এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান

এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—।

ঊনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণ ও বাঙালির ভাবনা চিন্তায় যুগান্তর সাধনের ক্ষেত্রে বঙ্গদর্শন-সাধনা পরে বিশ শতকে সবুজপত্র প্রথম আলোড়ন তোলে। শুধু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসেই নয়, উড়িষ্যা, কেরালা, কন্নড় প্রভৃতি অঞ্চলের ভাষা-সাহিত্যেও সবুজপত্রের প্রভাবে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বিরুদ্ধভাব, প্রতিবাদ, বিপ্রতীপ ছিল এঁদের মূল প্রেরণা।
বিশ শতকের প্রথম দু-তিন দশকের মধ্যেই সাহিত্য ও চিন্তার প্রচলিত ধারাকে পঙ্গুতা ও খর্ব মানসিকতা দ্বারা গ্রাসকারী প্রবণতাকে সরবে অস্বীকার করে নতুন কালের নান্দীপাঠ করেছিলেন রবীন্দ্র সমকালীন ও তাঁর পরবর্তী যেসব কবি ও শিল্পী– তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ সৃষ্টিতে স্বকীয় প্রতিভা ও অভীপ্সার মুক্তি ঘটিয়েছিলেন। এর ফলেই ভাব, বিষয়বস্তু, মনন-প্রকৃতি ও প্রকাশভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল।

বাংলা সাহিত্যের এই সমস্ত নব্য ‘কালাপাহাড়’দের বিশ-ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে পালন করেছিল সবুজপত্র-কল্লোল-কালিকলম-সত্তগাত-শিখা-প্রগতি-বুলবুল-কবিতা-চতুরঙ্গ এবং ‘অগ্রগতি’ (১৯৩৫)-র মতো একগুচ্ছ সাময়িক পত্র।

এর মধ্যে কোনো কোনো পত্রিকার যথার্থ মূল্য ও গুরুত্ব অনুধাবনের প্রয়াস এবং ইতিহাসের কোনো না কোনো আলোচনায় যথার্থ গুরুত্বে স্থান লাভ করলেও কিছু কিছু পত্রিকা অখণ্ড বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এখনও অন্তর্ভুক্তি পায়নি।
এটা বোঝা যায়, কোনো কোনো পত্রিকার গুরুত্ব কোনো কোনো কারণে কমে গেছে বা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ‘অগ্রগতি’-র ক্ষেত্রে ঘটেছে হয়তো অনেক কারণ। প্রধানত এই পত্রিকার কোনো নমুনা কপি পাওয়া যায় নি বলেই এর ইতিহাস-ঐতিহ্য-গুরুত্ব— সবই বিস্মৃতির কালো অতলে হারিয়ে গেছে।

এর সম্পাদক ছিলেন আশু চট্টোপাধ্যায়। তিনি সুভো ঠাকুরের হরিহরআত্মা বন্ধু ছিলেন। দুজনের চরিত্রেই ছিল প্রায় একই বৈশিষ্ট্য। ত্রিশ-চল্লিশের দশকে কলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্য জগতে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

সবুজপত্রের ধারায় কল্লোল কালিকলম-প্রগতি-দেশ-
কবিতা-চতুরঙ্গ ও অপরাপর সাহিত্যপত্রকে ঘিরে বিশ-ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে ঢাকা ও কলকাতা কেন্দ্রিক যে সাহিত্যিক আড্ডা ও সাহিত্যান্দোলন গড়ে ওঠে, তার ইতিহাসের সঙ্গে সমান্তরালে ‘অগ্রগতি’ পত্রিকা ও এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গোষ্ঠীর আড্ডা-আন্দোলন-স্ফূর্তি-বিদ্রোহের ইতিহাসও লিপিবদ্ধ হওয়া উচিত। এঁদের গোষ্ঠীবদ্ধ কর্মকাণ্ড কল্লোলের কালের সাহিত্য-সমাজকে প্রাণ-সঞ্চারকারী অনেক খোরাক সরবরাহ করেছিল। এঁরা সাহিত্যক্ষেত্রে অনেক নতুন ও কালোপযোগী বিষয়বস্তুর অবতারণা করেছিলেন। গরম করে রেখেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভকালীন কলকাতার সংস্কৃতি-অঙ্গনকে। তখন ছিলেন এঁরা সকলেই উজ্জ্বল তরুণ। প্রতিভাধর তরুণ শিল্পী সুভো ঠাকুর, মেধাবী ছাত্র ও গবেষক লেখক রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, নির্মল ঘোষদস্তিদার, হীরালাল দাশগুপ্ত, শৈল চক্রবর্তী, বিমল মিত্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মণি বাগচি, নন্দগোপাল সেনগুপ্ত, দিনেশ দাস প্রমুখ ঐ কালের লেখক গোষ্ঠীর একাংশ ছিলেন পত্রিকা ও সাহিত্যিক আড্ডায় সক্রিয় অংশ গ্রহণকারী। অন্নদাশঙ্কর রায়, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, অজিত দত্ত, বিষ্ণু দে প্রমুখের লেখাও এতে ছাপা হয়েছে। লিখেছেন আরও অনেকে যাঁদের নাম এখানে লেখার জায়গা নয়। —
তবে সকলের বিবরণ থেকে বোঝা যায়— বিশ শতকের উল্লেখযোগ্য প্রগতিশীল পত্রিকাবলীর মধ্যে অগ্রগতি ছিল সবুজপত্র-কল্লোল প্রভৃতির সার্থক উত্তরসূরি।

