এখন সময়:সন্ধ্যা ৬:২৮- আজ: বুধবার-২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:সন্ধ্যা ৬:২৮- আজ: বুধবার
২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

অচেনা সময়

সৈয়দ মনজুর কবির

সকাল সকাল একি বিপত্তি! এতো সুন্দর ঝাঁ চকচকে ট্রেনটা অথর্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে| নির্বিকার, অসহায় ভাবে – যেন ওর কিচ্ছু করার নেই| আসলেই তাই, ওর মানে এইতো মাস ছয়েক আগে সেই জার্মান থেকে আসা লোকোমটিভ ইঞ্জিনটার| ইনি&জনটা ঘন্টা খানেক আগেও ভালোই চললো| নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে ঠিক সময়েই এলো| আবার ঠিকঠাক ইঞ্জিন ঘুরে গিয়েও ল¤^া বগিগুলোর পিছনে গিয়ে যুক্ত হলো| ট্রেনের গতিপথের দিক পরিবর্তিত হলো – প্রস্তুত ঢাকা ছাড়বে নির্দিষ্ট সময় সকাল ৬.৩০ এ| সবই যখন ঠিক তখনি হলো বিপত্তিটা ৬টা ১৫ মিনিটে| ইঞ্জিন বন্ধ করা হয়েছে, তা এখনো পূনরায় চালু হচ্ছে না| বেশ কিছু কর্মকর্তাকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটোছুটি করতে দেখছে মিতু| চোখে মুখে স্পষ্ট ভয়ার্ত লক্ষণগুলো ফুটে উঠেছে| ও মনে মনে শক্তি সঞ্চয় করে সামনে হেঁটে যাওয়া এক লোককে জিজ্ঞাসা করলো, ভাই, কি হয়েছে?  ট্রেন ছাড়ছে না কেনো?

লোকটির চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ| ওভাবেই বললো, আর কি ঝামেলার শেষ আছে| এই কমলাপুর স্টেশনে আসবার সময় কুড়িল বিশ^রোডের রেল ক্রসিংয়ে এ ট্রেন একজনকে কেটে দু’টুকরো করে এসেছে| তাই হাজারো ঝামেলা এসে হাজির| এখন যতসব অফিশিয়াল ঝামেলা দূর হবে তারপর ট্রেন ছাড়বে|

মিতু আরেকটু ভয় পেয়ে যায়| মুখ হঠাৎই শুকিয়ে যাচ্ছে| কোনোমতে বলে, তা ভাই, কতক্ষণ লাগতে পারে?

লোকটি সেই বিরক্তির ছাপ নিয়েই বলে, একজন বড় অফিসারের সিগনেচার এর অপেক্ষায় আছে| উনি এলেই হয়তো ট্রেন ছাড়বে|

 

 

হয়তো কথাটা শুনে মিতু ভয়ে চুপ মেরে যায়| মনে এলোমেলো ভাবনা ছুটতে থাকে| হয়তো তো একটা অনিশ্চয়তা!

মিতু সেই ভোরের আলো ফুটতেই স্টেশনে এসে হাজির| উদ্দেশ্য যত দ্রুত এই ঢাকা শহর ত্যাগ করা যায়| ভোর থেকেই গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরম শুরু হয়ে গেছে| স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা বসে বসে মৃদু ঘামের উপস্থিতি টের পাচ্ছে| কিন্তু, মিতুই একমাত্র ব্যাতিক্রম| ওর শরীর ঠান্ডায় হিম শীতল| আসলে তার এই শীতলতা এসেছে চার ঘন্টা আগে ঘটে যাওয়া সেই বিবর্ণ ঘটনার জন্যই| এর জন্য ও ইদানীং নিজেকেই দায়ী করে| কলেজে পড়ার শুরুতেই কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সুদর্শন তরুণটিকে নিজের অজান্তেই এক টুকরো মিষ্টি হাসি উপহার দিয়েছিলো| সেই হাসিই পরিশেষে ওর বর্তমান বিবর্ণ পরিস্থিতির জন্য দায়ী| কারন ওই হাসি উপহার দেয়ার ব্যাপারটা ও আরো দিন আটেক দিয়েছে উচ্ছ্বসিত হয়ে|

আর ছেলেটির সাহসও কম ছিলো না| সে নবম দিনে মিতুকে উপহার দেয় একটা রক্ত রঙা গোলাপ আর বলে, এটা আপনার জন্য| মিতুর সেদিন প্রথম হৃদয় কাঁপলো অজানা শিহরণে| বড় বড় চাহনিতে  কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলে, কি? কি আমার জন্যে?

এই যে, এই ফুলটা| ছেলেটির সলজ্জ উত্তর|

ছেলেটির সে এক মন ভুলানো মিষ্টি হাসিতে মিতুর মন আঁটকে যায়| মনে হয় এমন হাসিমুখ ও অনেক বার ¯^প্নে দেখেছে| হঠাৎ মনের গভীরে এক প্রচন্ড আবেগ সাগরের ঢেউয়ের মতো উথলে উঠে| ও খুব ¯^াভাবিক ভাবেই ডান হাত বাড়িয়ে দেয়| আর এই হাত বাড়িয়ে দেয়াই মিতুকে নিয়ে যায় হাসি মুখের ওই ছেলেটির সাথে রেজিস্ট্রি অফিসে বিয়ের আইনানুগ ব্যবস্থা পর্যন্ত| ছেলেটির নাম অনিক| প্রথম মাস চারেক চলে ভালোলাগা আর বিভিন্ন উপহার দেয়া নেয়া| তবে মিতু ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে অনিক ড্রাগ এডিক্টেড| সে নিজে বাবার অমতে বিয়ে করে ফেললেও অনিকের বাবা মা কিন্তু ভীষণ খুশি হন| মিতু প্রথমে সেটা বুঝতে না পারলেও পরে বুঝতে পারে তার কারণ| অনিক শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয়ে কম্পিউটার সাইন্সে সেকেন্ড ইয়ারের পরপরই হঠাৎ ঢাকার বাসায় ফিরে আসে| দু দিনেই বাবা মা দুজনেই বুঝে ফেলেন ছেলের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে, সে আর আগের অনিক নয়| সারাক্ষণ অস্থির থাকে| দশ বারো দিন পর বলে – সে আর পড়ালেখা করবে না| সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরেফিরে অনেক রাতে ঘরে ফিরে| মাস পাঁচেক পরে একদিন মাকে বলে,  আম্মু আমি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছি| তোমরা এ্যালাও করলে কাল ওকে বাসায় নিয়ে আসবো| আর না করলে আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো|

প্রথম কথাটা শুনে মা মনে মনে ভীষণ খুশি হয়ে যান| কেননা এই সিদ্ধান্ত তারা অনিকের অগোচরে পারিবারিক ভাবে আগেই  নিয়েছে যে ওকে বিয়ে দিতে হবে| অনিক তাদের একমাত্র ছেলে| সিলেটে যাবার আগ পর্যন্তও ও ছিলো তাদের শান্ত, একান্ত বাধ্য| আর ওখান গিয়ে হঠাৎ পরিবর্তন| বাজে সঙ্গের সাথে মিশে বাজে জিনিসে আসক্ত হয়ে গেছে| হঠাৎ রেগে যায় আর ভাঙাচোরা শুরু করে সামান্য কথায়| কোথায় কোথায় চলে যায়, ওর খেয়াল খুশি মতো চলে – কেমন যেনো ছন্নছাড়া জীবন|

মা ভাবেন, ওকে যেভাবেই হোক ¯^াভাবিক করতেই হবে|  এ বিয়েতে হয়তো সে বিপথ থেকে ফিরে আসবে| মনের খুশির কথা প্রকাশ করলেন না মা| শুধু বললেন, এটা কি বলছিস? বলা নেই কওয়া নেই হুটকরে বিয়ে করলেই কি হলো? মেয়ে কে?  কেমন দেখতে? আচার ব্যবহার, পরিবার পরিজন কেমন?

এ কথায় অনিক হঠাৎ রেগে যায়| বলে, আম্মু, শোনো, মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে| এটাই শেষ কথা| অন্য কোনো ইনফরমেশন জানার প্রয়োজন নাই| এক্ষুণি বলো তোমরা রাজি কিনা?

