জাকিয়া শিমু
কালা সামছু চণ্ডরোগী! অতিসহজে তার রাগ ধরে যায়! দেখা যায় সাধারণ কোনো ঘটনায় সে দঙ্গল বাঁধিয়ে বসে! আজকে অবশ্য তার মন তেতিয়ে উঠার উপযুক্ত কারণ আছে! সে বিশেষ জরুরি একটি কাজে রওনা হয়েছে! বিশেষ সে কাজের’ চুক্তি মতে সকাল সকাল তাকে পৌঁছাতে হবে কিন্তু ঢাকা থেকে মাত্র মাইল দশেকের পথ পেরোতে পাক্কা তিন ঘণ্টা লেগে গেল!
নিচু অঞ্চল। পাহাড়ের মতো উঁচু রাস্তা ধরে বাস চলেছে গন্তব্যপথে। কিন্তু সড়কের বুক চিরে অজগরের দেহের মতো ঢিলেঢালা তিন তিনটে নদী পড়ে পথে। এসব নদী ফেরি ডিঙিয়ে পাড়ি দিতে হয়! ফেরিতে অযথা সময় ব্যয়ে তার মেজাজ চড়ে যায় যদিও নিজেকে ধরে রাখতে সে ফেরির রেলিং ধরে জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। কে যেন বলেছিল, জলের স্পর্শে মন শান্ত থাকে।’
এখন ভরা বর্ষাকাল। নদীর গায়ে পলি জমে অগভীর হওয়ায় বর্ষাজল নদীর দুকূল ছাপিয়ে ছুটে গেছে লোকালয়ের দিকে। জলের ভেতর তলিয়ে থাকা গ্রামগুলোকে খেলনাবাড়ির মতো লাগছে।
বাসের জানালায় সেদিকে তাকিয়ে সামছু ভাবে, তার গন্তব্য এসবের কোন একটা গ্রাম হবে হয়তো। আলাল বেপারী তাকে সেরূপ ধারণাই দিয়েছে। সে বুকপকেটে গুঁজে রাখা কাগজের ঠিকানায় আরেকবার চোখ বুলায়। নিশ্চিত হতে হাতের ইশারায় হেলপারকে বাস থামাতে বলে!
বাসঘাটে নেমে সামছু খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর গলার লাল ওলের মাফলারটা টেনে খুলে আবার জায়গা মতো লাগিয়ে কয়েক কয়েক সামনে এগিয়ে যায়। নিরাকপড়া আবহাওয়া! তেতিয়ে উঠা সূর্যটা মাথার উপর যেন সমস্ত উত্তাপ ঢেলে দিচ্ছে! ঘেমে চুপচুপা হয়ে আছে শরীর। খুব সিগারেটের তৃষ্ণা পায় এসময়। ঠোঁটের কোণায় অবশ্য বহুক্ষণ ধরে একটি দামি সিগারেট ঝুলে আছে সামছুর। বাসে বসে আয়েশ করে টানার কথা ছিল কিন্তু পাশের সিটে বসা কলেজ পড়ুয়া এক মেয়ের ধারালচোখের দৃষ্টিতে আর সাহসে কুলায় নাই! আজকালকার অল্পবয়সী মেয়েগুলি বেয়াদবের চূড়ান্ত হয়েছে। মুখে সিগারেট দেখে এমনভাবে তাকায় যেন মুখে আস্ত জাতসাপ পুরে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে! সামান্য কিছু না ঘটতে গলা চড়িয়ে মানুষজন জড়ো করে!
এমন এক তিক্ত অভিজ্ঞতা সামছুর মনে পড়ে! আগাগোড়া উদাসী স্বভাবের সে। বাসের হ্যান্ডল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে এক মহিলা কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছে কে জানে! স্বভাব মতো খেয়াল করেনি ও। হঠাৎ বাস থেমে গেলে সামছু হাত ফসকে উল্টে যেয়ে মহিলার ওপর পড়ে যায়! দ্রুত অবশ্য ও উঠে সরে যায়। কিন্তু মহিলা এমনভাবে চিৎকার করে উঠে যে মনে হয় যেন সামছু তাকে আদর করতে জড়িয়ে ধরেছে! তারপর সে কি ভয়ানক কাণ্ড! শেষমেশ থানাপুলিশ পর্যন্ত গড়াল। সরকার নাকি এ ব্যাপারে শক্তপোক্ত আইন পাস করেছে! ভালোর জন্যে আইন হলেও এখন দেখা গেল নির্দোষী পুরুষমানুষের পথে ঘাটে নির্ভারে চলা মুশকিল! এ ঘটনা সামছুর মনে পড়তে সে আর সিগারেট ধরা দূরে থাক, বাকিরাস্তা জানালার পাশে কোনমতে লেপটে ছিল!
ক্ষুধায় পেটে ঢাকবাদ্য বাজছে! সেই সাতসকালে এককাপ চা পড়েছে পেটে। সূর্য এখন মাথার উপর! বাসঘাটের আশেপাশে খাবার দোকান থাকার কথা। সামছু চারপাশে তাকায়। বাসঘাটে লাগোয়া সরু-চাপা একটি মেঠেসড়ক দু’দিকের গ্রামগুলোর বুক চিরে দূরে কোথাও চলে গেছে। সে সড়কের দু’পাশে সস্তা মানের গুটিকয় ভাতের রেস্তোরাঁ! রেস্তোরাঁর চেহারা অনেকটা ভেঙে-পড়া একান্নবর্তী পরিবারের খাবার ঘরের মতো-জীর্ণশীর্ণ পুরনো বাঁশকাঠের! জং-ধরা টিনের চালা ভেঙে পড়তে পড়তে কোনোমতে যেন দাঁড়িয়ে আছে। সামছু সেরকম একটি ভাতের রেস্তোরাঁয় ঢুকে।
কিন্তু ভেতরের পরিবেশ বাইরের ভগ্নদশা দেখে বোঝা মুশকিল। এটাই বোধহয় শহরের সাথে গাঁওগেরামের আসল পার্থক্য। বেশ খোলামেলা। সামছু একদম পেছন দিকের কোণায় নিরিবিলি জায়গা দেখে যেয়ে বসে। এবং আয়েশ করে ঠোঁটে ঝোলা সিগারেটে আগুন ধরায়। রেস্তোরাঁর জানালা দিয়ে তাকাতে; ইছামতি নদী দেখা যায় যা উত্তরদিকে বয়ে গেছে। এই নদীর নাম সে আলাল বেপারির কাছে জেনেছে। রেস্তোরাঁটি সেই নদীর উপর কাঠের পাটাতনে করা। বর্ষার পানিতে ইছামতি নদী থৈ থৈ করছে। পানির ছাদ থেকে ভুরভুরিয়ে বাতাস এসে মুহূর্তে সামছু’র ঘেমে-ওঠা শরীরটাকে শীতল করে দেয়।
কিন্তু গা জুড়ানোর সময় নেই! সময় মতো গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। সামছু’ হাঁটাপথ ধরে। কাঁচা রাস্তা। প্যাক কাদায় মাখামাখি। পথের দুধারে অচিন গাছগাছড়ায় ভরা। সামছু’ উদ্ভিদ বিশারদ নয়। তারওপর দুনিয়ার কোন বিষয়ে তার তেমন আগ্রহ নেই! কিন্ত আজ কেনো জানি তার প্রকৃতির ছোটোখাটো বিষয়আশয়ে চোখ আটকে যায়!
