মহীবুল আজিজ
একটা কোকিল এল্মগাছটার ওপর দিয়ে ডাকতে ডাকতে ওয়েস্ট রোড হয়ে পাইনহার্স্টের দিকে উড়ে চলে গেলে মিল্কম্যানটাও ঠিক তখনই দুধের বোতলটা নিঃশব্দে রেখে যায়। পোস্টম্যান দুইবার বেল বাজালেও এই ভোরের বেলা মিল্কম্যানরা ঘুম ভাঙায় না কারও। এক বাটি কেলোগ্স্ কর্ন ফ্লেক্স আর স্কিম্ড্ মিল্ক নিয়ে বসেছিলাম চ্যানেল ফোরে জোসেফ গোয়েবেল্স্-এর সাক্ষাৎকার দেখবো বলে। কিনসাইড হাউসের কেউই জেগে ওঠে নি। নিচতলার লাউঞ্জের পাশের কক্ষটাই জার্মান মার্গারেট মেহল্-এর। একটু পরে উঠেই শুরু করবে বেহালার রেওয়াজ। হয়তো আন্তোনিও ভিভালদি কিংবা ফেলিক্স মেন্ডেলশোন বাজাবে জানলার পাশে বসে। গোয়েবেল্স্-এর কাঠকাঠ নিরাবেগ ইস্পাতমুখটা পর্দায় ভেসে উঠতেই কেউ দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢোকে এবং প্রথমে খানিকটা সতর্ক উৎকর্ণতা বজায় রেখে মুখ ঘুরিয়ে পেছন ফিরতেই দেখি ছিপছিপে গড়নের এক তরুণি মাঝারো আকৃতির একটা বাদামি স্যুটকেস আর গায়ে এল্ লেখা একটা কফিরঙা প্লাস্টিকের বড়ো ব্যাগ নিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে লাউঞ্জে এসে ঢুকলো। দেখে বুঝতে পারা যায় অটাম সেশনের কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী কিন্তু কোন্ সে বিদেশ সেটা বোঝা মুশকিল। ক’মাস আগেই কস্তুরিকে দেখে মনে হলো কোলকাতার কি আসামের মেয়ে। না কস্তুরি আতুরাপানে সিংহলি, ক্যান্ডিনিবাসী। দেশে সিংহলি আর তামিলরা একটা আরেকটাকে পারলে খেয়ে ফেলে অথচ জাফনা’র শিবমকে বিয়ে করে কস্তুরি সুখেই আছে। সেরকমটাই মনে হয়েছিল প্রথমটায়, তবে সিংহলি কস্তুরি যতটা বাদামি সমাগত তরুণি ততটাই ফর্সা।
হোমায়রা কোরেশি পাকিস্তানি। “আই এ্যাম ফ্রম লাহোর”— বলার সময় ‘হ’-কে ঘিরে রাখা তার উষ্ণতার বৃত্ত খানিকটা প্রলম্বিত দেখে আমার বুঝতে কষ্ট হয় না, মেয়েটির স্বরে ঝিকিয়ে ওঠে বস্তুত পাঞ্জাবি আভিজাত্য। হিথ্রোয় নেমে ট্যাক্সিক্যাবে দেড় ঘণ্টায় কেম্ব্রিজ। সেক্রেটারি’র চিঠিতে সমস্ত নির্দেশনা দেওয়াই থাকে, এমনকি পোর্টার লজ-এ খামের ওপর হোমায়রা লেখা আর ভেতরে প্রয়োজনীয় সবক’টা দরোজা খোলার একটাই ‘মাস্টার কী’। আমার একটা কক্ষ পরেই ওর ছয় নম্বর। ওর বিষয় আইন এবং সে এমফিল করবে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে। সৌজন্যের বশে তাকে সকালের নাস্তার প্রস্তাব দিতেই কৃতজ্ঞতা তার কন্ঠে, কারণ যাত্রার ক্লান্তি আর ক্ষুধা কিছুটা হলেও বিপন্ন করেছিল তাকে। আর এসেই এই ভোরের বেলা সবকিছুর আগে যে খাবারের বন্দোবস্ত করা দরকার সেটা হয়তো সে ভুলেই যায়। তবে, তার স্যুটকেসে আলমন্ড বাদামের সুঘ্রাণযুক্ত লাহোরের বিখ্যাত নানখাতাই রয়েছে প্লাস্টিকের ব্যাগে। তার প্রস্তাবনা তখনকার মতো ফিরিয়ে দিতে হলো। স্যুটকেসটা খুলে আবার একটা ব্যাগ খুলে খাবার বের করে আনার ঝক্কি থেকে তাকে মুক্তি দেওয়াটাই শ্রেয়, ভেবে আমি তাকে মার্ক্স এ্যান্ড স্পেন্সারের লোফ আর একটা ডিমের ওমলেট করে দিলে সে আমার মুখোমুখি টেবিলে। চা কিংবা কফি দু’টোই তার দুধমুক্ত বলে আমি তাকে ফোল্কার্ট কফি বানিয়ে দিলে হোমায়রা তা এমন আয়েশের সঙ্গে পান করতে থাকে যেন বহুদিন পর বহু ব্যস্ততার পর তার একটা দুর্ভাবনামুক্ত দিন এলো একটু আরাম করে বসার। অথচ তার ব্যস্ততার দিনের কেবলই শুরু।
