ফরিদ মাহমুদ
[এক]
বিকেলের দিকে সুকুমারের চোখটা লেগে এসেছিল, কথাগুলো তার কানে লাগলো| একজন বলল, লোকটার কেউ নেই? সবসময় দেখি সিঁড়ির নিচে অন্ধকারে শুয়ে থাকে| হোমলেস নাকি?
বহুতল এই ভবনটি শহরের ব্যস্ততম সড়কের সাথে লাগানো| কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সন্ধ্যার পর এখানটায় ভিড় জমায়,আড্ডা দেয়| কিছু হকার বসে ফুটপাত ঘেঁষে| হোমলেস আসলে কি, সুকুমার এটা বোঝে না| সে মনস্থির করল, সানিম এর কাছ থেকে মানেটা জেনে নিবে|
সবিতার বাড়ি আসকার দিঘির পশ্চিম পাড়| সবিতার বাবার ছিল লেপ-তোশকের কারবার| খাঁটি শিমুল তুলা,উন্নত মানের কাপড়,যত্ন করে বানানোর জন্য পুরাতন বিমান অফিস সড়কে তাদের দোকানটি শহরবাসীর কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠে|
এদিকে মওলানা মোহাম্মদ আলী সড়কে প্রসিদ্ধ শালকরটি ছিল সুকুমারের| শালকরে গ্রাহকরা সুতি,পলিস্টার, টেট্রন, জামদানি, সিল্কের মতো দামি কাপড় দেয়| কাপড়ের দাগ তোলা, পরিমাণ মতো মাড় দেওয়া, সঠিক ভাঁজে আয়রন করা, সময়মতো ডেলিভারি দেওয়ার কারণে গ্রাহকদের কাছ থেকে সুনাম কুড়াতে তার বেশিদিন লাগেনি|
এশিয়ান হাইওয়ের এই অংশটি ঠিক যেন আঁকাবাঁকা সুতার মতো রূপ নিয়েছে| রাস্তার দুই দিকে দুইটি দিঘি| দিঘিগুলো ঘিরে ছিল কয়েকটি ধুপি পরিবার| পুর্ব দিকের দিঘিটির নাম ভাগ্য দিঘি| এটি ছিল ধুপিদের রুটিরুজির কেন্দ্রবিন্দু| বিশাল দিঘির প্রতিটি কোণায় একটি করে বড় শিলপাথরের ঘাটলা| ঘাটলার সাথে লাগোয়া তিনটি পোড়া মাটির গামলা বসানো| ঠিক যেন জলে ফোটা পদ্ম|
একেকটি পরিবারের কাপড় ধোয়ার জন্য ছিল আলাদা ব্যবস্থা| দিঘির পুর্ব ও দক্ষিণ দিকে খোলা মাঠ| পূর্বদিকের মাঠে কয়েক সারি বাঁশের খুঁটি লাগানো| সেখানে দড়ি টেনে কাপড় শুকানো হয়| শুকনো কাপড়ের একটা গন্ধ বাতাসে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে| সেই গন্ধ যেন ধুপিদের অস্থিমজ্জা, চিন্তা চেতনা এবং মননে গেঁথে গেছে|দক্ষিণ দিকে মাঠটিতে বিকালে তরুণেরা ফুটবল খেলে| রাস্তার পশ্চিম দিকের দিঘিটির নাম “ধুপির দিঘি”| দিঘিটি পাঁচ পরিবারের এজমালি সম্পত্তি|দিঘির চারপাশে ধুপিদের তিন পুরুষের ভিটেমাটি|
[দুই]
শ্বশুরবাড়ি থেকে সবিতাকে সে নিতে এসেছিল| জনমানবশূন্য বিস্তীর্ণ এলাকা| একটি বাড়ি থেকে আরেকটি বাড়ি খানিকটা দূরে| মূল সড়কের পিচঢালা পথে দাঁড়ালে দুর থেকে তার বাড়ির আঙিনা, গাছপালা, দেখা যায়| সার্কিট হাউসের সুউচ্চ ভবনের ছাদে লাল রঙের সিরামিকের টালি, চারিদিকে সবুজ গাছ, ফুলের বাগান| পাইনিয়ার হিলের চূড়ায় প্রোভিশনাল ক্লাব|
বিশাল এলাকাজুড়ে স্টেডিয়াম নির্মাণে মাটি ভরাটের কাজ চলছে| ভরাট অংশের সমান জায়গায় কারিগরেরা তোশক, নারকেলের ছোবড়া, ফোমের গদি রোদে শুকাচ্ছে| এর পেছনের দিকে সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং| যেখানটায় আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর| সুকুমার মনে মনে ভাবলো সবিতাকে নিয়ে একবার ট্রেন যোগে আসাম হয়ে কলকাতা বেড়াতে যাবে|
কেশব এসময় উঠানে অপেক্ষা করছিল|কাকার সাথে দেখা হতেই তার পা ছুঁয়ে সে কদমবুচি করল|
সুকুমার জিজ্ঞেস করল, কিরে কবে এসেছিস? পড়াশুনা চলছে ঠিকমতো?
কেশব বলল, এসেছি দুদিন আগে| আজ্ঞে চলছে|
কাকাবাবু,তুমি বাবাকে বুঝিয়ে বলো| তারা যেন আমার সাথে ওপারে চলে যায়| এদিককার অবস্থা মোটেও ভালো না| সরকার মহাশয় গুটিয়ে যেতে পারে|
কেশবের কথার মানে সে কিছুই বুঝতে পারল না|
কেশব বলল,ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হচ্ছে| চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন,জালালাবাদ যুদ্ধ,ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ হল| এরপরে সমগ্র ভারতে চলছে যুদ্ধ| পতেঙ্গায় বোমাবর্ষণ হয়েছে| এ বছর কলকাতা, ত্রিপুরা, নোয়াখালিসহ ভারতজুড়ে দাঙ্গায় কতো লোক মরলো!
এইবার সুকুমার বুঝতে পারল, কেশব ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন,সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের কথা বলছে|
কেশব বলল, দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ দ্বিখন্ডিত হয়ে যাবে| তার চোখেমুখে উৎকন্ঠা|
সুকুমার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,ঠিক আছে আমি বড়দার সাথে কথা বলবো|
পরদিন বড় দাদার সাথে সুকুমারের দেখা হল| সে বলল,ছেলেটা যখন চাইছে,তোমরা তার সাথে যাওনা কেন? ছেলেটা একা একা কলকাতায় থাকে| বাড়ি আসতে তাকে কতটা পথ পাড়ি দিতে হয়|
সে বলল, মেয়েটার কথা ভাবছি| ডা. খাস্তগীর স্কুলের মতো ভালো স্কুল থেকে নামিয়ে তাকে কোথার ভর্তি করবো?
সুকুমার বলল, কেশবের কলেজের পাশেই কোথাও করলে|
সে বিড়বিড় করে নিজে নিজে কি যেন বলল,তারপর নিরাশ ভঙ্গিতে হেঁটে চলে গেল| দাদার কথার কিছুই সে বুঝতে পারলো না|
১৯৪৬ সালের ডিসে¤^র মাসে বড়দা পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে গেল|
১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান নামে দুইটি ভিন্ন রাষ্ট্রের জন্ম হল|
দেশভাগের পরে অনেক হিন্দু পরিবার ভারতে চলে গেল| মুসলমানরা চলে এলো পাকিস্তানে|বড়দা চলে যাওয়ার সময় তার বসতভিটার কাগজপত্র উকিল মোতাহার হোসেনকে দিয়ে যান|যাওয়ার আগের দিন সে সবাইকে ডেকে বলল,বিপদে আপদে উকিল সাহেব তোমাদের মাথার উপরে ছায়া হয়ে থাকবে|
“দেশভাগে কার ক্ষতি কার লাভ”এই নিয়ে তার ভাববার সময় নেই|তার ঘরে এসেছে নতুন অতিথি|সবিতার কোল জুড়ে এসেছে ফুটফুটে একটা পুত্র সন্তান|
[তিন]
এই জেলাটি পাহাড়, নদী,সাগর বেষ্টিত| খুব একটা বসতি এখনো গড়ে উঠেনি| পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সদর দপ্তরকে ঘিরে কিছু বাংলো বাড়ি, কিছু স্টাফ কোয়ার্টার এবং পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কর্তৃপক্ষের উন্নয়ন কাজ চলছে| রেলওয়ের কয়েকটি ওয়ার্কশপ এখানটায় গড়ে উঠেছে| পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মাটি সমান করে গাড়ি চলাচলের রাস্তা করা হয়েছে| রাস্তাগুলো অলস পড়ে থাকে| অনেকক্ষণ পর পর একটা গাড়ির দেখা মেলে| সিআরবি রাস্তাটি পাহাড়ের উপরে এবং নিচ দিয়ে চলে গেছে| মাঝখানে পাহাড়ের ভাঁজ| রাস্তাটি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়| পাহাড়গুলোতে ঘন জঙ্গল| জঙ্গলে মাঝে মাঝে বাঘ চলাচল করে| এজন্য সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে টাইগার পাস|
হাজার বছরের পুরানো সমুদ্র বন্দর ঘিরে আগ্রাবাদ, জুবিলি রোড, আন্দরকিল্লা, আসাদগঞ্জ, খাতুনগঞ্জের মতো বাণিজ্যিক এলাকাগুলো ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় সরগরম| গুজরাট, লাহোর, করাচি থেকে কিছু বোহরা সম্প্রদায় এনায়েত বাজার, জামাল খান রোডে বসতি স্থাপন করে জেলার ব্যবসা প্রসারে ভূমিকা রাখছে| দেশভাগের পর বিপুল সংখ্যক বিহারি সম্প্রদায়ের আগমন ঘটেছে| তাদের অধিকাংশই কৃষ্ণবর্ণের| ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তারা পাহাড়তলীতে বসবাস করে| তারা কিছু এসেছে ভারতের বিহার রাজ্য ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে| যারা মুসলিম,তারা এসেছে পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও পশতুন থেকে| এদের বেশির ভাগ শ্রমজীবী মানুষ| এখানকার স্থানীয় মানুষগুলো প্রাকৃতিকভাবে আরামপ্রিয়| তারা কায়িক পরিশ্রম করতে চায় না| বিহারিদের আগমনে শ্রমজীবি মানুষের ঘাটতিটা ঘুঁচে গেল|
উকিল সাহেব একদিন সন্ধ্যেবেলায় মন্দিরের আঙিনায় চার পরিবারের মাথাদের নিয়ে ˆবঠকে করল| মোতাহের হোসেন বলল, ভূমি জরিপ চলছে| তোমাদের ভূমির এস এ জরিপ করে নাও|
সুকুমার,সজল দুই ভাই ও দুই কাকাতো ভাই সুবল দাশ,শঙ্কর দাশসহ সকলে মনোযোগ সহকারে কথাটি শুনলো|
সুবল বলল,আপনি আইনের লোক| সবার মঙ্গলের জন্য যা করবেন,আপনার মতোই আমাদের মত|
কথাগুলো বলে সে সবার উদ্দেশ্যে উচ্চঃ¯ৈ^রে বলল,কি বলিস তোরা?
সবাই সম¯^রে বলল, আজ্ঞে ঠিক বলেছে|
উকিল সাহেব বলল,আমার একটা আবদার আছে|
শঙ্কর উৎসাহ নিয়ে বলল,আজ্ঞে বলুন|
উকিল সাহেব বলল,তোমাদের যদি আপত্তি না থাকে আমার জমিটা আমি সজলের সাথে এওয়াজ বদল করতে চাই| সজলের ঘরটা আমার জমিতে,আমার ঘরটা সজলের ঘরের জমিতে করতে চাই| তাহলে সবার জমির ভূমি জরিপ এবং দলিদপত্র সংক্রান্ত সব কাজ আমি নিজ দায়িত্বে ও নিজ খরচে করে দেব|
তার এই প্রস্তাব শুনে তারা একে অন্যের দিকে চোখে চোখ রেখে সবার অন্তরের ভাষাটা বোঝার চেষ্টা করল|
উকিল সাহেব খানিকটা চুপ থেকে বলল,আমি সামনের দিকে থাকলে তাতে তোমাদেরই লাভ| ঝুট-ঝামেলা,
দাঙ্গা-ফ্যাসাদে বাইরের লোকে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না| তখন আমাকে ডিঙিয়েই ভেতরে প্রবেশ করতে হবে| তোমরা বিষয়টা ভেবে দেখো| তাছাড়া সজলের ঘর স্থানান্তরের খরচটাও আমি দিয়ে দিব|
একদিন রাতের বেলা মেজদাদা তার বাসায় এসে বলল,রাস্তা থেকে আমার বাড়ির ভেতরটা দেখা যায়| এতে বাড়ির বউ-ঝি চলাফেরা করতে সমস্যা হয়| আশেপাশে অনেক জমি খালি পড়ে আছে, থাকার মানুষ নেই| উকিল সাহেব যখন এতো করে বলল,তখন আমি আর অমত করলাম না| তাকে আমি সম্মতি দিয়ে এসেছি|
মাসখানেক পরে ভূমি জরিপ ও এওয়াজ বদলের দলিলপত্র সম্পন্ন করার জন্য উকিল সাহেব সবার টিপসই নিল|
[চার]
১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে পাক-ভারত যুদ্ধ লেগে গেল| বড় কাকার দুই ছেলে খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল| যদিও পুর্বদিকে তখনো যুদ্ধের দামামা বাজেনি| এদিকটার পরিবেশ ছিল একেবারেই শান্ত| তারা দুজন সপরিবারে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় থিতু হল| যাওয়ার সময় মো. জাহাঙ্গীর আলম নামক এক ব্যক্তির কাছে নামমাত্র মুল্যে তাদের ভিটেগুলো বিক্রি করে দিল|
উচুঁ পাহাড়ের নিচের সমান এই জমিটিতে তার পুর্ব পুরুষদের ভিটে| ভিটের দক্ষিণ দিকে একটি পাকা সরু রাস্তা| সামনের দিকটায় অনেকটা জায়গা জুড়ে খাদ|বর্ষাকালে পাহাড়ে নদীর গ্রোতের মতো ঢল নামে|
সেই ঢল খাদ বেয়ে ধেয়ে চলে| খাদের সামনের দিকে প্রশস্ত মূল সড়ক| পূর্বকোণে চৌরাস্তার মোড়| উত্তর দিকটায় পাহাড়ের উপরে পুলিশ লাইন| পুলিশ লাইনের ভেতরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলে যে কোনো লোক বিমোহিত হয়ে যাবে| সবচেয়ে উচু পাহাড়টিতে অস্ত্রাগার|সমান্তরাল উচ্চতায় একটা ল¤^া ব্যারাক| প্রবেশ পথের বাঁক পেরুলে পুলিশ হাসপাতাল| অস্ত্রাগার,ব্যারাক,হাসপাতালের মাঝখানটায় ছোট ছোট কয়েকটি কটেজ| কটেজগুলোতে সিনিয়র অফিসারদের কার্যালয়| অস্ত্রাগারের উত্তর দিকে সারিবদ্ধ মেসঘর|যেখানে পুলিশ কনেস্টবল ও অফিসারদের জন্য রয়েছে খাবারের ব্যবস্থা| উত্তরে অনেকটা জায়গা পেরিয়ে চাঁনমারি মাঠ|ওখানে চলে পুলিশের শুটিং অনুশীলন|
তার শালকরে পা পড়েছে জেলার পুলিশ সুপার ও ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার| ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার তাকে একটি সনদ দিয়েছে| সনদটি বাঁধাই করে সে শালকরে টানিয়ে রেখেছে| একাত্তরের মার্চ মাসের শুরু থেকে তার শালকরটি বন্ধ| পরিস্থিতি কোনদিকে গড়াচ্ছে ধারণা করাটা দুরূহ ব্যাপার| নির্বাচনের সময় শহরে হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে| গত কয়েকদিনে এই এলাকায় বিহারি বাঙালি হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে| মেজদা তার দুই ছেলে নিয়ে ভয়ে কুন্ঠিত হয়ে গেল| সে ওপারে চলে যেতে তোড়জোড় করলে তার তেজোদীপ্ত দুই ছেলে স্পষ্ট জানিয়ে দিল,তারা দেশ ছেড়ে কোথাও যাবে না| সুকুমারও তার একমাত্র ছেলে দেবাশিষকে নিয়ে বিপাকে পড়ল|
এদিকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে সোয়াত জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে|কিন্তু বাঙালি মুক্তিকামী জনতা অস্ত্র খালাসে বাঁধা দিল| এ নিয়ে উত্তেজনা চরমে| পল্টন রোড এবং এম আর সিদ্দিকী বাংলোয় দফায় দফায় মিটিং চলছে| ৩ না¤^ার জেটির পাশে নিউমুরিং কলোনির মাঠে সভা করে জনতার মিছিল ১ না¤^ার জেটিতে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে|জনতার প্রতিরোধ অব্যাহত আছে|
২৫ শে মার্চ কালো রাত্রিতে পাক হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট নামে ঢাকায় গণহত্যা শুরু করলে চট্টগ্রাম ছিল মুক্তিকামী জনতার প্রতিরোধের স্থল| কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ¯^াধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়|সেনাবাহিনী ও ইপিআর এর কয়েকজন বাঙালি অফিসার বিদ্রোহ করে প্রতিরোধ গড়ে তুললো| যে কারণে পাক বাহিনী বিদ্রোহী বাঙালি সামরিক-আধা সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর অফিসারদের উপরে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে প্রত্যাঘাত করার প্রস্তুতি নিল|
২৮ মার্চ ভোরে আশপাশটা বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে|শেলের আঘাতে ভিটেমাটিসহ কাঁপছে|থেমে থেমে মর্টারের গর্জন| মাঝে মাঝে দূর থেকে আর্তনাদ ও গোঙানির শব্দ শোনা গেল| কখনো একটানা আবার কখনো থেমে থেমে গুলির শব্দ হচ্ছে| আকাশে আগুনের ফুলকি দ্রুতবেগে ছুটে চলে আবার নিমেষেই মিলিয়ে যাচ্ছে| ক্ষণে ক্ষণে আগুনের কুন্ডলি পাকিয়ে প্রচন্ড ধোঁয়া রাতের আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে|সবিতা ও দেবাশিষ হঠাৎ ঘুম ভেঙে ভয়ে কুকঁড়ে গেছে| সুকুমার ফিসফিস করে তাদের বলল,এক্ষুণি এখান থেকে সরে যেতে হবে| দরজা খুলে পশ্চিম দিকে সরু গলি দিয়ে বেরিয়ে ঘন অন্ধকারে পাহাড়, রেল লাইন, সড়কপথ মাড়িয়ে জেলে পাড়ায় এসে এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিল|
গভীর উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও দুশ্চিন্তায় দিনটি অতিবাহিত হল| সন্ধ্যার পরে গ্রামবাসীর মুখে মুখে দুঃসংবাদটি ছড়িয়ে পড়ল| উপকূল দিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর ˆসন্যদল ইপিআর ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হচ্ছে| ক্যাম্পটি জেলে পাড়া থেকে খুব কাছে| এটির নিয়ন্ত্রণ এখন বাঙালি অফিসারদের হাতে| রাতের দিকে গোলাবর্ষণ শুরু হল| বিকট শব্দে একেকটি বিস্ফোরণ| জেলেপাড়ার ঘরগুলোতে হারিকেন ও কুপির আলো জ্বলছিল| মুহূর্তের মধ্যে সব আলো নিভে গেল| সমগ্র এলাকায় নীরবতা নেমে এলো| এসময় ঘরের সব দরজা জানালা বন্ধ করে তারা যে যার মতো করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল| এবার দুই দিক থেকে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেল| থেমে থেমে গুলি| কখনো মর্টার, কখনো সেলের শব্দ| সুকুমার মনে মনে ভাবল,এ যেন বাঘের মুখ থেকে ফিরে এসে সিংহের মুখে পড়ল| এবার ঝাঁকে ঝাঁকে গুলির শব্দ হচ্ছে| মনে হচ্ছে মাটির ঘরের বিভাজন,দরজা ও জানালা ভেদ করে অসংখ্য গুলি এসে শরীরে লাগবে|
দুইদিন পরে চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল| ৩১ মার্চ সকাল বেলা খবরাখবর জানতে তার বন্ধুটা ঘরের বাইরে গিয়েছিল|রাতে ফিরে এসে সে বলল,বাঙালি ˆসনিকেরা বীরত্বের সাথে লড়েছে|গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাবার পরে তারা কিছুটা পিছু হটে নাথপাড়ার দিকে সরে গিয়েছিল|কতক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,শওকত জল্লাদ ও বিহারিরা মিলে ৪০ জন ইপিআর এবং ৩৯ জন নিরস্ত্র বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যা করল|এ কথাগুলো বলে সে অঝোরে কাঁদতে লাগল|
সুকুমার সারারাত নির্ঘুম কাটালো| সে মনস্থির করল,তার যদি মরতেই হয় তবে সে তার ভিটেমাটিতেই মরবে| স্ত্রী-পুত্র নিয়ে ভোর বেলায় সে চুপিসারে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল| ঘুম থেকে জেগে উঠে সে দেখল, চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার| তার স্পষ্ট মনে আছে,তার শরীরের কোথাও আঘাত লাগেনি| তবে তার এমন লাগছে কেন? নিচু ¯^রে সে দেবাশিষের মা,দেবাশিষের মা,বলে ডাকলো|
সবিতা বলল,আজ্ঞে বলুন|
-এতো অন্ধকার কেন?
সবিতা বলল,ঘরে কেরোসিন নেই|
এবার কিছুটা ¯^স্তির নিশ্বাস ফেলে শিশিটা হাতে নিয়ে সে কোরবান আলীর দোকানে গেল| গলির মুখে কোরবান আলীর পান-বিড়ির দোকান| সে রেশনের খুচরা কিছু কেরোসিনও বিক্রি করে| কোরবান আলীর সাথে দেখা হওয়ার পরে সে জিজ্ঞেস করল,এ কয়দিন কোথায় ছিলে?
-কাট্টলিতে| এক বন্ধুর বাড়িতে|
কোরবান আলী বলল,পুলিশ লাইন আক্রমণের পরে সমস্ত এলাকা খালি হয়ে গেছে| সে ফিসফিস করে বলল,৫১ জন পুলিশকে গুলি করে মেরে ফেলল| লাশগুলো সব ব্যারাকের পশ্চিমে ল¤^া গর্ত করে গণকবর দিয়েছে|
নির্বিচারে মানুষ হত্যার কথা শুনে তার মনটা খুব বিষিয়ে ওঠলো| কেরোসিন নিয়ে সে ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল|
[পাঁচ]
এপ্রিলের শেষে রামগড়ের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে মোজদা পরিবার নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করল| তার বড় ছেলে পরেশ পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে যোগ দিল| দেবাশীষকে কোনোভাবেই ঠেকানো গেল না| সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিল| দেশে নির্বিবাদে গণহত্যা চলছে| সমানে চলছে লুটতরাজ| পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ঘরবাড়ি, লোকালয়| বিদ্রোহী সেনা,পুলিশ,প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশবিক কায়দায় হত্যা করে ছিন্নভিন্ন লাশ শহর প্রদক্ষিণ করে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো হল| পুলিশের ওসি খালেককে হাত পা বেঁধে হত্যা করে জিপের পেছনে টেনে হ্যাঁচড়ে, এক পর্যায়ে জিপে দড়ি দিয়ে বেঁধে দুই জিপে টেনে তার লাশ নিষ্ঠুরভাবে দ্বিখন্ডিত করে ফেলল| রেহাই পেল না বেসামরিক লোকজন, ছাত্রজনতা| পাক সেনারা আলী ইমাম নামের একজন ব্যাংক কর্মকর্তা,দুজন ছাত্র,একজন হিন্দু ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করল| তাদের দেহগুলো বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বুট জুতো দিয়ে ঠেলে ঠেলে একে একে বড় নর্দমায় ফেলে দিল| এর কয়েকদিন পরে এক ট্রাক লাশ চৌরাস্তার পশ্চিম পাশে খাদের মধ্যে ফেলল| কাজ শেষে পাকসেনারা দুটি জিপ যোগে দ্রুতবেগে চলে গেল|চারপাশে লাশের স্তুপ,সারাদেশে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পচাঁগলা বিভৎস সব লাশ!
দেশ ¯^াধীন হওয়ার পরে চারিদিকে বিধ্বস্ত অবস্থা|
খাদ্য ও বাসস্থানের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে| উদ্বাস্তু মানুষগুলো রাস্তার ধারে,বাড়ির আঙিনা, খোলা মাঠে মাথা গোঁজার চেষ্টা করল| কয়েকটি পরিবার তার বাড়ির সম্মুখভাগ ও উত্তর দিকে আশ্রয় নিল|
সবিতা পুত্র শোকে কাতর| যুদ্ধের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও দেবাশিষ আজো ফিরেনি| কোথাও তার হদিস পাওয়া যায়নি| সারাদেশে লাখ লাখ মানুষ এখনো নিখোঁজ| কিন্তু মায়ের মন কি বোঝে?
কাকার ছেলেদের জমি কেনা সেই জাহাঙ্গীর আলম
কয়েকবছর পলাতক থেকে সাম্প্রতিক দেশে ফিরে বাড়ি বানানোর কাজে হাত দিল|
ধুপির দিঘির পাড়ে কয়েকটি সেমিপাকা ঘর উঠেছে| এজন্য দিঘির অনেকটাই ভরাট গেছে| তারা জমি কিনেছে উকিল সাহেব থেকে| সুকুমারের মনে একটু খটকা লাগলো| দিঘিটি ছিল এজমালি সম্পত্তি| কিন্তু দিঘিটি বিক্রিযোগ্য নয়! এসব নিয়ে ভেবে কি লাভ? সবিতা চলে গেল,সম্পদ নিয়ে এখন সে আর কি করবে?
এক শ্রেণির লোকের হাতে এখন প্রচুর টাকা| মূল সড়কের পশ্চিম দিকের খাদটি ছিল,সরকারি খাস জমি| ¯^াধীনতার পরে সেখানে কয়েকটি অস্থায়ী দোকান ছিল|
বর্তমানে সেখান মার্কেট,আবাসিক ভবন,আবাসিক হোটেল,বাণিজ্যিক ভবন উঠে পুরো জায়গাটি জমজমাট হয়ে গেছে| তার বাপ দাদার বাড়িটি ঢাকা পড়ে গেছে|
ধুপির দিঘিটি পুকুর আকারে কিছুদিন বেঁচে ছিল| উকিল সাহেব এটিকে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করে দিয়েছে| মেজদার পুরানো ভিটেই উকিল সাহেব নতুন দালান করেছে| আবার এওয়াজ বদল করা মেজদার জমিটাও সে বিক্রি করে দিয়েছে|
দিনের আলোটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে|
এই বয়সেও তার দৃষ্টিশক্তিটা দুর্বল হয়নি| অনেক দূরের দৃশ্য এখনো সে আগের মতো দেখতে পায়| একটা সময় এখান থেকে তাকালে নুর আহমেদ সড়কের বিমান অফিস পর্যন্ত দেখা যেত| এখন সেই খোলা প্রান্তর নেই| নেই সেই খেলার মাঠ| দালান-কোঠায় ভরে গেছে সব| নেই সেই ভাগ্য দিঘি| সেই জায়গার শহরের সবচেয়ে বড় মসজিদ নির্মিত হয়েছে| খেলার মাঠটিতে ফ্লোর পাকা করে করা হয়েছে ঈদগাহ| শুধু তাই নয়,বাড়ির মাঝখানে যে ধুপির দিঘি ছিল,আজ তার কোনো অস্তিত্ব নেই!
মার্কেটের মালিকের ছেলে সানিমের মনটা আজ ফুরফুরে|সে এসে সুকুমারকে বলল,বড়দার শরীরটা আজ খারাপ নাকি? এমন মনমরা হয়ে বসে আছো কেন?
সুকুমার বলল,আজ চোখটা ভারী ভারী লাগছে| কয়েকদিন ভালো ঘুম হয়নি| তোমার কাছে একটা কথা জানার ছিল|
সে উৎসুক ভঙ্গিতে বলল,কি? বলো, বলো!
-হোমলেস কি?
-এ কথা তোমাকে কে বলল? তার পাল্টা প্রশ্ন|
আমাকে বলেনি| কয়েকটা ছেলে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল|
-ও তাই বলো| আজকালকাল ছেলেমেয়েরা কোনো কিছু মিন করে বলে না| পথে ঘাটে পড়ে থাকে,কাপড়-চোপড়, খাওয়া দাওয়ার ঠিক নাই এমন মানুষগুলোকে বলে হোমলেস| হোমলেস মানে গৃহহীন| ঘরছাড়া|
রাতে মেঘ ডেকে বৃষ্টি নামলো| বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা তার মুখে এসে পড়ল| মানুষের জীবনটা ক্ষণিকের| এই জীবনে সে ব্রিটিশ আমল,পাকিস্তান আমল,বাংলাদেশ শাসনামল দেখেছে| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ,পাক-ভারত ও বাংলাদেশ-পাকিস্তানের যুদ্ধ দেখেছে|তার চোখের সামনে জীবনে কত কিছুই না ঘটে গেল!জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে ঘর দিয়ে তার কি হবে? ফেলে আসা দিনগুলোতে তার এক জীবনের স্মৃতি!
এই পৃথিবীর মানুষের চার দেয়ালের ভেতরের যে ঘর,তার এই চোখ,এই মন,সেই ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে ভিন্ন এক বিশাল ঘরে বাসা বেঁধেছে,সেই কত বছর আগে!
ফরিদ মাহমুদ, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার




