আরফান হাবিব
পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। তাদের ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয়ান পরিবারের ইন্দো-ইরানীয় শাখার অন্তর্গত। মোট ১১টি উপজাতির মধ্যে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ছাড়াও মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, চাক, লুসাই, পাংখুয়া, বম, খ্যাং এবং খুমী উপজাতিদের ভাষাসমূহ সিনো-টিবেটান পরিবারের টিবেটো-বার্মেন শাখার অন্তর্ভুক্ত। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ছাড়াও মারমাদেরও ভাষার বর্ণমালা রয়েছে। নিভৃতে চালিয়ে যাওয়া কাব্যচর্চার নানান নিদর্শন এই অঞ্চলের জীবনধারার একটি অনন্য অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাংশে শৈল জনপদের প্রাতিষ্ঠানিক নাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম। এই অঞ্চলে চাকমা জাতির বাস সুপ্রাচীন কাল থেকে। ইন্দো-ইরানীয় ভাষাবংশের অন্তর্ভুক্ত চাকমা ভাষা। আদিবাসীদের মধ্যে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী বা জাতিগোষ্ঠী। তাদের নিজস্ব বর্ণমালা ও সমৃদ্ধ লোকসাহিত্য রয়েছে। চাকমারা বাংলা বর্ণমালায় নিজেদের ভাষায় কবিতা লিখতে সপ্রতিভ। চাকমা আদিকবি ফিরিঙচানের একটি কবিতা ও আশির দশকের তিনজন উত্তরাধুনিক কবির চাকমা কবিতার অনুবাদ থাকছে বর্তমান প্রবন্ধে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিকবি শিবচরণ। তিনি এই জনপদে পথ-প্রদর্শক কবি। তাঁকে অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি বলে ধারণা করা হয়। তিনি এক ধরনের বিশেষ কবিতা লিখেছিলেন-যেগুলোকে বলা হয় ‘লামাহ্্’ । তাঁর রচিত সাতটি লামাহ্্ নিয়ে সংকলিত গ্রন্থের নাম গোঝেন লামাহ্। এসব লামাহ্ কবিতায় স্রষ্টার প্রতি নিবেদন ও প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। শিবচরণের কবিতার জনপ্রিয় দুটি পঙ্ক্তি হলো —
যে বর মাগে সে বর পায়
গোঝেনে বর দিলে ন ফুরায়।
প্রসঙ্গত, কবি শিবচরণের প্রকাশিত গ্রন্থটি দুষ্প্রাপ্য এবং তাঁর রচিত গ্রন্থটির রচনাকাল সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
চাকমা সাহিত্যের আধুনিক কালের সূত্রপাত বিশ শতকের প্রথমার্ধে— ১৯৩০ সালে, কবি ফিরিঙচানের বাংলা বর্ণে চাকমা ভাষায় রচিত ‘আলঝি মিলার কবিতা’ নামে একটি কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে এই কবিতাটি তাঁর আলসি কবিতা গ্রন্থে সংকলিত হয়। কবিতাগুলো বেশ জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। এর ভাষা বেশ সাবলীল এবং ব্যঙ্গাত্মক। আলস্যের কারণে অলস ব্যক্তির কী সমস্যা হয় এবং অলস মেয়েরা যে অন্যের উপহাসের পাত্রী হয়, তার বর্ণনা আছে এতে—
আলসি মানস্যে প্রত্যেক দিনত
দিনত যানছে ঘুম
ফেজেরায়দি চিনা যায়ছে
আলসি মানস্যের জুম।
আলসি মানস্যর মুখৎ শুনা যায়
উয়ান ইয়ান নেই।
নেই শব্দউয়া কিদ্যায় অইয়ে
