এখন সময়:রাত ২:৪৯- আজ: মঙ্গলবার-৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:রাত ২:৪৯- আজ: মঙ্গলবার
৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

পরিশেষে সেই তুমি

সৈয়দ মনজুর কবির

এমনিতেই সরু গলি, কি বুঝে ফায়ার ব্রিগেড এর মাঝারি সাইজের পেট মোটা ওয়াটার ওয়াগনটা ঢ়–কলো তা দামালের বোধগম্য হচ্ছে না। অফিসের গাড়ি করে সেই সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় অফিস থেকে বেরিয়েছে। যেখানে বড় জোর মিনিট বিশেকের পথ সেখানে বিগত সাত আট মাস হলো রাস্তায় প্রচ- জ্যাম ঠেলে তাদের মহল্লায় পৌঁছাতে ঘড়িতে বেজে যায় আটটার মতো। এত অস্বস্তিকর বসে থাকার পর যদি বাড়ির কাছে এসে এমন বিপত্তি হয় তবে কার সহ্য হয়! আর পারলো না, মন বেশি রকমের খারাপ হওয়ার আগেই দামাল গাড়ি থেকে নামে। হাঁটতে হাঁটতে পথের প্রথম বাঁকটা পেরিয়েই দেখে সামনে ওদের বাড়ি যাবার আরেকটা গলির মুখেই লোকে লোকারন্য। সবার চাহনি গলির ভেতরের দিকে। মনে হচ্ছে উঁচু দালানের কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে। কি হয়েছে জানার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠতেই দামাল সামনেই একজন উৎসুক জনতাকে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে ভাই?

প্রশ্ন শুনেই উনি একটু লজ্জিত হয়ে উঠে। আর এই ভাবটি দেখতে পেয়েই দামাল নিজেই নিজেকে গাধা বলে গালি দেয়। কারণ, ও বুঝে ফেলে যে সে বরাবরের মতো এবারো ভুল মানুষকে জিজ্ঞেস করে ফেলেছে। যেমনটি হয় ওর বেলায় যখন কোনো অচেনা জায়গায় গিয়ে কাওকে ঠিকানাটার কথা বলে। আর তখনই উত্তর আসে, ভাই, আমি তো এই জায়গায় নতুন এসেছি। আমি বলতে পারবো না।

 

তোমার নাম কোথা থেকে এলো! আমাদেরকে ধাঁধাঁয় রেখে মিরা আবার চলেও গেলো ওর ঘরে। তারপর থেকেই কথাবার্তা বন্ধ।

এবার মিরার মা কথা বললেন, শোনো বাবা, মেয়ে আমার খুবই ভালো। কিন্তু আজকে দেখো ওই উপরে উঠে কি কান্ডটাই করছে। কারও সাথে কথাও বলতে চাচ্ছে না। আচ্ছা, যেহেতু হঠাৎ করে তোমার নামটা ও গতকাল বলেছে, তাই বলছিাম, তুমি কি বাবা একটু চেষ্টা করবে কথা বলবার জন্য।

দামালের অবস্থা মনে হচ্ছে সে যেনো আকাশ থেকে পড়ছে। এখানে তার কি বলার আছে কিংবা করণীয় হবে সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না। ও শুধু মাথা এগিক ওদিক ঘুরিয়ে আশেপাশের উৎসুক মানুষগুলোর চেহারা দেখতে লাগলো। ওদের চেহারায় এখন বেশ লাল লাল আভা। চোখ বড়ো বড়ো করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে এখনকার মেয়েটির নাটকের মূল নায়কে ওরা পেয়ে গেছে। দামাল হঠাৎ নিজেকে লজ্জিত আর অসহায় বোধ করছে। ভাবছে, এ কি হলো? ওর তো এই মেয়ের তো দূরের কথা, এই পরিবারের সাথেও তো বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নাই। তাহলে একি বিপত্তি! নাহ, আর তাকাতে পারছে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। তাই ওনাদের দিকে অসহায় ভাবে তাকিয়ে বলে, আমি, আমি কি করতে পারি?

মিরার মা আবার বললেন, বাবা তুমি এখনি ওর সাথে একটু কথা বলো।

আমি? আমি কি বলবো?

না, আসলে আমরাও তো কিছু বুঝতে পারছি না। গতকাল তোমার কথা বলেছিল বলে কেনো যেনো ভাবলাম, হয়তো যদি কথা বলে। আমরা তো আর কোনো উপায়ও দেখছি না বাবা।

দামালের কাছে মৃত্যু পথযাত্রী একমাত্র মেয়ের এক অসহায় মায়ের এমন অনুরোধে দামালের মনের ভিতর কেমন যেনো আনচান আনচান করে উঠে। ও েেবল ফেলে ঠিক আছে আমি চেষ্টা করছি ওর সাথে কথা বলবার।

কথাটা শুনেই মিরার বাবা কৃতজ্ঞতায় দামালের পিঠ আলতো করে চাপড়ে দেয়।

দামাল নিজে একটু সময় নিয়ে তারপর ছাদে দাঁড়ানো মাথা ঢাকা ছায়ামূর্তির দিকে তাকায়।  বলে, এই তুমি কি মিরা?

বিদ্যুৎ চমকের মতো ছায়ামূর্তি কেঁপে উঠে বলে, কে?  কে আপনি?

আমি দামাল। তোমাকে এক সময় আমি পড়িয়েছি।

আমাকে চিনতে পেরেছো?

ওপর থেকে মিরার হাস্যোজ্বল কন্ঠ ভেসে এলো। ওও! স্যার আপনি এসেছেন?

হাঁ। আমিতো এসময়ই বাসায় ফিরি।

হাঁ স্যার আমি জানি।

তুমি জানো? কিভাবে?

মিরা দামালের এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলে, স্যার, আপনার সাথে কি কিছুক্ষণ কথা বলা যাবে?

কেনো যাবে না মিরা। অবশ্যই যাবে। কিন্তু তুমিই বলো এভাবে এতগুলো উৎসুক জনতার মাঝে তুমি কি কথা বলতে পারবে। অন্তত আমি তো পারবো না মিরা।

ও হ্যাঁ। ঠিকই বলেছেন স্যার। আমি আপনাকে জানি। আপনি এখন না এলে আমি হয়তো বেশিক্ষণ আর দাঁড়িয়েও থাকতাম না। আপনার সাথে আমার কথাটাও আর হতো না। স্যার, আমি বাসায় ফিরে যাচ্ছি। আপনি ডোরবেল বাজালে আমি নিজে দরজা খুলে দেবো।

মিরার এমন স্বাভাবিক কথায় শুধু দামালই না মিরার বাবা মাও অবাক। তখন বাবাই বললো, সেই-ই ভালো, সেই-ই ভালো। আচ্ছা, তাহলে আমরা বাসায় যাচ্ছি। বাবা দামাল তুমি তাহলে মিনিট পাঁচেক পরে আসো।

দামাল তো এমনিতেই এক ঘোরের মধ্যে আছে, তার ওপর আফজাল সাহেবের মুখেও বাবা সম্বোধনে ও আরেকটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।

এরই মাঝে সবার মাঝেই এক শান্তির ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। কারণ, ছাদের কার্নিশে ওই ছায়ামূর্তি আর দেখা যাচ্ছে না। সবাই বুঝে গেছে সব উৎকন্ঠার সমাপ্তি হয়ে গেছে। তাই সবাই যে যার মতো চলেও যাচ্ছে। শুধু যাবার সময় টেরা চোখে দামালকে দেখতে দেখতে যাচ্ছে।

এত্তোগুলো লোক কয়েক মিনিটেই উধাও। গলির মাথায় দাঁড়িয়ে দেখছিলো দামাল। তখনি আফজাল সাহেবের গেটের দরজা খুলে ওদের কেয়ারটেকার বেরিয়ে আসে। মৃদু দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললো, স্যার, আপনারে আপায় ডাকে।

দামাল প্রথমে বুঝতে পারলো না। বললো, কে ডাকে?

স্যার, মিরা আপায় ডাকে।

ও হাঁ। আচ্ছা, আচ্ছা। মিরা ডাকে। নিজেই নিজেকে বলে দামাল গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকে। নয় বছর পরে এ বাসায় আবার পা রাখলো। বাড়ির ভেতরে অনেকখানি পরিবর্তন হয়েছে মনে হলো। অনেক কিছুই নতুন সংযোজিত হয়েছে নাকি এতোদিন পর ওর কাছে নতুন নতুন লাগছে বুঝতে পারছে না। দামালের মাথা এই মুহূর্তে স্বাভাবিক কাজ করা বন্ধ করে দিলো। ও এক ঘোরের মাঝে দোতলার সেই পুরনো তবে নতুন রঙ করা দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। অজানা এক শিহরণ মেরুদ- বেয়ে নেমে যায়। বেল টিপতেই দশ এগারো বছরের এক মেয়ে দরজা খুলে দামালের সামনে দাঁড়ায়। খিলখিল হাসিতে বলে, কাকে চান?

এমন প্রশ্নে দামাল একটু থমকে যায়। বলে, ইয়ে, ও আচ্ছা। ইয়ে, মানে, মিরার সাথে…….

কথাটা শেষ করতেও পারলো না। তার আগেই মেয়েটি আরো বেশি হাসতে হাসতেই বললো, ও মিরা আপুর কাছে যাবেন তো? উনি তো থাকেন চারতলায়। আপনি চারতলায় চলে যান। বলেই হাসতে হাসতেই দামালের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়।

স্তম্ভিত দামাল কিছুক্ষণ ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। দরজা বন্ধের শব্দে ওর ঘোর ঘোর ভাবটা কাঁটতে থাকে। বোঝার চেষ্টা করে ওতো ঠিক তলায় এসেছে। মিরারা তো দোতলাতেই ছিল। সে এখন কি করবে, কি করবে, এমন ভাবতেই সিঁড়ির ওপর দিক থেকে মিষ্টি নারী কন্ঠ ভেসে এলো, স্যার, চারতলায় চলে আসুন। আমরা চারতলায় চলে এসেছি।

দামাল পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারলো না। ও আবার আগের মতো সেই ঘোরের মাঝেই চলে গেলো। ও বুঝতে পারছে না, মিরা কি তাহলে ওপরে দরজা খুলে অপেক্ষা করছিলো। তাই এখানে মেয়েটির সাথে কথাবার্তা শুনেছে। ওর ওপরে যাবার আগেই আগ বাড়িয়ে বলে দিলো ওপরে যেতে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই কখন দামাল চারতলায় পৌঁছে গেছে ও নিজেই তা বলতে পারবে না।

ওই অবস্থায়ই শুনে, স্যার, আস্সালামু আলাইকুম। আসেন ভেতরে আসেন। ভেতরে আসেন।

দামাল বক্তার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। মনে মনে আল্লাহর নাম নিতে থাকে। কারণ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। দামাল ভাবছে এই জ্বলজ্যান্ত পরিই কি মিরা! ও ওর চোখকেও বিশ^াস করাতে পারছে না। দু বছরের বেশি সময় ধরে যে মেয়ের বোরকার ওপর শুধু চোখটাই দেখেছে সেই মেয়ে মার্জিত চোখ ধাঁধানো সাদা রঙের স্যালোয়ার কামিজ পরা। আসমানী রঙের চওড়া ওড়নায় মার্জিত আবৃত। অনাবৃত ঘন খোলা ঢেউ খেলানো চুল বাতাসে উড়ছে।