বাবা আমিতো তোকে না বলি নি| শুধু একটু জানা থাকলে ভালো হতো এই আর কি| আচ্ছা, আচ্ছা| তুই কালই বউমাকে নিয়ে আয়, আমি তোর বাবাকে বলছি|

মিতুকে পরের দিনই অনিক ওদের বাসায় নিয়ে আসে| মিতু ওর মহিলা হোস্টেল থেকে একবারে বিদায় নিয়ে নেয়| বাবা ভীষণ রেগে গেছেন| উনি মানতে পারছেন না তার আদরের বড় মেয়েটার এমন বিয়েটা| মা মেনে নিয়েছেন| কিন্তু বাবা না মানা পর্যন্ত মেয়ের আনন্দে ঢাকা আসতে পারছেন না| তাই মিতু ¯^ামীর হাত ধরে ওদের বাসায় আসতেই অনিকের মা বাবা আর আরো পনেরো ষোল জন আত্মীয় ওদের সানন্দে গ্রহন করে| মিতুর মা বাবাকে না জানিয়ে বিয়ে করাতে মনের অনেকটা অনুশোচনা কেটে যায়| অনিকের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি আরেকটু বেড়ে যায় মিতুর| কিন্তু সপ্তাহ যেতেই এ অনুভব হঠাৎ মুষড়ে পরে| অনিক প্রথম ওর ড্রাগের অভ্যস্ততার পরিচয় প্রকাশ করে| একটা অতি তুচ্ছ ঘটনায় তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে দেয়| হাতে ধরা পোরসেলিনের মগটা মিতুর দিকে ছুঁড়ে মারে| কপালে লাগে প্রচন্ড গতিতে, অল্পের জন্য বাঁ চোখটা রক্ষা পায়| কেটে গলগল করে রক্ত বেড় হতে থাকে| সেটা দেখে অনিকে কি হলো যেনো, দ্রুত ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো|

অনিকের মা তো কিছু ভাঙার শব্দ শুনেই ওদের ঘরে দৌড়ে আসেন| মিতুকে রক্তাক্ত দেখে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান| কপালে চারটা সেলাই নিয়ে বাসায় ফিরে মিতু| ওই প্রথম মিতু অনিকের অদ্ভুত আচরণে অবাক হয় আর মনের ভিতরে ডুকরে কেঁদে ওঠে| মনের অজান্তেই বাবাকে ফোন করে কাঁদতে থাকে| আদরের মেয়ের এমন কান্না শুনে বাবাও বিচলিত হয়ে পড়েন| মেয়ের দোষের কথাগুলো ভুলে সঙ্গে সঙ্গেই মিতুর মাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন| তারা অনেক অনুরোধ করেন বাড়ি ফিরে যেতে| কিন্তু অনিকের প্রতি এক আলাদ অনুভব মিতুকে তাদের সাথে যেতে দিলো না| অনিকের মা মিতুকে আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মা, আমি জানি তুমি আমাদের অনিককে পূনরায় ¯^াভাবিক করে তুলতে পারবে| আমি কথা দিচ্ছি – আমি বেঁচে থাকতে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে দিবো না|

