গাজী গিয়াস উদ্দিন
ছাত্রজীবন থেকেই শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চায় ব্রতী কবি ও গবেষক ড. কাইছার কবির।তাঁর উচ্চতর শিক্ষা গবেষণাকর্ম ( এম,ফিল অভিসন্দর্ভ) “মাহবুব-উল আলম জীবন ও সাহিত্য” (প্রথম প্রকাশ : জুন ২০২১)। গ্রন্থখানি নিয়ে সুবিজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক গবেষকবৃন্দ যথার্থ বলেছেন : গ্রন্থটি মৌলিক ও সৃজনশীল। গ্রন্থ রচনায় লেখকের মেধা শ্রম অধ্যাবসায় ও প্রকাশভঙ্গির অভিনবত্ব স্বীকার করতে হয়।গবেষকের বিষয় নির্বাচন ও বিশ্লেষণে নতুনত্ব রয়েছে। এমনকি মাহবুব উল আলম এর মতো স্বল্পালোচিত বিষয় তিনি বেছে নিয়েছেন। মাহবুব উল আলম এর প্রায় সব ধরনের রচনার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করেছেন পরিশ্রমী লেখক কাইছার কবির। পুরো গবেষণা সাহিত্যে ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী রচিত জীবনীগ্রন্থ ‘মাহবুব উল আলম ‘ এর পর এ বিষয়ে দ্বিতীয় গ্রন্থ রচনার কৃতিত্ব ড. কাইছার কবিরের।
কে এই মাহবুব উল আলম? মাহবুব উল আলম বাংলা সাহিত্যের একজন বিস্মৃতপ্রায় বিশিষ্ট সাহিত্যশিল্পী। গল্প, উপন্যাস, জীবনী, স্মৃতিকথা, পত্রসাহিত্য, প্রবন্ধ রচনায় খ্যাতিমান। তিন খণ্ডে ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস”, ‘বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত’ তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্ম। স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এ মহান গদ্যশিল্পীর সম্পর্কে যথার্থ মূল্যায়নের অভাব পূরণ ছিল এ গবেষণার লক্ষ্য। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কাইছার কবিরকে এ গবেষণা পত্রের জন্যে এম,ফিল ডিগ্রি প্রদান করে। গবেষণাকর্মের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন প্রফেসর ড. মহীবুল আজিজ।
সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম এর জীবনীকার ড. কাইছার কবির গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে (ছোটগল্প) বর্ণিত তথ্যমতে, মাহবুব উল আলম এর সাহিত্যচর্চা শুরু হয় ১৯২০ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত কালীশঙ্কর চক্রবর্তী সম্পাদিত, সাপ্তাহিক জ্যোতি’র মাধ্যমে। ১৯২৩ সালে বের হয় তাঁর ছোট ভাই দিদারুল আলম এর সম্পাদনায় ‘যুগের আলো’। মাহবুব প্রথমে এ পত্রিকায় ‘গ্রাম্য চাষী’ ছদ্মনামে লিখতে আরম্ভ করেন। মাহে নও,দিলরুবা, আজাদ, আলহাদী, ইনসাফ প্রভৃতি পত্রপত্রিকায় তাঁর প্রচুর গল্প প্রকাশিত হয়। তখনকার পল্লিসর্বস্ব অবহেলিত মুসলিম সমাজব্যবস্থার মধ্যেই মাহবুব উল আলমকে সাহিত্য সাধনা করে যেতে হয়েছে।
মাহবুব উল আলম এর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ দুইটি। তাজিয়া ও পঞ্চঅন্ন। এসব গল্পে চট্টগ্রামের পল্লিপ্রকৃতি, হতদরিদ্র্যের জীবন সংগ্রাম, শিক্ষার পরিবেশ অবরুদ্ধতা ও ধর্মীয় সংস্কারের বিষয় ফুটে উঠেছে। মাহবুব নিজেই বলেছেন, জীবনের সংকট মুহূর্তের জন্যে যথার্থ সিদ্ধান্ত আবিষ্কার করা একজন গল্প লেখকের কর্তব্য। তাঁর চারটি উপন্যাস পল্টন জীবনের স্মৃতি (১৯৪০), মোমেনের জবানবন্দী (১৯৪৬) (আত্মজৈবনিক উপন্যাস), মফিজন (১৯৪৬) ও গাঁয়ের মায়া (১৯৪৯)। তাছাড়া ‘বাঙ্গালীর মুক্তি-যুদ্ধের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দলিল।
সবশেষে মাহবুব উল আলম এর বিবিধ রচনা, সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি পাঠকের প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্র। উপসংহারে কাইছার কবির মাহবুবকে শিল্পসাধনায় ও মানবিক মূল্যবোধে নজরুল রুমি ও ওমর খৈয়াম এর সাথে তুলনা করেন। মাহবুব এর লেখায় রুশ সাহিত্যিক দস্তয়েভস্কি’র স্বদেশের মাটি ও মানুষের পরিচয় পরিদৃষ্ট বলে বর্ণনা করেন।
মাহবুব- উল আলম (১৮৯৮-১৯৮১) এর সাথে ১৯১৭ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলামের করাচি সেনানিবাসে পরিচয় ঘটে।মাহবুব উল আলমের ছোট ভাই দিদারুল আলম এর সাথে নজরুলের সখ্য গড়ে উঠে। তাঁদের বাড়িতে ১৯২৯ সালের ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি নজরুল আতিথিয়েতা গ্রহণ করেন। এসময় ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতা রচনা করেন। প্রথিতযশা সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়ের সাথেও আলমের পরিচয় ঘটে। অন্নদাশঙ্কর রায় তখন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক। আর মাহবুব উল আলম সাবরেজিস্ট্রার পদে চাকরি করতেন। ১৯৩০ সালে মাসিক মোহাম্মদী-তে আলমের পল্টন জীবনের স্মৃতি এবং ১৯৩৩ সালে বুলবুল- এ মোমেনের জবানবন্দী ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ফলে বই দুটো শিক্ষিত সমাজে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং সর্বত্র আলোচিত হতে থাকে। এসব লেখার স্বকীয়তা ও মৌলিকত্ব সুধী মহলে মূল্যায়িত হয়। কাইছার কবির বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে এসব দুর্লভ তথ্য তুলে ধরেন।
আলোচ্য গ্রন্থ পাঠে আমরা জানতে পারি, তিরিশের দশকে বাংলা কথাসাহিত্যে যাঁরা নতুনধারার সূচনা করেন। তন্মধ্যে মাহবুব উল আলম এবং আবুল ফজল তিরিশোত্তর কল্লোলীয় সাহিত্যরীতি দ্বারা প্রভাবিত হন।উত্তর জীবনে মাহবুব উল আলম সাংবাদিকতায় ব্রতী হন। চিন্তা কর্মে ও সৃষ্টিতে তিনি ছিলেন সমসাময়িক বাঙালি মুসলিম সমাজের প্রতিভূ।
মাহবুব উল আলম ১৮৯৮ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ফতেয়াবাদে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ১ মে তাঁর জন্মদিন হওয়ায় তিনি নিজেকে ‘সাহিত্যের দিনমজুর’ পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। দেশে বিদেশে বহু সম্মানসূচক পুরস্কার ও অর্জন সত্ত্বেও তিনি বলতেন, “ডক্টর নই, প্রফেসর নই, আমি সাহিত্যের দিনমজুর”। মাহবুব উল আলম সরকারি চাকরি শেষে ১৯৫৪ সালে ২৮ অক্টোবর ‘সাপ্তাহিক জমানা’ (১৯৫৯ সালে দৈনিক জমানা) প্রকাশ করেন। তিনি নিজেই ছিলেন এ পত্রিকার সাংবাদিক সম্পাদক প্রকাশক, কখনো নিজের পত্রিকার নিজেই বিক্রেতা। বুদ্ধিজীবী মহলে এটি সাহিত্য পত্রিকার খোরাক মেটাতো।
সাহিত্য ও জীবন সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম এর দৃষ্টিতে কোনো পৃথক সত্তা ছিল না। পরিপূরক শক্তি। তাঁর মতে, প্রকৃত সাহিত্য কখনো সত্যভ্রষ্ট হতে পারে না।’ যে মানুষ লেখে সে নিজের অজ্ঞাতসারেই সত্যলগ্ন থাকে। ড. কাইছার কবির ” শেষ জীবন ও মৃত্যু “অধ্যায়ে সুনিপুণ বর্ণনা দেন এভাবে : “শেষ বয়সেও তাঁর মানসিক শক্তি ও স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। তিনি প্রতিনিয়ত জীবনকে নতুন করে চালিত করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই হেঁটে গেছেন জীবনপথে।……. কোনো ধর্মীয় উচ্ছ্বাস অথবা গোঁড়ামি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং লেখাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি।….. তাঁর লেখাতে কোরানের আদর্শ ও গান্ধীর নীতিবোধের প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায়”।
” মাহবুব-উল আলম জীবন ও সাহিত্য ” বাংলা সাহিত্যের গবেষণা ইতিহাসে এক অসামান্য মাইলফলক। সর্ববিষয়ে এতটা বিশদ আলোচনা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য ও উপকরণের সমৃদ্ধ সন্নিবেশনা বিস্ময়কর। আমরা মনে করি এ মহৎ সাহিত্যকর্মের জন্যে সাহিত্য মহল কাইছার কবিরকে সুদীর্ঘকাল মনে রাখবে।
‘ মাহবুব উল আলম জীবন ও সাহিত্য ‘। প্রথম প্রকাশ জুন ২০২১,বলাকা প্রকাশন, চট্টগ্রাম। মূল্য : ৬০০ টাকা।
গাজী গিয়াস উদ্দিন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সংগঠক, লক্ষ্মীপুর




