এবং রবীন্দ্রনাথ
আসাদ মান্নান
রবীন্দ্রনাথ তাঁর দাড়ির ভেতর একটা আস্ত বিকেল
লুকিয়ে রাখতেন। ক্লান্ত হলে তিনি সেখান থেকে আলো
বের করে চায়ের কাপে ঢালতেন। সেই আলো খেলে
পৃথিবীর সব দুঃখের অনুবাদ হয়ে যেত গানে।
জোড়াসাঁকোর জানালাটা কখনো বন্ধ হতো না। কারণ
জানালার ওপারে সময় বসে থাকতো, পা দোলাতো।
রবীন্দ্রনাথ লিখতে বসলে সময়টা জানালা দিয়ে ভেতরে
ঢুকে কালি হয়ে যেত।
তাঁর কলম ছিল না, ছিল একটা ছোট নদী। তিনি
কাগজের উপর নদীটাকে ছেড়ে দিতেন, আর নদীটা
নিজের মতো হাঁটতে হাঁটতে শব্দের গ্রাম বানাতো। সেই
গ্রামের নামই গীতাঞ্জলি।
একদিন রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার করলেন, তাঁর ছায়া তাঁর
চেয়ে লম্বা কবিতা লেখে। তিনি রোদে দাঁড়িয়ে থাকতেন,
আর ছায়াটা দেয়ালে লিখতো — “আমি আছি, তাই তুমি আছো।”
শান্তিনিকেতনের আমগাছগুলো আসলে তাঁর ফেলে
আসা চিঠি। বাতাস দিলে চিঠিগুলো পাতা হয়ে নড়ে।
ছাত্ররা ভাবে হাওয়া দিচ্ছে, আসলে রবীন্দ্রনাথ উত্তর লিখছেন।
তিনি যখন ঘুমাতেন, তাঁর স্বপ্নগুলো খাট থেকে নেমে
বারান্দায় গিয়ে বসে থাকতো। ভোরবেলা তিনি
স্বপ্নগুলোকে ডেকে বলতেন, যাও, এবার মানুষের মাথায়
গিয়ে বসো। ওভাবেই গান তৈরি হতো।
রবীন্দ্রনাথের পকেটে সবসময় একটা ছোট মেঘ
থাকতো। মন খারাপ হলে তিনি মেঘটাকে বের করে
আকাশে ছেড়ে দিতেন। তারপর পুরো কলকাতা জুড়ে বৃষ্টি
নামতো, যার প্রতিটি ফোঁটায় একটা করে অসমাপ্ত লাইন।
তিনি মৃত্যুকে কখনো ভয় পাননি। তিনি মৃত্যুকে একটা
চেয়ারে বসিয়ে চা খাইয়েছেন, আর বলেছেন, তুমি একটু
বসো, আমার একটা গান বাকি আছে। মৃত্যু বসেই ছিল,
গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
তাঁর গোঁফ আর দাড়ির মাঝখানে একটা সেতু ছিল।
সেই সেতু দিয়ে প্রতিদিন সকাল-বিকেল হেঁটে যেত—
বাউল, নদী, শিশু, ঈশ্বর আর একটা না-ফোটা ফুল।
রবীন্দ্রনাথ আসলে কখনো যাননি। তিনি এখনো
একটা সাদা খাতার মার্জিনে বসে আছেন। আমরা যখন
কিছু লিখতে গিয়ে থেমে যাই, তিনি কলমটা একটু ঠেলে
দেন। আর আমরা ভাবি, এটা হঠাৎ মনে এলো।
===============================
আমার পাহাড়ে এসো
হাফিজ রশিদ খান
আমার পাহাড়ে এসো
এ নয় পাথরে গড়া
মাটির পাঁজর বেয়ে
নিঃশব্দ বৃক্ষের পল্লবের তলে
এই উচ্চাশা ছোঁয়া যায়
সঘন নিশ্বাসে মরা
অপচ্ছায়াগুলো ছুড়ে-ছুড়ে
অতল খাদের গহিন শীতলে
বিজয়ীর বেশে এখানে ওড়াবে ঝান্ডা
এমন ভেবো না, মিতা
বরং নিজেকে উজাড় করো
আর ভেদরেখা কেটে নাচো
এই শান্তকুঞ্জে— শরমের কি তা
তুমি আরো গান করো দরাজ গলায়
আমিও মেলাবো সুর–
দেশিয় ভাষায় উন্নাসিক নই
উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমের লোকায়ত শব্দে
অন্তর মজেছে পূর্বপুরুষের কালে—
যদিও দজ্জাল হাওয়ায়
মাঝেমধ্যে ভীত ও বিধুর হই
তুমি তো পুরোনো পড়শি আমার
হৃদয়ের প্রান্তরে, জানো তো
শত-শত অব্দে…
===============================
সময়ের কাব্য
শামসুল বারী উৎপল
অথচ। এখানটাতেই দাঁড়িয়ে পড়ল সব
দাঁড়ালো সভ্যতা, দাঁড়ালো ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য,
দাঁড়ালো পুস্তকের অর্গানিক পৃষ্ঠা, সংস্কৃতির গাঠনিক সংকেত
উঠে দাঁড়ালো সভাসদের নির্বাহী আদেশ,
রাষ্ট্রায়ত্ত স্বপ্নগুলো বন্দি হল আঁধারের উৎসবে।
অথচ। আপেলটা পড়ে গেল সময়ের মৃত্তিকায়
তারপর ঝড়; মাধ্যাকর্ষণজনিত টানাপোড়েনে
একদিন ফিরে এলো নিউটন
ফিরে এলো বিজ্ঞান ও ইতিহাস,
ফিরে এলো একা ও আরো কয়েকজন
রক্ত ও মেধার অক্ষরে লেখা
নতুন অধ্যায় নতুন বর্ণপরিচয়।
বাড়িত ফিরি যাও
আবু তাহের মুহাম্মদ
লৌহ বেড়ি পুষ্প কি
না কোমরবন্ধন
ম্যান ফ্যাশনের বেল্ট
কালো কাপড়ে চোখ ঢেকে গেলে পৃথিবীতে সে আবার জন্মায়
মাতৃ জঠর থেকে এক একটি ফুলের দোকান
কপাট খুলছে
কপাট খুলছে
একহাতে মৃত্যু
আরেক হাতে সূর্য
সুস্বাগতম হে নতুন সুকান্ত
সারাটা শরীর যেন কলিজা শুধু তাই কলিজা
সন্তানের মুখে ওষ্ঠের ছোঁয়ায়
বলে
‘একদিন বাংলাদেশ ফিরা আসপনে বাপ’।
রাতি রাতি চোখে রণাঙ্গন রংধনুর সব রঙের সাথে
আকাশ নীলের দ্রোহ
তাতে স্বপ্ন বোনা
গোলাপ চম্পা চামেলী ফোটার দিন।
এক ঝাঁক পায়রার নিরব ডানায় ডানায় একাত্তর
প্রতিটি নিঃশ্বাসে বাতাসে অশনি
রক্ত খুন ক্ষুধা আর আগুনের ঘূর্ণি
” আর কাঁইন্দো না বাছা
আমি সূর্যোদয়ের দিনে ফিরা আসমুনে
মা’র হাত ধরি তুমি বাড়িত ফিরি যাও
বাছা চইল্লা যাও এক্কনই ”
===============================
মধুর স্বপন
মনজুরুল ইসলাম
প্রতিপল প্রতিক্ষণ বারবার তুমি আসো স্মরণের পথে—
তোমার ঐশ্বর্য রাঙা স্মৃতিশিখা জ্বেলে গেলে বিমূঢ় অন্তরে!