উপমহাদেশীয় হেমন্তের শীত-শীত আমেজ এখানে কিন্তু হাড়ের পর্দা কাঁপিয়ে দেয়। পরনের কামিজ আর গ্যাবাডিনের প্যান্টের ওপর তার চামড়ার জ্যাকেটটা ততক্ষণে আল্গা করে নেয় হোমায়রা। খাবার আর কফির জন্য আবারও ধন্যবাদ দিয়ে দুই হাতের তালুতে একটা বন্ধনীর মতোন বানিয়ে সেটা দিয়ে ঘিরে ধরে সিরামিকের মগ। তাতে মগের উষ্ণতা ক্রমে তার আঙুল আর কব্জি হয়ে শরীরমুখী হয়। অবশ্য একটা কাপ কফির গরম আর কতটাই হতে পারে। কিন্তু হোমায়রার আকস্মিক সংলাপের জন্য আমার কোনো প্রস্তুতি ছিল না, হয়তো ওরও ছিল না। কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে আমি বাংলাদেশের জেনে সে কণ্ঠে সহানুভূতির একটা বিশেষ ভঙ্গি এনে বলে—
: ও, তুমি বাংলাদেশের! আমরা কিন্তু এখনও ষোলো ডিসেম্বর এলে অনেক কষ্ট অনুভব করি।
আচমকা ওর কথায় আমি দৃষ্টিকে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে ধরতে চাই। ওর কথায় আমার সারা গায়ে ফুসকুড়ির মতো অস্বস্তির কাঁটা অদৃশ্য অথচ বাস্তব হয়ে আমাকে তীব্র খোঁচা দিলে আমি পাল্টা প্রশ্নের তীর ছুঁড়ি হোমায়রার দিকে—
: কেন, তোমরা কেন কষ্ট অনুভব করবে ষোলোই ডিসেম্বর এলে?
বাইরে তখন একটা ঘন্টি শোনা গেল সাইকেলের। কেউ নিশ্চয়ই ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবের দিকে চলেছে কিন্তু এত সকালে কারও ঘন্টি বাজানোর কথা নয়। হতে পারে বাদামলোভী কোনো কাঠবিড়ালী লাফিয়ে এসে পড়েছিল চাকার কাছাকাছি। সতর্কতার বাইরে নয় কাঠবিড়ালীও। আমার প্রশ্নটাকে একটু যেন নাড়াচাড়া করে নেয় হোমায়রা। হয়তো সে আমার কাছ থেকে যে-প্রত্যুত্তর বা সম্পূরক কথকতা আশা করেছিল আমার প্রশ্নসূচকতা তার বিপরীত হওয়ায় একটুখানি অপ্রস্তুত ভাব জেগেছে তার মধ্যে। অবশ্য ওর কথার সবটা আমার হৃদয়ঙ্গম হয়েছে সেটা দাবি করা অনুচিত। আমি কেবল আমার নির্দোষ ও কৌতূহলী আবেগে জানতে চেয়েছি, আমাদের ষোলোই ডিসেম্বরে ওর কষ্টের কারণ। যেহেতু ষোলো তারিখটার সঙ্গে গভীর গভীরতর সম্পর্ক আমার এবং আমাদের হৃদয়ের সেখানে আমাদের সেই হৃদয়ে মারাত্মক ক্ষত’র সৃষ্টি করা পাকিস্তানি পক্ষের হয়ে কেন সে কষ্ট অনুভব করবে। হোমায়রার কথাটা আমার চেতনায় কোনোভাবেই সংযুক্তির বোধ আনতে পারে না। আমি তাই তাকে বিনা যুক্তিতে ছেড়ে দিতে চাই না। বিষয়টার সঙ্গে নিজের মান-সম্মান শুধু নয়, অস্তিত্বের অবস্থানটাও জড়িত বলে আমার মনে হলো। মনের মধ্যে একটা সংশয় আমার, কষ্ট কী এতোটাই সহজলভ্য অনুভূতি যে একটা গভীর চেতনাশ্রিত বোধ আমার মধ্যে বছরের পর বছর জমে ওঠা সংবেদনায় যেটা আবৃত হয়ে রয়েছে, যেটিকে সে এক ঝটকায় তার বোধ্যতার আওতায় নিয়ে যাবে! এ কী কাঠবিড়ালীর বাদাম চেয়ে না পাওয়ার কষ্ট! গন্তব্যমুখী শেষ ট্রেন ধরতে না পারার কষ্ট! হঠাৎ হারিয়ে ফেলা কোনো প্রিয়জনের জন্য কষ্ট! আকস্মিক আচ্ছন্নতার ঘোর কাটে হোমায়রার কথায়—
: না, মানে ষোলো ডিসেম্বর এলে তোমরা যখন বিজয়-উৎসবে মাতো তখন আমরা এই ভেবে কষ্ট পাই, আমাদের দেশটা কেন ভাগ হয়ে গেল! আমরা এক ছিলাম, কিন্তু ভেঙ্গে গিয়ে আলাদা হয়ে গেলাম।
