তোফায়েল তফাজ্জল
জীবন চলে না গাণিতিক সূত্র শরীরে জড়িয়ে
বা সমীহ করে; বরং তা প্রায়ই বড়শিদের অনুগত মাছ হয়ে ঝুলে পড়ে।
স্বপ্ন-সাধ আটকে যায় টানা-পোড়েনের বাঁকা রিঙে।
আবার কখনো খেয়াল-খুশির রঙ-বেরঙের ঘুড়িরূপে
বাতাসের হালকা আমেজের ঢেউয়ে ঢেউয়ে
চিৎ হয়ে, কাত হয়ে বুঝতে চায় বিহঙ্গ-দিনের প্রকরণ।
ফুলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রজাপতি হয়ে ওড়ে
কিংবা খাড়া কানে শুনতে চায় অলিদের গুঞ্জরণ
যা দেখে গা-জ্বলাদের ক্ষুব্ধতায় যোগ হয় অমাবস্যা-তিথি।
এসবের দুশমন হিসেবে আদাজল খেয়ে লাগে ভাঙতে
সংযমের কূল-উপকূল, ফেলতে অথই অর্ণবে,
করতে সলিল সমাধি তিলে তিলে বেড়ে ওঠা বাসনা-বাগান।
বলছো এসব এদের দুরারোগ্য রোগ? হতে পারে।
এরা দুর্বলতার মৌ, দুধ-কলা, ভাজি মাছ খেয়ে হতে চায়
বসন্তদূত বা শাখামৃগ অথবা বাঘের মাসি
চেনা-অচেনাকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে পেতে এক থালা সুখ!
বলো, কীভাবে এখানে অভয়ারণ্যের পাবো দেখা?
==================================
অসম্পূর্ণ মুখ
হামিদ রায়হান
চলে যাওয়া
না
অতটা সরল রেখা নয়
ভাঙা ত্রিকোণ জ্যামিতি
কোণ
খণ্ড
অসম্পূর্ণ মুখ
আমি
তিন খণ্ড আমি
একটা দাঁড়িয়ে দরজায়
একটা অস্বচ্ছ জানালার কাচে লেগে আছে
আরেকটা কাগজের ভেতর রক্ত ঝরায়
আর তুমি?
তুমি তো ঘনক
ছয় পিঠে ছয়টি বিদায়
প্রতি পিঠে আলাদা সময়
আলাদা আলাদা অস্বীকার
চলে যাওয়া মানে দেহ সরে যায়
অথচ আটকে পড়ে ছায়া
ভাঙা দেয়ালের দিকে
দেখো
এ কবিতা একটা টেবিল নয়
ধূলি পড়া ভাঙা পুরনো টেবিলে
অযত্মে ছড়িয়ে থাকা সময়ের থালা
শব্দগুলো লাফ দেয় ছিটকে পড়ছে
নিজেদেরই গলায় ধরে চিৎকার করছে
আমরা যাচ্ছি! না, রয়ে গেছি!
আমি লিখি
তবু হাঁটে না লাইনগুলো সোজা
তারা বাঁক নেয় কেটে যায়
একে অপরকে লাথি মারছে
মানে অস্বীকার করছে
তুমি চলে যাও
এক কোণ থেকে
জাগছোও অন্য কোণে
এক মুখ মুছে যায়
আরেকটা মুখ
হঠাৎ
আমাকে তাকিয়ে থাকে
এই যে আমার বুক
এক ভাঙা মানচিত্র
রক্ত রেখা দিয়ে আঁকা
তোমার অনুপস্থিতির দেশ
অন্তত এবার ভাবো
… শেষ?
না, শেষ এখানে একটা ভাঙা আয়না;
প্রতি টুকরো বলছে, আমি শেষ
রক্ত পড়ছে রাস্তায়
এরপরও সবগুলো মিলিয়ে
একটি প্রস্তুতি চলে যাওয়ার
মানে সম্পূর্ণ হওয়া নয়
বরং
নিজেকে ভাঙছে
অসংখ্য থেকে যাওয়া
তবু চলে যাবে
যাও …
==================================
মেঘ
সরকার আজিজ
এখনো পিপাসা
এখনো জলকাতরতা
গরম বাতাস জ্বর আর বিহগ-চুম্বন
দুপুরে ছায়ায় পাতাদের কোলাহল
এখনো ক্রমাগত তোমার নেশা
আজ শ্যামসন্ধ্যা
সমস্ত চৈতন্যজুড়ে একটা রাজহাঁস
কার বিরহে আমি স্মৃতিশিখা আঁকি!
