এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

এজাজ ইউসুফীর নান্দনিক ছড়াগ্রন্থ ‘উটকো বুড়োর ছুটকো ছড়া’

বিপুল বড়ুয়া

 

আনন্দমুখর পাঠের অন্যতম অনুষঙ্গ ছড়াপাঠ। পাঠককুলমাত্রই ছড়াপাঠে নিটোল নির্মল আনন্দ উপভোগ করেন। ছড়া নির্মিতির তাল-লয়-ছন্দ-অন্ত্যমিলের সৌকর্যে পাঠকমাত্রই বিমোহিত হন। ছড়ার বিষয়-বৈচিত্র্য অনায়াসে পাঠককে সচকিত করে। ছড়া লেখকের লেখনির কুশলতার জানান দেয়।

যশস্বী কবি-সাংবাদিক, এজাজ ইউসুফী এর সম্প্রতি প্রকাশিত ‘উটকো বুড়োর ছুটকো ছড়া’ ছড়াগ্রন্থের পাঠ আলোকে উপর্যুক্ত বক্তব্যের দারুন সাক্ষ্য মেলে। ৬৪ পৃষ্ঠার এই ছড়াগ্রন্থে ৫৩টি ছড়া রয়েছে। নানান স্বাদ আঙ্গিক ও প্রকরণের ছড়ায় সৌন্দর্যমণ্ডিত এই ছড়াগ্রন্থ।

‘উঠকো বুুড়োর ছুটকো ছড়া’ গ্রন্থে ছড়া রয়েছে রকমারি ছড়ার অপূর্ব সমাহার। দেশ-কাল-সমাজ পারিপার্শ্বিক আবহ—শিশুমনের বিচিত্র বিষয় ভাবনা—ধর্মীয় আবেশ—আনন্দের সুখপাঠ্য ঝলমলে ছড়া। মুঠোফোন আমাদের সাম্প্রতিক সময়ে সবার নিত্য সঙ্গী—সব বয়সী মানুষের প্রয়োজনীয় উপকরণ। তা নিয়ে একটি চমৎকার ছড়া লেখকের “মুঠোফোনে তেলেসমাতি” “যেখানে যাও সঙ্গে যাবে কী আবিষ্কার মুঠোফোন/ পৃথিবীটা হাতের মুঠোয় / দুনিয়াটা ঘরের কোণ।” চাঁটগার জলজট-প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় তাঁর অনুপম প্রতিবাদী ছড়া ‘…হাজামজা চারদিকে/নালা জুড়ে পলিথিন, মলটল ভেসে যায়/ গা টা করে ঘিন ঘিন (ছিপখান চাটগাঁয়) ‘…শত শত কোটি টাকা / গেছে নাকি ঘোলা জলে/ কোথায় যায় এতো টাকা/ ভাগাভাগি তলে তলে (চাটগাঁর জলজট)।

শহর চট্টগ্রামের পারিপার্শ্বিক স্থাপনার নিদারুণ অব্যবস্থাপনায় লেখকের ক্ষোভ অপরিসীম। তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার এ ধরনের হতশ্রীতে। তাঁর ছড়ায় উঠে এসেছে এসবের চালচিত্র। ‘.. কর্ণফুলিতে দূষণ নিয়ে কতো সেমিনার/ বর্জ্যে ভরা নদী নালা / ভীষণ অত্যাচার।’ ট্রাফিক জ্যামের দুর্গতিতে /কর্মঘণ্টা নাশ সড়কজুড়ে এ ধার ও ধার/ লক্কড়-ঝক্কড় বাস’। ‘… হাসপাতালে রোগী আসে/ সিট পাওয়াটা ভার। মৃত্যুঘণ্টা বেজেই চলে/মর্গে জায়গা তার।’ (দু:খী চট্টগ্রাম স্বপ্ন দেখে)। মানবতার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ বেশ চোখে পড়ে। এক্ষেত্রে তাঁর চেতনায় সর্বসুখ চির বহমান ও অনির্বাণ। তাঁর ‘বড়দিনের যিশু’ কবিতায় এ কথার ব্যঞ্জনা রয়েছে…‘এই দিনে আজ স্মরণ করি ক্রুশবিদ্ধ ঐ যিশু। পাপের বিনাশ করতে নিজেই হলেন দেবশিশু।’ (বড়দিনের যিশু)। মা নেই হারিয়ে গেছে কোথায় কোন দূর দেশে, মা হারা অবোধ শিশু মনের করুণ আর্তি তাঁর ছড়ার পঙ্ক্তিতে যেন জীবন্ত হয়ে আছে। ‘…তোমায় নিয়ে মিষ্টি রোদ্দুর উঠোন জুড়ে খেলে পালিয়ে গিয়ে দিলে ফাঁকি/ শেকড় উপড়ে ফেলে)’ (মায়ের জন্য কান্না)। রাজধানী তিলোত্তমা ঢাকার ব্যস্ততা: ছুটোছুটির বহর, চারদিকের বিত্ত-বিলাস, কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে এই প্রাণান্তকর অশুভ প্রতিযোগিতা লেখককে বেদনা দেয়-আশাহত করে। তাঁর ‘রাজধানী তিলোত্তমা’ ছড়ায় তার যথার্থ অনুরণন দেখা যায় ‘…সোনার হরিণ/ধরবে বলে/ঘুম নেই কারো চোখে/ ঝড়ের বেগে ছুটছে সবাই/ কাকে ডেকে কে যে রোখে’। লেখকের ছড়ার বিষয় প্রসঙ্গে সাবলীলভাবে উঠে এসেছে ধর্মীয় আবহ ‘ঈদ উৎসব’ ‘…লাল জামা পায় খুকি নাচে/ খোকা পরে পায়জামা/নগর ওঠে জেগে/আনছে কাপড় ছোট মামা/ (ঈদ)।