আলসি মানস্যথেই।
অনুবাদ (বাংলায়)
অলস লোকে প্রতিদিন
দিনে যাবে ঘুম।
আগাছায় পূর্ণ হয়
আলসে লোকের জুম।
অলস লোকে প্রতিদিন
নেই নেই শব্দ করে
নেই শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে
অলস লোকের তবে।
কবি সুহৃদ চাকমার (১৯৫৮-১৯৮৮) কাব্যগ্রন্থ ‘বার্গী’ ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের যাপিত জীবন আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে যখন নাগরিক যন্ত্র সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছিল, তখন সুহৃদ চাকমা তাঁর কাব্য ভুবনে লোকজ উপাদানের মোহময় উপস্থিতি ঘটিয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁর ‘বার্গী’ কাব্যগ্রন্থে লোকজ সংস্কৃতির এমন মায়াবী, চিত্রময় আর আবেগমথিত চিত্রায়ণ আমরা দেখতে পাই যা বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যিক শিকড়ের সঙ্গে আমাদের গভীর সংযোগ ঘটায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবন, নদী, প্রকৃতি, লোকজ বিশ্বাস, প্রেম-বিরহ, জুম জীবন-এসব উপাদান তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে প্রতিটি কবিতা পাঠককে যেন অরণ্যের মায়ামাখা আত্মায় টেনে নিয়ে যায়। তাঁর ‘বার্গী’ কবিতার চাকমা পাঠের পাশাপশি বাংলা অনুবাদ —
বার্গী
কাদিমায ফুত্যে সুদোহলার জুমতুগুনোত জুনোপহর ফুদিলে
একঝাক সনারঙ মেদোনী-বার্গী উরি যান
মেঘ সেরে কুওর খবং মুগুচ্যে মোন’ সান স্ববনত।
সোজরঙ সাজুরি সনারঙ বার্গীজাঙাল জুনোপহরে ভিজে মোন
জিংকানীর ঘর-গিরিত্তি-পোচপানা-লুভ-ধাব-আওঝ
কৃষ্ণাগাভুরীর ভরনভিরোন বুগ সান।
মথুরার মেদোনী-বার্গীপাল সোজমেঘ সাজুরি উরি যায়
জুনোপহরে ভিজে মোন হারেযেয়্যে সুরনত কৃষ্ণার বুগ ভাজি থায়।
বার্গী ( বাংলা অনুবাদ)
কার্তিকে সুতোকলি-ফোটা জুমের আঙিনায় জ্যোৎস্না ফুটলে,
একঝাঁক সোনালী গর্ভিণী-বার্গী উড়ে যায়
মেঘের আড়ালে, কুয়াশার ঘোমটা-পরা পাহাড়ের স্বপ্নে।
নীল মেঘ-সাঁতারে সোনালী বার্গীমালা, জ্যোৎস্নায় ধোয়া পাহাড়—
জীবনের ঘর-গেরস্থালী, ভালোবাসা, স্বপ্ন আর কামনা
কৃষ্ণাযুবতীর সুডৌল, পূর্ণ বুকের মতো।
মথুরার গর্ভিণী-বার্গী নীল মেঘ-সাঁতারে উড়ে যায়,
জ্যোৎস্নায় ধোয়া পাহাড় হারানো স্মৃতিতে, কৃষ্ণার বুক ভেসে থাকে।
কবি মৃত্তিকা চাকমা (জন্ম:১৯৫৮) বাংলা ও চাকমা ভাষায় নানা বিষয়ে কবিতা লিখেছেন এবং লিখে যাচ্ছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতার বইগুলোর মধ্যে- মনপরানী (২০০৯), এখনো পাহাড় কাঁদে (২০১০), মেঘ সেরে মোনোচুম (২০১১), সনামুরো(২০২৫) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতায় সমসাময়িক জীবন যন্ত্রণা এবং রাজনৈতিক মনোবিকাশ প্রবলভাবে বিদ্যমান। ‘ চেরেত্তার ফুল-বাগান ’ কবিতায় তিনি নিজের প্রতিবেশকে প্রকাশ করেছেন এভাবে—
চেরেত্তার ফুল-বাগান
চেরেত্তার আওঝর ফুল-বাগানত
জুই-সত্রং কৃষ্ণচুরা
ভেবেরাদাল্যা ফুল চারা