দামাল ভাবলো, আশ্চর্য এই সিঁড়ি ঘরে বাতাস এলো কোথা থেকে। এমন পরিকে দেখে তার মাথাই খারাপ হয়ে গেলো নাকি! প্রায় চারটি বছর হয়ে যাচ্ছে দামালের মনে মেয়েদের নিয়ে আগ্রহ আর নেই। এর পিছনে এক করুণ ঘটনা ঘটে গেছে ওর জীবনে।  সেটাও অবশ্যই মেয়েঘটিত।

দামালের চাচা দামালের সাথে বিয়ে দেবার জন্য এক মেয়ের সম্মন্ধ নিয়ে আসে। ওর পরিবার রাজি হলেও বলে দেয় দামালের পছন্দই শেষ কথা। আর দামালও বলে দিয়েছিলো যে বাবা মা যার সাথে ওর বিয়ের ব্যবস্থা করবে তাকেই সে বিয়ে করবে। সে ক্ষেত্রে আর কোনো বাধাই থাকে না ওর বিয়ের। সব ঠিকঠাক – ঘরোয়া পরিবেশে এনগেজমেন্টের দিনই বিয়ে পড়ানো হবে। পরে দিনক্ষণ ঠিক করে অনুষ্ঠান করে মেয়েকে ঘরে আনা হবে। তো সব কিছুই প্রস্তুত। ঠিক তখনই মেয়ের ফোন পায় দামাল। আর মেয়েদের প্রতি বিতৃষ্ণার সূত্রপাত। যদিও প্রথম থেকেই মেয়ের দিক থেকে কোনো আপত্তি ছিল না। দামাল দেখতে অসুন্দর না। উচ্চতায় মধ্যমান, পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। তবে ওর গায়ের রঙ কালোও না, আসলে শ্যামলা শ্যামলা ভাব। এটাই মূল সমস্যা। এই কারণেই দামালও মেয়ে ঘটিত কেনো ব্যাপারেই নিজেকে নিতো না। মনের মাঝে এক প্রতিজ্ঞা করে ফেলে, কোনো ভালো মেয়ে যদি তাকে মন থেকেই গ্রহণ করে তবেই সে বিয়ের ব্যাপারে যোগ দেবে। তো বলা নেই কওয়া নেই ধুম করে ফোনে মেয়েটি বলে, কিছু মনে করবেন না। আসলে আমার মন মান ছিল না একটা বিষয়। আমি আসলে আপনার কালো বর্ণ মন থেকে গ্রহণ করতে পারছি না। আপনি নিঃসন্দেহে খুবই ভালো মানুষ, কিন্তু আমি যদি আপনাকে স্পর্শই না করতে পারি…  মানে আপনার হাতটাও না ধরতে পারি! মেয়েটি এই পর্যায়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বলে, আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি আসলে, আমি আসলে এ বিয়েতে আর রাজি নই। আমাকে আপনারা এ বিষয়ে কোনোদিন আর বিরক্ত করবেন না বলে লাইনটা কেটে দিলো।

দামাল মোবাইল কানে অনেকক্ষণ চুপচাপ ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। ওর মনে তখন লজ্জায় ঘৃণায় মাখামাখি অবস্থা।  নিজের প্রতি তখন আরেকটু বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। সেদিনের পর থেকে ওর মনের মধ্যে প্রতিজ্ঞা আরো বদ্ধ পরিকর হয়ে যায়। স্বেচ্ছায় কোনো মেয়ে ওকে পছন্দ করে ওর জীবনে এলে তবেই সে বিয়েতে জড়াবে, আর না হলে নয়।

কি হলো স্যার? দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? মেয়েটির কথায় ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে দামাল। দেখে মেয়েটা ঘরের ভেতরে দরজার ভারী পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে। ওর খোলা চুল এখন আরো উড়ছে।

দামাল মন্ত্রমুগ্ধের মতো সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে পা রাখে। আর মাথার উপরে ফুলস্পিডে ঘূর্ণায়মান ফ্যানের শীতল বাতাস গায়ে লাগে। ওর কাছে মেয়েটার চুল ওড়ার বিষয়টা এখন পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু আসল ব্যাপারটাই তো এখনো পরিষ্কার হচ্ছে না। এই পরিটা কে? আর এ যদি মিরা হবে, তা কিভাবে সম্ভব? ও তো পরিপূর্ণ হিজাবে থাকে। মিরার পক্ষে ওর সামনে এভাবে আসার কথা কল্পনাই করা যায় না। তাহলে এই পরির মতো মেয়েটা কে?

এবারো দামালের চিন্তায় আসে বাধা। মেয়েটার মিষ্টি কথায়, আপনি এই রুমের সোফায় বসেন। আমি এক্ষুণি আসছি। বলে মেয়েটি হাত দিয়ে লিভিং রুমের পাশে আরেকটি রুম দেখিয়ে দেয়।

দেখেই বোঝা যাচ্ছে রুমটা শুধুই পারিবারিক লোকজনদের আলোচনার জন্য আলাদা ভাবে ব্যবহৃত হয়। দামাল সুবোধ বালকের মতো মেয়েটির কথা অনুসরণ করে। বসে জানালার ভারী পর্দার সাথে লাগোয়া এল সেফের সোফার মাঝের দিকটায়।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, মেয়েটি এটা মনোরম ছোট্ট ট্রেতে দুটো প্রশস্ত গবলেট নিয়ে এলো।গবলেটে পাশাপাশি পিস্তচিয়ো আর মেঙ্গো ফ্লেভারের আইসক্রিমে ভর্তি। আইসক্রিম দেখে দামালের মনে খটকা বাড়ে – এই রকম আইসক্রিম তো ও মিরাকে পড়ানোর প্রতিটা দিনই খেতো। তবে ওসব দিনে কেবল একটিই গবলেট আসতো। আজ দুটো আসলো। মানে কি?

মেয়েটি কর্নার টেবিলে গবলেট দুটো নামিয়ে রেখে সোফার মাঝামাঝি দামালের পাশের ওপর কোণে বসলো। মুখে লাজুক হাসি।

দামাল কেমন যেনো হয়ে গেলো। ও যা আগে কখনোই করে নাই সেই কাজটাই করে ফেললো। অনেকটা বেহায়ার মতো পলকহীন চোখে সামনে বসা অপরূপ পরিটার দিকে চেয়ে রইলো।

মেয়েটি তার সামনে বসা নির্বাক, হতভম্ব মানুটাকে দেখে হঠাৎ হাসিতে ফেটে পড়ে। সে হাসি আর থামতেই চায় না যেনো। এমন হাসির মাঝেই মেয়েটি বলে উঠে, স্যার! আপনার হলো টা কি? অবশ্য, আপনারই কি দোষ। আমি তো আগে কখনো কারো সামনে এভাবে আসিনি। এটাই আমার প্রথম আসলাম শুধু আপনার সামনে শুধু আপনার জন্য।

দামালের সম্ভূতি মেয়েটার দমকা হাসিতেই ফিরে এসেছিল। মেয়েটার কথা শুনে কোনোমতে জানতে চায়, আ.. আ.. আচ্ছা এসবের মানে কি? আপনি কে?

মেয়েটির হাসি আরো জোরালো হলো ওর এমন প্রশ্নে। হাসিতে কথা আটকে যাচ্ছে তারপরও বলছে, আমি মিরা। আপনি যাকে দুই বছর দুই মাস তিন দিন পড়িয়েছেন।

খাইছে এই মেয়েই মিরা! কৌতূহলী ভাবনা দামালের মনে ঝড় তোলে। ভাবে, হাঁ, এ মিরাই হতে পারে। কারণ ওর মনে পড়ছে শেষ তিন দিন ওকে মেয়েটা বেহুদাই পড়াতে এনেছিল, কি নাকি বিষয়ে ওর মনে খটকা ছিল। ওই তিনদিন মিরা ওর জীবনের পরবর্তী চিন্তা ভাবনাগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছে। দামালের কাছে সেগুলো শ্রেফ পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি তখন। তাই সেগুলোর কোনো গুরুত্বও ছিল না। ও স্বাভাবিক ভাবেই পড়ানো শেষে ওদের বাসা থেকে বিদায় নিয়েছিলো ওই অতিরিক্ত তিন দিনের পারিশ্রমিক ছাড়াই।

মনের কিঞ্চিত শংকা কাটিয়ে দামাল বললো, ও আচ্ছা, আচ্ছা। আসলে আপনাকে মানে মিরা তোমাকে আগেতো এভাবে কখনো দেখিনি। তাই আমি একটু কনফিউজড।

হাঁ, স্যার। আগে আমাদের আত্মীয় স্বজনদের মনেও এমন বিপত্তি ঘটেছে। আপনার তো হবেই সেটা শতভাগ সত্য। নিন স্যার আইসক্রিমটা খাওয়া শুরু করুন। আমি আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আপনাকে বলতে থাকি। এরপর কোনো প্রকার ভনিতা না করেই স্বাভাবিক কন্ঠেই বলতে শুরু করে, স্যার, আজকের এই যে খুব বাজে ঘটনাটা যা ঘটতে যাচ্ছিলো তা কিন্তু কোনো নাটক ছিল না। এটা সত্যিই হতো যদি আপনি এ সময়ে না আসতেন। আপনি আসাতে আমার মনে হলো যে কারণে আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলাম, সেটা আপনাকে না জানালে মরেও শান্তি পাবো না।

এ কথায় দামাল মুখে আইসক্রিম ঢ়–কিয়ে চামচ বের করতে গিয়েও থেমে যায়। মুখে চামচসহই কোনো মতে বলে, মানে?

বলছি, বলছি। স্যার, বলবো বলেই তো ছাদের কার্নিশ থেকে নেমে এসেছি। মিরা আবার বলতে শুরু করে, স্যার, নিলু আমার খুব প্রিয় এক বান্ধবী। ও আজ সকালে ফোন করেছিলো। ও এখনো নিজেকে মাফ করতে পারছে না। ও আপনার কাছে বিনীত ভাবে ক্ষমা চেয়েছে।

নিলু! তিনি আবার কে? আর উনি কেনই বা আমার কাছে ক্ষমা চাইবেন? দামাল একটু অবাক হয়েই প্রশ্ন করে।

ও আসলে আমার বান্ধবী। ওর বিয়ের ব্যাপারে আমার জন্যই ও আপনাকে অপমানিত করেছিল। আসলে ও, আসলে ও কিন্তু ভীষণ ভালো একটা মেয়ে। আপনাকে দেখেই ওর পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। ও যখন আমাকে ওর বিয়ের কথা বলতে আসে, তখনি আমি জানতে পারি ওর হবু বর আর কেউ না – আপনিই। কেনো জানি না আমি সে সময় ভীষণ কান্নায় ভেঙে পড়ি। আমার এমন আচরণে ও তো ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। নিলুর পীড়াপিড়িতেই আমি বলে ফেলি আপনি আমার। শুধু আমার। আর কিছু বলতে হয়নি নিলুকে।ও নিজেই পরের দিন এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, যা, দোস্ত! তোর জিনিস তোকে ফিরিয়ে দিলাম। ও তখন বেশ জোরে জোরে হাসছিলো। তবে আমার মনে হচ্ছিল, সেটা হাসি নয়, মনের গভীর থেকে উঠে আসা অসহায় কান্না।

আমি বললাম, দোস্ত, কীভাবে কী হলো?

