অনিন্দিতা অনি
অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক বাউল শিল্পী। গাইতে শুরু করলেন—
“সুরের গুরু, তোমার সুরের সভায় ওই/ আমার গান কি হবে ভুল/ আমি ভাঙা বাংলার তার ছেঁড়া এক সুরহারা বাউল।”
এক মুহূর্তেই যেন মঞ্চের অন্ধকার ভেদ করে উঠে এল বাংলার এক চিরচেনা অথচ ক্রমশ আড়ালে চলে যাওয়া মুখ—বাউল। আর সেই বাউলের কণ্ঠ ধরেই শুরু হলো বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, চট্টগ্রাম জেলা সংসদের আয়োজন ‘একতারা ও রবীন্দ্র-বীণা’—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস বাইশে শ্রাবণ স্মরণে এক ব্যতিক্রমী সুর-আলেখ্য।
গত ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করার প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে বাংলার বাউল ও লোকঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ককে গান, আবৃত্তি, নৃত্য ও কথামালার মধ্য দিয়ে নতুন করে অনুভব করার প্রয়াস নিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ, সাজাদপুর, পতিসরের দিনগুলো যেন এই আয়োজনের অন্তরালে ফিরে আসে। বাউলদের গান, তাঁদের জীবনদর্শন এবং ‘মনের মানুষ’-এর অনুসন্ধান কীভাবে কবির সৃষ্টির ভেতর প্রবেশ করেছিল—অনুষ্ঠানের বিন্যাসে ছিল তারই শিল্পিত অনুসন্ধান। একতারার মাটির সুরের পর রবীন্দ্র-বীণার অনুরণন হয়ে ওঠে দুই স্রোতের এক অন্তর্লীন কথোপকথন।

সমবেত কণ্ঠে ‘দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ’-এর পর ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি’ যখন এসে মেশে, তখন আলাদা করে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। শ্রোতাই যেন সুরের ভেতর দিয়ে সেই যোগসূত্র আবিষ্কার করে নেন। লালনের ‘মিলন হবে কত দিনে’-এর আকুতি পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার মন যখন জাগলি নারে’—মনের মানুষ ও আত্মঅনুসন্ধানের এই পর্বের পর ‘কৃষ্ণকলি’ অনুষ্ঠানকে নিয়ে যায় অন্য এক মাত্রায়।
মনের সৌন্দর্য থেকে বাইরের সমাজের সৌন্দর্যবোধ—কৃষ্ণবর্ণ এক পল্লিবালিকার চোখ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করেছিলেন, সেটিই পরক্ষণে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘সুরের গুরু’ যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর-প্রশ্ন। রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি কোথায়? সেই ময়নাপাড়ার মাঠ, সেই পল্লিবালিকা—বাস্তব জীবনে তার কী হলো?
এই জায়গাতেই ‘একতারা ও রবীন্দ্র-বীণা’ নিছক সংগীতানুষ্ঠান না থেকে সমাজবাস্তবতার দিকে মুখ ফেরায়। রবীন্দ্রনাথের কবিতার কৃষ্ণকলি আর শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক থাকে না; বাস্তব জীবনের এক বঞ্চিত মানুষের মুখও হয়ে ওঠে। যে বাউল মানুষের মুক্তি ও অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেন, বাস্তব সমাজে সেই বাউলই যখন অবহেলা, নিপীড়ন ও অসহিষ্ণুতার শিকার হন, তখন একতারার সুরের মধ্যেও প্রতিবাদের অনুরণন শোনা যায়।
আলোচনার পর্বও তাই মূল পরিবেশনা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি। অধ্যাপক সুধীর বিকাশ দেব বাউলদর্শনের মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে নেওয়ার দর্শনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে বাউলগানের অন্তর্নিহিত জীবনবোধের সঙ্গে অনুষ্ঠানের পরিবেশিত গানগুলোর একটি গভীর যোগসূত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথের নান্দনিক শিল্পবোধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। সৌন্দর্যকে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে কেবল বাহ্যিক রূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের অনুভব, জীবন ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন—তাঁর আলোচনায় উঠে আসে সেই দিকটি।
আর অভীক ওসমানের একটি বাক্য যেন উদীচীর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে—“উদীচী আছে বলেই সংস্কৃতির জগতে এখনও অগ্নিশিখা জ্বলছে।” কথাটি শুধু সংগঠনটির ভূমিকার প্রশংসা নয়; সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, মানবিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও যেন স্মরণ করিয়ে দেয়।
সবশেষে গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ সুরের পথ ধরে যখন পৌঁছে যাওয়া যায় ‘আমার সোনার বাংলা’-য়, তখন বোঝা যায় এই সুরযাত্রা কত দূরের পথ পেরিয়েছে। সেই স্বদেশচেতনার অনুরণন যখন শাহ আবদুল করিমের গানে ফিরে আসে, তখন স্পষ্ট হয়—প্রভাবের পথটি একমুখী নয়। বাউলের সুর যেমন রবীন্দ্রনাথকে স্পর্শ করেছে, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি ও পরবর্তী বাউলগানের ভুবনে নিজস্ব ছাপ রেখে গেছে।

অনুষ্ঠান যত এগিয়েছে, দর্শকরাও যেন ধীরে ধীরে সেই সুরযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছেন। পরিচিত গান নতুন বিন্যাসে ফিরে আসায় কোথাও ছিল বিস্ময়, কোথাও মুগ্ধতা। বাউলের গান বহুবার শুনলেও বাউল মানুষটির জীবন ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে এভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হওয়াকে অনেকেই আয়োজনটির বিশেষ অর্জন হিসেবে দেখেছেন। রবীন্দ্রনাথকে বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে নতুন করে আবিষ্কারের অভিজ্ঞতাও দর্শকের মনে রেখাপাত করেছে।
এই সুরযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নৃত্য ও আবৃত্তি। সূচনা বণিকের নৃত্য পরিচালনায় এবং মাধবী নৃত্যকলা একাডেমির পরিবেশনায় নৃত্যপর্বগুলো গানের আবহকে দৃশ্যমান করে তোলে। সুর-আলেখ্যের নির্দেশনায় ছিলেন সুনীল ধর; নির্মাণ ও পরিকল্পনায় সুনীল ধর, জয়তী ঘোষ, অপর্ণা চৌধুরী ও অনিন্দিতা দেবনাথ; কথামালায় জয়তী ঘোষ ও শান্তা; অর্পণা চৌধুরীর সঙ্গীত পরিচালনায় পরিবেশনাটি পেয়েছে সুসংহত কাঠামো। তালবাদ্যে শিমুল চক্রবর্তী
ও তরুণ চক্রবর্তী, বাঁশিতে সম্রাট দাশ এবং দোতারায় অনিন্দ্য বড়ুয়া সুরের বিন্যাসে যুক্ত করেছেন আলাদা মাত্রা।
উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সভাপতি জসীম চৌধুরী সবুজ এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট অসীম বিকাশ দাশের সাংগঠনিক নেতৃত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উদীচী বোয়ালখালী শাখার সঙ্গীত পরিবেশনাও যুক্ত হয়।
ফলে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিসরের বিভিন্ন শিল্পী ও সংগঠনের
অংশগ্রহণে আয়োজনটি হয়ে ওঠে আরও সমৃদ্ধ।

শেষে ‘আমার সোনার বাংলা’ যখন সমবেত কণ্ঠে বেজে ওঠে, তখন শুরুতে একা দাঁড়িয়ে থাকা সেই বাউলটির কথা মনে পড়ে। একতারার একতন্ত্রী সুর এসে মিশে যায় একটি জাতির কণ্ঠে।
‘একতারা ও রবীন্দ্র-বীণা’ তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান হয়ে শেষ হয়নি; রেখে গেছে বাংলার লোকঐতিহ্য ও রবীন্দ্রচেতনার এক গভীর, জীবন্ত এবং সমকালীন কথোপকথনের স্মৃতি। মঞ্চের শেষ আলো নিভে যাওয়ার পরও যার অনুরণন থেকে যায় দর্শকের মনে।
অনিন্দিতা অনি, সহকারী অধ্যাপক, ওমরগনি এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম



