এখন সময়:সকাল ৭:১৭- আজ: রবিবার-২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:সকাল ৭:১৭- আজ: রবিবার
২১শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-৬ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

প্রাচীন বাংলার নাগরিক জীবনে শিল্প ও সৌকর্য

ড. আবু নোমান

এখন প্রাচীন বাংলার যে স্থাপত্যগুলো পাওয়া সম্ভব সেগুলোকে প্রত্মতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ বললেও বলা যেতে পারে। স্থাপনা সমাজের সভ্যতার একটি অন্যতম নিদর্শন বা উপাদান। সমাজের আভিজাত্য ও উচ্চবিত্ততার মাপকাঠি নির্ণয়ের একটি মাধ্যম হচ্ছে সমকালীন সমাজের স্থাপনা। স্থাপনা ও শিল্প-সংস্কৃতির প্রকরণ একটি সমাজের রুচিশীলতা, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এবং সভ্যতার অন্যতম মাপকাঠি। বাংলার বহু স্থানে প্রাচীনকালের স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। এ সকল স্থাপনার মধ্যে দূর্গ-বিহার, মন্দির ও স্তুপ অন্তর্ভুক্ত।

মহাস্থানগড়, বানগড়, চন্দ্রকেতুগড় ও তমলুকের নাম প্রাচীন বাংলার দুর্গসমূহের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। দুর্গনগরী হিসেবে এই সমস্ত স্থানগুলো চিহ্নিত হয়েছিল। এসব নগর ছিল শিল্প, বাণিজ্য ও প্রশাসনের কেন্দ্র। প্রাচীনকালে মহাস্থানগড় পরিচিত ছিল পু-্রনগর হিসেবে। বানগড় প্রাচীনকালে পরিচিত ছিল কোটিবর্ষ হিসেবে। তমলুক প্রাচীনকালে পরিচিত ছিল তাম্রলিপ্তি হিসেবে। এ সমস্ত দুর্গনগরগুলা খনন করে প্রাচীন বাংলার সাংস্কৃতিক বহু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। এ সকল প্রাচীন নিদর্শনের আলোকে প্রাচীন বাংলার নাগরিক জীবনের অনেক অজানা তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব।

পাহাড়পুর বিহার শালবন বিহারসহ বাংলার বহুস্থানে প্রত্মতাত্ত্বিক উৎখননের ফলে কতকগুলো বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধস্তুপ এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দিরের নিদর্শন আবি®কৃত হয়েছে। বৌদ্ধ বিহারে ভিক্ষুগণ বসবাস করতেন, পূজা-অর্চনা করতেন। এবং জ্ঞান আহরণ ও বিতরণে নিয়োজিত থাকতেন। ফলে বৌদ্ধধর্ম ও ভিক্ষুজীবন এবং শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। হিন্দু-বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ স্তুপে জনগণের ধর্মীয় মনোভাবের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। আবিষ্কৃত স্থাপনাগুলো প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যশিল্পের বাস্তব নিদর্শন। এসব নিদর্শন বাঙালির স্থাপত্যশিল্পে নৈপুণ্যের প্রমাণ দেয়। ভারতবর্ষের বৃহত্তর বৌদ্ধবিহারগুলোর মধ্যে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ছিল বৃহত্তম। এই বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দির একটি ক্রুশাকৃতির উপাসনা কমপ্লেক্স। এর প্রতিটি প্রধান দিকেই একটি করে ম-পযুক্ত গর্ভগৃহ রয়েছে। এ ধরনের মন্দির স্থাপত্য সৃষ্টির উৎসভূমি বাংলা। ময়নামতির ক্রুশাকৃতির মন্দিরগুলোতেই এ ধরনের স্থাপত্য শৈলির উৎসমূহের খোঁজ পাওয়া যায়।

প্রাচীন বাংলার স্থাপনা নির্মাণের প্রধান উপকরণ ছিল ইট। কোনো কোনো দুর্গ, প্রাকার মাটির তৈরি, বেশির ভাগই ছিল ইটনির্মিত। পাহাড়পুর ও ময়নামতির কোনো কোনো স্থাপনায় প্রাচীরগাত্র পোাড়ামাটির ফলক দ্বারা অলঙ্কৃত। এ সব ফলকে সমকালীন সমাজ-সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের চিত্র লক্ষ্য করা যায়। ফলে বাংলার প্রাচীন স্থাপনা বাংলার প্রাচীন ইতিহাস রচনাকে অনেকটাই সহজ করেছে। তবে একথা সত্য, প্রাচীন বাংলার স্থাপনা অনেকটাই অনাবি®কৃত। আবিষ্কৃত হলে ইতিহাস রচনা যেমন অনেকটা সহজ ও স্বচ্ছ হয়ে যেতো, আবিষ্কারের অভাবে তা অন্ধকারে বস্তু খোঁজার মতই ধারণাপ্রসূত হয়ে যায়। বাঙালি সমাজের প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যকে জানার প্রচেষ্টা অনেকটাই অপ্রতুল। বাঙালির প্রাচীন ইতিহাস রয়ে গেছে লুক্কায়িত। অন্ধকারে থেকে গেছে বাংলার গভীর পলিমাটি, নতুন গড়ে ওঠা বসতি এবং পরিত্যক্ত ও জঙ্গলময় ভূমির নিচে বহু প্রাচীন জনপদের চিহ্ন। অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে সে যুগের মানুষের ব্যবহৃত উপকরণসমূহ।

ভাস্কর্য, মৃৎশিল্প, ধাতব শিল্প ইত্যাদি নিদর্শনের মাধ্যমে প্রাচীন বাংলার অর্থনৈতিক সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থা সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করা সম্ভব। প্রাচীন বাংলায় চারু ও কারু শিল্পের যে নিদর্শন তা সকালীন সমাজের উত্তবিত্ত শ্রেণির মানুষের এবং শাসক শ্রেণির আর্থিক সমৃদ্ধি ও রুচির পরিচায়ক। চারু ও কারু শিল্পে সে সময়ের এক শ্রেণির মানুষের সামাজিক তথ্য ফুটে ওঠে। এ ছাড়াও চারু ও কারুকলার বহু নিদর্শন হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মের বিষয়বস্তুকে চিত্রিত করে।

প্রাচীনকাল হতে বাংলায় চিত্রাঙ্কনের চর্চা থাকলেও পাল যুগের পূর্বেকার কোনো চিত্র এখনো পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত। ফা হিয়েন তাম্রলিপ্তির বৌদ্ধবিহারে অবস্থানকালে বৌদ্ধমূর্তির ছবি আঁকতেন বলে জানা যায়। সাধারণত মন্দির ও বৌদ্ধবিহার প্রভৃতির প্রাচীরগাত্র চিত্রদ্বারা শোভিত করা হতো বলে পরবর্তীকালের শিল্পশাস্ত্রের অনুশাসনে বর্ণনা পাওয়া যায়। সুতরাং বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাচীনকাল হতেই চারুকারু শিল্প পরিচিত ছিল এ কথা অনুমান করা যায়। একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে পাল আমলে লিখিত কয়েকটি বৌদ্ধ গ্রন্থের পুঁথিতে অঙ্কিত বজ্রযান-তন্দ্রযান-মতোক্ত দেবদেবীর ছবি আবি®কৃত হয়েছে। পাল আমলের এই চিত্রগুলোই প্রাচীন বাংলার চারুকারু শিল্প আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু। এই চিত্রগুলো ছিল রেখার সাহায্যে অঙ্কিত।

ভাস্কর্যশিল্প মূলত দেবদেবীর প্রতিমার-ই নিদর্শন। তিব্বতীয় লামা তারানাথের বর্ণনায় রয়েছে, ধীমান ও তার পুত্র বিৎপালো প্রস্তুর ও ধাতব মূর্তি গঠনে এবং চিত্রাঙ্কনে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তাঁদের একটি স্বতন্ত্র শিল্পী সম্প্রদায়গোষ্ঠী ছিল। বিজয় সেনের দেওপাড়া প্রশস্তিতে এই এই শিল্পী সম্প্রদায়গোষ্ঠীর উল্লেখ রয়েছে। তাঁরা ভাস্কর্য নির্মাণে বিশেষ পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

প্রস্তর ও ধাতুর সাহায্যে ভাস্কর্য নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে তৎকালে অর্থশালী শ্রেণি কিংবা শাসকরাই ভাস্কর্য নির্মাণ করতেন। শিল্পীগণ উচ্চবিত্ত শ্রেণির ব্যয় নির্বাহে তাঁদের নির্দেশন মোতাবেক এই সমস্ত ভাস্কর্য নির্মাণ করতেন। শিল্পীগণ তাঁদের এই শিল্পী পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সাধারণত: এই শিল্পীগণ তাঁদের সৃষ্টিকর্মে উচ্চবিত্ত শ্রেণির সৌন্দর্যবোধ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের আবেগের প্রতিফলন-ই ঘটাতেন। ধনী, অভিজাত ও উচ্চবিত্ত মানুষের অনুগ্রহে, আগ্রহে ও পৃষ্ঠপোষকতায় পরিপুষ্ঠ এইসব শিল্পীর শিল্প রচনা সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষের মনোরঞ্জন ও প্রয়োজনের অনুকূলে হলেও

শিল্পীদের দক্ষতা ও সচেতনতায় সমকালীন সমাজের মানুষের রুচিবোধ, পোশাক-পরিচ্ছদ, অলঙ্কার প্রভৃতির একটি সার্বিক সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে। চারু ও কারুশিল্পের নিদর্শনসহ গৃহস্থালি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত নানাবিধ উপকরণ প্রাচীন বাংলার সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার উৎস হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গুপ্তপরবর্তী তাম্রশাসন, শিলালিপি কিংবা সাহিত্য হতে প্রাচীন বাংলার নগর-বন্দর, কারুকার্যখচিত রাজপ্রাসাদ, মন্দির ও আশ্রমের কথা জানা যায়। এছাড়া পঞ্চম শতাব্দীতে বাংলায় আগমনকারী চৈনিক পর্যটক ফাহিয়েন এবং সপ্তম শতাব্দীতে আগমনকারী হিউয়েন সাং এখানে অসংখ্য আশ্রম, মন্দির ও স্তুপ দেখতে পেয়েছিলেন। সেকালের সাহিত্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে এ সমস্ত মন্দির ছিল ভূ-ভূষণ, পর্বতশৃঙ্গস্পরা, স্বর্ণকলসশীর্ষ, মেঘবর্ত¥াবরোধী। দুর্ভাগ্যের বিষয় এ সকল মন্দির বা স্তুপের কয়েকটি ধ্বংসাবশেষ ছাড়া এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাই প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য শিল্প, ভাস্কর্য ইত্যাদি সম্পর্কে ইতিহাসের উৎস একান্তই অপর্যাপ্ত।

ভারত উমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন হলো স্তুপ। বৈদিক যুগে মানুষের দেহাবশেষ পুঁতে রাখার উদ্দেশ্যে শ্মশানের ওপর মাটির স্তুপ তৈরি করা হতো। বৌদ্ধধর্মে স্তুপের প্রচলন দেখা যায়। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে তিন প্রকারের স্তুপ রয়েছে। এক- শরীর ধাতু স্তুপ: এই শ্রেণির স্তুপে বুদ্ধদেব ও তাঁর শিষ্যদের দেহাবশেষ রাখা হতো এবং তা পুজো করা হতো। দুই- পরিভোগিক স্তুপ: এই শ্রেণির স্তুপে বুদ্ধদেবের ব্যবহার করা জিনিসপত্র রাখা হতো এবং পুজো করা হতো। তিন- নির্দেশিকা বা উদ্দেশিক স্তুপ: বুদ্ধবে ও বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত কোনো জায়গা বা ঘটনাকে চিহ্নিত বা পাওয়া যায়, এটিই হলো নিবেদন স্তুপ। বৌদ্ধরা তীর্থস্থানে পুজো দিতে এসে ভক্তি ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে স্তুপ নির্মাণ করতেন। বৌদ্ধধর্ম বাংলার যেখানেই বিস্তৃত হয়েছে সেখানেই স্তুপ নির্মিত হয়েছে। হিউয়েন সাং বাংলার কয়েকটি স্থানে স্তুপ দেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলার বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট ব্রোঞ্জ ও পাথরের স্তুপের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয় যায়।

প্রাচীনকাল হতে বাংলায় জৈন ও বৌদ্ধ ভিক্ষুক সংঘরাম ও বিহার তৈরি করে নিজ নিজ ধর্ম প্রচার করতো। ধীরে ধীরে ধর্মীয় অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ইটের তৈরি বিহার নির্মিত হতে থাকে। তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরে একটি জৈন বিহারও ছিল, তবে এর আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত সোমপুর মহাবিহার বিখ্যাত একটি বিহার। রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরে এর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃৃত হয়েছে। এর কক্ষ সংখ্যা ছিল ১৭৭টি। ধর্মপাল এই বিহারটির নির্মাতা। তিনি বিক্রমশীল বিহার ও তদন্তপুর বিহার নামে আরো দুটি বিহার নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া পাল আমলে তৈরি ছোট বড় আরো কয়েকটি বিহারের নাম পাওয়া যায়। যেমন নওগাঁর জগদ্দল বিহার, দেবীকোট বিহার, চট্টগ্রামের পন্ডিত বিহার, ত্রিপুরার কনকস্তুপ বিহার প্রভৃতি। ময়নামতিতেও কয়েকটি বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে।

প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাসে মন্দির স্থাপত্য মর্যাদা ও স্বকীয়তায় এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে। প্রাচীনকালে বাংলায় অগণিত মন্দির নির্মিত হয়েছিল। প্রাচীন সাহিত্য, পুঁথি ইত্যাদিতে মন্দির সম্পর্কে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে মনে হয় এই মন্দিরগুলো অবস্থিত ছিল পুন্ড্রবর্ধন সমতট, রাঢ়, বরেন্দ্র প্রভৃতি অঞ্চলে। এই সকল মন্দির আজ বিলীন হয়েছে, তবে অষ্টম শতকের কয়েকটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়।

ভাস্কর্যের ইতিহাস বাংলায় বেশ সমৃদ্ধ। ভাস্কর্য নির্মাণ বহু প্রাচীনকাল হতেই প্রচলিত ছিল। গুপ্তযুগে বাংলার শিল্পীগণ যে ভাস্কর্য নির্মাণ করতেন তার উপকরণ শক্ত না হওয়ার কারণে বেশির ভাগই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পুস্করনা, তমলুক, মহাস্থান প্রভৃতি অঞ্চলে গুপ্তপূর্ব যুগের কয়েকটি পোড়ামাটির মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর মান ততটা উন্নত নয়। গুপ্তযুগে প্রাপ্ত মূর্তিগুলো অপেক্ষাকৃত উন্নত ছিল। গুপ্তযুগে বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য দেখা যায়।

পালযুগের ভাস্কর্য শিল্প অনেক উন্নতমানের। নবম শতাব্দী হতে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত শিল্পকে পালযুগের শিল্প বলা হয়। এই সময়ের ভাস্কর্য শিল্প এতটাই উন্নত অবস্থায় পৌঁছেছিল যে পরবর্তী সেন আমলেও এই ভাস্কর্যশিল্পের নির্মাণধারা অব্যাহত ছিল।

পোড়ামাটির শিল্পেও বাংলা ছিল বেশ উন্নত। বাংলায় অতি প্রাচীনকাল হতে পোড়ামাটির শিল্প ছিল জনপ্রিয়। এ কথা উল্লেখ্য যে, বাংলায় পর্যাপ্ত পাথর না থাকায় পোড়ামাটির শিল্প বিকল্প হিসেবেই জনপ্রিয় হতে শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক হতে খ্রিস্টাব্দ দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতক পর্যন্ত সমগ্র গঙ্গা-যমুনা উপত্যাকা ও মধ্যভারত জুড়ে পোড়ামাটির শিল্প প্রচলিত ছিল। পা-ুরাজার ঢিবিতে বাংলার পোড়ামাটির শিল্পের শুরু হয়েছিল বলে আধুনিক গবেষণায় প্রতীয়মান হয়। পরবর্তী পর্যায়ে চন্দ্রকেতুগড় এবং তাম্রলিপ্তির পোড়ামাটির শিল্প বিকাশ লাভ করে।  প্রাচীন পু-্রবর্ধন, তমলুক, মহাস্থান প্রভৃতি স্থানে পোড়ামাটি শিল্পের কিছু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া দিনাজপুর জেলার বানগড়ে কোটীবর্ষ নগরীর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা বিভাগের তত্ত্বাবধানে এখানে খননকার্যের ফলে এখানে কিছু পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে। এগুলো মৌর্যযুগের বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কর্ণসুবর্ণের ধ্বংসাবশেষ হতে যে পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে তা ষষ্ঠ শতকের বলে ধারণা করা যায়। এছাড়া পাহাড়পুরেও পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে। কুমিল্লার ময়নামতি ও লালমাই পর্বতে প্রচুর পরিমানে পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে। এ ফলকগুলোর মধ্যে নানারূপ দেবদেবী, নারীপুরুষ ও পশু পাখির মূর্তি রয়েছে।

প্রাচীন বাংলায় চিত্রাঙ্কন চর্চা হতো। এ সময় মন্দিরের দেয়াল সুশোভিত করার জন্য চিত্রাঙ্কনের ধর্মীয় বিধান ছিল। তাই বাংলার মন্দিরগুলো ও বিহারের গাত্রে যে চিত্রাঙ্কন ছিল তা সহজেই অনুমেয়। বাংলায় প্রাচীনকালের কমপক্ষে ৬০টি চারুকলার চিত্র পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সবগুলোই বৌদ্ধগ্রন্থের চিত্রলিপি। এগুলো দশম থেকে দ্বাদশ শতকে অঙ্কিত বলে ধরা হয়। এ চিত্রগুলোর মধ্যে দুটি বা তিনটি শোভাবর্ধক চিত্র। অন্য চিত্রগুলো তাল পাতায় অঙ্কিত। দেবদেবীর আকৃতি প্রথমে আঁকা হতো ও পরে সেগুলো রং করা হতো। এ সময় সাধারণত সাদা, হলুদ, লাল এবং কালো রং ব্যবহৃত হতো। এর পাশাপাশি রঙগুলোর সমন্বয়ে মিশ্র রঙেরও ব্যবহার হতো। চিত্রশিল্পকর্মের শিল্পীরা মূর্তিতত্ত্বের আদর্শ অনুসরণ করতেন। চিত্রকর্মের মূল বিষয়বস্তু ছিল মূলত বুদ্ধের জীবন ও বৌদ্ধতান্ত্রিক দেবদেবী। পা-ুলিপির অঙ্কিত চিত্রগুলো পুর্বাঞ্চলীয় শিল্পরীতির অন্তর্ভূক্ত ছিল। এ রীতিটি ভারতের গুপ্তরীতি থেকে বিকশিত হয়েছিল।

কৃষি অর্থব্যবস্থা প্রাচীন বাংলার জীবনকে আলোড়িত করলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিল্পব্যবস্থা তথা কুটিরশিল্প সমকালীন সমাজজীবনের অর্থনীতি ও সৌন্দর্যবোধকে প্রভাবিত করেছে। প্রাচীন বাংলার কুটির শিল্প বলতে হস্তশিল্পই প্রধান। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও বাংলার বিখ্যাত বয়নশিল্প সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়। বঙ্গ এবং পুন্ড্রে চার প্রকার বস্ত্রশিল্প ছিল বলে জানা যায়। উন্নত ও মসৃণতর বস্ত্রের প্রকরণ ছিল দুকূল। দুকূল সম্পর্কে কৌটিল্যের অর্থশান্ত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘বঙ্গকং শ্বেতং দুকলম।’ অর্থাৎ বঙ্গের দুকূল উন্নতমানের মসৃণ শ্বেত। পুন্ড্রের দুকূল শ্যাম ও মনির মতো স্নিগ্ধ। পূর্ব ও উত্তরবঙ্গে দুকূল উৎপন্ন হতো। এই বস্ত্রের সৌন্দর্যে বিমোহিত হতো সে সময়ের মানুষ। সমকালীন মানুষের রুচিবোধের পরিচায়ক ছিল এই বস্ত্র।

রেশম বস্ত্রকে প্রাচীন বাংলায় পত্রোর্ণ বলা হতো। মগধ, পুন্ড্রদেশ ও সুবর্ণকুড্যে পত্রোর্ণ জন্মাতো। সুবর্ণকুড্যের অবস্থান সম্পর্কে জানা যায় না। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্ণসুবর্ণকেই সুবর্ণকুড্য বলে অভিহিত করেছেন। কর্ণসুবর্ণের অবস্থান বলতে মুর্শিদাবাদ থেকে রাজমহলের মধ্যবর্তী অঞ্চল বুঝায়। বর্তমানেও এখানে রেশম ভালো উৎপন্ন হতো। সে সময় বাংলায় রেশম চাষ হতো নাগবৃক্ষ, লিকুচ, বকুল ও বটগাছ থেকে। এগুলো থেকে বিভিন্ন রঙের রেশম পাওয়া যেতো। যেমন নাগবৃক্ষের পোকা থেকে হতো হলুদ রঙের রেশম, লিকুচের পোকা থেকে উৎপন্ন হতো গমবর্ণের রেশম আবার বকুলের পোকা থেকে ননীর মতো রেশম পাওয়া যায়। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, রেশম শিল্প প্রাচীন বাংলার দেশীয় শিল্প। তুঁত মাধ্যমে যে রেশম শিল্প তা চীন থেকে আগত। এ থেকে যে রেশম উৎপন্ন হয় তা একই রঙের। বহু রঙে রাঙাতে হলে একে আলাদাভাবে রঙ দিতে হয়। পরবর্তীতে চীনের তুঁত থেকে রেশম উৎপন্ন বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রাচীন বাংলায় কার্পাস বস্ত্র অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। পরবর্তী সুলতানি, মুঘল ও ইংরেজ যুগে কার্পাস বস্ত্রকেই মসলিন বলা হতো। বাংলার এই মসলিন শিল্প পৃথিবীর সকল স্থানেই ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে রোম সাম্রাজ্যে কার্পাসের কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, পেরিপ্লাস ইত্যাদি গ্রন্থ ছাড়াও চীন, আরব এবং ইতালীয় রচয়িতাদের রচনায়ও বাংলার এই কার্পাস শিল্পের বর্ণনা দেখা যায়। বস্ত্র উৎপাদনে এশিয়া মহাদেশের বিখ্যাত সাতটি স্থানের মধ্যে বঙ্গ ছিল অন্যতম।

গ্রিক নাবিক রচিত গ্রন্থ চবৎরঢ়ষঁং ড়ভ ঃযব ঊৎরঃযধবধহ ঝবধ তে উল্লেখ দেখা যায় যে, বাংলার মসলিন কাপড় বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। সমসাময়িক ও পরবর্তী আরব বণিকদের রচনাতেও বাংলার এই সুনিপুণ মিহিন বস্ত্রের উচ্চ প্রশংসা রয়েছে। এই সময়ের মানুষের রুচি ও সৌন্দর্যবোধকে জানা যায় এই বস্ত্রের সুনিপুণতায়।

এই বস্ত্র সূক্ষ্ম ও মসৃণতায় এতই সুনিপুণ ছিল যে, এই কাপড়ের একটি পোশাক একটি অঙুরির মধ্য দিয়ে সহজেই এপাশ ওপাশ নেয় যেত। পর্যটক সোলায়মান বলেন যে, এ ঘটনা কোনো শোনা ঘটনা নয়, নিজের চোখেই দেখা। ত্রয়োদশ শতকে, পর্যটক হিসেবে আগমনকারী মার্কোপোলো বাংলায় কার্পাস উৎপাদন এবং কার্পাস বস্ত্রের লাভজনক ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন।

বস্ত্রশিল্প ছাড়াও প্রাচীন বাংলায় বিভিন্ন শিল্প ছিল এবং এ ধরনের শিল্প গুণে ও মানে অনেক উন্নতাবস্থায় পৌঁছেছিল। প্রাচীন বাংলায় যে শিল্পগুলো বেশ নাম করেছিল সেগুলো হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন আকারের প্রাচীন মৃৎপাত্র, সুন্দর সুন্দর প্রতিকৃতিযুক্ত পোড়ামাটির ফলক, বিভিন্ন ধরনের ধাতুনির্মিত শিল্পকর্ম, যুদ্ধাস্ত্র, অষ্টধাতু ও প্রস্তরনির্মিত বিভিন্ন ভাস্কর্য। প্রাচীন বাংলার গহনা শিল্পও কারুকার্যের সুনিপুণ উন্নততর পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল।

প্রাচীন বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে স্বর্ণ ও রৌপ্যশিল্পের অবদান ছিল ব্যাপক একথা সহজেই ধারণা করা যায়। সোনা ও রূপার ব্যবহারসংক্রান্ত বিষয়াবলি প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন তাম্রলিপি ও সাহিত্যে পরিলক্ষিত হয়। সমকালীন বাংলার বিত্তশালী সমাজে সোনা, রূপা, মনিমুক্তা ও হীরা এবং বিচিত্র দ্যুতিময় প্রস্তুরখচিত নানা রকমের অলঙ্কারাদি বেশ জনপ্রিয় ছিল। সে সময়ের প্রস্তুতকৃত দেবদেবীর অলঙ্করণ দেখলে একথা প্রমাণিত হয়। মিনহাজ সিরাজের তবকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, বাংলার সেন বংশীয় শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেন সোনা ও রূপার থালায় ভোজন করতেন। মধ্যযুগের বিভিন্ন সাহিত্যেও দেখা যায় যে, প্রাচীন বাংলার বণিক, সাধু ও সওদাগরেরাও সোনারূপার থালায় আহরাদি সম্পন্ন করতেন।

সন্ধ্যাকরনন্দী রচিত রামচরিত কাব্যে সমকালীন বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কারাদি বিশেষ করে মনিময় ঘুঙ্গুর মুক্তা, হীরা ও বিচিত্র সব প্রস্তরখচিত অলঙ্কারাদির উল্লেখ দেখা যায়। বিজয় সেনের দেওপাড়া লিপি, লক্ষ্মণসেনের নৈহাটি তাম্রলিপি ও অন্যান্য বহু তাম্রলিপিতে দেবদাসী, রাজান্তপুরের নারী ও পরিচারিকাদের মূল্যবান অলঙ্কারসজ্জার উল্লেখ রয়েছে।

বিজয়সেনের দেওপাড়া প্রস্তরলিপি হতে জানা যায়, প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন রাজার ব্যক্তিগত সেবকের স্ত্রী ও মন্দিরের দাসসাসীরা যে অলঙ্কার পরিধান করতেন তা ছিল-দামি পাথরের তৈরি ফুল, গহনা, কানের দুল, পায়াবন্ধনী, বাজুবন্ধনী এবং স্বর্ণের তৈরি হস্তবন্ধনী অন্যতম। বল্লাল সেনের নৈহাটি তাম্রলিপি পাঠে জানা যায় যে, রাজবংশীয় রমণীরা তখন মুক্তাহার গলায় পরিধান করতেন। তখনকার উচ্চবংশীয় রমণীদের অলঙ্করণ সম্বন্ধে রামচরিতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় মূল্যবান পাথরখচিত পায়াবন্ধনী, হীরার তৈরি অনন্যসুন্দর অলঙ্কার সামগ্রী, নীলকান্ত পাথর খচিত অলঙ্কার মুক্তো, লাল পাথরখচিত অলঙ্কার এবং অন্যান্য সৌন্দর্য্য বর্ধনকারী  সামগ্রী পাওয়া যেতো। এ সমস্ত অলঙ্কার সেন আমলে ব্যবহারের বহু নিদর্শন পাওয়া যায়। মিনহাজ উদ্দীন সিরাজ তাঁর তবকাত-ই নাসিরীতে লক্ষণসেনের রাজপ্রাসাদে স্বর্ণ ও রৌপ্যনির্মিত বাসন ও তৈজষপত্র ব্যবহারের উল্লেখ আছে।

প্রাচীন বাংলার অপরাপর অন্যান্য শিল্পদ্রব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল লৌহশিল্প। প্রাচীন তাম্রলিপিতে কর্মকার শ্রেণিকে রাজপাদোপজীবী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। রাজপাদোপজীবীরা লৌহ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ার ও অস্ত্র তৈরি করতো। একথা সর্বজন বিদিত যে, বাংলা হচ্ছে কৃষি প্রধান অঞ্চল। কৃষি কাজের উপযোগী করে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও হাতিয়ার তৈরির মুল উপাদান হলো লৌহ। লৌহ থেকে দা, কুড়াল, কোদালি, খন্তা, খুড়পি, লাঙল ইত্যাদি তৈরি করা হতো। ইদিলপুর তাম্রলিপিতে লৌহনির্মিত অতি সুন্দর জলপাত্রের বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়াও যুদ্ধ বিগ্রহের জন্য লৌহনির্মিত অস্ত্রশস্ত্র তৈরি হতো। যেমন তীর, বর্শা, তলোয়ার ইত্যাদি। অগ্নিপুরাণ থেকে জানা যায় যে, প্রাচীন বাংলার অঙ্গ ও বঙ্গে তলোয়ার ছিল প্রসিদ্ধ ও সৌন্দর্যের প্রতীক।

প্রাচীন বাংলায় মৃৎশিল্পও ছিল অনেক বিখ্যাত। সে সময় যারা এ পেশার সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের কুম্ভকার বলা হতো। কুম্ভকার পেশা ছিল অনেকটা গ্রামকেন্দ্রিক। কাঁচা মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুন্দর সুন্দর থালা, বাটি, জলপাত্র, রন্ধনপাত্র, দোয়াত, প্রদীপ ইত্যাদি তৈরি করা হতো এবং পুড়িয়ে এগুলোকেই প্রয়োজনীয় উপকরণ পাত্র এবং সৌন্দর্যবর্দ্ধনকারী পাত্র হিসেবে প্রস্তুত করা হতো। ছোট ছোট ঘোড়া, পুতুল এখনো বাংলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে ঘাটে ছড়িয়ে থাকে। এ সমস্ত উপকরণের ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন নগর পাহাড়পুর, মহাস্থান, ময়নামতি এবং অন্যান্য প্রতœতাত্বিক খননস্থল থেকে বিপুল পরিমান উদ্ধার হয়েছে। এ সকল উদ্ধারকৃত কারুকার্যপূর্ণ উপকরণের মাধ্যমে সে সময়ের মৃৎশিল্পের উন্নততর অবস্থার কথাই প্রমাণ করে। এ সময়ে পুজোর জন্য মাটির ভাস্কর্য তৈরিতে পটু একটি শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। তাম্রলিপি গুলোতে ভূমিদান ও ভূমি বিষয়ের উল্লেখ আছে।

তামা প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত একটি ধাতব পদার্থ। তাম্রলিপি, তামাজুরি প্রভৃতি নামের সঙ্গে তামার কোনোরূপ সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে এ সময় তামার পাতের উপর তাম্রশাসন বা তাম্রলিপি রচিত হতো। সুতরাং বলা যায় প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে তামার ব্যবহার গুরুত্ব পেয়েছিল। তাম্রলিপি কিংবা তামাজুরি স্থানে তামার উৎপাদন সম্ভাবত ছিল বলে ধারণা করা যায়। কোনো কোনে তাম্রলিপিতে সুত্রধরের উল্লেখ দেখা যায়। প্রাচীন তাম্রলিপিগুলো তাঁরা খোদাই বা উৎকীর্ণ করতেন। পরবর্তীতে সূত্রধরের ধারণা পরিবর্তন হয়েছে। খ্রিষ্টিয় পঞ্চম থেকে অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত সময়ের তাম্রলিপিগুলোতে ভূমিদান ও ভূমি বিষয়ের উল্লেখ আছে।

বাংলায় হীরার খনির কথা একাধিক প্রাচীন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে পুন্ড্র ও বঙ্গদেশে হীরার খনি ছিল বলে জানা যায়। হীরার খনির কথা আইন-ই-আকবরী গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং ধারণা করা যায় যে, মুঘল যুগ পর্যন্ত বাংলায় হীরার খনিতে হীরা পাওয়া যেতো। এ সকল হীরার খনি বিহার সীমান্তে অবস্থিত কোখরা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সম্্রাট জাহাঙ্গীরের সময় কোখরায় বেশ কয়েকটি হীরার খনির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। পেরিপ্লাস গ্রন্থে বাংলায় মুক্তোর কথা রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে গঙ্গানদীর তটে অবস্থিত গঙ্গা নগরীতে মুক্তো বিক্রয় হতো।

প্রাচীন বাংলায় কাঠে ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। কাঠ পচনশীল হওয়ার কারণে প্রাচীনকালের কাঠের ব্যবহারের যথেষ্ট উদাহরণ বর্তমানে দেখা যায় না। কিছু কাঠের তৈরি স্তম্ভ, খিলান, খুঁটি ইত্যাদি যে এখনো পর্যন্ত বিদ্যমান হয়েছে তাতে অনন্য কারুকাজ প্রাচীন বাংলার কাষ্ঠশিল্পের উপর নতুন ধারণার উদ্রেক করে। প্রাচীন বাংলার এ ধরনের কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেখা যায় ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে। কাঠ দিয়ে এ সময়ে আরো যে সব নির্মাণ করা হতো তা হচ্ছে কাঠের তৈরি ঘরবাড়ি, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য আসবাবপত্র, মন্দির, পালকি, গরুরগাডি, রথ, নৌকা ইত্যাদি। এ সমস্ত দিক থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, প্রাচীন বাংলায় কাঠের শিল্প এবং কাষ্ঠশিল্পীর কী প্রয়োজন ও চাহিদা ছিল তৎকালীন সমাজে। বিজয় সেনের দেওপাড়া তাম্রলিপিতে খোদাইকর রানক শূলোপানি উল্লেখ করেছেন, ‘বারেন্দ্রক শিল্পীগোষ্ঠী চুড়ামনি’। এ থেকে সমকালে কাষ্ঠশিল্পীদের সমাজে অবস্থান সম্পর্কে সহজেই ধারণা পাওয়া যায়।

প্রাচীন বাংলায় বহু শিল্প, কারুকাজ ও পেশার উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন সাহিত্যে ও তাম্রলিপিতে। এ সময়ের কারুশিল্প ও হস্তিদন্তশিল্প সমাজে প্রচলিত ছিল। এছাড়াও শঙ্খশিল্প, কাংস্যশিল্প এবং স্বর্ণশিল্পও সে সময়ে ছিল উল্লেখযোগ্য।

 

ড. আবু নোমান

সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ

রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী

প্রাচীন বাংলার নাগরিক জীবনে শিল্প ও সৌকর্য

ড. আবু নোমান এখন প্রাচীন বাংলার যে স্থাপত্যগুলো পাওয়া সম্ভব সেগুলোকে প্রত্মতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ বললেও বলা যেতে পারে। স্থাপনা সমাজের সভ্যতার একটি অন্যতম নিদর্শন বা উপাদান।

বৈষম্যমূলক কোটা প্রথায় মেধাবীরা বঞ্চিত হবে (সম্পাদকীয়- জুলাই ২০২৪)

সরকারী চাকরীতে কোটা প্রথা কোন ভালো বা গ্রহণযোগ্য প্রথা হতে পারেনা। এতে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়। প্রশাসনে মেধাবীর চেয়ে অমেধাবীর আধিক্য বেশী বলে রাষ্ট্রীয় কাজে

আহমদ ছফা বনাম হুমায়ূন আহমেদ

মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ তখন আহমদ ছফার পিছন পিছন ঘুরতেন। লেখক হুমায়ূন আহমেদ-কে প্রতিষ্ঠার পিছনে যে আহমদ ছফার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, সে কথা