আলোময় একটা বিরহ
যার সাম্রাজ্যে ঘিরে আছে নিবেদন
তার মায়াবি ছায়ার নাম জানা নাই
ক্ষমা করো সিন্ধুর জল
আমি পেতে চাই না কিছু
আমাকে এক বিন্দু প্রেম দীক্ষা দাও
যে আছো অন্তরে তুমি রেশমি বুনন
তার দিকে ছুটে আমার সমস্ত জীবন
==================================
দীর্ঘ প্রেমের কবিতা
সোহরাব পাশা
ভ্রমণের অসমাপ্ত ছোট ছোট গল্প
লাবণ্যের ছেঁড়া পাতা–
নিরীহ ক্রন্দন
রাত্রিঢাকা ভোরের গোলাপ
দাগ ওঠে না মেঘের
সন্দেহ প্রবল ছায়াগুচ্ছ
আজন্ম অন্য তুমি,
অদ্ভুত আদিম রূপান্তর
ত্রস্ত কলস্বর
পেছনে তুমুল না- থাকার ইতিহাস
নৈঃশব্দের প্রিয় গান ;
মুখস্থের ক্লাস —
রোদন নিষিদ্ধ নেই দীর্ঘ প্রেমের কবিতা ।
==================================
জখমী বাংলাদেশ
সুশান্ত হালদার
রুদ্র অনলে দগ্ধ শরীরও বিশ্রাম চায়
আর ক্ষুধায় যখন মলয় রায়চৌধুরী হয়ে উঠি —
তখন কবিতার ছিঁড়া পাতায় দেখি কামিনীলতায় ব্যস্ত কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী
ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের মানচিত্র ধরে সাদাচুলের ফাঁক গলিয়ে
দেখে নিচ্ছে সাঁতার কাটা চাপিলার জীবনানন্দ উপত্যকার শিলাইদহ কুঠুরি
কোন কোনদিন ঘুম ভাঙতেই দেখি
টেবিলে রাখা কবিতায় নিয়ম ভাঙার অনিয়মে বসে আছে হুমায়ুন আজাদ
জবাফুল চোখে তাকিয়ে দেখছে রক্তাক্ত কাহ্ন পা নিবাস
যেখানে চন্দন বিথী বাগানে মাস্টারদা ভোলা গাছে
ঝুলে আছে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের
বেয়নেট বিদ্ধ তারাপদ রায়ের জখমী বাংলাদেশ
কোন কোনদিন চোখ খুলেই দেখি
পুড়িতেছে রুদ্র রবি সূর্য— কানাই তাপস রোকেয়া রাবেয়া সোনিয়া সবাই
জ্বলছে প্রীতিলতা সুহাসিনী লীলা নাগ ইলা মিত্র দুকড়িবালা দেবী
গার্সিয়া মিছিলে মাভৈ মাভৈ বলে দিচ্ছে ডাক- নবারুণ মানিক গাঙ্গুলী
লোরকা অবমুক্তি আগুনে ফিরবে শীতলক্ষ্যার ভৈরবী কপালকুণ্ডলা জননী!
==================================
দহনের কাল
রূপক বরন বড়ুয়া
সমস্ত আলোক থেমে গেলে হতবাক পৃথিবীর বাঁক
মৃত নক্ষত্র নগরী থেকে ধেয়ে আসে বিক্ষুব্ধ আঁধার!
মৃত্তিকা পিদিমে কই সুখ!অগ্নি হাতে আলোক সন্ধানে
সবুজ মাঠের পরে অগ্নিদাহে,পোড়ে দেহ,ধবল জ্যোৎস্নার।
বারেবারে দেখি চোখ মেলে কোন প্রাণ এসেছে এখানে
কোন ছায়াপথে সিক্ত কাল-মন্ত্র জপে নিসর্গ নরোমে।
আমরা তো কবেই মরে গেছি ছায়াহীন,অনন্তের ধ্যানে
চিত্রনাট্যে অহরহ ডুবি অতীতের ভঙ্গুর ম্যুরালে
ডুবে থাকা বিস্ময়ের ঘোর, জল, নিষ্প্রাণ চোখের কোণে
ও নদী পুড়িয়ে ওরা অন্য নগর বানাবে অন্তরালে।
এ জনপদ সাজাবে নব কোন জতুগৃহে চর্যার উদ্যানে
মুছবে বারোমাসি কেচ্ছা লালনের গান,পুরাণের ঘ্রাণ
ওরা তো আধমরা ঘুণ পোকা এতো শক্তি পেলো কোথা থেকে?
দহনের কূটকাছালি যত ওরা জানে অসভ্যের ধান ভানে।
শঙ্খবুকে তুলসীর প্রেমপাতা ভেসে যায় চোখে সমুদ্দুর
দহনের কাল শেষে কতদূরে হাসে রূপালি রোদ্দুর!
==================================
ঠাকুর ও দুখুর মিথষ্ক্রিয়া
নুসরাত সুলতানা
বরাবর নজরুলের সাথে আমার প্রগাঢ় সখ্য। তথাপি ঠাকুর এসে উঁকিঝুঁকি মারেন। মুচকি হাসেন। আমি দরোজা বন্ধ করে দিই। ঠাকুর জানালা গলে প্রবেশ করেন আমার মনের মল্লিকা বনে। আমি তাঁরে তবক দেয়া খিলি পান দিই। ঠাকুর পান মুখে দিয়ে মুচকি হাসেন। পাশে বসেন। এরভেতর ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। আমি দাঁড়িয়ে জানালার গ্রিলের ফাঁকে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁতে যাই। ঠাকুর গেয়ে ওঠেন—আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে..। স্বর্গে বসে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো দাঁত খিটমিট করেন। কাদম্বরী দেবী মুচকি হেসে বলেন- সে নহে হয় কভু কারো একা..। সে শুধু সুদূরের..! এরভেতর দেখি ঠাকুর কোথায় মিলিয়ে চলে গেছেন। আমি বিমূঢ় হয়ে বসে থাকি। অতঃপর ভেসে আসে দুখুর ক্ষ্যাপাটে কন্ঠস্বর- নারী নাহি হতে চায় কভু একা কারো। ওরা দেবী, ওরা লোভী, উহাদের অতিলোভী মন এক পেয়ে সুখী নয়, একজনে তৃপ্ত নয়। ওরা যাচে বহুজন…
==================================
মনজু রহমানের দুটি কবিতা
বোধের পাগলামি
তুমিই শিখিয়েছিলে; রুমালে ফুলের কুসুম ভেঙে জ্যোৎস্না ছোঁয়ার গান
আকাশ থেকে আকাশে; মেঘ থেকে মেঘের নীলিমায় জোয়ারের টান
বলেছিলে প্রেমের ঋষি বসে এইখানে, চোখের আয়নায় ভাঙে স্বরলিপি
শূন্য উদ্যানে শব্দের পান্তর বোষ্টব; এইখানে শব্দের জন্ম-মৃত্যু দেখো
মধু ও বিষ চুম্বনে এই প্রেম পুস্পিতা; শ্ল্পিজাত; দীর্ঘায়ু; চরণে রেখো—
সেই যে অঙ্কের শুরু; অঙ্কের মাতাল টানে-শব্দে এতোকাল উড়েছি আমি
এ তুমি কেমন তুমি; হৃষ্ট হওয়ার আগে ঝরালে দীপ্তি; বোধের পাগলামি!
