রূপক বরন বড়ুয়া
অনেকদিন ধরে ভেবেছি লোহাগাড়া উপজেলার এক প্রত্যন্ত অজপাড়া গাঁ ‘ নারিশ্চা’র এক জ্ঞানতাপস আজকের প্রতিভাবান প্রথিতযশা ড. সুমনপ্রিয় ভিক্ষু /মহাস্থবিরকে নিয়ে কিছু কথা লিখবো। কিভাবে এক হতদরিদ্র নিরন্তর অভাবের সাথে লড়াই করা এক অদম্য হার না মানা তেজস্বী বালক ধীরে ধীরে নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে তার ভেতরের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার যে উদগ্র বাসনা,অবিরাম প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় এক আলোকবর্তিকায় রূপায়িত করার প্রজ্ঞার কথা বাক্যজ্জ্বল করবো যা নিরন্তর আমাকে ভাবিয়েছে। সুমন এর অতীত প্রাক্কলন করলে দেখা যায় তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন বাঁশখালীর শীলকূপ গ্রামের সম্ভ্রান্ত ‘মহেন্দ্র’ মাতব্বর পরিবার।। মানুষেরা তার আদিমতর অবস্থা থেকে কখনো এক জায়গায় স্থির হতে পারেনি। খাদ্যান্বেষণে বা সুন্দর জীবিকা ও নিরাপদ আশ্রয়কে পুঁজি করে সে ঘুরে বেড়িয়েছে এখানে ওখানে তাদের দৃষ্টি সীমানার বাইরেও। গৃহী সুশীল বড়ুয়া সুমন এর পিতা মিলন বড়ুয়া এভাবে শীলকূপের হরকিশোর বড়ুয়া ও সহধর্মিণী চিন্তা বালা বড়ুয়া’র কন্যা পরিবালা বড়ুয়াকে বিয়ে করে নারিশ্চা’য় এসে থিতু হন শ্বশুরবাড়িতে।

মিলন বড়ুয়ার জন্ম ৩ ডিসেম্বর ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে। মিলন বড়ুয়া পরবর্তীতে পরিবার নিয়ে নারিশ্চা গ্রামে বসতি স্থাপন করলেও শীলকূপ গ্রামে এখনও তার অংশের জমিজমা ও ভিটা রয়েছে। একদিন মিলন বড়ুয়া চেনা জমি ছেড়ে চলে এসেছিল আজকের নারিশ্চা গ্রামে। কিন্তু যে গ্রহণের ছায়া গৃহী সুশীল বড়ুয়া’র পিতার জীবনে আপতিত হয়েছিলো তার ছায়া তখনও সচ্ছলতার দ্বার থেকে অপসৃত হয়নি। নিদারুণ অর্থাভাব, দরিদ্র্যতা, অভাব অনটনে মিলন বাবু’র সংসার চলছিলো শুরু থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এসময় দুই মেয়ে সুখী, সুপ্তি ও পুত্র সুশীল বড়ুয়া’ কে নিয়ে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছিলেন। কিন্তু অভাব গৃহী সুশীল বড়ুয়া’ সুমন এর অদম্য ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। শত দীনতা আর অর্থকষ্টের মধ্যেও গৃহী সুশীল বাড়ি থেকে একটু দূরে ‘ নারিশ্চা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে। এ প্রসঙ্গে একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিভাবে তার প্রথম শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিলো তখন তার মুখ থেকে যা শুনেছিলাম তার সে কথাগুলো আজ তুলে ধরলাম;

‘আনন্দ উৎসাহের সাথে অনেকের স্কুল জীবন শুরু হলেও সেই সুযোগ আমার হয় নি। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব, পরিবারের দরিদ্রতা, শিক্ষার একটি সুন্দর পরিবেশ তখন আমাদের গ্রামে ছিল না। এরপরও পিতামাতার আগ্রহে নারিশ্চা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণি এবং প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত শেষ করি।’