জিংহানীত আঝা এল তুলিব্যের
সে বাগানত বোজি উত্তোর-দঘিন বোয়ের হেবার,
চিকি পুগে-পোজিমে হিঙিরি বেল-উধের
আর দুবি যার
থির গোরি সাগর-চোগে রিনি চেবার।
বোজি থেইম তজিম সাত-রঙ্যা বাগানত
খুলি দিন্যেয় মনর বেক দরজা-জানালা
ফুলর তুম্বাজ এলে,
দঝরা পিথিমীর এক মানেই জনম লোম আওঝে
সেই মর আওঝর চেরেত্তার
জুই-সত্রং-কৃষ্ণচুরার তজিম বাগানত।
যত্নের বাগানে ( বাংলা অনুবাদ)
একান্ত সাধের ফুলবাগানে
জুঁই, গাঁদা, কৃষ্ণচূড়া,
অঢেল রঙের ফুলের চারা—
স্বপ্ন ছিল লালন করব জীবনে।
সে বাগানে বসে দখিনা হাওয়া,
সূর্যোদয় দেখব, সূর্যাস্ত দেখব,
আর চোখ রাখব দরিয়ায়।
বসে থাকব সাতরঙা ফুলবাগানে,
খুলে দেব মনের সকল অর্গল
ফুলের সুবাসে
ভিন্ন এক পৃথিবীতে জন্ম নেব,
সেই আমার একান্ত যত্নে গড়া
জুঁই-সাতরঙা ফুলবাগানে।
শিশির চাকমা (জন্ম:১৯৬০) আশির দশক থেকে এ যাবত পর্যন্ত নানা বিষয়ে প্রচুর কবিতা লিখেছেন। প্রেম ও স্বদেশ বিষয় উপজীব্য তাঁর ‘তুই ন এলে’ কবিতায় পাহাড়ি জনপদের সৌন্দর্য বিলুপ্তির কথা হৃদয়স্পর্শী অনুভূতিতে ভেসে ওঠে। কবিতাটির চাকমা ভাষার পাশাপশি বাংলায় এমন—
তুই ন এলে
তুই ন এলে
দিন যেদ নয়,
তরে ন পেলে
রেত এদ নয়।
বোয়ের উধিব মন’ বাগনত
ফুল ঝরিবাক বঙ পাদারত,
তুই ন এলে মন ভাঙিব
তুই ন এলে
রেদ এদ নয়,
ন’ জ্বলিবাক রেদো জুনিপুক
তরে ন পেলে বুক কানিব।
তুই ন এলে মেঘ কানিব
চেরো পালামায় ঝর লামিব,
ম’ মুজুঙে বান উধিব
বানে মরে ভাযেই নিব
ভাযেই নিলে ছাবা লুগিব।
তুমি না এলে ( বাংলায়)
তুমি না এলে দিন কাটে না,
তোমায় না পেলে রাত নামে না।
হৃদয়-বাগিচায় ঝড় উঠবে,
ফুল ঝরবে আকুল প্রহরে,
তুমি না এলে হৃদয় ভাঙবে।
তুমি না এলে রাত নামে না,
রাতের জোনাকিরা আলো ছড়াবে না,
তোমায় না পেলে হৃদয় কাঁদবে।
তুমি না এলে মেঘ কাঁদবে,
চারদিকে ঝড় নেমে আসবে,
আমার সামনে বান উঠবে,
সে বানে ভেসে যাব,
ভাসিয়ে নিলে ছায়াও মিলাবে।
সংকট কিংবা আনন্দ—জীবনের প্রতিটি পর্বেই মানুষ আশ্রয় খুঁজেছে কবিতায়। অনুভূতি, স্বপ্ন ও মননের অনন্য শিল্পরূপ কবিতা মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। শিল্প, সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক বিকাশে কবিতার ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রকৃতির বৈচিত্র্য, সংগ্রামের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাংলাদেশের মানুষকে করেছে সহজাতভাবে কবিতামুখী। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলা কবিতার বিস্তৃত ভুবনে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী কবিরাও নীরবে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব কাব্যভাষা ও নন্দনচেতনা। যদিও তাঁরা এখনো মূলধারার সাহিত্যে প্রত্যাশিত স্বীকৃতি পাননি, তবু তাঁদের সৃজনভুবন বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যে।
আরফান হাবিব : প্রাবন্ধিক ও গবেষক, বান্দরবান