হোমায়রার কথায় কেউ একটা দেশলাইকাঠির সংযোগে আমার ভেতরে জ্বালিয়ে দেয় আকস্মিক আগুন। চমৎকার প্রিন্টের ঝলমলে সালোয়ার কামিজ আর জ্যাকেটের আড়ালে থাকা তরুণী হোমায়রা কোরেশিকে মুহূর্তে আমার অন্য সত্তার মানুষ মনে হলে আমি আমার ভেতরে থাকা প্রশ্নের আঁকশি দিয়ে খুঁড়তে চেষ্টা করি ওর ভেতরটা। যে-ষোলোর জন্য সে কষ্ট অনুভব করে বলছিল সেই ষোলোতে তার জন্মই হয় নি। তাহলে আমাদের ষোলো সম্পর্কিত তার এই অনুভূতিটা নিশ্চয়ই তার পূর্ববর্তী কোনো মানুষের বা মানুষদের ষোলোসম্পর্কিত অনুভূতির পরিণাম যা সে পেয়েছে অধমর্ণ হিসেবে উত্তমর্ণের কাছ থেকে। আমার ষোলো ডিসেম্বরে তার কষ্টের কারণটা নিশ্চয়ই অন্য কোনো উৎস থেকে এসে তার মধ্যে ঢুকেছে। কিন্তু সেটা যে অকৃত্রিম নয় তাতে যে খাদ আছে সেটা তাকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। এই ভোরের বেলা যখন সে তার শিক্ষাজীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সূচকসিঁড়িতে কেবল পা রেখেছে তখন তাকে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি করা কতোটা যৌক্তিক সে-প্রশ্ন আমার মনে উঁকি দিলেও একই সঙ্গে একটা অস্বস্তির বিদ্ধতা আমাকে ভেতরে-ভেতরে অপদস্থ করতে থাকলে আমি হোমায়রাকে সঠিক জবাব দেওয়াটা প্রয়োজন মনে করি। ওর কফি শেষ। শেষ আমারটাও কিন্তু নিচ থেকে দোতলায় তার কক্ষে যাওয়ার প্রাক্কালে তাকে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয় আমার কথা। হতে পারে, এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়াটা এটাই প্রথম কিংবা আমার আপ্যায়ণের ঋণ খানিকটা ফিরিয়ে দেওয়ার সহজাত মানসিকতা অকস্মাৎ জেগে উঠেছে তার মনের মধ্যে। আমি ততক্ষণে আমার ও আমাদের ষোলোতে তার সেই কষ্ট অনুভব করবার কথার জবাব যতোটা সম্ভব গুছিয়ে নিয়েছি। কেননা, জবাবটা তার শোনা দরকার। তা নাহলে সে সারাটা সময় তার নিজের উপলব্ধিটাকেই সঠিক বলে ভেবে যাবে। তার সেই উপলব্ধিটা তার একার মনে হলেও আসলে একার নয়, তাতে অপর হিসেবে রয়ে গেছি আমি এবং আমরাও। আজ সকালবেলা ঘটনাচক্রে নিতান্ত সমাপতনিকতার ফল হিসেবে তার সঙ্গে আমার দেখা। নইলে কে জানতো, আমার এবং আমাদের সকলের একটা প্রগাঢ় অনুভূতির মধ্যে সে এবং তারাও এতোটা তীব্রভাবে বর্তমান হয়ে আছে! হোমায়রা মনোযোগ দিয়ে শোনে আমাকে এবং সকালের নির্জনতার সহযোগ আমি পাই নির্বিবাদে—
: আমাদের ষোলোতে তোমরা কেন কষ্ট পাও সেটা ভেবে আমি অবাক এবং কিছুটা কৌতুকই অনুভব করি। কষ্ট পাবো আমরা কারণ তোমরা, মানে তোমাদের পূর্বপুরুষেরা এই কষ্টের জন্য দায়ী। তারাই সৃষ্টি করেছে এই কষ্ট বেদনা ও যন্ত্রণাকে। তুমি যে কষ্ট পাওয়ার কথা বলছো সেটা আসলে কষ্ট নয়, কষ্টের আবরণে ঢাকা একটা ফালতু আবেগ। তুমি জানো, তুমি যে কষ্ট পাওয়ার কথা বলছো সেটা আমাকে উপহাস এবং বিদ্রূপ। তুমি জিজ্ঞ্যেস করো তোমাদের সেই পুরুষদের, আমরা কি তোমাদের আক্রমণ ও আঘাত করেছিলাম নাকি তোমরা? আমরা কেবল তোামাদের অন্যায় স্বৈর-স্বেচ্ছাচারী আচরণের প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ করেছিলাম। সমস্ত মৃত্যু এবং যন্ত্রণাভোগের শিকার আমরা হয়েছিলাম। বলতে পারো, তোমরা কী মৃত্যু আর কোন্ যন্ত্রণাভোগের শিকার হয়েছিলে? মিস হোমায়রা, তুমি শুনে রাখো, তুমি যা বলছো তা একদম ঠিক নয়। আমি দুঃখিত তোমার আসার সঙ্গে সঙ্গে কথাগুলো তোমাকে শুনতে হলো বলে, কিন্তু আমার আর কোনো উপায় ছিল না। কথাটা আসলে আমি তুলি নি, তুমিই তুলেছো।