লেখকের শিশুপ্রীতি ছোটমণিদের শিশুসুলভ কথকতা উঠে এসেছে তাঁর ছড়ায় অত্যন্ত সাবলীলভাবে। তাঁর লেখনিতে রয়েছে ছোটমণিদের প্রতি মমত্ববোধ—তাদের আনন্দ দেয়া, তাদের কথা তুলে ধরার অপার মনোবাসনা। তার সনিষ্ঠ প্রকাশ দেখা যায়— তাঁর ছোট সোনা আরহাম’ ও, আজান সোনা, ছড়ায়। ‘… দস্যি হবি বুঝে গেছি/ জোছনা মাখা মুখ তোর/ সোনার খনি রুপোর খনি/ বৃষ্টি নামায় মিষ্টি ভোর/ আজান সোনা আর কাঁদে না, নানুর বাড়ি যাই/ মাকে নিয়ে বলে এসো থ্যাঙ্কু নানু ভাই।’

আমাদের মহান বিজয় দিবসের প্রতি বৈপরীত্যে আক্ষেপ লেখকের ‘…কোন পথে আজ দেশটা চলে/ কোথায় বীরাঙ্গনা শামিয়ানার তলে জড়ো রাজাকারের ফণা’/কোথায় তাদের অস্ত্রগুলো জং ধরেছে আজ/ মুক্তিযোদ্ধা তোমরা কোথায় রুখতে বন্য বাজ (বিজয়ের ছড়া)। পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিয়োগান্তক ঘটনার সমব্যথী হয়ে লেখক লিখেছেন ‘…পচাত্তরের বিষাদমাখা রক্ত ঝরা দিন/ শিশু রাসেল হত্যাকারী তারা কতো হীন (রাসেলের জন্য শোকগাথা)। মহান স্বাধীনতা—স্বাধীনতার ইতিহাস, সাম্প্রতিক অবয়ব নিয়ে তাঁর উচ্চারণ ‘…কিন্তু সে সব ইতিহাস আজ/ঘুণ পোকাদের হানা/ ঘুম দিয়েছে বুড়োরা সব তোরাই অস্ত্র শানা) (ইতিহাসের ডানা)…ভয়ংকর সব পিশাচ দানো/ এক চাঁদোয়ার নিচে/ চাপাতির কোপ দিচ্ছে সে আজ/ মুক্তিযুদ্ধ মিছে (স্বাধীনতার কুলাঙ্গার), উটকো বুড়োর ছুটকো ছড়া’ ছড়াগ্রন্থের লেখক কবি এজাজ ইউসুফীর এমনতরো স্থান-কাল-পাত্র সমাজ ধর্মীয় আবহের চিত্র বিচিত্র বিষয় অনুষঙ্গ শিশু মানস ইত্যাদির চমৎকার ছড়ার পাশাপাশি মুরগি ছানা, পাখি, গুগল, লাল ঝুমকা, মঙ্গলগ্রহে মানুষ, বানরের বাঁদরামি, কোলাব্যাঙের কীর্তি, পাখির বাসা, তালের পিঠা, চাঁদের বুড়ো, ক্রিকেট, ডাংগুলি, বৃষ্টি ঝরে, খুকির ফুল-হরেক বিষয়ে মজাদার আকর্ষণীয় ছড়াও রয়েছে যা পাঠক মাত্রকেই পাঠে আনন্দ দেবে। ‘উটকো বুড়োর ছুটকো ছড়া’ আকর্ষণীয় এই ছড়া গ্রন্থের লেখক উত্তর আধুনিকতারবাদী, কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও ছোট কাগজ ‘লিরিক’ সম্পাদক এজাজ ইউসুফী নব্বইয়ের দশকের কবিতা বিনির্মাণের ক্ষেত্রে করণ-প্রকৌশলে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মাত্রা যুক্ত করেছেন। তিনি বাংলাদেশের কাব্য সাহিত্যে উত্তর আধুনিকতাকালে ধারণার প্রধান প্রবক্তা। মানুষ, রাষ্ট্রদর্শন, ধর্ম, সাম্যবাদসহ সময়ের বিচিত্র রূপবৈচিত্র্য তাঁর চিন্তা চেতনায় কাব্য ভাবনায় সঞ্জীবিত থেকেছে। ১৯৮২ সাল থেকে শিল্প, সাহিত্যে ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক ছোটকাগজ ‘লিরিক’ সম্পাদনা করছেন তিনি।