অনিকের মায়ের দেয়া ওয়াদা আর মিতুর অসম্ভব ভালবাসায় তারপর প্রায় বছর দেড়েক কেটে যায়| চিকিৎসকের নিবিড় পরামর্শে চলতে থাকে ড্রাগ এডিকশন থেকে মুক্ত হওয়ার চিকিৎসা| মিতুর কোল জুড়ে আসে আদনান, ছোট্ট ফুটফুটে পুত্র| দেখতে দেখতে আড়াই মাস বয়স হয়ে যায় আদনানের| এতদিনের মাঝে অনিক আরো কয়েকবার নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলো| সে মুহুর্তে মিতুর স্নিগ্ধ ছোঁয়া আর ব্যবহারে অনিককে ¯^াভাবিক করা গেছে| কিন্তু আজকের ঘটনা মিতুকে বিস্মিত, পাথর করে দেয়| রাত প্রায় দুটো| হঠাৎ অনিক ঘুম থেকে জেগে অস্থির হয়ে উঠে| প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুমন্ত আদনানও জেগে উঠে কাঁদতে থাকে| কোলে আদনানকে নিয়ে মিতু অনিককে আগের মতো নিয়ন্ত্রনে আনতে হয় ব্যর্থ| আবারো হাত তোলে অনিক| মিতু চিৎকার দিয়ে অনিকের মাকে ডাক দেয়| নিজেকে কোনমতে বাঁচিয়ে আদনানকে বুকের সাথে লেপ্টে দরজার দিকে দৌড় দেয়| প্রায় উন্মত্ত অনিক নিজেকে আরো নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে| বিছানার পাশের সাইড ড্রয়ারের উপর রাখা ফ্লাওয়ার ভাসটা দিয়ে মিতু ডান হাতের পাশ দিয়ে ঝড়ের গতিতে আঘাত করে| হঠাৎ কান্নারত আদনান কান্না দেয় থামিয়ে| মিতু ডান হাতের মাঝ বরাবর তীব্র ব্যথা পেলেও সে ব্যথা ওকে ছুঁতেও পারলো না| সে শুধু বুকের মাঝে ছোট্ট আদনানের শরীরের শেষ ঝাঁকুনি অনুভব করে| বিস্ফোরিত চোখে বারবার নিশ্চুপ ছেলেকে দুহাতে ঝাঁকায়| ডান হাতের মাঝ বরাবর দিয়ে উষ্ণ তরলের বন্যা বয়ে যায়| অনিকের আঘাতটা মিতুর ডান হাতের বাহিরে বেরিয়ে থাকা আদনানের ছোট্ট মাথায় লেগেছে আর সে মুহুর্তেই ওদের বুকের মানিক এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে| মিতু দরজা কাছে গিয়েও দরজাটা খুলতে পারলো না| ওখানেই ধ্বপাস করে ফ্লোরে পড়ে যায়| তখনো আদনানকে পাগলের মতো ঝাঁকাচ্ছেই| অনিকের মাঝে আগেও যেমন প্রতিক্রিয়া হয় ঠিক তেমনি আজকেও হলো তাই| সেও হঠাৎ চুপচাপ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে| তারপরই মিতুকে সরিয়ে দরজা খুলে ওদের ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়|

ওদিকে দরজা খুলে অনিক বেরিয়ে যেতেই অনিকের মা ওদের ঘরে প্রবেশ করে| আর উনিও মিতুর মতো নির্বাক হয়ে পড়েন| অনিকের বাবাও এসে এ দৃশ্য দেখে বিচলিত হয়ে যান| প্রচন্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েন| ঘর থেকে বেরিয়ে অনিকের খোঁজ করতে থাকেন| না, ওকে ঘরের ভিতরে এবং ছাদে কোথাও পাওয়া গেলো না| বিয়ের আগেও একদিন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল| পরে পাশের মহল্লার গলিতে এককোনে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে| বাবা ভাবলেন কিছু সময় পরে গিয়ে ওকে খুঁজে আনবেন|

উনি মিতুর কাছে ফিরে আসেন| অনেটা সময় কেউ কেনো কথা বলে না| মিতুর মা-ই প্রথম কথা বলেন, বৌমা, নানুকে আমার কোলে দাও|

এই প্রথম মিতুর গলায় ঝড় বয়ে যায়| চিৎকার দিয়ে বলে, না , আমি দেবো না| আমি আমার মানিককে দিবো না| ও আমার বুকেই থাকবে| ও আমার বুকেই থাকবে| মিতুর বুক ভেঙে কান্নার ঢেউ উথলে ওঠে| হাউমাউ করে করে কেঁদে ওঠে| অনিকের মা-ও মেঝেতে বসে পড়ে মিতুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকেন| সময় গড়িয়ে চলে| এক সময় মিতু অনিকের মায়ার হাতের বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে দাঁড়িয়ে যায়| পাগলের মতো এদিকে ওদিকে খুঁজে মোবাইলটা হাতে নেয়| কাঁপাকাঁপা হাতে রাত সাড়ে তিনটায় ময়মনসিংহে ওর বাবাকে ফোন দেয়| অনেক সময় ধরে বাবাকে শুধু মাত্র কয়েকটা কথাই বলতে পারে যে ও বাড়ি ফিরছে| ওদিক থেকে হতভ¤^ বাবা শুধুই একটা কথাই বললেন, হাঁ মা, আয়| আমি স্টেশনে থাকছি তোর অপেক্ষায়|