কথাগুলো বলে আমি একবার হোমায়রার দিকে তাকাই, একবার জানলা দিয়ে বাইরে। বেরিফলের একটা ঝোঁপের ওপর ছোট্ট মুনিয়ার মতো দু’তিনটে পাখি বসি বসি করেও না বসে উড়ে চলে যায় ম্যাডিংলে রোডের দিকে। ভালো করে একবার পরখ করতে গিয়ে দেখি হোমায়রার মুখাবয়বে ্একটু আগেকার স্মিত ভাবটা উধাও। গম্ভীর প্রায় হতোদ্যম হয়ে সে তাকায়, কিংবা হয়তোবা তার দৃষ্টিতে আমি আমার প্রত্যুত্তরের মধ্য দিয়ে দুর্জ্ঞেয় কোনো ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি যার ঠিক-ঠিক পাঠোদ্ধার সম্ভব নয়। সেই চেষ্টা অবশ্য করেও না হোমায়রা। মনে হলো আমার জবাব এবং ভ্রমণের ক্লান্তি তাকে পেয়ে বসতে শুরু করেছে। ফলে, আমার কথার জবাবে তার কোনো কথা তখনকার মতো না থাকলে সে গম্ভীর মুখে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দোতলায় তার নির্দিষ্ট কক্ষের দিকে এগোবার উদ্যোগ নেয়। তখনও, তার প্রতি হঠাৎ জমে ওঠা একটা অপ্রকাশ্য ক্ষোভ সত্ত্বেও সৌজন্যের বশে তার স্যুটকেসটা দোতলায় পৌঁছে দেবার প্রস্তাব করি এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ধন্যবাদযোগে হোমায়রা সে-প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সিঁড়িতে পা দেয়। এরিমধ্যে ক্রমাগত ওঠানামার ফলে নয়টা সিঁড়ি আমার মুখস্থ। নয় আর নয় এবং মাঝখানে ছোট্ট একটুখানি চৌকো ল্যান্ডিং মিলিয়ে হোমায়রাকে মোটামুটিভাবে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই ভারবাহী হতে হয়। পাঞ্জাবি জাতির বৈশিষ্ট্য স্মরণ করলে এটা নিশ্চিত বলা যায়, মেয়ে হলেও একটা স্যুটকেস আর একটা কাঁধব্যাগে তার পরিশ্রম ততটা অবর্ণনীয় হওয়ার কথা নয়।
হোমায়রা কোরেশির সঙ্গে সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত অম্লমধুরই হয়ে গেল যেখানে আবার অম্লের ভাগই অধিক। ক্লেয়ার হলের এই ‘কিনসাইড হাউজে’র বারোটা কক্ষে অন্তত দশটা দেশের শিক্ষার্থীর বাস। দিনের কখনো না কখনো সকলের সঙ্গে সকলের দেখা হয়। আবার এমনও হয় সপ্তাহের একটা দিনের জন্যও কোনো একজনের দেখা মেলে না। কেউ উইক-এন্ডে বেড়াতে চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও। কারোবা ফিল্ডওয়ার্কে নমুনা-সংগ্রহের কাজে টানা কয়েকটা দিনই কাটাতে হয় কেম্ব্রিজের বাইরে। তবে দূরত্বের কারণে আমাদের মতো উপমহাদেশীয়দের থেকে যেতে হয় একই অবস্থানে। তাও কেউ লন্ডন যাচ্ছে কেউ ওয়ারউইকশায়ারে কিংবা কেউ নরউইচ দুর্গ দেখবার জন্য। ফিরে এলে দেখা যায় শেক্সপিয়রের জন্মস্থানের বা ওয়ারউইক দুর্গের স্যুভেনির শোভা পাচ্ছে বুকশেল্ফের ওপর কিংবা পড়ার টেবিলের কোণে। আমার মতো হোমায়রারও ভোরে ওঠা অভ্যেস। সকালে লাউঞ্জে নাস্তার টেবিলে লবিতে কিংবা এমনকি লাইব্রেরিতে বা সিটি সেন্টারের মার্কেট প্লেসে হুটহাট দেখা হয়ে যায়। বিলেতি কেতায় একজনের সঙ্গে দিনে যতোবার দেখা হয় ততোবারই পারস্পরিক সম্ভাষণ বিনিময় চলে। এটাই স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। কিন্তু লক্ষ করি, আমি সম্ভাষণে উদ্যত হলেও প্রতিক্রিয়ায় হোমায়রা নির্বিকার। অনেকটা না দেখার বা না শোনার একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য নিয়ে পাশ কাটিয়ে যায় সে। অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারি, হেমায়রা আমাকে এড়িয়ে চলেছে। প্রতিক্রিয়ায় তাকে এড়িয়ে চলতে থাকি আমিও। উইক এন্ডের দুপুরে মহারাষ্ট্রের বীরস্বামীর সঙ্গে হিন্দি/উর্দুতে কথা বলতে তার সমস্যা হয় না কিন্তু পাশের সোফায় আমার উপস্থিতিকে সে পরিপূর্ণভাবে অস্বীকার করে। ওরা দু’জন দুই দেশের হলেও আমার কাছে মনে হয় ভাষাগতভাবে তারা একে অপরের নিকট জন। দীনেশ যদি বলে ‘সমাচার সমাপ্ত হুয়ে’ তাহলে হোামায়রা বলছে ‘খবর খতম হুয়ে’। মোটামুটি একইরকমের। আমাকে তার এড়িয়ে চলার কারণটা ততো জটিল নয়। সেই যে প্রথম দিন তাকে আপ্যায়ণ এবং তার কথার সঙ্গত প্রতিবাদ করি সেটা সে ভোলে নি। হয়তো আপ্যায়ণের বিষয়টাকে তুচ্ছ ভেবে ইতিহাসের মতান্তরকে সে পরিণত করেছে মনান্তরে। সেটা সে করে থাকলেও আমার পক্ষে তার মনের ভেতরে ঢুকে পড়ে সেই বর্তমানতাকে যেহেতু পাল্টে দেওয়া সম্ভব নয় আমি তাই বাস্তবতা মেনে নিয়ে পারস্পরিক এড়িয়ে যাওয়াটাকেই আরামের ও নিরাপদ ভাবি।
কিন্তু তা সত্ত্বেও নিয়তি হয়তো আমাদের জন্য কোথাও সংরক্ষিত রেখে দেয় পরীক্ষাপর্বের প্রতিবন্ধকতা যেটা পেরোতে গিয়ে সম্মুখীন হতে হয় দারুণ কসরতে। হৈমন্তিক শিক্ষাপর্ব শুরুর দিনকয়েকের মধ্যে প্রতিটি হলে ‘মেক আ ডিশে’র আনুষ্ঠানিকতা চলে। এর মূল উদ্দেশ্য উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্প্রীতি ও সামাজিকতার বন্ধন গড়া। একে অন্যকে জানার মাধ্যমে পৃথিবীর নানা জাতির ও নানা বর্ণের মানুষের মধ্যে নৈকট্যের সেতুবন্ধ রচনাও এর একটা উদ্দেশ্য। লাউঞ্জের বড়ো টেবিলে যার-যার নিজস্ব খাবার নিয়ে আমরা হাজির এক উত্তীর্ণ সন্ধ্যায়। একটা বড়ো পাইরেক্সের ডিশে আমার বানানো চিকেন টিকিয়া মসালা শাদা আলোর প্রেক্ষাপটে রচনা করে লালচে আভা। ফ্রান্সের থমাস বানিয়েছে বাটার ক্রোয়াসোঁ। ফিনল্যান্ডের এ্যান ফিনেল আপেল টার্ট। আয়ারল্যান্ডের শন ফোগান জ্যাকেট পোট্যাটো আর কার্প-ফ্রাই। জার্মানির মার্গারেট মেহল মার্জিপান বিস্কিট। মজার ব্যাপার কারও ডিশই পরিচয়চিহ্নিত নয়, সেটা অনুমানসাপেক্ষ। হোমায়রার তৈরি করা খাবার সহজেই সনাক্ত করা সম্ভব আমার পক্ষে: মুর্গির কোর্মা এবং সেটা রান্না করা হয়েছে একটু ভিন্ন ধরনে। কাঁচা মরিচের ঝালের সঙ্গে দুধ এবং নারকেলের যৌথতা একটা ভিন্ন রকমের স্বাদ আনে। আমার চিকেন টিকিয়া মসালা এবং হোামায়রার কোর্মা অল্প সময়ের মধ্যে ‘সোল্ড আউট’। সেই সঙ্গে ইতালির গ্রাৎসিয়া’র তিরামিসু কেক-এর ডেজার্ট। খেতে খেতে গল্প চলে। আমার এবং হোমায়রার আসনের মাঝখানকার আসনে আইরিশ জেসিকা। ইতিহাসে পিএইচডি-র শিক্ষার্থী জেসিকা’র কাছে আমি জানতে চাই আয়ারল্যান্ডের বিখ্যাত ‘পোট্যাটো ফ্যামিন’ সম্পর্কে যে-দুর্ভিক্ষ রোগশোক আর বিপর্যয় ১৮৪৫ থেকে ১৮৫২ পর্যন্ত দগ্ধে-দগ্ধে মারে আইরিশ জাতিকে। দেখলাম আমার দিকে সরাসরি না তাকালেও হোমায়রা সাগ্রহে অনুসরণ করে চলে আমার প্রশ্নের জবাবে উত্তরদানরত জেসিকাকে। একথা সেকথায় উঠে আসে আমাদের ভাষা-আন্দোলন প্রসঙ্গ। জেসিকার কাছে সেটা একটা দারুণ ঐতিহাসিক ঘটনা। ওর কোর্স-শিক্ষক এ্যান্থনি ল’ ভারতীয় উপমহাদেশীয় এবং কমনওয়েল্থ্ হিস্ট্রি’র বিশেষজ্ঞ। ওঁর কাছেই জেসিকা প্রথম পূর্ববাংলার ভাষা-আন্দোলনের বিষয়টা জানতে পারে। তাছাড়া আলজেরিয়াতে কাতেব ইয়াসিনের নেতৃত্বে আরব ভাষা-উপনিবেশবিরোধী তামাঝিঘ্ট্ভাষী প্রাচীন আলজেরিয় জাতির ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবিতে যে-সংগ্রাম ও আন্দোলন হয় সেটাও জেসিকার জানা। আচমকা আমাকে প্রশ্ন করে জেসিকা, যারা শহিদ হয়েছিল তাদের কারা হত্যা করেছিল এবং কাদের আদেশে সেটা ঘটেছিল। জেসিকার প্রশ্নোত্তরের জন্য আামাকে মুহূর্তকালও ভাবতে হয় না। কেননা, এর উত্তরটা আমার সত্তার মধ্যে গাঁথা। এর জন্য আামাকে ইতিহাসের শিক্ষার্থী হতে হয় না।
