মাসুদুল হক
চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শনগুলোর অন্যতম; কিন্তু চর্যাপদের প্রকৃত ঐতিহাসিক তাৎপর্য কেবল এই কারণে নয় যে এর মধ্যে বাংলা ভাষার আদিরূপের সন্ধান পাওয়া যায়। চর্যাপদ একই সঙ্গে পূর্বভারতের বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনা, পালযুগের জ্ঞানচর্চা, প্রাচীন জনপদের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, লোকভাষার বিবর্তন এবং উত্তরবঙ্গের বিস্মৃত সামাজিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। চর্যার পদকর্তাদের জীবন ও কর্মকে যদি আধুনিক জেলা-সীমানার সংকীর্ণতার বাইরে রেখে প্রাচীন ভূগোলের আলোকে বিচার করা যায়, তবে বৃহত্তর দিনাজপুর—অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নিকটবর্তী উত্তরাঞ্চল এবং ভারতের উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরকে অন্তর্ভুক্ত করে যে ঐতিহাসিক ভূখণ্ড—চর্যাপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও সাধনভূমি হিসেবে প্রতিভাত হয়। বিশেষত কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, সরহপাদ, ঢেঁটনপাদ এবং তাঁদের সমকালীন সিদ্ধাচার্যদের সঙ্গে এই ভূখণ্ডের ভাষিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের নানা স্তরের প্রমাণ একত্র করলে বৃহত্তর দিনাজপুরকে চর্যার ইতিহাসের প্রান্তিক অঞ্চল না ভেবে একটি সম্ভাব্য কেন্দ্রীয় অঞ্চল হিসেবে পুনর্মূল্যায়নের যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়।
আরেকটি বিষয় চর্যাপদের প্রত্যেক কবির জন্মস্থান সম্পর্কে সমসাময়িক শিলালিপি, তাম্রশাসন বা প্রত্যক্ষ জীবনী আমাদের হাতে নেই। অতএব ‘চর্যাপদের বেশকিছু পদকর্তাই বর্তমান দিনাজপুর জেলার অধিবাসী ছিলেন’—এমন সিদ্ধান্তকে সরাসরি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে ঘোষণা করা পদ্ধতিগতভাবে নিরাপদ নয়। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত: চর্যার প্রধান পদকর্তাদের জীবন, ভাষা, সাধনা, স্থানিক স্মৃতি এবং তাঁদের সময়কার রাজনৈতিক-ধর্মীয় পরিবেশ কি বৃহত্তর দিনাজপুরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে এই অঞ্চলকে তাঁদের আবাসভূমি, সাধনক্ষেত্র অথবা সাংস্কৃতিক পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শনাক্ত করা যায়? প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক উপাত্তের সম্মিলিত পাঠে এই প্রশ্নের উত্তর যথেষ্ট জোরালোভাবে ‘হ্যাঁ’-এর দিকে যায়।
এই আলোচনায় ‘দিনাজপুর’ বলতে বর্তমান প্রশাসনিক জেলা বোঝালে বিপদ হবে। কারণ আধুনিক জেলার সীমানা ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফল। সরকারি দিনাজপুর-ইতিহাসে বলা হয়েছে যে অতীতের দিনাজপুর বর্তমান জেলার তুলনায় বহুগুণ বিস্তৃত ছিল; একসময় বর্তমান মালদহ, বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও পূর্ণিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলও বৃহত্তর দিনাজপুর প্রশাসনিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অতএব চর্যাকারদের ‘দিনাজপুরের মানুষ’ বলার অর্থ আধুনিক জেলা-সীমানার মধ্যে তাঁদের জন্মস্থান আবদ্ধ করা নয়; বরং প্রাচীন বরেন্দ্র-পুণ্ড্র-কোটিবর্ষ-দেবকোট-কামরূপ-উত্তরবঙ্গের আন্তঃসংযুক্ত সাংস্কৃতিক ভূগোলের মধ্যে তাঁদের স্থান নির্ণয় করা।