নিলু বলেছিলো, দোস্ত, দামাল সাহেব খুবই ভালো একজন মানুষ। আমি অনেক ভেবে চিন্তে দেখলাম, দামাল সাহেবের কোনো খারাপ কিছুই নেই যা বলে বিয়ে ভাঙা যায়। তাই এক তুচ্ছ ব্যাপারকে তুলে এনে ওনাকে মানা করে দিয়েছি।

কি? কি সেই তুচ্ছ বিষয় তুই বলেছিস?

আসলে আমার কাছে ওনার তো কোনো খুঁত খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই ওনার গায়ের কালো রঙের কথাই বলেছি।

কি বললি, তুই? ওনার গায়ের রঙ তো কখনও কালো না। কখনও কালো না। কখনও না, মিরা ছটফট করতে থাকে।

আরে আরে তুই এমন করছিস কেনো। আমিও জানি সেটা। কিন্তু কিভাবে ওনাকে মানা করতাম। আর দেখ উনি ভালো মানুষ তার প্রমান, আমি বলার পর উনি আর কোনো প্রকার প্রতিউত্তর কিংবা দোষারোপও করেন নাই। এমন কাজ করেছি যে ওনার কাছে আর মুখ দেখানোর যোগ্যতাও নাই। আসলে দোস্ত, আমি তোকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি তো তোর মনের মানুষকে নিতে পারবো না।

দামালের সামনে বসা মিরার চোখ অশ্রুতে ভিজে গেছে। সেদিনের নিলুর সাথে কথাবার্তাগুলো বলতে গিয়ে মিরার গলা চাপা কান্নায় বাধা পরছে। এবার মিরার কথায় বাধা দেয় দামাল। বলে, মিরা, আমার মাথা আউলিয়ে যাচ্ছে। একটা, একটা কেমন জানি পেট মোচড়ানো অনুভূতি বুকের মাঝে জমা হচ্ছে। আচ্ছা, আচ্ছা, আমি একটু বুঝে নেই, দাঁড়াও। দামাল এটা বলে একটু বড় করে শ^াস নেয় আর দুটে চোখ বন্ধ করে। যখন খোলে তখন দামালের চোখে – মুখে এক আনন্দমাখা আভা ছড়িয়ে যায়।

সেটা মিরার চোখ এড়ায় না। পলকহীন চোখে মিরা দামালের মুখের দিকে চেয়ে রয়। মুহূর্তেই মিরার মনের মাঝে একটা অতি পরিচিত শিহরণ বয়ে যায়। মিরা হঠাৎই ভাবনায় ডুবে যায়। এই পরিচিত শিহরণটা সে পেয়েছিলো তার সেই টিউশনি গ্রহণের অতিরিক্ত শেষ তিন দিনে। কিশোরী জীবনের সেই নীরবে নিভৃতে কারো প্রতি মনের মাঝে গড়ে ওঠা ভালোলাগা নাকি ভালোবাসা মিরার জীবনকে দেয় বদলে। টিউশনের শুরুর প্রথম কয়েক মাস পরেই ছোট বেলা থেকে এই হিজাবী মেয়েটার মাঝে ঘটে পরিবর্তন। কিন্তু সে আপ্রাণ চেষ্টা করে সেটা না প্রকাশ করার জন্য। কারণ, ও নিজেও গৃহশিক্ষক আর শিক্ষার্থীর মধ্যে যে স্বাভাবিক সম্পর্কটা থাকা উচিত তা বিশ^াস করে। আর সে কারণেই শেষ তিন দিনে তার মনের ভিতর ততদিনে গড়ে ওঠা তীব্র অনুভূতি দামালের কাছে প্রকাশ করতে গিয়েও পারে নি। শুধু শুধু ওর কতগুলো অবান্তর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলে সময় নষ্ট করেছে। আর ওর মনকে ওলটপালট করা লোকটা চলে গেছে ওর মনের কথা না জেনেই। অবশ্য মিরার ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা শেষে পারিবারিক ভাবে দামালকে জানানো হবে। তখনতো শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর সম্পর্কটা থাকবে না। এদিকে ওর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার শেষ ভাগে নিলুর সাথে দামালের বিয়ের ব্যাপারটা করে তোলে ঘোলাটে। একদিকে প্রিয় বান্ধবীর স্যাকরিফাইস আর অপর দিকে একটা বিয়ে ভেঙে দেয়ার দোষী দোষী অনুতপ্ততা মিরার মনকে ক্রমেই সংকুচিত করে দিচ্ছিল। নিজেও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়ছিলো অন্য কোন ছেলেকে বিয়ে করবে না। এতোদিন তো ওর মনের মানুষটাকে একটি বার হলেও দেখতো। তাও সেটা তারমতো করেই। প্রতিদিন দামাল কয়টায় অফিসে যায় ও জানতো। তাই সেই সময়ের দশ পনেরো মিনিট আগেই রেডি হয়ে থাকতো। গলি দিয়ে দামাল বের হওয়া থেকে গলির মাথায় রাস্তায় দাঁড়ানো গাড়িতে ওঠা পর্যন্ত আগেই গলির মাথায় দাঁড়িয়ে মিরা দেখতো। আর এতোদিন হলো এই দামাল মানুষটি সেটা দেখেও দেখলো না। মিরাও এতটুকুতেই সুখী। এটাও হতো না যদি জানতো দামাল বিয়ে করে ফেলেছে। তাহলে সে নিজেই এ সমগ্র ব্যাপার থেকেই সে সরে যেতো। ভাগ্য ভালোই যাচ্ছিলো কারণ দামালও যে স্বেচ্ছায় বিয়ে করবে না বলেছিল।

কিন্তু গতকাল ঘটলো আরেক ঘটনা। ওর ঢাকার হেড অফিস মিরাকে একটা বড় দায়িত্ব দিয়ে চিটাগং অফিসে পাঠানোর অর্ডার দিয়েছে। গতরাত থেকেই মিরার মন ঘন অন্ধকারে ঢাকা। কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সে কি করবে। সম্পূর্ণ এক নিজস্ব জগৎ নিয়ে সে যে দিন অতিবাহিত করছিলো তা তো আর হবে না। চিটাগং চলে গেলে মনের মানুষটাকে তো আর দেখতেও পারবে না। এদিকে মেয়ে হয়ে অতি আগ্রহী হয়ে ছেলেকে প্রস্তাব দিলে সমাজে ওকে হেয় প্রতিপন্ন করবে ভেবে চুপচাপও থাকতে পারছে না। না, সত্যিই মিরা আার পারলো না – মানসিক ভারসাম্যহীনতার চরম পর্যায়ে চলে গেলো। সকাল থেকে দুপুর মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে ভুগতে সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে আর চলে যায় ছাদে। যাবার আগে বাবা মায়ের শোবার রুমে ক্ষমা চেয়ে একটা চিঠি দিয়ে আসে।

বাবা, মা,

আস্সালামু আলাইকুম। একটা কথা আমি তোমাদের কাছে লুকিয়েছিলাম। দামাল স্যারকে আমার ভীষণ পছন্দ। কিন্তু তোমাদের দিকে তাকিয়ে আমি তা প্রকাশ করতে পারি নি। এমনকি ওনাকেও কথাটা বলতে পারি নি। আর দামাল স্যারের যে বিয়েটা হয় নি সেটাও আমারই কারণে। আমি অনেকগুলো দিন পার করেছি নিজস্ব তৈরি একটা ঘোরের মধ্যে। এখন সে ঘোরও আর থাকছে না। আমার মানসিক অবস্থা কেনো প্রকারই আর ভালো যাচ্ছে না। আমি যদি উল্টোপাল্টা কোনো কিছু করে ফেলি তবে তোমরা আমাকে মাফ করে দিও।

তোমাদের আদরের মিরা।

মিরার মাথার কলকব্জা হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। মাথার ভেতর চরম এক শূন্যতা নেমে আাসে। ও ঠিক সন্ধ্যায় ছাদে চলে যায় আর ছাদের দিক থেকে সিঁড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। পরনে বেশ ঢোলাঢালা লম্বা লং হুডি পড়েছে। এতে মুখম-ল সবটাই ঢেকে গেলো। প্রথমে কিছুক্ষণ পুরো ছাদ ধীর গতিতে পায়চারী করে। তারপর ঠিক যখনই ছাদের কার্নিশে যাবে ঠিক তখনই সিঁড়ির দরজার ওপাশে মিরার মায়ের হাউমাউ কান্না আর ধুমধাম দরজায় বারির শব্দ শুনতে পায় মিরা। মা চিৎকার করে বলছেন, মা মিরা। মা আমার, এই দরজা বন্ধ করেছিস কেনো? কি হয়েছে তোর? আর ওই চিঠি লিখেছিস কেন? কি করছিস তুই?

মিরার মাথা ঝিম ঝিম করছে। সব কেমন এলোমেলো লাগছে। কি বলবে বুঝতে পারছে না। শুধু চেঁচিয়ে বললো, মা, আমি চলে যাচ্ছি, মা।

আই, কি বলিস? কোথায় যাচ্ছিস? আই দরজা খোল। তুই আমাকে বল। সব কিছু আমি দেখতেছি। তুই দরজা খোল।

মিরা স্থবির হয়ে গেছে। কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা উবু হয়ে।

ওপাশের বিল্ডিংয়ের ফরিদা আন্টি ছাদে উঠে এসেছেন। পেছনে আরো কতগুলো ছোট বড় ছেলে মেয়েরাও দৌড়ে ওদিকটায় রেলিঙের কাছে আসছে। ফরিদা আন্টিও হাউমাউ করে উঠলেন, এই কে তুমি? এভাবে এখানে দাঁড়িয়েছো কেনো? এই তুমি কে? মাথার হুডিটা উঠাও।

মিরা আরো বেশি পাথর হয়ে যায়। এমনটা তো ও ভাবে নি। মাথা উপরে না তুলেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।

এদিকে সিঁড়ির দরজায় বাবার কন্ঠও শোনে মিরা, মা, কি হয়েছে? আমাকে বল? আমি তো তোর কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখি নি। তুই পড়ালেখা শেষ করে নিজের পারিবারিক ব্যবসা বাদ দিয়ে চাকরিতে ঢ়–কলি। বিয়ে করবি না বলে চুপচাপ রইলি। কই আমি কি তোকে কখনো আপত্তি করেছি। এতদিন পর এই চিঠির মানে কি? তুই আগে বললেই তো পারতি। আমরা ছেলের সাথে কথাবার্তা বলতে পারতাম। তুইতো এখন ম্যাচিউর্ড একটা মেয়ে। তোর কাজের একটা গুরুত্ব থাকবে না? খোল, দরজাটা খোল।

