দেবাশিস ভট্টাচার্য
শৈশব নিয়ে লিখতে গেলে আমি আবেগ আপ্লুত হয়ে যাই, জীবনের এতটা সময় পার করে এসে মনে হয় শৈশবই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।
যে সময় ছিল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরা। অনেকটা বাড়ির পেছনের ঠান্ডা নিরব পুকুরের জলে ভাসা পদ্মপাতার মত।ঘ্রাণ পাই ছোঁয়া যায়না এমন এক অনুভূতি।
স্কুলে যাওয়ার দিনটি খুব মনে পড়ে, বই খাতা নিয়ে ভাইবোনদের সাথে ছুটতে ছুটতে যাওয়া।
তখন অত গাড়ি অটোর ব্যবস্থা ছিল না। হাঁটা পথ পুকুরের পাড় দিয়ে একটা মাটির রাস্তা পেরিয়ে আমরা দলবেঁধে বড় রাস্তায় উঠতাম। তারপর আরো কিছু পথ গেলে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় টিনের চালা বেড়ার ঘর। দিদিমনি আমাদের পরম যত্নে আদর করে কোলে নিয়ে টুলে বসিয়ে দিতেন। সেই বীণা দিদিমনি, শান্তি পিসি, খালেক স্যার, সন্ধ্যা পিসির কথা বলতেই হয়। উনারাই পরম যত্নে আমাদের প্রাথমিক ভিত গড়ে দেন।
কত স্মৃতি চকচক করে ওঠে স্মৃতির আয়নায়।
আমার জন্ম প্রত্যন্ত গ্রামে, দেশের সিংহভাগ মানুষই গ্রামেই জন্মেছেন। কারো বাবা কৃষক, কারো বাবা চাকরি করেন, কারো বাবার দোকান আছে বাজারে।
মানুষের এ সময়টা শ্রেষ্ঠ সময় বলতে পারি এ কারণে এ সময় ছোট মনে কোন হিংসা বিদ্বেষ, জন্মাতে দেখিনি। হিন্দু, মুসলিম বৌদ্ধ, খৃস্টান সবাই মিলে মিশে একসাথে বড় হয়েছি আপন ভাইয়ের মতো।
আমরা সমতটের মানুষ,পূর্বে আছে পাহাড় পশ্চিমে সমুদ্র। মাঝখানে পলি জমে গড়ে ওঠা সমটতের মানুষ আমরা।
শৈশবের দুরন্তপনা বলতে পুকুরে সাঁতার কাটা শিখে নেয়া, পেছনের গাছপালার ভেতর ছোট ছোট ঝোপের ভেতর পাখির পেছনে লাগা, ছোট কাকুর সাথে মাছ মারতে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে সবুজ পাহাড়ি পথে হারিয়ে যাওয়া, কলাগাছের ভেলায় চড়ে পুকুরে এপার ওপার করা এসবই চলতো রোজ।
শৈশবের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ আকস্মিক হারিয়ে গেছে চিরতরে। ওরা আর কখনো ফিরে আসবে না।
এখনো কিছু বন্ধু আছে সামশু, প্রদীপ, প্রশান্ত, শিবু, শ্যামল তাদের সান্নিধ্য পাই এখনো। বসে স্মৃতি হাতড়ে মরি।
লাঠি লজেন্স, আইসক্রিম, বুট বাদামের লোভ এখনো আছে। চোখে পড়লে খেতে ইচ্ছে করে, পরক্ষণেই বয়স এসে বাধা দিয়ে বসে। সেই হাইস্কুল গেটে গুটি মেরে বসে থাকা প্রফুল্ল কাকু আর নেই। কিম্বা ছুটির ঘন্টা বাজানোর নির্মলদাতো আর নেই। প্রবীর স্যার,হরিবিলাস স্যার,বশির স্যারদের আর পাবো না। একমাত্র আমার প্রিয় শিক্ষক নজির আহমদ স্যার আলোকবর্তিকা হাতে আজো দাঁড়িয়ে আছেন।
তখন স্কুলের সামনে টিনের বায়োস্কোপ আসতো আমরা দু ‘জন মিলে ছন্দে ছন্দে গানে গানে এসব সাজানো ছবিগুলো দেখে কিযে আনন্দ পেতাম।