এই বৃহত্তর ভূগোলের কেন্দ্রে ছিল পুণ্ড্রবর্ধন। পুণ্ড্রবর্ধন কোনো বিচ্ছিন্ন জনপদ ছিল না; প্রাচীন উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এটি। মহাস্থানগড়ে আবিষ্কৃত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের শিলালিপি বা শিলমোহর থেকে জানা যায়, মৌর্যযুগেই পুণ্ড্রনগরে শ্রমণ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ছিল এবং দুর্ভিক্ষকালে তাঁদের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও ছিল। অর্থাৎ উত্তরবঙ্গের এই ভূখণ্ডে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি চর্যাপদের বহু শতাব্দী আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একই ধারায় বাণগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরেও মৌর্য, শুঙ্গ, কুষাণ, গুপ্ত ও পালযুগের বসতির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরের বাণগড় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় প্রাচীন কোটিবর্ষকে বাণগড়ের সঙ্গে শনাক্ত করা হয়েছে। কোটিবর্ষ ছিল পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্গত একটি প্রশাসনিক একক এবং দামোদরপুর তাম্রশাসনগুলোতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। একাদশ শতকের মহীপাল ও দ্বাদশ শতকের পালরাজাদের দলিলেও কোটিবর্ষের গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে। প্রত্নখননে এখানে মৌর্যযুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক স্তর, নগরপ্রাচীর, আবাসিক স্থাপনা, নিষ্কাশনব্যবস্থা, ধর্মীয় স্থাপত্য এবং পালযুগের সমৃদ্ধ নগরজীবনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কোটিবর্ষের আরেক নাম দেবকোট বা দেবীকোট। প্রাচীন সাহিত্য ও অভিধানগ্রন্থে কোটিবর্ষের সঙ্গে দেবিকোট, উমাবন, বাণপুর ও শোণিতপুর নামগুলোর সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী মধ্যযুগে দেবকোটের গুরুত্ব আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু চর্যাপদের সময়ের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই অঞ্চলটি তখনও একটি প্রাচীন নগর ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে বাণগড়ের বসতি মৌর্যযুগ থেকে গুপ্ত ও পাল-সেন যুগ হয়ে মধ্যযুগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকার প্রমাণ রয়েছে।
চর্যাপদের সময়কাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বহুল আলোচিত অভিমত চর্যাগুলোর কালকে আনুমানিক ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে স্থাপন করে। অন্যদিকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতো গবেষকরা কয়েকটি সিদ্ধাচার্যের কাল আরও প্রাচীন বলে মনে করেছেন। এই মতভেদকে দুর্বলতা না ভেবে চর্যাপদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা উচিত; কারণ এতে বোঝা যায়, চর্যাপদ একদিনে রচিত কোনো গ্রন্থ নয়, বরং কয়েক শতাব্দী ধরে বিকশিত সিদ্ধতান্ত্রিক গীতির একটি সংকলন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ঙউইখ-এর প্রথম খণ্ড ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল এবং চর্যাপদের ভাষা ও পূর্বভারতীয় ভাষাবিকাশ নিয়ে তাঁর গবেষণা পরবর্তী আলোচনায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
এই দীর্ঘ সময়ের বৃহত্তর রাজনৈতিক পটভূমি ছিল পাল সাম্রাজ্য। পাল রাজারা বৌদ্ধধর্মের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তাঁদের শাসনকালে বরেন্দ্র ও উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৌদ্ধবিহার, মহাবিহার ও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। সোমপুর, বিক্রমশীলা, জগদ্দল, দেবিকোট প্রভৃতি বিহার শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না; এগুলো ছিল দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, চিকিৎসা, তন্ত্র, ভাষা ও অনুবাদচর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র। পালযুগে বাংলার বৌদ্ধবিহারগুলো নেপাল, তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বৌদ্ধ জ্ঞানবিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করেছিল।
পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারের কথা এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পালরাজ ধর্মপালের সময় এর নির্মাণ শুরু হয় এবং এটি কয়েক শতাব্দী ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল নয়, চীন, তিব্বত, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও বৌদ্ধরা এখানে ধর্ম ও জ্ঞানচর্চার জন্য আসতেন। দশম শতকে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান এখানে আচার্য ছিলেন বলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
জগদ্দল মহাবিহারের প্রসঙ্গ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। নওগাঁর জগদ্দলকে পালরাজ রামপালের প্রতিষ্ঠিত মহাবিহার হিসেবে শনাক্ত করা হয় এবং রামচরিতম্-এর বিবরণে বরেন্দ্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে এখান থেকে পাথরের ভাস্কর্য, শিলালিপি, পোড়ামাটির ফলক, অলঙ্কৃত ইট, ধাতব বস্তু এবং বিশেষভাবে হেরুকা-সহ বজ্রযানী বৌদ্ধ প্রতিমা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ চর্যাকারদের তান্ত্রিক-বৌদ্ধ সাধনা যে ধরনের ধর্মীয় পরিবেশে বিকশিত হয়েছিল, বৃহত্তর বরেন্দ্র ও উত্তরবঙ্গের এই প্রত্নতাত্ত্বিক পরিসর তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দিনাজপুরের নিজস্ব ভূখণ্ডেও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের প্রমাণ কম নয়। নবাবগঞ্জের সীতাকোট বিহার, করতোয়া-সংলগ্ন প্রাচীন বিহারসমূহ, বিভিন্ন ধাপ ও প্রত্নস্থল এবং সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে আবিষ্কৃত বিহারগুলো প্রমাণ করে যে বর্তমান দিনাজপুর কোনো ‘বৌদ্ধবিহীন প্রান্তিক অঞ্চল’ ছিল না। সরকারি জেলা-তথ্যে নবাবগঞ্জ অঞ্চলের একটি প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ৪১টি প্রকোষ্ঠের কথা বলা হয়েছে। আবার প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে আদি-মধ্যযুগীয় বসতির বিস্তৃত উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে।
এই প্রত্নতাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা চর্যাপদের ধর্মীয় প্রকৃতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চর্যাকাররা সাধারণ গৃহস্থ কবি ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন সহজযান, বজ্রযান ও তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাধনার সঙ্গে যুক্ত সিদ্ধাচার্য। তাঁদের কবিতার ভাষা আংশিকভাবে সাংকেতিক—‘সন্ধ্যাভাষা’ নামে পরিচিত। পদে কৃষক, জেলে, শিকারি, কুমার, ডোম, নৌকা, ঘর, গরু, ধান, নদী, বন, বাজার, নারী, নগর ইত্যাদি দৈনন্দিন জীবনের উপকরণ এসেছে; কিন্তু এগুলোর আড়ালে নিহিত থাকে যোগ, তন্ত্র, চক্র, প্রজ্ঞা, উপায়, শূন্যতা ও দেহসাধনার সংকেত। এই দ্বৈততা চর্যাপদকে একই সঙ্গে লোকজ ও গুপ্ত, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক করে তুলেছে।
এখানেই বৃহত্তর দিনাজপুরের সঙ্গে চর্যার সম্পর্কের প্রথম শক্তিশালী সূত্রটি পাওয়া যায়। যে অঞ্চলে পালযুগে নগর, বাণিজ্যপথ, কৃষি, নদীপথ ও বৌদ্ধবিহার পাশাপাশি বিকশিত হয়েছিল, সেই অঞ্চলের লোকজ জীবন চর্যার উপমা ও রূপকের জন্য উপযুক্ত সাংস্কৃতিক মাটি সরবরাহ করেছিল। কোটিবর্ষের প্রত্নতাত্ত্বিক নগরজীবন, পুণ্ড্রবর্ধনের বিস্তৃত রাজনৈতিক পরিসর, বরেন্দ্রের বিহার-সংস্কৃতি এবং করতোয়া-পুনর্ভবা-আত্রাই নদীভিত্তিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গ ছিল সিদ্ধাচার্যদের যাতায়াত ও সাধনার জন্য এক উর্বর অঞ্চল।
এবার চর্যার পদগুলোর ভাষার দিকে তাকানো যাক। ভুসুকুপাদের বিখ্যাত পদে আছে—‘আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী’। এই একটি পঙ্ক্তিই বহু আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখানে ‘বঙ্গালী’ শব্দটি আধুনিক জাতীয়তার অর্থে ব্যবহার করা হয়নি; এটি তৎকালীন বৃহত্তর বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি ভাষিক চিহ্ন। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘আজি’, ‘মোর’, ‘পইঠা’, ‘মইলে’ প্রভৃতি রূপ। উত্তরবঙ্গের রংপুরী-দিনাজপুরী কথ্যভাষায় আজও ‘আইজ/আজি’, ‘মোর’, ‘মুই’, ‘মইলে’ জাতীয় রূপের অস্তিত্ব আছে। কোনো একটি শব্দের সাদৃশ্য অবশ্যই জন্মস্থান প্রমাণ করে না; কিন্তু একাধিক সর্বনাম, ক্রিয়ারূপ, কালচিহ্ন, বিভক্তি ও ধ্বনিগত রূপ যখন একই ভৌগোলিক অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকে, তখন তা ভাষার ঐতিহাসিক স্তর শনাক্ত করার মূল্যবান উপাদান হয়ে ওঠে।
ভুসুকুপাদের অন্য পদেও এই লোকভাষিক চরিত্র দেখা যায়। তাঁর ‘চারি চাঁদে’ বা ‘চৌদীস’ জাতীয় রূপ, ‘অপণা’, ‘মাংসে’, ‘হরিণা’, ‘মূঢ়া’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহারে সংস্কৃতনির্ভর পাণ্ডিত্যভাষার পরিবর্তে জীবন্ত কথ্যভাষার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যার ভাষায় প্রাচীন বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান করেছিলেন এবং তদ্ভব ও দেশজ শব্দের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছিলেন। চর্যার পাণ্ডুলিপি নেপালে সংরক্ষিত হলেও ভাষার ভৌগোলিক চরিত্র পূর্বভারতীয়; সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও সুকুমার সেনের মতো গবেষকের ভাষাতাত্ত্বিক সারাংশও জানায় যে চর্যায় বাংলা, অসমিয়া, উড়িয়া ও বিহারি ভাষার বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে দেখা যায়।
কাহ্নপাদ এই আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি। চর্যাপদের পদকর্তাদের মধ্যে তাঁর নামে সর্বাধিক পদ পাওয়া যায়। তাঁর পদগুলোতে যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তার মধ্যে ‘তোহর’, ‘তোহরি’, ‘মোএ’, ‘নাড়িআ’ প্রভৃতি রূপ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ‘তোহর’—অর্থাৎ তোমার—রূপটি উত্তরবঙ্গের বহু উপভাষায় আজও পরিচিত। ‘মোএ’ বা ‘মোক’-এর সম্পর্কও উত্তরবঙ্গীয় সর্বনামব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। ‘নাড়িআ’ ধরনের রূপে ধ্বনিগত পরিবর্তন ও কথ্যতার যে বৈশিষ্ট্য আছে, তা চর্যার ভাষাকে একটি নির্দিষ্ট লোকভাষিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দেয়।
কাহ্নপাদের বিখ্যাত পদে ‘নগর বাহিরিরে ডোম্বী তোহোরি কুড়িআ’—এই ধরনের লোকজ দৃশ্য রয়েছে। এখানে নগর, ডোম্বী, পথ, গমন, দেহ ও সম্পর্কের যে উপমা ব্যবহৃত হয়েছে, তা কেবল তান্ত্রিক সংকেত নয়; এর পেছনে রয়েছে বাস্তব সমাজের ভাষা। কাহ্নপাদের ভাষার এই লোকভিত্তিক চরিত্র তাঁকে কোনো রাজদরবারের সংস্কৃত কবি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে। তাঁর কবিতার সামাজিক ভূগোল সন্ধান করতে গেলে উত্তরবঙ্গের গ্রাম-নগর-নদী-সীমান্ত সংস্কৃতিকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সরহপাদের ক্ষেত্রেও ‘মই’ এবং ‘খাইব’ জাতীয় রূপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘মই’ থেকে উত্তরবঙ্গীয় ‘মুই’, ‘খাইব’ থেকে ‘খাইম’—এই রূপান্তরকে সরাসরি একই শব্দের সরল উত্তরাধিকার বলা যাবে না; কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিক তুলনায় এগুলো একটি প্রাচীন পূর্বাঞ্চলীয় ক্রিয়া ও সর্বনামব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বোঝাতে পারে। চর্যার ভাষা ও উত্তরবঙ্গীয় কথ্যভাষার তুলনা তাই কেবল শব্দের অভিধানগত মিল নয়; ধ্বনি, রূপ, ক্রিয়া, সর্বনাম ও বিভক্তির স্তরেও করা প্রয়োজন।
ঢেঁটনপাদের পদ আরও আকর্ষণীয়। ‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেসী’, ‘হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী’, ‘বেঙ্গস সাপ চঢ়িল জাই’, ‘বলদ বিআল গবিঅ বাঁঝে’, ‘পীঢ়া দুহিআই এ তীনি সাঁঝে’—এই পঙ্ক্তিগুলোয় যে শব্দভাণ্ডার ব্যবহৃত হয়েছে তা একদিকে কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জীবনকে সামনে আনে, অন্যদিকে উত্তরবঙ্গীয় লোকভাষার সঙ্গে তুলনার অবকাশ সৃষ্টি করে। ‘মোর’, ‘হাড়ীত’, ‘নিতি’, ‘চঢ়িল’, ‘বলদ’, ‘সাঁঝে’—এসব শব্দের অনেকগুলো আজও উত্তরবঙ্গের লোকভাষায় পরিচিত। বিশেষ করে ‘তলত/তলোত’, ‘হাড়ীত’, ‘মোর’, ‘মুই’, ‘আইজ’ জাতীয় রূপের সমষ্টিগত উপস্থিতি এক ধরনের ভাষিক ভূগোল নির্দেশ করে।
রংপুরী-দিনাজপুরী ভাষার ‘তলত’ বা ‘তলোত’ রূপটি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লোকছড়ায় পাওয়া যায়—‘বাশের তলোত যাই / বাশের তলোত ঝাপুর ঝুপুর / ঠাণ্ডা বাতাস খাই।’ এই ‘তলোত’ অর্থাৎ তলায় বা নিচে—চর্যার ‘তলত’ ধরনের রূপের সঙ্গে তুলনীয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষাকে নদীর স্রোতের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন—ভাষার জন্মের কোনো নির্দিষ্ট দিন নেই; বিভিন্ন স্থানে তার বিভিন্ন নাম ও রূপ। এই ধারণা চর্যা ও রংপুরী ভাষার সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। কারণ একই প্রাচীন ভাষিক প্রবাহের ভিন্ন শাখা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথক অঞ্চলে পৃথক রূপে টিকে থাকতে পারে।
লুইপাদের পদেও ‘মুই’ জাতীয় রূপের উপস্থিতি লক্ষণীয়। লুইপা চর্যাপদের অন্যতম প্রাচীন সিদ্ধাচার্য এবং তিব্বতীয় ঐতিহ্যে তিনি সিদ্ধপরম্পরার অন্যতম আদিগুরু হিসেবে সম্মানিত। তাঁর সঙ্গে পূর্বভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগের কথা বৌদ্ধ ঐতিহ্যে পাওয়া যায়। তাঁকে একক আধুনিক জেলার বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন; কিন্তু তাঁর পদে যে ভাষিক রূপ পাওয়া যায়, তা পূর্বভারতীয় কথ্যভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই কারণেই লুইপা-সহ চর্যার প্রাচীন সিদ্ধদের ইতিহাসকে বরেন্দ্র, পুণ্ড্রবর্ধন ও উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক ভূগোলের বাইরে রাখা সমীচীন নয়।
চর্যার ‘বঙ্গাল দেশ’ এবং ‘বঙ্গালী ভইলি’ জাতীয় উল্লেখও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চর্যাকারদের কাছে ‘বঙ্গ’ ছিল একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অঞ্চল। আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের মানচিত্রে যে অঞ্চলগুলো বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম বা উড়িষ্যার অন্তর্ভুক্ত, চর্যার যুগে সেগুলো আধুনিক অর্থে পৃথক রাষ্ট্র বা ভাষারাষ্ট্র ছিল না। সিদ্ধাচার্যরা নদী, বাণিজ্যপথ, তীর্থ, বিহার ও গুরুপরম্পরার মাধ্যমে চলাচল করতেন। ফলে কাহ্নপাদ বা ভুসুকুপাদের জন্ম যদি উত্তরবঙ্গে হয়ে থাকে, তাঁদের অন্যত্র সাধনা করা বা অন্য অঞ্চলের ভাষিক বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করা অস্বাভাবিক নয়; একইভাবে অন্যত্র জন্মগ্রহণকারী কোনো সিদ্ধের দীর্ঘকাল বৃহত্তর দিনাজপুরে অবস্থানও সম্ভব।
এইখানেই ‘জন্মভূমি’ ও ‘সাধনভূমি’—দুই ধারণার পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চর্যাকারদের ক্ষেত্রে আমাদের হাতে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ অনেক সময় জন্মস্থান নয়, বরং তাঁদের সাধনা ও সাংস্কৃতিক পরিসরের প্রমাণ। সিদ্ধাচার্যদের জীবনকথা মূলত তিব্বতীয় অনুবাদ, বৌদ্ধ কিংবদন্তি, পরবর্তী জীবনী এবং তাঁদের নামে প্রচলিত পদ থেকে পুনর্গঠিত। তাই কোনো কবির পদে উত্তরবঙ্গীয় ভাষার বৈশিষ্ট্য, উত্তরবঙ্গের বৌদ্ধ প্রত্নস্থলের সঙ্গে তাঁর ধর্মীয় পরম্পরার সামঞ্জস্য এবং একই অঞ্চলে তাঁর স্মৃতির লোকায়ত উপস্থিতি—এই তিনটি একত্রে পেলে সম্ভাব্য আঞ্চলিক পরিচয় নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়।
