এখন সময়:রাত ৩:২০- আজ: শনিবার-১৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:রাত ৩:২০- আজ: শনিবার
১৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

ইউসুফ ইদ্রিসের গল্প – নারীমাংসের বাড়ি

ভাষান্তার : জ্যোতির্ময় নন্দী

 

লেখক পরিচিতি

ইউসুফ ইদ্রিস ছিলেন মিশরের একজন অগ্রণী কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও ছোটগল্পকার। তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত মিশরীয় জীবনের বাস্তবচিত্র তুলে ধরা এবং আধুনিক আরবি সাহিত্যে গভীর প্রভাব বিস্তারের কারণে। ইদ্রিস ১৯২৭ সালের ১৯ মে মিশরের শারকিয়া প্রদেশের ফাকুস শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং শৈশব কাটান মিশরের বদ্বীপ অঞ্চলের গ্রামীণ পরিবেশে। তাঁর বড় হয়ে ওঠার বছরগুলো ছিল নানা দুঃখ-কষ্টে ভরা। শৈশবে মা-বাবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, দীর্ঘ পথ হেঁটে স্কুলে যাওয়া-আসা– এগুলো তাঁকে সাধারণ মানুষের সংগ্রামের প্রতি গভীর সংবেদনশীল করে তোলে। পরে তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন (১৯৪৫-১৯৫১) করতে যান। সেখানে তিনি সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং রাজতন্ত্র ও ব্রিটিশ প্রভাবের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কিছুদিন কারাবরণ করেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক হয়ে ইদ্রিস কায়রোর কাসর এল আইনি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন এবং পরে শহরের দরিদ্রতম এলাকায় স্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ অভিজ্ঞতা তাঁকে মিশরের নিম্নবিত্ত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত করে তোলে এবং তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি চিকিৎসা পেশা ত্যাগ করে সম্পূর্ণভাবে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করেন। ইদ্রিস আধুনিক আরবি ছোটগল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রথাগত আরবি সাহিত্য থেকে সরে এসে কথ্য মিশরীয় উপভাষাকে শুদ্ধ আরবির সঙ্গে মিশিয়ে সাধারণ গ্রামবাসী ও শহুরে দরিদ্র মানুষের বাস্তব জীবনচিত্র তুলে ধরেন। তাঁর প্রথম গল্পসংকলন আরখাস লায়ালি (সবচেয়ে সস্তা রাত, ১৯৫৪) প্রকাশিত হলে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। বইটির ভূমিকায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক তাহা হুসেইন তাঁকে ‘নতুন প্রতিভা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে: আলাইসা কাজালিক (এমনই তো?, ১৯৫৭), উপন্যাস আল-হারাম (নিষিদ্ধ, ১৯৫৯) ও আল-আইব (পাপ, ১৯৬২), এবং নাটক আল-ফারাফির (ফারফুররা, ১৯৬৪) এবং আল-লাহজাত আল-হারিজা (সঙ্কটময় মুহূর্ত, ১৯৫৮)। তিনি আধুনিক মিশরীয় নাটক নিয়ে প্রবন্ধও লিখেছেন, যেখানে তিনি লোকজ ঐতিহ্য ও ছায়ানাট্যকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি স্বতন্ত্র মিশরীয় নাট্যরূপের পক্ষে মু দেন। তাঁর রচনায় সামাজিক অবিচার, দারিদ্র্য এবং চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা বার বার উঠে এসেছে, যা মিশরীয় সমাজের বাস্তবুা তুলে ধরার প্রতি তাঁর অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। একজন কট্টর বামপন্থী হিসেবে ইদ্রিস প্রথমে প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের সংস্কারকে সমর্থন করেছিলেন, কিন্তু পরে হতাশ হয়ে পড়েন এবং ১৯৫৪ সালে নাসের সরকারের কিছু নীতির বিরোধিতা করার কারণে কারাবরণ করেন। তাঁর এসব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকর্মে দ্রোহ ও সামাজিক সচেতনুার সুর এনে দেয়। ইদ্রিস বিয়ে করেন রজা আল-রিফাইকে। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে কন্যা নেসমা ইদ্রিসও একজন কথাসাহিত্যিক। ১৯৯১-এর ১ আগস্ট লন্ডনে ইউসুফ ইদ্রিস মৃত্যুবরণ করেন। আধুনিক আরবি সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি একটি স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। ইদ্রিস আরবি ছোটগল্পের পথিকৃৎ হিসেবে সমাদৃত। তিনি নতুন থিমের দিগন্ত উন্মোচন করেছেন এবং সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। আধুনিক মিশরীয় সংস্কৃতি, সামাজিক সংগ্রাম এবং আরবি সাহিত্যের বিকাশ বোঝার জন্য তাঁর রচনাগুলো অপরিহার্য পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর প্রভাব আরব বিশ্বের বহু প্রজন্মের লেখকদের অনুপ্রাণিত করে আসছে।