প্রিয় মানুষ বলতে দাদু, ঠাকুরমা বাবা মা কাকু পিসিমনিদের নিয়ে আমাদের ছিল একান্নবর্তী সংসার।
উনাদের অপার স্নেহে আমরা বড় হয়েছি। লেখাপড়ায় ভালো ছিলাম বলে শত দুষ্টুমী উনারা ক্ষমা করে দিতেন।
একটু পশ্চিমে গেলে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। সবুজ গালিচায় একটু গড়াগড়ি না খেলে কি ভালো লাগে। প্রাইমারি ছেড়ে যখন হাইস্কুলে ভর্তি হলাম, তখন কিছুটা পরিবর্তন হতে থাকে।
কিছুটা পরিবর্তন হতে থাকে জীবনে। নতুন ইউনিফর্ম পরে জুতা মোজা, ব্যাগ নিয়ে স্কুলের চারপাশে ঘোরাঘুরি খেলাধুলো শুরু হয়, এ যেন এক নতুন জীবন। দুরন্তপনা কমে আসে। অনেকের মতে আমাদেরও কিছু ভালো লাগা আছে,সীতাকুুণ্ডের মায়ায় আমাদের বেড়ে ওঠা।
আড়ম্বরহীন জীবনের প্রতি আমার অমোঘ মায়া। শ্যাওলা জমা উঠোন, ছায়া ছায়া ঘর। দেয়াল থেকে সামান্য রঙ খসে পড়েছে কোথাও। কাঠের আয়না টাঙানো পেরেকের সাথে। একপাশে একটা চৌকি পাতা। টানাটান করে পেতে রাখা চাদরের ওপর ভাঁজ করে রাখা নকশিকাঁথা। কাপড় কেটে তৈরি পর্দা ঝুলছে জানলায়। ঘরের কোণে একটা কাঠের আলনা। তাতে ভাঁজ করে রাখা রয়েছে নরম ধনেখালী শাড়ি। তার ঠিক পাশেই একটা টিপাই এর ওপর চীনেমাটির ফুলদানিতে সাজানো রজনীগন্ধা…
জীবনের এতটা সময়ে অনেকেই পাশে ছিলেন।
আজ আর সবাই নেই। ক্রমাগত ছোট হয়ে গেছে আমার পরিবার। দাদু, ঠাকুরমা, বাবাকে হারিয়েছি সেই কবে ..মাও বয়সের ভারে ক্লান্ত হয়ে চলে গেলেন। তবুও এ বয়সে আমার সব সুখ দুঃখ শেয়ার করতাম মার সাথে। মা ছাড়া এসব হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো কতটা প্রিয় ছিল আজ ভালো করে বুঝি। সে স্নেহ ভালোবাসা এখন আর কারো ভেতর খুঁজে পাই না ..সবাই আছে কিন্তু সে ফিলিংস আর নেই …
আমি উপশহরের মানুষ ..একসময়কার গ্রাম এখন শহর হয়ে উঠছে, এখনো একটু বৃষ্টি হলেই পাওয়ার সুইচ অফ হয়ে যায়। একসময় গরুর গাড়ি ছিল…. যাতায়াতের অন্যতম বাহন। এরপর কাঠের বাস। ব্রেক কষলে সব লোকজন একপাশে কাত হয়ে যেত। এরপর এলো আধুনিক যানবাহন। পৌরসভার কল্যাণে বাতি লাগলো রাস্তায়। ছোট্ট বেড়ার দোকানগুলো সরিয়ে তোলা হোল মার্কেট। অত্যাধুনিক প্লাজা। সবকিছুই পরিবর্তন হচ্ছে, জীবনমান, চলাফেরা, পোশাক আশাক, কথাবার্তা …বিজ্ঞানের যত আবিষ্কার ..কিন্তু আমরা কতটুকু মানবিক ভাবে এগোলাম জানি না।
এখনো সবাই বলে আগের মানুষ ভালো ছিল। তারা অশিক্ষিত ছিল, চাষা ছিল কিন্তু মিথ্যাচার করতো কম….অসভ্যতা জানতোইনা …!!
সত্যিই তো কতদূর এগোলো মানুষ…!
এমনই ভাবতাম শৈশবে জয় গোস্বামীর মতো নিজেকে।
আমি যখন ছোট ছিলাম খেলতে যেতাম মেঘের দলে একদিন এক মেঘবালিকা প্রশ্ন করলো কৌতুহলে এই ছেলেটা, নাম কি রে তোর?’
আমি বললাম, ফুস মন্তর মেঘবালিকা রেগেই আগুন,মিথ্যে কথা, নাম কি অমন হয় কখনো?
