সুমন বনিক
মহেড়া জমিদার বাড়ির নামটি অনেক আগেই জানা ছিল, কিন্তু দেখা হয়নি। ইতিহাসের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে এর মানিকরতœ উদঘাটন করা ঊর্মিলা (আমার স্ত্রী)’র স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হলেও আমার আগ্রহের যে-ঘাটতি আছে, তা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই! যেহেতু, পারিবারিক অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইল এলাম, তাই এতোকাছে এসেও মহেড়া না-ঘুরে/না-দেখে ফিরে যাওয়াটা সমীচীন মনে হয়নি। কেননা, মহেড়া জমিদার বাফড়টি শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক/ মূল্যবান স্থাপনা। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন জমিদারগণ চার ভাই মিলে মহেড়ায় জমিদারী পত্তন করেন। বুদাই সাহা (বিদু সাহা), বুদ্ধু সাহা, হরেন্দ্র সাহা এবং কালীচরণ সাহা, তারা সাহা পদবী ধারণ করেই জমিদারি পত্তন করেন এবং চার অংশে বা হিস্যায় বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। পরবর্তীতে তাদের বংশধর এবং পরবর্তী প্রজন্ম সাবাই রায় চৌধুরী পদবি গ্রহণ করেন। তাই, মহেড়া জমিদার বাড়ির নাড়ি নক্ষত্র অনুসন্ধানে সাতসকালে টাঙ্গাইল শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে মহেড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা। ‘রেন্ট-এ-কার’ চালক শাহীনভাই মাঝবয়েসী লোক। খুব তাড়াতাড়ি তাঁর সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠল।
বাংলাদেশের রিক্সাওয়ালা, অটোরিক্সা চালক, রেন্ট-এ-কার চালক ইত্যাদি কিসিমের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা গিয়ে শেষমেশ রাজনীতি, সমাজিক অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্যের বাজারদর ইত্যাদি প্রসঙ্গে গিয়ে ঠেকে। আমাদের গাড়ীচালক শাহীনভাই যখন তাঁর এক্স-করোলা গাড়িটি চালিয়ে এক্সপ্রেস ওয়েতে উঠলেন, পাশে-বসা আমি তাঁর একটা দীর্ঘনিশ্বাস শুনলাম, তিনি খেদোক্তি নিয়ে বললেন- “বুঝলেন দাদা আগে এতো ফাইন রাস্তা আছিল না, কি-যে বিরক্তি নিয়া গাড়ি চালাইতাম, ভাঙ্গাচুরারাস্তা যানজট আরও কত ঝামেলা আছাল। এই রাস্তা হবার পর খুব আরাম হইছে। অহন এই দ্যাশটায় ভাল মাইনষের দাম নাই।” তাঁর কথা মাটিতে পড়ার আগেই আমি বললাম -“এই কথা ক্যান বললেন”। কিছুক্ষণ থেমে আবার বল্লেন “শালার বাঙালি জাতিডাই খারাপ, মাইনষের খালি দুষটা দেহে (দেখে), গুণডা দে’হে না।” “ভাই বাঙালির কী দোষ, ব্যক্তির ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে, এর জন্যে গোটা জাতি কী দায়ী।” শাহীনভাইয়ের চোখেমুখে চরম বিরক্তিভাব দেখে আমি আর কথা আগবাড়ালাম না। শাঁ শাঁ করে গাড়ি ছুটে চলল, মনে হচ্ছে বিদেশের কোনো মহাসড়কে গাড়ি ছুটছে।

যেহেতু দু/চারটি দেশ ঘুরে দেখেছি, তাই বিদেশের প্রসঙ্গটি আনলাম। ড্রাইভার শাহীনভাইয়ের কথাগুলো কানে বাজল, সত্যিই তো অনেক উন্নয়নের সুফল ভোগ করছি! গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম, চট্টগ্রাম শহর থেকে এয়ারপোর্ট যেতে একসময় ২/৩ ঘন্টা সময় লাগত, সেদিন ১৩ কিলোমিটার পথ এক্সপ্রেস ওয়ে/ফ্লাইওভারে চড়ে মাত্র ২০/২৫ মিনিটে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছে গেলাম। ঢাকাতে নেমে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এক্সপ্রেস-ওয়ে-ধরে ধানমন্ডি পৌঁছতে সময় লাগল ৩০/৩৫ মিনিট, ৩ ঘন্টার পথ [ ট্রাফিক জ্যাম সহ] কতো সহজেই পাড়ি দিলাম। এতোসব কথা বলে ড্রাইভার শাহীনভাইকে আর বিরক্ত করতে চাইলাম না। তাঁর দুঃখ-কষ্ট, তার মনেই থাকুক। বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ আমরা সবাই। পেছনের সিট থেকে গলা বাড়িয়ে অনুসূয়া (আমার মেয়ে) গান শোনানোর জন্য ড্রাইভার সাহেবকে তাগাদা দিচ্ছিল, শেষতক ব্লুট্রুথ কানেক্ট করে গান ছাড়লেন ড্রাইভার সাহেব। মালজোড়া টাইপের আজানা এক গান, শুনতে বেশ লাগছিল,অনুসূয়াও খুব মজা পেল।
