এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

দুপুর রঙের বৃষ্টি

রাজ কুমার শেখ

আজ কলেজে থাকতে ভালো লাগছে না। নাজের পড়া মাথায় উঠেছে। কদিন যা গেছে ওর ওপর দিয়ে।  এখনো ও মনে শান্তি পাচ্ছে না।  আলি মির্জা সাহেব। ওর চোখ খুলে দিয়েছেন। ওর মায়ের খোঁজ নোরিন ফুপুই দিতে পারবেন। নাজ সেদিন সকালে জিগ্যেস করে, ফুপু,  মায়ের খোঁজ কি তুমি সত্যিই জানো না?  না আমাকে বলতে চাও না? কেন?

বেটি, ও সব জপনে তোর লাভ কি? আমি তোর সব।

আমি মাকে চাই ফুপু।

বেশ অবাক হোন নাজের এমন কথা শুনে। মুখে কিছু বলেন না। নাজ চিঠিগুলোর কথা বলে। কিন্তু নোরিন ফুপু কোনো  উত্তর দেন না। নাজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। পাথরের মতো বসে থাকেন নোরিন ফুপু। এমন একদিন যে হবে তা তিনি জানতেন। নাজকে সে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে। কিন্তু সত্যি তার মায়ের কথা ও কখনো বলতে চাননি। তিন সারা জীবন ধরে কত কী–ই মুখ বন্ধ করে থেকেছেন। আজ সব বলে দিতে ইচ্ছে করে। নাজকে দেখে তার মায়া হয়। মা হারা একটি মেয়ে। কষ্ট কি তারও হয়না?হয়। কিন্তু সব কথা বলতে পারেন না। তিনি চুপ করে বসে থাকেন।

নাজ মিনাকে নিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে পড়ে। রোদ পড়ে গাছের পাতাগুলো চকচক করছে। যেন রোদ পিছলে পড়ে যাচ্ছে।  নাজ দেখছিল গাছ গুলোকে। কত পাশাপাশি ওরা আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। বীজ পড়ে আরও সব ছোট ছোটো চারা গজিয়েছে। ওরাও তার মায়ের পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।  নাজের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।  হাহাকার করে ওঠে ওর মন। মিনা কিছু বলে না। ও জানে নাজের কষ্টটা কোথায়। মিনা আলতো করে হাত রাখে ওর পিঠে। নাজকে শান্ত হতে বলে।

ওরা এগিয়ে যায়। রোদের আঁকিবুঁকি এঁকে দিয়েছে রাস্তাতে। গাছের ছায়া। পাতা গুলোর সবুজ গন্ধ। রমির কথা বলে মিনা। নাজ ওকে ডাকতে বারণ করে। নাজের কিছুই ভালো লাগছে না। ওরা খানিকটা এলোমেলো হাঁটে। কোথাও যেন মন লাগছে না। নাজ বলে, চল মিনা তোর বাড়ি যাই। আজ থাকবো তোর ওখানে। হাতে অনেক সময় আছে।

এ তো খুব ভালো কথা। দারুণ জমবে। আজ রাতে গল্প করবো। কত দিন তুই যাস না। চল বাস ধরি।

 

ওরা যখন ভাবতাতে নামলো বাস থেকে তখন বেলা মরে এসেছে। নরম কমলা রঙা রোদটা খুব মিষ্টি লাগছে। নাজের মনটা এখন হালকা লাগছে। ফুরফুরে বাতাসে নাজের রেশমঘন চুল উড়ছে। ও হাত দিয়ে ঠিক করছে না। ওরা মাটির রাস্তাতে এসে পড়লো। বিল থেকে এক ঝাঁক শফেদ বক উড়ে গেল। টলটল কীসে জল। মাঠঘাট সবুজে ঢেকে। বুক ভরে বাতাস নেওয়া যায়। বক গুলোর ডানার জল ঝরে পড়লো ওদের গায়ে। নাজ ওদের উড়ে যাওয়া দেখে। গভীর নীলাকাশে ওরা এক সময় মিলিয়ে গেল। সত্যিই মিনাদের এই জায়গাটা খুব সুন্দর। এখানে এসে ও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। ভেতরের কথাগুলো আলগা করে দিতে পারে। জীবনের এত বাঁক! ও নিতে পারে না। জীবনটা সহজ নয়। অনেক গলি। অনেক কাদা। তবু তো এগিয়ে যেতে হয়।

কি ভাবছিস?

কিছু না।

রমি এলে ভালো হতো বল? বেশ আড্ডা দেওয়া যেত।

ও তো এসেই বলবে তাড়া আছে। ওর কাজ আর কাজ। ছুটি নেই। কি করবো বল?

হুম। আজ এলি ভালো করলি। আমার ভালো লাগে না। একা একা ভালো লাগে বল?

কেন সেই যে আছে না? তাকে ডাকলেই তো পারিস।

তোর মুখে কিছু কি আটকায় না? শুধু বকর বকর। যা।

রাগ করলি মুনু?