 

আংটিটা বাতির পাশে। নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে কানকে অন্ধ করে দেয়। নীরবতার মধ্যে চুপিসারে আঙুল এগিয়ে আসে। আংটিটা পরে নেয়। নীরবতার মধ্যে বাতিও নিভে যায়। রাজত্ব করে অন্ধকার। নীরবতার ভেতরে, বাতিও নিভে যায়।

বিধবা আর তিনটি কন্যা।

আর বাড়িটি এক কামরার।

আর শুরুটা হল নীরবতা।

 

বিধবা নারীটি দীর্ঘাঙ্গী, গৌরবর্ণা, তন্বী দেহ, বয়স পঁয়ত্রিশ। মেয়েরাও দীর্ঘাঙ্গী, প্রাণোচ্ছল; শোক প্রকাশ করার জন্যে হোক বা না হোক, তারা কখনোই তাদের প্রলম্বিত কালো পোশাক খোলে না। সবার ছোট মেয়েটার বয়স ষোলো, আর বড়টার কুড়ি। মেয়ে তিনটে দেখতে ভালো না; তারা পেয়েছে তাদের বাবার গায়ের গাঢ় তামাটে রঙের উত্তরাধিকার। তারা যেন সঙ্গতিহীন কয়েকটা টুকরো; মায়ের দিক থেকে তারা প্রায় কিছুই নেয় নি।

ঘরটি তাদের উপর নানা বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়। দিনের বেলা এটা তাদেরকে ধারণ করে– বিধিনিষেধ আর চরম দারিদ্র্য– এর মধ্যেই এক ধরনের সৌন্দর্য, যা সাধারণত আরো বড় বাড়িগুলোতেই দেখা যায়। চারটি নারীর ছোঁয়ার প্রাচুর্যে ঘরটা ভরে ওঠে। আর রাতে তাদের দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে উষ্ণ জীবন্ত মাংসখণ্ডের মতো– কেউ বিছানায়, কেউ বিছানার চারপাশে। বিছানা থেকে নিঃশ্বাস উঠে আসে– উষ্ণ, অশান্ত, কখনো ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস।

 

পুরুষটির মৃত্যুর পর থেকে এ ঘরে রাজত্ব করছে নীরবতা। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তিনি দু বছর আগে মারা গেছেন। শোকপ্রকাশের কাল শেষ হয়েছে, কিন্তু শোকের অভ্যাস রয়ে গেছে, আর তার উপর নীরবতা। এক দীর্ঘ, অন্তহীন নীরবতা– যেন আসলে তা অপেক্ষার নীরবতা। মেয়েরা বড় হচ্ছে, প্রত্যাশা দীর্ঘতর হচ্ছে, কিন্তু কোনো পাণিপ্রার্থী আসছে না। আর কে এমন নির্লজ্জ যে, গরিব আর বিশ্রী চেহারার মেয়েদের দরজায় এসে কড়া নাড়বে, তদুপরি যদি তারা অনাথ হয়? তবুও আশা থাকে, অবশ্যই থাকে, প্রতিটি শস্যদানারই মূল্য আছে, শুধু তার স্বামীর ঘরের প্রতিটি মেয়ে বাদে। আর যদি দারিদ্র্য থাকে, তা সবসময়েই আছে, আছে আরো বেশি দরিদ্রও। আর যদি কুশ্রীতা থাকে, তাহলে আরো বেশি কুশ্রীও আছে। আর প্রত্যাশার বস্তু পাওয়া যায়, কখনো কখনো পাওয়া যায়, ধৈর্য ধরতে পারলে তবেই।