আলাপচারিতায় আরো জানা যায়, পারিবারিক নানা আর্থিক দীনতায় লেখাপড়ায় এসেছে চরম প্রতিবন্ধকতা, উপায়ন্তর না দেখে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তির পরিবর্তে আপন গৃহ ছেড়ে বিহারের সেবক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করেন একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও। বিহারের সেবক থাকাকালীন সময়ে নারিশ্চা ভূষণ বড়ুয়ার বাড়ির সম্মুখে তৎকালীন যে বৌদ্ধ বিহার ছিল সেখানে একজন মার্মা ভিক্ষু ছিল তার সাথে পরিচয় ঘটে। তারপর ওই মারমা ভিক্ষুর সাথে বান্দরবান চলে যান এবং বান্দরবান রাজ বিহারে অবস্থান করে বান্দরবান সদরে বান্দরবান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২য় শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে এক বছর ১৯৯১ ঘূর্ণিঝড়ের পর সুশীলের বাবা গিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখানে আবারও নারিশ্চা ধাতুচৈত্য জাদি বিহারে অবস্থানকালীন সময়ে ওই এলাকায় বেসরকারিভাবে চালু হওয়া ব্র্যাক স্কুলে ২য় শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তারপর একদিন নারিশ্চা ধাতুচৈত্য জাদি মন্দিরের অধ্যক্ষ মার্মা ভিক্ষু’র আদেশক্রমে লক্ষণখীল গ্রামে গিয়ে ভদন্ত ধর্মদর্শী মহাস্থবিরের নিকট থেকে এক সেট চীবর সংগ্রহ করে গ্রামে এসে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। এরপর মার্মা ভিক্ষু চলে গেলে সে জায়গায় অধ্যক্ষ হিসেবে আসেন প্রজ্ঞাসার মহাস্থবির। এক বছর পর প্রজ্ঞাসার মহাস্থবিরের সাথে রংপুর জেলার মিঠাপুকুর বেণুবন বিহারে চলে যান, সেখানে মিঠাপুকুর জীবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। নতুন বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণকারী আদিবাসীদের সাথে এক বছর অতিক্রান্ত করার পর আবার চট্টগ্রাম নারিশ্চায় চলে আসেন। সেখানে চেঁদিরপুনি নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করেন এবং চেঁদিরপুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবারও ৪র্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পান এবং কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তারপর পুটিবিলা মহাবোধি বিহারে অবস্থান করেন, একদিন চীবর ত্যাগ করার জন্য চেয়েছিলেন নানা অসঙ্গতিতে কিন্তু করা হয় নি তবে সেই দিনই ভদন্ত প্রজ্ঞাসার মহাস্থবিরের নিকট পুনঃপ্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। পুটিবিলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণি পাস করে সাতবাড়ীয়া বেপারীপাড়া চলে আসেন। সেখানে সাতবাড়ীয়া বেপারীপাড়া রত্নাঙ্কুর বিহারে ৩ জানুয়ারি ২০০০ সাল থেকে অবস্থান এবং পূর্ব সাতবাড়ীয়া হাজীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৮ম-১০ম শ্রেণি পড়ে এবং সফলভাবে এসএসসি পাস করেন ২০০৩ সালে।

২.
