এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

কামার

তানভীর আহমেদ হৃদয়

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি মাটিতে নামেনি। পূর্ব আকাশে সূর্যের আভা ফুটে উঠলেও গ্রামের অধিকাংশ মানুষের ঘুম ভাঙেনি। কিন্তু আব্দুল করিম কামারের ঘরে দিনের শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই।

পুরোনো টিনের চালার নিচে ছোট্ট কামারশালার দরজা খুলে তিনি চুল্লির সামনে দাঁড়ালেন। আগের রাতের নিভে যাওয়া ছাই সরিয়ে শুকনো কয়লা সাজালেন, তারপর বাঁশের তৈরি হাপর টেনে আগুন জ্বালাতে লাগলেন। ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ অন্ধকারের বুক চিরে লাল শিখা মাথা তুলে দাঁড়াল। করিমের চোখেও যেন সেই আগুনের প্রতিফলন জ্বলে উঠল। এই আগুনই তার জীবন, এই আগুনই তার রুটি-রুজি। লোহার গায়ে হাতুড়ির প্রতিটি আঘাত যেন তার নিজের বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস। আগুনে লাল হয়ে ওঠা লোহা যখন ধীরে ধীরে দা, কাস্তে, কোদাল কিংবা লাঙলের ফলায় রূপ নেয়, তখন করিমের মনে হয়—মানুষের জীবনও বোধহয় এমনই। অসহ্য তাপে না পুড়লে তার প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে না।

তার বাবা আজিজ কামারও এই একই চুল্লির সামনে দাঁড়িয়ে সারাজীবন কাটিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে একদিন ছেলেকে বলেছিলেন, “মনে রাখিস করিম, কামারের হাত কখনো ভিক্ষা চায় না। সে আগুনকে বন্ধু বানিয়ে নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে।”

বাবার সেই কথাগুলো করিম আজও ভুলতে পারেনি।

এদিকে ঘরের ভেতর থেকে স্ত্রী রহিমা ডাক দিল, “শোনো, চাল শেষ হয়ে এসেছে। বাজারে ধারও আর কেউ দিচ্ছে না। আজ যদি দু-চারটা কাজ পাও, ফেরার সময় একটু চাল নিয়ে এসো।”

করিম স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। এই হাসির ভেতর কতটা অসহায়ত্ব লুকিয়ে আছে, তা রহিমা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না। সংসারে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী আর দুই সন্তান। বড় ছেলে রফিক এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসবে। মেয়ে রুনা মাত্র চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। দুজনেরই পড়াশোনার খরচ বাড়ছে। অথচ কামারশালার আয় দিন দিন কমছে।

সকালের কিছুক্ষণ পর প্রথম খদ্দের এলেন কৃষক মতিয়ার। হাতে ভাঙা একটি কাস্তে।

“করিম ভাই, এইডা ঠিক করে দেও। নতুন কাচি কেনার মতো অবস্থা নাই।”

করিম কাস্তেটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখল। তারপর বললো, “নতুনটার মতোই করে দেব। যতদিন আমার হাত চলে, তোমার কাচি ভাঙা থাকবে না।”

মতিয়ার হেসে বললো, “তোমার হাতের কাজের তুলনা নাই। কিন্তু এখন সবাই বাজারের কারখানার জিনিস কিনছে।”

কথাটা শুনে করিমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সত্যিই তো, একসময় এই কামারশালার সামনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাইন লেগে থাকত। এখন দিনের পর দিন বসে থেকেও তেমন কাজ জোটে না। শহরের কারখানায় তৈরি সস্তা যন্ত্রপাতি গ্রামের বাজার ভরিয়ে দিয়েছে। মানুষ টাকার হিসাব বোঝে, কিন্তু হাতের কাজের মূল্য আর বোঝে না।

সারাদিনে মাত্র তিনটি কাজ হলো। সন্ধ্যায় হিসাব করে দেখল, এতটুকু আয়ে সংসারের একবেলার খাবারও জুটবে না। তবু বাজার থেকে এক কেজি চাল আর অল্প কিছু ডাল কিনে বাড়ি ফিরল।