বর্ষাস্নাত বোঁটায়
তারপর ঘরের ভেতর শূন্য ঘর
তারপর কুয়াশার দানা; ঘামর শরীর
বর্ষার উজানে সাপের উষ্ণ পারদ
ও হে সর্পিনী, তোমার কি ক্রিয়ার সময়?
এই খোলা ঘরে দেবতা নেই জেনেও
ঊাসা বাঁধো শূন্যের গুহায়?
আমার একান্ত বারান্দায় রোদ ও মেঘের সঙ্গম
আমার অথৈ ঘুমঘরে মাছরাঙার দীঘল ঠোঁট
কী চাও গাঙচিল, খোলা চাতালের শূন্য উঠোনে?
আমি কোনো দেবীর দেবতা হতে পারিনি আজও;
পড়ে আছি তার ছড়ানো কালো চুলের দীর্ঘ আঁধারে
সেই অন্ধকার সরবরে
এক বোধ নিয়ে হেঁটে যাই স্বপ্নের প্রান্ত রেখায়
প্রেমে নয়; ভালোবাসায় নয়;
দেবীর দর্পণ আঁচে পুড়ি তার প্রথম সোপান
ঈড়ি করতোয়ার নব বেহুলার শীতল আগুন
পুড়তে পুড়তে
দূর কদমের বর্ষাস্নাত বোঁটায় বুনি বাবুই বাসা।
==================================
হোসেইন আজিজ-এর তিনটি কবিতা
ভেতরবাসী নেকড়ে
না, কোনো রজ্জুতে নয়,
অন্তঃস্থ শিকলে বেঁধে রাখি
রক্তচন্দ্রের নেকড়ে;
যে কেবল জ্যোৎস্নার নয়,
নিজের ছায়াকেও ছিঁড়ে খায়।
কদাচ সে বিদ্রোহী হয়,
চিৎকারে কাঁপিয়ে তোলে
ঘনবসতির লোকালয়;
যেখানে মানুষেরা নয়,
নেকড়েরা মুখোশ পরে।
তবুও প্রাণপণে বেঁধে রাখি
আমার ভেতরবাসী নেকড়ে,
সে বাঁধনমুক্ত হলে
আমি আর মানুষ থাকবো না,
থাকবো কেবল এক আর্তনাদ।
মৃতরাগের দাহ
তোমার স্যাঁতস্যাঁতে গুহা,
বছরের পর বছর যেখানে
জমে আছে মৃতরাগ।
কেউ জানে না,
কতকাল সূর্য ঝুলেছিল
তোমার জানালার কার্নিশে,
শুধু শুকিয়ে দিতে আর্দ্রন্ধকার।
আজ আকাশে উদোম সূর্য,
মনগুহা শুকিয়ে নাও, নারী,
উবে যাক মৃতরাগের গন্ধ।
পলাতক হবো
একদিন আমিও পলাতক হবো।
রক্তের গন্ধ ফেলে, নাড়ির দড়ি ছিঁড়ে,
শেকড়ের শব্দে ফিরে যাবো না।
থাকবে চৌকাঠের ছায়া,
আধভাঙা উচ্চারণ, আর
একটা নিঃশ্বাসের ছেঁড়া খসড়া।
আমি যাবো, উপড়ানো মাটির গন্ধে,
যেখানে সময় গিলে খায় সময়,
আর অবশ অবশেষ, শেষমেশ
নিজস্ব মাটিতেই রেখে যাবো আত্মলিপি।
==================================
এই দেহটি শ্রেণিবিভক্ত
দুলাল সরকার
এই দেহটি শ্রেণি বিভক্ত—- সব অঙ্গ নয় সমান বরণীয় —-
সমান মূল্যায়িত,কারোর প্রতি অবহেলা— যদিও সবার হস্তক্ষেপে সুস্থ, সুন্দর
সমাজ হতে পারে—- অথচ বিভক্ত ;
দৃষ্টিভঙ্গির এমন পার্থক্য — উদগিরণে মুছে দিতে
প্রস্তুত অগ্নিগিরি —- শোষণ,শাসন সকল বাধার
উপড়ে শেকড়
সাম্যবাদকে করতে প্রতিষ্ঠিত ধর্ম এবং পুঁজিকে
নাশ করে অনৈক্য আর বর্ণভেদকে মুছে
কারোর জন্য না খেয়ে কারো থাকা, মুছে ফেলে
নিশ্চিত করে সাম্যজলে ফুলের ফুটে ওঠা—-
মানুষ এবং প্রকৃতির এই সমান তালে ফোঁটা—
সহাবস্থান নীতি — ভালোবাসাও
নিশ্চিত করে বসন্ত মাস হতে—–
==================================
অন্ধকার
মুহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী
ক্ষত-বিক্ষত রাত্রের অন্ধকার জীর্ন পাতার মর মর ধ্বনি
পদাঘাতে ক্রোধ বীরত্বে আতঙ্কিত পদ-লালিত্য হুঙ্কার
সমুদ্রের তলদেশ আকাশে সীমানায় পৌছানোর
মৃত্যু জয়ী অবাধ্যতার ঢেউ।
পর্বতের সবুজ অরণ্যের স্বিগ্ধতার জটিল সমীকরণ
জীবন পুঞ্জিকা হিংস্র বিষাক্ত নখের থাবা
দাউ দাউ করে জ্বলে চিতার আগুন
বৃক্ষের চোখ হিমশীতল রোদ্দুর উজ্জ্বল বিভোর
স্বপ্ন স্যাঁতসেঁতে সোঁদা গন্দ।
উলঙ্গ উচ্চারণ অগ্নিপিন্ডে দগ্ধ জীবনের চোরাবালি
জলন্ত কয়লায় হেঁটে যায় আদিম মানুষ
উত্তাপে জ্বলে উঠে বর্বর হত্যাকাণ্ডের জনপথ।
==================================
চিলেকোঠা চাঁদ
আজিজ কাজল
প্রত্যাবর্তনই শেষ কথা নয়;এই দিঘির প্রত্ম-ঘোর আঁচলে
প্রতিদিন তোমার আদুরে পাখি বাস্তুবৃক্ষের শরীরে টানে
হলুদ শামিয়ানা।
প্রবাসী চিঠির নরম পদ্য, পত্নী-ক্ষুধার আগুন, সুইসুতা
ঘরকন্না, লবণ চোখের নরম—একটি কাঁচুলি মেঘ উড়ে
উড়ে পশ্চিমে যায়, প্রতিদিন সে বিরহ-বর্ণের চিঠি পাঠায়
হায় পাখি, তোমার ঠোঁটের নীলগদ্যে খড়-বিচালি ওঠে
না—উড়তে পারার সমূহ শক্তি নিয়ে হারালে তোমার
জহুরি।
==================================
একদিন এ অন্ধকারের
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
একদিন এই অন্ধকারের অবসান হবে নিশ্চিত আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত প্রমাণ রয়েছে এর।
কালো আঁধার বেশি দিন থাকে না
আলোর কাছে সে হেরে যায় ।
একদিন এই ছোট পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দূরত্ব কমবে রাঙা গন্তব্য এসে পায়ে জড়াবে ।
একদিন এই গাছের গোড়ায়
জল সার ঢালতে ঢালতে
ফুলও ফুটবে ফলও আসবে
ভালোবাসা আর নিষ্ঠার শ্রম বৃথা যায় না ।
গাছের শাখায় তুমুল ঝড় বইছে
রাগী নদী গর্জনশীল ঢেউয়ে ঢেউয়ে মাতাল
গিলে খায় বসতবাড়ি প্লাবনের রাক্ষস ।
হয়তো কিছু শাখা প্রশাখা ভাঙ্গে
হয়তো বাড়ি ঘরের কিছু ক্ষতি হয়ে যায়
তবু এ ঝড় থামে — প্লাবন থামে
বড় সাময়িক এরা
ফিরে আসে স্বাভাবিক বাতাস সুস্থ হাওয়া ।
রাতের ঘন বড়ো আঁধারে
জোনাকির রঙে রয়েছে ইশারা।
==================================
সোনার হরিণটিও পাবো একদিন
রেজাউল করিম
এক অস্থির সময়ের মুখোমুখি
পাওয়া না পাওয়ার হিশাব-নিকাশ করতে করতে আমরা
দিনের পর দিন যেন আরও অস্থির হয়ে পড়ছি
বাড়ছে সংঘাত,গুপ্ত হামলা,গুপ্ত রাজনীতি, গুপ্ত প্রেম
ভীষণ অস্থির সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি আমরা
রাগ,ক্ষোভ, লোভ,প্রতিশোধের নেশায় মত্ত আমরা
অনিশ্চয়তা, বিশ্বাসহীনতা আমাদের নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে
লক্ষহীন পথে যেন হাঁটছি আমরা
পাওয়া না পাওয়াার, আশা-নিরাশার দোলাচালে
যায় দিন আসে দিন, তবু সামনে এগুনো ছাড়া তো
আর বিকল্পও নেই আমাদের—
অনেক ভেবে দেখলাম,আমরা একদম পাইনি
এমনও তো না…
আমরা অনেক পেয়েছি,
পেয়ে হারিয়েছিও বারবার
হারাতে হারাতে পাবো,হারাতে হারাতে পাবো
সোনার হরিণটিও
হয়তোবা পাবো একদিন
সেই প্রতীক্ষায় দিন গুনি আজও।
==================================
মাটির সন্তান
রুহু রুহেল
আকাশটা সুনীল থাকে কম
সাদা মেঘের ভেলাও
জরাগ্রস্ততা-যেন অস্থির!
আমাদের মননটা নির্মল নয়
আপন চেনাতে বেশ কষ্ট
মনুষ্যজীব! খুব অদ্ভুদ!
আমার খোলা জানালা
শুচিবোধের প্রবাহে সমীরণ কম
দখিনা সমীরণের উন্মাতাল আনন্দে
ভাসাবো যে বুক
চেয়েছিলাম হাজার চোখের ভেতর
ডুব দিয়ে খুব।
পারবো কি না দ্বিধা দ্বন্দ্বে
আজো রাত আর ভোর কাটে
ঘোর অমানিশা যেন নেশা নেশা
অভিরূপ রূপ নাচে।
সেখানে দেখি এখনো
উত্তর পশ্চিম পূর্ব দক্ষিণ
বারেবার ব্যঙ্গ করে হাসে।
ভেবে ভেবে নিজের অহংকার
সুনিপুণ শিল্পত্ব বুনন
অতিপ্রলাপে ভ্রষ্টের কাছে
মাথা নত না করে বরঞ্চ
নব অঙ্গীকারে জেগে ওঠে
ব্যক্ত করে অভিপ্রায় বোধের নতুন জাগরণ!
আমার ও আমাদের আকাশ
সীমায়তনিক রেখায়
মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখুক
এ প্রত্যয় ও দৃঢ় অঙ্গীকার জানিয়েছিল
এ মৃত্তিকার সবুজ সন্তানেরা
চৌষট্টি হাজার গ্রাম বাংলার নদ নদী
পাহাড় পর্বত অরণ্যানী
বন বনানীর সাক্ষী রেখে
প্রোজ্জ্বল্যে স্বকীয় হোক
আমাদের মাটির সন্তানের সৃষ্টিগত
সাহিত্যের অমিয় সুধা রূপ!
==================================
ঝরে যাওয়া মায়াফুল
য়ানসার হক
মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি আছো
আমার অতলগর্ভে নীরবতার গভীরে লুকিয়ে।
আমার নি:স্বাসের অন্ত:প্রবাহ অদৃশ্য হলেও
তুমি থাকো নির্বিকারে অথচ নিপুণনতায়।
তবে কী তোমার নিরুচ্চার পরিপ্লুতা
একেবারে ভুল ছিল আমার ডেরায়?
ভেবেছিলাম এক অনবচ্ছিন্ন অধ্যায় হবে
আমাদের অনির্বাণ ধারাবাহিকতায়
আমার বিকিরিত প্রান্তর ডাকেনা কাঊকে
গোধূলি সন্ধ্যার সমীকরণ হতে….
অথচ দেখো কালের নির্মোহ প্রহেলিকা
ভ্রমেই শেষ হয় আমাদের মায়াময় পর্ব
মায়াবৃত্তের অধ্যায় ভেঙে আদি-অনন্তে।
==================================
আপেক্ষিক শব্দ
শামসুল বারী উৎপল
সত্যি একটা আপেক্ষিক শব্দ
হ্যাঁ হ্যাঁ সত্যিই বলছি
এই যেমন আইনস্টাইনের প্রাসঙ্গিক তত্ত্বের মতো,
সত্যিও আরেকটি ভাবনার প্রেক্ষিতে কাজ করে
মানে হল থিওরি অব রিলেটিভিটি,
বুঝতে পারছি আপনি আমাকে আস্ত একটা পাগল বলে গালি দিতে পারেন,
কিম্বা বাপ মা তুলেও।
সে যাকগে, তার আগে আসুন
বিশিষ্ট নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানীর কাছে পাঠ নিই,
আমি আপনাকে বোঝাতে ব্যর্থ হলেও
উনি নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা দেবেন,
কেন সময়ের সাপেক্ষে পরিবর্তিত হয় বস্তুর আকার।
আমেনা খাতুন যখন আমাকে বলেছিলো,
‘তিন সত্যি, তোমাকেই ভালোবাসি’
রাত পেরোবার বহু আগেই আমেনা খাতুন
চিনে নিয়েছিলো রাতের বেসাতি।
ঐযে মরা কুলগাছটার পশ্চিমপাশ ঘেঁষে
যে শুয়ে আছে নীল আকাশ
একদিন বলেছিলো জ্েযাৎস্না দেবে
প্রকৃতির পৃথিবীতে, দেয়নি।
যে স্নিগ্ধ সমুদ্রকে তুমি থৈ থৈ জল ধারণ করতে দেখো
আমি দেখি একখন্ড নির্ভেজাল জনারন্য,
বিচ্ছুরিত জলোচ্ছ্বাস।
গতকাল যে মানুষটি তোমার বুক ছুঁয়ে
কবিতার কথা বলেছিল
সে আমার মৃত্যুর কারণ।
বোশেখে দীর্ঘশ্বাস
গাজী গিয়াস উদ্দিন
এ ভোগের বাজারে ত্যাগের ওপারে
স্বপ্ন পালিয়ে বেড়ায়
রিপুদের তাড়নায় বোশেখের ফরমান
নিসঙ্গ নিসর্গের লুকোচুরি – হবে না অবসান?
ললনারা স্বরূপে গৃহে প্রবেশ করে
উষ্ণ অভিব্যক্তি মাধবী অন্তরে
বোশেখে প্রচন্ড খরায় অতিথি বৃষ্টি
যৌবনের মৌবনে বিরচিত হোক প্রেম
বিদায়ী শিশিরে দখিনার অগ্নিশুচি দৃষ্টি
যযাতি পুত্রের কাছে চেয়েছিল ভিক্ষা যৌবন
সূর্যোদয় হায় সূর্যাস্ত এখন সুদৃশ্য মাকাল
প্রখর মধ্যাহ্ন ছিল বসন্ত প্রশস্তি কাল
বোশেখ কন্ঠে বেদনা – বক্ষে সমবেদনা
খোঁপায় চুমোর তাপ – আঁচলে ঝঞ্ঝা কামনা
নক্ষত্রের কসম: এ কেমন দীর্ঘশ্বাস সন্ধ্যা সকাল?
==================================
বিহঙ্গী বসন্ত
রাজীব কুমার দাস
প্রথম প্রভাত, কুয়াশার চাদর আর নিস্তব্ধ পথ
শীত-শীত অনুভব, অজানা গন্তব্য আর মিষ্টি বাতাস,
হাতে-হাত রেখে মনের সুখবাসনায় চলেছি বহুদূর
বলেছিলে-আবারো হবে দেখা কোনো এক বসন্ত বিকেলে।
সেদিন তোমার চলে যাওয়া দেখেছি ফিরে আসার অপেক্ষায়
তারপর, জীবনের গতিতে মেতেছি অবিরাম
পথের ব্যস্ততায় সে পথও ভুলেছিল তোমায় আমায়
অনির্বান বাসনায় ইচ্ছেগুলো অজানায় হয়েছিল বিলীন।
জীবনের নিয়মে সময়টা চলেছে নিরঙ্কুশ
মুঠোয় পুড়েছি কিছু স্বপ্ন, কিছু অজানা অভিমান,
অলীক ভাবনায় বেঁধেছি নীড় আশার বালুচরে
বসন্তরা তবুও আসে যায় তোমারি অপেক্ষায়!
অত:পর ফিরেছো তুমি বিবর্তনের ধারায়
তোমার ফিরে আসা পথে বসন্ত হয়েছে বিহঙ্গ,
মুঠো খুলে চেয়ে দেখি শুন্যরা বেঁধেছে নীড়
অবশেষে হারালো সে বসন্ত বিকেল- তোমার ললাটের সিঁদুরে।।
==================================
নির্ভয় পৃথিবীর অপেক্ষা
(মহামারি ও বোমা)
কাওসার সুলতানা
বৈশাখ এলো রুদ্র সাজে
আগুনফুলের মুকুট পরে,
বৃষ্টি তারে জড়িয়ে আদরে
মুছতে চায় যতো ধুলো, তাপ
তবু পৃথিবীর কপালে জমে থাকে উত্তাপ।
মহুয়ার গন্ধ আজ নিস্প্রভ, নেই মদিরতা –
মহামারির থাবা দশানন রাবণ যেন – তার
বিষাক্ত নিঃশ্বাসের কাছে পরাজিত মানব জনম,
মৃত্যুর সূক্ষ্ম আবরণ ভেদ করে চলে মাতম।
এদিকে যুদ্ধ
এক বিকৃত আলোকোৎসব,
যেখানে ড্রোন এক অশুভ নক্ষত্র,
মিসাইলের আঘাত যেন ঝরে পড়া উল্কা,
প্রতিটি বিস্ফোরণে ক্ষত বিক্ষত
হয়ে হারিয়ে যায় মানুষ, মানচিত্র।
মানুষ?
লোভের অন্ধ ক্ষুধায়
বিষে, যুদ্ধে এবং মহামারিতে মৃত্যু কুড়াও,
খনি-মণি পেতে খেলো রক্তের হোলি নিয়ত,
একদিন তোমাদেরও মৃত্যুর ঘন্টা বাজবে।
জেনে নাও,
সময়ের পুরোহিত নিঃশব্দে গুনছে শেষ মন্ত্র
একদিন বাজবে সেই চূড়ান্ত ঘণ্টা,
যার ধ্বনি ছিন্ন করবে সকল অহংকার।
তারপর?
নিঃশ্বাস ফেলে প্রশ্ন করবে শূন্যতা
কবে আবার জন্ম নেবে
নির্ভয় এক পৃথিবী?
==================================
আলোর যৌবন
নাজমুল ইসলাম সজীব
স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা,
মনে আছে বড় আশা।
মন করে উড়ু উড়ু,
জীবনের পথ চলা, সবে শুরু।
পাবো নাকো স্বপ্নের মেলা,
তবে; খেলতে হবে বড় খেলা।
পথ এখনো পেলাম না খুঁজে,
রাত হলে, নিদ্রা আমায় বুঝে।
দিনগুলো যাচ্ছে ঝরে,
কে দেশের জন্য কি করে!
দেশকে খুব ভালবাসি,
তাই বারবার ছুটে আসি।
দেশের মাটি,দেশের জন
সবাই আমার আপনজন।
==================================
শেষ সূর্য
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান
শাদা গোলাপের কাঁটায়
যুদ্ধ থেমে আছে
গুলিভর্তি মগজ স্নানরত
দুর্বায় ঝরে বেশ্যা-স্মৃতি।
পাখিরা যুদ্ধ করে না
খানিক সংসার, নির্দোষ ওড়া
তবু ভাঙে ঘর, চন্দ্রিমা
মোছে চুমু নগ্ন সন্ধ্যায়
হিম-রক্ত সাদা হয়ে আসে
প্রতিটি মুখ ঘৃণার কোরাস
পৃথিবীর শেষ সূর্য ওঠে
ভেসে যায় মানুষ, খড়কুটো।
==================================
শব্দরা এসেছে রাজপথে
দেওয়ান মাসুদ রহমান
ইদানীং কিছু মানুষের মনে উত্তাল অস্থির
রণনৃত্যে জেগে ওঠে-
তাদের শব্দরা নেমে আসে রাজপথে
রক্তের গান গায় ল্যাম্পপোস্টের আলোয়।
ভাঙা বর্শায় কাঁপে সন্ধ্যার লাল আলো,
ইতিহাস থেমে শোনে সেই হাহাকার-
যেখানে যুদ্ধের উন্মাদনায় জেগে থাকে ক্লান্তি বিষাদ
নিঃশ্বাসে নির্জন সীরাতের পথে।
মানুষেরা-
একজোড়া নীরব আঁধারে
বুক ফুলিয়ে হাঁটে
মিনারের ছায়া যেন আসে রাতের বাসস্ট্যান্ডে।
রহমতের প্রসারিত দিগন্তে
কামনা নয় জেগে ওঠে নূরের মুকুট,
নাভির বদলে হৃদয়ের তটরেখায়
মানুষের ঘাম হয়ে ওঠে দোয়ার প্রতিনিধি।
কামনার গন্ধ নয়—
সেহরির বাতাসে ভেসে আসে
মক্কার মাটির মতো পবিত্র সুবাস।
প্যানিকের রন্ধনশালা পুড়ে গিয়ে
মনের তসবিহের দানায় দানায়
অবশেষে বেজে ওঠে মুক্তির সুর-
দূর মিনার থেকে ভেসে আসে ফজরের আজান।
জালিমের অস্থিরতা বিদায় নেয়,
সমস্ত নিদ্রা সেজদায় আত্মসমর্পণ করে।
শরীরের তারা গুনে
এইসব রাতের ইবাদতলিপি
ধীরে ধীরে শব্দেরা বদলে যায়,
কবিতা হয়ে ওঠে
দোয়ার মতো শান্ত।
==================================
নিষিদ্ধের বাংলাদেশ
আলী আকবর বাবুল
নিষিদ্ধ শব্দের নিচে ঢাকা পড়ে আছে এক বিস্মৃত মানচিত্র
যেখানে নদীগুলোও আজকাল চুপচাপ বয়ে যায়, যেন গোপন সাক্ষী
পদ্মার ঢেউয়ে লুকিয়ে রাখা হয় উচ্চারণহীন প্রতিবাদ
আর আকাশ—একটি সেন্সরড পাণ্ডুলিপি, তারকারাও যেন অনুমতির অপেক্ষায়। শহরের বাতিগুলো জ্বলে ওঠে, কিন্তু আলো দেয় না, শুধু নজরদারি দেয়ালগুলোতে লেখা থাকে অদৃশ্য কালি—অস্বীকারের ইতিহাস একটি শিশু তার প্রথম শব্দ শেখে, কিন্তু শব্দটি উচ্চারণের আগেই নিষিদ্ধ মায়ের চোখে জমে ওঠা জলও যেন রাষ্ট্রীয় গোপন নথি হয়ে যায়। এখানে বাতাসও প্রশ্ন করতে ভয় পায়,
কারণ প্রশ্নেরও আজকাল লাইসেন্স লাগে
স্বপ্নগুলো রাতের আঁধারে পালিয়ে যায় সীমান্ত পেরিয়ে
আর ভোরের সূর্য ওঠে—একটি জব্দ করা ঘোষণা নিয়ে।
তবু মানুষের ভেতর গোপনে জন্ম নেয় এক অননুমোদিত আলো
নিষিদ্ধের মধ্যেই সে গড়ে তোলে নিজের স্বাধীনতার হিমালয়।
==================================
দেহের ভেতর গলিত গন্ধ
নুরুন্নাহার মুন্নি
একদিন একদিন করে
তুমি হারিয়ে যাচ্ছ-
শূন্যে, মাথাহীন পৃথিবীর গলিত সন্ধ্যায়।
এখানে বিবেক বন্দি,
বস্তাভর্তি লাশ।
অর্থের ওঠানামা
হাড়কাঁপানো জ্বরের মতো কাঁপায় সময়।
ভয়হীন ঘৃণা পোষে
তোমার থরথরে শরীর,
তবু ভালো থাকার লোভ
হঠাৎ ভর করে বুকের ভেতর।
তুমি জেগে আছো,
কিন্তু বেঁচে নেই।
মানুষের তির্যক দৃষ্টি,
করুণা, জিহ্বার ছোবল, ঘৃণা-
সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ মৃত্যু।
মৌনব্রতী বোধি বৃক্ষেরা সাক্ষী।
একদিন তাদের জমে থাকা চিৎকারে
ভেঙে পড়বে তোমার রোবটিক দেহ।
খুলে যাবে পাঁজর,
আর দেহের ভেতর গলিত গন্ধে
তুমি খুঁজতে থাকবে মৃত্যু-
তুমিও, তোমরাও।
==================================
কৃষক
রবি বাঙালি
ঊষা হতে সন্ধ্যাবদি
নিত্য তারা খাটে,
বৃষ্টি ভিজে রোদে পুড়ে
শস্য ফলায় মাঠে।
শ্রমের ঘামে সিক্ত ফসল
মূল্য পায় না মোটে,
মজুতদার আর মধ্যসত্ত্বী
অধিক প্রফিট লুটে।
কৃষক বলে তোমরা যাদের
নিত্য দাও যে গালি,
তারাই তোমার আহার জোগায়
হৃদয়খানা ঢালি।
সত্যিকারের দেশের সেবক
শোনো দেশবাসী,
বুকের মাঝে কষ্ট পুষে
মুখ ভরে দেয় হাসি।
অর্থনীতির মূল চালিকায়
তাদের কেউ নয় তুল্য,
হেলা ভুলে বুকে তুলে
দিয়ো তাদের মূল্য।
==================================
বৃষ্টি এলো
গাজী আবু হানিফ
অনুরণন :
বৃষ্টির রমালিক শীতল পরশে
শরীর গিয়েছে জুড়িয়ে –
উষ্ণতা কোথা যেনো হারালো?
পাখিরাও মেতেছে কলরবে।
স্পর্শ :
বাতাস দিচ্ছে পরশ-
জলময় প্রশান্তি ঢালছে ধীরতায়
আবছা কি এক সুখেদ মায়া!
ধুলো ধুয়ে হচ্ছে কাদা।
বিমুগ্ধতা :
গ্রীষ্মের এ ক্ষণে এ স্বর্গীয় বিমুগ্ধতা।
বৃক্ষরাজি পশুপাখি মেলে দিচ্ছে হাত।
==================================
দ্বীপদেশে
রফিক আনম
মেঘনার রাজকন্যা হাতিয়ার নিঝুম প্রদীপ
আলো হাতে কাছে ডাকে অন্ধকারে কোমল ছায়ায়
পাহাড়ি সুবোধ ছেলে জীবনের প্রথম বসন্তে
ফুলেল বন্যায় সিক্ত করে প্রেয়সীর তনুমন
প্রদীপের আলোছায়া যতদূর মায়ায় জড়ায়
উর্বশী সোনালি চুল ততদূর তনুকায় বাঁধে
অতিথি পাখিরা আসে প্রাণে প্রাণে লেনাদেনা বাড়ে
সাত সাগরের ঘাট মেঘনার প্রেমে দ্বার খুলে
ধনশালী রূপবতী গুণভারে ঘোমটায় নিঝুম
মেঘনার কপালের ভাঁজে ঢল কমলার ঘামে
দুগ্ধপোয্য উপকারভোগী কালসাপ হয়ে দংর্শে
নৌঘাট, মাছের ডেরা, প্যারাবন, মহিষের দই
দংশনের যন্ত্রণায় কাতরায় ফেনিল তরঙ্গে;
ডুবো জলে যায়-আসে নিভু নিভু প্রদীপের আয়ু
==================================
শব্দ কেড়ে নিতে এলে
প্রজ্ঞাজ্যোতি ভিক্ষু
শব্দ কেড়ে নিতে এলে
নীরবতা ভেঙে উত্তাল-গর্জন উঠেছিল রাজপথে সেদিন
একুশের রক্তাক্ত ভোরে জানিয়ে দিল-
ভাষা মানে কেবল কথা নয়, অস্তিত্ব সত্তা ও প্রগাঢ় প্রাণ-স্পন্দন।
অক্ষর বাঁচাতে যারা ঝরেছিল
তাদের ছায়ায় বড় হলো স্বপ্ন,
সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে অতঃপর
স্বাধীনতার মানচিত্র আঁকল একদিন
প্রতিবাদের ভাষা বদলাতে বদলাতে
গর্জন চল্লিশার মত হয়ে উঠল জনতার কণ্ঠ,
ভেসে এল শৃঙ্খল ভাঙার ডাক
ভেসে এল রক্তময় বারুদ-গন্ধ
আর ছড়িয়ে পড়ল গ্রাম থেকে শহরে
সেই আশ্চর্য আগুন- লাভা।
একদিন তারপর হামাগুড়ি দিয়ে, এ্যাম্বুস করে এলো একাত্তর,
আকাশে বারুদের মেঘ গর্জন
নয় মাস ধরে রক্তে ভিজে, মানুষের মাংস জমে
মাটি হয় পলল, মাটি হয় রঙিন ও স্বাধীন
আর মায়ের চোখের রক্তাক্ত জল
লাল হয়ে মিশল সবুজ বিপুল-জনপদে
যখন পতাকা উড়ে পতপত
যখন পতাকা হয় মৃত আত্মাদের চিহ্ন
যখন পতাকা হয় আমার অহঙ্কার,
আমার স্বপ্ন, আমার আনন্দ এ প্রতিজ্ঞা অবিরত..!
==================================
জয় বাংলার জয়
মাসুম হাসান
প্রলয় নৃত্য উঠুক নেচে
নিকষ কালো রাত্রি দেখে –
কেউ করিসনে ভয়,
আঁধার টুটে ফুটবে আলো
জয় বাংলার জয়।
সেই পুরনো শকুনগুলো
লোক চোখেতে দিয়ে ধুলো
খামচে ধরেছে মানচিত্র –
খামচে ধরেছে মাটি,
দেশদ্রোহীদের চিতায় জ্বালিয়ে
ধূলায় মিশাবো ঘাঁটি।
বুকে যাদের একাত্তরের
জ্বলে অগ্নিশিখা –
টগবগে খুন তরুণ সেনা
ঠিক খুঁজে নাও দিশা,
দেশের এমন ক্রান্তিকালে
যায় কি থাকা ঘরে
জয় বাংলা স্লোগান তোলো
সবাই সমস্বরে,
মীরজাফর আর দালাল তোদের
কল্লাগুলো কেটে –
এই বাংলার জমিন থেকে
শেকড় দেব ছেঁটে,
অপরাজেয় বাংলা আমার
দুরন্ত দুর্জয় –
ভয় করিসনে ভয়
কুচক্রীদের করবো বিনাশ
জয় বাংলার জয়।।
==================================
পিছুটান
শর্মি দে
চৌরাস্তার মোড়ে তোমায় রেখে হেঁটে এলাম হাজার ক্রোশ
পাড়ি দিলাম রাত জাগা ভোর
ভাজা বালিশ,
বিছানা এপাশ-ওপাশ
আজকাল হাঁটছি দারুণ
গুছিয়ে সংসার, পরিপাটি ঘর
কার্নিশে প্রেম, আঁচলে বাঁধা বর
মন তবুও পিছু চায়,
হয়তো বা স্বপ্নে পায়,
তোমারও বুকে জুড়ে আছে
এমনই একটা সংসার,
কৈশোরে স্বপ্ন দেখেছি যার,
একসাথে হাজারবার।
==================================
ভাঙনের ব্যাকরণ
ইমরান শাকির ইমরু
চারিদিকে আজ ব্যথার প্রাচীর
ইট-পাথরের নয়
জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসে গাঁথা,
না-বলা কথার নীলচে চাপে
ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা এক নীরব দেয়াল।
দেয়ালের গায়ে
হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ভাঙা হৃদয়,
বারবার কেঁদে ওঠে
নিজের শোককে ভাষা শেখায়,
নিজেকেই শোনায়
ভাঙনের গোপন ব্যাকরণ।
চিৎকারের শব্দ ফিরে আসে
ক্ষতবিক্ষত প্রতিধ্বনি হয়ে,
কাঁদতে চাইলেও চোখ আর মানে না,
কান্নার নদী শুকিয়ে যায়
অভ্যাসের রৌদ্রে।
তখন কষ্ট পাথরের মতো বসে
নিঃশ্বাস ভারী হয়,
হৃদপিণ্ডে নামে
নীরব আর্তনাদের কালো মেঘ।
যে ব্যথা দেখা যায় না আয়নায়
ধরা পড়ে না কারও প্রশ্নে,
শুধু প্রতিদিন বহন করতে হয়
নিজের ভেতরেই
একটা ধ্বংসস্তূপ,
একটা মানুষ,
একটা অশেষ নিঃশব্দতা।
==================================
দুই বিজ্ঞানী
সুমন বিপ্লব
ড. জামাল নজরুল ইসলাম
মহান বিজ্ঞানী ছিলেন,
রুমমেট ছিলেন স্টিফেন হকিং
তিনি বিদায় যে নিলেন।
১৯৯৩ সালের
চব্বিশ ফেব্রুয়ারি
ঝিনাইদহে জন্মে ছিলেন
চট্টগ্রামে বাড়ি।
লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিক্ষকতা করতেন,
দুই বিজ্ঞানী একই সাথে
তাঁদের জীবন গড়তেন।
মহাকাশ নিয়ে তাঁরা যে
গবেষণা করেছেন,
পৃথিবীতে হকিং-জামাল
অমর হয়ে রয়েছেন।
==================================
আমি নেই কোথাও
কাসেম আলী রানা
যে যৌবনে
আমি ছিলাম
তোমার আরাধনার জায়নামাজ
সে যৌবন এখন নষ্ট হয়েছে!
তুমি গিয়েছো কতদূর?
শেষ হয়েছে কি রাত দুপুর?
এখনও কি বাজে পায়ের নূপুর?
তোমার প্রার্থনা কবুল হয়নি,
আমি পৃথিবীর বাইরে যাইনি,
তোমারও হয়নি।
কোন নির্জন অরন্যের ঝর্ণাধারায়
মৃত চোখ ফোঁটাইনি কোন ফুল।
তোমার চোখের জল
জমে জমে সাগর হয়েছে,
সেখানে বাস করে কত লক্ষ কোটি প্রাণ!
কেবল আমি নেই কোথাও!
কোনখানে!