নিশিদিন জ্বলে শিখা কূলহারা নিঃস্ববুকে ক্রূর কিয়ামতে!
অনুপ তরণী আজ বুকের তরঙ্গে যেন বিধুর সন্তরে!
বিনয় সৌন্দর্য রঙে জীবন রাঙিয়ে গেলে সর্বহারা প্রাণে!
ছড়ালে সৌরভ ঘ্রাণ সবখানে পরস্পর মুগ্ধ হেসে হেসে!
নিবিড় সাজালে তুমি জীবনের গল্পগুলো প্রেমাকুল ধ্যানে!
সংসার ধন্য করে ফোটালে বাগানে ফুল কত ভালোবেসে!
প্রেমার্ত সান্নিধ্য সুখে কেটে গেলো জীবনের ক্রূরক্রান্তিকালে!
আমার সুভাগ্য সে-যে পেয়েছি তোমাকে আমি ধূসরিত বাঁকে!
তোমারই সাহচর্যে এ জীবন ধন্য হলো মত্ত ইন্দ্রজালে!
এখনো রাঙায় বুক সুগন্ধ স্মৃতির ফাগে মুগ্ধতার ডাকে!
কালের করাল গ্রাসে আজ-যে হারিয়ে গেলো সুন্দর জীবন!
তবু-যে রাঙিয়ে গেলে ক্ষণিকের সেবা মন্ত্রে মধুর স্বপন!
===============================
আন্তঃমিল
আসিফ নূর
নেশাগ্রস্ত যুবকের ঢুলুঢুলু চোখের মতো ঘোলাটে চাঁদ,
আমার দিকে তাকিয়ে আছে; অকারণ রাগ-ক্ষোভ-অভিমানে।
নেশাখোর আর চাঁদের অনেক আন্তঃমিল স্বভাবচরিত্রে—
উভয়েই নিশাচর এবং তাদের কলঙ্কও সুবিদিত।
মিলনে আর বিরহে চিরদিন দারুণ প্রাসঙ্গিক বলেই
গান-কবিতা-চারুশিল্পে দুয়ের তুমুল প্রকাশ বিশ্বময়,
অপরূপা জোছনার কারণে নারীরা চাঁদের ঈর্ষায় মরে;
এবং খুব ভালোবেসেও ঘৃণা করে মাতাল দেবদাসকে।
===============================
মায়ানদী
সাইয়্যদি মঞ্জু
গাছ থেকে বানর পড়ার মতো কিছু দুর্ঘটনা হয়ে যায়
পৃথিবীও নাকি বুড়ো হয়ে গেছে মানুষের ধারণায়
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে কেউ যদি ডুবে মরে
এসব খবর স্কিপ করে চলে যাই লাউ, মূলা, কলা, ঝিঙা—
সবজি চাষের মাঠে, কারণ জীবন সে তো একটাই।
প্রকৃতির আচরণে ক্ষুব্ধ হই, মানুষের বিচরণে মুগ্ধ নই,
চুনোপুঁটি মরে গেলে বোয়ালের উৎসব, কাচের ঘরে কে!
ভোট চুরি হতে পারে, গুম-খুন হতে পারে, সকাল-বিকেল—
হতে পারে ২০/২৫ বার আলোর বিচ্যুতি,
ভাড়াটে মিছিলে দেশপ্রেমিকের ভিড়, রাজপথ তুমি কার!
মাঝেমধ্যে ভাবি—
সুইস ব্যাংকে বাড়ে সঞ্চয়ী হিসাব, বেগমপাড়ায় যত ঘর,
দেখি আজ নিজেরাও কম নয়, কতদূর এগোলাম!
বিনোদন পাতার খবর, চিত্রলোক ছাড়ে তার নিজ কর্ম,
তাহলে কি অভিনয় পাপ!
কোন এক কবি নাকি বলেছেন— পাপ-তাপ কিছু নেই
আমরা সকলে পাপী…
গতকাল দেখা হলো আকস্মিক, ফেরার সময় বলে গেল—
“বিদায়ী নামাজ পড়তে আসিও শুনে মৃত্যুর খবর”
বুক চিরে ওঠে যে প্রার্থনা, হাজার বছর বেঁচে থাক তুমি
ওগো চেনা মেয়ে—
যেতে হবে জানি, সূর্যাস্তের মতো বেলা শেষে একদিন
তবুও তো বেঁচে থাকার যে মায়ানদী বয়ে চলে রোজ।
===============================
কবিতার অসুখ
মোহাম্মদ ইসমাইল
কবিতার পাহাড় ঘুমিয়ে থাকে যে বুকে,
আসলে আমরা সবাই গুমরে মরি সেই পাহাড়ের কাব্যিক অসুখে!
আর আমিও যেন বড্ড প্রেমে পড়েছি সেই কবিতার অসুখে-
সেই কবিতার এক প্রকার স্নায়ুবিক বিরল অসুখে!
শুনেছি, কবিতার শরীরেও নাকি হালকা হালকা জ্বর আসে,
আর সেই জ্বরের পুরো হৃতকম্পনের তীব্রতায়-
সারা পৃথিবীটাও বুঝি প্রেমের জোয়ারেতে ভাসে!
মির্জা গালিবের মতো এখানে আবার
বালাখানার কোনো শারাবীরা নাচতে আসে না তো?
পারস্যের কবি হাফিজের মতো এখানে আবার আকাশের
কোন খুদে তারারা খসে পড়ে ঝলসে নাচছে না তো?