মূলসড়ক ছেড়ে আমাদের গাড়ি সরু রাস্তা ধরে ছুটে চলল। সেই হারানো গ্রামের দৃশ্য চোখে পড়ল। ছনের ঘর, টিনের ঘর, বাড়ির উঠোনের পাশে খড়ের গাদা, গাছে দড়ি-দিয়ে বাঁধা শীর্ণকায়ার গরু, মাটির সোঁদাগন্ধ ইত্যাদি দেখতে-দেখতে, অনুভব করে-করে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি, গাড়িটি ছুটছে মহেড়ার দিকে। বাংলাদেশের গ্রামগুলো আজ হারিয়ে-ই গেছে! উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে আবহমান বাংলার চিরায়ত সেই গ্রামে। ইলেক্ট্রিসিটি, ইন্টারনেট, কমিউনিকেশন অর্থাৎ ডিজিটাল বাংলাদেশের নানান অনুষঙ্গ আজ গ্রামকে শহরে রূপান্তর করেছে। দু চারটি গ্রাম বাদে সবগুলো গ্রামে-ই উন্নয়ন-জোয়ারের ঢেউ লেগেছে। রাস্তার একটা চোখে-পড়া-স্থানে দেখলাম “Welcome to PTC” লেখাসম্বলিত আকর্ষণীয় বিলবোর্ড। ড্রাইভার শাহীনভাই বল্লেন, দাদা ‘আমরা আইছি, ঐ যে জমিদারবাড়ি ,ঐহানে ছিনেমার সুটিং হয়।” ওর কথা শেষ হতে-না-হতেই আমাদের গাড়ি মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল। ড্রাইভার টিকিট কাউন্টার দেখিয়ে, গাড়িটি পার্কিং জোনে নিয়ে গেলেন। জনপ্রতি এন্ট্রি ফি ১০০ টাকা, পার্কিং ৫০ টাকা। মূল ফটক ঢোকার মুখেই ‘বিশাখা সাগর’। বিশাল দিঘি-শানবাঁধানো ঘাট, বৃক্ষরাজি পরিবেষ্টিত এক মনোরম দৃশ্য। দিঘির টলটলে জল, শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ- মনটা জুড়িয়ে যায়! আসুন, একঝলকে জমিদার বাড়ির আদ্যপান্ত জেনে নিই:

কলকাতার ডাল ও লবণ ব্যবসায়ী কালীচরণ সাহা ও তাঁর সহোদরেরা ১৮৯০ সালে বর্তমানের টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া এলাকায় আসেন এবং তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯০ দশকের পূর্বে স্পেনের করডোভা নগরীর আদলে বিশাল জমিদারবাড়ি গড়ে তুলেন। এই বাড়িটির স্থাপত্যের মধ্যে রোমান, বাইজেন্টাইন ও ব্রিটিশ রীতির মিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। এখানে প্রধান তিনটি ভবন রয়েছে-মহারাজ লজ, চৌধুরী লজ ও আনন্দ লজ। এছাড়াও রয়েছে রানী ভবন ও কাচারিঘর। আট একর জায়গা জুড়ে মহেড়া জমিদার বাড়ি বিস্তৃত। মহেড়া জমিদার বাড়ি প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শনস্বরূপ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা রক্ষণাবেক্ষণ করা জমিদার বাড়িগুলোর মধ্যে একটি।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই জমিদার বাড়ির একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনী মহেড়া জমিদার বাড়িতে হামলা করে এবং জমিদার বাড়ির কুলবধূসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে ১৯৭১ সালে। পরবর্তীতে জমিদার বাড়ির লোকজন লৌহজং নদীর নৌপথে এ দেশ ত্যাগ করেন। এখানেই তখন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৪মে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকবাহিনী মহেড়া জমিদার বাড়িতে হামলা করে এবং পাঁচজনকে চৌধুরী লজের মন্দিরের পেছনে একত্রে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। তারা হলেন: ১) জমিদার বাড়ির কুলবধূ যোগমায়া রায় চৌধুরী,২)প-িত বিমল কুমার সরকার (স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক), ৩) মনিন্দ কুমার চক্রবর্তী, ৪) অতুল চন্দ্র সাহা, ৫)নোয়াই বণিক। “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সদয় অনুমোদন ক্রমে ১৯৭২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আবদুল