লেখক এজাজ ইউসুফী চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক (২০০৬-২০০৮) এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন এর সভাপতি (২০১৪-২০১৬) দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দৈনিক পূর্বকোণের ফিচার সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনও করেছেন। দৈনিক দেশের কথা, দৈনিক বাংলাদেশের স্বাধীনতা পত্রিকায়ও সাংবাদিকতা করেছেন তিনি। তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, সাক্ষাৎকার সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৬টি।

তিনি ছোট কাগজ ‘লিরিক’ এর জন্য অল ইন্ডিয়া লিটল ম্যাগাজিন কনফারেন্সে ‘ছোট কাগজ সম্মাননা ১৯৯৩, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন স্মারক সম্মাননা পদক ও সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮ এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ‘লিটল ম্যাগাজিন স্মমাননা ২০২২সহ আরো অনেক সম্মাননা পুরষ্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর বহু গবেষণা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ বিভিন্ন পত্রিকা ও জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

লেখক এ ছড়াগ্রন্থে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে ও নেতৃত্বদানকারী কালজয়ী বীর নেতৃবৃন্দে প্রতি বীরোচিত শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তি গোষ্ঠী বিশেষের অবমাননাকর আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। গ্রন্থিত ছড়াসমূহে শিশু মনষ্কতা, শিশুদের ভালোবাসার বিষয় আশয় জনসম্পৃক্ততার স্থাপনা সমূহে কর্তৃপক্ষের খেয়ালীপনা হরিলুটের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। চলমান প্রাত্যহিক জীবনের অপ্রাপ্তি অবহেলাপ্রাপ্তির নিরিখে প্রতিবাদ যেমন করেছেন, তেমনি ফুল-পাখি-নদী-আকাশের সীমানা-ঠিকানার নির্মোহ ছবি অঙ্কন করেছেন।

লেখকের ছড়ার প্রকাশভঙ্গি সুন্দর ও সাবলীল। মিল-মাত্রা-ছড়ার বিস্তারণে লেখক বহুমাত্রায় সচেতন থেকেছেন বলা যায়। তাই ছড়া নিটোল আনন্দ দেয় পাঠককে। পাঠককেও নিরাশ হতে দেননি লেখক এ গ্রন্থের ছড়া পাঠে।

 

কবি সাংবাদিক এজাজ ইউসুফী এর নান্দনিক ছড়াগ্রন্থ ‘উটকো বুড়োর ছুটকো ছড়া’ এর সুন্দর প্রচ্ছদ ও অলংকার করেছেন শিল্পী মোমিন উদ্দিন খালেদ। এই ছড়াগ্রন্থটি লেখক উৎসর্গ করেছেন দেশের বারোজন খ্যাতিমান ছড়াকারকে যা সত্যিই উল্লেখ্য।

লেখক মোশতাক রায়হানের আদিগন্ত প্রকাশন হতে প্রকাশিত এই ছড়াগ্রন্থের মূল্য চারশত টাকা মাত্র।

 

বিপুল বড়ুয়া, শিশুসাহিত্যিক, চট্টগ্রাম

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—। ঊনিশ শতকে

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান’র আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান আতিক’র লেখা আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পিটস্টপ হল রুমে আবির প্রকাশন-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ নুরুল আবসার’র

অপূর্ণতার ভেতর পূর্ণ এক সৃজনযাত্রা : কামরুল হাসান বাদল

এজাজ ইউসুফী কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ,

উদীচী’র সুর-আলেখ্য ‘একতারা ও রবীন্দ্র – বীণা’র অনুরণন

অনিন্দিতা অনি   অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির   দরজায় অনবরত হাত চাপড়ানোর ধুপ ধুপ শব্দে সিহাবের সকালের মজার ঘুমটা যায় ভেঙে। মেজাজটা যায় বিগড়ে। এভাবে দরজায় শব্দ তো কারো