সুজন বড়ুয়া
মোবাইল ফোন বেজে ওঠার শব্দে হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেলেন কাকলি হালদার। এতক্ষণ যেন এক গভীর ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিলেন তিনি। কোন অচেতন জগতে হারিয়ে গিয়েছেলেন নিজেও জানেন না। চোখ রেখেছিলেন টেলিভিশনের পর্দায়। টেলিভিশন অন করা আছে প্রায় সকাল থেকে। কদিন ধরে কাটছে বেশ উদ্বেগময় সময়। দেখতে দেখতে কোটা আন্দোলন হয়ে গেল বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন। আন্দোলনের তীব্রতা ঘনীভূত হতে হতে এসে দাঁড়িয়েছে এক দফায়। সরকারের পদত্যাগ। আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা আর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে। প্রতিবাদ বিক্ষোভ সমাবেশ মারামারি গোলাগুলি হতাহতের ঘটনা ঘটছে অবিরাম। দেশময় প্রতিমুহূর্তে ঘটছে নতুন কিছু না কিছু। প্রতিমুহূর্তে উদ্বেগ, না জানি কখন কী হয়। তাই টিভি অন করে রেখেছিলেন সকাল থেকে।
কাকলি হালদার একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ। বয়স আটান্ন-ঊর্ধ্ব। ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে তার কলেজ। সুতরাং তার সর্বক্ষণ সজাগ না থেকে উপায় নেই। ঘরের টুকটাক কাজ করতে করতে শুনছিলেন আর দেখছিলেন টিভি। দুপুর গড়িয়ে যেতে যেতে পরিস্থিতি যেন দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। চারদিকে টান টান উত্তেজনা।
রাস্তাঘাটে আন্দোলনকারীদের তৎপরতার জোর বাড়ছিল। বিকেলের দিকে রাজপথগুলো যেন একেবারে উত্তাল। তবে কি আন্দোলনকারীদের জয় আসন্ন? মনে এমনি শংকা সংশয় নিয়ে একসময় কাকলি বসে পড়েছিলেন টিভির সামনে। আর উঠে যাওয়ার অবকাশ পাননি। অবাক হয়ে দেখছিলেন অভাবনীয় পটপরিবর্তন; আর শুনছিলেন চমকপ্রদ সব তথ্য-ভাষ্য। দ্রুত ঘটে গেল সব। একটানা চার মেয়াদের ক্ষমতাসীন একটি সরকারের পতন, প্রধানমন্ত্রীর দেশ ত্যাগ, ছাত্র-জনতার গণভবন দখল ও লুটপাট, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর-সহ সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা জ্বালাও-পোড়াও, বিভিন্ন জায়গায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারণ ও অবমাননা সব দৃশ্যপট যেন চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মতো ভেসে যাচ্ছিল একে একে। সব কেমন অবিশ্বাস্য লাগছিল কাকলির। এও কি সম্ভব! কিন্তু এর পরের গন্তব্য কোথায়? ভাবনা, দুর্ভাবনা আর অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলতে দুলতে বার বার কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এমন সময় টেলিফোনের শব্দ।
শেল্ফের ওপর থেকে মোবাইল ফোন সেটটা হাতে নিলেন কাকলি হালদার। স্ক্রিনে ইন্দুকাকার নাম ভাসছে। ঝিনাইদহ জেলার গ্রাম থেকে ফোন করেছেন ইন্দুভূষণ কাকা। বাবার আপন ছোটোভাই। স্কুল শিক্ষক ছিলেন। এখন সস্ত্রীক গ্রামেই থাকেন। মোটামুটি সচ্ছল গৃহস্থ পরিবার। নিজের পরিবার-সহ কাকলিদের বাড়িঘর দেখাশোনা করেন। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইন্দুকাকার উদ্বেগাকুল গলা, তোমরা কেমন আছো কাকলি-মা?
কাকলি বলল, আমরা একরকম আছি কাকা। আপনারা কেমন আছেন?
—আমরা ভালো নেইরে মা। সেটা জানানোর জন্যই ফোনটা করলাম। সরকার পতনের পর আজ বিকাল গড়িয়ে না যেতেই একদল লোক আমাদের কালী মন্দিরে হামলা করেছে। গ্রামে হিন্দুদের অনেক বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। লুটপাটও করেছে। আমাদের উঠানে বাঁধা ছাগলটা নিয়ে গেছে মা।— শেষদিকে ইন্দুকাকার গলা কাঁদো কাঁদো শোনাল।
কাকলি কী বলবেন সহসা যেন কিছু ভেবে পেলেন না। তবে মনে মনে এই আশংকাই করেছিলেন তিনি। প্রতিবারই নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের গ্রাম-মহল্লায় হামলা এ দেশে একটি সাধারণ ঘটনা। পছন্দের প্রার্থী জয়ী হোক বা না হোক, একটি চক্র যেন এর জন্য তৈরি হয়েই থাকে। সেখানে এবার তো আন্দোলনের মুখে একটি ক্ষমতাসীন সরকারের পতন। কথিত ভারত-বান্ধব এই সরকারের ভোট ব্যাংক হিন্দু-পাড়া-মহল্লা—এমন বদ্ধমূল ধারণা যাদের তারা কি আর চুপ থাকবে? দেশে এই মুহূর্তে কোনো সরকার নেই; পুলিশ প্রশাসন পর্যুদস্ত। ধান্ধাবাজ দুষ্কৃতকারীরা তো এ সুযোগ নেবেই। না জানি আরো কত ভয়াবহ কিছু হয়।
কাকলির অস্থির লাগছিল। তবু সামলে নিলেন নিজেকে। বিপদাপণ্ন বয়স্ক কাকাকে তাৎক্ষণিক সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।— কাকা, এখন পরিস্থিতি অন্যরকম। এমন ঘটনা আরো ঘটতে পারে। সবাইকে সাবধানে থাকতে হবে। ছাগল নিয়ে গেছে যাক, আপনারা সবাই ঠিক আছেন তো?
—এমনিতে আমরা সবাই ভালো আছি। এখানে তোমাদের বাড়িঘরের কোনো ক্ষতি হয় নাই।
— কাকা, আরো আক্রমণ হতে পারে। পাড়ার সবাই মিলে রাতে রাতে গ্রামের বাড়ি-মন্দির পাহারা দেওয়া যায় কিনা দেখেন। সাবধানে থাকবেন। আর কিছু বলবেন?
—নারে মা, তোমরা ভালো থেকো। রাখি।
ফোন রাখার পর কেমন এক খারাপ লাগা পেয়ে বসল কাকলিকে। পাঁচ ঘণ্টা আগের মনের অবস্থার সঙ্গে এ অবস্থার কোনো মিল নেই। উদ্বেগের মধ্যেও এতদিন একটা ক্ষীণ আশা ছিল— সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন তা আর নেই। এখন সব দিকে আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতা। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে আসছে জেলায় জেলায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর। কোথাও হয়েছে হিন্দু মন্দিরে ভাংচুর, কোথাও-বা ঘটেছে হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালাও-পোড়াও আর লুটপাটের ঘটনা। এটাই যেন এখন অনিবার্য। জয়ে পরাজয়ে পতনে সবখানে যেন অপরাধী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। কী আশ্চর্য! এ দেশের স্বাধীনতা অর্জনে গঠনে উন্নয়নে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের কোনো অবদান নেই! তারা মুক্তিযুদ্ধ করেনি? বাবা নিজেও তো একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন; আবার সরকারি কর্মকর্তাও ছিলেন। বাবার মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেক লোক সরারসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন এবং এখনো আছেন। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনও সরকারি কর্মকর্তা। আমরা কি দেশের অগ্রগতি-উন্নয়নের অংশীদার নই? সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কি এ দেশের নাগরিক নয়? তাহলে কেন তাদের ওপর বার বার এই হামলা-নির্যাতন? যুগ যুগ ধরে এই ধারা চলে আসছে। বাবা বলতেন পাকিস্তান আমলেও এই হামলা-নির্যাতন-অবমাননা ছিল; ছিল তারও আগে ব্রিটিশ আমলেও। সেজন্যই ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে। কোনো
