অহংকার করার মতো জাতীয় পরিচয়ের চিহ্নগুলো ধুয়ে মুছে গেলে সেই জাতিকে তো আর চেনার উপায় থাকে না। আমাদের অহংকার মুখের ভাষার অধিকার কেড়ে নিতেই সদ্য ‘স্বাধীন’ একটি দেশে প্রথম আঘাতটি আসে ১৯৪৮ সালে। তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিকড় ধরে টান দেয়ার যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণার আর্তি দ্রোহের উত্তাপের ফুলকিতে পরিণত হয় বায়ান্নের পলাশঝরা ফাগুনে। তখন থেকেই শুরু হয় বাঙালির মাথা নত না করার ইতিহাস। এই ইতিহাসের পরের পৃষ্ঠাগুলোতে বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের বর্ণিল লিপিমালা রচিত হয়। মা ও মাটির গন্ধমাখা এই লিপিমালায় আমাদের আত্মপরিচয়ের চিহ্নগুলোই আমাদের অহংকার। এই অহংকারের অলঙ্কার আমাদের সংস্কৃতি। আবহমান বাংলার নৈসর্গিক রূপ-রস গন্ধমাখা এই সংস্কৃতি আমাদের চিন্তা-চেতনা-মননের ভূমিকে উর্বর করে রাখে। সংষ্কৃতির পললে ঋদ্ধ ভূমিতে চাষাবাদে সৃজিত ফল ও ফুলগুলো প্রকৃতির নিয়মে ঝরে পড়লেও তার বীজ থেকে যায় আবারও সৃষ্টির প্রয়োজনে। এই বীজ থেকেই একাত্তরে জন্ম এই বাংলাদেশ।
বঙ্গজ পলল ভূমিতে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের জন্মের অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় অতিবাহিত হলেও আপন অস্তিত্বের শিকড়টি নানান ঘাত-অপঘাতে মৃত্তিকার গভীরে স্থির ও থিতু হতে পারেনি। রাজনীতির গতি ধারার নানান বাঁকবদল ও পটপরিবর্তনে সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারের পথটিও কখনো মসৃণ ছিল না। এর বড় কারণটি হলো যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা শুধু তাকে ভোগ করার এবং স্থায়িত্বকরণের দিকেই তাদের প্রবল ঝোঁক। মানুষের আত্মশক্তিকে জাগ্রত করার ভিত্তি যে সংস্কৃতির চির সনাতন অভিমুখ তা তারা ভুলতে বসেছিলেন। বায়ান্ন এবং একাত্তর শুধুমাত্র একটি জাতির মূল পরিচয়ের উৎস হলেও তার চেতনাকে ধারণ এবং তা প্রজন্ম পরম্পরায় ছড়িয়ে দেয়ার মন্ত্রটি তাদের জানা ছিল না। আমাদের প্রাপ্তির সকল উৎস যে দুটি ঐতিহাসিক সুস্পষ্ট চিহ্নের মধ্যে নিহিত সেগুলোর ভিত্তি সোপান হলো সাংস্কৃতিক জাগরণ। এই সাংস্কৃতিক জাগরণের মধ্য দিয়েই ভাষা আন্দোলন বায়ান্নে বিকশিত রূপ নিয়েছিল এবং তা থেকে একাত্তরে ভূমিষ্ঠ হয় বাঙালি জাতিসত্তার স্বাধীন ঠিকানা বাংলাদেশ।
আজ বাঙালির পরিচয়ের ঠিকানাকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। তাহলে বুঝতে হয় আমাদের মধ্যে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক সংকট প্রবলভাবে প্রভাব ফেলেছে। এই সংকট এতই ঘনীভূত হয়েছে যে, আবেগ ও অনুভূতিকে বোধশূন্য করে ফেলেছে। নষ্টদের নিষ্ঠুর থাবায় শুভবোধগুলো ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। আবহমান বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির রূপ মুছে দিতে ধর্মের প্রলেপ দেয়া হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কিশোরগঞ্জ, সিলেট থেকে টাঙ্গাইল—একের পর এক গানের আসর, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, কনসার্ট, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি উৎসবে হামলা ও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এই ঘটনাগুলো যদি রাষ্ট্রের নজরে না আসে তাহলে এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাবের দায় কার ওপর বর্তাবে? একটা বিষয় পরিষ্কার, এসব ঘটনায় রাষ্ট্র বার বার পিছু হটে যায়। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, এখনই রাষ্ট্র কি অর্ধেক হেরে বসে আছে? তাহলে সম্পূর্ণ হেরে যাওয়ার আগেই দরকার— বায়ান্ন ও একাত্তরের প্রতিবাদী প্রেক্ষাপট রচনায় বাঙালির রুদ্রবীণার ঝংকারে সৃষ্ট একটি সাংস্কৃতিক গণজাগরণ।