রাগ কেন করবো বল? আমি এমনিই।

জানি বাবা জানি। অত আর বলতে হবে না।

নাজ হাসে। কমলারঙা রোদটুকু বিলের জলে পড়ে কেমন মায়াবী ছড়িয়ে দিয়েছে। নাজ গায়ে মাখছে রোদ। এমন আলোতে ওর মিশে যেত ইচ্ছে করে কখনো কখনো। ওর ডানা থাকলে উড়ে যেত। ওই বকগুলোর সাথে। আজ ওর মন করছে হারিয়ে যেতে। আর সে ফিরতে চায় না। হাঁপিয়ে উঠেছে ও। কেমন লাগে চারপাশ। সব বদলে যাচ্ছে। এ সব আর ভালো লাগে না। ও সত্যিই কোথাও চলে যাবে। ওর কোনো ঠিকানা নেই।  মুক্ত পাখির মতো উড়ে যাবে দূর অজানা দেশে। কেউ তো নেই তার। নোরিন ফুপু যদি বলে দিত সব কথা। তাহলে সে সত্যিটা মেনে নিত। জানতো সে এই পৃথিবীতে একা। মাথার ওপর কেউ নেই।  প্রতিটি মানুষেরই ঠিকানা থাকে। ঘর থাকে। জীবনের মানে থাকে। কিন্তু তার জীবন? ওই বিলের বক গুলোরও একটা ঠিকানা আছে। আর নাজের?

না ও আর ভাবতে পারছে না। মিনা কিছুটা এগিয়ে গেছে। ধুলো রাস্তা।  দুপাশে কাঁটার ঝোপঝাড়। তা থেকে কেমন একটা গন্ধ ভেসে আসছে। রাস্তার ঢালু নেমে মিশে গেছে বিলের সঙ্গে।  অনেক বালি হাঁসও চড়ছে। ওদের ডাক শোনা যাচ্ছে।  কলমিলতা বাতাসে দুলছে। জলজ গন্ধ বাতাসে। নাজ এ সব দেখতে দেখতে হাঁটছে। মিনা ওকে ডাকে, কি রে নাজ, জকদি আয়? আমার খুব খিদে পেয়েছে।

তোর শুধু খিদে খিদে।

নাজ বলে কথাটা।

পাবে না?  সেই কোন সকালে খেয়ছি।

আসছি।

নাজ পা চালায়। কিন্তু ওর পা সরে না। আবার আটকে যায় ভাবনায়। ওর ভাবনার শেষ নেই। একটু মনটা ঠিক করবে বলে মিনার কাছে আসা। কিন্তু এখানে তাকে ভাবনায় পেয়ে বসছে। একা থাকলেই মানুষকে ভাবনার জালে ঘিরে ধরে। জাল ছিঁড়ে আর বের হতে পারে না। ভাবনা একটু একটু করে গিলে নেয়।  মানুষের মৃত্যুও হয়তো ঘটে যেতে পারে।

ভাবে নাজ।

আর বেশি রোদ নেই। বেলা মরে এসেছে। মেন রাস্তা থেকে মিনাদের বাড়িটা একটু ভেতরে। খুব বেশি মানুষের বাস নেই এদিকটায়। চাষের জমি। বিল। নালা। আর গাছের সারি। সবুজ হয়ে আছে চারপাশ। নাজ এখান থেকে যাবে। আর যাবে না ও। কিন্তু মিনার কাছে কি সারা জীবন থাকা যায়? কেমন সব ছেলেমানুষী ভাবনাতে ওকে পেয়ে বসে। ওর হাসি পায়।

অকারণ হাসলে আবার মিনা যদি ওকে পাগল ভাবে! তবু হাসি চেপে রাখতে পারে না। প্রাণ খুলে হাসে। কতদিন পর সে এমন করে হাসলো। মিনা হঠাৎ নাজের হাসি শুনে ও থমকে দাঁড়ায়। ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাই।

কিরে — কি হল? এমন পাগলের মতো হাসছিস?

এমনি।

না অন্য কিছু?

তোর সবতে বলা চায়? কি ভাবিস?

তুই হাসছিস। কেন হঠাৎ হাসছিস তা জিগ্যেস করবো না? একটা যা তা।

মিনা রাগ দেখিয়ে বলে।

আরে মিনু, হাসলে মন ভালো হয়।

তা বুঝলাম। কিন্তু!

কোনও কিন্তু না। তুইও হাসনা কেনে।

ধুস পাগল!

তা তো বলবিই।

 

ওরা যখন বাড়ি পৌঁছালো তখন সূর্য ডুবে গেছে। নাজ এসেই মিনার শোবার ঘরে নিজেকে এলিয়ে দেয়। খোলা জানালা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া আসছে। মনে নার কথা বলে গেলেন। ভীষণ আলাপি মানুষ। নাজের জন্য নাস্তা আনতে গেলেন। মিনা ওকে কলতলে গিয়ে ফেস হয়ে আসতে বলে। নাজ আর একটু শুয়ে থাকে। মিনা ফেস হয়ে এসে বসে ওর পাশে। আজ রমি থাকলে ভালো হতো। নাজকে একা পেত। ওদেরকে ঠিক মিনা বুঝতে পারে না। নাজ এত সুন্দরী দেখতে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে সকলে ওর দিকে চায়। টিকালো নাকের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে থাকে। রেশমঘন চুলে গুলো যখন ওর সুন্দর মুখটা ঢেকে দেয় তখন মনে হয় ও কোনো রাজকন্যা। মিনা ওর দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। এখন ও ওর বিছানায় শুয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন একটি গোলাপ কুঁড়ি। ছুঁতে ইচ্ছে করছে। নাজকে তাড়া দেয় মিনা। ওর খিদে পেয়েছে। আর ও থাকতে পারছে না। এমন সময় ওর মা নাস্তা দিয়ে যান।  নাজ কলতলে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আসে। নাজেরও খিদে পেয়েছে। দুজনে এক সময় নাস্তা খেয়ে উঠে পড়ে। মিনা ওকে নিয়ে ওদের পুকুর পাড়ে যায়। অন্ধকার নেমে এসেছে। আমগাছের পাশ দিয়ে গিয়ে ওরা বসে।  পুকুরে মাছে ঘাই মারা শব্দ শেনা যাচ্ছে। ঘাসের ওপর ওরা বসে। মনোরম পরিবেশ। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে।  জোনাকি গুলে গাছে গাছে উড়ে বেড়াচ্ছে। নাজ মুগ্ধ হয়ে দেখছে। আজ চাঁদ উঠতে দেরি করছে। আকাশ পরিষ্কার। তারা ফুটে আছে। মাঠ থেকে উঠে আসা বাতাসে সবুজ গন্ধ। মিনা বলে, জানিস নাজ, আমার যখন মন খারাপ হয় তখন এখানে এসে বসি। পুকুরের পানি দেখি। মাছ। অনেক রাত করে শুতে যাই। শিয়ালগুলো ডাকে। আমার ভয় করে না। এ সব দেখে আমি বড়ো হয়েছি। বাপের খুব ইচ্ছে ছিল তার নেয়ে কলেজে পড়বে। কিন্তু মানুষটি দেখতে পেল না কিছুই।  মামারা না থাকলে ভেসে যেতাম।

মিনার গলা ধরে আসে। নাজ কিছু বলে না। মিনার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর চোখে কি জল? অন্ধকারে ও ঠাহর করতে পারে না। চাঁদটা পুব আকাশে উঁকি মারছে। ওর নরম আলো খেলা করছে চরাচরে। কি মায়াবী পরিবেশ! নাজ এমন করে কখনো খোলা জায়গায়ও বসেনি। সত্যিই মিনা খুব ভালো পরিবেশে ও বড়ো হয়েছে।  নাজ ডুবে যায় এক মধুর ভালো লাগায়। ওর মনের ভাবনার সুতেগুলো একটু একটু করে ছিঁড়ে যাচ্ছে। ও আবার নতুন এক আলোর খোঁজে। সেখানে ও মিশে যেতে চায়ছে। যে আলো ওর জীবন আলেময় হয়ে উঠবে। নাজ মিনার হাতে হাত রাখে। রাত গড়িয়ে যায়।  শিয়াল ডাকছে। ওরা দুজনে জেগে বসে থাকে এক ভোরের খোঁজে।

অ্যান কারসন : পুরাণ পেরিয়ে মানুষের কাছে

শাহেদ কায়েস ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়ন ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা

 ‘সাড়ে ৭ বছরে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি’

আন্দরকিল্লা ডেক্স : গত সাড়ে ৭ বছরে সারাদেশে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চাঁদপুরের সুপরিচিত প্রতিষ্ঠিত সংগঠন চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি। বিগত পুরো অক্টোবর মাস

কবীর-লালন ভাবসঙ্গীত উৎসবে ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন : ভাঙা ডালের কোষ থেকে জেগে ওঠে সবুজ-সজিব পত্র-পল্লব

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেছেন, তুমুল ঝড়-ঝঞ্ঝায় সবুজ প্রান্তরে সকল বৃক্ষরাজি ধ্বংস হলেও কয়েকটি ডালপালা পড়ে থাকে। ঐ ডালপালাগুলোর মধ্য

যোগেন চৌধুরী : শূন্যতার মর্মবেদ

মইনুদ্দীন খালেদ দুঃসহ অভিজ্ঞতায় অস্তিত্বের প্রদাহে বদলে যায় মানুষের নিত্য-চেনা অবয়ব। ক্ষুরধার একটা অপয়া মুহূর্তের রিরংসায় মানুষ কি অতর্কিতে হয়ে যায় তার আপনজনের হন্তারক! পচনশীল

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির (পূর্ব প্রকাশিতের পর) মামা, আমরাতো তিন দিন আগের থেকেই ওরে খুঁজতেছিলাম। পুলিশ আধা ঘন্টা হইলো ওর লাশ দিয়া গেছে। কইলো পরশুদিন রাইতে