: গুলি করেছিল পাকিস্তানিরা। আর মারা গিয়েছিল বাঙালিরা।
এতক্ষণ ধরে আড়চোখে তাকানো হোমায়রা সম্ভবত ‘পাকিস্তানি’ শব্দটা শুনে প্রতিক্রিয়ায় ধাতস্থ হয়ে ওঠে। কিংবা জেসিকা’র নিকটে তার দেশের পূর্বতন লোকেদের বদনামের সম্ভাবনার দায় নিতে চায় না সে। কিন্তু যেটা সত্য সেটা বলতেই হয়। তবে হোমায়রারও সত্য আছে যে-সত্য মেলে না আমার সত্যের সঙ্গে। আমাকে এড়িয়ে চলা এবং মনে-মনে আমাকে শত্রু জ্ঞান করা হোমায়রা জেসিকার মধ্যবর্তিতার ওপর দিয়ে তীক্ষ্ম স্বরে বলে ওঠে—
: এক্সকিউজ মি! আমি শুনেছি যারা ভাষার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল তাদের গুলি করেছিল বাঙালি সৈনিকেরাই। কাজেই পাকিস্তানিদের গুলি করার কথাটা হয়তো ঠিক নয়।
শুনে আমারও অবাক হওয়ারই কথা। ইতিহাসের ঘটনাটা আইনের হোমায়রার জানা ঠিকই কিন্তু তার জানায় থাকে না বস্তুনিরপেক্ষতা। আমি তাই জেসিকাকে সাক্ষী মেনে বলি—
: শোনো জেসিকা, দেশ যারা চালায়, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক যারা তাদের আদেশটাই তো আদেশ। সে যদি বলে গুলি করো তাদের চাকরি করা লোক, সে বাঙালি হোক বিহারি হোক গুলি করলো, এখন তাহলে হত্যাকারী কে? — যে আদেশ করলো সে-ই তো?
জেসিকার বিষয় হয়তো আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস কিন্তু ইতিহাসের দর্শন নিশ্চয়ই একেক জায়গার জন্য একেক রকম নয়। আমার উত্তরে জেসিকা সমর্থন জোগালে কিছুটা চুপসে যায় হোমায়রা। আরেক কোণে তখন কোলাহল শুরু হয়ে গেছে ট্রান্সভেস্টাইট-রাইট নিয়ে। রাজপথে ওদের অধিকার নিয়ে সরব হওয়া লোকেদের সমর্থনকারী মার্কিন যুবক নিক এভারেটের গলা শোনা যায়— ওদের মিছিলে যাওয়া মানেই তো আর ওদের মতো হওয়া নয়। পৃথিবীটা বৈচিত্র্যের, এটা মেনে নিতে হলে সবাইকেই জায়গা দিতে হবে। কোনো বিশেষ এক ধরনের লোক এসে দাবি তুললো, সবাইকে এমন হতেই হবে তাহলে সেটা তো স্বৈরাচার। আরেক ইতালিয় পাওলা’র বানানো ডেজার্ট মারমরিজ্জাতো একটা কোয়ার্টার প্লেটে তুলে নিতে নিতে আমি তাকাই হোমায়রার দিকে। আমার মনের গহিনে তখন একটা হাল্কা প্রশান্তির রেশ। হোমায়রার ভুল জানাকে সঠিকভাবে মোকাবেলা করবার তৃপ্তি নিয়ে আমি কেকের নরোম ভাগে কামড় বসাই। প্রায় মাঝরাত অবধি চলে ‘মেক আ ডিশ’ পাির্ট। পাশের কক্ষের সুইডিশ কামিলা লুন্ড অনেকটা ভদকা গিলে ফেলবার লোভ সামলাতে পারে না, যদিও সে দারুণ খাদ্যসচেতন। লাঞ্চে কখনো তাকে ভারি খাবার খেতে দেখি নি। কৌতুক করে সে-ই বলবে: আমি লাঞ্চে পাতা খাই! আসলে খায় নানা রকমের সালাদ পাতা। লেটুস চায়নিজ ক্যাবেজ আধসেদ্ধ পার্সনিপ ব্রোকলি এইসব। মাঝে-মাঝে একটু বৈচিত্র্য আনবার জন্য কুচিকুচি করে কাটা কি গ্রেইড করা রয়্যাল গালা বা ফুজি আপেল কিংবা হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকার সবুজরঙা আপেল যেগুলো পেকে যাওয়ার পরেও সবুজই দেখায়। কামিলা চাবি লাগাতে পারছিল না দরজায়। অনুমতি নিয়ে আমি তাকে সহায়তা করলাম। তখনই দেখলাম দৃষ্টিতে কিছুটা কৌতূহলের আঁকশি ঝুলিয়ে হোমায়রা ঢুকে পড়লো তার ছয় নম্বর কক্ষে।