মান্নান এর উদ্যোগে মহেড়া জমিদার বাড়ি টি জোনাল পুলিশ ট্রেনিং স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯০ সালে জোনাল পুলিশ ট্রেনিং স্কুলকে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উন্নীত করা হয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ জমিদার বাড়ি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও মহেড়া জমিদার বাড়িটি পুলিশের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষিত আছে।” এই লেখা সম্বলিত নীল রঙের একটি সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম। যেখানে মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের নাম লিপিবদ্ধ আছে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার মূল্যবান স্মৃতিস্মারক এবং জমিদারদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রে সমৃদ্ধ একটি মিউজিয়াম কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিউজিয়ামটিতে জমিদারদের ইতিহাস ও তাঁদের ব্যবহৃত তৈজসপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী রয়েছে। এছাড়া এ মিউজিয়ামে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধারণ করে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রসহ বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকা ও ক্রমবিবর্তনের চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে।

জমিদার বাড়িতে প্রবেশের জন্য রয়েছে ২টি সুরম্য ফটক / গেট / সিংহদুয়ার। এছাড়াও মূল ভবনে পিছনের দিকে পাসরা পুকুর ও রানী পুকুর নামে আরো দুইটি পুকুর রয়েছে এবং শোভাবর্ধনে রয়েছে সুন্দর ফুলের বাগান। বিশাখা সাগর সংলগ্ন দক্ষিণ পার্শ্বে রয়েছে বিশাল আম্রকানন ও বিশাল তিনটি প্রধান ভবনের সাথে রয়েছে নায়েব সাহেবের ঘর, কাচারি ঘর, গোমস্তাদের ঘর, দীঘিসহ ও আরো তিনটি লজ। সেখানে একটি ফোয়ারা আছে সেটা ১৮৯০ সালে নির্মাণ করা হয়েছে।
চৌধুরী লজ: জমিদার বাড়ি প্রবেশের পরেই মূল ফটক দিয়ে দেখা যায় চৌধুরী লজ। এটির গোলাপি রঙের ভবনটির পিলারগুলো রোমান স্থাপত্য শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে। সুন্দর নকশাখচিত এই ভবনের ভেতরে রয়েছে ঢেউ খেলানো ছাদ। দোতলা বিশিষ্ট এই ভবনটির সামনে রয়েছে সুন্দর বাগান ও সবুজ মাঠ।
মহারাজ লজ: বাইজেনটাইন স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত মহারাজ লজ ভবনের সামনে ছয়টি (৬) টি কলাম রয়েছে। সেখানে গোলাপি রঙের মহারাজ লজের সামনে রয়েছে সিঁড়ির বাঁকানো রেলিং ও ঝুলন্ত বারান্দা যা ভবনের শোভা বৃদ্ধি করেছে। ভবনটিতে মোট কক্ষ আছে বারো (১২) টি, সামনে বাগান ও পেছনে একটি টেনিস কোর্ট রয়েছে। এই ভবনটি বর্তমানে শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আনন্দ লজ: মহেড়া জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবন হলো আনন্দ লজ। নীল ও সাদা রঙের মিশ্রণে ভরা ভবনটির সামনে আট (৮) টি সুদৃশ্য কলাম রয়েছে। তিন তলা বিশিষ্ট ঝুলন্ত বারান্দা এ ভবনকে করেছে আরো দৃষ্টিনন্দন। আনন্দ লজের সামনে হরিণ, বাঘ ও পশু-পাখির ভাস্কর্যসহ একটি চমৎকার বাগান আছে।
কালীচরণ লজ: জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির শেষের দিকে নির্মিত এই কালীচরণ লজ অন্য ভবন থেকে অনেকটা আলাদা। ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের আদলে এই ভবনটি ইংরেজ স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত। অন্যন্য স্থাপত্য শৈলীর জন্য বিকেল বেলা ভবনের ভেতর থেকে সুন্দর আলোর ঝলকানি দেখা যায়।
ঊর্মিলার ছবি তোলার মেনিয়া প্রবল, ফটোগ্রাফার হিসেবে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পরীক্ষায় আজঅব্দি উত্তীর্ণ হতে পারিনি ! হেঁটে হেঁটে পুরো এলাকাটি চষে বেড়ালাম, সকাল গড়িয়ে দুপুর, এবার ফেরারপালা। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তি হয়েছে অনেক যুগ আগেই। জমিদারি প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয় ১৯৫১ সালের ১৬ মে [১, ১২]। ১৯৫০ সালের ‘পূর্ববঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন’ (ঝঃধঃব অপয়ঁরংরঃরড়হ ধহফ ঞবহধহপু অপঃ, ১৯৫০) কার্যকরের মাধ্যমে এই প্রথা উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু, জমিদারী প্রথার সুশাসন/ দুঃশাসন কালের পরিক্রমনে আজও জ্বলজ্বল করে। তথাপি,মহেড়ার জমিদারি শাসনের অবসান অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে যাঁরা আত্মত্যাগ করেছেন, শহিদ হয়েছেন সেইসব বীর শহিদের সঙ্গে মহেড়ার জমিদারদের নামটিও জড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। জমিদার বাড়ির মিউজিয়ামে জমিদারদের তৈজসপত্র, ব্যবহারিক জিনিসপত্র দেখলাম, কিন্তু কোনো জমিদারের পোট্রেট/ছবি চোখে পড়ল না। মাঘ মাস হলেও, দিনের বেলা রোদের তেজ কম ছিল না, ঘুরতে-ঘুরতে জল তেষ্টা জেঁকে বসেছে। কিন্তু কোথাও পানীয় জলের ব্যবস্থা চোখে পড়ল না। অপর্যাপ্ত ওয়াশরুমের নোংরা আর জীর্ণ দশা দেখে মনটা বিষণœ হয়ে গেল। বাংলাদেশের অধিকাংশ পর্যটন কেন্দ্রগুলো পয়ঃনিষ্কাশন এবং পানীয় জলের সঙ্কটে জর্জরিত। হয়ত এই বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ে না অথবা বিবেচনায় নেয় না। জমিদার ভবনের ভেতরে সাধারণ দর্শকদের প্রবেশাধিকার না-থাকাটা যথার্থ মনে হল না। অথচ, প্রতিটি কক্ষ বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। টিকিট কেটে প্রবেশ করলেও- দর্শকদেরকে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসপাঠ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন। আমরাও কিছুটা হতাশ হয়েছি। মহেড়া জমিদার বাড়ি মানবসভ্যতা আর ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। অনিন্দ্যসুন্দর কারুকার্য আর বিশাল মহলগুলো আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে পুরোনো হাজারো স্মৃতি, সুখ-দুঃখের কীর্তি লেপ্টে আছে এই বাড়ির প্রতিটি পরতে। এই জমিদাররা অন্যান্য জমিদারদের মত অত্যাচারী না হলেও কর্তৃত্বপরায়ণ ছিলেন। এলাকার উন্নয়নের জন্য অনেক কাজও করেছেন। তবু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তাদেরকে এগুলো ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তবে, ইতিহাস অনুসন্ধানী মানুষের কাছে মহেড়া এক হাসি-কান্না আর আর্তনাদের ইতিহাস। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা- এটাই আমাদের ইতিহাস।
এবার, ড্রাইভার শাহীনভাই আমাদের নিয়ে ফিরছেন। কিছুটা ক্লান্তি দেহজুড়ে চেপে বসেছে। টং-এর দোকানে চা-পানের বাতিক আছে ঊর্মিলার, ড্রাইভার সাহেব এক্সপ্রেস ওয়ে ছেড়ে বাইলেন ধরে গাড়ি চালিয়ে একটা চা-খানায় এসে থামলেন। দোকানিকে বললাম দু’কাপ চিনি ছাড়া রং চা দিন। ইদানীংকালে রং চা বেশ জনপ্রিয়, অনেকে মিষ্টি খাওয়ার পরও চিনিছাড়া রং চা খান। বাঙালির রুচির এও একটা অদ্ভুত দিক! যা-ই হোক, এটাও ঠিক-আমাদের অনেকের জীবন-ই-তো “চিনি ছাড়া রং চা’র মতো পানসে! শাহীনভাই চিনিসমেত চা খেলেন। আমি সিলেটি মানুষ, চায়ের-পরে পান না-খেলে যেন ‘কোর্স কমপ্লিট’ হয় না! পানের খিলি ৫ টাকা,লাল-চা প্রতিকাপ ৫টাকা। বেশ সস্তাই মনে হল। রতন জর্দা, হেনা-পাতি সমেত পানটা বেশ রসালু-সুস্বাদু। সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি শেষে গাড়ি ছুটে চলল।
সুমন বনিক : সম্পাদক- অগ্নিশিখা, সিলেট