যদি তাই হয়,
তবে পৃথিবীতে আবার নতুনভাবে কবিতার মজমা বসুক!
আবার নতুনভাবে কবিতার সেই রোজনামচা জলসা ঘরে-
নতুন প্রাণধারার মত্ত জীবনের সেই কবিতা আস্বাদনের কথাগুলো
আবার নতুন কোনো সুরের মূর্ছনায় ঝংকৃত হলে হোক।
নতুন তুর্কিদের এই কাব্যবিতান সুরের শরাব আসরে,
নজরুলের সেই বিষের বাঁশরীটার রুদ্র সুরে ;
এখানে বাংলার আবার নতুন কোনো হেলাল হাফিজরা
যদি তাদের ভালোবাসার সুরটুকু তুলতে চায়- তবে তুলুক না!
শুনেছি, কবিতার পাহাড় যে বুকে ঘুমিয়ে থাকে,
সেই বুকের ভালোবাসার হয়নাকো কারোর তুলনা!
===============================
আত্মহত্যা!
শাহানারা বেগম
খাঁ খাঁ রোদ্দুর-ভরদুপুর
সিলিংফ্যান নয় যেন আমার আত্মা ঘুরে মরছেন আটকুঠুরে!
এ আত্মা কি কোনো কালে আত্মহত্যা করেছিলো?
প্রেতাত্মা হয়ে তাই কি ফিরে এলো অচেনা প্রেতনগরে?
একি প্রস্তর যুগ?
পাথরে পাথর ঘষে সভ্যতার হাতেখড়ি
হয়েছিল কোন্ সৌরকালে?
প্রেতনগরে তাই বুঝি মানুষের মূল্য নেই কানাকড়ি!
ধানসিঁড়ির ওপারে সোনালি ডানার চিল কাঁদে নাকো আর!
আষাঢ়ের দুপুরে তাই ঘনঘনে রোদ্দুর!
আকাশের ওপারে নির্মম আকাশ ..
এই প্রেতনগরীতে তাই প্রস্তরে ঘষে মগজ
সভ্যতার ঘটে বিকট বিনাশ!
শহরের ভিড়ে একা মানুষ
নোহা নেছার অন্নি
শহরটা আজও জেগে থাকে, নিয়ন আলোয় ভরে ওঠে পথ,
হাজার মানুষের ব্যস্ত পায়ে কেঁপে ওঠে ফুটপাত।
এ শহরে মানুষ অনেক, তবুও মানুষ বড় একা।
পাশ দিয়ে কত মুখ চলে যায়, কেউ কারও চোখের ভাষা দেখে না।
কেউ ছুটছে স্বপ্নের পেছনে, কেউ ছুটছে বেঁচে থাকার তাগিদে,
কেউ বা হাসছে ঠোঁটের কোণে— অথচ বুকের ভেতর জমে আছে
অসংখ্য না-বলা কষ্ট।
বাসের জানালায় বসে থাকা মানুষটি
হয়তো খুঁজছে তার হারানো দিন,
কফির টেবিলে চুপ করে থাকা মেয়েটি
হয়তো লুকিয়ে রাখছে এক পৃথিবী অভিমান।
আর ব্যস্ত রাস্তায় হেঁটে যাওয়া ছেলেটি
হয়তো প্রতিদিন নিজের সঙ্গেই
একটি অদৃশ্য যুদ্ধ করে।
এই শহর কাউকে থামতে শেখায় না,
শুধু ছুটতে শেখায়— আর ছুটতে ছুটতে একদিন
মানুষ ভুলে যায়, শেষবার কবে সে নিজের সঙ্গে কথা বলেছিল।
বাড়িগুলো উঁচু হয়, রাস্তাগুলো আলোয় ভরে যায়,
প্রযুক্তি মানুষকে কাছে আনে— তবুও কোথাও যেন
মন থেকে মনটা দূরে সরে যায়।
শহরের সবচেয়ে বড় ভিড়ের মাঝেও
কখনো কখনো একজন মানুষ নিজেকে ভীষণ একা মনে করে।
কারণ একাকিত্ব মানে মানুষ না থাকা নয়,
একাকিত্ব হলো— অনেক মানুষের মাঝেও
নিজের কথা বলার মতো একজন মানুষ না থাকা।
তবুও জীবন থামে না।
পরদিন আবার সূর্য ওঠে, শহর আবার জেগে ওঠে,
মানুষ আবার ভিড়ে মিশে যায়।
হয়তো কোনো একদিন এই ভিড়ের মাঝেই
কেউ একজন থেমে বলবে— “কেমন আছো?”
আর সেই একটি প্রশ্নেই হয়তো কোনো একাকী মানুষের
পুরো পৃথিবীটা আবার একটু আলোয় ভরে উঠবে।
===============================
ভাপ ওঠা ভাত- সালুনের ঘ্রাণ
সাব্বির রেজা
পাশের বাড়ির ভাপ ওঠা ভাত, সালুনের ঘ্রাণ!
কেনো যে রোজ রোজ কড়ানাড়ে ভাঙা ঘরের অসুস্থ দরজায়–!
দরজায় খিল তুলে খাক’না ওরা,
মাংসের সালুনে মেখে ভাপ ওঠা গরম ভাত?
আমরা তো আধ পেটে পান্তা খেয়েই,
মাঠে, ময়দান কারখানায় যাই?
আমরা তো মরিচ পেঁয়াজেই তৃপ্ত হই,
পেঁয়াজ, মরিচেরও সারাগায় জ্বরের উত্তাপ!
আমাদের ক্ষুধার্ত সন্তানেরা ভাতের প্রর্থনায় জেগে থাকে সারারাত-সারারাত!
আমাদের প্রার্থনা পান্তা পেঁয়াজ,
প্রতিবেশির সালুনের ঘ্রাণ
ভরদুপুরে কেনো যে কড়ানাড়ে -ঘরের
ভাঙা দরজায়!
ভাপ ওঠা ভাতের মৌ মৌ গন্ধ কেনো যে,
ফুসকি দেয় অসুস্থ জানালায়!
হে, ক্ষুধার মহান ঈশ্বর (?)
তুমি নাকি অসীম ক্ষমতা ধর?
আটকাওনা আনবাড়ির ভাপ ওঠা ভাত-সালুনের ঘ্রাণ?
===============================
মাটির খাতা
মোহাম্মদ জাফর সাদেক
বীজের গভীরে ঘুমিয়ে থাকে বাপ-দাদার পুরোনো খেত,
লাঙলের ফলায় উর্বর মাটিতে ওড়ে আষাঢ়ের কাদা।
ধানের ডগায় জমে থাকে কৃষাণির ক্লান্ত নোনা ঘাম,
ভিজে মাটি ফিসফিস করে বলে—মানুষ মাটিরই মানুষ।
বাঁশবনের বাতাসে ভাসে চিরচেনা মানুষের ডাক,
পুকুরঘাটে নামে সাঁঝবেলা, মনে পড়ে নাড়ির টান।
ভাঙা নদী পলি জমিয়ে চরে ফলায় নতুন ফসল,
অভাবের রাতে কুঁড়েঘরে জেগে রয় অভাবের তাড়া।
মাটির গভীরে শেকড় জানে কার রক্ত কোথায় ঝরেছে,
এই ধানখেতই তো খেটে খাওয়া মানুষের ইতিহাস।
শহরে বসে আমরা হিসাব কষি খাতা-কলমে,
আর মাটি চুপিসারে বুনে চলে মানুষ আর ঘাম।
ফিরে আয় মন
রেশম লতা
ফিরে আয় মন, বুকের গোপন কুঠুরি
খুলে দিয়ে সন্ধ্যার দিকে ক্যান চইলে যাস?
এই উঠোনে একদিন
তার চুলের গন্ধে অন্ধ হইছিলাম,
আইজ মন তুই মাটি ফেঁড়ে ক্যান গেঁইথে যাস?
কে জানে, এহনো কোনো পুরানা চিঠি
তার বালিশের নিচে আমার লাইগা কান্দে কিনা!
কে জানে, ঘুমের ভিত্রে আমার নামে
তার ঠোঁট একবারও নড়ে কিনা!
ওইকালে চায়ছিলো আঙুলের ভিতর আঙুল,
নিঃশব্দ শরীরের ভাষা, সেই উত্তাপ
যেইখানে লজ্জা ভাইঙে
দুজন মানুষ শুধু দুজনের হয়া যায়
সাক্ষীসমেত এহন সব এলেন্দির চড়!
মন তুই রাজদরবারে যাসনে, যাসনে মিছিলে
কাকরুলের গন্ধমাখা কোনো নির্জন বিকেলের কাছে গিয়ে ভালোবাসা শিখে আয়—
কীভাবে একটি পাখি
একটি ডালে বসে সমস্ত আকাশ ধইরে থাকে
এরপর ফিরা আইসে বুকের দরজায় আস্তে কড়া নাড়িস।
আমি তার কম্পিত শরীর ছুঁয়ে ধর্ম ভুইলে যামু।
===============================
উদম নৃত্য
তামিম হুসাইন ডালিম
হাজারো কষ্টের কালো বুদবুদগুলো
আমাকে ঘিরে সে এক উদম নৃত্য
ইন্দ্রিয়গুলো তার গতি হারাচ্ছে
ভালো আর মন্দের ব্যবধান খোঁজার
প্রাণান্ত চেষ্টার বিফল আয়োজন
অন্তঃসার শূন্য ফলহীন বৃক্ষের
উঁচু উঁচু শাখার আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন।
শত সহস্র চেষ্টার ফলেও আমি
অন্যায় এর সাথে হাত মেলাতে পারিনি
পারিনি হিমালয় ডিঙাতে
সফেদ শুভ্র বরফের চুড়ায় হিশীতল
উষ্ণতর অনুভূতির স্বাদ নিতে।
===============================
অপাঠ্য
মাহফুজা অনন্যা
অথচ সমস্ত নদী মাপতে মাপতে তুমি ভুলে গেলে একটি শুকনো চোখও মহাসাগরের প্রাচীনতম নিদর্শন।
পাঁজরের ভেতর সহস্র অপ্রকাশিত ফুল পরাগ নয়, অব্যক্ত ভাষার মুদ্রণ ছড়িয়ে রাখে। কোনো স্পর্শ আসে না, শুধু ঋতুহীন বাতাস তাদের পাপড়িতে ধুলোর অভিধান লিখে যায়।
ঠোঁটের কিনারায় একটি অসমাপ্ত কবিতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাঠকের অপেক্ষায় বসে আছে। তুমি অক্ষর দেখেছ, কিন্তু তাদের রক্তসঞ্চালন শোনোনি; তুমি উচ্চারণ শিখেছ, কিন্তু নীরবতার ব্যাকরণ পড়োনি।
এ কেমন ভালোবাসাুযেখানে সূর্য প্রতিদিন জানালায় আসে, তবু ঘরের ভেতর একটি প্রদীপ জন্ম নিতে পারে না?
সম্ভবত ভালোবাসা কারও পাশে থাকা নয়, ভালোবাসা বুকের গভীরের অদৃশ্য ভূমিকম্পের শব্দ শুনতে শেখার আরেক নাম।
===============================
ক্যানভাসে শরৎ
সংগীতা স্বপন
ক্যানভাস জুড়ে শরৎ আকাশ শাদা ও নীলের ভাঁজে
ছুটে অবিরাম রাশি রাশি মেঘ ব্যস্ত ভীষণ কাজে।
শূন্য লোকের মহা কারিগর এঁকে যায় দিনভর
সাগর নদীর বাষ্প জমিয়ে গড়ে তুলে হিমঘর।
চাতক-চাতকী তৃষ্ণা মেটাতে বেঁধেছে নিত্যঘর
বিশ্বকর্মা,তুমি তো নিজেই নিপুণ চিত্রকর।
কেশর দোলানো বনের রাজাও বাউলের একতারা
তোমার চিত্রে মেঘনন্দিনী কাকে খুঁজে হয় সারা?