হোমায়রার সঙ্গে সম্পর্কটা মনে হয় শেষ পর্যন্ত ঠাণ্ডা লড়াইয়ের মতো কিছু একটার কাছাকাছি যাচ্ছিল। পার্টির রাতের পর থেকে তার গাম্ভীর্য আরও জমাট রূপ নেয়। কিন্তু প্রকৃতির বিচার বলে একটা কথা আছে। তবে সেটা এমন নাটকীয়তায় মোড় নেবে তা আমার ধারণার মধ্যে ছিল না। সকালেই নোটিশ পেলাম, সন্ধ্যায় হাউজ-মিটিং। হাউজ-প্রতিনিধি ডেনমার্কের এ্যাকসেল রাসমুসেন। ও পিএইচডি করছে জিওগ্রাফিতে। বিষয় ভূগোল হলেও ওর সঙ্গে হেনরিক ইবসেন নিয়ে অনেক গল্প করেছি। ওর নানা-বাড়ি নরওয়ের স্কিয়েন। ইবসেনের জন্মশহর সেই বন্দর-নগরের অনেক গল্প এ্যাকসেলের কাছে শুনতে শুনতে আমি প্রিয় নাট্যকারের মানুষজনকেই যেন দেখতে পাই। কিন্তু মিটিংয়ের আলোচনার বিষয়টা জানানো হয় না। সন্ধ্যায় আমরা মিটিংয়ে একত্রিত হলে দেখলাম, এক কোণের চেয়ারে খানিকটা জড়োসড়ো হয়ে বসে হোমায়রা কোরেশি। পরনে আকাশি রংয়ের সালোয়ার কামিজ আর মাথায় জর্জেটের শাদা ওড়না। স্কার্ফের বিকল্প হিসেবে ওড়নাই ঢেকে দিয়েছে তার মাথাটা। ফর্সা হোমায়রার চেহারায় অনেককাল আগেকার ভারতীয় চিত্রনায়িকা মধুবালার একটা স্পর্শ আলতো আভায় উঁকি দেয়। মিটিংয়ের বিষয় উপস্থাপন করলো এ্যাকসেল : বাড়ির হেল্থ্ এ্যান্ড হাইজিন। একটু অবাকই হই শুনে। প্রায় বছরখানেক বসবাসের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আমরা মানে কিনসাইডের সকলেই স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতায় যথেষ্ট অগ্রসর। তাছাড়া আমাদের বাড়িটা একটু বেশিমাত্রাতেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পাশের হাউজে একটা বিড়াল ছিল, বেডমেকারের পোষা। তা-ও মারা গেছে সপ্তাহদু’য়েক আগে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে কেমন শুষ্কদেহ হয়ে যায়, প্রচুর লোম ছড়াতে শুরু করে। হয়তো কোনো অজ্ঞাত রোগে পড়েছিল। সেটা বাদ দিলে আপত্তিকর বলবার মতো তেমন কিছুই ছিল না। কিছু প্রাথমিক আলাপের পর এ্যাকসেল জানালো, সাত নম্বর কক্ষের শিলাঘ স্নেইডেনের উত্থাপিত আপত্তির কারণেই হাউজমিটিং। স্কটিশ শিলাঘ হোমায়রার সংলগ্ন প্রতিবেশি। দোতলার বেসিনটা শিলাঘের কক্ষের সামনেই উল্টোদিকে সরু করিডরে। হোমায়রা নামাজ পড়বার জন্য সেই বেসিনে ধর্মীয় রীতিমোতাবেক অযু করে এবং সেটাও তার আপত্তির কারণ নয়। কেননা, যার-যার নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে কারও আপত্তি থাকবার কথা নয়। কিন্তু অজুর সর্বশেষ ধাপে হোমায়রা প্রথমে এক পা এবং পরে তার দ্বিতীয় পা বেসিনের ওপরটাতে তুলে যেভাবে ধোয় সেটাই শিলাঘের মূল আপত্তির হেতু। তার মতে, এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় এবং সেটা দেখতে দৃষ্টিকটু। শিলাঘ যখন বেসিনে মুখ ধুতে যায় তখন তার মনে হতে থাকে, সেখানে হোমায়রার পায়ের ময়লা ধুলোবালি লেগে রয়েছে। আপাত পরিচ্ছন্নতার আড়ালে হয়তো কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। একসঙ্গে বসবাসের এমন অভিজ্ঞতা সত্যিই প্রথম এবং সব প্রথমেরই একটা স্বাতন্ত্র্য থাকে। আমাদের কারোর মাথায়ই সমাধানের সূত্র ধরা দেয় না যদিও সবাই যে হোমায়রার প্রতি শত্রুতা অনুভব করে তা নয়। নিচতলায় একজন শিক্ষার্থী ছিল গত বছরের শেষদিকটায়: রাওয়ালপিন্ডির ওমর। সেও বেশ নামাজি ছিল কিন্তু নিচতলার কেউ তার ব্যাপারে কোনো আপত্তি তোলে নি কখনো। তাকেও নিশ্চয়ই অজু’র আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দুই পায়ের পাতা ধুয়ে নিতে হয়েছিল, সেটা অবশ্য পালনীয় একটা কাজ। হোমায়রা নিজ থেকেই দুঃখ প্রকাশ করলো। সে জানতো না এটা একটা আপত্তিকর বিষয়ে রূপ নেবে। তখনই আমার মাথায় এলো চিন্তাটা এবং এ্যাকসেলসহ সবাইকে বললাম, হোমায়রার দুই পা ধোয়ার বিষয়টা যেহেতু সবশেষের অংশ, সেটা বেসিনে পা না তুলেও সে করতে পারে। আগ্রহঝোলানো চোখে তাকায় শিলাঘ স্নেইডেন। বললাম, বেসিনের পরেই ল্যাভাটরি যেখানে শাওয়ারের জন্য যেতে হয় সবাইকেই। পুশশাওয়ারটা যেহেতু যথেষ্ট স্থিতিস্থাপক এবং সহজেই ওপর নিচ করা যায় চাইলে অযু’র সমস্ত রীতি শেষ করে সর্বশেষ পা-ধোয়ার কাজটুকু সেখানেই করা সম্ভব। আবার শাওয়ারকক্ষে একটা নিচু কল রয়েছে পানির, ছেড়ে দিলে অবারিত ধারা। বরং ধোয়ার কাজ সেখানেই সাবলীল হতে পারে। আমার প্রস্তাবনাটা সকলেরই পছন্দ হলো। এ্যাকসেল রাসমুসেন বিশেষভাবে আমাকে ধন্যবাদ দিল। শিলাঘ নিজ থেকেই হেমায়রাকে বললো: আমি দুঃখিত তোমাকে আলোচনার বিষয়ে পরিণত করবার জন্য। আশা করি কিছু মনে করবে না তুমি। অভিযোগকারী শিলাঘ অবশ্য খুব বন্ধুভাবাপন্ন। স্কটল্যান্ডের পার্থশায়ারে তার বাড়ি। জেনে বলেছিলাম, তুমি যে দেখছি বিখ্যাত মিশনারি আলেক্সান্ডার ডাফের গ্রামের লোক। হেসে বলে শিলাঘ, ডাফ আমাদেরই পূর্বপুরুষ, মায়ের দিক থেকে। একটা এ্যালবামে কলকাতার ডাফ কলেজে তোলা ওর বাবা-মায়ের ছবি দেখায় আমাকে। সত্যি পৃথিবীটা বড়ো নয় মোটেই। কলকাতার নিমতলা ঘাট স্ট্রিটের সেই বিল্ডিংয়ের সামনে দিয়ে আমিই হেঁটে গেছি কয়েকবার।
হোমায়রা যে নামাজি সেটা আমি আঁচ করেছিলাম ওর বাড়িতে আসবার দিন কয়েকের মধ্যেই। এক ভোরে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়মে যাবো বলে আগেভাগে উঠতে হয় আমাকে। ড্রামার স্রিট থেকে বাস ছেড়ে যাবে সকাল ছ’টায়। উঠে প্রস্তুতি সেরে টিফিন এবং লাঞ্চের জন্য গোটাকয় স্যান্ডউইচ বানাবার জন্য আমি দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামবো। ঠিক তখন করিডোরে মাথায় ওড়না-ঢাকা হোমায়রা শাওয়ারের দিকটা থেকে আসছিল ওর কক্ষে ঢুকবার জন্য। কিন্তু আমাকে দেখে মুহূর্তে দিক পাল্টে সে আবার উল্টো দিকে মানে বেসিন-শাওয়াররুমের দিকেই হেঁটে যেতে থাকে। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই সেটা আলিঝালি চোখে পড়ে। বাস ধরবার তাড়ায় বিষয়টা নিয়ে আমি আর ততো ভাবিত হই না। কিন্তু বাস যখন ইলফোর্ডের ভ্যালেন্টাইন পার্ক পেরিয়ে মিউজিয়মের রাস্তা ধরলো তখনই দুম্ করে দৃশ্যটা ভেসে উঠলো চোখে। এক তরুণির সঙ্গে আচমকা দেখা হতেই সে তার ভেজা-ভেজা মুখমন্ডলটা ঘুরিয়ে নিয়ে উল্টোমুখে ঘুরে হাঁটতে শুরু করেছে। বুঝতে পারলাম, হোমায়রা আসলে অযু করে কক্ষে ফিরছিল কিন্তু এতে ভোরে আমার সঙ্গে দেখাটা তার জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। পুরুষদৃষ্টির মুখোমুখি হোমায়রা পুনরায় অযু করবার জন্য মুখ ঘুরিয়ে চলে গেছে বেসিনের দিকে। হাউজমিটিংয়ের পর সবটা বেশ স্পষ্ট হয়ে আসে আমার নিকটে। সেদিনকার ঘটনার পর হোমায়রাকেও মনে হলো আমার প্রতি কিছুটা অনুকূল। তার ভাবভঙ্গিতে আগেকার গাম্ভীর্য অপ্রকট। দেখা হলেই তার মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার মুদ্রাটা আর লক্ষণীয় হয় না। বরং দেখে মনে হলো, তার আশা আমি তাকে সম্ভাষণ করি। করিও। কখনো স্মিত হেসে জবাব দেয়, কখনো স্বভাবে কাজের তাড়া আছে এমন ভাব দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে যায়। (চলবে)
মহীবুল আজিজ, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক, চট্টগ্রাম