সুশীল বড়ুয়া প্রব্রব্জ্যা গ্রহণের পর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। একসময়ের বাক সংযমিত বালক সুশীল হয়ে উঠলো সুমন শ্রমণ। আমি যখন রত্নাঙ্কুর বিহারের সাধারণ সম্পাদক তখন শ্রমণ সুমনের স্বল্পভাষী, শান্ত সুবোধ, মার্জিত রুচিবোধ চারিত্রিক দৃঢ়তা আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে,আকৃষ্ট করেছে তার ভদ্রতা, নম্রতা নির্লোভ এক বিনয়ী সংস্কার।
আমি নিজেও আর্থিক সচ্ছলতায় বেড়ে উঠিনি। বাবা বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা হলেও পিঠাপিঠি সাত সন্তানের লেখাপড়া ও অন্যান্য আনুসাঙ্গিক খরচের ব্যয়ভার চাকরির বেতনের সাথে আপস করেনি বরং বলা যায় একটা তিক্ততা, রিক্ততা নিত্য ব্যয়ের খতিয়ানের সাথে বৈরীতা স্পষ্ট করেছে। তাই শৈশব আমাদের কেটেছে অম্লমধুর সাংঘর্ষিক বন্ধুর পথের রসায়নে বারবার সিক্ত হয়ে। তারপরও বলতে পারি প্রাচুর্য হয়তো দেখিনি তবে একেবারে অভাবের নির্মমতা মা- বাবা আমাদের স্পর্শ করতে দেয়নি। কিন্তু চারপাশের অভাবের যে প্রকট, সর্বগ্রাসী রূপ রয়েছে তা অবলোকনের সুযোগ হয়েছে। আমি সপ্তাহান্তে বাড়িতে যেতাম গ্রামের আনাচকানাচ ঘুরে ঘুরে দেখতাম। তখন দেখেছি সুমন শ্রমণ ও আরেকজন সেবক (যাকে আমরা বৌদ্ধ সম্প্রদায় ‘খারাংয়া’ বলে জানি) সোয়াইং (ভান্তেদের জন্য দায়ক দায়িকা কর্তৃক প্রদত্ত খাবার) সংগ্রহের জন্য গ্রামের পথ ধরে হেঁটে যেতে। তারপর দেখতাম ১০ টার পর স্কুলের দিকে রওয়ানা দিতে। আমি ফাঁকে ফাঁকে শ্রমণ সুমনের লেখাপড়ার খবর নিতাম। সে বরাবরই একজন ভালো ছাত্র ছিলো। স্কুলে তার রেজাল্টও ছিলো ভালো। এরপর এই রত্নাঙ্কুর বিহারে থেকেই সে এস এস সি পাস করেছে সাতবাড়িয়া হাজিরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ভালো ফলাফল নিয়ে।
তারপর এই বিহারে থেকে পটিয়া সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচ এস সি পাশ করেন। ইতোমধ্যে আমি রত্নাঙ্কুর বিহারের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ছেড়ে আপন কর্মস্থলে চলে আসি। তেমন করে আর খবর নিতে পারিনি সুমন শ্রমণের। হঠাৎ একদিন মোমিন রোড, ডিসি হিলের রাস্তার ফুটপাতে দেখা হয়ে গেলো সুমনপ্রিয় ভিক্ষুর সাথে। খুব ভালো লাগলো অনেকদিন পর দেখা পেয়ে। জিজ্ঞেস করলো আমাকে দাদা কেমন আছেন! বললাম আছি একরকম। আচ্ছা কেমন কাটছে ভিক্ষু জীবন, প্রশ্ন রাখলাম লেখাপড়া কেমন হচ্ছে এবং পরিশেষে জিজ্ঞেস করলাম এতো বৎসর তো চীবরটা রাখলেন শরীরে, লেখাপড়া শেষ করে আবার চীবর ত্যাগ করে লোথক অর্থাৎ গৃহবাসে ফিরে আসবেন কি? নিষ্পাপ একটা মুখ, মুখে প্রশান্তি ও স্নিগ্ধতা খুব শান্ত ধীর গলায় বললো দাদা এখন সবেমাত্র অনার্সে ভর্তি হয়েছি, মাস্টার্স করবো বাকিটা ভবিতব্য। তবে একটা বাক্য উচ্চারিত হলো ‘এটা কখনো ভাবিনি ভাবতেও চাই না। তবে শুরুতে শ্রামণ্য ধর্ম পালনের সময় অভাবের তিক্ততা এতো ব্যাপক ছিলো যে মনে হয়েছিলো চীবরটা ত্যাগ করবো কিন্তু পারিনি বরং ওটা আরো গাঢ়ভাবে লেপটে রইলো। তারপর তো আপনারাই আপনাদের গ্রামে রত্নাঙ্কুর বিহারে শ্রামণ্য ধর্ম থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ভিক্ষু করিয়ে দিলেন। আপনাদের মর্যাদা আমি রাখবোই কখনো ক্ষুন্ন হতে দেবো না।’ সেদিন আমি ওর কন্ঠে আশ্চর্য দৃঢ়তা লক্ষ্য করেছিলাম।