কখনো বা আঁকো পালকি বেয়ারা পঙ্খীরাজের ছবি
আউল-বাউল, ঋষি দরবেশ কখনো বিশ্বকবি।
ছোট্ট নৌকা ছোট্ট পালেতে হয় যেন দিশেহারা
মেঘেদের দেশে চলে ভেসে ভেসে উদাস বাঁধন হারা।
বলাকার মালা অঙ্গে জুড়িয়ে সাজালে মেঘের বাড়ি
লাজুক বধূর জড়িয়েছো গায়ে শিমুল তুলোর শাড়ি।
===============================
কাবিল ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে
এম এ ওয়াজেদ
হত্যাবিজ্ঞানের প্রতিভাদীপ্ত মেধাবী মুখ কাবিল
ভুলে যায় ঐশী নির্দেশের ধ্বংসবতী নিষেধাজ্ঞা
অভিধানের নিষিদ্ধ শব্দপ্রতিজ্ঞার ব্যাকরণসূত্র
ভেঙে ফেলে সার্বভৌম মোহতার দগদগে ঋজুতায়
পৃথিবীর হ্রদধারে নেমে আসে অন্ধকার শৈত্যপ্রবাহ
হে আদম নবী! হে অনুতপ্ত প্রথম মানব-
ওই দ্যাখো সাঁজোয়া যানে
বর্মাবৃত অবাধ্য সশস্ত্র কাবিল ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে
তার চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসে মৃত্যু-ককটেলের গুঁড়াদানা
শিশ্নাগ্নিতে ছটপট করে সমুদ্রবেষ্টিত লজ্জাহীন অণ্ডকোষ
আকলিমার কেশগুচ্ছ থেকে নিঃসৃত হয় গোলাপঘ্রাণ
হে নবী দুহিতা অষ্টাদশী রাজনন্দিনী-
হাবিলের মুগ্ধচোখের প্রেমগোলাপ আজ শুকিয়ে গেছে
পুষ্পশয্যার বাসন্তিক পুষ্পগুলো অশ্রুবিলাপে কান্নারতা
নিষিদ্ধ গন্দমে ভরে গেছে কাবিলের অমুগ্ধ নিউরন কোষ
পৃথিবীর প্রার্থনাসভার আত্মবাদী শিল্পজ্ঞান প্রার্থনাসঙ্গীত
রপ্ত করেনি প্রমত্ত ধ্বংসসমাপ্তির সুখবাদী নিশাচর কাবিল
হে স্বর্ণযূথিকা আদি মাতা হাওয়া !
তোমার গর্ভপ্রসূন হাবিলের রক্তদেহ পড়ে আছে মাটিতে
আর সুখজানালায় উঁকি মারে ফেরারি কাবিলের রক্তছুরি
পৃথিবীর স্বর্ণনন্দনে আজ সভ্যতার ব্যথাতরী পথ হারায়
দাসত্বপ্রজন্ম ভুলে যায় জীববিজ্ঞানের জীবনচরিত
ক্ষুধিত বায়োডাটা ভরে যায় অকালমৃত্যুর উচ্ছলতায়
জিয়নকাঠি ধরে রাখতে পারেনা যৌবনের আয়ুষ্কাল
তৃণভূমির তৃষ্ণার্ত পত্রমোচী বৃক্ষের পাতারা ঝরে পড়ে
সীমানাপ্রাচীরের চারদিকে সশস্ত্র কাবিলের উত্তরসূরী-
অনবরত পায়চারি করে ; মাথার উপরে উড়তে থাকে
ধ্বংসবাসনার চৈতন্যহীন যৌবনমতী বোমারু বিমান
মুক্তির জ্যোৎস্নালোক হারিয়ে যায় প্রগাঢ়তম অন্ধকারে
ঘুম থেকে জেগে দেখি কাবিল ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে
===============================
চকোলেট আত্মা
রফিকুজ্জামান রণি
আমাদের মৃত আত্মাগুলি
চকোলেট হয়ে গেলে
নির্ভীক শিশুরা চুষতে চুষতে
স্থ’ূল ও বিকৃত সময়ের প্রান্তসীমায়
লুটিয়ে পড়ে একদিন
অত:পর তাদের নিস্তরঙ্গ দেহে
জমে থাকা বিষণ্ন ধোঁয়ায়
রাত দেখতে পাই—
এই রাত ফুরায় না কোনো কালে!
===============================
অনির্দিষ্টেও বহমান
শিউলী মজুমদার
চতুর্দশী চাঁদ
অপরিমেয় মেঘ
শুধু আষাঢ়ে জমে না।
বৃষ্টির ধারা শুধু
শ্রাবণের শরীর ছোঁয় না-
শরতেও মেঘ জমে
বসন্তেও হয় বৃষ্টি।
অস্পর্শে থেকে
স্পর্শ হয় বহুভাবে।
তবু আষাঢ়ে গল্প লিখি
শ্রাবণের বৃষ্টি জলে।
===============================
কবিতা কবির অন্তর প্রতিচ্ছবি
শাহনাজ পারভীন মিতা
শব্দের কথামালায় কেউ নয় কবি
কবিতা কবি অন্তরে কল্প প্রতিচ্ছবি,
ক্যানভাসে আঁকা নয় কাব্যের ব্যঞ্জনা
পাঠককে নিয়ে চলে নির্ভার ভাবনা ।
আঁধার বর্ণিল হয় কাব্য কবিতায়
নিভৃতে গোপনে কবি কি ব্যথা লুকায়,
দুচোখে জ্বলে আলোর শব্দ বিচ্ছুরণ
উড়ছে ঝরা পাতারা স্মৃতির স্মরণ।
ত্রাহ্যস্পর্শে জন্ম নেয় কত অনাসৃষ্টি
গ্রহণেও চাঁদ মাঝে আলোকের বৃষ্টি ,
ঝিনুকের বুকে মুক্তো সুপ্ত যে যন্ত্রণা
শব্দের অমৃত সুধা জীবন মন্ত্রণা ।
কবিতার সৃষ্ট ঘরে কবির আবাস
শিউলি ঝরে হারায় রাতের সুবাস।
===============================
চিঠি
নীলিমা শামীম
প্রিয় নীল
তোমায় একটি চিঠি লিখবো বলে
অপেক্ষায় থেকেছি অনন্তকাল।
তোমায় একটি চিঠি লিখবো বলে
জমে গেছে অজস্র নীল খাম।
তোমায় লিখবো বলে শুকিয়ে গেছে চোখের দৃষ্টি ,
প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে নিঃস্ব হয়েছি।
তোমায় লিখবো বলে জমিয়ে রেখেছি অসংখ্য শব্দ মালা।
শব্দেরা জমতে জমতে শুকিয়ে হয়েছে কাঠ ;
শুকনো শব্দেরা এখন নেমেছে আন্দোলন-মিটিং-মিছিলে ;
গুলি হয়ে বর্ষিত হতে চায় যেমন ঝরছে আকাশ ভাঙা বৃষ্টি।
তোমায় লিখবো বলে জমিয়ে রেখেছি লক্ষ কোটি অনুভূতি।
অনুভূতিরা কতোবার ঝরে পড়েছে কামনার চাদর ছেড়ে।
রাগ অভিমানেরা বিদ্রোহ করেছে দুঃসহ তপ্ত রোদ হয়ে ;
শুধু তোমায় লেখা হয় না বলে।
বিদ্রোহী কবি যদি বেঁচে থাকতেন তবে তাঁর কবিতায়
তুমি টের পেতে আমিও অজস্র অগুণতি ক্ষণ অপেক্ষায় থেকেছি
শুধু তোমার লেখা পাবো বলে।
আমার অভিমানী সুরে তা দিয়ে বলেছো,”
চিঠি লেখার সময় পার করেছি সেই কবে, কোন এক কালে।
কেন বোঝাতে পারি না, আমি এখনো তোমার চিঠির অপেক্ষায় থাকি
যেমনটি থাকে চাতক পাখি।
যেমনটি থাকে ষোড়শী।
কেমন করে বোঝাই তোমার দুকলম লেখা
আমাকে এখনো জাগিয়ে তোলে
ঠিক যেমনটি জাগে বালিকা বধূটি।
তোমার একটি চিঠি পাবো বলে —–তোমার লীমা
===============================
অজানিত পিছুটান
ফজিলা ফয়েজ
জিব দিয়ে অনুভব করি ঠোঁটের খুন পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ যেনো অতৃপ্ত পিপাসার মানবী।
বিস্মিত! অজানিত আশঙ্কার অনল বুকের ভিতর বইতে থাকা এক পাথর কাটা স্রোত।
আঁধার গহ্বরে ঠাঁই নিয়েছে মৃত্যু ক্রোর।
জরাজীর্ণ গতরে অধিকারের খুঁটি গেড়েছে বিষণ্নতা।
পিছুটান কি কবিত্ব?