অগ্রগতি পত্রিকার কী ছিল না? এর যে কোনো একটি অংশ দিয়েই একটি সফল ‘আধুনিক পত্রিকা’ হিসেবে ‘অগ্রগতি’ মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, শিল্প ও সাহিত্য সংস্কৃতির আলোচনা, প্রচ্ছদ, অঙ্গসজ্জা, কাগজ, মুদ্রণ পারিপাট্য বিজ্ঞাপনের রুচি—সবদিক থেকেই ‘অগ্রগতি’ বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে একক ও বিরল এক উদাহরণ হয়ে আছে।
সাদা আর্ট পেপারে বারো বাই সাড়ে নয় ইঞ্চি সাইজে গল্প-কবিতা-উপন্যাস ও বিজ্ঞানের আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে ২৪, ৩২, ৬৮, ৭২ কিংবা আরও বেশি পৃষ্ঠার (সাধারণ মাপ ২৪ পৃষ্ঠা) বিশেষ সংখ্যা
দু’ কলামে অত্যাধুনিক অথচ পরিচ্ছন্ন চিত্রাবলী (চারু, কারু, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, ফটোগ্রাফিকু(অতিপ্রাকৃত ও প্রাকৃত) শোভিত হয়ে অগ্রগতি প্রকাশিত হওয়া মাত্রই বাজার দখলকরে নিয়েছিল। পশ্চিম বাংলার (তথা কলকাতার) বাইরে পূর্ববঙ্গে এবং ভারতের বাঙালি- অধ্যুষিত অপরাপর অঞ্চলসমূহে অগ্রগতির জনপ্রিয়তা এবং কাটতি ছিল।
প্রথম বর্ষের একটি সংখ্যার একাধিক সংস্করণও হয়েছিল। কিন্তু এর কোনো ইতিহাস কেউ-ই ইতিপূর্বে লেখেননি।
উপর্যুক্ত পরিস্থিতির আলোকে, ঘটনাক্রমে অগ্রগতির সম্পাদক আশু চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিকথার ঢংয়ে ‘কল্লোল যুগের পরে’ শিরোনামে জন্ম-ইতিহাস ইত্যাদি লিখলে (প্যাপিরাস প্রকাশিত,১৯৯৩)তা পড়বার সুযোগ হয় এবং পত্রিকাটি সম্বন্ধে বিশেষ কৌতূহলী হয়ে উঠি। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ‘হারিয়ে যাওয়া রত্ন’ ভেবে আমি দেশে বিদেশে অনুসন্ধান করে সৌভাগ্যক্রমে এর তৃতীয় বর্ষের একটি ফাইল প্রায় অক্ষত অবস্থায় দেখতে পাই (১৯৯৩ সালে)।
সম্পাদক জানিয়েছেন, অগ্রগতি’ চতুর্থ বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (শরৎ সংখ্যা, ১৩৪৫) প্রকাশিত হবার পর পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে। কিন্তু পত্রিকাটি তৃতীয় বর্ষেই শেষ হয়। ১৩৪৫ সালে আশ্বিন মাসে যে সংখ্যায় তাঁর উপন্যাস ‘ভালো নয় মন্দ নয়’ বের হবার পর পত্রিকা বন্ধের কথা অন্যত্র বলেছেন সম্পাদক সে-সংখ্যাটি হচ্ছে তৃতীয় বর্ষের ৩৪ সংখ্যা। প্রকাশকাল ৭ই আশ্বিন ১৩৪৫। এই সংখ্যা শেষ সংখ্যা হলে তৃতীয় বর্ষের সমস্ত সংখ্যাই দেখার সুযোগ আমাদের হয়েছে। প্রথম দুই বছরের দু’টি ভলিউম
এখনও অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। হয়ত ঐ দু’ বছরে আরও প্রায় ৭০টি সংখ্যা বের হয়ে থাকবে। এবং একশোর সামান্য কমবেশি সংখ্যা এর প্রকাশিত হয়েছিল। (কবিতার ১০৪ ? ) যদিও সম্পাদক শ’দেড়েক সংখ্যা বের হয় বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এ তথ্যে স্মৃতিবিভ্রমের আশংকা সত্য হয়েছে। সম্পাদক পত্রিকার জন্ম ইতিহাস যেমন লিখেছেন, তেমনি বন্ধের কারণও বিবৃত করেছেন। আগে মৃত্যুর কারণটিই তাঁর কাছ থেকে শুনি—
“অগ্রগতির আসর যখন জমজমাট তখনই বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ আরম্ভ হয়ে গেল। এই সংঘর্ষ যত বাড়তে থাকল, ‘অগ্রগতি’র প্রচারও তত বাড়তে থাকলো। ভারতের সব বড় শহর ছাড়াও লন্ডনে গাওয়ার স্ট্রিটে ডকটর সচ্চিদানন্দ সিংহ ‘বিব্লিওফাইল’ নামে একটি পুস্তকালয়ের জন্য সপ্তাহে তিনশ করে কপি বিক্রি করতেন। তখনো লন্ডনে বহু বাঙালি বাস করতেন।
“চতুর্থ বর্ষের প্রথম সংখ্যা অর্থাৎ পূজা বা শরৎকালীন বিশেষ সংখ্যা বের করার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য তখন পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ করলাম।…পত্রিকাটি বন্ধের প্রধান কারণ ছিল এই যে কাগজের কন্ট্রোল হওয়ায় বরাদ্দমতো যে পরিমাণ কাগজ পেতাম তাতে আমাদের অগণিত পাঠকদের সকলের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিতে পারতাম না। মাত্র অল্পসংখ্যক পাঠকের জন্যে পত্রিকা বের করে কি লাভ হত, তাছাড়া একথাও অনেকে বলেছিলেন যে, জাপান জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ায় অবিলম্বে ইংরাজ-শাসিত ভারতে বিমান আক্রমণ বা বোমাবর্ষণের ভয় দেখা দিতে পারে। তখন প্রেস চালাবার লোকজন পাওয়া যাবেনা। তবু পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া আমার পক্ষে নির্বুদ্ধিতার কাজ হয়েছিল। অন্যান্য পত্রিকাগুলি সেই দুর্যোগের পটভূমিকাতেও বেশ বেঁচে ছিল। অথচ তখনকার বাঙলা পত্রিকাগুলির মধ্যে ‘অগ্রগতি’র প্রচার ছিল সবচেয়ে বেশি।”
প্রাপ্ত সংখ্যাসমূহের পৃষ্ঠার সঙ্গে এবং হয়ত অপরাপর বর্ণনার মধ্যে আশু চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতি কিছু প্রতারণা করতে পারে। তবু তাঁর কথাই আমাদের প্রধান দিগদর্শন। পত্রিকার প্রাপ্ত সংখ্যাসমূহের রচনাবলীর এবং এতে বিধৃত তথ্যের সঙ্গে সম্পাদকের স্মৃতিকথার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তৈরি করা হলো ত্রিশ দশকের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা অগ্রগতির ইতিহাস। ঐ সময়ের একজন সক্রিয় সাহিত্যকর্মী এবং অগ্রগতির কর্ণধার আশু চট্টোপাধ্যায়ের অনেক কথাই মনে আছে।
আবার দীর্ঘ দিনের ব্যবধানে, বিশেষ করে পত্রিকার ফাইল তাঁর নিজের কাছেও ছিল না বলে তথ্যবিভ্রান্তি ঘটেছে অনেক ক্ষেত্রে। বিস্মৃতিই বড় দায়। তাতে কিছু এসে যায় না। যদি না এই পত্রিকার এক তৃতীয়াংশও দেখা না যেতো, তাহলে সম্পাদক আশু চট্টোপাধ্যায়ের ‘স্মৃতিকথাই ছিল অগ্রগতির ইতিবৃত্ত। কিন্তু এখন কেবল স্মৃতি ভরসা নয়, সংগ্রহও গবেষকের সম্বল হয়েছে।
অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ‘অগ্রগতির’ সম্পাদকের স্মৃতিকথার ভূমিকা লিখতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন : “আশু চট্টোপাধ্যায় এমন এক ব্যক্তি যিনি আমাদের স্মৃতিলোকে স্থায়ী আসন পেতেছেন। কী তিনি ছিলেন না, সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর ছিল অবাধ বিহার, সাবলীল পদচারণা। যাঁরা নিকট-সান্নিধ্যে এসেছিলেন তাঁরা তাঁর মধ্যে উত্তপ্ত প্রাণের অফুরন্ত লীলা প্রত্যক্ষ করে বিস্মিত হতেন।”
বৈশাখ ১৩৬৯ বঙ্গাব্দের ‘জলসা’ পত্রিকার এক বিশেষ সংখ্যায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অগ্রগতির লেখক গোষ্ঠীর ইতিহাসের তথ্য উপস্থাপন করেছেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সম্পাদক শ্রী সাগরময় ঘোষ। ‘সম্পাদকের বৈঠকে’ লিখেছিলেন: “ত্রিশ বছর আগের কথা বলছি। যে কোনো দিন সন্ধ্যায় চৌরঙ্গীর বেঙ্গল রেস্তোরাঁর সামনে গেলে দেখতে পেতেন চারজন তরুণ সুপুরুষ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করছে। গল্প বললে ভুল হবে। আসলে রেস্তোরাঁয় চায়ের কাপে যে তর্কের ঝড় উঠেছিল তারি রেশ চলছে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। ডবল-ডেকার ফাঁকা বাস এলে যে-যার পথে যাবার কথা, যাওয়া আর হয় না। তর্কের বিষয় হয়ত জমস জয়েস অথবা রিলকে, নয়তো ‘বন্দীর বন্দনা’ অথবা ‘শেষের কবিতা’। কত বাস এল আর গেল, চতুর্মুখ তখনো মুখর। চারজনেরই বেশভূষা প্রায় একই ধরনের। ঢিলে হাতা আদ্দির পাঞ্জাবী জানু ছাড়িয়ে বিঘৎখানেক নেমে এসেছে, শান্তিপুরী ধুতির কোঁচা মাটিতে লুটানো। এঁরা কারা? এঁরাই সাপ্তাহিক ‘অগ্রগতি’ পত্রিকার সম্পাদক লেখক পরিচালকবৃন্দুআশু চট্টোপাধ্যায়, বিরাম মুখোপাধ্যায়, নির্মল ঘোষ ও হীরালাল দাশগুপ্ত।”
‘অগ্রগতি’ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “কল্লোল” ও “কালিকলম”-এর পর এই চটকদার সাপ্তাহিক পত্রিকাটি ধুমকেতুর মতো বাঙলা সাহিত্যের আকাশে সহসা আবির্ভূত হয়ে আবার মিলিয়ে গেছে। যতদিন ছিল, চমক ছিল। আর ছিল তার সাজসজ্জায়, রচনাভঙ্গিতে, বিষয় নির্বাচনে এমনই এক বেপরোয়া ভাব যে সম্পাদককে বার দু’ তিন লাল বাজারের খপ্পরে পড়তে হয়েছিল নিষিদ্ধ রচনা প্রকাশের মামলায়। পত্রিকার নাম-মাহাত্ম্য বজায় রাখবার জন্যে সম্পাদকমণ্ডলী সময় ও কালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে ছিলেন। সেই সময়ে আজকের দিনের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিকের দলের প্রায় সবাই ছিলেন অগ্রগতি’র লেখক। মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জীবনানন্দ দাশ, অচিন্ত্যকুমার প্রভৃতি এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন, এই পত্রিকা মারফত আমাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন দুই কবি, একজন দিনেশ দাস, অপরজন হীরালাল দাশগুপ্ত।”

অগ্রগতির আড্ডা সম্পর্কে আশু চট্টোপাধ্যায় সংযোজন করে বলেছেন, “সাগরবাবু আর কয়েকজনের কথা বলতে ভুলে গেছলেন। তাঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন বিমল মিত্র। তিনি আমাদের বিশেষ বন্ধু ও দলের একজন ছিলেন। অগ্রগতি তে তাঁর অজস্র গল্প প্রকাশিত হয়েছে। সন্ধ্যায় ‘অগ্রগতি’র আসরে যোগ না দিলে হয়ত সন্ধ্যাটা বৃথা যাচ্ছে বলে তাঁর মনে হত। তাঁর সুমিষ্ট হাসি, কথা ও ব্যবহার আমাদের মুগ্ধ করেছিল। আর দলে ছিল মণি বাগচী, সুভো ঠাকুর, নিয়মিত আসত আর লিখত নন্দগোপাল সেনগুপ্ত। দূর থেকে নিয়মিত লেখা পাঠাতেন প্রসিদ্ধ গল্পলেখক জগদীশ গুপ্ত। বুদ্ধদেব বসু গল্প ও কবিতা লিখেছিলেন।’’

অগ্রগতি’র লক্ষ্য-আদর্শ সম্পর্কে পত্রিকার পাতায় বিধৃত রচনাবলীর চরিত্র লক্ষ্য করেই মন্তব্য করা চলে। তবু প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় পত্রিকার মুখবন্ধ বা সম্পাদকীয় পড়বার সুযোগ না পাওয়াটা দুঃখজনক। এক্ষেত্রেও সম্পাদকের ভাষ্যই অবলম্বন করা শ্রেয়। তিনি লিখেছেন,—
“…..‘জীবন্ত’ পত্রিকা গড়ে তোলাই ছিল আমাদের লক্ষ্য এবং সেজন্য আঘাত আমাদের অনেককে দিতেও হয়েছে, অনেকের কাছ থেকে খেতেও হয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের যুদ্ধ ছাড়িনি। …… আমরা তো হাঙ্গামা এড়িয়ে চলতে চাইনি, আমরা কয়েকজন যুবক তখন নতুন সাহিত্য রচনা করে কীর্তি স্থাপনের স্বপ্নে অন্য সব কিছুকেই তুচ্ছ জ্ঞান করছি। অন্নদাশঙ্কর রায়ের কাছে কোনো বিশেষ সংখ্যার জন্যে লেখা চেয়ে চিঠি লিখেছিলাম, তিনি উত্তরে লিখেছিলেন, ‘একেবারেই এখন হাতে সময় নেই। তবু ‘অগ্রগতি’তে লিখতে ইচ্ছা করে, কারণ এখন জীবন্ত পত্রিকা বলতে একমাত্র অগ্রগতিকেই বুঝায়। আপনারা অন্তত একটি কবিতা লিখে দিতে বলেছেন, কিন্তু আমার মতে উপন্যাস লেখা সবচেয়ে সহজ। তার চেয়ে কঠিন প্রবন্ধ লেখা এবং তার চেয়ে কঠিন গল্প লেখা। সবচেয়ে কঠিন একটি ভাল কবিতা লেখা। – ১৯৩৫ সনের পর লেখা অন্নদাশংকর রায়ের পত্রের ভাষ্যে তখনকার পত্রিকাবলীর মধ্যে একমাত্র জীবন্ত পত্রিকা বলতে তিনি ‘অগ্রগতি’কে বুঝেছেন বলে উপর্যুক্ত সূত্র মোতাবেক জানতে পারা যায়।

আশু চট্টোপাধ্যায় এই ‘জীবন্ত’ পত্রিকার জন্ম-ইতিহাস বিবৃত করেছেন, তাতে দেখা যায় ‘ভবিষ্যৎ’ পত্রিকার সম্পাদক, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সন্তান ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র সুভগেন্দ্রনাথ ঠাকুর অর্থাৎ প্রখ্যাত শিল্পী ও সাহিত্যিক বলে খ্যাত সুভো ঠাকুরই এর প্রধান উদ্যোক্তা। তাঁর ‘ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সাহিত্য পত্রিকায় লেখা দেবার অনুরোধের সূত্রে আশু চট্টো -পাধ্যায়ের সঙ্গে এই পত্রিকা সম্পাদনা বা প্রকাশনার সংযোগ স্থাপিত হয়। ‘ভবিষ্যৎ’ পত্রিকায় বহু নতুন ধরনের লেখা প্রকাশিত হলেও পত্রিকার নিজের একটি লেখকগোষ্ঠী তৈরি হয়নি। তা হয়েছিল সাপ্তাহিক ‘অগ্রগতি’ পত্রিকাকে আশ্রয় করে।

‘সুভো যখন প্রথম এই সাপ্তাহিক বের করবার প্রস্তাব করল, তখন আমি তাঁকে বারণ করেছিলাম। বলেছিলাম, অনেক টাকা খরচ, অনেক লোক চাই, অনেক পরিশ্রম। সুভো বলল, বাবা টাকা দিতে রাজি হয়েছেন, টাকা থাকলে আবার ভাবনা কি। তবু তার বাবার সঙ্গে একদিন আলোচনা করলাম। সাপ্তাহিক ‘অগ্রগতি’র জন্য তোড়জোড় পুরোদমে চলতে লাগল। ভবিষ্যতের প্রধান লেখক হিসাবে সুভো ঠাকুর ঠিক করল আমাকেই সেটির সম্পাদনা করতে হবে। ছাপাখানাটা বড় করল, এবং আমাকে সাহায্য করাবার ব্যাপারে একজন সহকারী সম্পাদকের জন্য বিজ্ঞাপন দিল। একদিন বিকেলে সুকিয়া স্ট্রিটে ছাপাখানায় গিয়ে দেখি এক দীর্ঘাকৃতি ব্যক্তি বসে আছে……বিরাম মুখোপাধ্যায়।…সুভোর সঙ্গে তাঁর আগে আলাপ ছিল। আমাদের পছন্দ হল এবং তাকেই দলে নেওয়া হল। বিরাম অগ্রগতির শেষ সংখ্যা পর্যন্ত পরিশ্রম করে গেছে……..
“সুভো পত্রিকাটির জন্যে এত বেশি বিজ্ঞাপনের ঢাক পেটাতে লাগল যে যখন প্রথম সংখ্যা বের হল তখন এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল। ………. আমরা দু’ হাজার কপি ছেপেছিলাম। তিনদিনের মধ্যে তা নিঃশেষ হয়ে গেল। তখনও হকাররা কাগজ চাইতে আসছে। তাই তাড়াতাড়ি রাত জেগে প্রথম সংখ্যার দ্বিতীয় সংস্করণ করতে হল।
“প্রথম সংখ্যার এই আশাতীত সাফল্যের পর পরপর কতকগুলি ঘটনা ঘটে গেল। ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা গেলেন। শ্রাদ্ধ শেষ হলে সুভো হাতে টাকা পেয়ে স্থির করল ইংল্যান্ড ঘুরে আসবে। তার ছোট ভাই বাসব পিতা বেঁচে থাকতেই ইংল্যান্ড গেছল ছবি আঁকা শিখতে। তখন খুবই দ্বিধা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলাম। সুভো কবে ফিরবে স্থির ছিল না। প্রথম সংখ্যার সেই অসামান্য সাফল্যের পরই কি ‘অগ্রগতি’র প্রকাশ বন্ধ করে দিতে হবে? অথচ আমার নামটা সম্পাদক হিসাবে ছাপা হয়ে গেছল। তখন আমার হাতেও প্রচুর টাকা এসে গেল। আমার দাদামশাইয়ের মৃত্যুতে অনেক টাকা পেলাম, তিনিই আমাকে মানুষ করেছিলেন। তাছাড়া আমার স্বর্গগত পিতার টাকা ও সম্পত্তি তো ছিলই। সাহিত্য করতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎকে বিপদগ্রস্ত করব? দ্বিধায় পড়ে গেলাম।”

“সুভো বলল, প্রেসটা নামেমাত্র টাকায় তোমায় দিয়ে দিচ্ছি, কাগজটার মালিকানাও দিচ্ছি। কয়েকমাস চালিয়ে দেখ। না চললে বন্ধ করে দিও। যদি চলে বিলেত থেকে ফিরে এসে আবার আমি তোমাকে সাহায্য করব। তাই স্থির করলাম। সুভো চলে গেল। হেদুয়ার কাছে মদনমিত্র লেনে এক দোতলা বাড়িতে প্রেস ও কার্যালয় তুলে নিয়ে গেলাম। ‘অগ্রগতি’ প্রকাশিত হতে লাগল এবং অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করল, হুইলার কোম্পানীর মারফত সমগ্র ভারতের সবস্টেশনে তো বিলি হতই, পশ্চিমে বোম্বাই, লাহোর, দিল্লি প্রভৃতি শহর থেকে পূর্বে ঢাকা, সিলেট, শিলচর প্রভৃতি সর্বত্রই আমাদের বিক্রির এজেন্ট ছিল। কলকাতায় ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকা বিক্রয়ের সোল-এজেন্ট। তাকে তুষারকান্তি ঘোষই ভার দিয়ে দিলেন। তুষার বাবু আমাদের খুবই স্নেহ করতেন। আমাদের অনেক বিশেষ সংখ্যার বিজ্ঞাপন তাঁর পত্রিকায় বিনামূল্যে বেরিয়েছে।”

আশু চট্টোপাধ্যায় আরও লিখেছেন “…. তখন অন্যান্য সাপ্তাহিকগুলি প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল। সেগুলিতে থাকতো সিনেমা আর রান্নাঘরের খবর আর একটা করে গল্প। অগ্রগতির প্রতিসংখ্যায় থাকত দুটি গল্প। তার মধ্যে একটি হাসির; দুটি প্রবন্ধ, একটি সচিত্র এবং অপরটি চিন্তাগর্ভ। তাছাড়া থাকত নিয়মিত বিভাগ। খেলাধুলা ও সিনেমা ছাড়াও শিক্ষাজগৎ, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি কর্পোরেশনের কার্যাবলী নিয়েও নিয়মিত লেখা হত। সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিল চলতি’ বিভাগটি, তাতে তৎকালীন পত্রপত্রিকা, সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের নিয়ে রসিকতার মধ্য দিয়ে কটাক্ষপাত করা হত। এই বিভাগটির জন্যেই পরে সজনীকান্ত দাস পত্রিকাটির নাম দিয়েছিলেন ‘হুলো অগ্রগতি’। হয়ত ‘চলতি’র হুলের জ্বালা তাঁর পক্ষেও অসহ্য হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ থেকে আরম্ভ করে প্রায় সব লেখকদের নিয়ে আলোচনা হত। রবীন্দ্রনাথ রাগ করেন নি, কারণ তাঁর সম্পাদিত ‘বাঙলাকাব্য পরিচয়’ নামে কবিতা সংকলনে আমাদের গোষ্ঠীর প্রায় সকলের কবিতাকেই তিনি স্থান দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত সেক্রেটারি অনিল চন্দ আমাদের পত্রিকা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই বিভাগটি প্রথমে নিয়মিত লিখত নন্দগোপাল সেনগুপ্ত। ‘জাবালী’ ছদ্মনামে। এছাড়া থাকত এক সপ্তাহের প্রয়োজনীয় খবরগুলি এবং ‘বিশ্বাসের বাইরে’ নামে একটি বিভাগ।”

সম্পাদক স্মৃতি থেকে অনেকটা যথাযথই সংগ্রহ করেছেন ঘটনাগুলো। তবে প্রকৃতই কোন্ বিভাগের কি নাম ছিল, তা তিনি হুবহু স্মরণ করতে পারেননি। খেলাধুলার বিভাগের নাম ছিল ‘স্পোর্টের পোর্টফোলিও’, লিখতেন ‘স্পোর্টসম্যান’। সিনেমা মঞ্চ নাটক এসবের আলোচনার বিভাগ ছিল ‘আমোদের আবহাওয়ায়’। বলা হত বন্ধনী মধ্যে মোটা অক্ষরে—‘আমোদের আবহাওয়ায়’
একেবারে চতুর্থ শ্রেণির কোনো নাটক বা ছায়াচিত্রের সমালোচনা প্রকাশিত হয় না।” পুস্তক পরিচিতি বা সমালোচনার বিভাগের নাম ছিল ‘বুক্সেলফ’। লীপো দাশগুপ্ত, নির্মল ঘোষ, হীরালাল দাশগুপ্ত প্রমুখ বেশির ভাগ সমালোচনা লিখতেন। একটি সংখ্যায় লীপো দাশগুপ্ত লিখিত প্রমথ চৌধুরীর ‘ঘোষালের ত্রিকথা’র সমালোচনা আছে। সম্পাদকীয় বিভাগের নাম ছিল ‘সম্পাদকের দেরাজ’। সংবাদধর্মী আলোচনার বিভাগ ছিল ‘এদিক ওদিক’ ও ‘বিশ্বাসের বাইরে’। ‘চলতি’ বিভাগটি সত্যিই অম্ল-মধুর আলোচনার জন্য আকর্ষণীয় ছিল।

এই বিভাগের আলোচনায় অনেক কথা বা মন্তব্য পাওয়া যায়, যা সমকালীন সাহিত্য পরিস্থিতির অকপট চিত্র ও তথ্য সরবরাহ করে। এখানে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, ‘কবিতা’ পত্রিকা ও অপরাপর সাহিত্যপত্র ও সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক (ব্যক্তিত্বসহ) বিষয়ে মন্তব্য বা ব্যঙ্গ থাকত। এসবের ভেতর দিয়েই প্রকাশ পেয়ে গেছে অগ্রগতির সাহিত্যবোধও। পণ্যের বিজ্ঞাপনের নতুন মডেলও তাঁরা প্রয়োগ করেছিলেন। বিজ্ঞাপনের চিত্র ও ভাষায় নতুনত্ব ছিল। ‘কবিতা’ পত্রিকার বিজ্ঞাপনের সৌকর্য ও ভাষা-স্টাইল এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য। ‘ব্যবসাদারের খাসকামরা’ হচ্ছে এ রকম একটি নতুন প্রচারধর্মী সাহিত্যাঙ্গিক। ছবি না দিয়ে পণ্যের সম্পর্কে পুস্তক সমালোচনার মতো লেখা হতো বিভাগটিতে একেবারে একেক পণ্যের ওপর। অধিকাংশ না হলেও বহু গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ সচিত্র বা অলংকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি পৃষ্ঠায় মটো হিসাবে মুদ্রিত হতো পৃষ্ঠার চারপাশে বর্ডার দিয়ে উড়োজাহাজ, স্টীমার, রেলগাড়ী ও মটর-কার-এর ছবি। এদিয়ে ‘অগ্রগতি’ গতিশীল জীবনের প্রতীকগুলোকেই প্রকটিত করে তুলেছিল। ‘‘অগ্রগতি’ গতিশীল পরিবর্তিত জাগতিক জীবনের সহায়ক সাহিত্যিক মুখপত্ররূপেই নিজেকে উপস্থাপিত করতে চেষ্টা করেছে। এবং তাতে সাফল্য অর্জন করেছে। তৎকালের আর কোনো পত্রিকার নামকরা যায়না, যার প্রচ্ছদ, মুদ্রণ,কাগজ, আর্ট, অলংকার- সজ্জা এবং রচনার অন্তঃস্থিত বক্তব্যের সঙ্গে ‘অগ্রগতি’র তুলনা করা চলে।
পরিচয়, দেশ, কবিতা, চতুরঙ্গ প্রভৃতি তখনকার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য মাসিকীগুলোর ছাপা, কাগজ ও রচনাসম্পদের উচ্চ আদর্শ বা মান ছিল বটে,তবে অগ্রগতির ভাব-মান-ঢং-স্টাইল ও চেতনা ছিল স্বতন্ত্র প্রকৃতির। এটা সম্ভব হয়েছিল সুভো ঠাকুর ও আশু চট্টোপাধ্যায়ের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে। সামাজিকভাবে তাঁরা কলকাতার মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যে যাঁরা অর্থে-বিত্তে-বিদ্যায়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে বেশি পরনির্ভর ছিলেন— নাসেই শ্রেণির সদস্য ছিলেন বলে কাউকে খুব বেশি ধার ধেরে কথা বলারও তাঁরা প্রয়োজনবোধ করতেন না। সাধারণত পত্রিকার সম্পাদক লেখক সদস্যরা বিত্তহীন পরিবারের সদস্য না হলেও টানাপোড়েনের সংসারের লোক হয়ে থাকেন। অগ্রগতির তরুণতম সম্পাদক-প্রকাশক-লেখক-কর্ণধাররা সে শ্রেণির নন, বরং তাঁরা তখন ইংলণ্ড-আমেরিকা যেতে পারেন পড়তে, এবং সাহিত্যের আদর্শ খুঁজতে গিয়েছিলেন পাশ্চাত্যে। ফলে তাঁদের মেজাজ ও মননে, কথনে ও কর্মে বলিষ্ঠতা ছিল। এই বলিষ্ঠতার কারণেই ‘অগ্রগতি’র মেজাজে তথাকথিত প্রবীণ প্রতিষ্ঠিতরা আহত বোধ করতেন। এঁদেরকে মনে করতেন ‘বেয়াদব’। এইসব কারণেই লেখাতে অশ্লীলতা না থাকলেও দোষ দেওয়া হতো ‘অশ্লীল’ বলে। আর বেয়াদবি’র কারণেই তাঁদের বিরুদ্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মশতবর্ষের বিশেষ সমালোচনার প্রেক্ষিতে লেখা আলোচনার বক্তব্য নিয়ে মানহানির মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছিল।

