এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

স্মৃতির একাত্তর ও পূর্বাপর

জসীম চৌধুরী সবুজ

দেখতে দেখতে ৫৪ টি বছর পার হয়ে গেল। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র জন্মলাভ করেছে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ ও অজস্র মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের জাতীয় জীবনের এক মহাঅর্জন। এই মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অংশ নিয়েছেন, ভূমিকা রেখেছেন বা সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছেন তাদেরই একজন আমি। পাক হানাদার বাহিনীর সাথে টানা ৪৮ ঘন্টার সন্মুখ সমরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার বিরল সৌভাগ্যের ভাগীদার আমি। কখনোই নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করিনি, সার্টিফিকেট পাওয়ার চেষ্টা তদবির করিনি। তবে একজন কিশোর গেরিলা হিসেবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবস্থান ও তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানের ঝুঁকিযুক্ত কাজ এবং অন্তিম লগ্নে ৪৮ ঘন্টার সম্মুখ সমরে সরাসরি অংশ গ্রহনের সুযোগ লাভকে এই অনুল্লেখ্য জীবনে অতীব উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে মনে করি। নিজেকে খুবই গর্বিত মনে করি এ কারণে যে, দেশমাতৃকার মুক্তির লড়াইয়ে সন্মুখ সমরে সামিল হতে পারার এরকম বিরল সুযোগ আগামী হাজার হাজার বছরেও আর কোনো প্রজন্ম পাবেনা।

মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামে রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের নিপীড়ন নির্যাতন ও সীমাহীন বৈষম্যের শিকার হতে থাকে পূর্ব পাকিস্তান। এর বিরুদ্ধে বাঙালির ক্ষোভ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দানা বাঁধতে থাকে। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনে বাঙালি ছাত্র জনতা রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। ৫৪ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র থেমে থাকে নি।

১৯৬৬ সালে লাহোরে সর্বদলীয় নেতৃবৃন্দের বৈঠকে উপস্থাপনের পর চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা। ক্রমেই তা পরিণত হতে থাকে বাঙালি জাতির প্রাণের দাবিতে। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে বিদায় নেন।

 

ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনের অধীনে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। এতে জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পায় ১৬০ টি আসন। মহিলাদের সাতটি সংরক্ষিত আসন পায় আওয়ামী লীগ। জনসংখ্যার ভিত্তিতে পশ্চিম পাকিস্তানের আসন সংখ্যা ছিল কম। সেখানে অধিকাংশ আসনে জুলফিকার আলি ভূট্টোর পিপলস পার্টি জয়লাভ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা দিলেন ছয় দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনা করা হবে। ভুট্টো এর বিরোধিতা করলেন। শুধু বিরোধিতাই নয়, তিনি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসার জন্য। ১৯৭০ সালের ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। বাঙালি এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন। আর ৬ দফা নয়। এবার বাঙালির দাবি এক দফা।

সাতই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান লোকে লোকারণ্য। বঙ্গবন্ধু কী ঘোষনা দেন তা নিয়ে সারাদেশ শুধু নয় সারাবিশ্ব থাকিয়ে আছে। রেসকোর্সের ( বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) উত্তাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দিলেন ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি , তোমরা যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়’।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি রেডিওতে সম্প্রচারের উদ্যোগ সফল হয়নি। তবে পরদিন রেডিওর বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টায় ভাষণটি সম্প্রচার করা হয়। সারাদেশের মানুষ হাটে বাজারে গঞ্জে মাইক লাগিয়ে সেই ভাষন শুনেছে। আমরা দোহাজারী হাজারী হাটে বিশাল জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে শুনি সেই ঐতিহাসিক ভাষন। মনে পড়ে বাজারে উভয় প্রান্তে অনেকগুলো মাইক লাগিয়ে সেখানে রেডিওতে সম্প্রচারিত ভাষণটি শুনেছেন হাজার হাজার মুক্তিকামী জনতা।

ভাষনে বঙ্গবন্ধু সরকারি অফিস আদালতসহ সব বিষয়ে তিনি নির্দেশনা প্রদান করায় মূলত তখন থেকেই অচল হয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান প্রশাসন। শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতার সংগ্রাম। সারাদেশে গ্রাম গঞ্জে পর্যন্ত ছড়িয়ে পরে এর ঢেউ। প্রকৃতপক্ষে সরাসরি প্রতিরোধ যুদ্ধ সর্বপ্রথম শুরু হয় চট্টগ্রাম থেকেই।

গ্রামে বসেই এই উত্তাপ আমরা টের পাচ্ছিলাম। সন্ধ্যা হলেই বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকার খবর শুনতে রেডিও আছে এমন দোকান বা বাড়ির কাছারিঘরের সামনে মানুষের ভিড় জমতে থাকে। ২৫ মার্চ কালরাতে পাক বাহিনী ঢাকায় রাজারবাগে নিরস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও জনসাধারণের উপর আক্রমণ করে বসলে চট্টগ্রামে ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিকের নেতৃত্বে প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে প্রথমে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান এবং পরদিন নেতৃবৃন্দের অনুরোধে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এম এ হান্নানের ঘোষণা সেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি বা পৌঁছালেও তা তেমন গুরুত্ব পায়নি। পরদিন মেজর জিয়া কালুরঘাটস্থ রেডিওর ট্রান্সমিসন সেন্টার থেকে যে ঘোষণা দেন তাতে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে উল্লেখ করেন। পরদিন তিনি তা সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনাটি আবার পাঠ করেন রেডিওতে।

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি দশম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের স্কুলের নাম দোহাজারী জামিজুরী এ রহমান উচ্চ বিদ্যালয়। তখনকার সময়ে এত স্কুল কলেজ ছিল না। দোহাজারী হাইস্কুল রাজনৈতিক তৎপরতার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১১শ’র মত। কঠোর শৃঙ্খলা ছিল। আরাকান সড়ক ঘেঁষে হাজারী দীঘির পাড়ে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত স্কুলে তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের খুবই ভালো অবস্থান। একে সংক্ষেপে ঊচঝট – অ্যাপসু বলে বলা হত। ভালো ছাত্ররা প্রায় সকলেই এই সংগঠনের সাথে জড়িত। ছাত্রলীগও অত্যন্ত তৎপর ছিল স্কুলে।

১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এ বছর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূত্থানে আইয়ুব খানের পতন হয়। এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক বোধ বিবেচনা বিকশিত হতে থাকে। তখন আমি ৮ম শ্রেনীর ছাত্র।

স্কুলে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের মধ্যে মোহাম্মদ মাহফুজ ও মোহাম্মদ ইসহাক দুইভাই ( দু’জনেই এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডে মেধা তালিকায় স্থান পান) এবং ছাত্রলীগের আবু তাহের খান খসরু ও জাফর আলী হিরু সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচিসমূহ সমন্বয় করতেন। আমি ছাড়াও আমার সহপাঠীদের মধ্যে আবদুল মোনাফ, নাজিম উদ্দীন, মোহাম্মদ এয়াকুব, শাহ আলম, আবছার উদ্দিনসহ আরো অনেকে ছাত্র ইউনিয়নে সক্রিয় হয়ে পড়ি। দোহাজারীতে তখন ছাত্র ইউনিয়নের শক্ত অবস্থান। সুব্রত চৌধুরী তখন চট্টগ্রাম কলেজে, মনোজ সিংহ হাজারী পটিয়া কলেজে পড়েন। বাড়ি দোহাজাীর। দোহাজারীতে ছাত্র ইউনিয়নের তদারকি মূলত তারাই করতেন।

রশীদ আহমদ নামে আমাদের এক স্যার ছিলেন। তিনি কমার্সের শিক্ষক। রশীদ স্যার ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) করতেন। পাকিস্তান ন্যাপের প্রধান ছিলেন খান আবদুল ওয়ালী খান, এবং পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। রশীদ স্যার কৃষক সমিতিতে সক্রিয় ছিলেন। নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা অধিকাংশই কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৬৯ সালে গাছবাড়ীয়া স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় কৃষক সমিতি, বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা সম্মেলন। এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কমরেড মনি সিংহ। রশীদ স্যার আমাদের স্কুলের বেশ কয়েকজনকে সেই সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়ে যান। স্কুল মাঠটি স্কুল থেকে দূরে বাজারের শেষপ্রান্তে, যেটি এখন গাছবাড়ীয়া সরকারী কলেজ মাঠ। সেই মাঠে অনুষ্ঠিত হয় সম্মেলন। এজন্যে কাস্তের আদলে নির্মিত হয় বিশাল মঞ্চ ও প্যান্ডেল।আর প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষকদের রেজিষ্ট্রেশন ও খাবারের ব্যবস্থা হয় গাছবাড়ীয়া স্কুলে। আবছার, শাহআলম ও আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় গাছবাড়ীয়া স্কুলের একটি মাটির ঘরে স্থাপিত সম্মেলনে আগত প্রতিনিধিদের রেজিষ্ট্রেশন ও খাবার কুপন ইস্যুর বুথে। স্কুল ছাত্র থাকা অবস্থায় সেটি আমার জীবনে প্রথম কোনো গনসংগঠনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ।

 

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটসহ যেসব কর্মসূচি দেয় দোহাজারী স্কুলে তা কঠোরভাবে পালিত হয়। আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রায় সকলের এসব কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ছিল। আরাকান সড়কের পাশে গাছবাড়ীয়া এবং পটিয়া আদর্শ স্কুল ও রাহাত আলী স্কুলেও সক্রিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘটের সময় আমরা শিক্ষকদের ম্যানেজ করে ক্লাস থেকে বের হয়ে মিছিলে যোগ দিতাম স্কুলের সকল শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের কিছু নির্দেশনা ছিল এ ব্যাপারে। তা হচ্ছে অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা এসে যদি আহবান জানায় তাহলে আমরা ক্লাস থেকে বের হয়ে আসতে পারব। গাছবাড়ীয়া স্কুল পাঁচ মাইল আগে। কখনো তারা আগে বের হয়ে আমাদের স্কুলের সামনে আসলে আমরাও বের হয়ে যেতাম। আবার আমরা আগে বের হতে পারলে ওদের স্কুলে গিয়ে ওদের বের করে নিয়ে একসাথে মিছিলে শ্লোগান ধরতাম। মিছিলে স্লোগান ছিল ‘ আমার তোমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা,’ পিন্ডি পিকিং ওয়াশিংটন, বাংলার দুশমন,’ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, নিপাত যাক নিপাত যাক,’ ১১ দফা-১১দফা, মানতে হবে, মানতে হবে,’।

গণঅভ্যুত্থানে অবশেষে বিদায় নিতে বাধ্য হলেন সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। আইয়ুব খানের কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠানের তফসিল ঘোষনা করলেন। নির্বাচনি আবহ তৈরি হতে শুরু করল। এরিমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ উপকূলীয় এলাকা। হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। স্থগিত হয়ে যায় নির্বাচন। বঙ্গবন্ধু উপকূলীয় অঞ্চল পরিদর্শনে কক্সবাজার গিয়ে সেখান থেকে সড়ক পথে চট্টগ্রাম ফেরার সময় অনেকগুলি পথসভায় বক্তৃতা করেন। দোহাজারীতে পথসভায় আমার বাবার সাথে আমি যোগ দিই এবং খুব কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখার সৌভাগ্য হয়। তখন প্রবীণ লোকজন তাঁকে শেখ সাহেব নামেই সম্বোধন করতেন। আমাদের কালিয়াইশ গ্রামের প্রতিবেশী মোখলেসুর রহমান ( মখলা ফকির নামে পরিচিত) এবং দোহাজারী গ্রামের ইসহাক ফকির দু’জনেই মজলুম টাইপের লোক এবং শেখ সাহেব বলতে পাগলপ্রায় ছিলেন। পথসভায় টেবিল ফ্যান ও হাতপাখা নিয়ে বাতাস করতে এদের ব্যস্ত দেখে শেখ সাহেব নাম ধরে তাঁদের ডেকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। যেখানে সভা হচ্ছিল তার সামনে দোহাজারী খাদ্য গুদামের দেয়ালে একটি দেয়াল লিখনে লেখা ছিল ‘বঙ্গশার্দুল শেখ মুজিব জিন্দাবাদ’। বাবা সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষন করে আমার কাছে জানতে চাইলেন, ‘বঙ্গশার্দুল’ শব্দের মানে কী? আমি জনি না বলার পর বাবা বললেন, এ শব্দের মানে হচ্ছে ‘বাংলার বাঘ’।

