এজাজ ইউসুফী
কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ, কলাম, রম্যরচনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, এমনকি ডকুমেন্টারি নির্মাণের মতো নানা ক্ষেত্রে যার বিচরণ, তাকে এক সন্ধ্যার আলোচনায় সম্পূর্ণভাবে ধারণ করা কার্যত অসম্ভব। সেই অসম্ভবের কথা স্বীকার করেই আয়োজন করা হয়েছিল “কর্ষণে বুননে সৃজনে একজন কামরুল হাসান বাদল : একটি অসম্পূর্ণ মূল্যায়ন” শীর্ষক অনুষ্ঠানটি।
১২ সেপ্টেম্বর শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম একাডেমির ফয়েজ নূরনাহার মিলনায়তনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি যেন এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়। দীর্ঘদিন পর এমন একটি আয়োজনে চট্টগ্রামের প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট মানুষের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী আইরিন সাহার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি গান পরিবেশিত হয়। সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আয়োজন পরবর্তী সময়ে পাঠ, আবৃত্তি ও কথামালায় ক্রমশ একজন সৃষ্টিশীল মানুষের নানা পরিচয় উন্মোচন করে।
অধ্যাপক মুজিব রহমান তাঁর বক্তব্যে কামরুল হাসান বাদলকে একজন বহুমুখী লেখক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বিদেশি লেখককে উদ্ধৃত করে বলেন, এই সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের মধ্যেই বাদলের সৃজনপরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে।
অধ্যাপক হোসাইন কবির তার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে কামরুলকে সমাজমনস্ক কবি হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই পরিচয়টি বাদলের সাহিত্যভাবনার একটি মৌলিক দিককে সামনে আনে।
কবি ও সাংবাদিক এজাজ ইউসুফী তাঁর বক্তব্যে বাদলের সৃষ্টিশীলতার বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে বলেন, কামরুল হাসান বাদল একাধারে কবিতা, গল্প, ছড়া, কলাম ও রম্যরচনা লিখেছেন। তাঁর লেখার সবচেয়ে আলোকিত বৈশিষ্ট্য হলো, এসব ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে লেখার পরও তা মৌলিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুতি ঘটেনি। শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফ কামরুল হাসান বাদলের পরিচয়কে কেবল ‘লেখক’ শব্দে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর মতে, বাদল একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও।
কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর বিশ্বাস, ভবিষ্যতে প্রাবন্ধিক হিসেবেই বাদল আরও বেশি সফল হতে পারেন। এই মন্তব্যটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাদলের সাম্প্রতিক লেখালেখিতে সমকাল, সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে বিশ্লেষণ প্রবণতা ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, কামরুল হাসান বাদল প্রথমত রাজপথের একজন প্রতিবাদী সংগঠক। অর্থাৎ তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা। একই সঙ্গে আবুল মোমেন বাদলের সাম্প্রতিক লেখালেখির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, তাঁর সাহসী কলাম তাঁকে আরও ব্যাপক পরিচিতি এনে দিতে পারে।
কবি ও ‘খড়িমাটি’ সম্পাদক মনিরুল মনির ব্যাখ্যা করেন, কেন কামরুল হাসান বাদলকে ঘিরে এমন একটি আয়োজনের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে।
কবি ও সম্পাদক আলী প্রয়াসের স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
কবি আখতারী ইসলাম সংবর্ধিত লেখকের উদ্দেশে রচিত সম্মাননাপত্র পাঠ করেন। এরপর রাশেদ হাসান, কঙ্কন দাশ, মুজাহিদুল ইসলাম, দিলরুবা খানম ছুটি, প্রণব চৌধুরী, অঞ্চল চৌধুরী ও দুলাল দাশগুপ্ত কামরুল হাসান বাদলের বিভিন্ন লেখা থেকে পাঠ ও আবৃত্তি করেন। তাঁদের কণ্ঠে বাদলের কবিতা ও গদ্য নতুন এক শ্রুতিমাত্রা পায়।
সংবর্ধিত লেখক কামরুল হাসান বাদল তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “জীবনে আমি অনেক বক্তৃতা দিয়েছি, অনেক কথা বলেছি। কিন্তু আজকের মতো অস্বস্তিতে কখনও পড়িনি।” তিনি জানান, চন্দন কুমার চৌধুরী নামের তাঁর একজন অনুরাগীর নাছোড় উদ্যোগের কারণেই আজকের এই অনুষ্ঠান। তিনি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
এই আয়োজনের উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো লিটল ম্যাগাজিন ‘খড়িমাটি’ থেকে প্রকাশিত ১৩২ পৃষ্ঠার বিশেষ সংখ্যা ‘কামরুল হাসান বাদল পর্ব’। একজন জীবিত লেখককে নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ নিঃসন্দেহে তার কাজকে সংরক্ষণ ও মূল্যায়নের একটি ভালো উদ্যোগ। (সংক্ষেপিত)
এজাজ ইউসুফী, কবি ও সম্পাদক