বর্ষাকাল বলে পথের দুধারে বাড়ন্ত ঝোপঝাড় লতাগুল্মে ভরে আছে। কোথাও ঢোলকলমির বাড়ন্ত শরীর আটকে দিয়েছে সরু পথের জায়গাটুকু। আকাশ ভরা মেঘেরা ছুটোছুটি করছে। এসবের মাঝে সে উদাস হয়ে হাঁটতে থাকে। সহসা প্যান্টের পকেটে হাত পড়তে কোমরের কাছের জিনিসটা তাকে যেন সজাগ করে! এতক্ষণ বিষয়টা ভুলেই ছিল সে। গলার লাল মাফলারের কোণা টেনে কোমর অবধি নামিয়ে আনে। সেই ফাঁকে আকাশের মেঘেদের দাপাদাপি থেমে যায়! কালো এবং ভারী হয়ে মাথার উপর তেড়ে আসে মেঘদল। ইছামতি থেকে ভেসে আসা হাওয়া’ও নাই হয়ে যায়! যে কোন সময় বৃষ্টি শুরু হবে। সামছু’ হাঁটায় জোর বাড়িয়ে দেয়!
অন্যদিকে আলাল বেপারির মেজাজ বড্ড তেতে আছে! ভয়ে কেউ তার কাছে ঘেঁষছে না! সে বসে আছে বাড়ির দখিন দিকের খোলা
উঠোনে। দখিনের উঠোন থেকে বাড়ি প্রবেশের পথটা বেশ দূর পর্যন্ত স্পষ্টই দেখা যায়। আলাল বেপারি সকাল থেকে সে রাস্তার উপর নজর রাখছে। বর্ষাকালে বাতাসে পানি ভেসে বেড়ায়। গরমে ত্রাহি অবস্থা। কোনোমতে লুঙ্গিটাকে কোমরে পেঁচিয়ে প্রায় উদোম হয়ে বসে আছে সে! কাজের ছেলেটা পেছন থেকে তালপাতার পাখায় গতরের সবজোর খাটিয়ে বাতাস করছে। ছেলেটা আলাল বেপারির অবস্থা দেখে কিছুটা আঁচ করতে পারে! বাড়িতে ভালো কিছু রান্নার আয়োজন করতে বলা হয়েছে’ তার মানে বাড়িতে আজ বিশেষ কেউ আসবে। ওদিকে আকাশে মেঘ বলে দুনিয়া আঁধার হয়ে অসময়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি নামতে আলাল বেপারি বাংলাঘরের বারান্দায় এসে বসে। আর আকাশ ভেঙ্গে ডলক নামে।
আষাঢ়ে ডলক ভেঙে সামছু’ অনেকটা রাত করে আলাল বেপারির বাড়ি পৌঁছে। সে বাড়ির অন্দরে না ঢুকে উঠোনের দক্ষিণ কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কাজের ছেলেটা গোয়ালঘর থেকে ফিরতে মেঘের মতো কালো একটি লোককে কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে! যার ভেজা চোখের মনি অন্ধকার রাতেও কালো বেড়ালের চোখের মত চিকচিক করছে। ঠোঁটের কোণে সিগারেট গোঁজা! সিগারেট বেঁয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে! সে দ্রুত আলাল বেপারিকে খবর দেয়! আলাল বেপারি নিজে এসে তাকে বিশেষ খাতির যত্নে বাংলাঘরে নিয়ে যায়! এবং সামছুকে বাড়ির সবার কাছে নিজের খালাতো ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দেয়!
পর পর তিনবার আলাল বেপারি চেয়ারম্যান ইলেকশনে বর্তমান চেয়ারম্যানের কাছে হেরে গেছে! কিন্তু চেয়ারম্যানের চেয়ে সে কম কিসে! গত ইলেকশনে সে যা খরচ করেছে মোটের ওপর সবমিলিয়ে চেয়ারম্যানের সেই পরিমাণ বিষয়সম্পত্তিও নেই! তারপরও সে বার বার হেরে যায়! তার কারণ অবশ্য পরিষ্কার! সেলিম শেখ! সেলিম শেখের কারসাজিতে সে বরাবর হেরে যাচ্ছে!
আলাভোলা সহজসরল মানুষটার কাছে এলাকার লোক কী পায় তা বেপারির মাথায় ঢোকে না!
যে কোন সমস্যায় পড়লে এলাকাবাসী পরামর্শ নিতে তার কাছে ছুটে যায়! বিচার সালিশে সবার আগে তার ডাক পড়ে! এমনকি চেয়ারম্যানও তাকে বিশেষ সম্মান দিয়ে চলে। লোকে বলে আগাগোড়া সৎলোক। এ যুগে মানুষ এও বিশ্বাস করে! বেপারির রাগ ধরে এ এলাকার নিমকহারাম লোকদের ওপর। বেপারি সবার বিপদে নিজ থেকে এগিয়ে যায়। কেউ সাহায্যের জন্যে আসলে পারতপক্ষে সে ফিরিয়ে দিয়েছে এমন নজির নেই। এলাকার মসজিদ মন্দির এতিমখানায় অঢেল দান করে। এতকিছুর পরও এলাকাবাসী তাকে ভোট দেয় না! !
গত ইলেকশনে বেপারি সেলিম শেখকে তার দলে ভেড়াতে চেষ্টা কম করে নি! লোকটা বোকা কিছিমের! এ যুগের জন্যে অচল সে! কয়েক টাকার এক চাকরি করে তাতে কোনোমতে টানাটানি করে সংসার চলে! এর বাইরে সে জনসেবা করে বেরায়। বেপারি চেয়ারম্যান হলে তাকে নগদে খুশি করে দেবে- সে প্রস্তাব সে অবজ্ঞার হাসিতে ফিরিয়ে দিয়েছে!
তবে সে সরাসরি চেয়ারম্যানের সমর্থনে মিটিং মিছিল করে বেরায় কিংবা তার পক্ষ হয়ে ভোট চায়- এমন কথা কেউ বলতে পারবে না! প্রমাণ হিসেবে বেপারি গোপনে লোক লাগিয়ে রহস্য ভেদের চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনরকম সরাসরি সাহায্যের প্রমাণ মেলে নাই! তবে সে যা করে তা হল ভোটের ব্যাপারে কেউ তার কাছে পরামর্শ চাইলে সে প্রার্থীর ভালোমন্দ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করে। এরপর নিজের মতে ভোট দিতে পরামর্শ দেয়! আর সেখানেই বেপারি হেরে যায়!
ইলেকশনে বেপারি টাকাকড়ি খইয়ের মতো বিলায় তার এলাকায়! নিজ দলের সাথে ভাড়া লোক যোগ করে বিরাট মিছিল বের করে! বাড়িঘরের বেড়া-দেয়াল এমন কি খাম্বা গাছ যা পায় সয়লাব করে তোলে পোস্টার ফেস্টুনে! ঘন ঘন ইলেকশন ক্যাম্প। মাইকে মাইকে ভেসে আসে বেপারীর মিথ্যা গুনগান! এলাকার হাট বাজারের চা’ঘর মিষ্টির ঘর সবার জন্যে বিনেপয়সায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়! তার ওপর নিজে ঘরে ঘরে যেয়ে জোরহাতে ভোট ভিক্ষা চায়! কিন্তু ইলেকশনের ফল আসে তথৈবচ!
সামনে বছর ইলেকশন! নিজেকে জিততে হলে এখনই আটঘাট বেঁধে নামতে হবে। বেপারির জীবনে এই একটি মাত্র অপূর্ণতা রয়ে গেছে! এরূপ অভিপ্রায় অপূর্ণ রেখে মরেও শান্তি নেই! এলাকার লোক আড়ালে আবডালে তাকে নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে! তাছাড়া পর পর তিনবারের ইলেকশনে যে টাকা ব্যয় হইছে তার একটা বিহিত না করলেই নয়! সেলিম শেখ বেশ গভীর সমুদ্রের প্রাণী। তাঁর আলাভোলা চেহারার অন্তরালের হদিস খুব কম লোক ধরতে পারে! এই লোকের কারনে তার জীবনে বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। হাঁটু ভাঁজে বসে থাকার সময় শেষ! কায়দা করে তাকে দুনিয়া থেকে সরাতে হবে! আলাল বেপারির চোখেমুখে ক্রোধের বহ্নি জ্বলে ওঠে!
সামছু’ কারো বুদ্ধিসুদ্ধি খয়রাত করে চলে না। তার সোজাসাপটা কথা- কড়ায় গণ্ডায় দুই লাখ দিতে হবে! এবং কাজের আগে পুরো টাকা শোধ করে দিতে হবে! আবার কাজ ধরাবাঁধা সময়ে করা যাবে এমন কথা দেওয়া যাবে না! আজকে রাতে হতে পারে আবার সপ্তাহখানেক লাগতে পারে। কাজ শেষে সে রাতেই এলাকা ছাড়বে!
বেপারির কাজের ছেলেটা বাংলাঘরের টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে কান পেতে এমন অগোছালো আলাপের ভাঙা অংশ শোনে! কিন্তু এসব
আলাপ শুনেও আসল উদ্দেশ্য ধরতে পারে না। বেপারি তাকে সামছুর ফুট ফরমাসের কাজে পাঠায়। লোকটি অল্প কথার মানুষ। যেন আঙুলের কড়ে গুনে কথা বলে! ইশারা ইঙ্গিতে কাজ সারে। আগাগোড়া রহস্যে মোড়া। রহস্য সবার মধ্যে থাকে না। লোকটার মধ্যে আছে। এই বিষয়টি ছেলেটির মনে ধরে! তবে লোকটির চোখজোড়া রক্তজবার মতো টকটকে লাল! চোখের দিকে তাকালে নিজের চোখ ঝলসে ওঠে। তাই সে সরাসরি লোকটির চোখের দিকে তাকায় না!
এ সত্য যে সামছু’ এ কাজে বেশ চতুর কিন্তু তার সোজাসাপটা কথাবার্তা বেপারির পছন্দ হয় না! লোকটা কথার পিঠে কথা বলার সুযোগ দেয় না। হাতের ইশারায় থামিয়ে দেয়। পুরো দুই লাখ টাকা নগদে নিয়েছে কিন্তু তার ঠিকানা বেপারিকে দেয় নি! সঠিক ঠিকানা নাকি দেওয়ার নিয়ম নেই! টাকা নিয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেলে কিছু করার থাকবে না বেপারির!
চলাফেরাও কেমন সন্দেহ লাগে। কাজের ছেলেটাকে নিয়ে যখন তখন বাড়ির বাইরে যায়। চায়ের দোকানে কিংবা ভিড়বাট্টায় চুপচাপ বসে এলাকার লোকের আলাপ শুনে! একফাঁকে সে নাকি সেলিম শেখের বাড়িও ঘুরে এসেছে। তার সাথে গল্প করেছে! এমন খবরে বেপারির রাগ ওঠে। কিন্তু সামছু’র সাথে চুক্তি মতে তার কাজের ব্যাপারে তাকে পরামর্শ দেওয়া যাবে না!
দেখা যায়, সেলিম শেখের সাথে সামছু’র বেশ মিল হয়ে যায়। সেলিম শেখ মানুষটা বেশ আলাপি গোছের! কথা বলেন নিচুস্বরে। অদ্ভুত এক আকর্ষণ আছে লোকটার মধ্যে! চাইলে তাকে পাশ কাটানো মুশকিল! মানুষটা সামছুর চোখের দিকে চোখ রেখে গল্প করে। সামছু’র চোখের দিকে তাকিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ কথা বলার সাহস পায় নাই! সামছু’ অবাক হয়। তার চোখের দিকে একবার কেউ তাকিয়ে দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস করে না! সে নিজেও যখন আয়নাতে চোখ রাখে বুকে চিরচির কাঁপন ধরে কিন্তু লোকটা ব্যতিক্রম! নিজের ভেতর সততার গাঁথুনি কতোটা শক্ত হলে মানুষ এমন ভয়ডর শূন্য হতে পারে! সত্য মানুষকে সাহসী করে তোলে’ সেলিম শেখ তার জ্যান্ত প্রমান। সেলিম শেখকে সামছুর মনে ধরে যায়!
আলাল বেপারির অঢেল জমিজিরত তা সকলে জানে তবে গোপন ব্যবসাপাতিও আছে। দাদন ব্যবসা, মদ-জুয়ার গোপন আস্তানা এমন কী মেয়ে মানুষও নাকি জায়গা মতো চালান দেয় সে! তবে এসব কাজ সে নিজে সরাসরি করে না তার এসব ব্যবসা দেখতে নিদিষ্ট লোক আছে। তারা তার হয়ে গোপনে এসব কাজ করে! গোপনে এসব কাজ চললেও গাঁয়ের যুবকশ্রেণির দ্রুত নৈতিক অধঃপতনের কারণ খোঁজতে গোপন ব্যবসার হদিস বের হয়ে আসে। যত্রতত্র সহজলভ্য এসব মদ-জুয়া-মেয়েমানুষ গাঁয়ের বাইরের লোক আনবে বলে বিশ্বাস করা সহজ নয়।
আলাল বেপারিকে নিয়ে এও খবর বের হয় যে সে সরকারি উঁচুস্তরে সে টাকাপয়সা দিয়ে আইনের মন্দ লোক হাতে রেখেছে! তাকে থানার বড়সাহেবের সাথে প্রায়ই দেখা যায়! সামনে ইলেকশনে জিততে স্বয়ং থানার বড় সাহেবের পরামর্শে সামছুকে ভাড়া করেছে!
কিন্তু সামছু’র ভাবসাব মোটেও সুবিধার ঠেকছে না! তার চলাফেরায় মনে হয় সে এ বাড়ির মেয়ে জামাই! নির্ভাবনায় নির্ভারে দিন কাটায়! দিনে ঘুমায় আর রাতে সে আড্ডা দেয় তাও বেপারির বিরুদ্ধ পার্টির সাথে! শেষরাত্রিতে বাড়ি ফিরে আরামের ঘুম দেয়। দুপুর গড়িয়ে যায় তাও তার ঘুম ভাঙে না! ধীরেসুস্থে উঠে পড়ন্ত বিকেলে তার পছন্দের ঝোলতরকারিতে হাতের কব্জি ডুবিয়ে খাবার খায়। আগেরদিন পরের দিনের খাবাররের মেনু সে ঠিক করে দেয়!
বেপারি দাঁত চেপে তার আবদারের আহার পাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকে! খাওয়া শেষে সে দখিণাবারান্দায় বসে পাঁচমসলার পান মুখে পুরে আয়েশিভঙ্গিতে পা নাচায়। বেপারির গায়ে জ্বালা ধরে! যদিও এসময় নিজের জেদ চেপে রেখে বেপারি তার সাথে খাতিরের চেষ্টা করে। এবং ইনিয়ে বিনিয়ে কাজের কথা তুলে। ইলেকশনের বাকি আছে মাত্র পাঁচ মাস! কিন্তু সামছু তার এসব কথায় কান দেয় না, কৌশলে ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যায়!
একদিন গভীর রাতে বাড়ি ফিরে সামছু’ ঘরের কপাট শক্ত করে এঁটে দিয়ে জিনিসটা ব্যাগ থেকে সাবধানে বের করে! আট ইঞ্চি লম্বা চকচকে সোনালি রঙের জিনিসটা দুভাঁজে ভাগ করে ছোট করে কোমরে খুব সহজে গুঁজে রাখা যায়। জিনিসটায় সে বারকয়েক হাত বুলায়। নিজের রক্তের ভেতর আচমকা কেমন যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। এই কদিন জিনিসটা সে সাথে রাখে নি। তাতে নিজেকে স্বাভাবিক হালকা মানুষ মনে হয়েছে। যেই মানুষের ভেতর নরম মানবিক একটা মনের বাস। অথচ জিনিসটা স্পর্শ করা মাত্র নিজেকে কেমন অচেনা মনে হয়। আশপাশের মানুষগুলোকে অবিশ্বাসী মনে হয়, সন্দেহের চারদেয়ালে মাকড়সার জালের মতো মন বন্দি হয়ে পড়ে।
বেপারি বাহ্য সারার অজুহাতে বেশি রাতে প্রায়ই সামছুর ঘরের বেড়ার ফাঁকে চোখ রাখে! আজ চোখ রাখতে এমন একটা জিনিস দেখে সে কাঁপতে থাকে এবং প্রায় দৌড়ে তার ঘরে ঢুকে কপাট বন্ধ করে দেয়!
এরপর দিন সকালবেলায় সামছুকে বেপারির সাথে বেশ হাসিমুখে গল্প করতে দেখা যায়! প্রথম দিনের পর তাদের মধ্যে আর তেমন কোন আলাপ হয় নি। আজ কী মনে করে সামছু নিজ থেকে বেপারিকে ডেকে কাছে বসিয়ে খাজুরে আলাপ শুরু করে! ভোররাতে সে বাড়ি ফিরেছে! সাধারণত বেলা করে ঘুমায়! আজ তার চোখে ঘুম নেই! সামছু জানায়, আজ মধ্যরাতে কাজ শেষে নিজ গন্তব্যে ফিরে যাবে।
এমন সংবাদে বেপারির মনে খুশি যেন আর ধরে না। এ-কদিনে সামছু’র জন্যে তার মনে যে আবর্জনা জমেছিল তা মুহূর্তে উবে কোথায় চলে গেল, কে জানে! বেপারি খুশির ঠ্যালা সামাল দিতে নিজে আজ বিশেষ বাজার করতে হাটে রওনা হয়। বাজারঘাট সাধারণত কাজের ছেলেটা করে কিন্তু আজ সে নিজের হাতে করবে!
আলাপের সময় সে সামছুকে বলে বিক্রমপুরের এক ঐতিহ্যবাহী খাবার সে আজ তাকে খাওয়াবে! তবে বাজারে এ সময়ে গর্ভবতী জিয়ল মাছ পাওয়া মুশকিল। তাই সে দ্রুত হাটে রওনা হয়ে যায় এবং মন মতো পেটে ডিম ভর্তি জিয়লমাছ নিয়ে বাড়ি ফিরে। নিজে চুলাপাড়ে দাঁড়িয়ে রান্নার তদারকি করে।
বিশেষ কায়দায় এই ডিমভর্তা সবাই বানাতে পারে না! বেপারির মার কাছ থেকে নিজের স্ত্রী শিখেছিল বলে বংশের মান রক্ষা হল। মাটির চুলার জ্বলন্ত ছাইয়ে কদুপাতায় মুড়ে মাছের ডিম, শুকনা মরিচ এবং দেশি পেঁয়াজ পোড়াতে হয়। এরপর সব হাতে ডলেপিশে ঘাইন ভাঙানো সরিষা তেল এবং ধনেপাতা কুচি দিয়ে মাখতে হয়! অমৃতসম এই খাবার একবার যে খেয়েছে বাকিজীবনে নিজের নাম ভুললেও এর স্বাদ ভুলতে পারবে না! ধোঁয়া ওঠা মোটা চালের ভাতের সাথে এই ভর্তার তুলনা হয় না’- বেপারির কথার যথার্থতার প্রমাণ সামছু ভাত মুখে পুরে বুঝতে পারে। এমন স্বাদের ভর্তা সে আসলে কমই খেয়েছে জীবনে।
সেই কবে থেকে আষাঢ় শুরু হয়েছে তার থামার কোনো নাম নেই! শেষরাতে আরো জোরে ঘুঘুডাকা ডলক নামে। এসময় আলাল বেপারির ঘরের দোরে সামছু কড়া নাড়ে! বেপারি জেগে ছিল! তার সজাগ থাকার কথা ছিল! সেলিম শেখকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে সামছুর হাতে তুলে দিয়ে বেপারি ফিরে আসবে এমন কথা আছে! সে দ্রুত দোর খোলে সামছুর সাথে বের হয়ে যায়। সামছু চাকুটি আলাল বেপারির পেট বরাবর বসিয়ে দেয় এবং রাতের অন্ধকারে নির্ভারে গন্তব্যে ফিরে যায়। ভোর সকালে আলাল বেপারিকে বাড়ির সাথে লাগোয়া উঠোনে মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়!
জাকিয়া শিমু, কথাসাহিত্যিক, ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র