 

অব্যাহত নীরবতা ভাঙে শুধু পাঠের শব্দে, যা একঘেয়ে সুরে ওঠে-নামে, কোনো প্রয়াস নেই তাতে, কোনো আবেগ নেই। মৃতের আত্মার শান্তির জন্যে কোরান পাঠ এটা, আর পাঠকটি অন্ধ। আর সময়টা বদলায় না—সে আসে শুক্রবার বিকেলে। তার লাঠি দরজায় টোকা দেয়, সে নিজেকে সমর্পণ করে বাড়ানো হাতে, গালিচায় বসে, আর পাঠ শেষ হলে নিজের চপ্পল খুঁজে নেয়, বিদায় সম্ভাষণ জানায়—যার উত্তর কেউ দেয় না—তারপর চলে যায়। অভ্যাসে আসা, অভ্যাসে পাঠ করা, অভ্যাসে যাওয়া—যতক্ষণ না আর কেউ তাকে অনুভব করে বা লক্ষ্য করে।

 

সবসময় নীরবতা, যতক্ষণ-না শুক্রবারের পাঠ তা কেটে দেয়, আর তা হয়ে ওঠে নীরবতা দিয়ে নীরবতাকে কেটে ফেলার মতো। সবসময়, অপেক্ষার মতো, আশার মতো– আশা সামান্য কিন্তু সবসময়কার। এবং অন্ততপক্ষে আশা সবসময় এখানে থাকে, প্রতিটি মেয়ের জন্য, অন্ততপক্ষে সামান্য হলেও। তারা আর খোঁজে না, আর কখনো খুঁজবে না।

স্থায়ী নীরবতা, যতক্ষণ না কিছু ঘটছে। শুক্রবার বিকেল আসে, কোরান পাঠক আসে না। যেকোনো চুক্তি, যত দীর্ঘই হোক, তারও শেষ থাকে। এ চুক্তি শেষ হয়ে গেছে।

 

বিধবা মহিলাটি আর মেয়েরা এখন বুঝতে পারল কী ঘটেছে। নীরবতাকে ভাঙার মতো একটা শব্দও আর ছিল না। সেইসাথে কিন্তু এটাও তারা বুঝল যে, সপ্তাহে একবার এসে যে-মানুষটি দরজায় কড়া নাড়ত, সে একজন পুরুষমানুষ। এটা সত্যি যে, তাদের মতোই দরিদ্র সে, কিন্তু তার পোশাক সবসময় পরিষ্কার, জুতো সবসময় চকচকে, আর পাগড়ি যত্ন করে বাঁধা। অন্ধত্ব তাকে প্রতিবন্ধী করেছে, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শক্তিশালী, গভীর, অনুরণনময়।

 

প্রস্তাব দেয়া শুরু হল: কেন এখনই চুক্তি নবায়ন করা যাবে না, কেন এ মুহূর্তেই তাকে একটা চিঠি পাঠানো যাবে না? ব্যস্ত, ক্লান্ত, এ অপেক্ষা নতুনকিছু নয়, আর সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে পুরুষটি আসে। সে কোরান পড়ে, আর মনে হয় যেন প্রথমবার পড়ছে। আরেকটি প্রস্তাব ওঠে: আমাদের একজন তাকে বিয়ে করবে না কেন, কেন ঘর ভরে উঠবে না পুরুষের কণ্ঠস্বরে? সে অবিবাহিত, সংসার ধর্মে প্রবেশ করে নি, তার গোঁফ-দাড়ি কেবল গজিয়ে উঠছে। সে অল্পবয়েসি, আর শোনা যাচ্ছে, সে ভালো একটা মেয়ের খোঁজে আছে।

মেয়েরা প্রস্তাবটা দেয়, আর মা তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, নিয়তির সঙ্গিনী হওয়ার জন্যে কাকে বেছে নেয়া যায় তা নির্ধারণ করতে। কিন্তু মুখগুলো অন্যদিকে ফিরে যায়, প্রস্তাব শুধুমাত্র প্রস্তাবই থেকে যায়, যেন নীরবে বলে– “আমরা কি একটা অন্ধকে বিয়ে করে আমাদের উপোস ভাঙব?” ৃ তারা তখনো স্বপ্ন দেখতে থাকে, একদিন তাদের বিয়ে হবে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন বরদের সাথেই।

 

“তুমি বিয়ে কর, মা। তুমি বিয়ে কর।”

 

“আমি? ৃ লজ্জা করে না তোদের!ৃ আর লোকে কী বলবে?”

