কামরুল হাসান বাদল
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তর একবারই এসেছিল, সে একাত্তর গৌরবের, সে একাত্তর অহংকারের। সে একাত্তর আর কখনও বাঙালির জীবনে আসবে না। কারণ বিশাল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হবে, অভ্যুত্থান হবে কিন্তু তার কোনোটিই কোনোভাবে একাত্তরকে স্পর্শ করতে পারবে না।
একাত্তরের কথা বলতে গেলে আমার মনে পড়ে, ফরাসি বিপ্লবের পটভূমিতে চার্লস ডিকেন্সের বিখ্যাত উপন্যাস ‘এ টেল অব টু সিটিজ’ (A Tale of Two Cities)-এর শুরুর উক্তিটি-
“It was the best of times, it was the worst of times, it was the age of wisdom, it was the age of foolishness, it was the epoch of belief, it was the epoch of incredulity, it was the season of light, it was the season of darkness, it was the spring of hope, it was the winter of despair, we had everything before us, we had nothing before us, we were all going direct to Heaven, we were all going direct the other way.’
গত শতকের ষাট দশক ছিল বিশ্বরাজনীতির এক সুবর্ণকাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একের পর এক স্বাধীন হচ্ছিল দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক শাসনে জর্জরিত দেশসমূহ। অন্যদিকে বাড়ছে সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বজুড়ে তরুণদের আগ্রহ। তার ধাক্কা এসে লেগেছিল তৎকালীন পরাধীন পুর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশেও। ছেষট্টি সালে বঙ্গবন্ধু ছয়দফা কর্মসূচি ঘোষণার পর দ্রুত পাল্টাতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি। পাকিস্তানের শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির অভিপ্রায়ে দলে দলে মানুষ আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে। শেখ মুজিবুর রহমান দেশের রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে উঠছেন। তাঁকে থামিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তানের আইয়ুব খান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। বঙ্গবন্ধুকে কারারুদ্ধ করে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা সাজানো হয়। সে উন্মাতাল সময়ে আগে থেকে সুসংগঠিত বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া সংগঠন ছাত্রলীগ এবং ডাকসু বিপ্লবী ভূমিকা পালন করে। সে সময় ডাকসুর ভিপি ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা তখন সর্বস্তরের ১১ দফায় পরিণত হয়ে সংঘটিত করে মহা গণ-অভ্যুত্থানের। বলা হয়ে থাকে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সে গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান নেতা।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বই শুধু দেননি, সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন এবং কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। সেই থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সিপাহসালার ।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন অন্যতম প্রধান সংগঠক। মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) চার প্রধানের একজন হিসেবে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালনসহ সংসদ সদস্য এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের সরকার গঠনে এবং দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
শুরুতে বলেছিলাম, একাত্তর বাঙালির জীবনে আর আসবে না। একাত্তরে বাঙালির চেতনা ও সাহস এভারেস্টের চূড়া স্পর্শ করেছিল। এই আরোহনের মূল অধিনায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু আর তোফায়েল আহমেদের মতো যোগ্য উত্তরসূরিদের মেধা, মনন ও দুঃসাহসে ভর করে নির্মিত হয়েছে একেকটি সিঁড়ি।
বাঙালির ইতিহাস নির্মাণের অন্যতম কারিগর দীর্ঘদিন চলৎশক্তিহীন থেকে অবশেষে ১ জুন মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুপরবর্তী তাঁর জানাজাকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকার তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলের কর্মী সমর্থকেরা যা কিছু করেছেন সে বিষয়ে বলারও অভিপ্রায় ক্ষীণতায় রূপ নিয়েছে। যাঁদের মেধা, শ্রম, সংগ্রামে ও ত্যাগে এই দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মরণের পরে সে দেশ বা রাষ্ট্র থেকে সামান্য সম্মান পাওয়া তো দূরের কথা, তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকুও তিনি পেলেন না। বিশ্বের কোনো দেশ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি এত উপেক্ষা, তাচ্ছিল্য ও অসম্মান প্রদর্শন করেনি। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাই শুধু অসম্মানিত হন না, যে চেতনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তাও মুছে ফেলা হয়।
চার্লস ডিকেন্সের সে উক্তির মতো, ‘It was the best of times, it was the worst of times, it was the age of wisdom, it was the age of foolishness, it was the epoch of belief, it was the epoch of incredulity, it was the season of light, it was the season of darkness,’ অর্থাৎ ‘সেটি ছিল সেরা সময়, সেটিই ছিল সবচেয়ে খারাপ সময়; সেটি ছিল জ্ঞানের যুগ, সেটিই ছিল মূর্খতার যুগ; সেটি ছিল বিশ্বাসের কাল, সেটিই ছিল সংশয়ের কাল; সেটি ছিল আলোর ঋতু, সেটিই ছিল অন্ধকারেরও ঋতু।’
একাত্তর আমাদের সেরা সময় ছিল সে সময় সৃষ্টি করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং তোফায়েলের মতো তাঁর সাহসী যোদ্ধারা। মনে রাখতে হবে এর বিপরীতে আরেকটি সময় ছিল যা খারাপের, মূর্খতার, সংশয় এবং অন্ধকারের।
রাষ্ট্র আজ তোফায়েল আহমেদকে যথাযোগ্য মর্যাদা না দিক, তাঁর সম্মানে বিউগলে করুণ সুর বাজুক না বাজুক, তাঁর সমাধিতে কোনো অভিধা উৎকীর্ণ থাকুক না থাকুক তাতে তোফায়েল আহমেদের ঔজ্জ্বল্য সামান্যও ম্লান হবে না। তাঁর স্বাধীন করা দেশ, দেশের প্রতিটি ধুলিকণায় লেখা হয়ে গেছে তাঁর নাম।
আপনাকে অভিবাদন বীর তোফায়েল আহমেদ।
কামরুল হাসান বাদল : কবি ও সাংবাদিক, চট্টগ্রাম




