এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

যোগেন চৌধুরী : শূন্যতার মর্মবেদ

মইনুদ্দীন খালেদ

দুঃসহ অভিজ্ঞতায় অস্তিত্বের প্রদাহে বদলে যায় মানুষের নিত্য-চেনা অবয়ব। ক্ষুরধার একটা অপয়া মুহূর্তের রিরংসায় মানুষ কি অতর্কিতে হয়ে যায় তার আপনজনের হন্তারক! পচনশীল গার্হস্থ্য জীবনের সুরতহালে একনিষ্ঠ ডোম, নাকি শল্য চিকিৎসকের মতো শনাক্ত করেছেন দুরারোগ্য ব্যাধির উৎস! মানুষের অস্তিত্বে বহমান যে-দুর্যোগ তারই দৃষ্টান্ত যোগেন চৌধুরীর শিল্প। চিত্রে সংক্রমিত যৌথ যাপনের ক্লান্তি, একা থেকে আরও একা হয়ে যাওয়া, ঘৃণাকে ভালোবাসায় রূপান্তরের ব্যর্থ প্রয়াস, একটা বিমূঢ় পরিধির মধ্যে নিজের আয়নায় বোবা চোখে নিজেকে দেখা এবং ধর্ষকামনায় গনগনে চকিত চাহনিও আছে নারীর ও পুরুষের। দেহের বীজতলায় গজিয়ে ওঠা একপ্রস্থ রোমরাজি মানুষ আর পশুর মাঝখানের পর্দাটা সরিয়ে দেয়। ঝুলন্ত বা উড্ডীন— কেউ ভূমি খুঁজে পাচ্ছে না, অথবা যে-ভূমিতে আছে সে প্রধানত স্থবির হলেও তার মরা চোখের দৃষ্টিতে একবিন্দু আশা চকচক করে। নাকি মজ্জমান মানব অস্তিত্বে নেতিবোধের ভরকেন্দ্র তালাশ করছেন যোগেন? রেখার বিরামহীন কুণ্ডলায়ন আর তুলির সুচালো জিহ্বার গুটিকয়েক হ্রস্ব আঘাত;— চিত্র বিরচনের এই দুই উপচারেই শিল্পী সম্প্রচার করেন আমাদের অস্তিত্বের দাহ্য দশা।

একটা অবয়ব পাঠ করা যেতে পারে। নারীর প্রোফাইলিক চিত্র; হালকা আলোর ওপর অবিশ্রাম জালিকা-বুনট। কানের কাছে হলুদের ঈষৎ স্পর্শ, ঠোঁট রক্তিমাভ, সব ছাপিয়ে আমাদের চোখ গেঁথে যায় চোখের মধ্যে— চোখের সাদা দিঘি আমাদের নির্বাক করে রাখে। এই নির্বাক সাদায় চোখের মণিও অচঞ্চল। এই অনির্বচনীয় স্তব্ধতাই মানুষের অবয়ব পাঠে বিশেষভাবে অনুভূত হয়। মানুষের ভেতরের শূন্যতা বোধের উন্মোচনে সেই নয়ন-পরিধির সাদাটুকু বস্তুত এ ছবির ভরকেন্দ্র।

যেন কোনো অপয়া মুহূর্তের চৌম্বক আবেশে নিঃসহায় মানুষ আপন দর্পণে নিজেকে পাঠ করছে বিমূঢ় অবলোকনে। মানব অস্তিত্বের এই অবস্থা নানা আয়োজনে যোগেন জীবনের শুরু থেকে আমৃত্যু এঁকে গেছেন। সমস্ত হিংস্র খেলার পর মানুষ একা, সমস্ত আরাধনার পর মানুষ একা, সমস্ত আনন্দ উদযাপনের পর মানুষ একা;— নিরালম্ব অস্তিত্বের ঘোর ও ঘের বিরামহীনভাবে শিল্পায়িত করেছেন যোগেন। মানব-মানবী সম্পর্কের মধু ও বিষ বিনিময় করে শেষ পর্যন্ত দুজনেই পরাজিত; মুখোমুখি বা পাশাপাশি বসে থেকেও তারা আজ একা এবং অচেনা। যোগেন চৌধুরী মানুষের অস্তিত্বের এই অচেনাকে এঁকেছেন— এ কথা শিল্পীর ছবি দেখে আমার কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।

এই অচেনা, বান্ধবহীনতা, শূন্যতাবোধ আর সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের অভিসন্দর্ভ পাঠ করে বোধগম্য হয় এই সত্য যে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক সংঘর্ষের— মিলনের নয়; এই চিন্তনে ভর করে আমরা যোগেনের ভুবনে বিচরণ করতে পারি। তার ছবিতে তিনটি নারীকে দেখি। তারা সখীভাবে উপস্থাপিত। তবুও তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। বসন তাদের উজ্জ্বল, অবয়ব প্রসাধনে রঙিন, দেহব্রীড়া চঞ্চল। কিন্তু কী পরিহাস! চোখের কাজল স্পষ্টতর করে চোখের গভীরের শূন্যতা— পরস্পরের বিচ্ছিন্নতা। তারা সখী নয়, সুখী নয়। পোশাক-প্রসাধন ও মিলন তাদের একাকিত্ব আড়াল করার বিফল আয়োজন।

মানুষের চোখ অস্তিত্বের ভরকেন্দ্র; কেবল এ-ভাবনাতেই স্থির নয় যোগেন। অতি আমিষাশী ভোগে হেজে-মজে যাওয়া দেহের কদর্য রূপের প্রদর্শনও শিল্পীর আরেকটি প্রধান চর্চার বিষয়। তিনি অনেক সংখ্যায় এঁকেছেন মাঝবয়সী বা বৃদ্ধ মানুষকে। নর ও নারীকেও— বিছিন্নভাবে এবং যুগলভাবেও। যোগাসনে বসে থাকা বিশালবপু মানুষটির ভুঁড়ি ফুলে প্রকাণ্ড কুমড়ার মতো হয়ে আছে। এ কারণে নস্যাৎ হয়ে গিয়েছে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দৃষ্টিনন্দন সামঞ্জস্য।। ভোগের বিকারকে জানান দেওয়ার জন্যই শিল্পী এ আয়োজন করেছেন। স্বল্পবাস উদোমপ্রায় মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিন্যাস আঁকার প্রতি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ করা যায় এই শিল্পীর সৃজন আয়োজনে। নগ্ন দেহ ছাড়া জীবনের বিচিত্র বিকার কীভাবেই-বা আর বুঝতে ও বোঝাতে পারেন একজন চিত্রকর। যোগেন চৌধুরী মানেই বহুকৌণিক পর্যবেক্ষণে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পাঠের মধ্য দিয়ে জীবনের বিচিত্র রূপের উপস্থাপন। গভীর চিন্তার আলোড়ন নেই, আছে কেবল ভোগ, এই সত্য উপচে আসে এই শিল্পীর জমিনে। সম্পর্ককে চর্ব-চৌষ্য-লেহ্য-পেয় ভেবে শারীরী উদযাপন শেষে নারী-পুরুষ এখন গার্হস্থ্য কারাগারে নিস্পৃহ, নিস্তেজ। জীবনের অবসাদ ও অপচয়ের অজস্র সংকেতে মর্মর যোগেনের ক্যানভাস।

হিংস্রতার শিল্পায়ন এ শিল্পীর আরও একটি অন্বেষণ। মানুষের দেহে ধারালো অস্ত্রের কোপের দাগ; এই অনুষঙ্গ শিল্পীর পরিচর্যায় পৌনঃপুনিকভাবে এসেছে। মানুষই প্রধানত মানুষের হিংস্রতার বলি। এ সত্য বিস্মৃত হয়ে শিল্পী হওয়া সম্ভব, তবে যোগেন তা ভাবতে পারেননি। নৃশংস অভিব্যক্তির মানুষী অবয়ব প্রচুর পরিমাণে চিত্রিত করেছেন তিনি। মানুষ যে হিংস্র দাঁতাল পশু বা তীক্ষ্ণচঞ্চু পাখির চেয়েও নৃশংস তার বর্ণন প্রচুর পরিমাণে আছে এই শিল্পীর চিত্রতলে। হিংস্রতার একটি অনুষঙ্গই পুরো ছবিতে সন্ত্রস্ত কাল ও সন্ত্রাসের পরিস্থিতি জ্ঞাপনে যথেষ্ট হতে পারে, এ সত্যই শিল্পের ভাষায় প্রমাণ করেছেন যোগেন।

 

শিল্পী নিরাপদ যাপনে তুষ্ট থাকতে পারেন। চাষ করতে পারেন শিল্পের কুসুম কালহীন শাশ্বতী অভিধায়। অনেকেই পারেন, আবার কেউ কেউ সেই নিরাপদ পথের পথিক না হয়ে সময়ের মুখোমুখি হন। তারা সহিংস কালের রক্তে তুলি ছুপিয়ে কালের বার্তা প্রেরণ করেন। অবশ্য যোগেনের স্পেসে সরল বাস্তববাদী ভাষায় কালের বার্তা সমুচ্চারিত নয়; চিহ্ন বা সংকেতের শক্তিকে ভর করে সন্ত্রাসের পরিধি রচনায় অভূতপূর্ব পারমিতার প্রমাণ রেখে গেছেন যোগেন।

 

জাগতিক ও অতিজাগতিক, লৌকিক ও অলৌকিক, বাস্তব ও পরাবাস্তব, প্রাত্যহিকতা ও স্বপ্নময়তা— এসবের দোলাচলে মানুষের জীবন চলমান। কোনো সূত্র প্রয়োগে তা হয়তো সর্বাঙ্গীণভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু উপলব্ধিতে জাগর করা সম্ভব শিল্পের ইশারাময় ভাষায়। মিহিন বিন্দুবৎ টেক্সচারে, কেঁচোর মতো সচল লতানো রেখায় আর উজ্জ্বল রঙের ঈষৎ ছোপে যোগেন নির্মাণ করেছেন কাল-তরঙ্গে ঘূর্ণায়মান মানুষের তাপিত অস্তিত্বের বয়ান।

নামগোত্রহীন পাখি, সরীসৃপ, বুনো কাঁটাঅলা ফুল-লতা-পাতার সঙ্গে মানুষের দেহ বা দেহের কোনো-না-কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বিত কম্পোজিশনে মানুষের অন্তঃস্থিত সুপ্ত বা গুপ্ত প্রবৃত্তি নতুন ভাষায় প্রখরতর করে উদ্ধার করতে চেয়েছেন শিল্পী। মানুষের দীর্ঘ হাত ও সাপ একই পটভূমে এঁকে বোঝাতে চেয়েছেন দুটোই বিষধর।

নির্জীব বস্তুতে প্রাণতরঙ্গ প্রবিষ্ট করার এক বিশেষ খেয়াল কাজ করেছে যোগেনের শিল্পচিন্তায়। গার্হস্থ্য জীবনের ব্যবহার্য জিনিস, যেমন— বিছানা চাদর এসব মন্ত্রচালিতের মতো শূন্যে ভাসমান রেখেছেন। ফর্মের ভারসাম্য সৃষ্টি শুধু নয়, বস্তুর মধ্যে যাপিত জীবনের সংক্রমণ বা বস্তুর সঙ্গে মানুষের অনির্বচনীয় সম্পর্কের বিষয়টি অতীন্দ্রিয় আবহ তৈরি করে জানান দিয়েছেন শিল্পী।

প্রাণের প্রবল সম্প্রচার, অনুভবের উদগত প্রকাশ, তপ্ত ও শীতল উভয় মেরুতেই গতায়ত, সালংকার ও নিরলংকার, অতিশয়ান ও সুমিতায়ন, মানুষের প্রাত্যহিক রূপ ও পুরাণপ্রতিম রূপক— কিন্তু পরিণামে মানুষ বান্ধবহীন, অচেনা সে পরিজনের কাছে, তথাকথিত বৈধ যাপনসঙ্গীর সাথে, সন্তানের কাছে এবং উপসংহারে নিজের কাছেই। মানব-অস্তিত্বের শূন্যতাবোধ কখনও স্তব্ধ-মৌন আবেশে, কখনও অবিশ্রাম রেখার মর্মরে, কখনও-বা রঙের ছোপের মুখরতায় পরিমাপ করতে চেয়েছেন যোগেন। ভারত কেন কেবলই তার সভ্যতার বিপুল মূর্তি-ভাস্কর্য-চিত্রকলার ঐতিহ্যের মধ্যে আবর্তিত হয়, এত যে ক্লেদ জমেছে যুগের পর যুগ, তা কেন মুখর হয়ে ওঠে না আধুনিক ও সমকালীন শিল্পে? বেঙ্গল স্কুলের পরে ক্যালকাটা গ্রুপের শিল্প থেকে আধুনিকতার মুক্তি ঘটে। এই চর্চার বয়স খুব যে বেশি তা বলা যাবে না। কিন্তু ব্যক্তির একাকিত্ব ও নিরস্তিত্বের দাহ ষাটোর্ধ্ব রবীন্দ্রনাথের তুলি-কলমের শিল্প-অভিযাত্রায় ব্যাপ্তার্থে সাফল্যে সরব হয়। এই পরম্পরায় একজন গণেশ পাইন স্মরণীয়। হয়তো এই দাবি আরও কেউ করতে পারেন তবে তা সংখ্যায় নগণ্য। ব্যক্তি মানুষের অস্তিত্বের সংকটের বোধে আকীর্ণ শিল্পসৃষ্টির প্রমাণ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই বিরল।

সব মহৎ শিল্পই পরিণামে শিল্পীর স্বরচিত বর্ণমালার আত্মজীবনী;— এই প্রবচনে কালজয়ী যোগেন-সৃষ্টি।

 

 

মইনুদ্দীন খালেদ : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

অ্যান কারসন : পুরাণ পেরিয়ে মানুষের কাছে

শাহেদ কায়েস ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়ন ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা

 ‘সাড়ে ৭ বছরে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি’

আন্দরকিল্লা ডেক্স : গত সাড়ে ৭ বছরে সারাদেশে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চাঁদপুরের সুপরিচিত প্রতিষ্ঠিত সংগঠন চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি। বিগত পুরো অক্টোবর মাস

কবীর-লালন ভাবসঙ্গীত উৎসবে ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন : ভাঙা ডালের কোষ থেকে জেগে ওঠে সবুজ-সজিব পত্র-পল্লব

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেছেন, তুমুল ঝড়-ঝঞ্ঝায় সবুজ প্রান্তরে সকল বৃক্ষরাজি ধ্বংস হলেও কয়েকটি ডালপালা পড়ে থাকে। ঐ ডালপালাগুলোর মধ্য

যোগেন চৌধুরী : শূন্যতার মর্মবেদ

মইনুদ্দীন খালেদ দুঃসহ অভিজ্ঞতায় অস্তিত্বের প্রদাহে বদলে যায় মানুষের নিত্য-চেনা অবয়ব। ক্ষুরধার একটা অপয়া মুহূর্তের রিরংসায় মানুষ কি অতর্কিতে হয়ে যায় তার আপনজনের হন্তারক! পচনশীল

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির (পূর্ব প্রকাশিতের পর) মামা, আমরাতো তিন দিন আগের থেকেই ওরে খুঁজতেছিলাম। পুলিশ আধা ঘন্টা হইলো ওর লাশ দিয়া গেছে। কইলো পরশুদিন রাইতে