 

“লোকে সবসময় যা বলে তাই বলবেৃ আর যে-ঘরে পুরুষ মানুষের আওয়াজ নেই, সে ঘর নিয়ে লোকে তেমনকিছু বলে না ।”

 

“তোমাদের আগে আমি বিয়ে করব? অসম্ভব।”

 

“তুমি আমাদের আগে বিয়ে করলে সেটাই কি ভালো হবে না, মা? তখন আমাদের ঘর আবার পুরুষমানুষের পায়ের শব্দকে জানবে, আর তারপরই না হয় আমরা বিয়ে করব? তুমি ওকে বিয়ে করো, মা, ওকে বিয়ে করো।”

 

বিধবা মহিলাটি অন্ধ কোরান পাঠককে বিয়ে করল। ঘরটায় প্রাণের সংখ্যা একটা বেড়ে গেল, আয়ও সামান্য বাড়ল, এবং আরো বড় বড় সমস্যাগুলোও দেখা দিল।

 

প্রথম রাত কেটে গেল। বিছানায় ওরা দুজন, এটা সত্যি। কিন্তু তারা দুজনেই একে অন্যকে ছোঁয়ার সাহস করতে পারল না, আর যদি দৈবাৎ, আর মেয়ে তিনটে ঘুমায়, কিন্তু প্রত্যেকেই বরটাকে পরীক্ষা করে, খুঁটিয়ে দেখে, নিখুঁতভাবে ওদের দুজনের মধ্যেকার দূরত্ব মাপে, খুঁজতে থাকে সব চোখ, খুঁজতে থাকে যদি, খুঁজতে থাকে সজাগ থাকা।

 

মেয়েরা বড় হয়, সব জানে, সচেতন, আর রাতে তাদের উপস্থিতিতে ঘরটা যেন আলোয় ভরে ওঠে। দুপুরের পর আর কোনো অজুহাত থাকে না, একে একে তারা বেরিয়ে যায় চুপিচুপি, সূর্যাস্তের আগে ফিরে আসে পুরুষটির কাছে, দ্বিধাগ্রস্ত, লজ্জিত, এক পা এক পা করে। পুরুষটির দিকে এগোতে দেরি করে, যতক্ষণ না সে আরো কাছে আসে, তারপর বিস্মিত, বিভ্রান্ত হয়ে একছুটে পালিয়ে যায়।

 

পুরুষটি খিলখিল করে হাসে। তার সাথে মিশে যায় নারীকণ্ঠের খিলখিল হাসি। নিঃসন্দেহে, তাদের মা হাসছে, আর সেই পুরুষ, যাকে তারা কেবল ভদ্র, বিনয়ী, শ্রদ্ধাশীল হিসেবে চিনে, সেও হাসছে। মা তাদের স্বাগত জানায় তাদেরকে জড়িয়ে ধরে, তখনো হাসতে থাকে, তার চুল লজ্জিত সিক্ততায়, আর তখনো হাসতে থাকা তার মুখ, প্যারাফিন বাতির পাশে যেটাকে তারা দেখতে  মাকড়সার জালের মতো সরু সরু কুঞ্চনে ভরা, সেটা হঠাৎ এক আলোয় ভরে ওঠে, তাদের সামনে যেন জ্বলে ওঠে এক বৈদ্যুতিক বাতি। তার চোখ ঝলমল করে। চোখ দুটো বদলে গেছে, স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে, আনন্দের অশ্রুতে। দুটো চোখ যেন এতদিন কোনো খনির তলদেশে বাস করছিল।