রাতের খাবারের সময় রফিক নিচু স্বরে বললো, “বাবা, স্কুলে পরীক্ষার ফি জমা দিতে বলেছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে না দিলে ফরম পূরণ হবে না।”

করিমের হাত থেমে গেল। ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে বললো, “দে বাবা, সময় আছে। আল্লাহ চাইলে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”

কিন্তু নিজের মনেই সে জানত, কোনো ব্যবস্থাই তার চোখে ধরা দিচ্ছে না।

সেদিন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর করিম একা কামারশালায় এসে বসে রইল। নিভে যাওয়া চুল্লির ঠান্ডা ছাইয়ে হাত রাখল। মনে হলো, এই ছাইয়ের নিচেই চাপা পড়ে আছে তার বহু বছরের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর না-বলা কান্না। দূরে কোথাও শিয়ালের ডাক ভেসে আসছিল। আকাশভরা তারা যেন নীরবে একজন কামারের দীর্ঘ সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে তাকিয়ে ছিল।

করিম ধীরে ধীরে হাতুড়িটা তুলে বুকে জড়িয়ে ধরল। তার মনে হলো, পৃথিবী যদি একদিন তাকে ভুলেও যায়, এই হাতুড়ি কোনোদিন তার সাথে  বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। কারণ আগুন, লোহা আর ঘামের সঙ্গে যে বন্ধন গড়ে ওঠে, তা মানুষের স্মৃতির চেয়েও অনেক বেশি স্থায়ী।

শীতের সকাল। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পুরো গ্রাম। করিম কামার প্রতিদিনের মতো ভোরেই কামারশালার দরজা খুলল। হাপরে বাতাস দিতেই চুল্লির ভেতরে আগুন জ্বলে উঠল, কিন্তু আজ সেই আগুনের উষ্ণতা যেন তার মন পর্যন্ত পৌঁছাল না। কয়েক দিন ধরে কাজ নেই বললেই চলে। একসময় যে কামারশালার সামনে কৃষকদের ভিড় লেগে থাকত, সেখানে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু নীরবতা বসে থাকে।

চুল্লির পাশে ঝুলে থাকা পুরোনো হাতুড়িটির দিকে তাকিয়ে করিমের মনে পড়ল বাবার কথা। আজিজ কামার বলতেন, “লোহা যত শক্তই হোক, ধৈর্যের আঘাতে একদিন না একদিন নত হবেই।” কিন্তু সময় কি আর লোহার মতো? সময় তো মানুষের ধৈর্যকেও ভেঙে দিতে জানে।

দুপুরের দিকে গ্রামের এক ব্যবসায়ী এসে বললো, “করিম ভাই, এই পেশায় আর লাভ নেই। বাজারে এখন কারখানার তৈরি দা, কাস্তে, কোদাল সবই কম দামে পাওয়া যায়। আপনি চাইলে আমার দোকানে কাজ করতে পারেন।”

করিম শান্ত চোখে লোকটার দিকে তাকাল। কথাগুলো অপমানের ছিল না, কিন্তু বুকের গভীরে কোথাও যেন ছুরির মতো বিঁধল। সে ধীরে বললো, “আমি সারা জীবন লোহাকে আকার দিয়েছি। এখন যদি শুধু বিক্রি করি, তাহলে আমার হাত দুটো বেঁচে থাকবে, কিন্তু মনটা মরে যাবে।”

লোকটি আর কিছু না বলে চলে গেল।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে করিম দেখল স্ত্রী রহিমা উঠোনে বসে পুরোনো শাড়িতে তালি দিচ্ছে। পাশে রুনা স্কুলের বই খুলে বসেছে, কিন্তু তার চোখ পড়ায় নেই। রফিক চুপচাপ বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

“কী হয়েছে?” করিম প্রশ্ন করতেই রফিক নিচু গলায় বললো, “বাবা, আজ শিক্ষক বলেছেন, পরীক্ষার ফি না দিলে আমাকে আর ক্লাসে বসতে দেবেন না।”

করিমের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, “আর দুটো দিন সময় দে। আমি ব্যবস্থা করব।”

রফিক জানত, বাবার কথার ভেতরে আশার চেয়ে কষ্টই বেশি। তবু সে মাথা নাড়ল।

রাতে রহিমা আলতো স্বরে বললো, “একটা গাভি ছিল, সেটাও তো গত বছর বিক্রি করলে। এখন আর কী বিক্রি করবে?”

করিম দীর্ঘশ্বাস ফেললো। “যদি দরকার হয়, এই কামারশালাটাই বিক্রি করে দেব।”

রহিমা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। “না! এটা বিক্রি করলে তুমি আর তুমি থাকবে না। এই চুল্লির আগুনেই তো তোমার জীবন।”

কথাগুলো শুনে করিমের চোখ ভিজে উঠল। এতো বছরের সংসারে এই প্রথম সে অনুভব করল, তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো এই ভাঙাচোরা কামারশালা নয়, তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো।

পরদিন সকালে গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক হাশেম আলী একটি মরিচাধরা লাঙলের ফলা নিয়ে এলেন। করিম আগুনে লোহা গরম করে ধীরে ধীরে সেটি নতুনের মতো গড়ে দিল। কাজ শেষ হলে বৃদ্ধ অনেকক্ষণ ফলাটার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “কারখানার জিনিসে ধার আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। তোমার হাতের কাজে এখনও মানুষের ঘামের গন্ধ পাই।”

সেই কথাগুলো করিমের ভেতরে নিভে যেতে থাকা আগুনে যেন নতুন করে বাতাস দিল।

কিন্তু সুখ বেশিক্ষণ টিকল না। বিকেলের দিকে মহাজন এসে আগের ধার করা টাকার হিসাব চাইল। কড়া গলায় বললো, “আগামী সপ্তাহের মধ্যে টাকা না দিলে কামারশালার জায়গাটা লিখে দিতে হবে।”

মহাজন চলে যাওয়ার পর করিম অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সামনে জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, মানুষ আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে, কিন্তু ভাগ্যকে নয়। হাতুড়ি দিয়ে লোহা বাঁকানো যায়, অথচ অভাবের কঠিন দেয়াল ভাঙা যায় না।

সেদিন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর করিম আবার একা কামারশালায় এলো। নিস্তব্ধ চুল্লির সামনে দাঁড়িয়ে সে হাতুড়িটি শক্ত করে ধরল। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বললো, “হে আগুন, তুই তো কোনোদিন আমাকে ফিরিয়ে দিসনি। এবারও যদি পারিস, আমার সম্মানটুকু বাঁচিয়ে রাখিস।”

চুল্লির ভেতরে তখনও কয়লার নিচে একটি ছোট্ট লাল অঙ্গার জ্বলছিল। করিম বুঝতে পারল—যতক্ষণ সেই অঙ্গার বেঁচে আছে, ততক্ষণ আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

শীত কেটে বসন্ত এলো, তারপর গ্রীষ্ম। ঋতু বদলালেও করিম কামারের ভাগ্যের আকাশে যেন কোনো নতুন রং ফুটল না। কামারশালার টিনের চাল আগের চেয়ে আরও জীর্ণ হয়েছে, দেয়ালের বাঁশে ঘুণ ধরেছে, আর চুল্লির পাশে বছরের পর বছর জমে থাকা কালো ছাই যেন তার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। তবু প্রতিটি ভোরে তিনি আগুন জ্বালান। কারণ তিনি জানেন, যে মানুষ আগুনের কাছে হার মানে, সে জীবনের কাছেও হেরে যায়।

একদিন দুপুরে হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। মুহূর্তেই শুরু হলো কালবৈশাখীর তাণ্ডব। ঝড়ের তীব্র বাতাসে কামারশালার টিনের চাল উড়ে গেল, বাঁশের খুঁটি ভেঙে পড়ল, আর প্রবল বৃষ্টির পানিতে চুল্লির আগুন নিভে গেল। বজ্রপাতের শব্দে পুরো গ্রাম কেঁপে উঠছিল, কিন্তু করিমের বুকের ভেতর যে শব্দ হচ্ছিল, তা যেন আরও ভয়ংকর।

বৃষ্টি থামার পর তিনি ভাঙা কামারশালার সামনে বসে রইলেন। কাদামাটির ওপর পড়ে থাকা হাতুড়িটি তুলে নিলেন। হাতের তালুতে শক্ত করে চেপে ধরতেই মনে হলো, এতদিন ধরে যে স্বপ্নটাকে আগলে রেখেছিলেন, সেটিও বুঝি আজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

পরদিন সকালে মহাজন আবার এলো। চারদিকে একবার তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললো, “এবার আর সময় নেই করিম। ধার শোধ করতে না পারলে জমিটা আমার নামে লিখে দাও।”

করিম কিছু বললো না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। জীবনে বহু অপমান সহ্য করেছেন, কিন্তু নিজের পৈতৃক কামারশালা হারানোর যন্ত্রণা যেন মৃত্যুর চেয়েও কঠিন।

 

ঠিক সেই সময় গ্রামের প্রবীণ কৃষক হাশেম আলী এগিয়ে এলেন। তিনি মহাজনের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “এই কামারশালা শুধু করিমের নয়, এই গ্রামের ইতিহাস। যার লাঙল, যার কাস্তে, যার কোদাল দিয়ে এত বছর আমাদের ফসল উঠেছে, তাকে আমরা একা ছেড়ে দেব না।”

খবরটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল। বিকেলের মধ্যেই গ্রামের মানুষ একে একে হাজির হতে লাগল। কেউ বাঁশ নিয়ে এলো, কেউ টিন, কেউ কয়লা, কেউবা পুরোনো লোহা। তরুণেরা ভাঙা চাল মেরামত করল, বৃদ্ধেরা পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিল, আর গ্রামের নারীরা রান্না করে সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করল।

করিম নির্বাক হয়ে সব দেখছিলেন। জীবনে প্রথমবার তিনি উপলব্ধি করলেন—একজন মানুষের প্রকৃত সম্পদ তার ঘরে জমে থাকা অর্থ নয়, মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা ভালোবাসা।

দুই দিনের মধ্যেই কামারশালা আবার দাঁড়িয়ে গেল। নতুন টিনের চালের নিচে চুল্লিতে আগুন জ্বলে উঠতেই করিমের চোখ ভিজে উঠল। তিনি হাপরে বাতাস দিলেন, লোহা আগুনে রাখলেন, তারপর হাতুড়ির প্রথম আঘাত করলেন। “টং!”

শব্দটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই মনে হলো, এ শুধু লোহার ওপর আঘাত নয়—এ যেন হতাশার বুক চিরে জীবনের ফিরে আসার ঘোষণা।

সেই দিনই এক তরুণ কৃষক নতুন একটি লাঙলের ফলা বানানোর অর্ডার দিল। তার পর আরেকজন এলো দা ধার করাতে। তারপর আরও দুজন। সন্ধ্যার আগেই কামারশালায় আবার সেই পুরোনো ব্যস্ততা ফিরে এলো। করিমের মুখে অনেক দিনের পর একটি তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

রাতে বাড়ি ফিরে রফিক বাবার পাশে বসে বললো, “বাবা, আমি পড়াশোনা শেষ করব। কিন্তু তোমার এই কাজটাও শিখব। কারণ আজ বুঝেছি, এটা শুধু একটি পেশা নয়—এটা আমাদের পরিচয়।”

