এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

মেঘলার চোখে জল

রফিকুল ইসলাম আধার

 

শেরপুরের ব্যস্ততম খোয়ারপাড় শাপলা চত্বর মোড়। বিকেলের কোলাহল আর যানবাহনের ব্যস্ততায় মুখর সড়ক। উদাসী পায়ে পথ চলছিল আকাশ। হঠাৎ তার নজর কাড়ে এক নারীকণ্ঠের নীরব আতঙ্ক—একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আর বিপরীতমুখী এক বিকট ইঞ্জিনের অবৈধ ট্রলির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঠিক মাঝখানে চরম ঝুঁকিতে দাঁড়িয়ে এক নারী। মুহূর্তের দ্বিধা ভুলে আকাশ নিজের দেহটা বাড়িয়ে দিল সেদিকে। শোরগোল, চাকার কর্কশ শব্দ, আর ঘর্ষণ—নারীটি রক্ষা পেলেন অলৌকিকভাবে। কিন্তু আকাশ ছিটকে পড়ল পিচঢালা রাস্তায়। মাথার বাম পাশ আর ডান পায়ে মারাত্মক আঘাত। রক্তে লাল হয়ে উঠল শাপলা চত্বরের ধূসর অ্যাসফল্ট; মুহূর্তে ঘিরে এলো অচৈতন্য অন্ধকার।

অপরিচিত কিছু পথচারী আর এক যুবকের সহায়তায় সেই নারীই রক্তাক্ত আকাশকে তুললেন অটোরিকশায়। গন্তব্য—জেলা সদর হাসপাতাল। পরিচয়ের হদিস নেই, জরুরি বিভাগের রেজিস্ট্রারে লেখা হলো কেবল একটি শব্দ: ‘অজ্ঞাতনামা’।

জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীকে নেওয়া হলো পঞ্চম তলার ক্যাবিনে। চিকিৎসকের তাগিদ—জরুরি ভিত্তিতে রক্ত চাই, ‘এবি পজিটিভ’। কাকতালীয়ভাবে সেই নারীর রক্তের গ্রুপ মিলে গেল। বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে তিনি নিজের রক্ত দিলেন অচেনা প্রাণটির জন্য। কিন্তু আসল সংকট তৈরি হলো অস্ত্রোপচারের অনুমতিতে—কোনো স্বজনের স্বাক্ষর চাই। চিন্তায়, দুঃশ্চিন্তায় ভেতরে ভেতরে ঘেমে উঠছিলেন সেই নারী।

ঠিক তখনই দেবদূতের মতো এগিয়ে এলেন হাসপাতালের এক তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। মুখটা চিনে চিনে লাগল তার। থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আরে, এ তো আমাদের রসুলপুরের আকাশ! তবে গ্রামে তো আর থাকে না, একতারা হাতে বাউল গান গেয়ে ভবের দুনিয়ায় ভেসে বেড়ায়।’

কর্মচারীর মাধ্যমে খবর পৌঁছাল রসুলপুরে। কিন্তু ক্যাবিনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির বুকের ভেতর যেন কালবৈশাখীর ঝড় উঠে গেল। আধাপাকা চুল-দাড়ি, পরনে সফেদ পাঞ্জাবি, আর পাশে পড়ে থাকা এক মলিন ঝুলি-আজকের এই উদাসী বাউলই কি তবে পনেরো বছর আগের সেই পরিচ্ছন্ন, প্রাণবন্ত তরুণ? আনন্দ মোহন কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স শেষ করা সেই মেধা, সেই ভবিষ্যৎ—সব কোথায় গেল? তবে কি সেই কলেজের

করিডর ছেড়ে সে সংসারমুখী হয়নি? মাস্টার্স শেষ করেনি? কোনো চাকরিতে যোগ দেয়নি? আর বাউলের একতারা হাতে কেনই বা পথে নামল? তবে কি এই চরম দেউলিয়াপনার পেছনে তিনিই দায়ী?

হাজারো প্রশ্ন যখন বুকের খাঁচায় আছাড় খাচ্ছিল, তখনই দরজার পর্দা ঠেলে ভেতরে এলেন আকাশের ছোট বোন দীঘি ও তার স্বামী। দুর্ঘটনার বিবরণ শুনতে শুনতে দীঘি যখন সেই নারীর মুখের দিকে তাকালেন, চমকে উঠলেন দুজনেই।

‘মেঘলা আপা… তুমি?’

হ্যাঁ, পনেরো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই মেঘলা। এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। আকাশ যখন অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষার্থী, তখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়া মেঘলাকে তার বাবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে বিয়ে দিয়েছিলেন প্রবাসী খালাতো ভাই মাসুদের সাথে। কিন্তু বিয়ের পর আর দেশে ফেরেনি মাসুদ, পরবাসেই অন্য এক নারীকে আপন করে নেয়। বিচ্ছেদের বিষাদ নেমে আসে দুই বছরের মাথায়। তারপর আর সংসার বাঁধেননি মেঘলা। কিন্তু আকাশের মনটা কেমন ছিল, সে কি বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে—এই প্রায়শ্চিত্তের খোঁজটুকুও যে কখনও পাননি মেঘলা!

অন্যদিকে, মেঘলার বিয়ের খবরে ভেঙে পড়েছিল তরুণ আকাশ। মাস্টার্সের পাঠ চুকে যায়নি, কণ্ঠে উঠে আসে বাবা শরফ বয়াতির বিরহী গান। সংসারের আর্থিক অনটন আর ছেলের এমন উদাসী খেয়ালে মনোকষ্টে চিরবিদায় নেন বাবা, তার কিছুদিন পর মা-ও পাড়ি জমান ওপারে। শেষ সম্বল বসতভিটাটুকুও গিলে খায় পাহাড়ি ঢলের রুদ্র নদী। আশ্রয় হয় বোন দীঘির শ্বশুরবাড়িতে, তবে সেখানেও মন টেকেনি। এখন বছরান্তে একবার কেবল স্মৃতির টানে গ্রামে ফেরা—একমাত্র বোনের মুখটা দেখতে।

রাত এগারোটা। অস্ত্রোপচার কক্ষে আলোর তীব্রতায় আকাশের ক্ষতবিক্ষত দেহে বিঁধছে ডাক্তারের ছুরি-কাঁচি। বাইরে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় দীঘি, তার স্বামী আর অশ্রুসজল মেঘলা।

সকাল আটটা। কেবিনের হালকা আলোয় চোখের পাতা নড়ে উঠল আকাশের। জ্ঞান ফিরতেই বোন দীঘি ছুটে এলো পাশে।

আবেগে আপ্লুত দীঘি বলল, ‘ভাইয়া! তোমাকে যে রক্ত দিয়ে, নিজের দায়িত্বে বাঁচিয়ে তুলল… সে তোমার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দেখবে না তাকে?’

আকাশের মুখে মৃদু, শ্রান্ত হাসি। ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘কার কথা বলছ? মেঘলার?’

দীঘি অবাক— ‘তুমি কী করে জানলে?’

‘দুর্ঘটনার ঠিক আগেই উদাসী মনে হাঁটতে গিয়ে তাকে দেখেছিলাম রে। পনেরো বছর পর মায়ার টান কি এত সহজে মোছা যায়? তাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে পড়ে গেলাম, কিন্তু ও যদি বেঁচে না থাকত, আজকের সমীকরণটা অন্যরকম হতো। তবে ও আমাকে চিনতে পারেনি, আর আমারও যে কথা বলার অবকাশ ছিল না…’

দীঘি গিয়ে মেঘলাকে ডেকে আনল। দরজার কাছে এসে দাঁড়াল এক অন্য মেঘলা—দুচোখ প্লাবিত জলে, বুকচাপা কান্নায় থরথর করে কাঁপছে দেহ।

ক্যাবিনজুড়ে এক ভারী নীরবতা। আকাশ নিচু স্বরে বলল, ‘মৃত্যুই আমার ভালো ছিল, নয় কি?’

মেঘলার গলার শব্দ বুজে আসে, ‘কেন তা হবে? মৃত্যু তো আমারই হওয়া উচিত ছিল। তুমি কেন বাঁচাতে গেলে?’

‘তা না হলে যে প্রেম আর মানবতার ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যেত, মেঘলা।’

‘যে তোমার প্রেমের মর্যাদা দিতে পারেনি, তার জন্য এখনো এত করুণা? এত মায়া?’

‘করুণা নয় মেঘলা,’ আকাশের কণ্ঠে এক অপরূপ নিরাসক্ত শান্তি, ‘যে প্রেম আমি বুকে ধারণ করে বেঁচে আছি, তাকে অবহেলা করি কী করে?’

‘কিন্তু আমার মতো তোমার এই জীবন, পড়াশোনা, চাকরি, সংসার—সব তো ছারখার হয়ে গেল!’

‘সব মিছে হলেও, আমি বিশ্বাস করি প্রেম মিথ্যে নয়, আর তুমিও মিথ্যে হতে পারো না।’

‘এত বিশ্বাস করে আজ কী পেলে তুমি?’ মেঘলার কণ্ঠ বুজে আসে।

‘আজ যা করতে পেরেছি, আর এই যে তোমাকে সুস্থ দেখতে পাচ্ছি—এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?’

মেঘলা পা বাড়িয়ে এগিয়ে এলো বিছানার একদম কাছে। চোখের কোণ বেয়ে তপ্ত জলের ধারা নেমে আসছে তার চিবুক ছুঁয়ে।

‘আমার প্রতি ঘৃণা আর ক্ষোভ তো থাকার কথা আকাশ… তবে কেন এভাবে নিজেকে শেষ করে দিলে?’

‘এখানে তো কোনো বিদ্বেষের ঠাঁই নেই। অদৃষ্টে যা লেখা ছিল, তা-ই ঘটেছে। তা খণ্ডাবে কে?’ আকাশ একটু থেমে বলল, ‘আমার কথা থাক। তোমার বিচ্ছেদের কথা আমি জানি। কিন্তু তারপর… আর তো নতুন করে ঘর বাঁধতে পারতে?’

‘ঘর?’ মেঘলার ঠোঁটে বিষাদের এক চিলতে হাসি, ‘যে বাবার চাপে ঘর বেঁধেছিলাম, সেই বাবাও তো আজ আর নেই। কিন্তু তোমার খবরটা তো অন্তত পেতে পারতাম…’

‘আমার খবর নিয়ে কী হবে? আমি তো দিব্যি ভালো আছি। অন্তর্যামী আমাকে মন্দ রাখেননি।’

আকাশের ভারী, গম্ভীর কথাগুলো মেঘলার হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। আর স্থির থাকতে পারল না সে। ঝাপসা চোখে আরও খানিকটা ঝুঁকে এলো। জখম হওয়া শরীরটার পাশে বসে সে নিজের অজান্তেই হাত বাড়াল। আকাশও তার ব্যথিত হাতটি তুলে নিল।  মেঘলার দুচোখের কোল ছুঁয়ে—জল মুছে দিতে গিয়ে দেখল, তার নিজের কোণেও  জমেছে শ্রাবণের মেঘ।

দীঘির নীরব অনুরোধে—দুটি হাত মিশে গেল দুটি হাতে। পনেরো বছরের অদেখা মরুভূমি যেন একমুহূর্তে ভিজে একাকার হয়ে গেল।

বাইরে তখনো বৃষ্টি ঝরছে কি? নাকি রোদের আলো ফুটছে শহরের শাপলা চত্বরে? পনেরো বছর পর যে দুটো হাত একে অপরকে স্পর্শ করল, তারা কি সত্যি আবার এক হলো, নাকি এ শুধুই এক অচেনা গন্তব্যের সাময়িক বিরতি? উত্তরটা রয়ে গেল কেবিনের ওই বিষাদমাখা বাতাসের ভাজে, রক্তের বিন্দুতে আর দুটি ভেজা চোখের না-বলা নিস্তব্ধতায়…।

 

রফিকুল ইসলাম আধার : কবি, গীতিকার ও সাংবাদিক, শেরপুর

অ্যান কারসন : পুরাণ পেরিয়ে মানুষের কাছে

শাহেদ কায়েস ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়ন ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা

 ‘সাড়ে ৭ বছরে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি’

আন্দরকিল্লা ডেক্স : গত সাড়ে ৭ বছরে সারাদেশে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চাঁদপুরের সুপরিচিত প্রতিষ্ঠিত সংগঠন চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি। বিগত পুরো অক্টোবর মাস

কবীর-লালন ভাবসঙ্গীত উৎসবে ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন : ভাঙা ডালের কোষ থেকে জেগে ওঠে সবুজ-সজিব পত্র-পল্লব

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেছেন, তুমুল ঝড়-ঝঞ্ঝায় সবুজ প্রান্তরে সকল বৃক্ষরাজি ধ্বংস হলেও কয়েকটি ডালপালা পড়ে থাকে। ঐ ডালপালাগুলোর মধ্য

যোগেন চৌধুরী : শূন্যতার মর্মবেদ

মইনুদ্দীন খালেদ দুঃসহ অভিজ্ঞতায় অস্তিত্বের প্রদাহে বদলে যায় মানুষের নিত্য-চেনা অবয়ব। ক্ষুরধার একটা অপয়া মুহূর্তের রিরংসায় মানুষ কি অতর্কিতে হয়ে যায় তার আপনজনের হন্তারক! পচনশীল

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির (পূর্ব প্রকাশিতের পর) মামা, আমরাতো তিন দিন আগের থেকেই ওরে খুঁজতেছিলাম। পুলিশ আধা ঘন্টা হইলো ওর লাশ দিয়া গেছে। কইলো পরশুদিন রাইতে