফাইল দেখে, টিভিতে টকশো দেখে। নাজমার হাত ধরে না। রাতে পাশ ফিরে ঘুমায়। দিঘির পাড়ে কেউ আর কোল পেতে দেয় না। নাজমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখে। চাঁদের গায়ে সাঈদের মুখ ভাসে। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়। মিনার শুনেও শোনে না।
মেয়ে হলো নাজমার। নাম রাখল সাবরিনা। মেয়েটা অবিকল নাজমা। একই চোখ, একই হাসি, একই ভাবে মাথা ঝাঁকায়। মিনার মেয়েকে আদর করে, কিন্তু নাজমার দিকে তাকায় না। যেন নাজমা একটা আসবাব।
আজ গোয়ালন্দ ঘাট।
ফেরিতে পাশাপাশি দুই বাস। সাঈদ ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যাচ্ছে। ‘লালন উৎসব’-এ অতিথি হয়ে। বয়স পঞ্চাশ ছুঁয়েছে, চুলে রুপালি রেখা, কিন্তু চোখে এখনও মঞ্চের আগুন। সারাজীবন একা। বিয়ে করেনি। লোকে বলে, “নাটকই ওর বউ।”
হঠাৎ বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া এসে লাগল পাশের জানালার কিশোরীর মুখে। মেয়েটা কেশে উঠে চিৎকার করে , “ওহ আম্মু! দেখো, ধোঁয়া! চোখ জ্বলছে!”
‘আম্মু’ ডাক শুনে ভেতর থেকে ছুটে এলেন একজন মহিলা। শাড়ির আঁচল সামলাতে সামলাতে। জানালার পাশে এসে দাঁড়াতেই চোখাচোখি হয়ে গেল।
সাঈদ স্তব্ধ। হাতের সিগারেট পড়ে যায় ।
নাজমা পাথর। বুকের ভেতর বিশ বছরের বরফ গলতে শুরু করে।
বিশ বছর পর।
চোখে চোখে গল্প হয়ে গেল পুরো জীবনটা। দীঘির জল, কৃষ্ণচূড়ার আগুন, আবৃত্তির মঞ্চ, লাইব্রেরির নীরবতা, না-বলা চিঠি, না-শুকানো কান্না, সিঁড়ির উপর ঘুমিয়ে পড়া এক কবি, শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ সব।
নাজমার চোখে জল। টলটল করছে, যেন পদ্মার ঢেউ। সাঈদের বুকে হাহাকার।
কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সাবরিনা। নাজমার মেয়ে। নাজমার কার্বন কপি। একই চোখ, একই ঠোঁট, একই চুলের ঢেউ। যেন বিশ বছর আগের নাজমা ফিরে এসেছে জল জ্যোৎস্না হয়ে। সময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।
সাবরিনা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দুজনার দিকে। “আম্মু, উনি কে? তুমি কাঁদছ কেন?”
নাজমা ধরা গলায় বলল, “উনি… উনি তোর…” বলতে গিয়ে থেমে যায় । গলায় কাঁটা বিঁধে।
কী বলবে? বন্ধু? না। অতীত? না। কবিতা? হ্যাঁ, কবিতা। জীবন্ত কবিতা।
সাঈদ জানালা দিয়ে হাত বাড়াল। কাঁপা হাত। সাবরিনার মাথায় হাত রাখল। মেয়েটার চুলগুলো নাজমার মতোই নরম, রেশমের মতো। বলল, “আমি তোমার আম্মুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, মা। তোমার আম্মু আমার কবিতা শুনত। আমি আবৃত্তি করতাম, আর তোমার আম্মু হাসত। সে হাসি দেখলে আমার মরে যেতেও ইচ্ছে করত।”
সাবরিনা ফিক করে হেসে ফেলল। “আপনি খুব মজার মানুষ!”
নাজমার বুকে ছুরি বসল। হাসি। এই হাসিটা সাঈদের প্রাপ্য ছিল। বিশ বছর আগে।
ফেরি ছাড়ার ভোঁ বাজল। বাসগুলো কেঁপে উঠল। জানালা সরে যেতে লাগল। সময় আবার চলতে শুরু করল, নিষ্ঠুরের মতো।
নাজমা শেষবার তাকাল। চোখে জল, ঠোঁটে কাঁপুনি। যেন এখনই ভেঙে পড়বে। ফিসফিস করে বলল, “ভালো আছো?”
একটা প্রশ্ন। বিশ বছরের জমা প্রশ্ন।
সাঈদ হাসল। সে হাসিতে হাজারটা না-বলা কবিতা, হাজারটা না-কাঁদা, কান্না।
বলল, “আছি। তোমার মেয়ের চোখে তোমাকে দেখে আরও ভালো থাকব। তুমি ভালো থেকো নাজমা। খুব ভালো।”
ফেরি চলল পদ্মার বুক চিরে। জল কেটে কেটে। জ্যোৎস্না পড়েছে জলে। টুকরো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে, আবার জোড়া লাগছে। যেমন জীবন। যেমন প্রেম। যেমন স্মৃতি।
সাবরিনা জিজ্ঞেস করল, “আম্মু, তুমি কাঁদছ কেন? লোকটা তোমার কে হয়?”
নাজমা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে। শক্ত করে। যেন মেয়ের ভেতর নিজেকে খুঁজছে।
বলে, “জলে জ্যোৎস্না পড়লে চোখে জল আসে রে মা। এ জল দুঃখের না। এ জল সুখেরও না। এ জল… এ জল, না-পাওয়ার। এ জল স্মৃতির। এ জল বিশ বছরের।”
ওপাশে সাঈদ জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইল ভাঙা জ্যোৎস্নার দিকে। বুকের ভেতর দিঘির জল ছলাৎ ছলাৎ করে উঠে।
পকেট থেকে ডায়েরি বের করল। পুরনো ডায়েরি। নাজমার দেওয়া রুমালটাও আছে ভেতরে। হলদে হয়ে গেছে। লিখল
“জীবন একটা ফেরি। কেউ ওঠে, কেউ নামে। কেউ টিকিট কাটে, কেউ বিনা টিকিটে চলে যায়। জানালায় জানালায় চোখ মেলে শুধু জল জ্যোৎস্না হয়ে ভাসে কিছু, না-পাওয়ার গল্প।
ডায়েরি বন্ধ করল সাঈদ। চোখ মুছল। না, জল নেই। জল শুকিয়ে গেছে কবেই। শুধু দাগ আছে। সিঁড়ির উপর শুকিয়ে যাওয়া জলের মতো সাদা দাগ। বুকের ভেতর।
আনোয়ার রশীদ সাগর : কথাসাহিত্যিক, ঝিনাইদহ




