দীপক বড়ুয়া
আমি স্বপ্নদীপ।
মা বাবার প্রথম সন্তান।
আমার জন্মের আনন্দে বাবা নাম রেখেছিল স্বপ্নদীপ। মা বাবা কেউ বুঝেনি আমি বড় হলে বামন হব। ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ায় ভীষণ ভালো ছিলাম। তাই বাবার আদরের কমতি ছিলনা।
আমি বড় হবার সাথে সাথে বাড়ির, পাড়ার, সবার কাছে অপমান, ঘৃণার পাত্রই ছিলাম। অবজ্ঞা করত সবাই। বাটকো বাটকো বলে হাসত আর ঠাট্টা করত। বাড়ির পাশেই প্রাইমারি ইশকুলে ভর্তি হলাম। সব ক্লাস সাথীদের কাছে বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতাম। লজ্জায় মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারিনি কোনদিন। হাই ইশকুল এ ও তাই। তারপরও মেট্রিক পরীক্ষায় ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করি। প্রত্যেক শিক্ষক লেখাপড়ায় ভালো বলে প্রচন্ড ভালোবাসতেন।
পুস্পিতা আমার সাথে পড়ত। আমাদের গাঁয়ের মেয়ে। সে আমাকে নিয়ে অন্য বন্ধুদের ঠাট্টা করা পছন্দ করত না। সে আমার বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল। একান্তে কাছে ডেকে বলত,
-স্বপ্নদীপ, তুমি নিজেকে ছোট মনে করো না। ওদের কথায় কি এসে যায়। তুমি একজন মেধাবী ছাত্র। ভবিষ্যতে অনেক বড় হবে। কলেজে পড়বে,বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বড় পদবি নেবে আমার বিশ্বাস।
– এসব কেন বলছ তুমি। এত অপমান আমার ভালো লাগে না পুস্পিতা। কি লাভ ভালো পাশ করে। সমাজে একজন ঘৃণিত মানুষ মাত্র।
– দীপ,আমি তোমাকে শেষ হতে দেব না। তোমার মধ্যে একটি ঐশ্বরিক মেধা আছে। সেটাকে আমি নষ্ট হতে দেব না। পাশে থেকে জাগিয়ে তুলব।
– তুমি আমার কে?
– বন্ধু, একজন নিরাপদ বন্ধু তোমার।
আমি পুস্পিতার কথায় ঠোঁট কামড়ে হাসি। মনেমনে বলি, সত্যি পাগল মেয়ে। একজন বামন ছেলে কারো বন্ধু হতে পারে?
কলেজে ভর্তি হলাম। সেখানেও নানান অপমান দৃষ্টিকটু কথা। সঙ্গে পড়ত পুস্পিতা। এক অদ্ভুত মেয়ে,সারাটা সময় পাশাপাশি থাকল। পাশে থেকে একসাথে পড়ে যাচ্ছে। এখানেও সকল অকথ্য ভাষায় কথা বলা সহপাঠীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলত,
-তোমরা সবাই ওকে বিদ্রূপ করো কেন? ওভাবে জন্মের ওর কি হাত ছিল? সবই সৃষ্টি কর্তার ইচ্ছেতে হয়। অবকাশ বলেই ফেলল,
– ঐ রকম পরিবেশে লেখাপড়ার কি দরকার ছিল বলো। ঘর থেকে বেরুনাটাও বেমানান। শুধু অপমানিত হওয়া।
– লেখাপড়ায় কি নিয়ম আছে। যে কোন কেউ পড়তে পারে। পুস্পিতা ও উল্টো বলে উত্তর দেয়।
– এই যে সবাই ওকে বিদ্রুপ করে ওর ভালো লাগে? কার ও মুখ বন্ধ করতে পারবে স্বপ্নদীপ?
– সবাই করবে বলে তুমিও করবে? তুমিতো অন্যদের মত নও অবকাশ। পুস্পিতার কথা।
– তুমি কর না পুস্পিতা!
– না, আমি করিনা।
– কেন?
– দীপ আমার বন্ধু এবং ভীষণ ভালো বন্ধু। সে একজন ভালো ছাত্র। পৃথিবীর মানুষগুলো কত স্বার্থপর, কতটা অকৃতজ্ঞ। শুধু নিজেকে নিয়ে গর্ব! ও কলেজে ভালো পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। দেখে নিও অবকাশ।
ঠিক তখনই আমার দু-চোখ নোনা জলে ভরে যায়। চোখের জল দেখে পুস্পিতা বলে, দীপ তুমি কাঁদছ?
আমার মুখে কথা বেরুয় না। শুধু ফুঁপিয়ে কাঁদছি। আমার কান্না দেখে অবকাশ চলে যায়। এটাই তো আজকাল মানুষের চরিত্র।
পুস্পিতা বলে, দীপ, তুমি কেন কাঁদছ?
– কি করব বল। এ অপমানে লজ্জা কুরে কুরে খাচ্ছে। পারিনা তালমিলিয়ে সবার সাথে হাঁটতে। পারিনা রিকশায় উঠতে, বাসে উঠতে। একটা শিশুর মতই চলা। এমন কি কলেজে টুলে বসে উপরের টেবিলে বই খাতা দেখিনা। এতটা ছোট তো! একটি কথা বলব পুস্প?
– বল।
– মাঝেমধ্যে বাবার উপর আমার রাগ হয়। তুমিতো জানো, আমার বাবাও বামন। কেন বিয়ে করল। আমার মা আবার চেয়ে অনেক লম্বা। তাতে কি লাভ হল। আমার আরও একভাই, এক বোন বামন। ওরাও আমার মত প্রতিনিয়ত অপমানে বড় হচ্ছে। যদি আমার বাবা বিয়ে না করত আমাদের মত সন্তান জন্ম হয়ে লানছিত হতো না। আমরা হলাম সমাজের অবাঞ্ছিত গোষ্ঠী। মানুষের চোখে হাসির খোরাক এবং ঠাট্টার মূল্যবাণ বিষয় মাত্র ।
– এটা কি বলছ তুমি দীপ। তোমার বাবার এখানে দোষ কি? তোমার অন্য ভাইয়েরা তো লম্বা। তা’হলে!
তারপর একদিন ইন্টারমেডিয়েটএ ও ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করলাম।
বাবা বলল, ভার্সিটিতে ভর্তি হতে। লোক লজ্জায় সাহস হলনা। কিন্তু পারলাম না পুস্পিতার জন্য। পুস্পিতার সাথে অর্থনীতিতে ভর্তি হলাম। ট্রেনে করে যাওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়ি। ট্রেনে উঠতে নামতে ভীষণ কষ্ট। তার উপর অন্য ছাত্রদের চক্ষু লজ্জার পাত্র আমি। কত ধরণের ঠাট্টা, টিটকারি, অকথ্য কথায় কান জ্বালাপোড়া করত। প্রতিবাদ করত পুস্পিতা। আমি পারতাম না। যেন একজন অকাল কুস্মাণ্ড আমি।
একদিন রাতে বাবা আমাকে ডেকে বলল, তোর মাষ্টার ফাইনাল পরীক্ষা কখন?
– তিনমাস পরে। আমি বললাম।
– ভালো করে পড় বাবা। আমার বয়স হল, কিছুদিন পরে চাকরি শেষ হবে। তুইতো বড় ছেলে, এবার তোকেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হবে। বাবার কথা শোনার ফাঁকে
বাবাকে একটা প্রশ্ন করতে খুব ইচ্ছে হল। কেন তুমি বিয়ে করলে! তুমি কি প্রেম করে বিয়ে করেছিলে? তা’ নাহলে মা তোমাকে স্বামী হিসেবে কেন পছন্দ করল! তুমি কি মায়ের যোগ্য ছিলে কোনদিন। যেমনটি আমার কাছাকাছি পুস্পিতা থাকে। নাকি ভালোই বাসে! বাবার মত বিয়ের আবদার করে বসবে নাতো! বাবার বিয়ে করার কারণে আমাদের সবাইকে সমাজে অপমানিত হতে হচ্ছে। বিয়ে না করলে আমাদের জন্মই হত না। বাবা খুবই রাগী। সমাজে আবার প্রতিষ্ঠিত একজন। অফিসে বাবাকে সবাই যথেষ্ট সম্মান করে। ভয়ে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। তবু বাবাকে ছোট্ট করে বলি,বাবা,
বামনের কি আদৌ সরকারি কিম্বা বেসরকারি চাকরি হয়? কোন সরকার কি সেই সুযোগ দেবে?
– আমি করছি না। তুইতো আমার চেয়েও মেধাবী ছাত্র। নিশ্চয়ই একটি চাকরি পাবি।
– হয়তো তখন ছিল। এই সময়ে না ও হতে পারে।
বাবার আমার কথায় চুপ থাকে।
কিছুদিন পরে ভার্সিটির ক্লাস শেষে ফিরছিলাম। পুস্পিতা, লাবণী,শ্রাবণ পাশাপাশি হাঁটছে। ওদের গতিতে আমি পেরে উঠিনা। হাঁটতেও পারিনা। আমাকে ফেলে অনেকটা পথ এগিয়ে যায় সবাই। আমাকে পাশে না দেখে হয়তো পুস্পিতা পিছনে ফিরে দেখে। আমি বেশ কিছু পথ ওদের পেছনে। পুস্পিতা কি ভেবে পিছনে আমার কাছে আসে। ওদের বড় গলায় বলে,তোমরা এগিয়ে যাও।
আমি বললাম, ওরা কি ভাববে বলতো!
– কিচ্ছু না ভাবার জন্যতো বললাম, তোমরা এগিয়ে যাও।
– তারপরও ঠিক করলে না তুমি।
– আচ্ছা বাদ দাওতো, তোমার সাথে জরুরি কথা আছে আমার। ভালই হল, এটাই তো সুবর্ণ সুযোগ।
– কি জরুরি কথা?
-হেঁটে হেঁটে বলছি। শুনবে।
কি লজ্জা, আমি পুস্পিতা পাশাপাশি হাঁটছি। ও আমার চেয়ে কতটা লম্বা,আর আমি এতটা বেটে যে পাশাপাশি হাঁটতে লজ্জা,খারাপ দুটোই লাগছে।
পুস্পিতা বলে,বাবা আমার বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছে।
– সেতো খুশির কথা। ভাল বর দেখে বিয়ে করে নাও। সংসার করে বাবাকে দুশ্চিন্তা মুক্ত কর।
– ছি: দীপ, এই কি বলছ তুমি। আমি তোমাকে ভালবাসি দীপ। ওর কথায় আমি থমকে দাঁড়িয়ে বলি, ছি:ছি: আমি তোমাকে ভাল বন্ধু ভাবতাম। আর কিছু নয়। তুমি যেটা বলছ, সেটা মারাত্মক অন্যায় আবদার। শুধু তাই নয়, আমাকে ইচ্ছেকৃত অপমান তুল্য।
– দীপ, আমি শুধু তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি। তোমাকে অনাথ দেখে তোমার ব্যক্তিত্বকে ভালোবেসে ফেলেছি। তুমিতো বড্ড একা। তোমার পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই। তাই ছোটবেলা থেকেই তোমার নি:ঙ্গতায় পাশাপাশি থেকেছি। বিয়ে করলে তোমাকেই করব দীপ। তুমি না করো না।
আমি হতবাক হয়ে প্রশ্ন করি, – তোমার মা বাবা এবং এই সমাজ বিয়েটা মেনে নেবে মনে হয় তোমার। কি করে ভাবলে এটা। জানো, আমি বাবার মত ভুল করতে চাই না। বাবার সামান্য ভুলে বামনের বিস্তার লাভ করে বামনদের কলংকিত করেছে। যেখানেসেখানে বামনেরা হাঁটতে, বসতে, ফিরতে এমন কি কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত অপমানিত, ঠাট্টার পাত্র হিসেবে খ্যাত হচ্ছে। এরপরও কি করে ভাবো এটা।
আমার কথার পরে পুস্প বলে,
-মা বাবার কিম্বা সমাজের কথা জানিনা। সমাজটা আসলে কি? মানুষের কোনদিনও উপকারে আসে?
আমি আমার শেষ কথাই বললাম। বিয়ে করলে তোমাকেই করব। আর কাউকে নয়। তোমার সাথে একসঙ্গে বড় হয়েছি,পড়েছি সময় কাটিয়েছি এবং কোনদিন একটুও ভেবে দেখেছ, আমাদের দু’জনের মনের কতটা মিল। তাই আগামি জীবনটাও তোমার সাথে সংসারে কাটিয়ে দেব অবলীলায়।
– সমাজে পরিচয় দিতে পারবে?
-আবারও সমাজের কথা? ছি:, ধিক্কার সমাজকে। হ্যাঁ খুব পারব। পুস্পিতা বলে থামেনা। বলে, সমাজ ভালোটাকে কখনও প্রাধান্য দিয়েছে? দেয়নি। ওরা চায় ওদের আধিপত্য, ক্ষমতাকে প্রস্ফুটিত করে তোলা ওদের কাজ।
– আমিতো তোমার মত পারবনা। আমি চাইনা বামনদের বিস্তার লাভে কলংকিত হউক ওরা। আমি বামন ঠিক আছে।আমি বিয়ে করে আরও বামনের জন্ম দিতে চাই না। আামর মত অন্য বামনদের পথেপথে ইশকুল, কলেজ, ভার্সিটি এমন কি কর্মক্ষেত্রে চিরকাল লজ্জায় অপমানিত হউক আমি চাই না।
– তুমি কি আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছ দীপ? ভেবেচিন্তে দাও।
– হ্যাঁ দিচ্ছি, কারণ আমি বামনের বংশ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে, বাকীটা তোমার সিদ্ধান্ত। এবং এটাও জেনে রাখ, আমি জীবনে কোনোদিন ও বিয়ে করব না প্রতিজ্ঞা করেছি। এটা স্বপ্নদীপের দৃঢ় স্বপ্ন।
রাগে আবেগে পুস্পিতার লাজুক চোখে জলের বন্যা দেখি। সে নীচু হয়ে আমার হাত ছুঁতে চায়, আমি হাত দূরে সরিয়ে সামনে হাঁটতে থাকি।
পুস্পিতা আর কথা বাড়ায় না। আমাকে পেছনে ফেলে দ্রুত অশ্রু চোখে সামনে হাঁটে। আমি পুস্পিতার পেছন পেছন।
ওর ছুটে যাওয়া আমাকে হারিয়ে দেয়। ওকে ধরতে চাই। না, দেখি আমি ওর চেয়ে অনেক পেছনে। আমার চোখজোড়া জল ধরে রাখতে পারে না। টুব টুব জল পড়ে। দুর্দান্ত লবন মাখা, আঁটার মত।
এমূহুর্তে আমি চোখের সামনে আর কোনও বামন দেখতে পাইনা। কি আনন্দ!
হৃদয় জুড়ে খুশির সুরধ্বনি বাজে।
দীপক বড়ুয়া, শিশুসাহিত্যিক ও গল্পকার, চট্টগ্রাম