মিতু রক্তাক্ত আদনানকে বুকে নিয়েই বাথরুমে যায়| সাথে নিজের আর সোনা মানিকের পোশাক নিয়ে নেয়| বেশ সময় নিয়েই পরম যত্নে সোনা মানিকের শরীরে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করে নতুন পোশাক পরায়| নিজেকেও পরিষ্কার করে জামা কাপড় পরে বেরিয়ে আসে| ছোট কালো রঙের হ্যান্ড লাগেজের ভিতর বুকের ধনকে ঢ়ুকায়| ফ্রীজ থেকে বরফের সব টুকরা বের করে বড় পলিথিনে ভরে নেয়| তারপর ব্যাগে রাখা ছোট্ট মানিকের দেহটা ঢেকে চেইন আটকে দেয়| প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা আার ফোনটা সহ ভ্যানিটি ব্যগ হাতে নিয়ে অনিকের বাবা মাকে বলে, মা, বাবা, আমাদের জন্য দোয়া করবেন| আমি যাচ্ছি| আমার সোনা মানিক আমার সাথেই থাকবে|

অনিকের বাবা কথা বললেন, মা, আমরা তোমাকে বিন্দু মাত্র বাধা দিবো না| তুমি এতোদিন তোমার হৃদয় উজাড় করে অনিকের জন্য যা করেছো তাতে আমরা দুজন তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ| ছেলেটা তো আর ভালো হলো না| তুমি অনুমতি দিলে ওকে আমরা আইনের হাতে তুলে দিবো|

মিতুর চোখ আবারো কেঁদে ওঠে| বলে, না, বাবা, না| আমি ওকে অসম্ভব ভালোবাসি| আপনারা ওকে কিছুই করবেন না| ও যদি এরপরও ভালো হয়ে আমার কাছে ফিরে আসে, আমি ওকে আগের মতোই ভালোবাসবো| আমি চলে যাচ্ছি, বাবা আমার মানিককে নিয়ে|

অনিকের মা প্রথমে মিতুকে জড়িয়ে তারপর ওর হাতের ট্রাভেল ব্যগটা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে| মিতু অনেক চেষ্টায় মাকে ছাড়িয়ে বাড়ির বাহিরে বের হয়ে আসে|

ভোরের সূর্য উঠেছে উঠছে ভাব| মিতু এক অচেনা ভোরে ঘোরের মধ্যে একাকী রিক্সা করে কমলাপুর রেল স্টেশনে এসেছে সেই কখন| ময়মনসিংহ যাবার টিকিট কেটেছে, ট্রেনও যথাসময়ে এসে হাজির| কিন্তু এখনো পর্যন্ত ট্রেনে কাউকে উঠতে দিচ্ছে  না| হাতের ব্যাগের মোটা কাপড়ের ওপর ঠান্ডা ভাব বাড়ছে| মিতুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হতে শুরু করেছে| হঠাৎই অপেক্ষমাণ যাত্রীরা আনন্দে হই হই করে ওঠে| কারণ জানতে জানা গেলো ট্রেনে সবাইকে যার যার আসনে বসতে বলা হয়েছে| কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন চালু হবে|

মিতুও তাড়াহুড়ো করে ওর শীতাতপ কামরায় উঠে বসে| পায়ের হাঁটুর উপর মানিককে ভরা ব্যাগটা রেখে বুকের সাথে লেপ্টে রাখে| একটা ছোট্ট ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেন চলতে থাকে| এমন সময় ওর ভ্যানিটি ব্যাগে রাখা মোবাইল ফোনটি বেজে উঠে| দ্রুত মোবাইল বের করে রিসিভ করে| ওপাশে অনিকের বাবার কন্ঠ ভেসে ওঠে, বৌমা, শুনতে পাচ্ছো?

হাঁ, বাবা, শুনতে পারছি| ট্রেন এই মাত্র চলা শুরু করেছে|

মা, ঠিক আছে, ঠিক আছে| মা, একটা কথা……..