নীরবতা ম্লান হয়ে আসে, সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। রাতের আহারের সময়, খাওয়ার আগে, খাওয়ার পরে মজার মজার চুটকি আর গল্প বলা হয়, গান হয়। লোকটার কণ্ঠস্বর মধুর, আর সে গান গায়, বিখ্যাত দুই গাইয়ে উম্মে কুলসুম আর আবদ আল ওয়াহাবকে অনুকরণ করে। তার কণ্ঠস্বর উঁচু, উল্লাসে একটু ভাঙা ভাঙা, ওদের মায়ের জন্য ভালো বিনোদন। আর পরদিন, পুরুষমানুষটার হাসি অন্য পুরুষদের টেনে আনে। আর পুরুষরাই তো পুরুষদের খাদ্য।

 

হ্যাঁ, মেয়েরা। কালকে পুরুষমানুষরা আসবে আর নবদম্পতির বিয়েতে উল্লাস করবে। কিন্তু আসন্ন সত্যটি তাকে গ্রাস করে। সেটা পুরুষরা নয়, বা দুজনের বিয়ে নয়। বরং এটা যে, লোকটা একজন তরুণ, অন্ধ তাতে কী, আর অন্ধরা শুধু অন্ধ বলেই যে বেশিরভাগ মানুষ তাদের মতামতকে উপেক্ষা করে, তাতেই-বা কী এসে যায়। এই তরুণ শক্তিশালী, বলিষ্ঠ, জীবন্ত। দুবছরের অসুস্থতা, অক্ষমতা আর অন্তহীন বার্ধক্যের অভিজ্ঞতায় ডুবে থাকার পর এটাই মহিলাটাকে তৃপ্ত করে।

 

নীরবতা চলে গেল, আর যেন আর কখনো ফিরে আসবে না। জীবনের কোলাহল তীক্ষ্ম হল, আর স্বামী, তার স্বামী, তার কাছে বৈধ হলো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল, তাতে কী দোষ! পুরুষটা তোমার সাথে যা করে, সবই বৈধ। যতক্ষণ না নারীটির আর কোনো দ্বিধা থাকে, বা কোনো গোপন আবরণ। যতক্ষণ-না রাত আসে আর তারা সবাই একত্র হয়। জীবনের দিকে ডাক দেয় ইন্দ্রিয়গুলো, আর তাদের দেহ। যতক্ষণ-না মেয়েরা ছড়িয়ে পড়ছে, আলাদা হয়ে যাচ্ছে, বুঝতে পারছে, উপলব্ধি করছে, এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের আন্দোলন আর কণ্ঠস্বর… বিছানায় অসাড় হয়ে গিয়ে তাদের নড়াচড়া সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, আর হঠাৎ কাশি, গোঙানি উঠে আসে, আর অসম্বদ্ধ শীৎকার।

 

মহিলাটির দিনগুলো কাটত বড়লোকদের বাড়িতে কাপড় ধোয়ার কাজে। পুরুষটির দিনগুলো কাটত গরিবদের ঘরে কোরান পাঠে। প্রথমে তার অভ্যাস ছিল না দুপুরে ঘরে ফেরার, কিন্তু রাত দীর্ঘ, আর সে নিদ্রাহীন হয়ে পড়ে। দুপুরে ঘরে ফিরে আসতে শুরু করে সে, রাতের অস্থিরতা থেকে শরীরকে বিশ্রাম দিতে, আর পরবর্তী রাতের জন্য প্রস্তুত হতে। একদিন, রাতের তৃপ্তির পর– আর প্রতিটি রাতেই সে তৃপ্ত হয়– সে হঠাৎ তাকে জিজ্ঞাসা করল, দুপুরবেলা তার কী হয়েছিল, কেন সে এখন অত তড়বড় করে কথা বলছে, আর তাহলে কেন সে আজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা নীরবে বসে ছিল, আর কেন সে এখন বিয়ের আংটিটা পরেছে। বিয়েতে সে তো শুধু আংটিটাই দিয়েছে, তবে দুপুরবেলা সে সেটা পরে না কেন?