শত্রুতা কুড়িয়েছিলেন তাঁরা। অবশ্য সবদেশে, সবকালেই নতুন, ভালো কিছু করতে গেলেই ঈর্ষার, ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। তবে বাঙলা দেশের ঈর্ষার ধরন অন্য রকম। রসিকতাকে ঈর্ষাভাজনেরা নগ্ন হামলা বা আক্রমণের পর্যায়ে ফেলে নিন্দা করতে ছাড়েন না। তাছাড়া তখনকার দেশীয় ভাষায় সাহিত্যে মহাযুদ্ধ পরবর্তী পাশ্চাত্ত্য ইংরাজী ফরাসী-জার্মান সাহিত্যের নতুন অভিজ্ঞতা যে রঙ চড়িয়েছিল অসমর্থদের সে রঙে রঞ্জিত হবার সাধ্য ছিল না, সাধ থাকলেও, এই অক্ষমতার কারণেই ঘটেছিল রসবোধের বিপর্যয়। বৈদগ্ধ্যপূর্ণ রসিকতা অথবা স্বাস্থ্যকর নির্মল হাস্য কৌতুকও তাই এক শ্রেণীর কাছে অসহ্য ঠেকতো।
“অগ্রগতি’র পাতাগুলো নির্বিকার চিত্তে, সত্যসন্ধীর দৃষ্টিতে পাঠ করে একথা বলা চলে অগ্রগতির চিন্তা ও চেতনায় আধুনিকতার মোহ অন্ধভাবে প্রকাশ পায়নি। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও মিথকে অস্বীকার করে নব্য-আধুনিকতাকে তারা চাননি, যা দিয়ে সমাজবিচ্ছিন্নতা প্রকাশ পেতে পারে। তাঁদের চিন্তা ও কর্মের প্রেরণা হয়েছিল বাঙালির ঐতিহ্যিক ভাবধারাকেই যুগোপযোগী করার অর্থাৎ আধুনিকতার পথে দ্রুত অগ্রগতি সাধন-প্রচেষ্টা।

আশু চট্টোপাধ্যায় পত্রিকার ভেতরের ঘটনা বলতে গিয়ে অগ্রগতি গোষ্ঠীর লেখক-শিল্পীদের সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা পত্রিকার অবদান হিসেবে মেনে নিয়ে পাঠ করলে অর্থবহ হয়ে ওঠে— “এতগুলি বিভাগ চালাবার জন্যে লোকের দরকার। একে একে দল পুষ্ট হয়ে উঠতে বিরাম নিয়ে এল বিমল মিত্রকে। বিমল মিত্র নিয়ে এল দিনেশ দাস ও হীরালাল দাশগুপ্তকে। এছাড়া এল মণি বাগচী ও নির্মল ঘোষ। অগ্রগতি-গোষ্ঠী জমে উঠল। বিকেল থেকেই আড্ডা জমত। তাতে মাঝে মাঝে যোগ দিতেন প্রেমেন্দ্র মিত্র আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁদের দু’জনের অনেক লেখা ‘অগ্রগতি’তে প্রকাশিত হয়েছে। দূরে থেকেও নিয়মিতভাবে কবিতা পাঠাতেন জীবনানন্দ দাশ ও জগদীশ গুপ্ত। গল্প প্রভৃতির জন্য নিয়মিত ছবি আঁকার ও হেডপিস-টেলিপিস তৈরি করার ভার নিলেন শৈল চক্রবর্তী ও পি-সি-এল। এঁরা উত্তরকালে প্রসিদ্ধ শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন।”

তিনি আরও যা লিখেছেন তাতে পূর্ববঙ্গের (ঢাকার) সন্তান সোমেন চন্দের সাহিত্যিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সোমেন চন্দের জীবন ও সাহিত্যকর্ম মোটামুটিভাবে গ্রথিত-সংকলিত- লিপিবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন স্থান ও প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তিনি অগ্রগতির গল্প প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে (ঢাকা থেকে লেখা পাঠিয়ে) যে পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক রূপে স্বীকৃত হয়েছিলেন, এবং তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘অন্ধ শ্রীবিলাসের অনেকদিনের একদিন’ই যে সেই পুরস্কার প্রাপ্ত গল্প এবং তা যে অগ্রগতিতে (৩বর্ষ ২১ সংখ্যা) প্রথম ছাপা হয় তা জানা ছিল না।

সোমেন চন্দ্রের আরও দু’টি গল্প ‘ভালো না লাগার শেষ’ (৩বর্ষ ১৭ ও ১৮ সংখ্যায়) এবং ‘মরুভূমিতে মুক্তি’ও এই পত্রিকায় ছাপা হয় (তিন বর্ষ, তেইশ সংখ্যা)।

 

ইসরাইল খান, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, ঢাকা

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—। ঊনিশ শতকে

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান’র আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান আতিক’র লেখা আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পিটস্টপ হল রুমে আবির প্রকাশন-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ নুরুল আবসার’র

অপূর্ণতার ভেতর পূর্ণ এক সৃজনযাত্রা : কামরুল হাসান বাদল

এজাজ ইউসুফী কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ,

উদীচী’র সুর-আলেখ্য ‘একতারা ও রবীন্দ্র – বীণা’র অনুরণন

অনিন্দিতা অনি   অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির   দরজায় অনবরত হাত চাপড়ানোর ধুপ ধুপ শব্দে সিহাবের সকালের মজার ঘুমটা যায় ভেঙে। মেজাজটা যায় বিগড়ে। এভাবে দরজায় শব্দ তো কারো