কি কথা বাবা?

আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে| তোমরা যাও| পরে বলি…….

বাবা, কি পরে বলবেন? এখনি বলেন| আপনিতো জানেন কেউ কিছু বলতে গিয়ে না বললে আমার মধ্যে কি রকম ওলটপালট লাগে| বাবা, বলেন| কি বলবেন?

আসলে ব্যাপারটা হয়েছে কি…. | বলতে গিয়ে বাবার গলা কান্নায় ফুসে ওঠে| কথা যায় আটকে|

কি হলো বাবা? আপনি কাঁদছেন? মিতুর উৎকন্ঠা বেড়ে যায়|

না, এই তো| না, মানে| মানে হয়েছে কি| ওই যে অনিক বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো| আমি তো আশে পাশে কত জায়গায় খুঁজে ওকে না পেয়ে বাসায় ফিরে এসে এক অজানা না¤^ার থেকে ফোন পেলাম| লোকটা নাকি অনিকের প্যান্টের পকেটে রাখা মানি ব্যাগে আমার না¤^ার পেয়েছে| তো উনি, উনি বললেন…….| আবার অনিকের বাবার কন্ঠ থেমে যায়|

মিতু উৎকন্ঠা আর চেপে রাখতে পারে না| একটু চেঁচিয়েই বলে, বাবা, বলেন, কি বললো লোকটা? প্লিজ বাবা, প্লিজ|

ও হাঁ| মা, উনি বললেন যে, আজ ভোরে কুড়িল বিশ^রোডে একজন যুবক ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দেয়| আর ওরই পকেটে আমার ফোন না¤^ারসহ ঠিকানাও নাকি আছে|  বলোতো মা, আমি কি বিশ^াস করবো?

তো আমি মা, ওনার সাথে কথা শেষ করার সাথেই খিলখেত থানার ওসি ফোন করে বলে অনিক নাকি আত্মহত্যা করেছে ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে| তো, মা, আমি এখন কি করবো? হ্যালো, মা! হ্যালো! কি কথা বলছো না কেনো? মা, হ্যালো!

মিতু বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে| মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের করতে পারছে না| মোবাইল ফোনটা কানেই চেপে রাখা| হঠাৎ করেই মিতুর কাছে মনে হলো সে এই বর্তমান সময়ের মাঝে নেই| এই সময়টা স্তব্ধ আর ভীষণ অচেনা লাগছে তার|

মিতুর বুকের সাথে ছুয়ে রাখা সোনা মানিকের শীতল দেহ আর লোহার চাকায় লেগে থাকা ভালোবাসার মানুষটির রক্ত নিয়ে এক অচেনা সময়ে ছুটে চলেছে মিতুকে নিয়ে বহু প্রতীক্ষিত ট্রেনটি|

 

 

সৈয়দ মনজুর কবির, গল্পকার

বাঙালির বর্ষবরণ—কবিতায়-গানে

সুমন বনিক দিনপঞ্জিকায় প্রতিটি মাসের পাতা জুড়ে ৩০/৩১ টি সংখ্যা থাকে| সংখ্যাগুলো একএকটি তারিখ বা দিনের নির্দেশনা দিয়ে থাকে| আমরা সেই তারিখমতো আমাদের কর্মপরিকল্পনা সাজাই

আন্দরকিল্লা সাহিত্য পত্রিকাকে সম্মাননা দিলেন লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ

গত ১১ এপ্রিল ২০২৬ লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ-এর ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সাহিত্য সম্মেলনে আন্দরকিল্লা সাহিত্য পত্রিকাকে সম্মাননা প্রদান করেন| আন্দরকিল্লা সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল আবসার এই সম্মাননা

লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদের ২৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : গত ১১ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদের ২৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সাহিত্য সম্মেলন ২০২৬ উপজেলা  পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়| সাহিত্য সংসদের

সুখ কিনতে কত লাগবে

সাফিয়া নুর মোকাররমা “সুখ কিনতে কত লাগবে?”—প্রশ্নটি শুনতে সরল, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে মানুষের গভীরতম আর্তি| আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা প্রায়ই ভাবি, সুখ যেন