তারপর আরো কতদিন গেলো চোখের আড়াল হয়ে গেলো কতো কথা কত স্মৃতি।মাঝে দু’ একবার চোখে পড়েছিলো ওর ব্যস্ততাময় ছুটোছুটির সামান্য ঝলক। কথা তেমন হয়নি। পরে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিনবোধি ভিক্ষুর কাছ থেকে জানতে পারলাম সুমন প্রিয় ভিক্ষু কৃতিত্বের সাথে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। শুনে খুব খুশি হয়েছিলাম সেদিন।

খুশিতে চোখে জল এসেছিলো। মনে পড়ে এক হতদরিদ্র, হার না মানা এক অসামান্য প্রতিভাধর শ্রমণ কিভাবে নিজের ভেতরের সুপ্ত লালিত ইচ্ছাকে শত বাধা আর অভাব অনটনকে দলিতমথিত করে চোখের তারায় আলোক বেঁধে দিশা খুঁজে ছিলেন একদিন। দারিদ্র্যের কশাঘাতে তিলতিল করে বুঝেছিলেন মুখ থুবড়ে পড়ে থাকলে জীবনকে কখনো চিনতে পারবেন না তাই উঠে দাঁড়ালেন গতি আনলেন দেহে, মন ও মননে। সময় বুঝে একসময় বি,এড কোর্স ও ইংলিশ কোর্স, কম্পিউটার কোর্স সম্পন্ন করলেন নামকরা সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে।এসব ড.জিনবোধি ভিক্ষুর কাছ থেকে শুনেছি। এখানে একটা কথা না বললেই নয় ‘ সুমনপ্রিয় ভিক্ষু’র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছেন ড.জিনবোধি ভিক্ষু। নানাভাবে নানা রকমভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। এটা নানা আলাপচারিতায় সুমন প্রিয় ভিক্ষু তা অকপটে স্বীকার করেছেন। তবে এটাও বললেন “আমি যখন সাতবাড়িয়া বেপারীপাড়া গ্রামের রত্নাঙ্কুর বিহার ছেড়ে পড়াশুনার জন্য চট্টগ্রাম শহরে চলে আসলাম তখন সুপরিচিত বৌদ্ধ সমিতির নেতা সাতবাড়িয়া বেপারীপাড়া গ্রামের জন্মজাত সন্তান প্রাণেশ কান্তি বড়ুয়া ও সাতবাড়িয়া দেওয়াঞ্জীপাড়া গ্রামের জন্মজাত সন্তান সনদ চৌধুরী আমাকে চট্টগ্রাম নন্দনকানন সার্বজনীন বৌদ্ধ বিহারে থাকার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন, বলতে গেলে ওনারা আমাকে চট্টগ্রাম নন্দনকানন সার্বজনীন বিহারে থেকে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেন। “এ বিষয়ে আরো পরিষ্কার করে বলেন বৌদ্ধ সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রাণেশ কান্তি বড়ুয়া দাদা আমার আর্থিক অনটনের কথা জেনে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। আমি প্রাণেশ কান্তি বড়ুয়া দাদা ও সনদ চৌধুরী দাদা’র কাছে চিরঋণী ও চিরকৃতজ্ঞ। ওনাদের সাহায্য সহযোগিতা না পেলে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করাটা এতো সহজ হতো না। ”
এরপর সুমনপ্রিয় ভিক্ষু আর পেছন ফিরে তাকান নি। কৃতিত্বের সাথে অনার্স মাস্টার্স পাস করার পর চলে গেলেন থাইল্যান্ড এবং সেখানকার মহাচুলালঙ্করণরাজবিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পি এইচ ডি করলেন। তার থিসিস ছিলো An Analytical studz of Symbolic Relationship between the Monk Behaviours and theFaith of Lay Communit ‘এবং ধর্মদূত ডিগ্রি- মহাচুলালঙ্করণরাজবিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ধর্মদূত কলেজ থেকে ধর্মদূত ডিগ্রি নিলেন। এসময়ে তার থিসিস ছিলো An Analytical Studz of Propagagation Buddhism in India and Nepal এবং তা ছিলো থাই ভাষায়। এসময় তিনি চকরিয়া উপজেলার, বিলছড়ি গ্রামের জন্মজাত সন্তান ধর্মরক্ষিত মহাস্থবির সর্বাত্মক সহযোগিতা পান। আবার ফিরেও এলেন নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে।

৩.
যেখানে একবার একজন শ্রমণ বা ভিক্ষু বিদেশে যাবার সুযোগ পেলে চীবর নিয়ে হোক বা চীবর ত্যাগ করে হারিয়ে যায় সৌভাগ্যের আশায় লোভ আর মাৎসয্যের কারণে সেখানে ড.সুমনপ্রিয় ভিক্ষু সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। নিজের শিক্ষা আর জ্ঞানকে সাথে করে আসলেন স্বদেশে আলোক ছড়াতে। আজ লিখতে বসে ভাবছি একমাত্র লেখাপড়া যার ধ্যান জ্ঞান সে একসময়ের সাতকানিয়া উপজেলার বর্তমান লোহাগাড়া উপজেলার নারিশ্চা গ্রাম থেকে বান্দরবান রাজবিহারে থেকে বান্দরবান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন, তারপর প্রজ্ঞাসার মহাস্থবির এর সাথে রংপুর অবস্থান। সেখানে একবছর অবস্থান করে মিঠাপুকুর জীবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে পুনরায় চেঁদিরপুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবারও ৪র্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ৫ম শ্রেণি পাশ করেন। এসময়ে তিনি পুটিবিলা মহাবোধি বিহারে অবস্থান করেন এবং সেখানে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে চন্দনাইশ সাতবাড়িয়া গ্রামে চলে আসেন। তথ্যানুসারে দেখা যায়, তিনি সাতবাড়িয়া বেপারীপাড়া রত্নাঙ্কুর বিহারে ৩ জানুয়ারি ২০০০ সাল থেকে অবস্থান করেন এবং পূর্ব সাতবাড়ীয়া হাজীর পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৮ম-১০ম শ্রেণি পড়ে এবং সফলভাবে এসএসসি পাস করেন ২০০৩ সালে। তারপর পটিয়া সরকারি কলেজ থেকে ২০০৫ সালে এইচ এস সি পাস করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ অনার্সে ভর্তি এবং ২০০৯ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রাম নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে চলে আসেন। এরপর বিএ অনার্স, এমএ, বিএড ডিগ্রি সম্পন্ন করে ২০১৫ সালের জুন মাসে থাইল্যান্ড চলে যান। থাইল্যান্ড হতে ২০১৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি এবং ২০১৯ সালে ধর্মদূত ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ২০২০ সালে বাংলাদেশে আসার পর থেকে আবারও সাতবাড়িয়া বেপারীপাড়া রত্নাঙ্কুর বিহারে অবস্থান। সেখানে রত্নাঙ্কুর বিহারে থেকে শ্রামাণ্য ধর্ম থেকে উপসম্পদা গ্রহণ করে সুমনপ্রিয় শ্রমণ থেকে সুমনপ্রিয় ভিক্ষু হিসেবে পরিচিত হন। আর এই পুণ্যকাজে সার্বিক সহযোগিতা করেন সাতবাড়িয়া গ্রামের ধার্মিক উপাসক বিবেকানন্দ বড়ুয়া ও তার স্ত্রী ধর্মশীলা মন্দিরা বড়ুয়া। রত্নাঙ্কুর বিহারে অবস্থান করে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর চট্টগ্রাম শহরের এনায়েতবাজার নন্দনকানন সার্বজনীন বৌদ্ধ বিহারে থেকে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে চকরিয়া,বিলছড়ি গ্রামের জন্মজাত সন্তান ‘ধর্মরক্ষিত মহাস্থবির’ ভান্তের আন্তরিক সহযোগিতায় থাইল্যান্ড চলে যান পি এইচ ডি ও ধর্মদূত ডিগ্রি অর্জনের জন্য। থাইল্যাণ্ড থেকে আসার পর তিনি আবার সাতবাড়িয়া বেপারীপাড়া রত্নাঙ্কুর বিহারে অবস্থান করেন। এখানে তিনি গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কম্পিউটার ও ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ শেখানোর জন্য নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং গ্রামের ছেলেমেয়েদের মাঝে তা দারুণ সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন ছেলেদের ইংরেজি ল্যাংগুয়েজ ও কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য আমেরিকা প্রবাসী বিধান চন্দ্র বড়ুয়া ও তাঁর ছেলেমেয়েরা নানাভাবে সহযেগিতা করেছেন। বলা বাহুল্য যে সুমন প্রিয় ভিক্ষুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় অল্প সময়ে ছেলেমেয়েরা বিষয় দুটোতে খুব উৎসাহের সাথে মনোনিবেশ করে উভয় ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে পারঙ্গম হয়ে ওঠে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মুখে দেখা যেত নিজেদের মধ্যে ফ্লুয়েন্ট ইংরেজি বলতে এবং ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতে। আমি নিজেই আশ্চর্য হয়েছি এদের মাঝে কথোপকথনে। তারা দক্ষ হয়ে উঠেছিলো ইংরেজি ভাষায় অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে। কিন্তু গ্রামের কুশিক্ষা, অনগ্রসর চিন্তা চৈতন্যে তা এনেছে বিরূপ প্রতিভাস। গ্রামের এক শ্রেণির বখাটে মূর্খ যুবক এবং সমাজবিরোধী কুচক্রী শ্রেণির লোকেরা গ্রামের ছেলেমেয়েদের এ উন্নতি মেনে নিতে পারেনি, মেনে নিতে পারেনি ধামাধরা গ্রামীণ পশ্চাৎমুখী ধ্যান-ধারণাতে পরিবর্তন আনার রূঢ় বাস্তবতাকে, অলস চিন্তনে ও সংকীর্ণ মনোবৃত্তিতে যুগোপযোগী ভাবনাকে তারা অসার ভেবেছে, এবং নানা রকম কুৎসিত মন্তব্য ও কাল্পনিক রটনার মধ্য দিয়ে এক নিরীহ ব্রহ্মচারী ভিক্ষুকে অভিষিক্ত করা হলো যা নয় তাই বলে, কলঙ্কিত এক নাটকের দৃশ্যপট টেনে সৃজনের যে সৃজনীধারা প্রবহমান ছিল সেই উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডকে স্তিমিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হলো। উঠতি কিছু ছন্নছাড়া মা-বাবার অবাধ্য মতিভ্রম যুবক গ্রামের সহজ সরল মানুষের মনে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি করে এবং এর মাঝে রাষ্ট্রীয় পট পরিবর্তনে ব্যবহৃত ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের অংশ ‘মব’ এ অনুপ্রাণিত হয়ে এর সংস্করণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সমস্ত গ্রামের সুমনপ্রিয় ভিক্ষু কর্তৃক পরিচালিত ছেলেমেয়েদের সকল উন্নয়নমূলক কার্যক্রম নস্যাৎ করে দেয়া হলো। যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সুমনপ্রিয় ভিক্ষু এগিয়ে এসেছিলেন পরম কৃতজ্ঞতায় সাতবাড়িয়া গ্রামে তা আর হয়নি। আর গ্রামের ছেলেমেয়েরা আবার হলো সেই ‘ পুনঃ মুষিক ভব ‘অর্থাৎ যে তিমিরে ছিলো সে তিমিরে রয়ে গেলো। এখানে বলতে দ্বিধা নেই যে আমরা নিজেরা নিজেদের গ্রাম নিয়ে অহংকার করি কিন্তু অহংকার করার মতো তেমন কিছু আর অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না আজ। কিছু অর্বাচীনের মতো কাজ আমাদেরকে চন্দনাইশ উপজেলার অন্যান্য বৌদ্ধ গ্রামের কাছে ছোট করে রেখেছে। ভিক্ষু সমালোচনা, ভিক্ষুদের প্রতি নেতিবাচক চিন্তাধারা, ভিক্ষুদের অসম্মান করা, অপবাদ দেয়া এসব এ গ্রামে নতুন কিছু নয়। এর আগেও অনেক নামি ভিক্ষুও আমাদের এ গ্রামে অপদস্থ হয়েছে অনেকবার। আমি এসব বলে আমার লেখার বিষয়বস্তুকে ধোঁয়াটে করতে চাই না। তবে যা সত্যি তা সত্যই। অতীতের তিক্ত কাহনগুলো মনে করিয়ে না দিলে আমরা তো আমাদের চারিত্রিক সংশোধন তো কখনো আনতে পারবো না। তাই অতীত রোমন্থন করে নিজেদের ভুলেরই অনেকটা প্রায়শ্চিত্ত করছি। আমরা আমাদের গ্রামের সুমনপ্রিয় ভিক্ষু’র কেন জানি মহাস্থবির বরণ করতে করতেও করতে পারিনি সব ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু এ মহৎ ধর্মীয় কাজটাও কিন্তু থেমে থাকেনি। এ সম্মানটুকু দিলো ভদন্ত শীলমিত্র থেরো এবং ফারিকুল–
চাকমারকুল জাগ্রত পরিষদ। তিনি মহাস্থবির হলেন ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইং, পবিত্র ভিক্ষু পরিবাস সমাপনী দিবসে, ফারিকুল বিকেকারাম বৌদ্ধ বিহার, রামু, কক্সবাজার।
একপর্যায়ে ড.জিনবোধি ভিক্ষু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন ‘ওনার উপকার আমি জীবনে শোধ করতে পারবো না। তিনি আমার শিক্ষক, আমার গুরু। অসম্ভব মানবতাবাদী এক অনাগরিক যে আমাকে দেখিয়েছে পথের দিশা। আমার মতো এক উদ্বাস্তুকে এনে এ বিহারে ঠাঁই দিয়েছেন। দায়ক-দায়িকাদের ধর্ম দানের মাধ্যমে সেবা করার সুযোগ করে দিয়েছেন।’

৪.
ড. সুমনপ্রিয় মহাস্থবির তাঁর বর্তমান জীবন অতিবাহিত করছেন চট্টগ্রাম নন্দনকানন সার্বজনীন বৌদ্ধ বিহারে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলনে ও উপাসক উপাসিকাদের ধর্ম দান ও ধর্ম দেশনা করে। শিক্ষাজীবন সমাপনের পর এখন তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন বৌদ্ধদেশসমূহে বিভিন্ন সন্মেলনে নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করছেন,তার কিছু তথ্য নিচে সন্নিবেশিত হলো ;
শ্রীলঙ্কা ; আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সন্মেলন, পার্লামেন্ট হাউস,কলম্বো নভেম্বর ২ – ৭, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
থাইল্যান্ড : ইন্টারন্যাশনাল ভেসাক ডে কনফারেন্স, ব্যংকক ২০১৫, ২০১৬,২০১৭,২০১৮,২০১৯, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
সিঙ্গাপুর : ইন্টারন্যাশানাল সোসিয়াল ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স, জালানবুকেট,মীরা ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
মালেশিয়া : আন্তর্জাতিক ভাবনা কনফারেন্স, ব্রিকফিল্ড ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
ইন্দোনেশিয়া : আন্তর্জাতিক ভাবনা কনফারেন্স
স্মরাতুঙ্গা বুড্ডিস্ট কলেজ,বয়োলালী ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ
জাপান : আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ মহাসন্মেলন,ওসাকা, কোবে সিটি, ডিসেম্বর ২০১৪ ,খ্রিস্টাব্দ, সেপ্টেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ
উত্তর কোরিয়া ; ৪র্থ তম বিশ্বশান্তি সন্মেলন, সিউল, সেপ্টেম্বর ১৭-১৯ তিনদিন ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ
ভারত : ধর্মদূত প্রশিক্ষণকালে ১৮-৩০ মোট ১৩ দিন
এপ্রিল ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ কনফেডারেশন সন্মেলন, নিউ দিল্লি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ
ত্রিপিটক চ্যানটিং অনুষ্ঠান, বুদ্ধগয়া ২০০৮,২০১৩,২০১৫ খ্রিস্টাব্দ
এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে নানা আন্তর্জাতিক সন্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করে ইংরেজিতে বক্তব্য ও লেখা যা দেশ বিদেশের বহু পত্র-পত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। ভদন্ত ড.সুমনপাল ভিক্ষুর আন্তরিক সহযোগিতায় তার পি এইচ ডি, ডিগ্রি গবেষণা অভিসন্দর্ভ কলিকাতা হতে ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এর মাঝে তিনি এ উপমহাদেশের মহান বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু, শ্রাবক বুদ্ধ অর্হৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির এর দেশনা সংগ্রহ করে সংকলনগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন।
আজ যে ‘সুমনপ্রিয় শ্রমণ’কে নিয়ে লিখতে সচেষ্ট হয়েছি সে আজ ড.সুমনপ্রিয় মহাস্থবির, অনেক পরিণত, অনেক পাণ্ডিত্যের অধিকারী। নিতান্ত সহজ সরল নিরহংকারী,অমায়িক শান্ত সমাহিত এক ব্যক্তিত্ব।
তারপরও এ ভিক্ষুর জীবন চর্চায় রয়েছে এক অসামান্য সৃষ্টিশীল জীবনবোধ, এক লড়াকু সৈনিক যার চিন্তা চেতনা, চৈতন্যে রয়েছে প্রজ্ঞা, মৈত্রী ও আলো বিচ্ছুরণের আরক। আপন মনে,ধ্যানে ছুটে চলেছেন মানব কল্যাণে, হিতে। বর্তমান সময়ে নন্দনকানন সার্বজনীন বিহারে অবস্থান করে বৌদ্ধ উপাসক উপাসিকাদের ধর্মদান, ধর্ম দেশনার মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের অমৃত বাণী প্রচার করছেন।

ড. সুমনপ্রিয় মহাস্থবির একজন দক্ষ সাংগঠনিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর সাংগঠনিক কর্মদক্ষতা সবাইকে মুগ্ধ করেছে। মিষ্টভাষী, শান্ত, সরল কর্মদক্ষ ড. সুমনপ্রিয় মহাস্থবির বর্তমানে চন্দনাইশ ভিক্ষু পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের ৫ বছর দায়িত্ব পালন করে সবেমাত্র দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন। তিনি বর্তমানে সাতকানিয়া – লোহাগাড়া ভিক্ষু সমিতির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিভাগীয় সচিব এবং বাংলাদেশ ভিক্ষু মহাসভার তথ্য ও প্রযুক্তি সচিব হিসেবে দায়িত্বরত রয়েছেন। তিনি জাপানের World Buddhist Summit Conference কমিটির সদস্য হিসেবে ২০১৪ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
আমি ড. সুমনপ্রিয় ভিক্ষু’র সার্বিক মঙ্গল কামনা করছি।
রূপক বরন বড়ুয়া, কবি ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম




