মো. দিদারুল আলম
জাফর চৌধুরী একজন সফল ব্যবসায়ী। নীতি ও সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করাই তার আদর্শ। তবে এই সততার কারণে আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই তাকে ‘বেকুব’ বলে উপহাস করে। তিনি নিজের সাধ্যমতো মানুষকে সাহায্য করেন। পণ্যে কোনো ত্রুটি থাকলে তিনি তা গ্রাহককে আগেই জানিয়ে দেন; এই স্বচ্ছতার কারণেই এলাকার বাইরেও তার অনেক অনুরাগী ক্রেতা তৈরি হয়েছে। তবে আদর্শের পথে চলায় অনেক ব্যবসায়ী তাকে চক্ষুশূল মনে করেন। সোজাসাপ্টা কথা বলার কারণে অনেকেই তাকে সহ্য করতে পারেন না।
দবির উদ্দিন জাফর চৌধুরীর বাড়িতে কাজ করেন। সামান্য মাইনে দিয়ে টেনেটুনে তার সংসার চলে। তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে তিনি হিমশিম খান। তার ছেলেটি বেশ মেধাবী, দবিরের স্বপ্ন ছেলেটিকে মেডিকেলে পড়ানোর। কিন্তু অর্থের অভাবে তা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তিনি সবসময় সংশয়ে থাকেন। তার খুব ইচ্ছে বড়লোক হয়ে পরিবারের অভাব দূর করার।
জাফর চৌধুরীর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। দুই ছেলেকে তিনি সুশিক্ষায় বড় করছেন যেন তারা ভবিষ্যতে ব্যবসা দেখাশোনা করতে পারে।
তবে তার সন্তানদের মধ্যে সবচাইতে মেধাবী সতেরো বছর বয়সী মেয়েটি। সে দেখতেও অত্যন্ত সুন্দরী। জাফর চৌধুরীর স্বপ্ন হলো মেয়েটিকে ডাক্তার বানানো এবং তাকে দিয়ে একটি হাসপাতাল পরিচালনা করা। এই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
জাফর চৌধুরীর জন্ম ১৯৩০-এর দশকে। দেশভাগের সময়কার কিছু স্মৃতি আজও তার মনে গেঁথে আছে। ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গার সেই ভয়াবহতা তিনি ভুলতে পারেন না—কীভাবে হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় লিপ্ত হয়েছিল। একদিন সন্তানদের সঙ্গে আলাপকালে উঠে আসে সেই প্রসঙ্গ। দক্ষিণ এশিয়ার অনেকের ধারণা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কেবল একটি পক্ষ দায়ী ছিল। বাবার কথা শুনে বড় ছেলে প্রশ্ন করল, “তাহলে এই দাঙ্গার মূল কারণ কী ছিল?”
জাফর চৌধুরী বুঝিয়ে বললেন, “মূলত ব্রিটিশ শাসক ও কংগ্রেসের প্রতি ক্ষোভ থেকে মুসলিম লীগ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’-এর ডাক দিয়েছিল। কর্মসূচিটি ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, কিন্তু কংগ্রেস মনে করেছিল এটি তাদের বিরুদ্ধে। এই ভুল বোঝাবুঝি থেকেই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, যাতে চার হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়।”
কথার পিঠে ছেলেটি বলে উঠল, “বাবা, ১৯৪৭ সালে দেশভাগ যা-ই হোক, পূর্ব বাংলা আলাদা রাষ্ট্র হলে ভালো হতো। পাকিস্তানের অংশ হয়ে আমাদের কোনো লাভ হয়নি। শুরু থেকেই তারা আমাদের ওপর শোষণ চালাচ্ছে। ভাষা, অর্থনীতি, রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য চরমে। বাবা, আজ গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার রাজপথে ছাত্ররা মিছিলে নেমেছে। আমিও যাব, তুমি বারণ করো না।” জাফর চৌধুরী ধীরস্থির কণ্ঠে বললেন, “না রে, আমি তোকে বাধা দিব না। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করতেই হবে।”
১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খানের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে গণহত্যা শুরু করে। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকাররা নির্বিচারে নারী নিগ্রহ শুরু করে। কোথায় সুন্দরী নারী আছে, তা খুঁজে বের করে তারা ক্যাম্পে নিয়ে যেত। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই জাফর চৌধুরী অর্থ ও পরামর্শ দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করে আসছিলেন। ওই দুঃসময়ে মানুষের আয়-রোজগার ছিল না বললেই চলে; তিনি সাধ্যমতো সবাইকে সাহায্য করতেন। রাজাকাররা এই খবর পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেয়। জাফর চৌধুরী ধার্মিক মানুষ হওয়ায় তাকে সরাসরি কিছু করতে না পারলেও তিনি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে ছিলেন। ভয়ে তিনি রাতে বাড়িতে থাকতেন না। তার যুবতী মেয়ে এবং দুই তরুণ ছেলে যারা সরাসরি যুদ্ধে না গেলেও নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছিল, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি সবসময় উদ্বিগ্ন থাকতেন।
যুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু ততদিনে সব তছনছ হয়ে গেছে। দেশ নতুন করে সাজাতে হবে, সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। যুদ্ধে জাফর চৌধুরীর ব্যবসায়িক অনেক ক্ষতি হয়েছে। তবে তার চাইতেও বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে তার মনে। তিনি উদাস হয়ে থাকেন, কারো সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না। ব্যবসায় মন বসাতে পারেন না।
একদিন আচমকা জাফর চৌধুরী দবিরকে বললেন, “দবির, আমার আঠারো বছরের একটা মেয়ে দরকার। দেখতে সুন্দর হতে হবে।” কথাটি শুনে দবির চমকে উঠলেন। আমতা আমতা করে বললেন, “কী বলেন স্যার!” জাফর চৌধুরী কঠোর স্বরে বললেন, “যা বলছি তা-ই করো। তবে মেয়েটিকে এখানে আনবে না। দূরে কোথাও, ধরো সিলেট বা চট্টগ্রামের কোনো ভালো হোটেলে নিয়ে যাবে—যেখানে কেউ কাউকে চেনে না।”
দবির তার মালিকের কথা শুনে তাজ্জব বনে গেলেন। কাউকে কিছু বলতেও পারছেন না, আবার হজমও করতে পারছেন না। তিনি ভাবলেন, “এই বৃদ্ধ বয়সে মালিকের কী হলো? যিনি কোনোদিন পরনারীর দিকে চোখ তুলে তাকাননি, তিনি এখন যুবতী মেয়ে খুঁজছেন! বাড়ির লোক জানলে তো আমার ইজ্জতও যাবে।” তবুও মালিকের কড়া নির্দেশ, তাই দবির মেয়ে খুঁজতে লাগলেন। দুই সপ্তাহ চেষ্টার পর মনের মতো মেয়ে পাওয়া যাচ্ছিল না। দবির সারাক্ষণ তটস্থ থাকতেন, এই বুঝি মালিক ডেকে কৈফিয়ত চাইলেন!