তিনি অবশ্য পরে বঙ্গবন্ধু নামেই ব্যাপক পরিচিতি পান।

 

পূর্ব পাকিস্তানে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের পর জাতীয় নির্বাচন স্থগিত করা হয়। চট্টগ্রামের কক্সবাজার, চকরিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, মিরসরাইসহ দেশের সব উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি বাড়িঘর, স্কুল-কলেজ ও নানান স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। এতবড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানে না আসায় এবং ত্রাণ ও মানবিক সাহায্য সহযোগিতা শুরু না করায় শেখ সাহেব শাসক গোষ্ঠীর তীব্র সমালোচনা করেন এবং বাংলার সাধারণ মানুষকে যার যতটুকু সামর্থ্য আছে তাই নিয়ে পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান। সন্ধ্যার দিকে সভা শেষ হলে আমি বাবার সাথে বাড়ি না ফিরে স্কুলের বন্ধুদের সাথে আরো কিছু সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরি।

 

দোহাজারী হাইস্কুলে যখন আমরা ভর্তি হই তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন মমতাজ উদ্দিন আহমদ স্যার। তাঁর বাড়ি চকরিয়ায়। তাঁর এক ছেলে জসীম উদ্দিন আহমদ ও এক মেয়ে আমাদের সহপাঠী ছিল। স্যারের সাথে তারা স্কুল সংলগ্ন প্রধান শিক্ষকের কোয়ার্টারে থাকত। ১৯৭০ সালে তিনি বিদায় নিলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে শুধাংশু সেন স্যার যোগ দেন। তাঁর বাড়ি বোয়ালখালী। তিনি আগে কলাউজান স্কুলে ছিলেন। স্যার দোহাজারী স্কুলে যোগ দিয়েই কীভাবে আগামীতে বোর্ডে স্কুলের অবস্থান আরো ভাল করা যায় সে পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে থাকেন। মানবিক বিভাগে আমার রোল নম্বর ছিল এক। তিনি আমিসহ আরো অনেকের প্রতি খুবই মনযোগী হন যেন আগামীতে এসএসসি পরীক্ষায় স্কুলের ভালো রেজাল্টের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়।

স্যার আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। বছরের প্রথম থেকেই জোরালো প্রস্তুতির তাগাদা ছিল তাঁর। তিনি কোনো ফি না নিয়েই প্রাইভেট পড়াতেন আমরা ক’জনকে। স্কুল সংলগ্ন স্যারের বাসায় গিয়ে পড়তাম। রমজান মাসে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে বললাম স্যার, কাল পড়তে আসতে পারব না।

স্যার কারণ জানতে চাইলেন। বললাম, ঈদ মার্কেটিং করতে শহরে যাব বাবার সাথে। তাই আসতে পারব না।

স্যার হালকা রসিকতা করে বললেন, ঠিক আছে যাও, শুধু নিজেরটা কিনিও না, আমাদের জন্যও কিনিও।

গ্রামে গঞ্জে তখন ঈদ বাজার বসত না। আমার বাবা প্রতিবছর আমাদের চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যেতেন ঈদের জামাকাপড় কিনে দিতে। শহরে যাওয়ার সময় বাবাকে বললাম স্যারের কথা। স্যারের তিন মাস বয়সী এক পুত্র সন্তান আছে। ওর জন্য টেরিবাজার আফগান স্টোর থেকে ভাল মানের জামাসেট কেনা হয়। ঈদের ছুটির শেষে স্যারের বাসায় যাওয়ার সময় নিয়ে যাই স্যারের বাবুর জন্য কেনা সেই উপহার। গিয়ে দেখি দরজায় তালা ঝুলছে। নাইট গার্ড সাঁচি মিয়া দা’র কাছে জানলাম স্যার স্ত্রী ও তিন মাসের শিশু পুত্রকে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে চলে গেছেন।

যুদ্ধের দামামা যে ছড়িয়ে পড়েছে তা তখন নিজে ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারলাম। আমরা সহপাঠী ও বন্ধু বান্ধবরা সাঙ্গু ব্রিজে বা দোহাজারী রেল স্টেশনে নিয়মিত আড্ডায় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করতে থাকি। লেখাপড়া কোথায় যাবে তার চেয়েও আমরা বেশি উদ্বিগ্ন দেশ কোন দিকে যাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত কি হয় এসব ভাবনায়। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবরসমূহ আমরা আড্ডায় শেয়ার করি।

আমার এক জেঠাতো ভাই আবদুল মান্নান চৌধুরী চট্টগ্রাম শহরে তেল কোম্পানিতে চাকরি করতেন, যেটি স্বাধীনতার পরে হয় যমুনা অয়েল কোম্পানি। শহরের পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যেতে থাকলে লোকজন শহর ছেড়ে নিরাপদ অবস্থানে চলে যেতে থাকেন। একদিন আমার সেই বড়ভাইয়ের সাথে তার কয়েকজন সহকর্মী শহর ছেড়ে চলে আসেন আমাদের গ্রামে। তারা বাইরের দেউড়ি ঘরে ছিলেন সপ্তাহ- দশ দিনের মত।

সাহিত্যিক আবুল ফজলের এক বোনের শ্বশুর বাড়ি আমাদের পাশের বাড়িতে। ওনার ভাগ্নেদের আমরা বদ্দা বলে ডাকতাম। একদিন দুপুরে আমাদের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে শুভ্র চুল দাড়ির অপরিচিত এক ব্যক্তিকে দেখি মসজিদের পাকাঘাটে, তিনি গোসল করছেন। কাছে দাঁড়ানো অন্য লোকদের কাছে শুনলাম তিনি প্রখ্যাত সাহিত্যিক শিক্ষাবিদ আবুল ফজল। শহরের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় তিনিও নিরাপদ আশ্রয়ে সেখানে গিয়ে কয়েকদিন থেকেছিলেন। শুনেছি আমাদের গ্রামে যাওয়ার আগে তিনি কয়েকদিন হাসিমপুর গ্রামে থেকে এসেছেন। আমাদের গ্রামে যাওয়ার তিন মাইল আগে এই গ্রামেই আবুল ফজলের প্রথম শ্বশুর বাড়ি। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন, যিনি উমরতুল ফজল নামে পরিচিত ছিলেন।

২.

একাত্তরের এপ্রিল- মে মাসের দিকেই চট্টগ্রাম শহরে পাক হানাদার বাহিনী বেপরোয়া হয়ে উঠে। পাকিস্তান থেকে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ সোয়াত চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। সেখান থেকে অস্ত্র খালাসে বাধা দিচ্ছে শ্রমিক কর্মচারী ও বাঙালি জনতা। পাক বাহিনী চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বাঙালি কর্মকর্তাদের আটক ও সৈন্যদের উপর হামলা চালানোর খবর জানাজানি হলে শহর বন্দর গ্রাম সর্বত্র প্রতিরোধ লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। আমাদের এলাকার বিভিন্ন গ্রামের যুবকরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ধোপাছড়ি পাহাড়ি অঞ্চল অতিক্রম করে ভারত চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে মালামাল লুট করা হচ্ছে। হিন্দুরা সপরিবারে দলে দলে পালিয়ে যেতে থাকে সীমান্তের দিকে। এ সময় ডায়রিয়া ও অন্যান্য পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেকে মারা যাচ্ছে। তাদের মাটি চাপা দেয়ারও কেউ নাই। সবাই ছুটছে অজানা গন্তব্যে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। আমাদের সেন স্যারের অতিপ্রিয় সেই পুত্র সন্তানটিও পথেই মারা যায়।

এর মধ্যে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যেতে থাকে। ছাত্র যুবকরাও যে যেভাবে পারে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে শুরু করে। আমাদের গ্রামে কাটগড় বিওসি মোড়ে সাতকানিয়া থানা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ক্যাম্প স্থাপন করে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা এবং মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নেবেন তাদের বাছাই ও যোগাযোগ করতে থাকে। বয়স কম হলেও আমি রাজনীতি সচেতন একজন কিশোর অষ্টম শ্রেণিতে থাকার সময় মিছিল মিটিংয়ে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করে আসছি। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানকালীন সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিয়েছি। ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সংশ্লিষ্টতা। তবে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের নেতাদের সাথে ছিল ভালো সম্পর্ক। সবাই আমাকে স্নেহ করতেন। বয়স তখন সাড়ে ১৩ বছর। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাকে নেয়া বা তাদের সাথে ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাই তারা কেউ উৎসাহ দেখালেন না। ‘তোমার বয়স কম, তুমি পারবেনা, এখানেই থাকো- নানাভাবে সাহায্য করতে পারবে’- এরকম বলে অনেকেই সান্ত্বনা দিলেন।

 

শঙ্খ নদের উজানে ধোপাছড়ি রুট হয়ে মূলত দলে দলে লোক চলে যাচ্ছে ভারতে। ইতোমধ্যে খবর পেলাম আমার সহপাঠী আব্দুল মোনাফ, শচীন্দ্র চলে গেছে। আকবর খান, আব্দুল শুক্কুর এরাও যুদ্ধে চলে গেছে। যুদ্ধে যেতে না পেরে মনটা খুবই খারাপ। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে একদিন শুক্রবার বাড়ির মসজিদে আমরা যখন জুমার নামাজ পড়তে যাই তখন প্লেনের বিকট শব্দ শুনে মুসল্লিরা বের হয়ে আসলে আকাশে দেখা মেলে পাক বাহিনীর যুদ্ধবিমানের। মূহূর্তেই পটিয়া এবং আমিরাবাদে বোমাবর্ষণ করে চলে যায় জেটবিমান। উভয়স্থানে হতাহতের খবর পাওয়া যায়। (চলমান)

 

জসীম চৌধুরী সবুজ : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম

অ্যান কারসন : পুরাণ পেরিয়ে মানুষের কাছে

শাহেদ কায়েস ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়ন ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা

 ‘সাড়ে ৭ বছরে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি’

আন্দরকিল্লা ডেক্স : গত সাড়ে ৭ বছরে সারাদেশে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চাঁদপুরের সুপরিচিত প্রতিষ্ঠিত সংগঠন চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি। বিগত পুরো অক্টোবর মাস

কবীর-লালন ভাবসঙ্গীত উৎসবে ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন : ভাঙা ডালের কোষ থেকে জেগে ওঠে সবুজ-সজিব পত্র-পল্লব

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেছেন, তুমুল ঝড়-ঝঞ্ঝায় সবুজ প্রান্তরে সকল বৃক্ষরাজি ধ্বংস হলেও কয়েকটি ডালপালা পড়ে থাকে। ঐ ডালপালাগুলোর মধ্য

যোগেন চৌধুরী : শূন্যতার মর্মবেদ

মইনুদ্দীন খালেদ দুঃসহ অভিজ্ঞতায় অস্তিত্বের প্রদাহে বদলে যায় মানুষের নিত্য-চেনা অবয়ব। ক্ষুরধার একটা অপয়া মুহূর্তের রিরংসায় মানুষ কি অতর্কিতে হয়ে যায় তার আপনজনের হন্তারক! পচনশীল

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির (পূর্ব প্রকাশিতের পর) মামা, আমরাতো তিন দিন আগের থেকেই ওরে খুঁজতেছিলাম। পুলিশ আধা ঘন্টা হইলো ওর লাশ দিয়া গেছে। কইলো পরশুদিন রাইতে