গোরক্ষনাথের প্রসঙ্গ এখানে চর্যার বৃহত্তর উত্তরাধিকার বোঝাতে সহায়ক। গোরক্ষনাথ নিজে চর্যাপদের পদকর্তা নন; তাঁর সঙ্গে যুক্ত নাথধর্ম মূলত পরবর্তী শৈব-যোগী ও তান্ত্রিক ধারার অংশ। কিন্তু বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও নাথযোগীদের মধ্যে সাধনপদ্ধতি, দেহতত্ত্ব, গুপ্ত ভাষা এবং লোকগীতির নানা আন্তঃসম্পর্ক ছিল। বৃহত্তর দিনাজপুরে গোরকুই বা গোরক্ষকূপের মতো স্থাননাম ও স্মৃতিচিহ্ন সেই উত্তরাধিকারকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈলের গোরকুইতে গোরক্ষনাথ-স্মৃতিবাহী মন্দির, আশ্রম ও প্রাচীন কূপ রয়েছে; সমকালীন প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাহিত্য গবেষকগণ স্থানটিকে নাথপন্থিদের প্রাচীন ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই নাথ ঐতিহ্য চর্যাপদের সঙ্গে সরাসরি একাকার নয়, কিন্তু উত্তরবঙ্গের তান্ত্রিক-যোগী সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বোঝাতে এর মূল্য অপরিসীম। চর্যার সহজযানী বৌদ্ধ সাধনা এবং নাথদের দেহসাধনা পরবর্তী যুগে বহু লোককথা, গীতিকা ও সাধনসাহিত্যে একে অপরের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। গোপীচাঁদ-ময়নামতী, মানিকচন্দ্র, গোরক্ষনাথ প্রভৃতি আখ্যান উত্তরবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের লোকসাহিত্যে যে বিস্তার লাভ করে, তার পেছনে এই প্রাচীন তান্ত্রিক-যোগী সাংস্কৃতিক পরিবেশের দীর্ঘ প্রভাব ছিল।
‘সুরোহর’ প্রসঙ্গটি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। গবেষক ধনঞ্জয় রায় সুরোহরকে অতীশের জন্মস্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং তার লেখা ‘দিনাজপুর জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে অতীশ দীপঙ্কর সেই সুরোহর গ্রামের আচার্য জেতারির কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে দেবকোটে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় অতীশের জন্মস্থান নিয়ে ঐকমত্য নেই। বহু গবেষক ও তিব্বতীয় ঐতিহ্যের পাঠে তাঁকে বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; আবার অন্য গবেষকরা বিহারের ভাগলপুর-সাবৌর অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর জন্মভূমির সম্পর্কের কথা বলেছেন। অতএব সুরোহর-তত্ত্বকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার না করে বৃহত্তর দিনাজপুরের বৌদ্ধ জ্ঞানপরিসরের একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে রাখা উচিত।
তবে সুরোহর গ্রামটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল। সেখানে পালযুগীয় জৈন ভাস্কর্যের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে প্রাচীন দিনাজপুরের এই অংশটি শিল্প, ধর্ম ও পাণ্ডিত্যচর্চার একটি সক্রিয় কেন্দ্র ছিল। অর্থাৎ অতীশের জন্মস্থান-প্রশ্নে সুরোহর গ্রামসংশ্লিষ্ট দাবি প্রমাণিত না হলেও সুরোহর গ্রামটি যে চর্যাকারদের সময়কার উত্তরবঙ্গীয় সাংস্কৃতিক পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল, সে কথা প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্তে যথেষ্ট সমর্থিত।
অতীশ দীপঙ্করের সঙ্গে দিনাজপুরের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক জন্মস্থান নয়, তাঁর শিক্ষাজীবন ও বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পর্কিত। পালযুগে দেবকোট, সোমপুর, জগদ্দল, বিক্রমশীলা, নালন্দা ও অন্যান্য বিহার পরস্পরের সঙ্গে জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য বিনিময় করত। অতীশের মতো একজন বৌদ্ধ পণ্ডিত এই জ্ঞানচর্চার অংশ ছিলেন। ফলে তাঁর সঙ্গে দিনাজপুর-দেবকোটের সম্পর্ক থাকলে তা বৃহত্তর বৌদ্ধ জ্ঞানভূমির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন; কিন্তু সেই সম্পর্ককে চর্যাকারদের জন্মস্থান প্রমাণের সরাসরি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বরং দিনাজপুরের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো প্রত্নতাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা। বাণগড়ের পালযুগীয় নগরস্তর, পুণ্ড্রবর্ধনের বৌদ্ধ ঐতিহ্য, নবাবগঞ্জের বিহার, বরেন্দ্রের সোমপুর ও জগদ্দল, করতোয়া-আত্রাই-পুনর্ভবা নদীভিত্তিক যোগাযোগ, উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জনবসতি এবং পালযুগীয় ভাস্কর্যের বিস্তার—সব মিলিয়ে যে সাংস্কৃতিক অঞ্চলটি গড়ে ওঠে, চর্যাপদের পদকর্তাদের ধর্মীয় ও ভাষিক পরিসর তার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশেষত বাণগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য এখানে নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। কোটিবর্ষ/দেবকোটের পালযুগীয় স্তরে দুর্গপ্রাচীর, আবাসিক স্থাপনা, মন্দির, শস্যাগার, স্নানাগার, নালা, কূপ ও নগরপরিকল্পনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পালযুগে এই নগর সমৃদ্ধ ছিল এবং কোটিবর্ষ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। একটি সমৃদ্ধ নগরকেন্দ্রের পাশে গ্রামীণ জনপদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কারুশিল্প, কৃষি ও নদীপথ থাকবেই। চর্যার পদে যে নগর ও গ্রামীণ জীবন পাশাপাশি উপস্থিত, তার জন্য এমন পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উপযোগী।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তরবঙ্গের নদীভূগোল। কোটিবর্ষ পুনর্ভবা ও আত্রাই নদীর সংযোগভূমিতে অবস্থিত ছিল। নদী ছিল মধ্যযুগীয় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। তাই উত্তরবঙ্গের কোনো সাধক সহজেই বরেন্দ্র, গৌড়, কামরূপ বা বিহারের অন্য বৌদ্ধকেন্দ্রে যাতায়াত করতে পারতেন। চর্যাকারদের ভৌগোলিক পরিচয়কে এই নদীনির্ভর গতিশীলতার মধ্যে দেখতে হবে। একজন কবির পদে যদি কামরূপের ইঙ্গিত থাকে, তাতে তিনি দিনাজপুরের নন—এমন সিদ্ধান্ত যেমন ভুল হবে, তেমনি কোনো পদে বঙ্গের উল্লেখ থাকলেই কবি বর্তমান বাংলাদেশের নির্দিষ্ট জেলার মানুষ—এমন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়।
এই কারণে চর্যাকারদের ‘দিনাজপুরীয়’ পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো বহুস্তরীয় তুলনা। প্রথম স্তরে থাকবে প্রত্নতত্ত্ব; দ্বিতীয় স্তরে পালযুগের রাজনৈতিক ইতিহাস; তৃতীয় স্তরে বৌদ্ধবিহার ও তান্ত্রিক সাধনার বিস্তার; চতুর্থ স্তরে চর্যার ভাষা; পঞ্চম স্তরে উত্তরবঙ্গের জীবন্ত লোকভাষা ও লোকস্মৃতি। এই পাঁচ স্তর একে অপরের সঙ্গে যখন সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন কোনো অঞ্চলের সম্ভাব্য সাংস্কৃতিক ভূমিকা সম্পর্কে দৃঢ়তর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
এই পাঁচ স্তরের মধ্যে ভাষিক প্রমাণটি সবচেয়ে প্রাণবন্ত। আজও দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলের লোকভাষায় ‘মুই’, ‘মোর’, ‘আইজ’, ‘তলত/তলোত’, ‘হাড়ীত’, ‘নিতি’, ‘সাঁঝে’, ‘খাইম’, ‘পইঠা’, ‘মইলে’ জাতীয় রূপ পাওয়া যায়। এগুলো চর্যার ভাষায় বিভিন্ন রূপে উপস্থিত। আবার ‘কাউয়া’, ‘কালা’, ‘খালত’, ‘গগণত’, ‘দুয়ারত’, ‘দুলি’, ‘পৈরাণ’, ‘নাল’, ‘গেলি’, ‘হেরি’, ‘রাতি’ প্রভৃতি শব্দও উত্তরবঙ্গের লোকভাষার সঙ্গে তুলনা করা যায়। এগুলোর প্রত্যেকটির পৃথকভাবে প্রমাণমূল্য সীমিত; কিন্তু এতগুলো শব্দ ও রূপকে একত্রে একটি ভাষিক মানচিত্রে বসালে প্রাচীন উত্তরবঙ্গীয় ভাষার সঙ্গে চর্যার ভাষার ঘনিষ্ঠতার প্রশ্নটি উপেক্ষা করা কঠিন।
চর্যার ভাষা যে সম্পূর্ণ আধুনিক বাংলা ছিল না, তা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। পণ্ডিত ও গবেষকদের ভাষাতাত্ত্বিক বিবরণে স্পষ্ট করা হয়েছে যে চর্যায় বাংলা, অসমিয়া, উড়িয়া ও বিহারি ভাষার বৈশিষ্ট্য একত্রে দেখা যায়, কারণ এগুলোর প্রাচীন পূর্বভারতীয় কথ্যভাষাগত উৎস পরস্পর সম্পর্কিত। এই কারণেই চর্যাকে ‘শুদ্ধ বাংলা’ হিসেবে দাবি করার চেয়ে ‘প্রাচীন পূর্বভারতীয় ভাষার মধ্যে বাংলা-অসমিয়া-উড়িয়া ইত্যাদির দিকে বিকশিত হওয়া এক ভাষিক স্তরের দলিল’ হিসেবে দেখা বেশি বৈজ্ঞানিক। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক সতর্কতা দিনাজপুরের দাবিকে দুর্বল করে না; বরং তা আরও শক্তিশালী করে। কারণ বৃহত্তর দিনাজপুর নিজেই সেই পূর্বভারতীয় ভাষিক সংযোগক্ষেত্রের একটি অংশ ছিল।
গোরকুইয়ের প্রত্নস্থলটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বর্তমান স্থাপনাগুলোর অধিকাংশ পরবর্তী যুগের হলেও স্থানটির ধর্মীয় স্মৃতি অনেক পুরোনো বলে স্থানীয় ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক আলোচনায় বিবেচিত হয়েছে। ক্ষেত্র সমীক্ষায় দেখা গেছে, গোরকুই প্রত্নকেন্দ্রে একাধিক ছোট মন্দির, প্রাচীন কূপ এবং গোরক্ষনাথের সমাধি হিসেবে পরিচিত একটি স্থাপনা রয়েছে। অর্থাৎ কোনো সাধকের সঙ্গে একটি অঞ্চলের সম্পর্কের প্রমাণ শুধু তাঁর সমসাময়িক শিলালিপিতে নয়, দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকা স্থাননাম, আচার ও লোকস্মৃতিতেও সংরক্ষিত হতে পারে—যদিও সেগুলোকে অবশ্যই সমালোচনামূলক মূল্যায়নের দৃষ্টিতে যাচাই করতে হবে।
বৃহত্তর দিনাজপুরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় বহুত্ব। সুরোহর, ইতাহার ও উত্তর দিনাজপুরের আশপাশের অঞ্চলে পালযুগের জৈন ও ব্রাহ্মণ্য ভাস্কর্য যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি বৃহত্তর উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধ প্রত্ননিদর্শনও বিস্তৃত। সুরোহর থেকে আবিষ্কৃত দশম শতকের ঋষভনাথের অসাধারণ মূর্তি বর্তমানে রাজশাহীর সংগ্রহে সংরক্ষিত; গবেষণায় এটিকে বরেন্দ্র শিল্পধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই তথ্যের গুরুত্ব হলো—চর্যাপদের সময়কার উত্তরবঙ্গ কোনো একমাত্রিক ধর্মীয় অঞ্চল ছিল না; বরং বৌদ্ধ, জৈন, শৈব, বৈষ্ণব ও স্থানীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির সহাবস্থান ছিল। এমন বহুমাত্রিক পরিবেশেই সিদ্ধাচার্যদের মতো ধর্মসীমা অতিক্রমকারী সাধকদের বিকাশ সম্ভব।
রংপুরী ভাষার সঙ্গে চর্যার সম্পর্কও এই আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পায়। রংপুরী কোনো হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া আধুনিক আঞ্চলিক ভাষা নয়; এর মধ্যে প্রাচীন উত্তরবঙ্গীয় ভাষার বহু স্তর সংরক্ষিত আছে। দিনাজপুর ও রংপুরের মধ্যে ঐতিহাসিক যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। প্রশাসনিক সীমানা বদলেছে, কিন্তু নদী, জনপদ, কৃষি, বিবাহ, বাণিজ্য ও লোকসাহিত্যের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। ফলে রংপুরী ভাষায় সংরক্ষিত কোনো প্রাচীন শব্দরূপের সঙ্গে চর্যার রূপের মিল পাওয়া গেলে সেটিকে শুধু ‘রংপুরের আধুনিক উপভাষার প্রভাব’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না; বরং উভয়ের একটি প্রাচীন সাধারণ ভাষিক উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
মাসুদুল হক : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, দিনাজপুর