 

মহিলাটা হয়তো আশঙ্কায় কেঁপে উঠতে বা দাঁড়িয়ে গিয়ে চেঁচামেচি করতে পারত। চাইলে সে পুরুষমানুষটার প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে পারত। হয়তো সে তাকে প্রতারণা করতে পারত, আর সেই একটা কথা, সেই অদ্ভুত কুৎসিত কথাটা তাকে কিছুতেই বলতে পারত না।

 

কিন্তু এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা এটাকে পুরো আটকে ফেলল, আর তার সাথে আটকে ফেলল মহিলাটার নিঃশ্বাসকেও। তাকে নীরব করে দেয়া হল। তার কান পরিণত হল নাকে, আর অনুভবে, আর চোখে। সে নিজেকে বাধ্য করল কান পেতে রাখতে, যাতে কোনো নড়াচড়া হলে সে প্রথমেই জানতে পারে। যেভাবেই হোক, সে নিশ্চিত হয় যে, এটা মেজো মেয়েটা। মেয়েটার চোখে এমন দুঃসাহসের দৃষ্টি, যেন গুলি ছোঁড়া হলেও সে মরবে না। কিন্তু মা নিজেকে বাধ্য করে কান পেতে রাখতে। মেয়ে তিনটার নিঃশ্বাস আরো জোরালো, গভীর, জ্বরাক্রান্তের মতো উষ্ণ, আর আকাঙ্ক্ষায় ফেনায়িত। সে আলাদা শুয়ে, দ্বিধাগ্রস্ত। নিষিদ্ধ স্বপ্ন তাকে ব্যতিব্যস্ত করে। বিশৃঙ্খল শ্বাসপ্রশ্বাস পরিণত হয় হিসহিস শব্দে, যেন তৃষ্ণার্ত মাটি থেকে বাষ্প বেরিয়ে আসছে। আর হৃদয় ভাঙার ব্যাপ্তি আরো বর্ধিত, গভীর আর আবদ্ধ হলো। সে শ্বাস নিল, প্রতিটি ইন্দ্রিয় শুনতে উদগ্রীব, তবু পারল না উষ্ণ মাংসের একটা স্তূপ থেকে আরেকটা স্তূপকে আলাদা করতে– সবকটাই গোঙাচ্ছে আর গুমরে উঠছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, শ্বাস বন্ধ করে রাখছে, হয়তো সাহায্য চাইছে, হয়তো ভিক্ষা চাইছে, হয়তো আরোকিছু।

 

সে তার দ্বিতীয় স্বামীতে আপাদমস্তক ডুবে গেল, আর ভুলে গেল প্রথম স্বামীকে। কিন্তু তার মেয়েদের জন্য ধৈর্য পরিণত হল তেতো ওষুধে, যখন তাদের সম্ভাব্য বরদের মরীচিকা দেখা বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ যেন হুল ফুটে মা জেগে উঠল, দুর্বোধ্য রহস্যের আকর্ষণে আতঙ্কিত হয়ে। মেয়েরা ক্ষুধার্ত। খাদ্য নিষিদ্ধ। তারা সুস্থ, কিন্তু খাদ্য নিষিদ্ধ। যা নিষিদ্ধ, তার জন্যে ক্ষুধার সাথে আর কিছুর তুলনা চলে না। সে পুরুষটাকে জানে। পুরুষটা তাকে জানে, আর তার আত্মাকে শীতল করে, তার দেহ ভোগ করে, আর পুরুষটাকে সে জানে। আর যা তৃপ্ত, তা তৃপ্ত, আর পুরুষটার স্বাদ ভুলে যাওয়া অসম্ভব।

 

সে সেই মা, যে নিজের মুখ থেকে খাদ্য নিয়ে মেয়েদের খাইয়ে নিজে অনাহারে থাকত, চিন্তিত থাকত তাদের পেট ভরেছে কিনা। সে তাদের মা। সে কি ভুলে গেছে?

এটা তার উপর চাপ দিতে থাকল, হৃদয় ভেঙে যাওয়াকে নীরবতায় রূপান্তরিত করল। মা নীরব হল, আর সেই মুহূর্ত থেকে নীরবতা আর কখনোই তাকে ছাড়ল না। প্রাতঃরাশের সময় সে সামনে বসা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে দেখল, মেজো মেয়েটা চুপচাপ, আর চুপচাপই থেকে গেল সে।

 

রাতের আহারের সময় আসে, অন্ধ তরুণটি আনন্দে ভরপুর, এখনো মজা করছে, গান গাইছে, হাসছে, কিন্তু তার মাতামাতিতে যোগ দিচ্ছে কেবল ছোট আর বড় মেয়েটা।

দীর্ঘ ধৈর্য তিক্ততাকে পরিণত করে অসুখে, আর সত্যটাকে বুঝে নিতে কারো কোনো ভুল হয় না। একদিন বড় মেয়ে মায়ের আঙুলে পরা আংটির দিকে তাকিয়ে সেটার প্রশংসা করতে লাগল। মায়ের হৃদয় ধুকপুক করতে লাগল, ধুকপুকানি আরো বেড়ে গেল, যখন মেয়ে বলল সে তার মায়ের আংটিটা পরতে চায়, শুধু আজকের দিনটার জন্যে। আর মা চুপচাপ নিজের আঙুল থেকে আংটিটা খুলল, আর চুপচাপ আংটিটা বড় মেয়ের বাড়িয়ে দেয়া আঙুলে পরিয়ে দিল।

আর পরের রাতের খাওয়া দাওয়া সারা হল নীরবতায়। কথা বলতে অস্বীকার করল বড় মেয়েটা।

অন্ধ তরুণটি চুটকি বলে, গান গায়, হাসে, কিন্তু তার সঙ্গে যোগ দেয় কেবল ছোট মেয়েটা।

কিন্তু ছোট মেয়েটাও দ্রুত বড় হয়ে যায়, আর আংটির খেলায় তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে, আর নীরবতার মধ্যেই, সে একটি ভূমিকা পেয়ে যায়।

 

আংটিটা বাতির পাশে। নীরবতা নেমে এসে কানকে অন্ধ করে দেয়। আর এই নীরবতার মধ্যে ভূমিকাটার মালিকের আঙুল এগিয়ে আসে, আংটিটা পরে নেয়। আর নীরবতার মধ্যেই বাতি নিভে যায়। আর অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে। অন্ধকার চোখকে অন্ধ করে দেয়। হৈচৈ, কৌতুক, গান কিছুই আর রইল না, শুধু অন্ধ তরুণটি ছাড়া।

 

এবং কোলাহল আর শব্দের বাইরে অপেক্ষা করছে, ষড়যন্ত্র করছে কামনা, পুরুষমানুষটাকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে নীরবতার বিরুদ্ধে, তাকে ঠেলে দিচ্ছে ভাঙনের সীমানায়। অন্যদিকে, সে জানতে চায়, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানতে চায়। সে নিজেকে বলল, নারীদের স্বভাবের একটা শর্ত হলো তারা একই থাকে না, এক রূপ থেকে অন্য রূপে বদলায়। কখনো সে শিশিরের মতো সতেজ, আবার কখনো ক্লান্তিতে ভরা ঘোলা জলাশয়ের মতো। কখনো গোলাপের পাঁপড়ির মতো মসৃণ, আবার কখনো কাঁটাওয়ালা ফলের মতো রুক্ষ। আংটিটা সবসময় আঙুলে থাকে, একথা সত্য, কিন্তু আংটির আঙুল প্রতিবার আলাদা হয়ে যায়। আর সে প্রায় নিশ্চিত জানে, আর তারা, নারীদের সবাই, অবশ্যই জানে, তবে কেন নীরবতার কথা বলা হবে না? বলা হবে না কেন?

 

কিন্তু রাতের খাওয়ার সময়ে প্রশ্নটা তাদেরকে ভারাক্রান্ত করে—যদি পুরুষটি নীরবতার কথা বলে, তখন কী হবে? ৃ কী হবে, যদি মহিলাটি কথা বলে?

 

শুধু প্রশ্নটা মাথায় এলেই তাদের খাবার গলায় আটকে যায়।

 

মহিলাকে আশ্রয় দেয় নীরবতা, আর সে তা ছাড়তে অস্বীকার করে।

 

কিন্তু পুরুষটাই আশংকা করতে শুরু করে যে, কোনো ঘৃণ্য ঘটনা ঘটেছে, আর সে নীরবতার গায়ে আঁচড় কাটতে থাকে। হয়তো, কোনো সন্ধ্যায়, নীরবতার প্রাসাদে একটা শব্দ মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ে, আর তাতে যদি সে-প্রাসাদ ভেঙে পড়ে তো তার কপালে দুঃখ আছে।

 

এক অদ্ভুত ভিন্নধরনের নীরবতা উদ্ভূত হয়ে সবকিছুর আশ্রয় হয়ে ওঠে।

 

এবার এটা এক স্বেচ্ছা নীরবতা: এর কারণ দারিদ্র্য নয়, ধৈর্য নয়, হতাশা নয়।

 

হয়তো এটা আরো গভীর ধরনের নীরবতা, আর এটা হল একটা চুক্তির নীরবতা, আরো জোরালো ধরনের একটা চুক্তি– যেটা আসলে কিনা চুক্তিহীন কোনোকিছুর ব্যাপারে চুক্তি।

 

বিধবা আর তিন মেয়ে।

আর এক কামরার একটা বাড়ি।

আর নবায়িত নীরবতা।

আর সেই অন্ধ অতিথি, যে এই নীরবতার সঙ্গে আসে, আর নীরবতা বজায় রেখে সে নিজেকে নিশ্চিত করে যে, বিছানায় তার সঙ্গী সবসময়েই তার স্ত্রী—বৈধ, পবিত্র, আর তার আংটির বাহক। তরুণী হোক বা বয়স্ক, মসৃণ হোক বা রুক্ষ, রোগা হোক বা মোটা—এটা মহিলার বিষয়, কেবল তারই। এটা দৃষ্টিশক্তি সম্পন্নদের বিষয়, আর এর দায়িত্বও কেবল তাদের। তারাই নিশ্চিত হওয়ার আশিসপ্রাপ্ত। তারাই পার্থক্য করতে সক্ষম। যতক্ষণ সে নিজে দৃষ্টিশক্তি থেকে বঞ্চিত, ততক্ষণ সে নিশ্চিত হওয়া থেকেও বঞ্চিত থাকবে। সে অন্ধ, আর অন্ধদের কোনো দোষারোপ করা যায় না।

 

অন্ধদের কোনো দোষারোপ করা যায় না?

 

 

 

জ্যোতির্ময় নন্দী, কবি ও অনুবাদক

আলোকচিত্রশিল্পী রঘু রাই: ক্যামেরার ভেতর দিয়ে একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষ্য

শাহেদ কায়েস বিশ্বখ্যাত ভারতীয় আলোকচিত্রশিল্পী রঘু রাই আর আমাদের মাঝে নেই। ৮৫ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তের পথে। কিন্তু তাঁর কাজ বেঁচে থাকবে আমাদের

লেখালেখি করে কয় টাকা পাও?

মাহফুজা অনন্যা   “লেখালেখি করে কয় টাকা পাও”? এরকম প্রশ্ন লেখক কবির জন্য নতুন নয়! সেদিন আমার এক শিক্ষিত বন্ধুও আমাকে একইভাবে প্রশ্ন করেছিল খুব

মায়ের কোলে শেষ আশ্রয়

প্রজ্ঞাজ্যোতি ভিক্ষু   ‘মা’ আমার — এক অবিরাম ভালোবাসার গল্প মা—এই ছোট্ট শব্দটির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বিশাল পৃথিবী, অফুরন্ত ভালোবাসা আর অসীম ত্যাগের গল্প।

প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির দুই বিভাগে বৈশাখী উৎসব উদযাপিত

পাবলিক হেলথ বিভাগ: প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির জিইসি মোড়স্থ ক্যাম্পাসে পাবলিক হেলথ বিভাগের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বৈশাখী ও পিঠা উৎসব-১৪৩৩ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৪ এপ্রিল ২০২৬ বিকেল ৩টায়

লিমন- বৃষ্টি : পরকালের শান্তি যেন তোমাদেরকে আলিঙ্গন করে

সাইয়িদ মাহমুদ তসলিম বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয় একক হৃদস্পন্দন দিয়ে কান্না করেছে বাংলাদেশি মেধাবী দুই শিক্ষার্থীর জন্য । এ যেন এক বিরল ঘটনা । বিশ্বের এমন