বাবার কথায় মিরার চোখে জল চলে আসে। ও শুধু পাথরের মতোই দাঁড়িয়ে থাকে।

বাবা বেশিক্ষণ অপেক্ষা করলেন না। ধুপধাপ শব্দ করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শোনে মিরা। সময় কত দ্রুত চলে যায়! মিরা অবাক হয়। কতক্ষণ পর, ও ঠিক বলতে পারবে না, পুলিশের গাড়ি,  ফায়ার ব্রিগেড এর  সাইরেন, সাথে এক দল উৎসুক জনতা নিচে জড়ো হয়ে সে এক এলাহী কা- করে ফেলেছে। কি একটা লজ্জাকর আর বিব্রতকর অবস্থা! এরই মাঝে ফায়ার ব্রিগেডের ইনচার্জ হ্যান্ড মাইকে মিরাকে নেমে আসার অনুরোধ করছে। এক ফায়ার ফাইটার পাইপ বেয়ে উপরে আসার চেষ্টা করাতে মিরা বলে ওঠে, এই কেউ এমন কাজটি করলে আমি এক্ষুনি পড়ে যাবো। মিরার বাবা ভয় পায়। উনি তৎক্ষণাৎ পাইপ বেয়ে উপরে ওঠা বন্ধ করে। নিচে লোকজনের ভীড় বাড়তেই থাকে। সে ভীড়ের মধ্য থেকে কত প্রকার যে কথা মিরা শোনে তার ইয়ত্তা নাই। হঠাৎ একটা অতি পরিচিত- বিশেষ করে বলা যায় অনেক সময় ধরে মনের মাঝে লালিত- কন্ঠস্বর শুনতে পায় মিরা। হৃদপি-ের কম্পন যায় বেড়ে। মাথাটা হঠাৎ আবার স্বাভাবিক কাজ করা শুরু করে। ওর কাছে মনে হয় যেনো দামাল স্যারের কাছে এই মুহূর্তেই গিয়ে দাঁড়ায়। তখনি ও তার কার্নিশে দাঁড়িয়ে থাকা আবিষ্কার করে। মনের ভিতরে অবাক পরিবর্তন দেখা দেয়। দামাল স্যারকে ওর মনের গভীরের কথা বলে ফেলার সাহসটা শতগুণ বেড়ে যায়। যখন নিচে দাঁড়িয়ে দামাল নিজেই ওর সাথে কথা বলার নিবেদন জানায় তখনই ও আরো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় আর দামালকে বাসায় আসতে। অসম্ভব শিহরিত মন নিয়ে মিরা সিঁড়ির দরজা খুলে বাসায় চলে আসে। রেসিং কারের দ্রুত গতিতে নিজের পোশাকের পরিবর্তন আনে। আর আনে মনের মানুষের সামনে হিজাব না করে দাঁড়ানোর প্রথম হয়তো সেটাই শেষ প্রচেষ্টা। ডোরবেল বাজলে দরজা ওই খুলবে এমনও বলে রাখা হলো আগে থেকেই। ও নিজেও অবাক তার এমন অবস্থার জন্য। ভাবলো দরজা খুলে দামালের সামনে দাঁড়ালে হয়তো অজ্ঞান টজ্ঞান না হয়ে যায়। কিন্তু হলোটা কি?

ডোরবেল বাজার কোনো লক্ষণই দেখা গেলো না। কিছু সময় মিরা নিজেই বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ধৈর্য্যে আর পারলো না। কাঁপা হাতে দরজা খুলেই দামালের কন্ঠ আর সাথে নিচে দোতলার ছোট্ট মেয়েটির হাসির ধ্বনি শুনতে পায়। মনে পড়ে স্যারতো দোতলার কথাই জানতেন। ওরা যে চারতলায় উঠে এসেছে তা তো উনি জানতেন না। মিরা দ্রুত চারতলার সিঁড়ির রেলিঙের উপর শরীর বাঁকিয়ে নিচে তাকায়। ছোট্ট মেয়েটির কথা শেষ হতেই দামাল স্যারকে চেঁচিয়ে উপরে আসার জন্য অনুরোধ করেই আবার দরজার ভারী পর্দার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আসলে মনের সমস্ত কিছু নির্ভর করে পরিবেশের উপর। এখনোও তাই হলো। মিরার মনের কম্পমান অবস্থা আর নেই। ছোট্ট মেয়েটার খিলখিল হাসি হয়তো এটা ঘটালো। আর যখন দামাল চারতলায় এসে ওকে দেখলো তখন দামালের চেহারার হতভম্ব অবস্থা দেখেতো মিরার পেট ফেটে হাসি পাচ্ছিলো। কিন্তু কীভাবে যে মিরা সেটা কন্ট্রোল করলো তা ওই ভালো জানে।

ভাবনার জগতের ওই মজার হাসির অনুভূতির ছোঁয়া দামালের সামনে এখন বসা মিরার মনকে আরো বেশি আন্দোলিত করে। সে অনুভব হঠাৎ বাধা পায় দামালের কথায়, মিরা! আমি কি ঠিক শুনেছি? দামালের কন্ঠে আশ্চর্য এবং আনন্দের মিশ্রণ।

মিরা হকচকিত হয়ে বলে, কোন ব্যাপারটা স্যার?

দামাল একটু ভড়কে যায়। ইতস্তত কন্ঠে বলে, মা মানে ওই যে তুমি নিলুর কথা বলছিলে। ওনাকে বলে দিও, উনি যে কাজটি করেছেন তাতে উনি নিজেই মহত্তের পরিচয় দিয়েছেন। ওনার প্রতি আমার আর কেনো অভিযোগ নেই। আমি আমার অন্তর থেকেই ওনাকে ক্ষমা করে দিলাম। বলেই দামাল একটু চুপ হয়ে যায়।