করিম ছেলের মাথায় হাত রেখে আকাশের দিকে তাকালেন। অসংখ্য তারার ভিড়ে যেন তিনি নিজের বাবার মুখ দেখতে পেলেন। মনে হলো, আজিজ কামার কোথাও বসে নিশ্চয়ই হাসছেন। আগুন নিভে গিয়েছিল, কিন্তু তার উত্তরাধিকার নিভে যায়নি। ছাইয়ের নিচে লুকিয়ে থাকা অঙ্গারের মতোই তা আবার জ্বলে উঠেছে—মানুষের ভালোবাসায়, আত্মসম্মানে এবং এক কামারের অবিনশ্বর বিশ্বাসে।

 

সময়ের চাকা থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে আরও দশটি বছর কেটে গেল। গ্রামের অনেক কিছু বদলে গেছে। কাঁচা রাস্তার জায়গায় পাকা সড়ক হয়েছে, বাজারে বিদেশি যন্ত্রপাতির সারি বেড়েছে, কৃষকের হাতে ট্রাক্টর উঠেছে। কিন্তু গ্রামের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট কামারশালাটি এখনও প্রতিটি ভোরে আগুনের লাল আভায় জেগে ওঠে।

তবে আজ আর আগের মতো শক্ত হাতে হাতুড়ি তুলতে পারেন না করিম কামার। একসময়ের বলিষ্ঠ বাহু কাঁপে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। আগুনের তাপে পোড়া হাতের চামড়া আরও রুক্ষ হয়ে গেছে। কপালের গভীর ভাঁজগুলো যেন বছরের পর বছর জমে থাকা সংগ্রামের ইতিহাস লিখে রেখেছে।

এখন অধিকাংশ কাজ করে তার ছেলে রফিক। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে লোহা গরম করে, হাতুড়ি চালায়, ধার দেয়। করিম শুধু মাঝে মাঝে বলে ওঠেন, “আঘাতটা একটু ডান দিকে দে… না, এভাবে নয়। লোহারও একটা প্রাণ আছে। তার ভাষা বুঝে আঘাত করতে হয়।”

রফিক হাসে। সেই হাসিতে শ্রদ্ধা আছে, ভালোবাসা আছে, আর আছে এক উত্তরাধিকারকে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার।

 

একদিন সকালে শহর থেকে কয়েকজন তরুণ এলো। তারা লোকজ পেশা নিয়ে গবেষণা করছে। একজন করিমকে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, এতো কষ্টের কাজ জীবনে কেন ছাড়লেন না?”

করিম কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর চুল্লির আগুনের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, “লোহা আগুনে পুড়ে শক্ত হয়, মানুষ কষ্টে পুড়ে মানুষ হয়। আমি যদি আগুনকে ছেড়ে দিতাম, তাহলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলতাম।”

তরুণরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তাদের চোখে বিস্ময়, আর করিমের চোখে দীর্ঘ জীবনের শান্তি।

সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামের মানুষ করিম কামারকে সংবর্ধনা দিল। কোনো বড় মঞ্চ ছিল না, কোনো জাঁকজমকও ছিল না। ছিল শুধু গ্রামের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। যে কৃষকদের জন্য তিনি সারা জীবন লাঙলের ফলা, কাস্তে, দা আর কোদাল গড়েছেন, তারা একে একে উঠে এসে তার হাতে একটি সম্মাননা স্মারক তুলে দিল।

করিম কাঁপা হাতে স্মারকটি নিলেন। তার চোখ ভিজে উঠল। তিনি বললেন, “আমি কোনো বড় মানুষ নই। আমি শুধু একজন কামার। তবে আজ বুঝলাম, মানুষের জন্য করা পরিশ্রম কোনোদিন হারিয়ে যায় না। একদিন না একদিন তা মানুষের হৃদয়ে ফিরে আসে।”

রাত গভীর হলো। সবাই চলে যাওয়ার পর তিনি একা কামারশালায় ঢুকলেন। চুল্লির আগুন তখনও ধিকিধিকি জ্বলছে। পাশে রাখা সেই পুরোনো হাতুড়িটি তিনি হাতে তুলে নিলেন। এ হাতুড়ি একদিন তার বাবার ছিল, তারপর তার হয়েছে, আর আজ তা রফিকের অপেক্ষায়।

তিনি হাতুড়িটি ছেলের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “মনে রাখিস, এই হাতুড়ি দিয়ে শুধু লোহা গড়বি না, মানুষের বিশ্বাসও গড়বি। কাজের মধ্যে কখনো অসততা আনবি না। কারণ আগুন সবকিছু সহ্য করে, কিন্তু মিথ্যা সহ্য করে না।”

রফিক বাবার হাত শক্ত করে ধরে মাথা নিচু করল। তার চোখ থেকেও নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

পরদিন ভোরে গ্রামের মানুষ শুনল, করিম কামার আর নেই। রাতের শেষ প্রহরে তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার মুখে ছিল এক প্রশান্ত হাসি—যেন দীর্ঘ সংগ্রামের পর অবশেষে তিনি শান্তির ঠিকানায় পৌঁছে গেছেন।

সেই দিন কামারশালার চুল্লির আগুন নিভতে দেওয়া হয়নি। রফিক নিজ হাতে হাপর টেনে আগুন জ্বালিয়ে রাখল। প্রথম হাতুড়ির আঘাত পড়তেই পুরো কামারশালা কেঁপে উঠল। গ্রামের প্রবীণরা নীরবে বললেন, “করিম চলে যায়নি। সে বেঁচে আছে এই আগুনে, এই হাতুড়ির শব্দে, এই ঘামে, এই সততায়।”

আজও সন্ধ্যা নামলে সেই কামারশালার পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষ থেমে যায়। হাতুড়ির ছন্দময় শব্দ শুনে তাদের মনে হয়, আগুন কখনও মরে না। সত্যিকারের শ্রম, সততা আর ভালোবাসাও মরে না। একজন কামারের জীবন শেষ হতে পারে, কিন্তু তার হাতে গড়া মানবতার উত্তরাধিকার যুগের পর যুগ জ্বলতে থাকে—চুল্লির লাল শিখার মতো, অনির্বাণ, অমলিন, অনন্ত।

 

তানভীর আহমেদ হৃদয় গল্পকার ও প্রাবন্ধিক, ঢাকা

ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নজরুলের সাহিত্যিক প্রতিরোধ

শাহেদ কায়েস একজন কবিকে নিয়ে ব্রিটিশ সরকার এতটা অস্বস্তিতে পড়েছিল কেন? তাঁর লেখা বাজেয়াপ্ত করতে হয়েছে, পত্রিকার জামানত কেড়ে নিতে হয়েছে, ছাপাখানায় নজরদারি বসাতে হয়েছে,

হঠাৎ ‘আন্দরকিল্লায় অন্তরকথা

ড. মাসুদুল হক   ২৫ আগস্ট ২০২৬ সন্ধ্যা একটু একটু করে রাতের দিকে গড়াচ্ছিল। কচি অন্ধকার পাকতে পাকতে যখন চেরাগি পাহাড় মোড়ে পৌঁছালাম, তখন চট্টগ্রামের

স্বপ্নীল বোঝাপড়া

সৈয়দ মনজুর কবির তুমি কে ও? কোন বাড়ির ছেলে? কই আগে তো কোনোদিন দেখি নাই? বেশ উচ্চ:স্বরে একটানে প্রশ্নগুলো করেন পিয়ার খান প্রায় আশি হাত

লাল নীল স্বপ্নের গল্প

দেবাশিস ভট্টাচার্য   শৈশব নিয়ে লিখতে গেলে আমি আবেগ আপ্লুত হয়ে যাই, জীবনের এতটা সময় পার করে এসে মনে হয় শৈশবই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।

কামার

তানভীর আহমেদ হৃদয় ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি মাটিতে নামেনি। পূর্ব আকাশে সূর্যের আভা ফুটে উঠলেও গ্রামের অধিকাংশ মানুষের ঘুম ভাঙেনি। কিন্তু আব্দুল করিম কামারের ঘরে