পিপাসা কি কাগজবন্দি অমরত্ব?
জগতে মৃত্যুর মতো এত সুন্দর স্নিগ্ধ আর নিস্তব্ধ কিছুই নেই।
===============================
নিরুদ্দেশ
রাজিব দাশ
নিরুদ্দেশরা হয় স্মৃতি কুনো
আত্মীয় অনাত্মীয় বলে তাদের কিছু থাকে না
তাদের নিয়ে কেউ বুক চাপড়ে কান্না করে না
কবর শ্মশান নিয়ে কেউ চিন্তা করে না;
নিরুদ্দেশের হয় না শ্রাদ্ধ স্মৃতি তর্পণ
কুলখানি চেহলাম সভা সেমিনার পথসভা;
নিরুদ্দেশের থাকে না বৎসরান্তে স্মৃতি মেলা স্মৃতি স্মারক মঞ্চ স্তম্ভ;
তবুও একগাদা প্রশ্ন জাগে মনে
নিরুদ্দেশের বুকে হারিয়ে যেতে মানুষের এত ভয় কেন?
===============================
অবশেষ
দুখাই মুহাম্মাদ
তোমার ভেতরে যে আগ্রাসন
তার ভেতরেই আমার বসবাস।
তুমি চাইলে অধিনস্ত করে নিতে পার
চুরমার করে দিতে পার খেয়ালের বশে।
আমি জেলেনস্কির-
পশ্চিমা আহ্বানে লোভী নই
আড়ষ্ট নই তোমার একগুঁয়ে মতবাদে
আমার চাওয়া প্রচ্ছন্ন স্বাধীনতা, এক আকাশ শিথিলতা
এর চেয়ে বেশি আর চাওয়ার নেই
শুধু দেখার বাকি অবশেষ।
===============================
বৈশাখের ভোরে
আইরিন সুলতানা লিমা
আজ বৈশাখের ভোরে—
ঘুমভাঙা চোখে দুয়ার খুলে দেখি,
শীত এসে দাঁড়িয়ে আছে;
মাঠের কুয়াশার মতো নিঃশব্দ,
বুকের ভেতর জমে থাকা কোনো পুরোনো ভয়ের মতো।
বসন্ত কবে চলে গেছে—জানি না;
শালিক ডেকেছিল কি না মনে পড়ে না আর,
শুধু দেখি—
দূরে রোদ উঠেছে ধানক্ষেত ছুঁয়ে
গ্রীষ্ম যেন ধীরে ধীরে পা রাখছে এই বাংলার বুকে
যে শীত—
রাতের শেষে আরও গভীর হয়,
জোনাকির আলোতেও যার অন্ধকার কাটে না,
যে শীত আমাকে ডাকে
নিস্তব্ধ, একা, অচেনা কোনো দিকে—
সে শীতকে আমি আর চাই না।
আমি চাই—
রোদে পুড়ে থাকা এক দুপুর,
নদীর ধারে বসে থাকা ঘাসের মতো নির্জনতা,
যেখানে ডানা মেললেই
সব ক্লান্তি উড়ে যায় আকাশে।
তবু শরীর কেঁপে ওঠে—
অদৃশ্য জ্বরের আগুনে পুড়ে যায় ভিতর;
এত শীত, এত ভার, এত দীর্ঘ অসুখ
আর বহন করা যায় না।
তখন মনে হয়—
একটুখানি উষ্ণ রোদ যদি পেতাম,
ধানক্ষেতের ওপর নেমে আসা বিকেলের মতো,
তবে হয়তো জীবন
আবার নীরবে ফিরে আসত
এই একাকী শরীরের ভেতর।
===============================
ফসিলের অভিমান
সৈয়দা সামিরা আহমেদ
মাকড়ের জালে ভরা
গল্পগুলো গুপ্তধন,
দরজায় নাড় কড়া,
বন্দি হয়ে আছে মন।
ব্যাঙমা-ব্যাঙমী নেই
কী হবে গল্পের তবে,
কথার হারিয়ে খেই
আবার কি দেখা হবে?
ছায়াপথের চৌমোড়ে
ঘুমন্ত ওই পাতালপুরী,
রাক্ষুসে হাসির তোড়ে
ফোটেই না কত কুঁড়ি!
সব কিছু মুছে যাবে
নেই কোনো পিছুটান
কে আর ভাঙাতে যাবে
ফসিলের অভিমান?
