পাহাড়ি ঝরনার মুগ্ধতা
বছরের পর বছর একটি শুকনো উঠোনে
কত অজস্র বৃষ্টির জল পতিত হয়।
জলের স্পর্শে কেবল ভিজে ওঠে উপরের ধুলোমাটি;
সেই জল ভেজাতে পারে না মাটির গহিন অস্তিত্ব।
কত পরিচিত রাস্তা প্রতিদিন জুতোর তলা ক্ষয়ে,
কত চেনা বাতাস ছুঁয়ে যায় শরীর,
তবু তারা হৃদয় দরজায় কড়া নাড়ার একটা শব্দও করে না।
পরিচয় তো কেবল কিছু শব্দের আদান-প্রদান,
অভ্যাসের ছকে কাটানো কিছু দিনের অপরিহার্য দুপুর।
অথচ দূর কোনো অচেনা পাহাড় থেকে
একদিন ভেসে আসে অচেনা এক ঝরনার সুর।
এক ঝলক আলো এসে জানিয়ে দিয়ে যায় রূপকথার বার্তা,
হঠাৎ দেখা কোনো এক নক্ষত্র আলো জ্বেলে দেয় অন্তরে।
একটু চোখে চোখ রেখে তাকানো,
কিংবা বাতাসের দোলায় খসে পড়া দু-একটি কথা;
আর অমনি খাঁ খাঁ রোদে পোড়া বালুচর
এক নিমেষেই সমুদ্রের নোনা জলের স্পর্শে ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
ভালোবাসা তো শুধু দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা তাজমহল নয়,
হতে পারে হঠাৎ বজ্রপাতের আলোর চোখ ঝলসানো মুগ্ধতা ;
যা চির চেনা সব সমীকরণ ভেঙে দিয়ে
হৃদয়কে নিয়ে যায় অন্য কোনো অচিন ঠিকানায়।
পরিব্রাজক ঢেউ
আমার শান্ত সাগর, যেখানে জল ছিল স্থির।
হঠাৎ অনাহূত এক পরিভ্রাজক ঢেউ এল;
পায়ে যার অচেনা পথের ধূলিকণা,
আচারে যার ঝড়ের পূর্বাভাস।
অথচ আমার আর পরিভ্রাজক ঢেউয়ের ভাষা সাধারণ ছিল না।
সে বলত ক্ষণিকের উষ্ণতার উপাখ্যান,
আর আমি খুঁজেছি দীর্ঘ নীরবতার ব্যাকরণ।
তার স্পর্শে বুকজুড়ে নেমে এলো প্রবল ঘূর্ণিঝড়,
শান্ত জলরাশির উত্তালে চুরমার হলো আমার সাজানো তীর।
তারপর?
ঝড় শেষে পরিভ্রাজক ঢেউ ঠিকই ফিরে গেল তার চিরচেনা দিগন্তে,
রেখে গেল শুধু ভেঙে যাওয়া তীরের রেখা।
এখন সাগর আবার শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে,
কিন্তু তলদেশে জমে থাকে নোনা বিরহ।
আর আমি একাকী দাঁড়িয়ে গিলে খাই
সেই না-বলা কথা আর থিতিয়ে আসা ঢেউয়ের অবশেষ।
প্রেমের বন্দিশালা নেই
হেমন্তের কোনো এক ধূসর গোধূলিতে
যখন চালতাগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে
ঝরে পড়ে হলুদ রোদের শেষ রেশ,
তখন আমি বুঝি;
প্রেমের কোনো দেয়াল থাকে না।
সে তো ভোরের ডানাভাঙা শালিকের ওড়ার মতো নিঃশব্দ,
হিজল আর জামের বনে জমে থাকা কুয়াশার মতো অধরা।
তাকে কোনো সোনার খাঁচায় আটকে রাখা যায় না,
না পারা যায় লোহার শিকলে বাঁধতে তার চঞ্চল ডানা।
যেখানে শিকলের শর্ত ওঠে,
যেখানে থাকে পাহারা আর হিসাবের কড়াকড়ি;
সেখানে প্রেম জন্মায় না;
সেখানে শুধু থেকে যায় ধূসর রূপসী বাংলার একাকী কোনো বিষাদ।
প্রেম তো এক অপার রূপসীর মতো;
ধানসিঁড়ির তীরে, কার্তিক নক্ষত্রের নিচে
বাতাসের সাথে গান গেয়ে যে মিলিয়ে যায় দূর নক্ষত্রলোকে,
যার কোনো কারাগার নেই,
যার কোনো বন্দীশালা নেই এই পৃথিবীতে।
এখনও বিরহ গিলে খাই
এখনও কেউ এসে হাওয়ার মতো সামনে দাঁড়ায় ,
হাতে নিয়ে অচেনা কোনো ঢেউয়ের প্রস্তাব।
কিন্তু তার আর আমার সুর এক তারে মিলে না,
আমাদের ঢেউ কথা বলে ভিন্ন দুটি ভাষায়;
ভাষান্তরে এক দোলাচল,
যেখানে ব্যাকরণ কেবলই এক তরফা বোঝাপড়া।
সে আসে শান্ত সাগরে অচমকা ঝড় তুলবে বলে,
স্থির জলেও কাঁপন ধরিয়ে দেয় তার চঞ্চল পা।
তারপর সমুদ্রের বুক চিরে ঘূর্ণিঝড় হয়ে
অল্প কটি দিনের জন্য হৃদয়টাকে উত্তাল করে দিয়ে,
ঠিক যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই হাওয়া হয়ে যায়।
ঝড় থেমে গেলে থেকে যায় সমুদ্রের নোনা জল,
আর এক বুক নিস্তব্ধ হাহাকার।
তার রেখে যাওয়া তাণ্ডবের পর আমি শুধু নীরবে বসে থাকি,
আর একা একা বিরহ গিলে খাই।