দামালের চুপ হয়ে যাওয়া দেখে মিরা ব্যাকুল হয়ে বলে, স্যার আমি ভীষণ লজ্জিত যে আমি প্রশ্ন করে ফেলেছিলাম, কোন ব্যাপারে। আসলে আমি একটু ভাবনার জগতে চলে গিয়েছিলাম। আমি লজ্জিত। আসলে স্যার, আপনি যা কিছু শুনেছেন সবই সত্যি। হাঁ স্যার, সবই সত্যি। হঠাৎ মিরার বুকের গভীর থেকে এক কান্নার দলা গলায় এসে আটকে যায়। মুখ দিয়ে কথা ফিসফিস আকারে বের হচ্ছে। চোখে জল ছলছল করছে, মনে হচ্ছে এখনি ছলকে পড়বে। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে মিরার আকুতি ঝরে পড়ে, স্যার, আপনি কি সব শুনেও বুঝতে পারছেন না? আমিতো আপনাকে ছাড়া আর কাওকে আমার মনে স্থান দিতে পারছি না। আমি যে..  আমি যে…। মিরা বেশ শব্দ করেই ছোট শিশুদের মতো কেঁদে ওঠে।

দামাল বুঝে উঠতে পারছে না এখন তার কি করা উচিত। মিরার প্রতি তার মাঝে এই প্রথম এক নতুন অনুভবের সৃষ্টি হয়েছে। মনের মাঝে দমকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। দামাল কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে, মিরা, মিরা। আমি তো জানলাম। তুমি, তুমি বললে, আমি বাসায় বলি।

মিরা কান্নার মাঝেই বলে, হাঁ, হাঁ বলেন। এক্ষুনি বলে। আমি জানতে চাই আপনার বাসার সবাই কি বলেন।

আচ্ছা, মিরা!  বাবা মা তোমার বাবা মায়ের মতামত জানতে চাইলে কি বলবো?

ও হাঁ। আপনাকে বলাই হয় নি। আমি এখানে বসার আগেই বাবা মাকে বলেছি যে আপনি রাজি থাকলে এক ঘন্টার মাঝেই কাজী ডেকে আমাদের বিয়ে হবে। ওনারা রাজি আছেন। আপনি দয়া করে এক্ষুনি বাসায় ফোন দিন, প্লিজ, প্লিজ।

দামাল প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে। হাতে নিয়ে একটু ইতস্তত করে। সেটা উদ্বিগ্ন মিরা লক্ষ করে বলে, আবার কি হলো?

দামাল একটু মৃদুস্বরে বলে, আসলে হয়েছে কি, আজকেই বিয়ে হলে ঠিক আছে। কিন্তু একটা সমস্যা এরাইজ করলো যে!

কি সমস্যা? মিরার চোখে উদ্বেগ এর চিহ্ন ফুটে উঠে।

আসলে হয়েছে কি, আমার অফিসে আমার সিনসিয়ারিটি এবং ডেডিকেশন দেখে আমাকে এদের খুলনার জোনাল অফিসের হেড হিসেবে ট্রান্সফার করেছে। কালই ওখানে জয়েন করবার কথা। রাতের ১০.৩০ মিনিটে বাস।

দামালের কথার শেষ শব্দটা উচ্চারিত হতেই মিরা আনন্দে সোফা থেকে লাফিয়ে ওঠে। চিৎকার দিয়ে ডাকে, বাবা মা, শিগগির এখানে আসো। মিরার মুখে এখন যেনো বিশ^ জয় করার হাসি। ও খুশিতে রীতিমতো মৃদু লাফাচ্ছেও যেনো।

বাবা মায়ের এ রুমে আসতে বেশি সময় লাগলো না। বাবাকে সামনে পেয়ে মিরা দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। বলে, বাবা, তুমি বলেছিলে আমাকে তোমার ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে। বাবা, আমি আমার আগের চাকরি করার প্রতিজ্ঞা মুছে ফেলছি। তুমি তোমার খুলনা অফিসে এক্ষুনি বলে দাও, আগামী সপ্তাহ থেকেই আমি ওখানে জয়েন করছি। আর আজ রাতেই তোমাদের জামাইয়ের সাথে খুলনা রওনা হচ্ছি।

মিরার খিলখিল হাসির সাথে কথাগুলো শুনে বাবা মার দুজনের চোখে আনন্দ অশ্রু নেমে আসে। আর দামাল অবাক চোখে মিরার সব আনন্দগুলো হৃদয়ে ছোঁয়াতে থাকে।

 

সৈয়দ মনজুর কবির : গল্পকার

হাসনাত আবদুল হাই: নবতিতম জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

আলম খোরশেদ তাঁর কথা প্রথম শুনি স্বয়ং পিতৃদেবের মুখে। একই এলাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ দুজনেই, তদুপরি লতায় পাতায় কীরকম যেন আত্মীয়ও। এই নিয়ে একধরনের চাপা গর্বও

ডা. চন্দন দাশ ছিলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ

শোয়েব নাঈম চন্দন দা’ (ডা. চন্দন দাশ) অভূতপূর্ব মানসিক অনুরণনে আমার মধ্যে বহু বছর আগেই বসন্তের এক রেশ রেখে গেছেন। তাঁর বসন্তের এই রেশ ছিল

তেজোদীপ্ত তোফায়েল আহমেদ বোধশূন্যতায় তুমি শোকসভা

কামরুল হাসান বাদল   বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তর একবারই এসেছিল, সে একাত্তর গৌরবের, সে একাত্তর অহংকারের। সে একাত্তর আর কখনও বাঙালির জীবনে আসবে না।

পান্থজনের কথা

সুমন বনিক মহেড়া জমিদার বাড়ির নামটি অনেক আগেই জানা ছিল, কিন্তু দেখা হয়নি। ইতিহাসের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে এর মানিকরতœ উদঘাটন করা ঊর্মিলা (আমার স্ত্রী)’র স্বভাবজাত

পরিশেষে সেই তুমি

সৈয়দ মনজুর কবির এমনিতেই সরু গলি, কি বুঝে ফায়ার ব্রিগেড এর মাঝারি সাইজের পেট মোটা ওয়াটার ওয়াগনটা ঢ়–কলো তা দামালের বোধগম্য হচ্ছে না। অফিসের গাড়ি