===============================
মনাকাশ
করবী পাল
আশ্বিনের এই তুলো তুলো মেঘ কেবলই কষ্ট বাড়ায়।
একছুটে মন ঘরকে ছেড়ে পালায় দূরে।
কৈশোরের সব দুরন্তপনা সঙ্গোপনে সাথী করে
মনটা তখন আকুল হয়ে বেড়ায় ঘুরে।
সাঁ সাঁ করে উড়ে চলে গাংচিলের পেছন পানে
আস্তে করে বসে পড়ে লবণ জলে সাগর পাড়ে;
ঢেউয়ের তালে শব্দরাজি আকুল হয়ে
বাজায় যেনো ব্যাকুলতার পদাবলী।
কার যেনো আজ আসার কথা মান ভাঙাবে;
ঝাউয়ের শাখায় উথাল পাতাল শনশনানি
মনগহীনে আঁচড় কাটে এক অভিমানীর;
রং ছড়িয়ে আবির ঢেলে রবি যখন অস্তগামী
অভিমানীর মান ভাঙাতে পটে বসে
সোনা রঙে রঙিন হয়ে।
“বিদায়” বলে পা বাড়িয়ে কিশোরী যেই ঘরমুখো
অমনি রবি বিলিয়ে হাসি দিনের শেষে সন্ধ্যা আনে;
মনজুড়ে একরাশ ঘন আঁধার নামিয়ে।
===============================
সমরাগ
ফরিদুল আজাদ মিলন
আমাকে ছেড়ে আমি যেতে পারি না সম্ভব নয় কখোনই
শাস্তি গ্রহণে সমর্পিত হয়ে ছিল প্রমিথিউসবৃত্তি অবান্তরে
নিষ্ঠুর হোক যত পরাজিত ঔদ্ধত্য নটোয়াল জয়ভাণ দম্ভ
তোমাকে নিয়ে তুমি আমার হয়ে যাও আমি হই তুমিতে
বৃষ্টি মেঘ বাষ্প সমুদ্র বরফ অভিন্ন এককে এককে রয়ে যায় ভিন্ন
ব্যাকুলে কূল্তো ভাঙবেই দুমড়ে মুচড়ে বিলীন হবে হবেইতো
স্রোত কবে দিয়েছিল অধিকার বেঁধে দিতে সীমায়িত সীমানার
আন্তেগনের চোখ ঠিক জ্বলে উঠেছিল প্রেতরাতের ঘাগড়া খুলে
মানুষের স্বাদটুকু পেতে হবে মানুষেই গণ্ডির চুরমাচুরে ফিরে ফিরে
রাজব্রত ভীত হীনবল রাজদণ্ড ফুঁসে উঠুক যত তার ভীরু হুঙ্কার
পোষ্য পালিতন্যায় অবসন্ন লাশশিমুরোদ হা-হুঙ্কার সঞ্চারি
স্পর্ধার প্রসবি থুতুতে অবারিত ঘৃণার তোড়ে অহমফানুস উড়ে উড়ুক
তুমি ফিরে এসো আমিও ফিরি আমিতুমিতে একাকার হয়ে থাকি
===============================
মোহাম্মদ মুছা’র দু’টি কবিতা
অবিচ্ছেদ্য সত্য
মুগ্ধ মোহে নির্মল শ্বাসে বুক চিতিয়ে আছো
লুট করা সুখ মিছেমিছি কার দুয়ারে বেঁচো?
মাতাল চোখে স্বপ্ন তোমার রঙিন সবি দেখো
হৃদয় ভাঙার নয়ন জলে সুখের তরী ভাসো।
সুহাসিনী মায়াবিনী কাটে না মোর প্রহর
বুকের মাঝে বয়ে বেড়ায় নীল বেদনার বহর,
আজো আমি মগ্ন আছি মাতোয়ারা মন
এই কেমন খেলা ধ্বংসলীলা পুড়ছি সারাক্ষণ!
কাব্য বিষাদ
কোন কাব্যয় বাঁধবো তোরে
গদ্যে নাকি পদ্যে
মেঘেকে নিয়ে সুর তুলিতে
রাগে বিমুখ রোদ্রে,
গগন খুঁজে চন্দ্র পেলাম
ছন্দ মেলায় তাতে
হঠাৎ দেখি তারা উধাও
আড়ি আমার সাথে,
বাগান ঘুরে ফুল তুলিলাম
মালা নিলাম গেঁথে
ভোমর গুলো তৃষ্ণায় চৌচির
মধু খোঁজে খেতে,
কোন কাব্যে বাঁধবো তুরে
পায়না খুঁজে তুলনা
আবারও বুঝি ব্যর্থ আমি
কাব্য গাথা হলোনা।
===============================
স্পর্শ কাতর মন
কাজী নাজরিন
স্পর্শ কাতর সেই অবুঝ মনটা এখন আর
আগের মতো অল্পতে ভেঙে পড়ে না
অতি আবেগে যাকে তাকে বিশ্বাস করে না
যখন তখন টুপ করে দু’চোখের অশ্রু ছেড়ে দেয় না,
অনেকটা কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে
সবকিছু জানা হলো,
চেনা হয়েছে মানুষের মুখোশ পরা ভেতরের প্রতিচ্ছবি!
যে বা যারা কষ্ট দিয়ে কিংবা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে
তাদের সেইসব ভাবতেও ইচ্ছে জাগে না
খারাপ সময়ের টুকরো টুকরো স্মৃতি
বরং নিজেকে শক্ত করার মানসিক প্রস্তুতি দিয়েছে
হ্যাঁ এটাই কঠিন বাস্তবতা!
কেন জানি না, আজকাল
মানুষকে বিশ্বাস করতে ভয় হয়,খুব বেশি ভয়!
আবেগ, অনুভূতি,আহ্লাদী স্বভাব কিছুই নেই
আগের মতো,
নিজেকে অনেকটা পাল্টে
অন্যদের মতো কঠিন হতে চেষ্টা,
দিনশেষে এটাই বুঝতে পেরেছি
অতি সরলতা কিংবা আন্তরিকতার মূল্য আমাদের সমাজে নেই,
তাইতো নিজেকে নিজের মতো করে
ভালোবাসতে শিখে গেছি
নিজের মনের যত্ন করেই ভালো থাকার চেষ্টা।
কারো প্রতি বিন্দুমাত্র আশা, অভিযোগ, রাগ, অনুরাগ,আক্ষেপ কিছুই নেই,,
স্পর্শ কাতর মন আজকাল সবকিছু বাদ দিয়ে কেবলমাত্র মানসিক শান্তির অন্তিম অপেক্ষায়,
ভালো থাকুক যে যার মতো এটাই কামনা,,
===============================
কাঁটা তারের বেড়া
শবনম ফেরদৌসী
অন্ধকারে জন্ম নিয়ে পারিনি
হতে আধাঁর রাতের বাতি,
বাবার ঘরে অবাঞ্চিত তাই
সবার কাছে রাতি।
শিশু কালটা কাটলো আমার
অবহেলা অনাদরের মাঝে,
সব শিশুদের মত হইনি বড়
বেলা যেতো কাজে কাজে।
একটু বড় হলে বন্দি করে
কাঁটা তারের বেড়ায়,
প্রতি মুহূর্তে রক্তাক্ত হই
ফেলেছে বড় গেড়ায়।
নারী হয়ে জন্ম নেওয়া
ধরিত্রীতে বড় পাপ,
জীবন দিয়ে বুঝতে পারলাম
এযে কী অভিশাপ।
===============================
সহজ সত্য
সুজন দাশ
শরীরের জিন পাল্টায় নাকি
পাল্টে ফেললে ধর্ম,
ভেবে দেখো এই সহজ সত্য
খুঁজে নাও তার মর্ম।
মানবজাতির বও যদি ধারা
মানবিক কাজে দাও আগে সাড়া!
সবার উপরে মানুষের সেবা
ভুলো না মহৎ কর্ম।
খুঁজিও তোমার আসল ঠিকানা
কোথা হতে তুমি এলে?
পাপ পুণ্যের করিও বিচার
সময়টা হাতে পেলে।
অন্তরে বাস করে মহাজন,
কর আগে তাঁর সাধন ভজন;
সকলের মাঝে খুঁজোও তাঁকে
ভাবনাকে দাও মেলে।
হত্যা ও খুনে হয় না ধর্ম
মানবতা আগে লাগে,
উদারতা ত্যাগ প্রেমের প্লাবনে
ভেসে যেতে হয় রাগে।
মূর্খের মতো মারো কেন ফাল?
রক্তের রং সকলের লাল ;
বিবেক হারালে থাকেনা মানুষ
ভাবিও এ কথা আগে।
নাগরিক নিষ্ঠুরতার পরিঘাত
মারজিয়া খানম সিদ্দিকা
ঘুম ঘোরে তো ছিলাম
এসে কেড়ে নিতে চাও আপন নিবাস,
একি স্বপ্ন! নাকি সত্যি!!
কেন মায়াহীন জগতে বাস!!!
ছিলে আশ্রিত,সদা তটস্থ, আজ বড়ো নির্দয়
করেছো আঘাত,দিয়েছিলে মায়ায় তার হৃদয়।
বুক পেতে সে সয়ে যাবে ব্যথা হলো বড়ো নির্মম,
নিষ্ঠুরতম কশাঘাতে দুমড়ে প্রাণ হরণ
করে নিল যম।
ভূপৃষ্ঠে জন্মেছে মানব সন্তান আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত
নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার কবচ তাদের কাছে গচ্ছিত।
নিচ্ছে প্রাণ, তবুও দমে না তারা, শুনে না বাঁচার আকুতি,
নীল আকাশে স্বাধীন ভাবে উড়ে গেলো যেন
প্রাণ পাখিটি।
করে না ভয় মৃত্যুর, নাহি পরোয়া জীবনের
যেন শাদা মেঘের সাথে পাল্লা দেয়
ভাবে না জীবন অবসানের।
নিষিদ্ধ কার্য কেন মুছে না মনের কোণা থেকে
অবিচার অনাচার আত্মঘাত আসে কোথা থেকে!
নিশ্ছিদ্র জীবন যাপনে ছিল নগরীর আশ্বাস
অধিবাসী হলাম কেমন থাকে না কারুর বিশ্বাস!
নগরের প্রতি মানবিকার ছিল কতো না মধুর!
তারই মাঝে হারিয়ে যায় অসীম প্রাণের সুর।
===============================
বঙ্কিমকুমার বর্মন-এর দুটি কবিতা
প্রণাম
এই শরীর সংগীতময়
যৎসামান্য ভালোবাসা পেলে
প্রেমে-অপ্রেমে
ব্যথা ভুলে নেচে ওঠে সুরে সুরে
বহুদিন কাছেপিঠে
প্রতীকী চাঁদ
হেঁটেছে তোমার পাশে
আড়ালে, আয়োজন
সাবধানে খুলে পড়ো মন
দ্যাখো ছুঁয়ে আছে আভূমি প্রণাম ।
প্রেম
প্রেম সে-তো আলোঘর
জাগতিক ধারাপাত
পূর্ণ হোক পূর্ণ হোক, ছোঁয়ালে
দাঁড়িয়ে রয়েছি শেষ বেলায়
তুমি এসো খুব ভোরে
অদৃশ্য চোরাটান
ওইটুকু ব্যবধান
এই জন্ম ধন্য, তোমাকে পেলে।
আধমরা মানবী
ইশরাত জাহান রুতমিলা
প্লিজ, তুমি ফিরে এসো না আমার জীবনে আরৃ
এই শহরের ধুলোমাখা বিকেলগুলো
এখন কষ্ট লুকাতে শিখে গেছে।
তোমার নাম শুনলেই যে হৃদয়
একসময় নদীর মতো দুলে উঠতো,
সে হৃদয় আজ শুকিয়ে যাওয়া চর।
আমি বড় ক্লান্তৃ
এমন ক্লান্ত, যেন বহু বছর ধরে
নিজের মৃত স্বপ্নগুলো কাঁধে নিয়ে হাঁটছি।
তোমাকে আর বয়ে বেড়ানোর শক্তি নেই আমার,
কারণ ভালোবাসাও কখনো কখনো
পাথরের চেয়ে ভারী হয়ে যায়।
আমার সেই আটপৌরে মনটা হারিয়ে গেছে অনেক আগে,
যে মন অভিমানে দরজা বন্ধ করেও
চুপিচুপি অপেক্ষা করতো ফিরে আসার শব্দে।
এখন আর অপেক্ষা নেই,
শুধু নিঃশব্দে বেঁচে থাকার অভ্যাস।
আমি ভুলেও আর দুঃসাহস দেখাতে চাই না।
কারণ একবার ভেঙে যাওয়া মানুষ
দ্বিতীয়বার ভালোবাসার সামনে দাঁড়ালে
তার বুকের ভিতর কেবল ধ্বংসস্তূপ কাঁপে।
বিশ্বাস করো- আমি আধমরা এক মানবী
আমাকে দূর থেকে কল্পনা করা যায়,
রাতজাগা কবিতার মতো পড়া যায়,
কিন্তু ছোঁয়া যায় না।
আমার ভেতরে এখন
একটা নিভে যাওয়া নক্ষত্র বাস করে,
যে আলো দেয় না কাউকে,
শুধু অন্ধকারে চুপচাপ জ্বলে।
========================
পথহারা পথিক
টিপলু বড়ুয়া
খসে পড়া তারার মতো
হয়তো ছুটে যাবো একদিন,
ঝরে পড়া পাতার মতো
হয়তো মাটিতেই হবো বিলীন।
চৈত্রে চৌচির হওয়া কাদার মতো
ফাটল ধরেছে অন্তরে।
বৈশাখী ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া গাছের মতো
মাটিতেই রয়েছি পড়ে।
বন্যায় ভেসে যাওয়া পিঁপড়ের মতো
ছুটছি দিকবিদক।
মেঠো পথেই হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত
আমি সেই পথহারা পথিক।