লাভ হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির মূলেও অন্যতম নিয়ামক ছিল সকল সম্প্রদায়ের সম-মর্যাদা। তাই পূর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে একসঙ্গে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরও কেন এই ভেদাভেদ শুরু হলো আবার? এখনো এ দেশে দুর্গাপূজার মতো ধর্মীয় উৎসব পালন করতে হয় পুলিশ প্রহরায়। স্বাধীনতা লাভের তেপ্পান্ন বছর পরও কেন এই ভেদাভেদ ঘুচল না? এই সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষের শেকড় কোথায়? কারাই-বা এর পরিচর্যাকারী?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পান না কাকলি হালদার। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী, উদার কল্পনাপ্রবণ ভাববাদী মানুষ তিনি। ধর্ম-সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ পরিচয়ে নয়, মানুষকে তিনি দেখতে শিখেছেন মানবিক গুণাবলির মানদণ্ডে।
এরই মধ্যে অফিস থেকে বাসায় ফিরেছেন স্বামী প্রতুল ভৌমিক। তিনি সরকারের প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্ম-সচিব। মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। সরকার পতনের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর। প্রতুলবাবু একেতো মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা, তার ওপর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য। দুই দিক থেকেই তিনি এখন ভীষণ চাপে। কাজে কর্মে আলাপে আচরণে যতই তিনি নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করুন, কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করে না; সবাই ভাবে তিনি স্বাধীনতা পক্ষ শক্তি ও সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থক। সুতরাং প্রতুলবাবুর অবস্থাও আজ বিধ্বস্ত।
কাকলি প্রতুলবাবুর সামনে এসে দাঁড়ান, তোমার অফিস, মন্ত্রণালয়, সচিবালয়ের খবর কী?
— আর বলো না, সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে এখন একেকটার আসল স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে, সবাই এখন সরকার বিরোধী। এতদিন একেবারে ঘাপটি মেরে ছিল। সচিবালয়কে তারা নাকি স্বৈরাচারের দোসরমুক্ত করবে। তুঘলকি কাণ্ড শুরু করেছে সব।
— যা খুশি করুক। কিন্তু তোমাকে উদ্দেশ করে কেউ কিছু বলেছে নাকি?— কাকলি কৌতূহলের সঙ্গে তাকান।
প্রতুলবাবু স্বভাবসুলভ হালকা চালে বলেন, না, আমি তো কখনো অত্যুৎসাহী হয়ে সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু করিনি। আমি সবসময় বিধি মোতাবেক দায়িত্ব পালন করেছি।
— তবু এখন সাবধানে থকতে হবে। আর শোনো, এদিকে আমাদের গ্রামে তো হামলা হয়েছে। ইন্দুকাকা ফোন করেছিলেন। তিনি বললেন, বিকেলর পর পরই এক দল লোক এসে কালী মন্দিরে ভাংচুর করেছে, আমাদের উঠান থেকে একটি ছাগল নিয়ে গেছে। আরো কয়েকটা বাড়িতে লুটপাট হয়েছে। তোমাদের গ্রামের খবর কী? জানো কিছু?
— এ আর নতুন কী! একটি দুটি ঘটনা নয় যে, শুনে কাতর হব, এখন পাথর হয়ে গেছি। এরা এতদিনকার বিধি-বিধান, নিয়ম-নীতি, শিষ্টাচার কিছু মানবে বলে মনে হয় না।
কাকলি রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন, এমন সময় মোবাইল ফোন বেজে ওঠার শব্দে ঘুরে দাঁড়ালেন আবার। দিদি ফোন করেছেন।
দিদি মানে নমিতা হালদার, কাকলির একমাত্র বড়ো বোন। বিবাহসূত্রে এখন ভারতের নাগরিক, কলকাতার বেহালায় থাকেন, স্কুল শিক্ষিকা। তাদের একমাত্র বড়োভাই মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে দুই বোনই শুধু বেঁচে আছেন এখন। বাবা-মা বেঁচে নেই। দুই বোন দু’দেশের নাগরিক হলেও তারা পরস্পরের সুখদুঃখের ভাগীদার।
ফোন কানে নিতেই দিদির কান্নাজড়িত কণ্ঠ— কলি, কেমন আছিস ছোটো বোনটি আমার? তোদের হঠাৎ এ কী হলোরে, এমন দ্রুত উন্নয়ন করা একটি দেশে কীভাবে এই ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে এলো! তোরা তো এখন একেবারে অরক্ষিত। টিভি মিডিয়ায় যা দেখছি, শুনছি তাতে মনে হচ্ছে তোদের পথেঘাটে বেরুনোই এখন চরম ঝুঁকির ব্যাপার। এই বিপদের দিনে আমি কেন তোর পাশে নেইরে বোন। আমার এমনই কপাল, এমন কঠিন এক কারাগারে পড়েছি আমি, তোর কোনো বিপদে কাজে আসলামরে…।
দিদি নমিতার বিলাপের তোড়ে নিজেরই প্রায় কান্না এসে গেল কাকলির। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, দিদি তুমি শান্ত হও। তুমি এমন করো না। এখানকার অবস্থা অতটা খারাপ হয়নি। আমরা মোটামুটি ভালো আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে, আমরা মানিয়ে নিতে পারব।
— হ্যাঁ বোন, মানিয়ে চলিস। নীতি, আদর্শ, দেশপ্রেম এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে যাবি না।
কাকলি দিদিকে নিরস্ত করার জন্য বলেন, তুমি চিন্তা করো না দিদি। আমাদের অভ্যাস আছে। মনে যত কষ্টই থাকুক, মেনে নিয়ে চলতে চলতে এখানে জীবনের এতটা পথ আমরা পেরিয়ে এসেছি। কোনো কিছু খারাপ লাগলে ভাবি এ মাটি, এ দেশ তো আমারও। আমার বাবা এ দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, আমার নিজের ভাই স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, তখন আমার সব খারাপ লাগা দূর হয়ে যায় দিদি। এখানে যা-ই ঘটুক, এ দেশে থাকার জন্য আমি সব করতে পারি। তুমি খামোখাই ভাবছ। তোমার শরীর খারাপ হবে। শরীরের যত্ন নিও, ভালো থেকো। আর আমাদের জন্য প্রার্থনা করো।
রাতে আর বিশেষ খাওয়া-দাওয়া হলো না। রান্নাবাড়ারও তেমন প্রয়োজন হয়নি। মনও চাইছিল না। দুজন মাত্র মানুষ। দুপুরের রান্না করা সামান্য যা ভাত-তরকারি অবশিষ্ট ছিল, তা খেয়ে নিলেন স্বামী-স্ত্রী মিলে। তাদের একমাত্র কন্যাসন্তান ঝুমুর থাকে আমেরিকার ইলিনয় স্টেটে। ঢাকার বুয়েট থেকে ক্যামিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে আর্বান প্লানিং বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি করছে সে।
ভাগ্যিস, এ সময়টায় মেয়ে দেশে নেই। থাকলে না জানি কী থেকে কী হতো! যে অস্থিরমতি মেয়ে। দূরে আছে, সেই এক শান্তি। মেয়ের কথা ভাবতেই কাকলির মনে হলো, আজ সারাদিন ওর সঙ্গে কথা হয়নি। এখন ওখানে দিনের বারোটা বাজে। আজ সোমবার, এ সময় ওর ক্লাস থাকে। তবু কথা বলার সুযোগ থাকলে ফোন ধরবে— এই ভরসায় মেয়ে
ঝুমুরকে ফোনটা করেই ফেললেন কাকলি।
ঝুমুর ফোন ধরল, মা তোমরা কেমন আছো? কালকে আমি বিকেল থেকে রাতে ঘুমানোর আগ-পর্যন্ত অনেকবার তোমাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি, লাইন পাইনি। আজ সকালে ইউনিভার্সিটিতে এসে শুনছি বাংলাদেশে গতকাল অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। সব নাকি ওলোটপালোট হয়ে গেছে।
— হ্যাঁ মা, এখানে যে ছাত্র-আন্দোলন চলছিল, সেটার কারণে গতকাল ইন্টারনেট সংযোগে সমস্যা হয়েছে বার বার, এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আন্দোলনের মুখে সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী ভারতে চলে গেছেন। দেশে এখন খুব বিশৃঙ্খল অবস্থা।
ওপাশ থেকে ঝুমুর হতাশ সুরে বলল, দেশে এতকিছু ঘটে গেল, অথচ আমি নেই!
— তুমি থাকলে কী করতে? — মেয়ের ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য কাকলি পরক্ষণেই আবার বলেন, এখন দেশের এসব কথা ভেবে তোমার কাজ নেই। ওখানে পড়াশোনা করতে গেছ, সেটাই করতে থাকো। মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করে পিএইচডি-র জন্য অ্যাপ্লাই করবে। পাশাপাশি চাকরি বাকরি ধরার চেষ্টাও করে যাও। ওখানেই তোমাকে সেট্ল হতে হবে।
— মা!— মায়ের কথা শুনে যেন আঁতকে উঠল ঝুমুর।— তুমি না এতদিন বলতে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে আসতে হবে। দেশেই প্রোভাইড হওয়ার ভালো সুযোগ আছে। তুমি না বলতে দেশই ভালো।
— হ্যাঁ, বলতাম। এখন আর বলি না। শোনো, তুমি আমাদের একমাত্র সন্তান এবং কন্যা সন্তান, তারপরও বলছি দেশে ফিরে আসার দরকার নেই। ইউএসএ-তেই থেকে যাও তুমি। এখানে শিক্ষা, অর্থনীতি সব শেষ, সামাজিক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে। কখন কী হবে কেউ জানে না। সুতরাং ওখানেই থাকো। মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো। এখন ক্লাস নেই তোমার?
— হ্যাঁ, আছে। পরের ক্লাস একটু পরেই শুরু হবে। এই ফাঁকে বাবার সঙ্গে একটু কথা বলে নিতাম।
— আচ্ছা বলো। তবে শেষ কথা মনে রেখো, তোমাকে রেজাল্ট ভালো করতে হবে, পিএইচডি করে ইউএসএ-তেই যাতে প্রোভাইড হতে পারো।— বলতে বলতেই কাকলি ফোনটা স্বামী প্রতুলবাবুর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
রাত গভীর হয়ে তৃতীয় প্রহরে প্রবেশ করেছে। মনের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এলোমেলো ভাবনার ঝড়। ঘুম আসছে না চোখে। গত রাতের সঙ্গে আজ রাতের কত তফাৎ! গত রাতে এতক্ষণ ডুবে গিয়েছিলেন নিশ্চিন্ত নিদ্রায়। বারো ঘণ্টা না পেরুতেই একই সময়ে আজ মনের ওপর হাজারো চাপ। দেশের এই অবস্থায় চাপমুক্ত থাকবেন কীকরে? রাজধানীর একটি সুপরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান তিনি। যদিও দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তবু সময়ের স্পন্দন বুঝে নিতে হবে এখনই। কোন দিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি? রাজনীতির প্রবাহ কোন দিকে? বলা হচ্ছে এখন নতুন বাংলাদেশ। নিশ্চয়ই আগের মতো অবাধ মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুচর্চা আর চলবে না। তাহলে আগামীর পথ চলা কোন বরাবর? কাকলির ইচ্ছে হলো এ নিয়ে একবার প্রতুলবাবুর সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবনা এলো, বেচারা নিজের দপ্তর নিয়েই নাকাল। মন্ত্রণালয়ে নানা ধকল সামলেছেন সারাদিন। পাশেই ক্লান্ত অবসন্ন সৈনিকের মতো ঘুমাচ্ছেন এখন। দেখে মায়া হলো কাকলির। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে আবার ডুবে গেলেন নিজের মধ্যে নিজে।
সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে একটি সিদ্ধান্ত নিলেন অধ্যক্ষ কাকলি হালদার। আজই একবার কলেজে যাবেন এবং একই সময়ে সহকর্মীদেরও আসতে বলবেন। সবাইকে নিয়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা দরকার। খানিক পরেই তিনি ফোন করলেন উপাধ্যক্ষকে। সকাল এগারোটায় কলেজে সহকর্মীদের নিয়ে একটি জরুরি সভা আহ্বানের কথা জানিয়ে দিলেন।
যথাসময়ে কলেজে উপস্থিত সকল সহকর্মী। অধ্যক্ষ কাকলি হালদারের কক্ষে সভায় বসেছেন সবাই। কাকলি উপস্থিতির জন্য সহকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, ছুটির দিনে আপনাদের কলেজে আসতে বলেছি। কিন্তু আজ আপনাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা আমার কাছে খুব জরুরি মনে হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কলেজ পরিচালনায় আমাদের করণীয় নির্ধারণ করা দরকার। আপনাদের মতামত জানতে চাই।
উপাধ্যক্ষ শাহানা আক্তার বলেন, ম্যাডামের সঙ্গে আমিও একমত। এখন থেকে আমাদের কাজে কথায় ক্লাসের পাঠদানে নতুন ভাবনার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আশাকরি সবাই বিষয়টি অনুধাবন করছেন। ধন্যবাদ।
সহকারী অধ্যাপক শোভন রহমান বলেন, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ মহোদয়কে ধন্যবাদ এবং সহকর্মীদের শুভেচ্ছা। এই সভাটির প্রয়োজন ছিল। আমি অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি, অতীতের মতো আগামী দিনগুলোতেও ঐতিহ্যবাহী এই কলেজের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার জন্য কাজ করে যাব।
শোভন রহমান কথা বলার পর সবাই নীরব। আর যেন কেউ কথা বলতে ইচ্ছুক নন। কাকলি বলেন, আর কারো কোনো বক্তব্য নেই? আর কেউ বলবেন না?
আরো মিনিট দুই পর ইতস্তত ভঙ্গিতে সহকারী অধ্যাপক কলিমউল্লাহ উঠে দাঁড়ান, আস্সালামুআলাইকুম, আমি সামান্য একটু কথা বলতে চাই। শোভন সাহেবের সঙ্গে আমিও সহমত পোষণ করি। কিন্তু এখন অবস্থা আগের ঠিক বিপরীত। সেজন্য এই মুহূর্তে আমাদের একটি কাজ করা উচিত।
এই পর্যন্ত বলে কলিমউল্লাহ একটু থামেন। তার দিকে সবার উৎসুক দৃষ্টি।
আবার বলতে শুরু করেন তিনি, অধ্যক্ষ মহোদয়ের পেছনে দেয়ালের গায়ে শেখ মুজিব আর শেখ হাসিনার যে দুটি ছবি টাঙানো আছে সে ছবি দুটি এখনই আমাদের নামিয়ে ফেলা উচিত। এই কলেজের ওপর সাংবাদিকদের নজর সবচেয়ে বেশি। কারণ সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং এই কলেজের ছাত্রী ছিলেন; আর সবাই জানে অধ্যক্ষ কাকলি ম্যাডাম শেখ রাসেলের ক্লাসমেট ছিলেন।
কলিমউল্লাহর বক্তব্যে কাকলি হকচকিত, অপ্রস্তুত। হঠাৎ এভাবে এ ভাষায় সভার মধ্যে কেউ ছবি দুটি নামিয়ে ফেলার কথা বলতে পারেন, তা ভাবতেই পারেন না তিনি। ছবি নামিয়ে ফেলা যদি সময়ের দাবি হয়ে থাকে, তবে নামানো হবে। কাকলি গতকাল টেলিভিশনে এমন খবর দেখেছেন। তিনি নিজেও আজ এ বিষয়টি আলোচনা করবেন বলে মনে মনে ভেবে রেখেছিলেন। এখন এ বিষয়ে আপত্তি করবে কে? কিন্তু কলিমউল্লাহর বক্তব্যের ইঙ্গিত কী? জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম দুটি কী অশ্রদ্ধা ও অবজ্ঞার সঙ্গে উচ্চারণ করলেন তিনি। তার নিজের ভেতরের পরিচয় কি বেরিয়ে পড়ল না এতে? কারো মতাদর্শ ভিন্ন হতেই পারে, এটি তার নাগরিক অধিকার। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের আচরণে আলাপে কর্মকাণ্ডে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো কি সঙ্গত? এটি শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে? তাছাড়া কলিমউল্লাহ তার বক্তব্যে শেষ প্রসঙ্গটি কেন টেনে আনলেন? শেখ রাসেলের ক্লাসমেট হওয়া কি কারো অপরাধ? ক্লাসমেট যে কেউ হতে পারে। কাকলি না হয়ে এ স্থলে যদি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের কেউ হতো তাহলে কি ক্লাসমেট প্রসঙ্গটি আজ উত্থাপিত হতো? কলিমউল্লাহ কি মনে করিয়ে দিতে চান যে, বিগত সরকারের সময় কাকলি শেখ রাসেল ও বঙ্গবন্ধু সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। কাকলি মনে মনে ভাবলেন, হ্যাঁ, দিয়েছি, সেটা সরকারি দায়িত্ব পালনের অংশ ছিল। তাই বলে সেটা কি অপরাধ? কিন্তু এখন সে তর্কে যাওয়ার সময় নয়। ভাবতে ভাবতে নিজেকে সংযত করেন কাকলি। তারপর সহজ গলায় বলেন, আমরা সরকারি চাকরিজীবী, সব সময় সরকারের নীতি আদর্শ ভাবমূর্তি রক্ষাই আমাদের কাজ। দেয়াল থেকে ছবি নামানোও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়।
কলিমউল্লাহ-সহ অত্যুৎসাহী আরো দুজন সহকারী অধ্যাপক ততক্ষণে দেয়াল থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি দুটি নামিয়ে ফেলার কাজে লেগে পড়েছেন।
অধ্যক্ষ কাকলি হালদার ছবি দুটির দিকে তাকিয়ে থাকেন চুপচাপ। তার ভেতরে চলছে এক অসহায় আলোড়ন। দুদিন আগেও যে ছবি দুটি সরকারি অফিসের দেয়ালে সমহিমায় সংরক্ষণ করা মর্যাদার ব্যাপার ছিল, আজ তা কত তুচ্ছ, অকিঞ্চিৎকর অবহেলার বস্তু। শেখ হাসিনা না হয় সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী, জনরোষে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, তার ছবি অপসারিত হতেই পারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ছবি! তিনি তো জাতির পিতা; তাঁর সারা জীবনের ত্যাগ, সংগ্রাম ও সাধনার সুচারু রূপায়ণ এ দেশ। সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রধানের দপ্তরে জাতির পিতার ছবি সংরক্ষণ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। তবু তাঁর এত অবমাননা কেন? ক্ষমতার পালাবদলে অন্য কোনো দেশে কি এমনটি ঘটে? হায় জাতির পিতা, আপনার অবস্থাও এ দেশে সংখ্যালঘুদের মতো। ক্ষমতার পালাবদলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা যেমন আপনিও তেমনি অবমাননার শিকার বার বার। তেপ্পান্ন বছরেও অমীমাংসিত এ দুটি বিষয়। এর মীমাংসা কোথায়, কখন?
সুজন বড়ুয়া : সৃজনশীল সাহিত্য রচয়িতা