আমি বললাম, নিশ্চয়ই হয়, আগে আমার গল্প শোনো সে বলল, শুনবো না যাঃ, সেই তো রানি সেই তো রাজা সেই তো একই ঢাল তলোয়ার সেই তো একই রাজার কুমার পঙ্ক্ষিরাজে শুনবো না আর ওসব বাজে। আমি বললাম, তোমার জন্য নতুন করে লিখব তবে।
সে বলল, সত্যি লিখবি! বেশ তাহলে মস্ত করে লিখতে হবে। মনে থাকবে? লিখেই কিন্তু আমায় দিবি। আমি বললাম, তোমার জন্য লিখতে পারি এক পৃথিবী।
লিখতে লিখতে লেখা যখন সবে মাত্র দু চার পাতা
হঠাৎ তখন ভূত চাপলো আমার মাথায়
খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম ছোটবেলার মেঘের মাঠে
গিয়েই দেখি, চেনা মুখ তো একটিও নেই এ তল্লাটে
একজনকে মনে হল ওরই মধ্যে অন্যরকম
এগিয়ে গিয়ে বলি তাকেই তুমি কি সেই মেঘবালিকা, তুমি কি সেই?
সে বলেছে, মনে তো নেই। আমার ওসব মনে তো নেই
আমি বললাম, তুমি আমায় লেখার কথা বলেছিলে।
সে বলল, সঙ্গে আছে? ভাসিয়ে দাও গাঁয়ের ঝিলে।
আর হ্যা, শোন, এখন আমি মেঘ নই আর
সবাই এখন বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়।
বলেই হঠাৎ এক পশলায় আমায় পুরো ভিজিয়ে দিয়ে
অন্য অন্য বৃষ্টি বাদল সঙ্গে নিয়ে মিলিয়ে গেল দূরে কোথায়, দূরে দূরে। বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়
বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়.আপন মনে বলতে বলতে
আমিই কেবল বসে রইলাম ভিজে এক-সা কাপড় জামায় গাছের তলায় বসে রইলাম বৃষ্টি নাকি মেঘের জন্য এমন সময় অন্য একটি বৃষ্টি আমায় চিনতে পেরে বলল
তাতে মন খারাপের কি হয়েছে?
যাও ফিরে যাও-লেখ আবার
এখন পুরো বর্ষা চলছে, তাই আমরা সবাই এখন নানান দেশে ভীষণ ব্যস্ত
তুমিও যাও, মন দাও গে তোমার কাজে।
বর্ষা থেকে ফিরে আমরা নিজেই যাব তোমার কাছে।
এক পৃথিবী লিখবো আমি
এক পৃথিবী লিখবো বলে ঘর ছেড়ে সেই বেড়িয়ে গেলাম
ঘর ছেড়ে সেই ঘর বাঁধলাম গহিন বনে
সঙ্গী শুধু কাগজ কলম —
সুর আমাদের পাহাড় সমূদ্রে ছড়ানো ছিল,আমাদের সীতাকুণ্ড শৈশব ,কিশোরের দিনগুলোতে আন্দোলিত করেছে বারবার ।
মানুষের মনে সুরের জন্ম ঠিক কবে থেকেএর নির্দিষ্ট ইতিহাস নেই। তবে ধারণা করা হয়, ভাষারও আগে মানুষের মধ্যে ছন্দ ও সুরের অনুভূতি জন্মেছিল। প্রকৃতির শব্দই ছিল তার প্রথম শিক্ষক। বৃষ্টির টাপুর-টুপুর, নদীর কলকল, পাখির ডাক, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, হৃদস্পন্দনের তাল এসব থেকেই মানুষ প্রথম ছন্দ ও সুরের স্বাদ পেয়েছিল।
প্রাচীন মানুষ যখন শিকার করত, কাজ করত বা উৎসব করত, তখন তারা একসঙ্গে আওয়াজ তুলত, হাততালি দিত, পাথরে পাথর ঠুকত। ধীরে ধীরে সেই শব্দে নিয়ম, পুনরাবৃত্তি ও আবেগ যোগ হয়ে তৈরি হয় গান। অর্থাৎ, সুর এসেছে মানুষের আবেগ প্রকাশের প্রয়োজন থেকে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের মস্তিষ্কে শব্দের ওঠানামা ও ছন্দ ধরার এক স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে। শিশুও জন্মের পর মায়ের কণ্ঠের সুরে শান্ত হয়। তাই মনে করা হয়, সুর মানুষের ভেতরে এক আদিম প্রবৃত্তি হিসেবে ছিল।
আমাদের চেতনায় সীতাকুণ্ড বেঁচে থাকুক মাথা উঁচু করে—সুর নিয়ে,ছন্দ নিয়ে।
দেবাশিস ভট্টাচার্য : কবি ও গল্পকার, চট্টগ্রাম