একদিন দবির বাজারের পাশে পুকুরপাড়ে বসে নিজের অভাব আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলেন। এমন সময় একজন দালালের মাধ্যমে খবর এল। মেয়েটির বয়স আঠারো, অভাবের সংসার। বাবা নেই, মা মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন কিন্তু এখন হাঁপানি, ডায়াবেটিস আর প্রেসারের কারণে শয্যাশায়ী। ওষুধের টাকা জোগাতে না পেরে মেয়েটি এই পথে নামতে রাজি হয়েছে। পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে সে আসতে রাজি।
দবির খুশিমনে মালিককে খবর দিলেন। জাফর চৌধুরী সব শুনে দিনক্ষণ ঠিক করলেন—আগামী বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটায়। যথারীতি একটি হোটেলের কক্ষ বুক করা হলো। দবির ভেতরে ভেতরে গুমরে মরছিলেন, একজন নামাজি মানুষের এই অধঃপতন তিনি কিছুতেই মেলাতে পারছিলেন না।
নির্ধারিত দিনে জাফর চৌধুরী হাতে একটি ছোট স্যুটকেস নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দবিরের বুক তখন দুরুদুরু কাঁপছে। ভেতরে গিয়ে জাফর চৌধুরী দেখলেন, আঠারো বছরের মেয়েটি ঘরের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। ভয়ে মেয়েটির শরীর কাঁপছে। জাফর সাহেব সোফায় বসে চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তার চোখে গভীর বিষাদ।
মেয়েটি ধরা গলায় বলল, “স্যার, যা করার তাড়াতাড়ি করেন। আমার মায়ের ওষুধের টাকা লাগবে। মা খুব অসুস্থ।”
জাফর সাহেব অপলক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখ ভিজে উঠল। এই তো সেই মুখ, সেই কপাল! অবিকল তার হারিয়ে যাওয়া মেয়েটির মতো। ১৯৭১-এর সেই অভিশপ্ত রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা যখন তার কিশোরী মেয়েটিকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল, তখন তার বয়সও তো এমনই ছিল। এক সপ্তাহ পর খবর এসেছিল ক্যাম্পে মেয়েটি মারা গেছে, কিন্তু তার লাশটা আর পাওয়া যায়নি।
জাফর সাহেবের গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি ভগ্ন কণ্ঠে ডাকলেন, “মারে…”
মেয়েটি চমকে উঠল। এই ডাক সে কল্পনাও করেনি। জাফর চৌধুরী ব্যাগ থেকে এক জোড়া নতুন জামা আর কিছু খাবার বের করলেন। তিনি বললেন, “মারে, আমি তোকে কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। আমি শুধু একবার দেখতে চেয়েছিলাম—আমার মা মণিটা বেঁচে থাকলে আজ কেমন হতো। তুই দেখতে ঠিক আমার সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়ের মতো। যুদ্ধের হায়েনারা আমার ঘর অন্ধকার করে দিয়েছিল।”
তিনি হোটেল ইন্টারকমে ফোন করে খাবারের অর্ডার দিলেন। খাবার আসার পর পরম মমতায় মেয়েটিকে পাশে বসিয়ে নিজ হাতে খাইয়ে দিতে দিতে বললেন, “জানিস মা, আমি যখন অফিস থেকে ফিরতাম, আমার মেয়েটা এভাবেই বায়না ধরত তাকে খাইয়ে দেওয়ার জন্য। আজ থেকে তুই আর একা নোস। তোর মায়ের চিকিৎসার দায়িত্ব আমার। আজ থেকে তুই আমারই মেয়ে।”
সুফিয়ার চোখে তখন আর ভয় নেই, আছে অতল বিস্ময় আর কৃতজ্ঞতা। হোটেলের সেই বদ্ধ ঘরটি তখন কোনো কলঙ্কিত স্থান নয়, বরং এক শোকার্ত পিতার হারানো সন্তান ফিরে পাওয়ার এক পবিত্র আশ্রয়ে পরিণত হলো।
মো. দিদারুল আলম, শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক




